মঙ্গলবার, ২০শে ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ ইং, ৮ই ফাল্গুন, ১৪২৪ বঙ্গাব্দ, সকাল ৯:৪৯
শিরোনাম
  • ঘৃণাকে বিজয়ী হতে দেয়া যাবে না, ট্রাম্পকে ইঙ্গিত করে জর্জ ক্লুনি
  • আমার একটাই চিন্তা দেশের মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন করা: প্রধানমন্ত্রী
  • ‘কেন্দ্রীয় সরকারের আগ্রাসী নীতির কারণে কাশ্মীরকে হারাতে হবে’
  • সাড়ে চারমাস পর মুখোমুখি, খাদিজাকে উদ্দেশ্য করে যা বলল বদরুল
  • খালেদার ‘সাজা’ বিরোধী নেতাকর্মীদের মনোবল ভাঙ্গার কৌশল!
  • বিএনপির কর্মসূচি ‘যথাসময়ে’ জানানো হবে: রিজভী
  • দলের জন্য বোলিং করতেও রাজি মুশফিক
  • শিশু জিহাদের মৃত্যু: চার জনের ১০ বছর করে কারাদণ্ড
  • অবশেষে বাড়ি অবরুদ্ধ করে রাখা সেই দেয়াল ভেঙ্গে ফেলা হচ্ছে
  • সাক্ষ্য দিলেন খাদিজা, চাইলেন বদরুলের সর্বোচ্চ শাস্তি
  • বদরুলের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিতে আদালতে খাদিজা
  • আজ বগুড়ায় যেসব প্রকল্প উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী
  • রোহিঙ্গা স্থানান্তরের সরকারি পরিকল্পনার সঙ্গে দ্বিমত মানবাধিকার কমিশনের
  • মহেশখালীতে ইয়াবা ব্যবসায়ীদের সঙ্গে পুলিশের ‘বন্দুকযুদ্ধ’
  • হোয়াইট হাউসে কাজ করার দীর্ঘ অভিজ্ঞতার কথা জানালেন এই বাংলাদেশি সাংবাদিক
Saturday, September 3, 2016 7:01 pm
A- A A+ Print

আমেরিকার মুসলিমদের জাগ্রত করেছে ডোনাল্ড ট্রাম্প

152116_1

নিউইয়র্ক: অ্যালিসিয়া হার্নান্দেজ স্ট্রং (২০) বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া একজন ছাত্রী। আমেরিকার কানেকটিকাটের একটি মসজিদের লবিতে বসে দেশটির নতুন মুসলিম ভোটাদের নিবন্ধন করাচ্ছেন। তিনি প্রতি শুক্রবার মসজিদটিতে আসেন এবং বিকেলে আসরের নামাজের পূর্ব পর্যন্ত একটি টেবিল নিয়ে নিবন্ধন করানোর কাজ করেন। হার্নান্দেজ স্ট্রং ওয়েসলিয়ান বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন ছাত্রী এবং একজন গণতান্ত্রিক কর্মী। তার বাবা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিমান বাহিনীর একজন কর্মকর্তা। তিনি বেশ কিছুদিন হল ইসলামে ধর্মান্তরিত হয়েছেন। এক মিলিয়ন নতুন ভোটার নিবন্ধন করতে মাসব্যাপী মুসলমানদের জাতীয় প্রচারণায় তিনিও ভূমিকা রাখছেন। মূলত চারটি কারণে তিনি এ প্রচারণায় অংশ নিচ্ছেন বলে জানান। স্ট্রং বলেন, ‘প্রথমত, আমি একজন মুসলিম। দ্বিতীয়ত, আমি একজন ল্যাটিন এবং তৃতীয়ত, আমি একজন আফ্রিকান বংশোদ্ভূত আমেরিকান আর চতুর্থ কারণ হচ্ছে ডোনাল্ড ট্রাম্প। যিনি মুসলিম, ল্যাটিন ও কৃষ্ণাঙ্গ ভোটারদের সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়েছেন।’ যুক্তরাষ্ট্রে মুসলমানদের প্রবেশ নিষিদ্ধের জন্য ট্রাম্পের দাবি ইসলামের অনুসারীদেরকে মর্মাহত করেছে। ট্রাম্পের প্রেসিডেন্সিয়াল প্রচারণা আমেরিকান মুসলমানদের অনেকের কাছে লোহায় গ্যালভানাইজিং বা প্রলেপ দেয়ার মতো। যুক্তরাষ্ট্রে সম্ভবত বিশ্বের সবচেয়ে বেশি বর্ণের মানুষের বাস এবং জাতিগতভাবে তারা বিচিত্র ধর্মীয় সম্প্রদায়ের। ডোনাল্ড ট্রাম্পের ক্রমাগত মুসলিম বিদ্বেষ দেশটির ঘুমন্ত মুসলিম সম্প্রদায়কে জাগিয়ে তুলেছে।   আফগান বংশোদ্ভূত সিমেন জুবারখাইলি (২৭) বলেন, ‘ট্রাম্পের বাগাড়ম্বরপূর্ণ উক্তি মুসলমানদেরকে সজাগ করতে সহায়তা করেছে। এখন ট্রাম্পকে হারাতে আমরা সবাইঐক্যবদ্ধ।’ জুবারখাইলি কানেকটিকাটেই বড় হয়েছেন এবং কানেকটিকাট বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইনে স্নাতক লাভ করেন। তিনি বলেন, ‘এখানকার অনেক মুসলিম এখন আর নিজেদেরকে একা মনে করেন না। এমনকি তারা নিজেদেরকে সংখ্যালঘুও মনে করেন না। মুসলমানদের সম্পূর্ণভাবে নিষেধাজ্ঞার ট্রাম্পের ধারণা সম্পর্কেও তারা ভীত নয়।’ ট্রাম্পের মুসলিম বিরোধী বক্তব্য এবং রিপাবলিকান পার্টির পতাকাতলে তার উত্থান ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের হামলার পরে মুসলমানদের যে দুর্দশায় পড়তে হয়েছিল সেই পুরনো ক্ষতকেই পুনরায় স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে। ওই সময়ে আমেরিকান মুসলিমদের আনুগত্য নিয়ে অনেকেই প্রশ্ন তুলেছিলেন এবং যুক্তরাষ্ট্রের সমাজে তাদের অবস্থানকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে দিয়েছিল। ওই ঘটনার পর থেকে মুসলিম সম্প্রদায় দেশটিতে অন্তর্মুখী হয়ে পড়েন। মেট্রো নিউইয়র্ক ইসলামিক লিডারশিপ কাউন্সিলের নির্বাহী বোর্ডের সদস্য এবং নিউইয়র্ক মুসলিম ভোটার তথ্য ক্লাবের নেতা নাজি আল মোন্তাসির বলেন, ‘ট্রাম্পের মুসলিম বিদ্বেষমূলক বক্তব্য এখানকার মুসলিমদেরকে পুনরায় জাগিয়ে তুলেছে।’ তিনি ১৯৬৫ সালে ইয়েমেন থেকে যুক্তরাষ্ট্রে ইমিগ্যান্ট হন। ২০০১ সালে বিশিষ্ট নারী মুসলিম শিক্ষাবিদ এবং রাজনৈতিক কর্মী ডেবি আল মোন্তাসিরের সঙ্গে তার বিবাহ হয়। স্ত্রী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব হওয়া তা সত্ত্বেও ওই সময় পর্যন্ত তিনি রাজনৈতিকভাবে কোনো পক্ষের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না। ডেবি আল মোন্তাসির গত জুলাইয়ে ডেমোক্র্যাটিক ন্যাশনাল কনভেনশনালে দেয়া ভাষনে বলেন, ‘এবার সময় ভোটের মাধ্যমে সকল তিরস্কারের জবাব দেয়া।’      হার্নান্দেজ স্ট্রংয়ের সঙ্গে নাজি আল মোন্তাসির ও তার স্ত্রী ডেবি আল মোন্তাসির নিউ ব্রিটেনের আল তাকওয়া মসজিদে গত শুক্রবার এ দম্পতি বিষয়টি নিয়ে খোলামেলা কথা বলেন। মসজিদটিতে হার্নান্দেজ স্ট্রংও নিয়মিত আসেন এবং এখানে বসেই স্ট্রং ভোটারদের নিবন্ধনের কাজ করে থাকেন। নাজি আলমোন্তাসির বলেন, ‘এটা আমার কাছে খুবই স্পষ্ট যে, এই মুহূর্তে ট্রাম্পের সঙ্গে আমাদের দ্বন্দ্বে জড়াতে হবে। কেননা ট্রাম্প একজন বর্ণবাদী মানুষ এতে কোন সন্দেহ নেই। তিনি একজন সংকীর্ণবাদী ও ধর্মান্ধ। তিনি কেবল আমেরিকার জনই নয় সারা বিশ্বের জন্যেও বিষাক্ত।’ সর্বশেষ শুক্রবার নতুন ভোটার নিবন্ধিত কিছুটা কম হয়েছে। হার্নান্দেজ স্ট্রং কেবল একজন নতুন ভোটারকে নিবন্ধিত করাতে পেরেছেন। যদিও অনেকে ফরম বাড়িতে নিয়ে গিয়ে পূরণ করে তা সিটি হলে জমা দেন। সিটি হলটি ওই মসজিদ থেকে খুব বেশি দূরে নয়। নিউ ব্রিটেনে গত মাসের চেয়ে চলতি মাসে ৯০ জন মুসলমান  নিবন্ধিত হয়েছে। গ্রুপটি ৩ লাখেরও অধিক নতুন মুসলিম ভোটার নিবন্ধনের জন্য প্রচারণা চালাচ্ছে। হার্নান্দেজ স্ট্রং বলেন, ‘ইয়েমেনি সংস্কৃতি অপেক্ষাকৃত রক্ষণশীল। মুসলিম পুরুষ ও নারীরা সাধারণত আলাদাভাবে প্রার্থনা করেন। মসজিদে ভিন্ন ভিন্ন কক্ষে নামাজ আদায়সহ অন্যান্য কার্যাবলীও নারী-পুরুষ আলাদাভাবেই করে থাকে।’ ভোটিং সম্পর্কে সর্বপ্রথম আমি তাকওয়া মসজিদে বক্তব্য রাখি। সেদিন শ্রোতাদের বেশিরভাগই ছিল পুরুষ।  মহিলারা আলাদা একটি রুমে ভিডিওতে আমার বক্তব্য শুনছিল। বক্তব্য শেষে আমি যখন নারীদের রুমে ফিরে আসি তখন তারাও আমার সঙ্গে রোমাঞ্চ অনুভব করে। একজন মুসলিম নারী হিসেবে মুসলিম সম্প্রদায়ের সমর্থনে প্রচারণা চালাতে দেখে তারা খুব খুশি হয়।’ আলোচনায় ডেবি আল মোন্তাসির ট্রাম্প সম্পর্কে বলার চেয়ে তিনি বরং মুসলমানদের নিবন্ধনের বিষয়ে মনোযোগী হতে আহ্বান জানান। তিনি বলেন, ‘আমাদের ভোট কিভাবে গণনা করা হবে তার ওপর জোর দিতে হবে। কেননা এখানে আমাদের কয়েক ডজন ভোট স্থানীয় নির্বাচনে পরিবর্তন হতে পারে।’ তিনি বলেন, ‘সবচেয়ে বড় বার্তা যেটি আমরা মানুষকে পাঠানোর চেষ্টা করছি সেটা হলো এখানকার সব রাজনীতিই স্থানীয় কেন্দ্রীক। তাদের বুঝাতে চাচ্ছি এই নির্বাচন কিভাবে তাদের এবং তাদের প্রতিবেশিদের জীবনে সহজেই প্রভাব ফেলে। এজন্যই আমরা শহর থেকে শহর যাচ্ছি যেখানে বৃহৎ মুসলিম আমেরিকান সম্প্রদায়ের মানুষ বাস করে। আমার বিশ্বাস এটি সত্যিই তাদের নিজ সম্প্রদায়কে শক্তিশালী করবে।’ নিউ ব্রিটেন জেলায় রিপাবলিকান দলের কাউন্সিলর মাত্র ২০ ভোটে জয়ী হয়। হার্নান্দেজ স্ট্রং এ বিষয়টি মুসলিমদের বুঝানোর ওপর জোর দেন। হার্নান্দেজ স্ট্রং বলেন, ‘এই জেলায় অনেক মুসলিমের বাস। সেকারণে আমরা একটু টেষ্টা করলেই রিপাবলিকান প্রার্থীকে হারাতে পারি।’ কানেটিকাটে মুসলিম কোয়ালিশনের প্রতিষ্ঠাতা প্রেসিডেন্ট ডা. রেজা মনসুর হার্নান্দেজের ডানেই বসে ছিলেন।              ডা. রেজা মনসুর ও হার্নান্দেজ স্ট্রং ইমিগ্রেশন ও উচ্চ জন্মহারের কারণে ২০৩০ সালের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে এবং ইউরোপে মুসলিম জনসংখ্যা দ্বিগুণ হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। গবেষণায় দেখা গেছে, পশ্চিম ইউরোপের মুসলমানদের তুলনায় যুক্তরাষ্ট্রের মুসলমানরা আরো বেশি সমৃদ্ধিশালী এবং সুশিক্ষিত। মুসলিম নেতৃবৃন্দের অনুমান, কানেকটিকাটে অন্তত ১,০০,০০০ মুসলমানের বাস। এক জরিপে দেখা গেছে, আমেরিকান জনগোষ্ঠীর অর্ধেকেরও বেশি মানুষ ইসলাম সম্পর্কে সামান্য কিংবা কিছুই জানেন না। ২০১০ সালে পিউ রিসার্চের জরিপেও দেখা গেছে, মাত্র ৪১ শতাংশ মানুষ ব্যক্তিগতভাবে মুসলিমদের সম্পর্কে জানত।   হার্টফোর্ড হাসপাতালের হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ এবং কানেটিকাটের মুসলিম কোয়ালিশনের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ড. রেজা মনসুর এসব তথ্যে কিছুটা বিরক্ত। ১১ সেপ্টেম্বরের সন্ত্রাসী হামলার ঘটনায় একটি গ্রুপ সন্ত্রাসের জন্য মুসলিদের দায়ী করেন এবং মুসলিম মুক্ত বিশ্বের জন্য প্রচারণা চালান। কিন্তু বর্তমানে আমেরিকানদের মাঝে ইসলামের প্রতি নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি ক্রমবর্ধমান হারে বৃদ্ধিতে তিনি আরো বেশি উদ্বেগ প্রকাশ করেন। আমেরিকানদের মাঝে ইসলামের প্রতি নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি ২০০১ সালের হামলার আগে ছিল মাত্র ১৭ শতাংশ। মনসুর বলেন, ‘এটা আসলে ট্রাম্প নয়। ট্রাম্প কেবল মুসলিম বিদ্বেষকে তার প্রচারণায় কাজে লাগাচ্ছে মাত্র। কিন্তু দেশটিতে মুসলিম বিদ্বেষ গত এক দশকে ধারাবাহিকভাবেই বেড়েছে। ইসলামের প্রতি নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গির এই সংখ্যা ২০১২ সালে ছিল ৪০ শতাংশ এবং এখন ৫০ শতাংশেরও বেশি। যা ১৬০ মিলিয়ন আমেরিকান ইসলামের প্রতি নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি পোষন করেন।’ ১৯৯৫ সালে তার স্ত্রী আয়িদা কন্যা সন্তানের জন্ম দেন। এরপর থেকেই তিনি এবং তার স্ত্রী মুসলিম সম্প্রদায়ের জন্য আরো বেশি সক্রিয় হয়ে ওঠেন এবং ওই সময় থেকেই তার স্ত্রী হিজাব পড়া শুরু করেন। তাদের সঙ্গেই আলাপচারিতায় হোসাইন নামে এক যুবক ট্রাম্প এবং হিলারি ক্লিনটনের একটি ছবি দেখাচ্ছিলেন। ছবিটির নিচে শিরোনাম, ‘নভেম্বর ২০১০৬: রাজনৈতিক ভাগ্য মীমাংসাকারী।’ ছবিটি দেশটির রাজনীতি, তৃতীয় পক্ষ, নাগরিক অধিকার, অভিবাসন এবং ইসলামভীতির উপর মুসলিমদের দৃষ্টিভঙ্গি প্রতিফলিত হয়েছে এবং একই সঙ্গে প্রতিফলিত হয়েছে হিলারি ও ট্রাম্পের দৃষ্টিভঙ্গিও। ড. রেজা মনসুরের সঙ্গে ক্যাম্পেইনের বিষয় নিয়ে আলাপরত অন্যান্যরা কিভাবে হযরত মুহাম্মদ (সা.) মদিনায় একটি সংবিধান প্রণয়ণ করেন তার সংক্ষিপ্ত ইতিহাস তোলে ধরেন মনসুর। মদিনায় সনদ অনুযায়ী মুসলিমদের মতো ইহুদী ও অন্যান্য অমুসলিমদেরকে ধর্মীয় স্বাধীনতাসহ একই সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক অধিকার ভোগের নিশ্চয়তা দেয়া হয়েছিল। মনসুর বলেন, ‘রাজনৈতিক অধিকার প্রতিষ্ঠায় হযরত মুহাম্মদ (সা.) এর ভূমিকা চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।’   সিটি মিরর অবলম্বনে মো. রাহল আমীন

Comments

Comments!

 আমেরিকার মুসলিমদের জাগ্রত করেছে ডোনাল্ড ট্রাম্পAmarbangladeshonlineAmarbangladeshonline | Amarbangladeshonline

আমেরিকার মুসলিমদের জাগ্রত করেছে ডোনাল্ড ট্রাম্প

Saturday, September 3, 2016 7:01 pm
152116_1

নিউইয়র্ক: অ্যালিসিয়া হার্নান্দেজ স্ট্রং (২০) বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া একজন ছাত্রী। আমেরিকার কানেকটিকাটের একটি মসজিদের লবিতে বসে দেশটির নতুন মুসলিম ভোটাদের নিবন্ধন করাচ্ছেন।

তিনি প্রতি শুক্রবার মসজিদটিতে আসেন এবং বিকেলে আসরের নামাজের পূর্ব পর্যন্ত একটি টেবিল নিয়ে নিবন্ধন করানোর কাজ করেন।

হার্নান্দেজ স্ট্রং ওয়েসলিয়ান বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন ছাত্রী এবং একজন গণতান্ত্রিক কর্মী। তার বাবা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিমান বাহিনীর একজন কর্মকর্তা। তিনি বেশ কিছুদিন হল ইসলামে ধর্মান্তরিত হয়েছেন। এক মিলিয়ন নতুন ভোটার নিবন্ধন করতে মাসব্যাপী মুসলমানদের জাতীয় প্রচারণায় তিনিও ভূমিকা রাখছেন।

মূলত চারটি কারণে তিনি এ প্রচারণায় অংশ নিচ্ছেন বলে জানান। স্ট্রং বলেন, ‘প্রথমত, আমি একজন মুসলিম। দ্বিতীয়ত, আমি একজন ল্যাটিন এবং তৃতীয়ত, আমি একজন আফ্রিকান বংশোদ্ভূত আমেরিকান আর চতুর্থ কারণ হচ্ছে ডোনাল্ড ট্রাম্প। যিনি মুসলিম, ল্যাটিন ও কৃষ্ণাঙ্গ ভোটারদের সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়েছেন।’

যুক্তরাষ্ট্রে মুসলমানদের প্রবেশ নিষিদ্ধের জন্য ট্রাম্পের দাবি ইসলামের অনুসারীদেরকে মর্মাহত করেছে। ট্রাম্পের প্রেসিডেন্সিয়াল প্রচারণা আমেরিকান মুসলমানদের অনেকের কাছে লোহায় গ্যালভানাইজিং বা প্রলেপ দেয়ার মতো। যুক্তরাষ্ট্রে সম্ভবত বিশ্বের সবচেয়ে বেশি বর্ণের মানুষের বাস এবং জাতিগতভাবে তারা বিচিত্র ধর্মীয় সম্প্রদায়ের। ডোনাল্ড ট্রাম্পের ক্রমাগত মুসলিম বিদ্বেষ দেশটির ঘুমন্ত মুসলিম সম্প্রদায়কে জাগিয়ে তুলেছে।

 

আফগান বংশোদ্ভূত সিমেন জুবারখাইলি (২৭) বলেন, ‘ট্রাম্পের বাগাড়ম্বরপূর্ণ উক্তি মুসলমানদেরকে সজাগ করতে সহায়তা করেছে। এখন ট্রাম্পকে হারাতে আমরা সবাইঐক্যবদ্ধ।’ জুবারখাইলি কানেকটিকাটেই বড় হয়েছেন এবং কানেকটিকাট বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইনে স্নাতক লাভ করেন।

তিনি বলেন, ‘এখানকার অনেক মুসলিম এখন আর নিজেদেরকে একা মনে করেন না। এমনকি তারা নিজেদেরকে সংখ্যালঘুও মনে করেন না। মুসলমানদের সম্পূর্ণভাবে নিষেধাজ্ঞার ট্রাম্পের ধারণা সম্পর্কেও তারা ভীত নয়।’

ট্রাম্পের মুসলিম বিরোধী বক্তব্য এবং রিপাবলিকান পার্টির পতাকাতলে তার উত্থান ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের হামলার পরে মুসলমানদের যে দুর্দশায় পড়তে হয়েছিল সেই পুরনো ক্ষতকেই পুনরায় স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে। ওই সময়ে আমেরিকান মুসলিমদের আনুগত্য নিয়ে অনেকেই প্রশ্ন তুলেছিলেন এবং যুক্তরাষ্ট্রের সমাজে তাদের অবস্থানকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে দিয়েছিল। ওই ঘটনার পর থেকে মুসলিম সম্প্রদায় দেশটিতে অন্তর্মুখী হয়ে পড়েন।

মেট্রো নিউইয়র্ক ইসলামিক লিডারশিপ কাউন্সিলের নির্বাহী বোর্ডের সদস্য এবং নিউইয়র্ক মুসলিম ভোটার তথ্য ক্লাবের নেতা নাজি আল মোন্তাসির বলেন, ‘ট্রাম্পের মুসলিম বিদ্বেষমূলক বক্তব্য এখানকার মুসলিমদেরকে পুনরায় জাগিয়ে তুলেছে।’

তিনি ১৯৬৫ সালে ইয়েমেন থেকে যুক্তরাষ্ট্রে ইমিগ্যান্ট হন। ২০০১ সালে বিশিষ্ট নারী মুসলিম শিক্ষাবিদ এবং রাজনৈতিক কর্মী ডেবি আল মোন্তাসিরের সঙ্গে তার বিবাহ হয়। স্ত্রী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব হওয়া তা সত্ত্বেও ওই সময় পর্যন্ত তিনি রাজনৈতিকভাবে কোনো পক্ষের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না। ডেবি আল মোন্তাসির গত জুলাইয়ে ডেমোক্র্যাটিক ন্যাশনাল কনভেনশনালে দেয়া ভাষনে বলেন, ‘এবার সময় ভোটের মাধ্যমে সকল তিরস্কারের জবাব দেয়া।’

     হার্নান্দেজ স্ট্রংয়ের সঙ্গে নাজি আল মোন্তাসির ও তার স্ত্রী ডেবি আল মোন্তাসির

নিউ ব্রিটেনের আল তাকওয়া মসজিদে গত শুক্রবার এ দম্পতি বিষয়টি নিয়ে খোলামেলা কথা বলেন। মসজিদটিতে হার্নান্দেজ স্ট্রংও নিয়মিত আসেন এবং এখানে বসেই স্ট্রং ভোটারদের নিবন্ধনের কাজ করে থাকেন।

নাজি আলমোন্তাসির বলেন, ‘এটা আমার কাছে খুবই স্পষ্ট যে, এই মুহূর্তে ট্রাম্পের সঙ্গে আমাদের দ্বন্দ্বে জড়াতে হবে। কেননা ট্রাম্প একজন বর্ণবাদী মানুষ এতে কোন সন্দেহ নেই। তিনি একজন সংকীর্ণবাদী ও ধর্মান্ধ। তিনি কেবল আমেরিকার জনই নয় সারা বিশ্বের জন্যেও বিষাক্ত।’

সর্বশেষ শুক্রবার নতুন ভোটার নিবন্ধিত কিছুটা কম হয়েছে। হার্নান্দেজ স্ট্রং কেবল একজন নতুন ভোটারকে নিবন্ধিত করাতে পেরেছেন। যদিও অনেকে ফরম বাড়িতে নিয়ে গিয়ে পূরণ করে তা সিটি হলে জমা দেন। সিটি হলটি ওই মসজিদ থেকে খুব বেশি দূরে নয়। নিউ ব্রিটেনে গত মাসের চেয়ে চলতি মাসে ৯০ জন মুসলমান  নিবন্ধিত হয়েছে।

গ্রুপটি ৩ লাখেরও অধিক নতুন মুসলিম ভোটার নিবন্ধনের জন্য প্রচারণা চালাচ্ছে।

হার্নান্দেজ স্ট্রং বলেন, ‘ইয়েমেনি সংস্কৃতি অপেক্ষাকৃত রক্ষণশীল। মুসলিম পুরুষ ও নারীরা সাধারণত আলাদাভাবে প্রার্থনা করেন। মসজিদে ভিন্ন ভিন্ন কক্ষে নামাজ আদায়সহ অন্যান্য কার্যাবলীও নারী-পুরুষ আলাদাভাবেই করে থাকে।’

ভোটিং সম্পর্কে সর্বপ্রথম আমি তাকওয়া মসজিদে বক্তব্য রাখি। সেদিন শ্রোতাদের বেশিরভাগই ছিল পুরুষ।  মহিলারা আলাদা একটি রুমে ভিডিওতে আমার বক্তব্য শুনছিল। বক্তব্য শেষে আমি যখন নারীদের রুমে ফিরে আসি তখন তারাও আমার সঙ্গে রোমাঞ্চ অনুভব করে। একজন মুসলিম নারী হিসেবে মুসলিম সম্প্রদায়ের সমর্থনে প্রচারণা চালাতে দেখে তারা খুব খুশি হয়।’

আলোচনায় ডেবি আল মোন্তাসির ট্রাম্প সম্পর্কে বলার চেয়ে তিনি বরং মুসলমানদের নিবন্ধনের বিষয়ে মনোযোগী হতে আহ্বান জানান। তিনি বলেন, ‘আমাদের ভোট কিভাবে গণনা করা হবে তার ওপর জোর দিতে হবে। কেননা এখানে আমাদের কয়েক ডজন ভোট স্থানীয় নির্বাচনে পরিবর্তন হতে পারে।’

তিনি বলেন, ‘সবচেয়ে বড় বার্তা যেটি আমরা মানুষকে পাঠানোর চেষ্টা করছি সেটা হলো এখানকার সব রাজনীতিই স্থানীয় কেন্দ্রীক। তাদের বুঝাতে চাচ্ছি এই নির্বাচন কিভাবে তাদের এবং তাদের প্রতিবেশিদের জীবনে সহজেই প্রভাব ফেলে। এজন্যই আমরা শহর থেকে শহর যাচ্ছি যেখানে বৃহৎ মুসলিম আমেরিকান সম্প্রদায়ের মানুষ বাস করে। আমার বিশ্বাস এটি সত্যিই তাদের নিজ সম্প্রদায়কে শক্তিশালী করবে।’

নিউ ব্রিটেন জেলায় রিপাবলিকান দলের কাউন্সিলর মাত্র ২০ ভোটে জয়ী হয়। হার্নান্দেজ স্ট্রং এ বিষয়টি মুসলিমদের বুঝানোর ওপর জোর দেন। হার্নান্দেজ স্ট্রং বলেন, ‘এই জেলায় অনেক মুসলিমের বাস। সেকারণে আমরা একটু টেষ্টা করলেই রিপাবলিকান প্রার্থীকে হারাতে পারি।’

কানেটিকাটে মুসলিম কোয়ালিশনের প্রতিষ্ঠাতা প্রেসিডেন্ট ডা. রেজা মনসুর হার্নান্দেজের ডানেই বসে ছিলেন।

             ডা. রেজা মনসুর ও হার্নান্দেজ স্ট্রং

ইমিগ্রেশন ও উচ্চ জন্মহারের কারণে ২০৩০ সালের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে এবং ইউরোপে মুসলিম জনসংখ্যা দ্বিগুণ হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। গবেষণায় দেখা গেছে, পশ্চিম ইউরোপের মুসলমানদের তুলনায় যুক্তরাষ্ট্রের মুসলমানরা আরো বেশি সমৃদ্ধিশালী এবং সুশিক্ষিত। মুসলিম নেতৃবৃন্দের অনুমান, কানেকটিকাটে অন্তত ১,০০,০০০ মুসলমানের বাস।

এক জরিপে দেখা গেছে, আমেরিকান জনগোষ্ঠীর অর্ধেকেরও বেশি মানুষ ইসলাম সম্পর্কে সামান্য কিংবা কিছুই জানেন না। ২০১০ সালে পিউ রিসার্চের জরিপেও দেখা গেছে, মাত্র ৪১ শতাংশ মানুষ ব্যক্তিগতভাবে মুসলিমদের সম্পর্কে জানত।

 

হার্টফোর্ড হাসপাতালের হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ এবং কানেটিকাটের মুসলিম কোয়ালিশনের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ড. রেজা মনসুর এসব তথ্যে কিছুটা বিরক্ত। ১১ সেপ্টেম্বরের সন্ত্রাসী হামলার ঘটনায় একটি গ্রুপ সন্ত্রাসের জন্য মুসলিদের দায়ী করেন এবং মুসলিম মুক্ত বিশ্বের জন্য প্রচারণা চালান। কিন্তু বর্তমানে আমেরিকানদের মাঝে ইসলামের প্রতি নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি ক্রমবর্ধমান হারে বৃদ্ধিতে তিনি আরো বেশি উদ্বেগ প্রকাশ করেন। আমেরিকানদের মাঝে ইসলামের প্রতি নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি ২০০১ সালের হামলার আগে ছিল মাত্র ১৭ শতাংশ।

মনসুর বলেন, ‘এটা আসলে ট্রাম্প নয়। ট্রাম্প কেবল মুসলিম বিদ্বেষকে তার প্রচারণায় কাজে লাগাচ্ছে মাত্র। কিন্তু দেশটিতে মুসলিম বিদ্বেষ গত এক দশকে ধারাবাহিকভাবেই বেড়েছে। ইসলামের প্রতি নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গির এই সংখ্যা ২০১২ সালে ছিল ৪০ শতাংশ এবং এখন ৫০ শতাংশেরও বেশি। যা ১৬০ মিলিয়ন আমেরিকান ইসলামের প্রতি নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি পোষন করেন।’

১৯৯৫ সালে তার স্ত্রী আয়িদা কন্যা সন্তানের জন্ম দেন। এরপর থেকেই তিনি এবং তার স্ত্রী মুসলিম সম্প্রদায়ের জন্য আরো বেশি সক্রিয় হয়ে ওঠেন এবং ওই সময় থেকেই তার স্ত্রী হিজাব পড়া শুরু করেন।

তাদের সঙ্গেই আলাপচারিতায় হোসাইন নামে এক যুবক ট্রাম্প এবং হিলারি ক্লিনটনের একটি ছবি দেখাচ্ছিলেন। ছবিটির নিচে শিরোনাম, ‘নভেম্বর ২০১০৬: রাজনৈতিক ভাগ্য মীমাংসাকারী।’ ছবিটি দেশটির রাজনীতি, তৃতীয় পক্ষ, নাগরিক অধিকার, অভিবাসন এবং ইসলামভীতির উপর মুসলিমদের দৃষ্টিভঙ্গি প্রতিফলিত হয়েছে এবং একই সঙ্গে প্রতিফলিত হয়েছে হিলারি ও ট্রাম্পের দৃষ্টিভঙ্গিও।

ড. রেজা মনসুরের সঙ্গে ক্যাম্পেইনের বিষয় নিয়ে আলাপরত অন্যান্যরা

কিভাবে হযরত মুহাম্মদ (সা.) মদিনায় একটি সংবিধান প্রণয়ণ করেন তার সংক্ষিপ্ত ইতিহাস তোলে ধরেন মনসুর। মদিনায় সনদ অনুযায়ী মুসলিমদের মতো ইহুদী ও অন্যান্য অমুসলিমদেরকে ধর্মীয় স্বাধীনতাসহ একই সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক অধিকার ভোগের নিশ্চয়তা দেয়া হয়েছিল।

মনসুর বলেন, ‘রাজনৈতিক অধিকার প্রতিষ্ঠায় হযরত মুহাম্মদ (সা.) এর ভূমিকা চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।’

 

সিটি মিরর অবলম্বনে মো. রাহল আমীন

Comments

comments

সম্পাদক : মোহাম্মদ আবদুল বাছির
প্রকাশক: মোহাম্মদ জহিরুল ইসলাম
ফোন : ‎০১৭১৩৪০৯০৯০
৩৪৫/১, দিলু রোড, নিউ ইস্কাটন, ঢাকা-১০০০
X
 
নিয়মিত খবর পড়তে আমাদের ফেসবুক পেজে লাইক দিয়ে যুক্ত থাকুন
X