শুক্রবার, ২৩শে ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ ইং, ১১ই ফাল্গুন, ১৪২৪ বঙ্গাব্দ, দুপুর ১:৫৫
শিরোনাম
  • ঘৃণাকে বিজয়ী হতে দেয়া যাবে না, ট্রাম্পকে ইঙ্গিত করে জর্জ ক্লুনি
  • আমার একটাই চিন্তা দেশের মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন করা: প্রধানমন্ত্রী
  • ‘কেন্দ্রীয় সরকারের আগ্রাসী নীতির কারণে কাশ্মীরকে হারাতে হবে’
  • সাড়ে চারমাস পর মুখোমুখি, খাদিজাকে উদ্দেশ্য করে যা বলল বদরুল
  • খালেদার ‘সাজা’ বিরোধী নেতাকর্মীদের মনোবল ভাঙ্গার কৌশল!
  • বিএনপির কর্মসূচি ‘যথাসময়ে’ জানানো হবে: রিজভী
  • দলের জন্য বোলিং করতেও রাজি মুশফিক
  • শিশু জিহাদের মৃত্যু: চার জনের ১০ বছর করে কারাদণ্ড
  • অবশেষে বাড়ি অবরুদ্ধ করে রাখা সেই দেয়াল ভেঙ্গে ফেলা হচ্ছে
  • সাক্ষ্য দিলেন খাদিজা, চাইলেন বদরুলের সর্বোচ্চ শাস্তি
  • বদরুলের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিতে আদালতে খাদিজা
  • আজ বগুড়ায় যেসব প্রকল্প উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী
  • রোহিঙ্গা স্থানান্তরের সরকারি পরিকল্পনার সঙ্গে দ্বিমত মানবাধিকার কমিশনের
  • মহেশখালীতে ইয়াবা ব্যবসায়ীদের সঙ্গে পুলিশের ‘বন্দুকযুদ্ধ’
  • হোয়াইট হাউসে কাজ করার দীর্ঘ অভিজ্ঞতার কথা জানালেন এই বাংলাদেশি সাংবাদিক
Friday, January 13, 2017 9:05 am
A- A A+ Print

অরণ্যে রোদন : বন্ধুকে হাসপাতালে রেখে ফিরে…

7

জিয়া ইসলামের কথা উঠলেই আপনার মনে পড়বে তাঁর মধুর হাসিভরা মুখখানি। হাসি ছাড়া তাঁকে কেউ কখনো দেখেনি। আমি তাঁকে বলি ‘চিরশিশু’। শিশুর সরলতা নিয়ে তিনি এই রাজধানী ঢাকার যাবতীয় জটিলতা মোকাবিলা করে এসেছেন। তাঁর একটা অসাধারণ গুণ আছে—তিনি সবার উপকার করতে চান, আর উপকার করার সময় একটু বেশিই উপকার করেন। আর কীভাবে আপনার উপকার তিনি করতে পারবেন, এটাই যেন তাঁর চেষ্টা থাকে। প্রথম আলোর প্রধান আলোকচিত্র সাংবাদিক জিয়া ইসলাম। তাঁর তোলা অনেক ছবি বিখ্যাত হয়েছে। যেমন ধরা যাক, সিডরের সময় আশ্রয়কেন্দ্রে আশ্রয় নেওয়া মায়ের কোলজুড়ে আসা নবজাতকের ছবি, মায়ের কোলে শিশুটি, সদ্যোজাত শিশুটির মুখে হাসি, শিশুটির নামও রাখা হয়েছিল ‘সিডর’। প্রথম আলো ওই ছবি নিয়ে ক্যালেন্ডার করেছিল। ২১ আগস্ট শেখ হাসিনার জনসভায় গ্রেনেড হামলার ভয়াবহতম মুহূর্তটিতে জিয়া ইসলাম একই ট্রাকে ছিলেন। প্রচণ্ড শব্দ, রক্ত, ধোঁয়া, বিস্ফোরণের সেই বিহ্বল মুহূর্তে একের পর এক দেহ তাঁর শরীরের ওপরে এসে পড়েছে, তিনি জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছিলেন কয়েক মুহূর্তের জন্য, জ্ঞান ফিরেই হাতে তুলে নিয়েছেন ক্যামেরা, আইভি রহমানের নিস্পন্দ চোখের ছবিসহ অনেক ছবি জিয়া ইসলামের তোলা—আজ যেসব আমরা অত্যন্ত বেদনার সঙ্গে দেখে থাকি। জিয়া ইসলাম এর আগেও পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে বিপদের মধ্যে পড়েছিলেন, আহত হয়েছিলেন। কিন্তু কোনো কিছুই তাঁকে কর্তব্যচ্যুত করতে পারেনি। সবচেয়ে বড় কথা, জিয়া ইসলামের মুখের হাসি এতটুকু মলিন করতে পারেনি। জিয়া ইসলামের সংস্পর্শে একবার এসেছেন, কিন্তু জিয়াকে ভালোবেসে ফেলেননি, এমন মানুষ কেউ থাকতে পারে বলে আমরা বিশ্বাস করি না। জিয়া ইসলামের দুটি পুত্রসন্তান। জাইম (সাড়ে চার), জাওয়াদ (সাড়ে তিন)। জাইম আর জাওয়াদ তাদের মা আশাকে জিজ্ঞেস করছে, বাবা কোথায়? মা কী উত্তর দিচ্ছেন আমি জানি না। জিজ্ঞেস করার সাহস আমাদের নেই। ৯ জানুয়ারি গভীর রাতে জিয়া ইসলাম পান্থপথে ছিলেন মোটরবাইকে, রাস্তার এক পাশে, একটা অতি দ্রুতগামী গাড়ি ফাঁকা রাস্তায় জিয়াকে মোটরসাইকেলসমেত উড়িয়ে দিয়ে পালিয়ে চলে যায়। রাস্তা ফাঁকা ছিল। গাড়িটা জোরে না চালালে এবং চালক বেহুঁশ না থাকলে এই দুর্ঘটনা কিছুতেই ঘটতে পারত না। জিয়া ইসলাম এখন রাজধানীর অ্যাপোলো হাসপাতালে সংজ্ঞাহীন শুয়ে আছেন। তাঁর মস্তিষ্কে আঘাত লেগেছে। পা ভেঙে গেছে, চোয়াল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, পাঁজর ভাঙা, ফুসফুস রক্তময়। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয় তাঁকে সেই রাতে, পরে জরুরি ভিত্তিতে অ্যাপোলো হাসপাতালে, চিকিৎসকেরা দ্রুত তাঁর মস্তিষ্কে অস্ত্রোপচার করেন, গতকাল পর্যন্ত তাঁর জ্ঞান ফেরেনি। আমরা সবাই জিয়ার সুস্থতা কামনা করি, প্রার্থনা করি, জিয়া পুরোপুরি সুস্থ হয়ে আবার আমাদের মধ্যে ফিরে আসুন, ফিরে আসুন তাঁর সেই ভুবনজয়ী হাসি নিয়ে, সেই পেশাগত কর্মদক্ষতা নিয়ে, ফিরে আসুন তাঁর প্রিয় দুটি শিশুপুত্র আর তরুণী স্ত্রীর কাছে। প্রথম আলো তাঁর পাশে আছে, মিডিয়া স্টার লিমিটেড তাঁর পাশে আছে। বাংলাদেশের সাংবাদিক সমাজ শোনামাত্র তাঁর জন্য ছুটে এসেছে। কিন্তু এর বাইরেও যিনিই একবার তাঁর সঙ্গে মিশেছেন, তিনিই ব্যাকুল হয়ে জিয়ার সুস্থতা কামনা করছেন, কিছু একটা করার জন্য এগিয়ে এসেছেন। জিয়াকে মধ্যরাতে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আইসিইউতে নেওয়ার পর একজন অভিনেতা আইসিইউর সামনে আসেন। তাঁর মুখ থেকে মদের দুর্গন্ধ বেরোচ্ছিল। তিনি সবাইকে, সম্ভবত নিজেকে আশ্বস্ত করে বলেন, কিছু হবে না, জিয়া সেরে উঠবেন। তিনি সাংবাদিকদের বলেন, দুর্ঘটনা তিনিই ঘটিয়েছেন। একজন সাংবাদিক তাঁকে প্রশ্ন করেন, ভাই, গাড়িটা কি আপনিই চালাচ্ছিলেন? তিনি বলেন, হ্যাঁ, আমিই চালাচ্ছিলাম। পরদিন পুলিশ তাঁকে আটক করে। এরপর তিনি পুলিশকে বলতে থাকেন, জিয়ার মোটরসাইকেলে তিনি ধাক্কা দেননি, তিনি ধাক্কা দিয়েছিলেন একটা রডভর্তি ট্রাককে। সেটা শুনে আমাদের শিল্পী-অভিনেতাদের কেউ কেউ থানায় যান। ওই অভিনেতার মুক্তির জন্য ভয়াবহ রকম তদবির হতে থাকে, চাপ আসতে থাকে। পরে আমি একজন অভিনেতাকে ফোনে জিজ্ঞেস করি, আপনারা এটা কেন করতে গেলেন? অভিযুক্ত ব্যক্তিটি গাড়ি চালানোর সময় মাতাল ছিলেন, মদ্যপ অবস্থায় গাড়ি চালানো পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তে খুবই গুরুতর অপরাধ। তখন অভিনেতা তাঁর লজ্জা প্রকাশ করে বলেন, আমরা তো ঘটনা জানতাম না। আমরা ভেবেছি ঘটনা সরল, ভুল করে তাঁকে ধরা হয়েছে। পরে ঘটনার আদ্যোপান্ত শুনে আমরা চলে এসেছি। জিয়া ইসলামের বিপন্নতায় যেমন সহকর্মী বন্ধু ‘কমিউনিটি’ একযোগে তাঁর পাশে এসে দাঁড়িয়েছে, একজন অভিনেতার বিপদে তাঁর ‘কমিউনিটি’ও যে তাঁর পাশে দাঁড়াতে চেয়েছে, সেটাকেও আমরা ইতিবাচক হিসেবেই দেখব। বাংলাদেশের সমাজের এটাই শক্তি, একজনের বিপদে আরেকজনের এগিয়ে আসা। আবার এটাই দুর্বলতা, এই কমিউনিটি-বন্ধনের কারণে আইন তাঁর নিজস্ব গতিতে চলতে পারে না, তারেক মাসুদ কিংবা মিশুক মুনীরের মৃত্যুর জন্য দায়ী বাসটির চালককেও ছেড়ে দিতে বাধ্য হতে হয়। এ প্রসঙ্গে আমি বরং গতকালের প্রথম আলোর আনন্দ পাতায় প্রকাশিত মেরিল স্ট্রিপের বিখ্যাত বক্তৃতার কিছু অংশ উদ্ধৃত করতে চাই। তিনি বলেছেন, ‘আমরা চাই গণমাধ্যমের নীতি এমন হোক, যেন এর কাছে দেশের সর্বোচ্চ শক্তিও জবাবদিহি করতে বাধ্য থাকে। এ জন্যই তো আমাদের পূর্বপুরুষেরা সংবিধানে গণমাধ্যমকে পূর্ণ স্বাধীনতা দিয়েছেন। তাই আমি অনুরোধ করব, সুপ্রতিষ্ঠিত হলিউড ফরেন প্রেস অ্যাসোসিয়েশন ও আমার অঙ্গনের প্রত্যেককে আমার সঙ্গে একাত্ম হতে। সুসাংবাদিকতাকে টিকিয়ে রাখার এবং সাংবাদিকদের রক্ষা করার আন্দোলনে সবাইকে এক হওয়ার অনুরোধ করব। কারণ, এই সময়ে সাংবাদিকদের পথ মসৃণ করার জন্য আমাদের সহযোগিতা করতে হবে, যেন তাঁরা আমাদের সত্যকে সুরক্ষিত রাখতে পারেন। আরও একটি বিষয়ে বলতে চাই। একদিন আমরা রাতের খাওয়ার আগে শুটিং সেটে দাঁড়িয়ে ছিলাম। খাওয়াদাওয়া বাদ দিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা শুটিং করতে হবে ভেবে আক্ষেপ করছিলাম। সে সময়ই অভিনেতা টমি লি জোনস আমাকে বললেন, ‘মেরিল, অভিনেতা হওয়াই তো একটি বিশেষ অর্জন, তাই না?’ সত্যিই তাই। এ এক বিশেষ অর্জন। আর এটাই আমাদের একে অপরকে প্রতিনিয়ত মনে করিয়ে দিতে হবে—‘এটা এক বিশেষ অর্জন এবং একটি বিশেষ দায়িত্বও।’ মেরিল স্ট্রিপ যা বলেছেন, তা–ই আমি আমাদের অভিনেতাদেরও মনে করিয়ে দিতে চাই—অভিনেতা হওয়া একটা বিশেষ অর্জন এবং বিশেষ দায়িত্বও। সেই দায়িত্ব পালনে যেন আমাদের অভিনেতা-অভিনেত্রীরা বিরত না থাকেন। বাংলাদেশে আমরা একটা সত্যিকারের ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছি। পুঁজি দ্রুত গড়ে উঠছে, আমরা দ্রুত মধ্য-আয়ের দেশ হচ্ছি। পুঁজি গড়ে ওঠার কাল হলো নৈরাজ্যের কাল। আর আমাদের পুঁজি তো লুটেরা পুঁজি। বন ধ্বংস করে, নদী দখল করে, ভূমিদস্যুতা করে, বাঁধে সিমেন্টের বস্তার বদলে কিছু না ফেলে, ভবনে ইস্পাতের বদলে বাঁশ ব্যবহার করে, ঘুষের টাকা বালিশে ভরে রেখে, কর ফাঁকি দিয়ে, শুল্ক ফাঁকি দিয়ে, ব্যাংকের হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ করে, শেয়ার মার্কেটে কারসাজি করে, টাকা বাড়িয়ে দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে হাজার হাজার মানুষের কাছ থেকে টাকা নিয়ে পালিয়ে গিয়ে, ফেনসিডিল-ইয়াবার ব্যবসা করে আমাদের পুঁজি গড়ে উঠছে। এখানে একজন স্কুলশিক্ষকও বিজ্ঞাপন দেন, ‘পাত্রী চাই, মাসিক আয় দুই লাখ টাকা’। নিশ্চয়ই সৎ ব্যবসায়ী, সৎ উদ্যোক্তা এবং দেশের কোটি পরিশ্রমী সৃষ্টিশীল মানুষেরও অবদান আছে, তবে কালোটাকা সব সময় সাদাটাকাকে অপসারিত করে—অর্থনীতির এটাই নিয়ম। এর ফলে এর বিষফোড়াগুলো সমাজের ত্বকেও ফুটে উঠতে শুরু করেছে। উত্তরার কিশোরদের ‘গ্যাং’ এবং দুই গ্যাংয়ের দ্বন্দ্বের ফলে এক কিশোরের মৃত্যু তার একটা সামান্য প্রমাণ। এ ধরনের গ্যাং ঢাকার অন্য অংশেও আছে, দেয়াললিখনের মাধ্যমে তারা তাদের উপস্থিতি জানানও দিয়েছে। এ ধরনের গ্যাং থেকে দুর্ধর্ষ অপরাধী চক্র, আন্ডারওয়ার্ল্ড যেন গড়ে না ওঠে, সেদিকে এখনই সতর্ক দৃষ্টি দেওয়া দরকার। আর দুটি সমস্যার দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাই। একটা হলো মাতাল হয়ে গাড়ি চালানো, বেপরোয়া ড্রাইভিং। আরেকটা হলো জোরে গাড়ি চালানোর প্রতিযোগিতা। যে বাবার হাজার কোটি টাকা আছে, তিনি তো চাইবেনই ছেলেকে একটা স্পোর্টস কার কিনে দিতে। আর যে গাড়ির গতি মুহূর্তেই ২০০ মাইল ওঠানো যায়, তার কিশোর চালক সেটা নিয়ে বের হয়ে যে নির্বিচারে মানুষ মারবে, ঢাকার রাস্তায় মাঝেমধ্যেই তার প্রমাণ পাচ্ছি। এবং এ ধরনের একজন ‘ঘাতক’কে থানায় নিয়ে যাওয়ার পর তাকে ছেড়ে দেওয়ার চাপটা কত বড় হবে, সহজেই অনুমেয়। যেকোনো উন্নত দেশে চালক মদ খেয়েছেন কি না, রাস্তায় এটা পরীক্ষা করে দেখে পুলিশ। আমাদের দেশেও তা করা দরকার। আর এই দেশে স্পোর্টস কার, স্পিড কার কোন রাস্তায় চালানোর জন্য আনা হয়, কেউ আমাকে জানাবেন কি? আমাদের দেশে গাড়ি চালানো সত্যি কঠিন। হাইওয়ে তো নেই, একই রাস্তায় রিকশা-গরুর গাড়ি চলে, হাট বসে, আবার সেটাই হাইওয়ে। মানুষ পদচারী–সেতুর নিচ দিয়ে, কাঁটাতারের বেড়া টপকে রাস্তা পেরিয়ে গাড়ির সামনে পড়ে। কাজেই দুর্ঘটনা ঘটলেই চালককে দায়ী করার বিরুদ্ধে আমি। কিন্তু মানুষের জীবন যে মূল্যবান, এই কথাটা যেন সবাই উপলব্ধি করতে পারি। আমার সামান্য ভুলে একটা পরিবার তছনছ হয়ে যাবে, এটা যেন আমরা হতে না দিই। আর সর্বত্র দরকার আইনের শাসন। আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীলতা। এই নৈরাজ্যময় নষ্ট পুঁজির দৌরাত্ম্যের কালে সেটাই তো সবচেয়ে দুর্লভ। আনিসুল হক: সাহিত্যিক ও সাংবাদিক।

Comments

Comments!

 অরণ্যে রোদন : বন্ধুকে হাসপাতালে রেখে ফিরে…AmarbangladeshonlineAmarbangladeshonline | Amarbangladeshonline

অরণ্যে রোদন : বন্ধুকে হাসপাতালে রেখে ফিরে…

Friday, January 13, 2017 9:05 am
7

জিয়া ইসলামের কথা উঠলেই আপনার মনে পড়বে তাঁর মধুর হাসিভরা মুখখানি। হাসি ছাড়া তাঁকে কেউ কখনো দেখেনি। আমি তাঁকে বলি ‘চিরশিশু’। শিশুর সরলতা নিয়ে তিনি এই রাজধানী ঢাকার যাবতীয় জটিলতা মোকাবিলা করে এসেছেন। তাঁর একটা অসাধারণ গুণ আছে—তিনি সবার উপকার করতে চান, আর উপকার করার সময় একটু বেশিই উপকার করেন। আর কীভাবে আপনার উপকার তিনি করতে পারবেন, এটাই যেন তাঁর চেষ্টা থাকে। প্রথম আলোর প্রধান আলোকচিত্র সাংবাদিক জিয়া ইসলাম। তাঁর তোলা অনেক ছবি বিখ্যাত হয়েছে। যেমন ধরা যাক, সিডরের সময় আশ্রয়কেন্দ্রে আশ্রয় নেওয়া মায়ের কোলজুড়ে আসা নবজাতকের ছবি, মায়ের কোলে শিশুটি, সদ্যোজাত শিশুটির মুখে হাসি, শিশুটির নামও রাখা হয়েছিল ‘সিডর’। প্রথম আলো ওই ছবি নিয়ে ক্যালেন্ডার করেছিল।
২১ আগস্ট শেখ হাসিনার জনসভায় গ্রেনেড হামলার ভয়াবহতম মুহূর্তটিতে জিয়া ইসলাম একই ট্রাকে ছিলেন। প্রচণ্ড শব্দ, রক্ত, ধোঁয়া, বিস্ফোরণের সেই বিহ্বল মুহূর্তে একের পর এক দেহ তাঁর শরীরের ওপরে এসে পড়েছে, তিনি জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছিলেন কয়েক মুহূর্তের জন্য, জ্ঞান ফিরেই হাতে তুলে নিয়েছেন ক্যামেরা, আইভি রহমানের নিস্পন্দ চোখের ছবিসহ অনেক ছবি জিয়া ইসলামের তোলা—আজ যেসব আমরা অত্যন্ত বেদনার সঙ্গে দেখে থাকি। জিয়া ইসলাম এর আগেও পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে বিপদের মধ্যে পড়েছিলেন, আহত হয়েছিলেন। কিন্তু কোনো কিছুই তাঁকে কর্তব্যচ্যুত করতে পারেনি। সবচেয়ে বড় কথা, জিয়া ইসলামের মুখের হাসি এতটুকু মলিন করতে পারেনি। জিয়া ইসলামের সংস্পর্শে একবার এসেছেন, কিন্তু জিয়াকে ভালোবেসে ফেলেননি, এমন মানুষ কেউ থাকতে পারে বলে আমরা বিশ্বাস করি না।
জিয়া ইসলামের দুটি পুত্রসন্তান। জাইম (সাড়ে চার), জাওয়াদ (সাড়ে তিন)। জাইম আর জাওয়াদ তাদের মা আশাকে জিজ্ঞেস করছে, বাবা কোথায়? মা কী উত্তর দিচ্ছেন আমি জানি না। জিজ্ঞেস করার সাহস আমাদের নেই। ৯ জানুয়ারি গভীর রাতে জিয়া ইসলাম পান্থপথে ছিলেন মোটরবাইকে, রাস্তার এক পাশে, একটা অতি দ্রুতগামী গাড়ি ফাঁকা রাস্তায় জিয়াকে মোটরসাইকেলসমেত উড়িয়ে দিয়ে পালিয়ে চলে যায়। রাস্তা ফাঁকা ছিল। গাড়িটা জোরে না চালালে এবং চালক বেহুঁশ না থাকলে এই দুর্ঘটনা কিছুতেই ঘটতে পারত না।
জিয়া ইসলাম এখন রাজধানীর অ্যাপোলো হাসপাতালে সংজ্ঞাহীন শুয়ে আছেন। তাঁর মস্তিষ্কে আঘাত লেগেছে। পা ভেঙে গেছে, চোয়াল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, পাঁজর ভাঙা, ফুসফুস রক্তময়। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয় তাঁকে সেই রাতে, পরে জরুরি ভিত্তিতে অ্যাপোলো হাসপাতালে, চিকিৎসকেরা দ্রুত তাঁর মস্তিষ্কে অস্ত্রোপচার করেন, গতকাল পর্যন্ত তাঁর জ্ঞান ফেরেনি।
আমরা সবাই জিয়ার সুস্থতা কামনা করি, প্রার্থনা করি, জিয়া পুরোপুরি সুস্থ হয়ে আবার আমাদের মধ্যে ফিরে আসুন, ফিরে আসুন তাঁর সেই ভুবনজয়ী হাসি নিয়ে, সেই পেশাগত কর্মদক্ষতা নিয়ে, ফিরে আসুন তাঁর প্রিয় দুটি শিশুপুত্র আর তরুণী স্ত্রীর কাছে। প্রথম আলো তাঁর পাশে আছে, মিডিয়া স্টার লিমিটেড তাঁর পাশে আছে। বাংলাদেশের সাংবাদিক সমাজ শোনামাত্র তাঁর জন্য ছুটে এসেছে। কিন্তু এর বাইরেও যিনিই একবার তাঁর সঙ্গে মিশেছেন, তিনিই ব্যাকুল হয়ে জিয়ার সুস্থতা কামনা করছেন, কিছু একটা করার জন্য এগিয়ে এসেছেন।
জিয়াকে মধ্যরাতে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আইসিইউতে নেওয়ার পর একজন অভিনেতা আইসিইউর সামনে আসেন। তাঁর মুখ থেকে মদের দুর্গন্ধ বেরোচ্ছিল। তিনি সবাইকে, সম্ভবত নিজেকে আশ্বস্ত করে বলেন, কিছু হবে না, জিয়া সেরে উঠবেন। তিনি সাংবাদিকদের বলেন, দুর্ঘটনা তিনিই ঘটিয়েছেন। একজন সাংবাদিক তাঁকে প্রশ্ন করেন, ভাই, গাড়িটা কি আপনিই চালাচ্ছিলেন? তিনি বলেন, হ্যাঁ, আমিই চালাচ্ছিলাম। পরদিন পুলিশ তাঁকে আটক করে।
এরপর তিনি পুলিশকে বলতে থাকেন, জিয়ার মোটরসাইকেলে তিনি ধাক্কা দেননি, তিনি ধাক্কা দিয়েছিলেন একটা রডভর্তি ট্রাককে। সেটা শুনে আমাদের শিল্পী-অভিনেতাদের কেউ কেউ থানায় যান। ওই অভিনেতার মুক্তির জন্য ভয়াবহ রকম তদবির হতে থাকে, চাপ আসতে থাকে। পরে আমি একজন অভিনেতাকে ফোনে জিজ্ঞেস করি, আপনারা এটা কেন করতে গেলেন? অভিযুক্ত ব্যক্তিটি গাড়ি চালানোর সময় মাতাল ছিলেন, মদ্যপ অবস্থায় গাড়ি চালানো পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তে খুবই গুরুতর অপরাধ। তখন অভিনেতা তাঁর লজ্জা প্রকাশ করে বলেন, আমরা তো ঘটনা জানতাম না। আমরা ভেবেছি ঘটনা সরল, ভুল করে তাঁকে ধরা হয়েছে। পরে ঘটনার আদ্যোপান্ত শুনে আমরা চলে এসেছি।
জিয়া ইসলামের বিপন্নতায় যেমন সহকর্মী বন্ধু ‘কমিউনিটি’ একযোগে তাঁর পাশে এসে দাঁড়িয়েছে, একজন অভিনেতার বিপদে তাঁর ‘কমিউনিটি’ও যে তাঁর পাশে দাঁড়াতে চেয়েছে, সেটাকেও আমরা ইতিবাচক হিসেবেই দেখব। বাংলাদেশের সমাজের এটাই শক্তি, একজনের বিপদে আরেকজনের এগিয়ে আসা। আবার এটাই দুর্বলতা, এই কমিউনিটি-বন্ধনের কারণে আইন তাঁর নিজস্ব গতিতে চলতে পারে না, তারেক মাসুদ কিংবা মিশুক মুনীরের মৃত্যুর জন্য দায়ী বাসটির চালককেও ছেড়ে দিতে বাধ্য হতে হয়।
এ প্রসঙ্গে আমি বরং গতকালের প্রথম আলোর আনন্দ পাতায় প্রকাশিত মেরিল স্ট্রিপের বিখ্যাত বক্তৃতার কিছু অংশ উদ্ধৃত করতে চাই। তিনি বলেছেন, ‘আমরা চাই গণমাধ্যমের নীতি এমন হোক, যেন এর কাছে দেশের সর্বোচ্চ শক্তিও জবাবদিহি করতে বাধ্য থাকে। এ জন্যই তো আমাদের পূর্বপুরুষেরা সংবিধানে গণমাধ্যমকে পূর্ণ স্বাধীনতা দিয়েছেন। তাই আমি অনুরোধ করব, সুপ্রতিষ্ঠিত হলিউড ফরেন প্রেস অ্যাসোসিয়েশন ও আমার অঙ্গনের প্রত্যেককে আমার সঙ্গে একাত্ম হতে। সুসাংবাদিকতাকে টিকিয়ে রাখার এবং সাংবাদিকদের রক্ষা করার আন্দোলনে সবাইকে এক হওয়ার অনুরোধ করব। কারণ, এই সময়ে সাংবাদিকদের পথ মসৃণ করার জন্য আমাদের সহযোগিতা করতে হবে, যেন তাঁরা আমাদের সত্যকে সুরক্ষিত রাখতে পারেন।
আরও একটি বিষয়ে বলতে চাই। একদিন আমরা রাতের খাওয়ার আগে শুটিং সেটে দাঁড়িয়ে ছিলাম। খাওয়াদাওয়া বাদ দিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা শুটিং করতে হবে ভেবে আক্ষেপ করছিলাম। সে সময়ই অভিনেতা টমি লি জোনস আমাকে বললেন, ‘মেরিল, অভিনেতা হওয়াই তো একটি বিশেষ অর্জন, তাই না?’ সত্যিই তাই। এ এক বিশেষ অর্জন। আর এটাই আমাদের একে অপরকে প্রতিনিয়ত মনে করিয়ে দিতে হবে—‘এটা এক বিশেষ অর্জন এবং একটি বিশেষ দায়িত্বও।’
মেরিল স্ট্রিপ যা বলেছেন, তা–ই আমি আমাদের অভিনেতাদেরও মনে করিয়ে দিতে চাই—অভিনেতা হওয়া একটা বিশেষ অর্জন
এবং বিশেষ দায়িত্বও। সেই দায়িত্ব পালনে যেন আমাদের অভিনেতা-অভিনেত্রীরা বিরত না থাকেন।
বাংলাদেশে আমরা একটা সত্যিকারের ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছি। পুঁজি দ্রুত গড়ে উঠছে, আমরা দ্রুত মধ্য-আয়ের দেশ হচ্ছি। পুঁজি গড়ে ওঠার কাল হলো নৈরাজ্যের কাল। আর আমাদের পুঁজি তো লুটেরা পুঁজি। বন ধ্বংস করে, নদী দখল করে, ভূমিদস্যুতা করে, বাঁধে সিমেন্টের বস্তার বদলে কিছু না ফেলে, ভবনে ইস্পাতের বদলে বাঁশ ব্যবহার করে, ঘুষের টাকা বালিশে ভরে রেখে, কর ফাঁকি দিয়ে, শুল্ক ফাঁকি দিয়ে, ব্যাংকের হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ করে, শেয়ার মার্কেটে কারসাজি করে, টাকা বাড়িয়ে দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে হাজার হাজার মানুষের কাছ থেকে টাকা নিয়ে পালিয়ে গিয়ে, ফেনসিডিল-ইয়াবার ব্যবসা করে আমাদের পুঁজি গড়ে উঠছে। এখানে একজন স্কুলশিক্ষকও বিজ্ঞাপন দেন, ‘পাত্রী চাই, মাসিক আয় দুই লাখ টাকা’। নিশ্চয়ই সৎ ব্যবসায়ী, সৎ উদ্যোক্তা এবং দেশের কোটি পরিশ্রমী সৃষ্টিশীল মানুষেরও অবদান আছে, তবে কালোটাকা সব সময় সাদাটাকাকে অপসারিত করে—অর্থনীতির এটাই নিয়ম। এর ফলে এর বিষফোড়াগুলো সমাজের ত্বকেও ফুটে উঠতে শুরু করেছে। উত্তরার কিশোরদের ‘গ্যাং’ এবং দুই গ্যাংয়ের দ্বন্দ্বের ফলে এক কিশোরের মৃত্যু তার একটা সামান্য প্রমাণ। এ ধরনের গ্যাং ঢাকার অন্য অংশেও আছে, দেয়াললিখনের মাধ্যমে তারা তাদের উপস্থিতি জানানও দিয়েছে। এ ধরনের গ্যাং থেকে দুর্ধর্ষ অপরাধী চক্র, আন্ডারওয়ার্ল্ড যেন গড়ে না ওঠে, সেদিকে এখনই সতর্ক দৃষ্টি দেওয়া দরকার।
আর দুটি সমস্যার দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাই। একটা হলো মাতাল হয়ে গাড়ি চালানো, বেপরোয়া ড্রাইভিং। আরেকটা হলো জোরে গাড়ি চালানোর প্রতিযোগিতা। যে বাবার হাজার কোটি টাকা আছে, তিনি তো চাইবেনই ছেলেকে একটা স্পোর্টস কার কিনে দিতে। আর যে গাড়ির গতি মুহূর্তেই ২০০ মাইল ওঠানো যায়, তার কিশোর চালক সেটা নিয়ে বের হয়ে যে নির্বিচারে মানুষ মারবে, ঢাকার রাস্তায় মাঝেমধ্যেই তার প্রমাণ পাচ্ছি। এবং এ ধরনের একজন ‘ঘাতক’কে থানায় নিয়ে যাওয়ার পর তাকে ছেড়ে দেওয়ার চাপটা কত বড় হবে, সহজেই অনুমেয়।
যেকোনো উন্নত দেশে চালক মদ খেয়েছেন কি না, রাস্তায় এটা পরীক্ষা করে দেখে পুলিশ। আমাদের দেশেও তা করা দরকার। আর এই দেশে স্পোর্টস কার, স্পিড কার কোন রাস্তায় চালানোর জন্য আনা হয়, কেউ আমাকে জানাবেন কি?
আমাদের দেশে গাড়ি চালানো সত্যি কঠিন। হাইওয়ে তো নেই, একই রাস্তায় রিকশা-গরুর গাড়ি চলে, হাট বসে, আবার সেটাই হাইওয়ে। মানুষ পদচারী–সেতুর নিচ দিয়ে, কাঁটাতারের বেড়া টপকে রাস্তা পেরিয়ে গাড়ির সামনে পড়ে। কাজেই দুর্ঘটনা ঘটলেই চালককে দায়ী করার বিরুদ্ধে আমি। কিন্তু মানুষের জীবন যে মূল্যবান, এই কথাটা যেন সবাই উপলব্ধি করতে পারি। আমার সামান্য ভুলে একটা পরিবার তছনছ হয়ে যাবে, এটা যেন আমরা হতে না দিই।
আর সর্বত্র দরকার আইনের শাসন। আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীলতা। এই নৈরাজ্যময় নষ্ট পুঁজির দৌরাত্ম্যের কালে সেটাই তো সবচেয়ে দুর্লভ।
আনিসুল হক: সাহিত্যিক ও সাংবাদিক।

Comments

comments

সম্পাদক : মোহাম্মদ আবদুল বাছির
প্রকাশক: মোহাম্মদ জহিরুল ইসলাম
ফোন : ‎০১৭১৩৪০৯০৯০
৩৪৫/১, দিলু রোড, নিউ ইস্কাটন, ঢাকা-১০০০
X
 
নিয়মিত খবর পড়তে আমাদের ফেসবুক পেজে লাইক দিয়ে যুক্ত থাকুন
X