বৃহস্পতিবার, ২৭শে জুলাই, ২০১৭ ইং, ১২ই শ্রাবণ, ১৪২৪ বঙ্গাব্দ, দুপুর ১২:৩৪
শিরোনাম
  • ঘৃণাকে বিজয়ী হতে দেয়া যাবে না, ট্রাম্পকে ইঙ্গিত করে জর্জ ক্লুনি
  • আমার একটাই চিন্তা দেশের মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন করা: প্রধানমন্ত্রী
  • ‘কেন্দ্রীয় সরকারের আগ্রাসী নীতির কারণে কাশ্মীরকে হারাতে হবে’
  • সাড়ে চারমাস পর মুখোমুখি, খাদিজাকে উদ্দেশ্য করে যা বলল বদরুল
  • খালেদার ‘সাজা’ বিরোধী নেতাকর্মীদের মনোবল ভাঙ্গার কৌশল!
  • বিএনপির কর্মসূচি ‘যথাসময়ে’ জানানো হবে: রিজভী
  • দলের জন্য বোলিং করতেও রাজি মুশফিক
  • শিশু জিহাদের মৃত্যু: চার জনের ১০ বছর করে কারাদণ্ড
  • অবশেষে বাড়ি অবরুদ্ধ করে রাখা সেই দেয়াল ভেঙ্গে ফেলা হচ্ছে
  • সাক্ষ্য দিলেন খাদিজা, চাইলেন বদরুলের সর্বোচ্চ শাস্তি
  • বদরুলের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিতে আদালতে খাদিজা
  • আজ বগুড়ায় যেসব প্রকল্প উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী
  • রোহিঙ্গা স্থানান্তরের সরকারি পরিকল্পনার সঙ্গে দ্বিমত মানবাধিকার কমিশনের
  • মহেশখালীতে ইয়াবা ব্যবসায়ীদের সঙ্গে পুলিশের ‘বন্দুকযুদ্ধ’
  • হোয়াইট হাউসে কাজ করার দীর্ঘ অভিজ্ঞতার কথা জানালেন এই বাংলাদেশি সাংবাদিক
Monday, July 17, 2017 11:13 am
A- A A+ Print

আলোচ্যসূচিহীন সভায় সচিবেরা যা চাইলেন

7

আলী ইমাম মজুমদার: কয়েক দিন আগে বাংলাদেশ সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতিতে একটি সচিব সভা হয়েছে। এটা নতুন কিছু নয়। বরং বছরে অন্তত একবার এ রকম একটি সভা হওয়ার কথা। কিন্তু এবারের সভাটি হয়েছে প্রায় তিন বছরের বেশি সময়ের ব্যবধানে। যদিও প্রধানমন্ত্রীর অনেক সভাতেই সচিবেরা উপস্থিত থাকেন এবং তাঁর দিকনির্দেশনা পান, কিন্তু সেগুলো সচিব সভার বিকল্প নয়। এসব সভার সঙ্গে সচিব সভার বৈশিষ্ট্যগত পার্থক্য হচ্ছে এ সভায় কোনো নির্ধারিত আলোচ্যসূচি থাকে না। সচিবেরা তাঁদের মন্ত্রণালয় কিংবা গোটা সরকারব্যবস্থার বিভিন্ন দিক সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারেন। তাঁদের কোনো সুযোগ-সুবিধা সম্পর্কে দাবি তুলতে পারেন। ঠিক তেমনি প্রধানমন্ত্রী গোটা শাসনব্যবস্থায় সচিবদের অধিকতর ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে দিকনির্দেশনা দিয়ে থাকেন।

সংবাদপত্রে আসা খবরাদির বিবেচনায় এ সভা যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ ছিল। প্রধানমন্ত্রী বেশ কিছু মূল্যবান বক্তব্য দিয়েছেন। তাঁর একটি হচ্ছে বেতন-ভাতা যেহেতু বেড়েছে, তাই দুর্নীতি বন্ধ করতে হবে। এটা অত্যন্ত যৌক্তিক। আর সচিবেরা মন্ত্রণালয় বা বিভাগে প্রশাসনিক প্রধান হিসেবে এ দায়িত্ব পালনে তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন। উল্লেখ্য, মাত্র সাত বছরের ব্যবধানে প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের বেতন-ভাতা অত্যন্ত আকর্ষণীয় পরিমাণে বাড়ানো হয়েছে। ২০০৯-এর বেতন স্কেল কার্যকর হওয়ার আগে যে সচিব অবসরে গেছেন, তাঁর বেতন ছিল ২০১৫-এর সহকারী সচিব বা সমমানের পদের সূচনায় পাওয়া বেতনের সমান। সুতরাং প্রধানমন্ত্রীর এ নির্দেশনা সময়োপযোগী। দুর্নীতি দমনের বিষয়টি শুধু দুদকের ওপর ফেলে দিলেই চলবে না। তাদের বড় সহায়ক শক্তি হতে পারেন সরকারের সচিবেরা। এ বিষয় ছাড়াও প্রধানমন্ত্রী নতুন অর্থবছরের সূচনাতেই বছরের কাজগুলোর তালিকা করে অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে বাস্তবায়নের প্রস্তুতি, স্থল ও নৌবন্দর ২৪ ঘণ্টা খোলা রাখার ব্যবস্থা, জেলা পর্যায়ে ত্রাণের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা রাখা, যত্রতত্র শিল্পকারখানা স্থাপন না করা ইত্যাদি বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা দিয়েছেন।

আশা করা সংগত, সচিবেরা সরকারপ্রধানের এসব নির্দেশনাকে গুরুত্বের সঙ্গে নেবেন। সচেষ্ট হবেন বাস্তবায়নে। তবে এসব বিষয়ে অতীত অভিজ্ঞতা কিন্তু বিপরীত। আমরা জানি, সীমাবদ্ধতা আছে সচিবদের সামনে। তা না হলে খবরের কাগজে শিরোনাম দেখতাম না ‘সুন্দরবন ঘিরে ১৮৬ শিল্প ও প্রকল্প!’ রামপাল নিয়ে পানি ঘোলা এখনো হচ্ছে। তার মধ্যে এ অবস্থা কী করে হয়, এটা অনেকেরই ধারণার বাইরে। সরকারের কর্মসংস্কৃতিতে স্থবিরতা স্পষ্ট হয় তিন লাখ শূন্যপদের কথা জেনে। দায়িত্বশীল মহল বলছে, নিয়োগবিধি প্রণয়ন বা সংশোধন না হওয়া এ অবস্থার জন্য প্রধানত দায়ী। এসব বিধিতে সম্মতিদানে কোনো কোনো মহল অযাচিত বিলম্ব করে। আর যারা উদ্যোক্তা সংস্থা, তারাও থাকে গা ছাড়াভাবে। অথচ শক্ত হাতে বিষয়টিকে ধরলে নিয়োগবিধিগুলো সংশোধন বা নতুনভাবে তৈরি করতে দীর্ঘ সময় নেওয়ার কথা নয়।

সরকারের কাজে গতিশীলতা আনতে না পারলে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা যথাযথভাবে বাস্তবায়িত হবে না। এটা ঠিক যে সব সময় সবকিছু করা যায় না। সচিবদের ব্যাপারেও এ কথা প্রযোজ্য। তবে এই ১৬ কোটি জনসংখ্যা-অধ্যুষিত দেশটিতে প্রায় ১৫ লাখ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী আছেন। তাঁদের মধ্যে সচিব সাকল্যে কমবেশি ৭০ জন। আর যোগ্য বিবেচনা করেই সরকার তাঁদের পদোন্নতি দিয়েছে ও পদায়ন করেছে। সুতরাং চ্যালেঞ্জ মোকাবিলাও তাঁদেরই করতে হবে। এখন যাঁরা সচিব, তাঁদের পূর্বসূরিরাও যে তাঁদের চেয়ে খুব ভালো কাজ করতে পেরেছেন, এমন বলা যাবে না। তবে যেহেতু যখন যাঁরা দায়িত্বে, বিচ্যুতিবিষয়ক কথাগুলো তাঁদের কেন্দ্র করেই হবে। আমরা নিশ্চিতভাবে জানি, কর্মরতদের মধ্যে উঁচু নৈতিকতা ও দক্ষতাসম্পন্ন বেশ কিছু সচিব আছেন। আর বিপরীতটাও রয়েছে। এমনটি বলতে গেলে ছিল সব সময়ই।

এ সচিব সভায় সচিবদের পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রী বরাবর প্রশাসনের বেশ কিছু সমস্যা ও দাবি ওঠানো হয় বলে বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় দেখা গেছে। এর মধ্যে রয়েছে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটদের মোবাইল কোর্ট পরিচালনা ও সরকারি কাজ করতে গিয়ে আদালত অবমাননা মামলায় জড়িয়ে পড়া প্রসঙ্গে। মোবাইল কোর্ট বিষয়টি সর্বোচ্চ আদালতের এখতিয়ারে রয়েছে। তাই এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী কোনো মন্তব্য করেননি। তবে সঠিকভাবে তথ্য-উপাত্ত না দেওয়ায় কোনো কোনো সময় সচিবেরা সমস্যায় পড়েন বলে তিনি উল্লেখ করেন। অবশ্য বিষয়টি দেখতে নির্দেশ দেন আইনসচিবকে। সভায় উপস্থিত সচিবদের কেউ কেউ চাকরির বয়স বৃদ্ধি, সচিব পদে তিন বছর অতিক্রান্ত হলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে সিনিয়র সচিব পদে পদোন্নতি, অবসরের পরও বাসা-গাড়িসহ বাসভবনের সহায়ক কর্মচারীদের সুবিধা এবং তাঁদের গাড়িতে একটি পরিচিতি ফলক দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন। ভিআইপি সুবিধা বহাল রাখার কথাটিও এসেছে বলে জানা যায়।

অবসর-পরবর্তী ছুটিকালে বাসা ও গাড়ি-সুবিধা তাঁরা এমনিতেই পান। তবে পূর্ণ অবসরকালে এটা দেওয়ার কোনো সুযোগ আছে বলে মনে হয় না। চাকরির বয়স নিকট অতীতে দুবছর বেড়েছে। অপেক্ষমাণ নবীনদের সুযোগ দেওয়ার কথা বিবেচনায়, এ দাবি এখনই করা সংগত নয়। পদসংখ্যা নির্ধারণ না করে স্বয়ংক্রিয়ভাবে সিনিয়র সচিব পদে পদোন্নতির বিধানও বহুমাত্রিক সমস্যার সৃষ্টি করতে পারে। এটা সংক্ষেপে আলোচনাযোগ্য বিষয় নয়। তাই আপাতত বিবেচনায় না নেওয়াই ভালো।

সচিবদের গাড়িতে পরিচিতি ফলক সংযোজনের দাবির প্রসঙ্গে বলা হয়েছে, পরিচিতি ফলক না থাকায় তাঁরা রাষ্ট্রীয় ও সরকারি অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করতে গিয়ে বিব্রতকর অবস্থায় পড়েন। এ কথাটি কিন্তু বিভিন্ন কারণে প্রাসঙ্গিক হয়ে পড়েছে। শুধু যদি বঙ্গভবনে স্বাধীনতা ও বিজয় দিবসের অনুষ্ঠানের কথাই ধরা হয়, তবে গাড়ি পার্কিংয়ের ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার পায় পতাকাবাহী ও তারকাচিহ্নিত গাড়ি। আর জাতীয় পতাকা ছাড়া আগে শুধু সুপ্রিম কোর্টের পতাকা ব্যবহার করতেন বিচারপতিরা। তা ছাড়া প্রতিরক্ষা বাহিনী কমান্ড পদগুলোতে থাকা কর্মকর্তাদের পতাকা ব্যবহারের প্রতিষ্ঠিত রেওয়াজ আছে। বিদেশি রাষ্ট্রদূত ও উন্নয়ন-সহযোগী সংস্থার প্রধানেরাও ব্যবহার করেন তাঁদের পতাকা। সাংসদদের গাড়িতেও পৃথক মনোগ্রাম থাকে। হালে কিন্তু অনেক স্বায়ত্তশাসিত সংস্থার প্রধান তাঁদের প্রতিষ্ঠানের পতাকা গাড়িতে লাগিয়ে দিব্যি ঘুরে বেড়াচ্ছেন। সামরিক বাহিনীর ব্রিগেডিয়ার জেনারেল বা সমমর্যাদার কর্মকর্তা এবং তদূর্ধ্বদের গাড়িতে থাকে তারকা। এত সব পতাকা ও তারকাচিহ্নিত গাড়িতেই ভর্তি হয়ে যায় বঙ্গভবনের ভেতরের আঙিনা। সচিবদের গাড়িসহ অন্য সব গাড়ি পাঠিয়ে দেওয়া হয় এর বাইরে। অনুষ্ঠান শেষে গাড়ি পেতে কোনো কোনো সচিবের দুই ঘণ্টা সময় লাগে, এমন ঘটনা ঘটে প্রায় প্রতি অনুষ্ঠানে।

সরকারের রুলস অব বিজনেসে সচিবদের মন্ত্রণালয় বা বিভাগের প্রশাসনিক প্রধান বলা হয়েছে। অথচ এ ক্ষেত্রে তাঁদের অনেক কনিষ্ঠ কর্মকর্তার চেয়েও বেহাল অবস্থায় থাকতে হয়। আর ভিআইপি সুবিধা বহাল রাখার দাবি মূলত বিমানবন্দরের ভিআইপি লাউঞ্জ ব্যবহারের সুবিধার্থে। এটা সত্যিকার অর্থে একটি জটিল বিষয়ে পরিণত হয়েছে। আদৌ যাঁরা ভিআইপি নন, তাঁরাও কোনো না কোনোভাবে প্রভাবশালী হওয়ায় ব্যবহার করে চলছেন এসব লাউঞ্জ। এ ব্যবস্থাটিই উঠিয়ে দেওয়া যায়। যাঁরা শুধু প্রথম শ্রেণি ও বিজনেস শ্রেণির যাত্রী, তাঁরাই পেতে পারেন এ সুবিধা। এটা করা হলে মন্ত্রী, সাংসদ, সচিব—কারও অসুবিধা থাকবে না। পদ-পদবি ছাড়া ব্যক্তিরাও এসব শ্রেণিতে যাঁরা যাবেন, তাঁরাও এ সুবিধা পেতে পারেন। এ রকম একটি উদ্যোগে কিছু লোকের মনোবেদনা হলেও অপব্যবহারের সুযোগ কমে যাবে। বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় ছেড়ে দিলে সরকার কিছু রাজস্ব আয়ও করতে পারে এ খাত থেকে।

অনুষ্ঠিত সচিব সভাটি নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা এর গুরুত্ব বিবেচনায় প্রাসঙ্গিক। মনে হচ্ছে সভাটি ছিল প্রাণবন্ত। আর আলোচ্যসূচিবিহীন এ সভায় কিন্তু যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ বিষয়াদি আলোচিত হয়েছে। এ ধরনের সভা নিয়মিত বিরতিতে যেন হয়, সেদিকে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগকে নজর দিতে হবে।

আলী ইমাম মজুমদারসাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব

Comments

Comments!

 আলোচ্যসূচিহীন সভায় সচিবেরা যা চাইলেনAmarbangladeshonlineAmarbangladeshonline | Amarbangladeshonline

আলোচ্যসূচিহীন সভায় সচিবেরা যা চাইলেন

Monday, July 17, 2017 11:13 am
7

আলী ইমাম মজুমদার: কয়েক দিন আগে বাংলাদেশ সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতিতে একটি সচিব সভা হয়েছে। এটা নতুন কিছু নয়। বরং বছরে অন্তত একবার এ রকম একটি সভা হওয়ার কথা। কিন্তু এবারের সভাটি হয়েছে প্রায় তিন বছরের বেশি সময়ের ব্যবধানে। যদিও প্রধানমন্ত্রীর অনেক সভাতেই সচিবেরা উপস্থিত থাকেন এবং তাঁর দিকনির্দেশনা পান, কিন্তু সেগুলো সচিব সভার বিকল্প নয়। এসব সভার সঙ্গে সচিব সভার বৈশিষ্ট্যগত পার্থক্য হচ্ছে এ সভায় কোনো নির্ধারিত আলোচ্যসূচি থাকে না। সচিবেরা তাঁদের মন্ত্রণালয় কিংবা গোটা সরকারব্যবস্থার বিভিন্ন দিক সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারেন। তাঁদের কোনো সুযোগ-সুবিধা সম্পর্কে দাবি তুলতে পারেন। ঠিক তেমনি প্রধানমন্ত্রী গোটা শাসনব্যবস্থায় সচিবদের অধিকতর ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে দিকনির্দেশনা দিয়ে থাকেন।

সংবাদপত্রে আসা খবরাদির বিবেচনায় এ সভা যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ ছিল। প্রধানমন্ত্রী বেশ কিছু মূল্যবান বক্তব্য দিয়েছেন। তাঁর একটি হচ্ছে বেতন-ভাতা যেহেতু বেড়েছে, তাই দুর্নীতি বন্ধ করতে হবে। এটা অত্যন্ত যৌক্তিক। আর সচিবেরা মন্ত্রণালয় বা বিভাগে প্রশাসনিক প্রধান হিসেবে এ দায়িত্ব পালনে তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন। উল্লেখ্য, মাত্র সাত বছরের ব্যবধানে প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের বেতন-ভাতা অত্যন্ত আকর্ষণীয় পরিমাণে বাড়ানো হয়েছে। ২০০৯-এর বেতন স্কেল কার্যকর হওয়ার আগে যে সচিব অবসরে গেছেন, তাঁর বেতন ছিল ২০১৫-এর সহকারী সচিব বা সমমানের পদের সূচনায় পাওয়া বেতনের সমান। সুতরাং প্রধানমন্ত্রীর এ নির্দেশনা সময়োপযোগী। দুর্নীতি দমনের বিষয়টি শুধু দুদকের ওপর ফেলে দিলেই চলবে না। তাদের বড় সহায়ক শক্তি হতে পারেন সরকারের সচিবেরা। এ বিষয় ছাড়াও প্রধানমন্ত্রী নতুন অর্থবছরের সূচনাতেই বছরের কাজগুলোর তালিকা করে অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে বাস্তবায়নের প্রস্তুতি, স্থল ও নৌবন্দর ২৪ ঘণ্টা খোলা রাখার ব্যবস্থা, জেলা পর্যায়ে ত্রাণের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা রাখা, যত্রতত্র শিল্পকারখানা স্থাপন না করা ইত্যাদি বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা দিয়েছেন।

আশা করা সংগত, সচিবেরা সরকারপ্রধানের এসব নির্দেশনাকে গুরুত্বের সঙ্গে নেবেন। সচেষ্ট হবেন বাস্তবায়নে। তবে এসব বিষয়ে অতীত অভিজ্ঞতা কিন্তু বিপরীত। আমরা জানি, সীমাবদ্ধতা আছে সচিবদের সামনে। তা না হলে খবরের কাগজে শিরোনাম দেখতাম না ‘সুন্দরবন ঘিরে ১৮৬ শিল্প ও প্রকল্প!’ রামপাল নিয়ে পানি ঘোলা এখনো হচ্ছে। তার মধ্যে এ অবস্থা কী করে হয়, এটা অনেকেরই ধারণার বাইরে। সরকারের কর্মসংস্কৃতিতে স্থবিরতা স্পষ্ট হয় তিন লাখ শূন্যপদের কথা জেনে। দায়িত্বশীল মহল বলছে, নিয়োগবিধি প্রণয়ন বা সংশোধন না হওয়া এ অবস্থার জন্য প্রধানত দায়ী। এসব বিধিতে সম্মতিদানে কোনো কোনো মহল অযাচিত বিলম্ব করে। আর যারা উদ্যোক্তা সংস্থা, তারাও থাকে গা ছাড়াভাবে। অথচ শক্ত হাতে বিষয়টিকে ধরলে নিয়োগবিধিগুলো সংশোধন বা নতুনভাবে তৈরি করতে দীর্ঘ সময় নেওয়ার কথা নয়।

সরকারের কাজে গতিশীলতা আনতে না পারলে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা যথাযথভাবে বাস্তবায়িত হবে না। এটা ঠিক যে সব সময় সবকিছু করা যায় না। সচিবদের ব্যাপারেও এ কথা প্রযোজ্য। তবে এই ১৬ কোটি জনসংখ্যা-অধ্যুষিত দেশটিতে প্রায় ১৫ লাখ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী আছেন। তাঁদের মধ্যে সচিব সাকল্যে কমবেশি ৭০ জন। আর যোগ্য বিবেচনা করেই সরকার তাঁদের পদোন্নতি দিয়েছে ও পদায়ন করেছে। সুতরাং চ্যালেঞ্জ মোকাবিলাও তাঁদেরই করতে হবে। এখন যাঁরা সচিব, তাঁদের পূর্বসূরিরাও যে তাঁদের চেয়ে খুব ভালো কাজ করতে পেরেছেন, এমন বলা যাবে না। তবে যেহেতু যখন যাঁরা দায়িত্বে, বিচ্যুতিবিষয়ক কথাগুলো তাঁদের কেন্দ্র করেই হবে। আমরা নিশ্চিতভাবে জানি, কর্মরতদের মধ্যে উঁচু নৈতিকতা ও দক্ষতাসম্পন্ন বেশ কিছু সচিব আছেন। আর বিপরীতটাও রয়েছে। এমনটি বলতে গেলে ছিল সব সময়ই।

এ সচিব সভায় সচিবদের পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রী বরাবর প্রশাসনের বেশ কিছু সমস্যা ও দাবি ওঠানো হয় বলে বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় দেখা গেছে। এর মধ্যে রয়েছে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটদের মোবাইল কোর্ট পরিচালনা ও সরকারি কাজ করতে গিয়ে আদালত অবমাননা মামলায় জড়িয়ে পড়া প্রসঙ্গে। মোবাইল কোর্ট বিষয়টি সর্বোচ্চ আদালতের এখতিয়ারে রয়েছে। তাই এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী কোনো মন্তব্য করেননি। তবে সঠিকভাবে তথ্য-উপাত্ত না দেওয়ায় কোনো কোনো সময় সচিবেরা সমস্যায় পড়েন বলে তিনি উল্লেখ করেন। অবশ্য বিষয়টি দেখতে নির্দেশ দেন আইনসচিবকে। সভায় উপস্থিত সচিবদের কেউ কেউ চাকরির বয়স বৃদ্ধি, সচিব পদে তিন বছর অতিক্রান্ত হলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে সিনিয়র সচিব পদে পদোন্নতি, অবসরের পরও বাসা-গাড়িসহ বাসভবনের সহায়ক কর্মচারীদের সুবিধা এবং তাঁদের গাড়িতে একটি পরিচিতি ফলক দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন। ভিআইপি সুবিধা বহাল রাখার কথাটিও এসেছে বলে জানা যায়।

অবসর-পরবর্তী ছুটিকালে বাসা ও গাড়ি-সুবিধা তাঁরা এমনিতেই পান। তবে পূর্ণ অবসরকালে এটা দেওয়ার কোনো সুযোগ আছে বলে মনে হয় না। চাকরির বয়স নিকট অতীতে দুবছর বেড়েছে। অপেক্ষমাণ নবীনদের সুযোগ দেওয়ার কথা বিবেচনায়, এ দাবি এখনই করা সংগত নয়। পদসংখ্যা নির্ধারণ না করে স্বয়ংক্রিয়ভাবে সিনিয়র সচিব পদে পদোন্নতির বিধানও বহুমাত্রিক সমস্যার সৃষ্টি করতে পারে। এটা সংক্ষেপে আলোচনাযোগ্য বিষয় নয়। তাই আপাতত বিবেচনায় না নেওয়াই ভালো।

সচিবদের গাড়িতে পরিচিতি ফলক সংযোজনের দাবির প্রসঙ্গে বলা হয়েছে, পরিচিতি ফলক না থাকায় তাঁরা রাষ্ট্রীয় ও সরকারি অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করতে গিয়ে বিব্রতকর অবস্থায় পড়েন। এ কথাটি কিন্তু বিভিন্ন কারণে প্রাসঙ্গিক হয়ে পড়েছে। শুধু যদি বঙ্গভবনে স্বাধীনতা ও বিজয় দিবসের অনুষ্ঠানের কথাই ধরা হয়, তবে গাড়ি পার্কিংয়ের ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার পায় পতাকাবাহী ও তারকাচিহ্নিত গাড়ি। আর জাতীয় পতাকা ছাড়া আগে শুধু সুপ্রিম কোর্টের পতাকা ব্যবহার করতেন বিচারপতিরা। তা ছাড়া প্রতিরক্ষা বাহিনী কমান্ড পদগুলোতে থাকা কর্মকর্তাদের পতাকা ব্যবহারের প্রতিষ্ঠিত রেওয়াজ আছে। বিদেশি রাষ্ট্রদূত ও উন্নয়ন-সহযোগী সংস্থার প্রধানেরাও ব্যবহার করেন তাঁদের পতাকা। সাংসদদের গাড়িতেও পৃথক মনোগ্রাম থাকে। হালে কিন্তু অনেক স্বায়ত্তশাসিত সংস্থার প্রধান তাঁদের প্রতিষ্ঠানের পতাকা গাড়িতে লাগিয়ে দিব্যি ঘুরে বেড়াচ্ছেন। সামরিক বাহিনীর ব্রিগেডিয়ার জেনারেল বা সমমর্যাদার কর্মকর্তা এবং তদূর্ধ্বদের গাড়িতে থাকে তারকা। এত সব পতাকা ও তারকাচিহ্নিত গাড়িতেই ভর্তি হয়ে যায় বঙ্গভবনের ভেতরের আঙিনা। সচিবদের গাড়িসহ অন্য সব গাড়ি পাঠিয়ে দেওয়া হয় এর বাইরে। অনুষ্ঠান শেষে গাড়ি পেতে কোনো কোনো সচিবের দুই ঘণ্টা সময় লাগে, এমন ঘটনা ঘটে প্রায় প্রতি অনুষ্ঠানে।

সরকারের রুলস অব বিজনেসে সচিবদের মন্ত্রণালয় বা বিভাগের প্রশাসনিক প্রধান বলা হয়েছে। অথচ এ ক্ষেত্রে তাঁদের অনেক কনিষ্ঠ কর্মকর্তার চেয়েও বেহাল অবস্থায় থাকতে হয়। আর ভিআইপি সুবিধা বহাল রাখার দাবি মূলত বিমানবন্দরের ভিআইপি লাউঞ্জ ব্যবহারের সুবিধার্থে। এটা সত্যিকার অর্থে একটি জটিল বিষয়ে পরিণত হয়েছে। আদৌ যাঁরা ভিআইপি নন, তাঁরাও কোনো না কোনোভাবে প্রভাবশালী হওয়ায় ব্যবহার করে চলছেন এসব লাউঞ্জ। এ ব্যবস্থাটিই উঠিয়ে দেওয়া যায়। যাঁরা শুধু প্রথম শ্রেণি ও বিজনেস শ্রেণির যাত্রী, তাঁরাই পেতে পারেন এ সুবিধা। এটা করা হলে মন্ত্রী, সাংসদ, সচিব—কারও অসুবিধা থাকবে না। পদ-পদবি ছাড়া ব্যক্তিরাও এসব শ্রেণিতে যাঁরা যাবেন, তাঁরাও এ সুবিধা পেতে পারেন। এ রকম একটি উদ্যোগে কিছু লোকের মনোবেদনা হলেও অপব্যবহারের সুযোগ কমে যাবে। বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় ছেড়ে দিলে সরকার কিছু রাজস্ব আয়ও করতে পারে এ খাত থেকে।

অনুষ্ঠিত সচিব সভাটি নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা এর গুরুত্ব বিবেচনায় প্রাসঙ্গিক। মনে হচ্ছে সভাটি ছিল প্রাণবন্ত। আর আলোচ্যসূচিবিহীন এ সভায় কিন্তু যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ বিষয়াদি আলোচিত হয়েছে। এ ধরনের সভা নিয়মিত বিরতিতে যেন হয়, সেদিকে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগকে নজর দিতে হবে।

আলী ইমাম মজুমদারসাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব

Comments

comments

সম্পাদক : মোহাম্মদ আবদুল বাছির
প্রকাশক: মোহাম্মদ জহিরুল ইসলাম
ফোন : ‎০১৭১৩৪০৯০৯০
৩৪৫/১, দিলু রোড, নিউ ইস্কাটন, ঢাকা-১০০০
X
 
নিয়মিত খবর পড়তে আমাদের ফেসবুক পেজে লাইক দিয়ে যুক্ত থাকুন
X