সোমবার, ১৯শে ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ ইং, ৭ই ফাল্গুন, ১৪২৪ বঙ্গাব্দ, সন্ধ্যা ৭:৫৮
শিরোনাম
  • ঘৃণাকে বিজয়ী হতে দেয়া যাবে না, ট্রাম্পকে ইঙ্গিত করে জর্জ ক্লুনি
  • আমার একটাই চিন্তা দেশের মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন করা: প্রধানমন্ত্রী
  • ‘কেন্দ্রীয় সরকারের আগ্রাসী নীতির কারণে কাশ্মীরকে হারাতে হবে’
  • সাড়ে চারমাস পর মুখোমুখি, খাদিজাকে উদ্দেশ্য করে যা বলল বদরুল
  • খালেদার ‘সাজা’ বিরোধী নেতাকর্মীদের মনোবল ভাঙ্গার কৌশল!
  • বিএনপির কর্মসূচি ‘যথাসময়ে’ জানানো হবে: রিজভী
  • দলের জন্য বোলিং করতেও রাজি মুশফিক
  • শিশু জিহাদের মৃত্যু: চার জনের ১০ বছর করে কারাদণ্ড
  • অবশেষে বাড়ি অবরুদ্ধ করে রাখা সেই দেয়াল ভেঙ্গে ফেলা হচ্ছে
  • সাক্ষ্য দিলেন খাদিজা, চাইলেন বদরুলের সর্বোচ্চ শাস্তি
  • বদরুলের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিতে আদালতে খাদিজা
  • আজ বগুড়ায় যেসব প্রকল্প উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী
  • রোহিঙ্গা স্থানান্তরের সরকারি পরিকল্পনার সঙ্গে দ্বিমত মানবাধিকার কমিশনের
  • মহেশখালীতে ইয়াবা ব্যবসায়ীদের সঙ্গে পুলিশের ‘বন্দুকযুদ্ধ’
  • হোয়াইট হাউসে কাজ করার দীর্ঘ অভিজ্ঞতার কথা জানালেন এই বাংলাদেশি সাংবাদিক
Friday, September 30, 2016 1:38 pm
A- A A+ Print

ইলিশ-বিলাস

247157_1-1

ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত এক আসামিকে বিচারক জিজ্ঞেস করলেন, 'মৃত্যুর আগে তোমার কোনো ইচ্ছে থাকলে বলো।' ম্লান চেহারা কিছুটা প্রসন্ন করে লোকটি বললেন, 'হুজুর, মৃত্যুর আগে ও মৃত্যুর পরে আমার দুটো ইচ্ছে আছে।' 'বলো।' বিচারক জিজ্ঞেস করলেন। 'পুরো একবেলা ইলিশ মাছ খেতে চাই। আর মৃত্যুর পর আমার দেহের সঙ্গে যেন অন্তত একজোড়া ইলিশ মাছ দেওয়া হয়।' 'এত কিছু থাকতে ইলিশ মাছ কেন?' 'হুজুর, প্রতিটি ধর্মগ্রন্থেই অনেক ভালো ভালো কথা লেখা আছে, ভালো খাবারের কথাও বলা আছে। কিন্তু কোথাও ইলিশের কথা লেখা নেই। এত স্বাদের একটা খাবারের কথা কেন লেখা নেই_ এটা যেমন একটা প্রশ্ন, আর লেখা নেই বলেই স্বর্গে হয়তো ওটা পাওয়া যাবে না বলে আমার ধারণা। তাই মৃত্যুর আগে ওটা পেট ভরে খেয়ে যেতে চাই। আর মৃত্যুর পর নিয়ে যেতে চাই এ জন্য যে সবাই যেন বলে, আহারে লোকটা আর যা-ই হোক, ইলিশ ভালোবাসত খুব।' বিচারক হেসে বললেন, 'মৃত্যুর পর তুমি স্বর্গে যাবে_ এটা কে বলল?' 'কেউ বলেনি। তবে নরকেও যদি যাই, অন্তত ওখানে গিয়ে এ কথাটা বলতে পারব, এখানে আসার আগে প্রাণভরে ইলিশ মাছ খেয়ে এসেছি। আমার মনে আর কোনো দুঃখ নেই।' ইলিশে সয়লাব হয়ে গেছে সারা দেশ। এটা বোঝার জন্য কিন্তু বাজারে যেতে হয় না। বাসা থেকে কেবল বের হলেই চলে। যদি দেখেন, রাস্তার এখানে-ওখানে টিনের পাত্রে ইলিশ সাজানো আছে এবং বিক্রি করার জন্য কাতর গলায় আপনাকে সাধছে, তখনই বুঝবেন সময়টা ইলিশের। অথচ এই কয়দিন আগেও মিরপুর ১ নম্বর বাজারে একটা ইলিশের দাম যখন সাড়ে চার হাজার টাকা চাওয়া হলো, তখন ক্রেতা মন খারাপ করার বদলে হাসতে হাসতে বললেন, 'অসুবিধা নেই, ওই দাম দিয়েই কিনব। দাঁড়ান, তার আগে ব্যাংক ডাকাতিটা সেরে আসি।' উল্লেখ্য, ওই সময়টায় এই ব্যাংক-সেই ব্যাংক থেকে টাকা তছরূপের বিভিন্ন খবর ছাপা হচ্ছিল পত্রিকায়। ইলিশ এত মজার কেন? মানুষ কেন ইলিশ পছন্দ করে? ব্যাপারটা আপনার ওপরই ছেড়ে দেওয়া হলো_ সারাদিন পরিশ্রম করার পর বাসায় ফিরলেন, হাত-মুখ ধুয়ে ডাইনিংয়ে বসলেন। সামনের দিকে তাকাতেই চোখ দুটি প্রসারিত হয়ে গেল আপনার_ আরে, ইলিশ মাছ! খালি পেটটা খালি হয়ে গেল আরও। চিউ করে সামান্য শব্দও হলো। প্লেটে ভাত নিয়ে এক টুকরো ইলিশও নিলেন। দুই আঙুল দিয়ে পটলচেরা চোখের মতো লম্বাটে টুকরোটার ক্ষুদ্র একটা অংশ ভেঙে ফেললেন, মুখে দিলেন, জিহ্বায় স্পর্শ লাগার সঙ্গে সঙ্গে সমস্ত শরীর জানান দিল_ আহা কী আনন্দ, আহা কী শান্তি! ইলিশের নানা পদ আছে_ ইলিশ ভুনা, সরিষা ইলিশ, ভাঁপে ইলিশ, ইলিশ কোর্মা, দই ইলিশ, আনারসে ইলিশ, ইলিশ পাতুরি, ইলিশ বরিশালি, ইলিশ পোলাও, আরও হরেক রকম। কিন্তু আমরা কয় পদের ইলিশ খেয়েছি? আলু-বেগুনে অভ্যস্ত আমরা বাঙালিরা তরকারি ইলিশেই অভ্যস্ত। মাঝেমধ্যে তেলে ভাজা। কখনও কখনও সরষেতে। ব্যস, এটুকুই। নাসিরউদ্দিন হোজ্জা খুব অবস্থাশালী মানুষ ছিলেন না। তিনি বাজার থেকে তার নিজের জন্য, স্ত্রী ও দুই সন্তানের জন্য পুরো ইলিশ না কিনতে পেরে মোট চার টুকরো ইলিশ কিনে বাড়ি ফিরছিলেন। হাতে মাছের পোঁটলাটা। পেছন থেকে একটা কাক এসে ছোঁ মেরে পোঁটলাটা নিয়ে গেল। হোজ্জা কাকটার দিকে হেসে বললেন, 'তুমি মাছ নিয়ে গিয়ে কী করবে? রান্না তো আর করতে পারবে না।' কাকও সঙ্গে সঙ্গে হেসে জবাব দিল, 'কিছু কিছু খাবার আছে, সেগুলো এত স্বাদ যে রান্না না করেই খাওয়া যায়।' খবরে এসেছে, এবার চার গুণ ইলিশ উৎপাদন হয়েছে। কারখানার আগুনে পুড়ে মরা মানুষ, ট্রলার ডুবে পানিতে ডোবা মানুষ, ঈদকেন্দ্রিক রাস্তায় অ্যাক্সিডেন্টে শত মানুষ, এত কিছুর পরও বাজারে এখন একটই গুঞ্জন_ ইলিশ আর ইলিশ। মানুষের হাতে হাতে ইলিশ, ব্যাগে ইলিশ, ফ্রিজে ইলিশ, কেটে কেটে লবণ দিয়ে রাখা ইলিশ। মাঝখানে সামান্য একটা সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে_ কোরবানির ঈদ। মাংসে বোঝাই হওয়া ফ্রিজে ইলিশ রাখার জায়গা নেই। আরও একটা খবর হচ্ছে_ এর জন্য নাকি ফ্রিজ বিক্রি আবার বেড়ে গেছে। ব্যবসা তো, ভালো হলেই ভালো। রাজা কৃষ্ণ চন্দ্রের রাজ্যজুড়ে সবাই ইলিশ ধরছে, ইলিশ কিনছে, ইলিশ রান্না করে খাচ্ছে, ইলিশের গল্প করছে। প্রচুর ইলিশ ফলেছে এবার। রাজা যেখানেই যাচ্ছেন, যার সঙ্গেই দেখা হচ্ছে, সবাই কেবল ইলিশের গল্প করছে। রাজা চরম বিরক্ত। গোপাল বলল, 'এটা তো স্বাভাবিক রাজামশাই। ইলিশের সিজন, সবাই তো ইলিশের কথাই বলবে।' রাজা বললেন, 'না, আমি ইলিশের কথা শুনতে শুনতে বিরক্ত। ইলিশ নিয়ে এই কথাবার্তা তোমাকে বন্ধ করতেই হবে।' গোপাল বলল, 'আমি তো এত চালাক নই যে মানুষের স্বভাব বদলাতে পারব। পারলে হয়তো একদিনের জন্য ইলিশ নিয়ে এ গল্প বন্ধ করতে পারি।' রাজা বললেন, 'তুমি শুধু একটা সকাল ইলিশ নিয়ে এই বকবকানি যদি বন্ধ করতে পারো, তাহলে তোমাকে আমি পুরস্কৃত করব।' 'ঠিক আছে, কাল সকালে কেউ ইলিশ তো দূরের কথা, কোনো মাছ নিয়েই কথা বলবে না।' এই বলে চলে গেল গোপাল। সকালবেলা রাজা যখন রাজসভায় এলেন, তখন গোপালকে কোথাও দেখতে পেলেন না। রাজা কিছুটা রেগে গেলেন। এমন সময় শাড়ি পরা এক মহিলা লম্বা ঘোমটা টেনে রাজসভায় হাজির হলেন। মহিলাটি কিছুটা নাচের ভঙ্গি করলেন, তার পায়ের নূপুর, হাতের চুড়ি বেজে উঠল। সবাই এই অদ্ভুত মহিলাটির দিকে অবাক হয়ে দেখছিল আর নিজেদের মধ্যে ফিসফিস করছিল। কেউ কেউ বলছিল, সম্ভবত পাশের রাজ্য থেকে মহিলাটিকে পাঠানো হয়েছে। রাজা জানতে চাইলেন, 'তুমি কে? কেন এখানে এসেছ?' মহিলাটির কোনো উত্তর নেই। রাজা আশ্বস্ত করলেন, 'তোমার কোনো ভয় নেই। তুমি বলতে পারো।' উত্তর না দিয়ে মহিলাটি কেবল ঘোমটাটা আরও টেনে দিল। আগের মতো চুড়িগুলো বেজে উঠল। রাজা এবার বিরক্ত হলেন_ তার রাজসভার সময় নষ্ট হচ্ছে বলে। কেউ জিজ্ঞেস করলেন, 'তোমার কি মাথা খারাপ? তুমি কি বয়রা।' কোনো কিছুরই জবাব দিলেন না মহিলাটি। কেউ বা জানতে চাইল, 'তুমি কি মজা করছ?' মাথা নাড়িয়ে না বলল মহিলাটি। এভাবে কেটে গেল সারা সকাল। শেষমেশ রাজা বললেন, 'আমি ক্লান্ত, তুমি বরং কাল আসো। যাও, তুমি তো আমার সারা সকালটাই নষ্ট করে দিলে।' 'কিন্তু আমার তো সকালটা নষ্ট হয়নি', কথা বলে উঠল মহিলাটি। রাজা অবাক হয়ে দেখলেন, মহিলাটি আর কেউ নয়, গোপাল ভাঁড়। গোপাল বলল, 'আমি আমার কথা রেখেছি। এই সকালটাতে আমি সবার মনোযোগ এমন ঘুরিয়ে দিয়েছি যে কেউ একবারের জন্যও ইলিশের কথা বলেনি।' রাজা হাসতে হাসতে বললেন, 'হ্যাঁ, তুমি তোমার কথা রেখেছ। আর এ জন্য আমি তোমাকে পুরস্কৃত করব।' গোপাল হাত জোড় করে বলল, 'কিন্তু পুরস্কার হিসেবে আমাকে দয়া করে ইলিশ মাছ দেবেন না, হুজুর।' উড়িষ্যার একটি প্রবাদ আছে, 'মাছ খাও তো ইলিশ, চাকরি করো তো পুলিশ।' যাক, শুধু আমাদের দেশেই নয়, ইলিশের সঙ্গে সঙ্গে সব দেশেই পুলিশের খুব কদর। খারাপ কি, যে নিজের কদর বাড়াতে পারে, লাভ তো তারই। পুলিশের প্রসঙ্গ যখন এলোই, তখন আরেকটা গল্প বলি। গল্পটি জনপ্রিয় কবি নির্মলেন্দু গুণকে নিয়ে। এটিকে গল্প নয়, কৌতুক বলাই ভালো। গুণদা হাঁটতে পছন্দ করেন খুব। এ রকম একদিন মধ্যরাতে হাঁটার সময় পুলিশ তাকে ঠেকালেন। রাস্তার মাঝে বেশ বিব্রতকর অবস্থা। গুণদা কিছুটা মোলায়েম গলায় বললেন, 'আপনারা আমাকে আটকালেন কেন? আমি একজন কবি।' পেছন থেকে একজন পুলিশ এগিয়ে এসে বললেন, 'আপনি যে কবি, এটা বুঝব কী করে? প্রমাণ দিন?' গুণী গুণদা তৎক্ষণাৎ বললেন, 'মাছের রাজা ইলিশ, মানুষের রাজা পুলিশ।' পুলিশের চোখ তো ছানাবড়া! তোষামোদ কে না পছন্দ করে! তাজা ইলিশ মাছ আমাদের সবারই পছন্দ। আবার কেটে লবণ দিয়ে রাখা লোনা ইলিশও পছন্দ করেন অনেকে। বাংলাদেশের জিডিপির ১ পারসেন্ট কভার করে এই ইলিশ। জীবিকা নির্বাহের জন্য চার লাখ ৫০ হাজার মানুষ সরাসরি ইলিশ ধরার সঙ্গে জড়িত। চার থেকে পাঁচ মিলিয়ন মানুষ জড়িত ইলিশ ব্যবসার সঙ্গে। সারা পৃথিবীতে যত ইলিশ ধরা হয়, তার ৫০-৬০ পারসেন্ট ধরা হয় বাংলাদেশে, ১৫-২০ পারসেন্ট ভারত ও পাকিস্তানে। বাকি ৫-১০ পারসেন্ট ধরা হয় মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম, চীন ও শ্রীলংকায়। পুরনো একটি প্রবাদ দিয়ে লেখাটা শেষ করছি_ একজন বাঙালি মানে কবি, দু'জন বাঙালি মানে ফিল্ম সোসাইটি, তিনজন বাঙালি মিলে একটি রাজনৈতিক দল, আর চারজন বাঙালি মানে দুটি রাজনৈতিক দল। কিন্তু সত্য কথাটা হচ্ছে, এরা সবাই ইলিশ ভালোবাসে। ইলিশ ভালোবাসেন আমাদের দুই নেত্রীও। মন-কষাকষির এই সংস্কৃতিতে একটা কাজ করলে কেমন হয়? আমরা কতিপয় মানুষ খুব যত্ন করে মাত্র দশ-বারো পদের সুস্বাদু ইলিশ রান্না করে বললাম, মাননীয় দুই নেত্রী, এ রান্নাগুলো আপনাদের জন্য। কিছুই করতে হবে না। আপনারা দু'জন একসঙ্গে বসে একই টেবিলে শুধু খাবেন। আর কিছু না। সম্ভবত তারা ওই ইলিশের জন্য একই টেবিলে বসবেন এবং একটু পর দেশের সব জটিলতা দূর হয়ে যাবে আস্তে আস্তে। খুব কঠিন একটা প্রশ্ন_ যারা মাছ ধরেন এবং বিক্রি করেন, তারা ঠিকমতো ইলিশ খেতে পারেন তো? কলকাতার এক পুরনো বাংলা ছবিতে গৃহকর্তা খেতে বসেছেন। কাছের দেয়ালে একটা ইলিশের ছবি আঁকা। তিনি একটা করে ভাতের লোকমা হাতে নিচ্ছেন আর ওই ইলিশের ছবির সঙ্গে স্পর্শ করে গলায় দিচ্ছেন। সব শেষে তৃপ্তি নিয়ে বললেন, 'আকালের এই বাজারে ইলিশ খেতে না পারি, ইলিশের ছবির সঙ্গে ভাত ছুঁইয়ে তো খেতে পারছি।' পৃথিবীতে আমরাই একমাত্র জাতি_ মুখের ভাষার জন্য যাদের যুদ্ধ করতে হয়েছে, ভাষা-স্মৃতির জন্য যাদের শহীদ মিনার আছে। আমরা সেই জাতিও_ পৃথিবীর সবচেয়ে সুস্বাদু মাছটির বেশির ভাগ আছে যাদের পানিতে! আসুন, এই আনন্দে আমরা একটা গোলটেবিল বৈঠক করি। মধ্যরাতের টক শোতে এ নিয়ে দারুণ আলোচনা হতে পারে।

Comments

Comments!

 ইলিশ-বিলাসAmarbangladeshonlineAmarbangladeshonline | Amarbangladeshonline

ইলিশ-বিলাস

Friday, September 30, 2016 1:38 pm
247157_1-1

ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত এক আসামিকে বিচারক জিজ্ঞেস করলেন, ‘মৃত্যুর আগে তোমার কোনো ইচ্ছে থাকলে বলো।’

ম্লান চেহারা কিছুটা প্রসন্ন করে লোকটি বললেন, ‘হুজুর, মৃত্যুর আগে ও মৃত্যুর পরে আমার দুটো ইচ্ছে আছে।’

‘বলো।’ বিচারক জিজ্ঞেস করলেন।

‘পুরো একবেলা ইলিশ মাছ খেতে চাই। আর মৃত্যুর পর আমার দেহের সঙ্গে যেন অন্তত একজোড়া ইলিশ মাছ দেওয়া হয়।’

‘এত কিছু থাকতে ইলিশ মাছ কেন?’

‘হুজুর, প্রতিটি ধর্মগ্রন্থেই অনেক ভালো ভালো কথা লেখা আছে, ভালো খাবারের কথাও বলা আছে। কিন্তু কোথাও ইলিশের কথা লেখা নেই। এত স্বাদের একটা খাবারের কথা কেন লেখা নেই_ এটা যেমন একটা প্রশ্ন, আর লেখা নেই বলেই স্বর্গে হয়তো ওটা পাওয়া যাবে না বলে আমার ধারণা। তাই মৃত্যুর আগে ওটা পেট ভরে খেয়ে যেতে চাই। আর মৃত্যুর পর নিয়ে যেতে চাই এ জন্য যে সবাই যেন বলে, আহারে লোকটা আর যা-ই হোক, ইলিশ ভালোবাসত খুব।’

বিচারক হেসে বললেন, ‘মৃত্যুর পর তুমি স্বর্গে যাবে_ এটা কে বলল?’

‘কেউ বলেনি। তবে নরকেও যদি যাই, অন্তত ওখানে গিয়ে এ কথাটা বলতে পারব, এখানে আসার আগে প্রাণভরে ইলিশ মাছ খেয়ে এসেছি। আমার মনে আর কোনো দুঃখ নেই।’

ইলিশে সয়লাব হয়ে গেছে সারা দেশ। এটা বোঝার জন্য কিন্তু বাজারে যেতে হয় না। বাসা থেকে কেবল বের হলেই চলে। যদি দেখেন, রাস্তার এখানে-ওখানে টিনের পাত্রে ইলিশ সাজানো আছে এবং বিক্রি করার জন্য কাতর গলায় আপনাকে সাধছে, তখনই বুঝবেন সময়টা ইলিশের। অথচ এই কয়দিন আগেও মিরপুর ১ নম্বর বাজারে একটা ইলিশের দাম যখন সাড়ে চার হাজার টাকা চাওয়া হলো, তখন ক্রেতা মন খারাপ করার বদলে হাসতে হাসতে বললেন, ‘অসুবিধা নেই, ওই দাম দিয়েই কিনব। দাঁড়ান, তার আগে ব্যাংক ডাকাতিটা সেরে আসি।’ উল্লেখ্য, ওই সময়টায় এই ব্যাংক-সেই ব্যাংক থেকে টাকা তছরূপের বিভিন্ন খবর ছাপা হচ্ছিল পত্রিকায়।

ইলিশ এত মজার কেন? মানুষ কেন ইলিশ পছন্দ করে?

ব্যাপারটা আপনার ওপরই ছেড়ে দেওয়া হলো_ সারাদিন পরিশ্রম করার পর বাসায় ফিরলেন, হাত-মুখ ধুয়ে ডাইনিংয়ে বসলেন। সামনের দিকে তাকাতেই চোখ দুটি প্রসারিত হয়ে গেল আপনার_ আরে, ইলিশ মাছ! খালি পেটটা খালি হয়ে গেল আরও। চিউ করে সামান্য শব্দও হলো। প্লেটে ভাত নিয়ে এক টুকরো ইলিশও নিলেন। দুই আঙুল দিয়ে পটলচেরা চোখের মতো লম্বাটে টুকরোটার ক্ষুদ্র একটা অংশ ভেঙে ফেললেন, মুখে দিলেন, জিহ্বায় স্পর্শ লাগার সঙ্গে সঙ্গে সমস্ত শরীর জানান দিল_ আহা কী আনন্দ, আহা কী শান্তি!

ইলিশের নানা পদ আছে_ ইলিশ ভুনা, সরিষা ইলিশ, ভাঁপে ইলিশ, ইলিশ কোর্মা, দই ইলিশ, আনারসে ইলিশ, ইলিশ পাতুরি, ইলিশ বরিশালি, ইলিশ পোলাও, আরও হরেক রকম। কিন্তু আমরা কয় পদের ইলিশ খেয়েছি? আলু-বেগুনে অভ্যস্ত আমরা বাঙালিরা তরকারি ইলিশেই অভ্যস্ত। মাঝেমধ্যে তেলে ভাজা। কখনও কখনও সরষেতে। ব্যস, এটুকুই।

নাসিরউদ্দিন হোজ্জা খুব অবস্থাশালী মানুষ ছিলেন না। তিনি বাজার থেকে তার নিজের জন্য, স্ত্রী ও দুই সন্তানের জন্য পুরো ইলিশ না কিনতে পেরে মোট চার টুকরো ইলিশ কিনে বাড়ি ফিরছিলেন। হাতে মাছের পোঁটলাটা। পেছন থেকে একটা কাক এসে ছোঁ মেরে পোঁটলাটা নিয়ে গেল। হোজ্জা কাকটার দিকে হেসে বললেন, ‘তুমি মাছ নিয়ে গিয়ে কী করবে? রান্না তো আর করতে পারবে না।’ কাকও সঙ্গে সঙ্গে হেসে জবাব দিল, ‘কিছু কিছু খাবার আছে, সেগুলো এত স্বাদ যে রান্না না করেই খাওয়া যায়।’

খবরে এসেছে, এবার চার গুণ ইলিশ উৎপাদন হয়েছে। কারখানার আগুনে পুড়ে মরা মানুষ, ট্রলার ডুবে পানিতে ডোবা মানুষ, ঈদকেন্দ্রিক রাস্তায় অ্যাক্সিডেন্টে শত মানুষ, এত কিছুর পরও বাজারে এখন একটই গুঞ্জন_ ইলিশ আর ইলিশ। মানুষের হাতে হাতে ইলিশ, ব্যাগে ইলিশ, ফ্রিজে ইলিশ, কেটে কেটে লবণ দিয়ে রাখা ইলিশ। মাঝখানে সামান্য একটা সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে_ কোরবানির ঈদ। মাংসে বোঝাই হওয়া ফ্রিজে ইলিশ রাখার জায়গা নেই। আরও একটা খবর হচ্ছে_ এর জন্য নাকি ফ্রিজ বিক্রি আবার বেড়ে গেছে। ব্যবসা তো, ভালো হলেই ভালো।

রাজা কৃষ্ণ চন্দ্রের রাজ্যজুড়ে সবাই ইলিশ ধরছে, ইলিশ কিনছে, ইলিশ রান্না করে খাচ্ছে, ইলিশের গল্প করছে। প্রচুর ইলিশ ফলেছে এবার। রাজা যেখানেই যাচ্ছেন, যার সঙ্গেই দেখা হচ্ছে, সবাই কেবল ইলিশের গল্প করছে। রাজা চরম বিরক্ত। গোপাল বলল, ‘এটা তো স্বাভাবিক রাজামশাই। ইলিশের সিজন, সবাই তো ইলিশের কথাই বলবে।’ রাজা বললেন, ‘না, আমি ইলিশের কথা শুনতে শুনতে বিরক্ত। ইলিশ নিয়ে এই কথাবার্তা তোমাকে বন্ধ করতেই হবে।’

গোপাল বলল, ‘আমি তো এত চালাক নই যে মানুষের স্বভাব বদলাতে পারব। পারলে হয়তো একদিনের জন্য ইলিশ নিয়ে এ গল্প বন্ধ করতে পারি।’ রাজা বললেন, ‘তুমি শুধু একটা সকাল ইলিশ নিয়ে এই বকবকানি যদি বন্ধ করতে পারো, তাহলে তোমাকে আমি পুরস্কৃত করব।’

‘ঠিক আছে, কাল সকালে কেউ ইলিশ তো দূরের কথা, কোনো মাছ নিয়েই কথা বলবে না।’ এই বলে চলে গেল গোপাল।

সকালবেলা রাজা যখন রাজসভায় এলেন, তখন গোপালকে কোথাও দেখতে পেলেন না। রাজা কিছুটা রেগে গেলেন। এমন সময় শাড়ি পরা এক মহিলা লম্বা ঘোমটা টেনে রাজসভায় হাজির হলেন। মহিলাটি কিছুটা নাচের ভঙ্গি করলেন, তার পায়ের নূপুর, হাতের চুড়ি বেজে উঠল।

সবাই এই অদ্ভুত মহিলাটির দিকে অবাক হয়ে দেখছিল আর নিজেদের মধ্যে ফিসফিস করছিল। কেউ কেউ বলছিল, সম্ভবত পাশের রাজ্য থেকে মহিলাটিকে পাঠানো হয়েছে। রাজা জানতে চাইলেন, ‘তুমি কে? কেন এখানে এসেছ?’ মহিলাটির কোনো উত্তর নেই। রাজা আশ্বস্ত করলেন, ‘তোমার কোনো ভয় নেই। তুমি বলতে পারো।’ উত্তর না দিয়ে মহিলাটি কেবল ঘোমটাটা আরও টেনে দিল। আগের মতো চুড়িগুলো বেজে উঠল। রাজা এবার বিরক্ত হলেন_ তার রাজসভার সময় নষ্ট হচ্ছে বলে। কেউ জিজ্ঞেস করলেন, ‘তোমার কি মাথা খারাপ? তুমি কি বয়রা।’ কোনো কিছুরই জবাব দিলেন না মহিলাটি। কেউ বা জানতে চাইল, ‘তুমি কি মজা করছ?’ মাথা নাড়িয়ে না বলল মহিলাটি। এভাবে কেটে গেল সারা সকাল। শেষমেশ রাজা বললেন, ‘আমি ক্লান্ত, তুমি বরং কাল আসো। যাও, তুমি তো আমার সারা সকালটাই নষ্ট করে দিলে।’

‘কিন্তু আমার তো সকালটা নষ্ট হয়নি’, কথা বলে উঠল মহিলাটি। রাজা অবাক হয়ে দেখলেন, মহিলাটি আর কেউ নয়, গোপাল ভাঁড়। গোপাল বলল, ‘আমি আমার কথা রেখেছি। এই সকালটাতে আমি সবার মনোযোগ এমন ঘুরিয়ে দিয়েছি যে কেউ একবারের জন্যও ইলিশের কথা বলেনি।’

রাজা হাসতে হাসতে বললেন, ‘হ্যাঁ, তুমি তোমার কথা রেখেছ। আর এ জন্য আমি তোমাকে পুরস্কৃত করব।’

গোপাল হাত জোড় করে বলল, ‘কিন্তু পুরস্কার হিসেবে আমাকে দয়া করে ইলিশ মাছ দেবেন না, হুজুর।’

উড়িষ্যার একটি প্রবাদ আছে, ‘মাছ খাও তো ইলিশ, চাকরি করো তো পুলিশ।’ যাক, শুধু আমাদের দেশেই নয়, ইলিশের সঙ্গে সঙ্গে সব দেশেই পুলিশের খুব কদর। খারাপ কি, যে নিজের কদর বাড়াতে পারে, লাভ তো তারই।

পুলিশের প্রসঙ্গ যখন এলোই, তখন আরেকটা গল্প বলি। গল্পটি জনপ্রিয় কবি নির্মলেন্দু গুণকে নিয়ে। এটিকে গল্প নয়, কৌতুক বলাই ভালো। গুণদা হাঁটতে পছন্দ করেন খুব। এ রকম একদিন মধ্যরাতে হাঁটার সময় পুলিশ তাকে ঠেকালেন। রাস্তার মাঝে বেশ বিব্রতকর অবস্থা। গুণদা কিছুটা মোলায়েম গলায় বললেন, ‘আপনারা আমাকে আটকালেন কেন? আমি একজন কবি।’

পেছন থেকে একজন পুলিশ এগিয়ে এসে বললেন, ‘আপনি যে কবি, এটা বুঝব কী করে? প্রমাণ দিন?’

গুণী গুণদা তৎক্ষণাৎ বললেন, ‘মাছের রাজা ইলিশ, মানুষের রাজা পুলিশ।’ পুলিশের চোখ তো ছানাবড়া! তোষামোদ কে না পছন্দ করে!

তাজা ইলিশ মাছ আমাদের সবারই পছন্দ। আবার কেটে লবণ দিয়ে রাখা লোনা ইলিশও পছন্দ করেন অনেকে। বাংলাদেশের জিডিপির ১ পারসেন্ট কভার করে এই ইলিশ। জীবিকা নির্বাহের জন্য চার লাখ ৫০ হাজার মানুষ সরাসরি ইলিশ ধরার সঙ্গে জড়িত। চার থেকে পাঁচ মিলিয়ন মানুষ জড়িত ইলিশ ব্যবসার সঙ্গে। সারা পৃথিবীতে যত ইলিশ ধরা হয়, তার ৫০-৬০ পারসেন্ট ধরা হয় বাংলাদেশে, ১৫-২০ পারসেন্ট ভারত ও পাকিস্তানে। বাকি ৫-১০ পারসেন্ট ধরা হয় মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম, চীন ও শ্রীলংকায়।

পুরনো একটি প্রবাদ দিয়ে লেখাটা শেষ করছি_ একজন বাঙালি মানে কবি, দু’জন বাঙালি মানে ফিল্ম সোসাইটি, তিনজন বাঙালি মিলে একটি রাজনৈতিক দল, আর চারজন বাঙালি মানে দুটি রাজনৈতিক দল। কিন্তু সত্য কথাটা হচ্ছে, এরা সবাই ইলিশ ভালোবাসে। ইলিশ ভালোবাসেন আমাদের দুই নেত্রীও। মন-কষাকষির এই সংস্কৃতিতে একটা কাজ করলে কেমন হয়? আমরা কতিপয় মানুষ খুব যত্ন করে মাত্র দশ-বারো পদের সুস্বাদু ইলিশ রান্না করে বললাম, মাননীয় দুই নেত্রী, এ রান্নাগুলো আপনাদের জন্য। কিছুই করতে হবে না। আপনারা দু’জন একসঙ্গে বসে একই টেবিলে শুধু খাবেন। আর কিছু না।

সম্ভবত তারা ওই ইলিশের জন্য একই টেবিলে বসবেন এবং একটু পর দেশের সব জটিলতা দূর হয়ে যাবে আস্তে আস্তে।

খুব কঠিন একটা প্রশ্ন_ যারা মাছ ধরেন এবং বিক্রি করেন, তারা ঠিকমতো ইলিশ খেতে পারেন তো? কলকাতার এক পুরনো বাংলা ছবিতে গৃহকর্তা খেতে বসেছেন। কাছের দেয়ালে একটা ইলিশের ছবি আঁকা। তিনি একটা করে ভাতের লোকমা হাতে নিচ্ছেন আর ওই ইলিশের ছবির সঙ্গে স্পর্শ করে গলায় দিচ্ছেন। সব শেষে তৃপ্তি নিয়ে বললেন, ‘আকালের এই বাজারে ইলিশ খেতে না পারি, ইলিশের ছবির সঙ্গে ভাত ছুঁইয়ে তো খেতে পারছি।’

পৃথিবীতে আমরাই একমাত্র জাতি_ মুখের ভাষার জন্য যাদের যুদ্ধ করতে হয়েছে, ভাষা-স্মৃতির জন্য যাদের শহীদ মিনার আছে। আমরা সেই জাতিও_ পৃথিবীর সবচেয়ে সুস্বাদু মাছটির বেশির ভাগ আছে যাদের পানিতে!

আসুন, এই আনন্দে আমরা একটা গোলটেবিল বৈঠক করি। মধ্যরাতের টক শোতে এ নিয়ে দারুণ আলোচনা হতে পারে।

Comments

comments

সম্পাদক : মোহাম্মদ আবদুল বাছির
প্রকাশক: মোহাম্মদ জহিরুল ইসলাম
ফোন : ‎০১৭১৩৪০৯০৯০
৩৪৫/১, দিলু রোড, নিউ ইস্কাটন, ঢাকা-১০০০
X
 
নিয়মিত খবর পড়তে আমাদের ফেসবুক পেজে লাইক দিয়ে যুক্ত থাকুন
X