রবিবার, ১৮ই ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ ইং, ৬ই ফাল্গুন, ১৪২৪ বঙ্গাব্দ, দুপুর ১২:৫২
শিরোনাম
  • ঘৃণাকে বিজয়ী হতে দেয়া যাবে না, ট্রাম্পকে ইঙ্গিত করে জর্জ ক্লুনি
  • আমার একটাই চিন্তা দেশের মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন করা: প্রধানমন্ত্রী
  • ‘কেন্দ্রীয় সরকারের আগ্রাসী নীতির কারণে কাশ্মীরকে হারাতে হবে’
  • সাড়ে চারমাস পর মুখোমুখি, খাদিজাকে উদ্দেশ্য করে যা বলল বদরুল
  • খালেদার ‘সাজা’ বিরোধী নেতাকর্মীদের মনোবল ভাঙ্গার কৌশল!
  • বিএনপির কর্মসূচি ‘যথাসময়ে’ জানানো হবে: রিজভী
  • দলের জন্য বোলিং করতেও রাজি মুশফিক
  • শিশু জিহাদের মৃত্যু: চার জনের ১০ বছর করে কারাদণ্ড
  • অবশেষে বাড়ি অবরুদ্ধ করে রাখা সেই দেয়াল ভেঙ্গে ফেলা হচ্ছে
  • সাক্ষ্য দিলেন খাদিজা, চাইলেন বদরুলের সর্বোচ্চ শাস্তি
  • বদরুলের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিতে আদালতে খাদিজা
  • আজ বগুড়ায় যেসব প্রকল্প উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী
  • রোহিঙ্গা স্থানান্তরের সরকারি পরিকল্পনার সঙ্গে দ্বিমত মানবাধিকার কমিশনের
  • মহেশখালীতে ইয়াবা ব্যবসায়ীদের সঙ্গে পুলিশের ‘বন্দুকযুদ্ধ’
  • হোয়াইট হাউসে কাজ করার দীর্ঘ অভিজ্ঞতার কথা জানালেন এই বাংলাদেশি সাংবাদিক
Tuesday, July 26, 2016 9:02 am
A- A A+ Print

উত্তরের ৪ জেলায় প্রায় ১০ লাখ মানুষ পানিবন্দী, খাবার ও বিশুদ্ধ পানির তীব্র সংকট

9

অতি বৃষ্টি ও প্রবল পাহাড়ি ঢলের কারণে দেশের উত্তর এলাকার ৪ জেলায় বন্যা পরিস্থিতির আরো অবনতি হয়েছে। বন্যার কারণে গাইবান্ধা, কুড়িগ্রাম, নীলফামারী ও জামালপুরে দুর্ভোগে পড়েছে বানভাসী প্রায় ১০ লাখ মানুষ। শীর্ষ নিউজের জেলা প্রতিনিধিদের পাঠানো খবর সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে। গাইবান্ধা: থেমে থেমে বৃষ্টি ও উজানের ঢলে পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় গত ২৪ ঘণ্টায় ব্রহ্মপুত্রের পানি ২২ সেন্টিমিটার বেড়ে বিপদসীমার ১৩ সেন্টিমিটার ও ঘাঘট নদীর পানি বেড়ে বিপদসীমার ১৫ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এছাড়া তিস্তা ও করতোয়া নদীর পানি বিপদসীমা ছুঁই ছুঁই করছে। এদিকে, জেলার নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় নতুন করে কামারজানি, মোল্লারচর, এ্যারেন্ডাবাড়ি, গজারিয়া, উড়িয়া, কাতলামারী, ভরতখালী, হলদিয়া, খলাইহারা, ফুলছড়ি, খঞ্চাবাড়িসহ বেশ কয়েকটি এলাকা প্লাবিত হয়েছে। ফলে জেলা সদর, সুন্দরগঞ্জ, ফুলছড়ি ও সাঘাটা উপজেলার প্রায় ২ লাখ ৫০ হাজার মানুষ পানিবন্দী হয়ে চরম দুর্ভোগসহ মানবেতর জীবন যাপন করছে। বাঁধে আশ্রিতরা চোর ডাকাতের ভয়ে কয়েকটি পরিবার খোলা আকাশের নিচে গবাধিপশু নিয়ে রাত দিন পাহারা দিচ্ছেন। এছাড়া বন্যা কবলিত এসব এলাকায় দেখা দিয়েছে খাদ্য ও বিশুদ্ধ পানির তীব্র সংকট। চলাচলের রাস্তা-ঘাট তলিয়ে যাওয়ায় বন্ধ হয়েছে যোগাযোগ ব্যবস্থা। বন্ধ হয়েছে অন্তত ৩০টি প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষা কার্যক্রম। এদিকে, পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় ও স্রোতের তীব্রতা বেড়ে যাওয়ায় ব্রহ্মপুত্র নদের বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের কমপক্ষে ১০টি পয়েন্টে হুমকির মুখে পড়েছে। এসব পয়েন্টের বাঁধ ভেঙে গেলে নতুন করে আরও শতশত বসতবাড়ি ও আদি জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যাবে বলে আশঙ্কা করছেন এলাকাবাসী। গাইবান্ধা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী প্রকাশ কুমার সরকার জানান, গত ২৪ ঘণ্টা পানি বৃদ্ধি পেয়ে ব্রহ্মপুত্র ও ঘাঘট নদীর পানি বিপদসীমা অতিক্রম করেছে। এছাড়া তিস্তা ও করতোয়া নদীর পানি বিপদসীমা ছুঁই ছুঁই করছে। এভাবে পানি বৃদ্ধির গতি অব্যাহত থাকলে পরবর্তী ১২ ঘণ্টার মধ্যে এসব নদীর পানিও বিপদসীমা অতিক্রম করবে। কুড়িগ্রাম: ব্রহ্মপুত্র, ধরলা, তিস্তা, দুধকুমার, ফুলকুমারসহ সবগুলো নদ-নদীর পানি হু হু করে বাড়তে থাকায় জেলার সার্বিক বন্যা পরিস্থিতির মারাত্মক অবনতি হয়েছে। দুর্ভোগে পড়েছে বানভাসী প্রায় ৩ লক্ষাধিক মানুষ। ধরলার পানি সেতু পয়েন্টে বিপদসীমার ৯৫ সেন্টিমিটার ও ব্রহ্মপুত্রে পানি চিলমারী পয়েন্টে বিপদসীমার ৬৯ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। নতুন করে প্লাবিত হচ্ছে উঁচু এলাকাগুলো। পানির প্রবল স্রোতে সদরের যাত্রাপুর বাজার রক্ষা বাঁধের ১শ মিটার ধসে যাওয়ায় ১৫টি বাড়ি ও ১০টি দোকান ঘর নদীতে ভেসে গেছে। যাত্রাপুর বাজার রক্ষা বাঁধের অবশিষ্ট অংশ রক্ষায় দ্রুত সরকারের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন যাত্রাপুর ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান আব্দুল গফুরসহ এলাকাবাসী। সোমবার দুপুরে উলিপুর উপজেলার নাগরাকুড়া এলাকার তীর রক্ষা বাঁধ ভেঙে নতুন করে ১০টি গ্রাম প্লাবিত হয়ে পড়েছে। এদিকে সদর উপজেলার ভোগডাঙ্গা ইউনিয়নের কুমারপুর এলাকায় কুড়িগ্রাম-ভুরুঙ্গামারী মহাসড়কে পানি ওঠায় ফুলবাড়ি, নাগেশ্বরী ও ভুরুঙ্গামারী উপজেলার সাথে সারাদেশের যোগাযোগ ব্যবস্থা বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে। হুমকির মুখে পড়েছে চিলমারী শহর রক্ষা বাঁধ। গত ৮ দিনে নদ-নদীর অব্যাহত পানি বৃদ্ধির ফলে জেলা প্রশাসনের তথ্যমতে- জেলার কুড়িগ্রাম সদর, চিলমারী, নাগেশ্বরী, রৌমারী, রাজিবপুর, ফুলবাড়ীসহ ৯ উপজেলায় পানিবন্দী হয়ে পড়েছে ৫৭ ইউনিয়নের প্রায় ৩ লক্ষাধিক মানুষ। ঘরে খাবার না থাকায় খাদ্য সংকটে পড়েছে বানভাসী মানুষেরা। বিশুদ্ধ পানি ও গবাদি পশুর খাদ্য সংকটে দুর্ভোগ বেড়েছে বন্যার্তদের। সরকাবিভাবে ত্রাণ তৎপরতা শুরু হলেও তা জুটছে না অনেকের ভাগ্যে। বন্যা কবলিত এলাকায় কাঁচা-পাকা সড়ক তলিয়ে থাকায় বিছিন্ন হয়ে পড়েছে যোগাযোগ ব্যবস্থা। সদর উপজেলার যাত্রাপুর ইউনিয়নের কালির আলগা চরের বাসিন্দা আবু তাহের জানান, টানা বন্যায় ঘরে খাবার না থাকায় বউ-বাচ্চা নিয়ে কোনরকমে একবেলা খেয়ে দিন পার করছি। গবাদি পশুসহ বাড়ি-ভিটা ছেড়ে আশ্রয় নিতে উঁচু জায়গা খুঁজছি। কুড়িগ্রামের ভারপ্রাপ্ত জেলা প্রশাসক আকতার হোসেন আজাদ জানান, ৮ লাখ ৭৫ হাজার টাকা ও ১শ ৯২ মেট্রিকটন চাল বিতরণ করা হয়েছে। এক হাজার প্যাকেট শুকনো খাবার বরাদ্দ পাওয়া গেছে যা বিতরণের কাজ চলছে। নতুন করে ৫শ মেট্রিকটন চাল ও ১০ লাখ টাকা বরাদ্দ চাওয়া হয়েছে। জেলা প্রশাসন থেকে ত্রাণ তৎপরতা অব্যাহত থাকলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম। দুর্গম চরাঞ্চলের বেশিরভাগ মানুষ ত্রাণ সহায়তা না পাওয়ার অভিযোগ করেন। কুড়িগ্রামের পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মাহফুজুর রহমান জানান, গত ২৪ ঘণ্টায় ধরলা নদীর পানি সেতু পয়েন্টে ২৫ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পেয়ে বিপদসীমার ৯৫ সেন্টিমিটার ও ব্রহ্মপুত্রের পানি চিলমারী পয়েন্টে ৮ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পেয়ে ৬৯ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। বৃদ্ধি পেয়েছে তিস্তা ও দুধকুমারের পানিও। জামালপুর: বন্যায় জামালপুরে ৮০টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাঠদান বন্ধ ঘোষণা। একইসঙ্গে ১৮টি মাধ্যমিক স্কুল ও মাদরাসা পর্যায়ের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ভিতর বন্যার পানি প্রবেশ করেছে। জামালপুরে জেলা শিক্ষা অফিসের সহকারী বিদ্যালয় পরিদর্শক মো. সফিকুল আলম বন্যার কারণে স্কুল বন্ধের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। এদিকে শুক্রবার (২২ জুলাই) বিকেল সাড়ে চারটা পর্যন্ত যমুনা নদীর পানি বাহাদুরাবাদঘাট পয়েন্টে বিপদসীমার ৬৭ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। এ পর্যন্ত জেলার চার উপজেলার ২০টি ইউনিয়ন বন্যা কবলিত হওয়ায় প্রায় সোয়া লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দী অবস্থায় দিন কাটাচ্ছেন। জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা আবুল মঞ্জুর মো. আব্দুল হাই জানান, গত দু’দিনে বন্যার্তদের মাঝে খাদ্য ও বিভিন্ন প্রয়োজনীয় সামগ্রীর ৬শ’টি প্যাকেট বিতরণ করা হয়েছে। এছাড়াও ইসলামপুর উপজেলার বন্যার্তদের মাঝে বিতরণের জন্য ৩৫ মেট্রিকটন চাল ও নগদ ৫০ হাজার টাকা এবং দেওয়ানগঞ্জ উপজেলার বন্যার্তদের মাঝে বিতরণের জন্য ২২ মেট্রিকটন চাল ও নগদ ৫০ হাজার টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের প্রশিক্ষণ কর্মকর্তা মো. আবু হানিফ জানান, চলতি বন্যায় ইসলামপুর উপজেলায় ২৫ হেক্টর রোপা আমন বীজতলা, ১০ হেক্টর আউশ, ৫০ হেক্টর সবজি এবং দেওয়ানগঞ্জ উপজেলায় ৭০ হেক্টর রোপা আমন বীজতলা, ১৫০ হেক্টর আউশ, ৫০ হেক্টর সবজি ও ১০ হেক্টর কলাগাছ পানিতে নিমজ্জিত হয়েছে। জেলা স্বাস্থ্য দপ্তরের ডেপুটি সিভিল সার্জন ডা. শাহীন সুলতানা জানান, বন্যাদুর্গত প্রতিটি ইউনিয়নে একটি করে মেডিকেল টিম কাজ করছে। নীলফামারী: উজানের ঢল ও ভারি বৃষ্টিপাতের কারণে তিস্তা নদীর পানি আবারো বিপদসীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। রোববার সকাল ৬টায় তিস্তা নদীর পানি ডালিয়া পয়েন্টে বিপদসীমার ১৭ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হলেও রাতে তা বেড়ে বিপদসীমার ২৭ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। অপরদিকে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর মাঝে শুকনো খাবার ও বিশুদ্ধ পানির চরম সংকট দেখা দিয়েছে। বাঁধে ঠাঁই নেওয়া পরিবার গুলো দুর্বিসহ জীবনযাপন করছে। তারা চাতক পাখির মতো ত্রাণের আশায় রাস্তার পানে চেয়ে আছে। কখন কে নিয়ে আসবে ত্রাণের গাড়ি। তিস্তার পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হয়ে পানিবন্দী হয়ে পড়েছে প্রায় ৩০ হাজার মানুষ। সরকারিভাবে বনার্তদের মাঝে ৩০ মেট্রিকটন চাল ও নগদ ১ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, যা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। ঝুনাগাছ চাপানী ইউনিয়নের নবনির্বাচিত চেয়ারম্যান আমিনুর রহমান ৫০টি পরিবারের মাঝে ১০ কেজি চাল, ১ কেজি ডাল, ১ কেজি আলু বিতরণ করেন। এছাড়াও শনিবার ৩৭৬টি পরিবারের মাঝে শুকনো খাবারও বিতরণ করেন। ঝুনাগাছ চাপানি ইউপি চেয়ারম্যান আমিনুর রহমান বলেন, ছাতুনামা ও ভেন্ডাবাড়ী গ্রামে ৬শ পরিবারের বসতভিটা হাঁটু থেকে কোমর পানিতে তলিয়ে রয়েছে। ডিমলা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রেজাউল করিম জানায়, উপজেলার তিস্তা নদীর সংলগ্ন ৭টি ইউনিয়নের চেয়ারম্যানদের সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে। বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর সার্বিক খোঁজ খবর জানার জন্য তথ্য কেন্দ্র চালু করা হয়েছে। তিস্তার পানি বৃদ্ধির ফলে চরাঞ্চলের নতুন পুরান মিলে প্রায় ৩০ হাজার মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েছে। সেই সাথে টানা বর্ষণ অব্যাহত থাকায় তিস্তার উথালপাথাল ঢেউ আর শোঁ শোঁ শব্দ তিস্তাপাড়কে কাঁপিয়ে তুলছে। শনিবার রাতে নীলফামারীর ডিমলা উপজেলা ও লালমনিরহাটের হাতিবান্ধা ও কালিগঞ্জ উপজেলার তিস্তার চর ও চর গ্রামে বসবাসরত মানুষজনকে নিরাপদে সরে নেয় জনপ্রতিনিধিরা। ডালিয়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মোস্তাফিজার রহমান জানান, উজানের ভারি বৃষ্টিপাত ও গজলডোবার জলকপাট খুলে দেওয়ায় তিস্তার প্রবাহ দুর্বার গতিতে বাংলাদেশে ধেয়ে আসে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ডালিয়া পয়েন্টে তিস্তা ব্যারাজের সবক’টি (৪৪টি) জলকপাট খুলে রাখা হয়েছে। কি পরিমাণ উজানের ঢল আসছে তা মনিটরিং করা হচ্ছে। সেই সঙ্গে তিস্তা ব্যারাজ ও ফ্লাড ফিউজ এলাকায় নজরদারি জোরদার এবং মানুষজনকে নিরাপদে চলে যাওয়ার জন্য মাইকিং করে প্রচারণা চালানো হচ্ছে।

Comments

Comments!

 উত্তরের ৪ জেলায় প্রায় ১০ লাখ মানুষ পানিবন্দী, খাবার ও বিশুদ্ধ পানির তীব্র সংকটAmarbangladeshonlineAmarbangladeshonline | Amarbangladeshonline

উত্তরের ৪ জেলায় প্রায় ১০ লাখ মানুষ পানিবন্দী, খাবার ও বিশুদ্ধ পানির তীব্র সংকট

Tuesday, July 26, 2016 9:02 am
9

অতি বৃষ্টি ও প্রবল পাহাড়ি ঢলের কারণে দেশের উত্তর এলাকার ৪ জেলায় বন্যা পরিস্থিতির আরো অবনতি হয়েছে। বন্যার কারণে গাইবান্ধা, কুড়িগ্রাম, নীলফামারী ও জামালপুরে দুর্ভোগে পড়েছে বানভাসী প্রায় ১০ লাখ মানুষ।

শীর্ষ নিউজের জেলা প্রতিনিধিদের পাঠানো খবর সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।

গাইবান্ধা: থেমে থেমে বৃষ্টি ও উজানের ঢলে পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় গত ২৪ ঘণ্টায় ব্রহ্মপুত্রের পানি ২২ সেন্টিমিটার বেড়ে বিপদসীমার ১৩ সেন্টিমিটার ও ঘাঘট নদীর পানি বেড়ে বিপদসীমার ১৫ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এছাড়া তিস্তা ও করতোয়া নদীর পানি বিপদসীমা ছুঁই ছুঁই করছে।

এদিকে, জেলার নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় নতুন করে কামারজানি, মোল্লারচর, এ্যারেন্ডাবাড়ি, গজারিয়া, উড়িয়া, কাতলামারী, ভরতখালী, হলদিয়া, খলাইহারা, ফুলছড়ি, খঞ্চাবাড়িসহ বেশ কয়েকটি এলাকা প্লাবিত হয়েছে। ফলে জেলা সদর, সুন্দরগঞ্জ, ফুলছড়ি ও সাঘাটা উপজেলার প্রায় ২ লাখ ৫০ হাজার মানুষ পানিবন্দী হয়ে চরম দুর্ভোগসহ মানবেতর জীবন যাপন করছে। বাঁধে আশ্রিতরা চোর ডাকাতের ভয়ে কয়েকটি পরিবার খোলা আকাশের নিচে গবাধিপশু নিয়ে রাত দিন পাহারা দিচ্ছেন।

এছাড়া বন্যা কবলিত এসব এলাকায় দেখা দিয়েছে খাদ্য ও বিশুদ্ধ পানির তীব্র সংকট। চলাচলের রাস্তা-ঘাট তলিয়ে যাওয়ায় বন্ধ হয়েছে যোগাযোগ ব্যবস্থা। বন্ধ হয়েছে অন্তত ৩০টি প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষা কার্যক্রম।

এদিকে, পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় ও স্রোতের তীব্রতা বেড়ে যাওয়ায় ব্রহ্মপুত্র নদের বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের কমপক্ষে ১০টি পয়েন্টে হুমকির মুখে পড়েছে। এসব পয়েন্টের বাঁধ ভেঙে গেলে নতুন করে আরও শতশত বসতবাড়ি ও আদি জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যাবে বলে আশঙ্কা করছেন এলাকাবাসী।

গাইবান্ধা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী প্রকাশ কুমার সরকার জানান, গত ২৪ ঘণ্টা পানি বৃদ্ধি পেয়ে ব্রহ্মপুত্র ও ঘাঘট নদীর পানি বিপদসীমা অতিক্রম করেছে। এছাড়া তিস্তা ও করতোয়া নদীর পানি বিপদসীমা ছুঁই ছুঁই করছে। এভাবে পানি বৃদ্ধির গতি অব্যাহত থাকলে পরবর্তী ১২ ঘণ্টার মধ্যে এসব নদীর পানিও বিপদসীমা অতিক্রম করবে।

কুড়িগ্রাম: ব্রহ্মপুত্র, ধরলা, তিস্তা, দুধকুমার, ফুলকুমারসহ সবগুলো নদ-নদীর পানি হু হু করে বাড়তে থাকায় জেলার সার্বিক বন্যা পরিস্থিতির মারাত্মক অবনতি হয়েছে। দুর্ভোগে পড়েছে বানভাসী প্রায় ৩ লক্ষাধিক মানুষ।

ধরলার পানি সেতু পয়েন্টে বিপদসীমার ৯৫ সেন্টিমিটার ও ব্রহ্মপুত্রে পানি চিলমারী পয়েন্টে বিপদসীমার ৬৯ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। নতুন করে প্লাবিত হচ্ছে উঁচু এলাকাগুলো। পানির প্রবল স্রোতে সদরের যাত্রাপুর বাজার রক্ষা বাঁধের ১শ মিটার ধসে যাওয়ায় ১৫টি বাড়ি ও ১০টি দোকান ঘর নদীতে ভেসে গেছে। যাত্রাপুর বাজার রক্ষা বাঁধের অবশিষ্ট অংশ রক্ষায় দ্রুত সরকারের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন যাত্রাপুর ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান আব্দুল গফুরসহ এলাকাবাসী।

সোমবার দুপুরে উলিপুর উপজেলার নাগরাকুড়া এলাকার তীর রক্ষা বাঁধ ভেঙে নতুন করে ১০টি গ্রাম প্লাবিত হয়ে পড়েছে।

এদিকে সদর উপজেলার ভোগডাঙ্গা ইউনিয়নের কুমারপুর এলাকায় কুড়িগ্রাম-ভুরুঙ্গামারী মহাসড়কে পানি ওঠায় ফুলবাড়ি, নাগেশ্বরী ও ভুরুঙ্গামারী উপজেলার সাথে সারাদেশের যোগাযোগ ব্যবস্থা বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে। হুমকির মুখে পড়েছে চিলমারী শহর রক্ষা বাঁধ।

গত ৮ দিনে নদ-নদীর অব্যাহত পানি বৃদ্ধির ফলে জেলা প্রশাসনের তথ্যমতে- জেলার কুড়িগ্রাম সদর, চিলমারী, নাগেশ্বরী, রৌমারী, রাজিবপুর, ফুলবাড়ীসহ ৯ উপজেলায় পানিবন্দী হয়ে পড়েছে ৫৭ ইউনিয়নের প্রায় ৩ লক্ষাধিক মানুষ। ঘরে খাবার না থাকায় খাদ্য সংকটে পড়েছে বানভাসী মানুষেরা। বিশুদ্ধ পানি ও গবাদি পশুর খাদ্য সংকটে দুর্ভোগ বেড়েছে বন্যার্তদের। সরকাবিভাবে ত্রাণ তৎপরতা শুরু হলেও তা জুটছে না অনেকের ভাগ্যে। বন্যা কবলিত এলাকায় কাঁচা-পাকা সড়ক তলিয়ে থাকায় বিছিন্ন হয়ে পড়েছে যোগাযোগ ব্যবস্থা।

সদর উপজেলার যাত্রাপুর ইউনিয়নের কালির আলগা চরের বাসিন্দা আবু তাহের জানান, টানা বন্যায় ঘরে খাবার না থাকায় বউ-বাচ্চা নিয়ে কোনরকমে একবেলা খেয়ে দিন পার করছি। গবাদি পশুসহ বাড়ি-ভিটা ছেড়ে আশ্রয় নিতে উঁচু জায়গা খুঁজছি।

কুড়িগ্রামের ভারপ্রাপ্ত জেলা প্রশাসক আকতার হোসেন আজাদ জানান, ৮ লাখ ৭৫ হাজার টাকা ও ১শ ৯২ মেট্রিকটন চাল বিতরণ করা হয়েছে। এক হাজার প্যাকেট শুকনো খাবার বরাদ্দ পাওয়া গেছে যা বিতরণের কাজ চলছে। নতুন করে ৫শ মেট্রিকটন চাল ও ১০ লাখ টাকা বরাদ্দ চাওয়া হয়েছে।

জেলা প্রশাসন থেকে ত্রাণ তৎপরতা অব্যাহত থাকলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম। দুর্গম চরাঞ্চলের বেশিরভাগ মানুষ ত্রাণ সহায়তা না পাওয়ার অভিযোগ করেন।

কুড়িগ্রামের পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মাহফুজুর রহমান জানান, গত ২৪ ঘণ্টায় ধরলা নদীর পানি সেতু পয়েন্টে ২৫ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পেয়ে বিপদসীমার ৯৫ সেন্টিমিটার ও ব্রহ্মপুত্রের পানি চিলমারী পয়েন্টে ৮ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পেয়ে ৬৯ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। বৃদ্ধি পেয়েছে তিস্তা ও দুধকুমারের পানিও।

জামালপুর: বন্যায় জামালপুরে ৮০টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাঠদান বন্ধ ঘোষণা। একইসঙ্গে ১৮টি মাধ্যমিক স্কুল ও মাদরাসা পর্যায়ের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ভিতর বন্যার পানি প্রবেশ করেছে।

জামালপুরে জেলা শিক্ষা অফিসের সহকারী বিদ্যালয় পরিদর্শক মো. সফিকুল আলম বন্যার কারণে স্কুল বন্ধের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

এদিকে শুক্রবার (২২ জুলাই) বিকেল সাড়ে চারটা পর্যন্ত যমুনা নদীর পানি বাহাদুরাবাদঘাট পয়েন্টে বিপদসীমার ৬৭ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। এ পর্যন্ত জেলার চার উপজেলার ২০টি ইউনিয়ন বন্যা কবলিত হওয়ায় প্রায় সোয়া লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দী অবস্থায় দিন কাটাচ্ছেন।

জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা আবুল মঞ্জুর মো. আব্দুল হাই জানান, গত দু’দিনে বন্যার্তদের মাঝে খাদ্য ও বিভিন্ন প্রয়োজনীয় সামগ্রীর ৬শ’টি প্যাকেট বিতরণ করা হয়েছে। এছাড়াও ইসলামপুর উপজেলার বন্যার্তদের মাঝে বিতরণের জন্য ৩৫ মেট্রিকটন চাল ও নগদ ৫০ হাজার টাকা এবং দেওয়ানগঞ্জ উপজেলার বন্যার্তদের মাঝে বিতরণের জন্য ২২ মেট্রিকটন চাল ও নগদ ৫০ হাজার টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের প্রশিক্ষণ কর্মকর্তা মো. আবু হানিফ জানান, চলতি বন্যায় ইসলামপুর উপজেলায় ২৫ হেক্টর রোপা আমন বীজতলা, ১০ হেক্টর আউশ, ৫০ হেক্টর সবজি এবং দেওয়ানগঞ্জ উপজেলায় ৭০ হেক্টর রোপা আমন বীজতলা, ১৫০ হেক্টর আউশ, ৫০ হেক্টর সবজি ও ১০ হেক্টর কলাগাছ পানিতে নিমজ্জিত হয়েছে।

জেলা স্বাস্থ্য দপ্তরের ডেপুটি সিভিল সার্জন ডা. শাহীন সুলতানা জানান, বন্যাদুর্গত প্রতিটি ইউনিয়নে একটি করে মেডিকেল টিম কাজ করছে।

নীলফামারী: উজানের ঢল ও ভারি বৃষ্টিপাতের কারণে তিস্তা নদীর পানি আবারো বিপদসীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। রোববার সকাল ৬টায় তিস্তা নদীর পানি ডালিয়া পয়েন্টে বিপদসীমার ১৭ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হলেও রাতে তা বেড়ে বিপদসীমার ২৭ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল।

অপরদিকে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর মাঝে শুকনো খাবার ও বিশুদ্ধ পানির চরম সংকট দেখা দিয়েছে। বাঁধে ঠাঁই নেওয়া পরিবার গুলো দুর্বিসহ জীবনযাপন করছে। তারা চাতক পাখির মতো ত্রাণের আশায় রাস্তার পানে চেয়ে আছে। কখন কে নিয়ে আসবে ত্রাণের গাড়ি।

তিস্তার পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হয়ে পানিবন্দী হয়ে পড়েছে প্রায় ৩০ হাজার মানুষ। সরকারিভাবে বনার্তদের মাঝে ৩০ মেট্রিকটন চাল ও নগদ ১ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, যা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল।

ঝুনাগাছ চাপানী ইউনিয়নের নবনির্বাচিত চেয়ারম্যান আমিনুর রহমান ৫০টি পরিবারের মাঝে ১০ কেজি চাল, ১ কেজি ডাল, ১ কেজি আলু বিতরণ করেন। এছাড়াও শনিবার ৩৭৬টি পরিবারের মাঝে শুকনো খাবারও বিতরণ করেন।

ঝুনাগাছ চাপানি ইউপি চেয়ারম্যান আমিনুর রহমান বলেন, ছাতুনামা ও ভেন্ডাবাড়ী গ্রামে ৬শ পরিবারের বসতভিটা হাঁটু থেকে কোমর পানিতে তলিয়ে রয়েছে।

ডিমলা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রেজাউল করিম জানায়, উপজেলার তিস্তা নদীর সংলগ্ন ৭টি ইউনিয়নের চেয়ারম্যানদের সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে। বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর সার্বিক খোঁজ খবর জানার জন্য তথ্য কেন্দ্র চালু করা হয়েছে।

তিস্তার পানি বৃদ্ধির ফলে চরাঞ্চলের নতুন পুরান মিলে প্রায় ৩০ হাজার মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েছে। সেই সাথে টানা বর্ষণ অব্যাহত থাকায় তিস্তার উথালপাথাল ঢেউ আর শোঁ শোঁ শব্দ তিস্তাপাড়কে কাঁপিয়ে তুলছে। শনিবার রাতে নীলফামারীর ডিমলা উপজেলা ও লালমনিরহাটের হাতিবান্ধা ও কালিগঞ্জ উপজেলার তিস্তার চর ও চর গ্রামে বসবাসরত মানুষজনকে নিরাপদে সরে নেয় জনপ্রতিনিধিরা।

ডালিয়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মোস্তাফিজার রহমান জানান, উজানের ভারি বৃষ্টিপাত ও গজলডোবার জলকপাট খুলে দেওয়ায় তিস্তার প্রবাহ দুর্বার গতিতে বাংলাদেশে ধেয়ে আসে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ডালিয়া পয়েন্টে তিস্তা ব্যারাজের সবক’টি (৪৪টি) জলকপাট খুলে রাখা হয়েছে। কি পরিমাণ উজানের ঢল আসছে তা মনিটরিং করা হচ্ছে। সেই সঙ্গে তিস্তা ব্যারাজ ও ফ্লাড ফিউজ এলাকায় নজরদারি জোরদার এবং মানুষজনকে নিরাপদে চলে যাওয়ার জন্য মাইকিং করে প্রচারণা চালানো হচ্ছে।

Comments

comments

সম্পাদক : মোহাম্মদ আবদুল বাছির
প্রকাশক: মোহাম্মদ জহিরুল ইসলাম
ফোন : ‎০১৭১৩৪০৯০৯০
৩৪৫/১, দিলু রোড, নিউ ইস্কাটন, ঢাকা-১০০০
X
 
নিয়মিত খবর পড়তে আমাদের ফেসবুক পেজে লাইক দিয়ে যুক্ত থাকুন
X