সোমবার, ১৯শে ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ ইং, ৭ই ফাল্গুন, ১৪২৪ বঙ্গাব্দ, রাত ৯:৫৫
শিরোনাম
  • ঘৃণাকে বিজয়ী হতে দেয়া যাবে না, ট্রাম্পকে ইঙ্গিত করে জর্জ ক্লুনি
  • আমার একটাই চিন্তা দেশের মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন করা: প্রধানমন্ত্রী
  • ‘কেন্দ্রীয় সরকারের আগ্রাসী নীতির কারণে কাশ্মীরকে হারাতে হবে’
  • সাড়ে চারমাস পর মুখোমুখি, খাদিজাকে উদ্দেশ্য করে যা বলল বদরুল
  • খালেদার ‘সাজা’ বিরোধী নেতাকর্মীদের মনোবল ভাঙ্গার কৌশল!
  • বিএনপির কর্মসূচি ‘যথাসময়ে’ জানানো হবে: রিজভী
  • দলের জন্য বোলিং করতেও রাজি মুশফিক
  • শিশু জিহাদের মৃত্যু: চার জনের ১০ বছর করে কারাদণ্ড
  • অবশেষে বাড়ি অবরুদ্ধ করে রাখা সেই দেয়াল ভেঙ্গে ফেলা হচ্ছে
  • সাক্ষ্য দিলেন খাদিজা, চাইলেন বদরুলের সর্বোচ্চ শাস্তি
  • বদরুলের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিতে আদালতে খাদিজা
  • আজ বগুড়ায় যেসব প্রকল্প উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী
  • রোহিঙ্গা স্থানান্তরের সরকারি পরিকল্পনার সঙ্গে দ্বিমত মানবাধিকার কমিশনের
  • মহেশখালীতে ইয়াবা ব্যবসায়ীদের সঙ্গে পুলিশের ‘বন্দুকযুদ্ধ’
  • হোয়াইট হাউসে কাজ করার দীর্ঘ অভিজ্ঞতার কথা জানালেন এই বাংলাদেশি সাংবাদিক
Wednesday, May 10, 2017 2:43 pm
A- A A+ Print

গুজরাটে মুসলিম পরিবারের ১৪জনকে হত্যা ও গণধর্ষণ : প্রতিশোধে আগ্রহী নই, শুধু চাই তারা যেন বুঝতে পারে কী খারাপ কাজ করেছে—–বিলকিস বানু

174430_1

গান্ধীনগর: ২০০২ সালে ভারতের পশ্চিমাঞ্চলীয় প্রদেশ গুজরাটে মুসলিম বিরোধী দাঙ্গার সময় উগ্র হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকেরা বিলকিস বানুকে গণধর্ষণ করে ও তার পরিবারের ১৪ জন সদস্যকে হত্যা করা হয়। বিচারের জন্য তার ১৫ বছরের যুদ্ধ অবশেষে তাকে সাফল্য এনে দিয়েছে। গণধর্ষণ ও হত্যায় জড়িত থাকার বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার পর গত সপ্তাহে বোম্বাই হাই কোর্টে ১১ জনকে মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দিয়েছে। এছাড়াও, প্রমাণ নষ্ট করে ফেলার জন্য আদালত পাঁচ পুলিশ এবং দুইজন ডাক্তারকে অভিযুক্ত হয়েছে। এর আগে বিচারিক আদালতে তাদেরকে খালাস দেয়া হয়েছিল। রবিবার দিল্লিতে বিবিসিকে বিলকিস বানু জানান, অবশেষে তাকে শান্তির আশা দেয়া হয়েছে। তিনি বলেন, ‘বিচার বিভাগের ওপর সবসময় আমার পূর্ণ আস্থা ছিল এবং এই আদেশের জন্য আমি বোম্বে হাইকোর্টের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি। এই রায়ে ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। আমি এই রায়ে অত্যান্ত খুশি হয়েছি।’ তিনি আরো বলেন, ‘রাজ্য সরকার এবং পুলিশও এই অপরাধের সঙ্গে যুক্ত বলে আমি মনে করি। কারণ তারা অভিযুক্তদেরকে ধর্ষণ ও লুটপাটের পূর্ণ স্বাধীনতা দিয়েছিল।’ বিলকিস বানু বলেন, ‘আদালত পুলিশ ও ডাক্তারদেরকেও দোষী সাব্যস্ত করেছে। মনে হচ্ছে আমি ন্যায়বিচার পেয়েছি।’ ন্যায়বিচারের জন্য বিলকিস বানো দীর্ঘ সংগ্রাম করতে হয়েছে। তিনি বলছেন, এই সংগ্রাম চালিয়ে যাওয়ার কোন বিকল্প ছিল না। এটা ভালভাবে নথিভুক্ত করা হয়েছে যে, কিছু পুলিশ ও রাজ্য কর্মকর্তারা তাকে ভয় দেখানোর চেষ্টা করেছিলেন, প্রমাণ ধ্বংস করা হয়েছিল এবং মৃতদেহগুলো কোনো রকম ময়নাতদন্ত ছাড়াই সমাহিত করা হয়েছিল। যে ডাক্তাররা তাকে পরীক্ষা করেছিল, তাদের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল যে, তাকে ধর্ষণ করা হয়নি এবং তাকে বিভিন্ন মাধ্যম থেকে হত্যার হুমকি দেয়া হয়েছে। এসব প্রতিকূলতা সত্ত্বেও তিনি আক্রমণকারীদেরকে চিহ্নিত করতে সক্ষম হন। ২০১৪ সালে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট মামলাটি কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থার ফেডারেল তদন্তকারীদের কাছে হস্তান্তর করার পর প্রথমবারের মতো অভিযুক্তদের গ্রেপ্তার করা হয়। গুজরাটের আদালত তাকে ন্যায়বিচার প্রদান করতে পারেনি বলে সুপ্রিম কোর্টে আবেদন করলে সুপ্রিম কোর্ট তার এই আবেদন মঞ্জুর করে এবং তার মামলা মুম্বাইয়ের একটি আদালতে স্থানান্তর করা হয়। এই দীর্ঘ যুদ্ধে তার পরিবারকে ব্যাপকভাবে দুর্ভোগ সহ্য করতে হয়েছে। গত ১৫ বছরে তিনি ও তার স্বামী ইয়াকুব রসুলকে ১০ বার বাড়ি থেকে বের করে দেয়া হয়েছে। তাদের পাঁচ সন্তানকে সঙ্গে নিয়ে গুজরাটের পথে পথে ঘুরতে হয়েছে। রসুল বলেন, ‘হুমকির কারণে আমরা এখনো নিজেদের ঘরে যেতে পারছি না। পুলিশ এবং রাজ্য প্রশাসন সবসময়ই আমাদের আক্রমণকারীদের সাহায্য করেছে। আমরা যখন গুজরাটে ছিলাম তখনো আমরা আমাদের মুখ ঢেকে রেখেছি, ভয়ে আমরা কখনো আমাদের ঠিকানা প্রকাশ করতাম না।’ দাঙ্গা চলাকালে বিলকিস বানো ও তার পরিবারের উপর এই হামলা ছিল সবচেয়ে ভয়াবহ অপরাধ। গুজরাটের গোধরা শহরে যাত্রীবাহী একটি ট্রেনে অগ্নিকাণ্ডে ৬০ জন হিন্দু তীর্থযাত্রী নিহত হলে এই দাঙ্গা শুরু হয়। উগ্র হিন্দুরা এই অগ্নিকাণ্ডের জন্য মুসলমানদের দোষারোপ করলে হিন্দু জনগোষ্ঠী বিক্ষোভ শুরু করে। তারা আশেপাশের মুসলিম এলাকায় নগ্ন হামলা চালায় এবং তাদের সম্পত্তি ধ্বংস করে। তিন দিনের জন্য দাঙ্গাবাজদের পূর্ণ স্বাধীনতা দিয়েছিল রাজ্য প্রশাসন ও পুলিশ। এ ঘটনায় ১,০০০ জনেরও বেশি মানুষ মারা যায়। তাদের অধিকাংশই ছিল মুসলমান। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ওই সময় গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন। এই দাঙ্গা থামাতে যথেষ্ট প্রদক্ষেপ না নেয়ার জন্য তিনি বেশ সমালোচিত হয়েছিলেন। এই অন্যায়ের সঙ্গে তিনি জড়িত নন বলে সর্বদা দাবি করে আসছেন এবং দাঙ্গার জন্য তিনি কখনো ক্ষমা প্রার্থনাও করেননি। অপর্যাপ্ত প্রমাণের উদ্ধৃতি দিয়ে ২০১৩ সালে সুপ্রিম কোর্টের একটি প্যানেল তার বিচার করতে অস্বীকৃতি জানায়। যাইহোক কয়েক বছর ধরে চলা এই মামলায় আদালত দাঙ্গায় জড়িত থাকার জন্য কয়েক ডজন লোককে দোষী সাব্যস্ত করেছে। ২০১২ একজন সাবেক মন্ত্রী ও মোদির অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ সহযোগীর ২৮ বছরের কারাদণ্ড দেয় আদালত। তবে, এখনো অনেক মানুষ ন্যায়বিচারের জন্য অপেক্ষার প্রহর গুনছে। পনেরো বছর পর বিলকিস বানোর চোখে এখনো অশ্রু ঝরছে কারণ তিনি সেই দিনের ভয়ঙ্কর স্মৃতি তাকে এখনো তাড়িয়ে বেড়ায়। দাঙ্গার সময় তিনি তার বাবার বাড়িতে ছিলেন। গোধরা শহরের অদূরে রন্ধুপুর গ্রামে তার বাবা-মা বসবাস করেন। ওই সময় তার বয়স ছিল মাত্রই ১৯ বছর এবং তিন বছর বয়সী কন্যা শিশুর মা এবং তার দ্বিতীয় সন্তান তখন তার গর্ভে ছিল। তিনি বলেন, ‘এটা ছিল ট্রেনে আগুন লাগার পরের দিন সকাল। আমি রান্নাঘরে সকালের খাবার খাচ্ছিলাম। তখন আমার চাচী ও তার ছেলেমেয়েরা দৌড়ে আমাদের বাড়িতে আসে। তারা এসে জানায়, তাদের বাড়ি আগুনে পুড়িয়ে দেয়া হচ্ছে এবং আমাদেরকে শিগগিরই এই এলাকা থেকে চলে যেতে হবে।’ ‘আমরা কেবল আমাদের শরীরের পরিহিত পোশাক ছাড়া সব কিছু ফেলে এলাকা ত্যাগ করি। এমনকি আমাদের পায়ে জুতা পরারও সময় ছিল না।’ কয়েক মিনিটের মধ্যে আশেপাশের সমস্ত মুসলিম বাড়িগুলো খালি করা হয়। নিরাপত্তার খুঁজে সেখানে বসবাসকারী ৫০টি পরিবারের সদস্যরা অন্যত্র চলে গেছে।’ বিলকিস বানো ১৭ জনের একটি দলে ছিলেন। তাদের মধ্যে ছিল তার তিন বছর বয়সী মেয়ে, তার মা, তার গর্ভবতী চাচাতো বোন, তার ছোট ছোট ভাইবোন, ভ্রাতুষ্পুত্র এবং ভাগ্নী এবং দুই প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ। ‘আমরা প্রথমে গ্রাম্য পরিষদের প্রধানের কাছে যাই। তিনি ছিলেন একজন হিন্দু। আমরা তার কাছে আশ্রয় প্রার্থণা করি। কিন্তু মুসলমানদেরকে আশ্রয় দেয়ায় বিক্ষোভকারীরা তাকেও মেরে ফেলার হুমকি দিচ্ছিল। তখন আমাদেরকে চলে যেতে বাধ্য করা হয়েছিল।’ পরের কয়েকদিন উগ্র হিন্দু গোষ্ঠী মুসলিমদের খুঁজে গ্রাম থেকে গ্রামে তল্লাশি চালায়। প্রতিবেশিদের প্রতি দয়া দেখানো হিন্দু পরিবারসহ মসজিদে মসজিদে গিয়ে তারা তল্লাশি চালায়। ৩ মার্চ সকালে তারা কাছাকাছি একটি গ্রামকে নিরাপদ মনে দুইটি জীপে করে সেখানে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। রাস্তায় একদল লোক তাদের গাড়ি থামিয়ে দেয়। তিনি বলেন, ‘তারা তলোয়ার এবং লাঠি নিয়ে আমাদেরকে আক্রমণ করে। তাদের মধ্যে একজন আমার কন্যাকে আমার কোল থেকে ছিনিয়ে নিয়ে মাটিতে ছুঁড়ে মারে। তার মাথার উপর একটা পাথর দিয়ে সজোরে আঘাত করে।’   তলোয়ারের আঘাতে বিলকিস বানোর হাত ও পা কেটে যায়। আক্রমণকারীরা ছিল তার গ্রামেরই তার প্রতিবেশি। মুহূর্তের মধ্যেই ১২ জন পুরুষকে তারা হত্যা করে। তারা তার কাপড় টেনে ছিঁড়ে ফেলে এবং তাদের বেশ কয়েকজন মিলে তাকে ধর্ষণ করে। তিনি তাদের কাছে অনুগ্রহ প্রার্থণা করেন এবং তাদের বলেন যে, তিনি পাঁচ মাস গর্ভবতী। কিন্তু তার আবেদন তাদের বধির কানে সেদিন প্রবেশ করেনি। তার চাচাত বোন যিনি মাত্রই দুই দিন আগে একটি মেয়ে শিশুর জন্ম দিয়েছিলেন। তারা তাকেও ধর্ষণের পর হত্যা করে। সঙ্গে তার নবজাতকও মেরে ফেলা হয়। বিলকিস বানো বেঁচে গিয়েছিল কারণ ওই সময় তার চেতনা হারিয়ে ফেলেছিল এবং তার আক্রমণকারীরা তাকে মৃত মনে করে চলে গিয়েছিল। ওই গণহত্যায় দুজন বালকসহ মাত্র চারজন বেঁচে ছিল। চেতনা ফিরে আসলে রক্তাক্ত ক্ষুদ্র একটি পেটিকোট দিয়ে তার শরীরকে ঢেকে কাছাকাছি একটি পাহাড়ের ওপর চলে যান এবং একটি গুহায় এক দিন নিজেকে লুকিয়ে রাখেন। ‘পরের দিন আমি খুব তৃষ্ণার্ত ছিলাম। তাই পানির খুঁজে নিকটবর্তী একটি উপজাতীয় গ্রামে যাই। গ্রামবাসীরা প্রথমে আমাকে সন্দেহ করেছিল এবং তারা লাঠি নিয়ে বেরিয়ে এসেছিল। কিন্তু পরে তারা আমাকে সাহায্য করেছিল। আমার শরীর ঢেকে রাখতে তারা আমাকে একটি ব্লাউজ এবং একটি স্কার্ফ দিয়েছিল।’ তিনি পুলিশের একটি জিপ গাড়ির দেখা পান এবং তারা তাকে পুলিশ স্টেশনে নিয়ে যান। সেখানে তিনি তার ঘটনার বর্ণনা দেন। তিনি বলেন, ‘আমি অশিক্ষিত, তাই পুলিশি কর্মকর্তাদের লিখিত অভিযোগ একবার পড়ে শুনানোর জন্য অনুরোধ করেছিলাম, কিন্তু তারা তা করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিল। তারা কেবল আমার আঙ্গুলের ছাপ নিয়েছিল এবং তারা তাদের নিজেদের মতো করে সেটি লিখেছিল। আমি আমার সব আক্রমণকারীকে চিনি এবং আমি তাদের নামও বলেছিলাম। কিন্তু পুলিশ কোনো নাম লিখেনি।’ পরের দিন তাকে দাঙ্গায় বিচ্ছিন্নদের জন্য নির্মিত গোধরার একটি ক্যাম্পে পাঠিয়ে দেয়া হয়। ১৫ দিন পর সেখানে তিনি তার স্বামী সঙ্গে পুনরায় মিলিত হন এবং পরবর্তী কয়েক মাস তারা সেখানে বসবাস করেন। তার অজাত সন্তান বেঁচে যায় এবং পরে তিনি একটি মেয়ে শিশুর জন্ম দেন। গত ১৫ বছর ‘খুব কঠিন’ সময় পার করেছেন তারা। কিন্তু এই দম্পতি জানিয়েছেন, হাইকোর্টের আদেশে তারা কিছুটা হলেও শান্তনা পাচ্ছেন। বিলকিস বানোর মামলায় তার আক্রমণকারীদের মৃত্যুদণ্ড হবে কিনা তা নিয়ে অনেকেই সন্দিহান ছিলেন। প্রসিকিউটররা তিনজনের মৃত্যুদণ্ডের দাবি জানিয়েছিল। তবে, বিলকিস বানু প্রতিশোধে বিশ্বাস করেন না। তিনি বলেন, ‘উভয় অপরাধই সমানভাবে ভয়াবহ ছিল। কিন্তু আমি কারো জীবন নেয়াতে বিশ্বাস করি না। আমি তাদের মৃত্যুদণ্ড চাই না।’ বিলকিস বানু বলেন, ‘আমি চাই তারা আজীবন জেলখানায় থাকুক। আমি আশা করি, তারা একদিন তাদের অপরাধের বিষয়টি উপলব্ধি করবে, কিভাবে তারা ছোট শিশুদের হত্যা করেছে এবং নারীদের ধর্ষণ করেছে।’ তিনি বলেন, ‘আমি প্রতিশোধ নিতে আগ্রহী নই। আমি কেবল চাই তারা যেন বুঝতে পারে যে তারা কী খারাপ কাজ করেছে।’ সূত্র: বিবিসি

Comments

Comments!

 গুজরাটে মুসলিম পরিবারের ১৪জনকে হত্যা ও গণধর্ষণ : প্রতিশোধে আগ্রহী নই, শুধু চাই তারা যেন বুঝতে পারে কী খারাপ কাজ করেছে—–বিলকিস বানুAmarbangladeshonlineAmarbangladeshonline | Amarbangladeshonline

গুজরাটে মুসলিম পরিবারের ১৪জনকে হত্যা ও গণধর্ষণ : প্রতিশোধে আগ্রহী নই, শুধু চাই তারা যেন বুঝতে পারে কী খারাপ কাজ করেছে—–বিলকিস বানু

Wednesday, May 10, 2017 2:43 pm
174430_1

গান্ধীনগর: ২০০২ সালে ভারতের পশ্চিমাঞ্চলীয় প্রদেশ গুজরাটে মুসলিম বিরোধী দাঙ্গার সময় উগ্র হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকেরা বিলকিস বানুকে গণধর্ষণ করে ও তার পরিবারের ১৪ জন সদস্যকে হত্যা করা হয়।

বিচারের জন্য তার ১৫ বছরের যুদ্ধ অবশেষে তাকে সাফল্য এনে দিয়েছে। গণধর্ষণ ও হত্যায় জড়িত থাকার বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার পর গত সপ্তাহে বোম্বাই হাই কোর্টে ১১ জনকে মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দিয়েছে।

এছাড়াও, প্রমাণ নষ্ট করে ফেলার জন্য আদালত পাঁচ পুলিশ এবং দুইজন ডাক্তারকে অভিযুক্ত হয়েছে। এর আগে বিচারিক আদালতে তাদেরকে খালাস দেয়া হয়েছিল।

রবিবার দিল্লিতে বিবিসিকে বিলকিস বানু জানান, অবশেষে তাকে শান্তির আশা দেয়া হয়েছে।

তিনি বলেন, ‘বিচার বিভাগের ওপর সবসময় আমার পূর্ণ আস্থা ছিল এবং এই আদেশের জন্য আমি বোম্বে হাইকোর্টের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি। এই রায়ে ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। আমি এই রায়ে অত্যান্ত খুশি হয়েছি।’

তিনি আরো বলেন, ‘রাজ্য সরকার এবং পুলিশও এই অপরাধের সঙ্গে যুক্ত বলে আমি মনে করি। কারণ তারা অভিযুক্তদেরকে ধর্ষণ ও লুটপাটের পূর্ণ স্বাধীনতা দিয়েছিল।’

বিলকিস বানু বলেন, ‘আদালত পুলিশ ও ডাক্তারদেরকেও দোষী সাব্যস্ত করেছে। মনে হচ্ছে আমি ন্যায়বিচার পেয়েছি।’

ন্যায়বিচারের জন্য বিলকিস বানো দীর্ঘ সংগ্রাম করতে হয়েছে। তিনি বলছেন, এই সংগ্রাম চালিয়ে যাওয়ার কোন বিকল্প ছিল না।

এটা ভালভাবে নথিভুক্ত করা হয়েছে যে, কিছু পুলিশ ও রাজ্য কর্মকর্তারা তাকে ভয় দেখানোর চেষ্টা করেছিলেন, প্রমাণ ধ্বংস করা হয়েছিল এবং মৃতদেহগুলো কোনো রকম ময়নাতদন্ত ছাড়াই সমাহিত করা হয়েছিল। যে ডাক্তাররা তাকে পরীক্ষা করেছিল, তাদের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল যে, তাকে ধর্ষণ করা হয়নি এবং তাকে বিভিন্ন মাধ্যম থেকে হত্যার হুমকি দেয়া হয়েছে।

এসব প্রতিকূলতা সত্ত্বেও তিনি আক্রমণকারীদেরকে চিহ্নিত করতে সক্ষম হন। ২০১৪ সালে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট মামলাটি কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থার ফেডারেল তদন্তকারীদের কাছে হস্তান্তর করার পর প্রথমবারের মতো অভিযুক্তদের গ্রেপ্তার করা হয়।

গুজরাটের আদালত তাকে ন্যায়বিচার প্রদান করতে পারেনি বলে সুপ্রিম কোর্টে আবেদন করলে সুপ্রিম কোর্ট তার এই আবেদন মঞ্জুর করে এবং তার মামলা মুম্বাইয়ের একটি আদালতে স্থানান্তর করা হয়।

এই দীর্ঘ যুদ্ধে তার পরিবারকে ব্যাপকভাবে দুর্ভোগ সহ্য করতে হয়েছে। গত ১৫ বছরে তিনি ও তার স্বামী ইয়াকুব রসুলকে ১০ বার বাড়ি থেকে বের করে দেয়া হয়েছে। তাদের পাঁচ সন্তানকে সঙ্গে নিয়ে গুজরাটের পথে পথে ঘুরতে হয়েছে।

রসুল বলেন, ‘হুমকির কারণে আমরা এখনো নিজেদের ঘরে যেতে পারছি না। পুলিশ এবং রাজ্য প্রশাসন সবসময়ই আমাদের আক্রমণকারীদের সাহায্য করেছে। আমরা যখন গুজরাটে ছিলাম তখনো আমরা আমাদের মুখ ঢেকে রেখেছি, ভয়ে আমরা কখনো আমাদের ঠিকানা প্রকাশ করতাম না।’

দাঙ্গা চলাকালে বিলকিস বানো ও তার পরিবারের উপর এই হামলা ছিল সবচেয়ে ভয়াবহ অপরাধ। গুজরাটের গোধরা শহরে যাত্রীবাহী একটি ট্রেনে অগ্নিকাণ্ডে ৬০ জন হিন্দু তীর্থযাত্রী নিহত হলে এই দাঙ্গা শুরু হয়।

উগ্র হিন্দুরা এই অগ্নিকাণ্ডের জন্য মুসলমানদের দোষারোপ করলে হিন্দু জনগোষ্ঠী বিক্ষোভ শুরু করে। তারা আশেপাশের মুসলিম এলাকায় নগ্ন হামলা চালায় এবং তাদের সম্পত্তি ধ্বংস করে।

তিন দিনের জন্য দাঙ্গাবাজদের পূর্ণ স্বাধীনতা দিয়েছিল রাজ্য প্রশাসন ও পুলিশ। এ ঘটনায় ১,০০০ জনেরও বেশি মানুষ মারা যায়। তাদের অধিকাংশই ছিল মুসলমান।

বর্তমান প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ওই সময় গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন। এই দাঙ্গা থামাতে যথেষ্ট প্রদক্ষেপ না নেয়ার জন্য তিনি বেশ সমালোচিত হয়েছিলেন।

এই অন্যায়ের সঙ্গে তিনি জড়িত নন বলে সর্বদা দাবি করে আসছেন এবং দাঙ্গার জন্য তিনি কখনো ক্ষমা প্রার্থনাও করেননি। অপর্যাপ্ত প্রমাণের উদ্ধৃতি দিয়ে ২০১৩ সালে সুপ্রিম কোর্টের একটি প্যানেল তার বিচার করতে অস্বীকৃতি জানায়।

যাইহোক কয়েক বছর ধরে চলা এই মামলায় আদালত দাঙ্গায় জড়িত থাকার জন্য কয়েক ডজন লোককে দোষী সাব্যস্ত করেছে। ২০১২ একজন সাবেক মন্ত্রী ও মোদির অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ সহযোগীর ২৮ বছরের কারাদণ্ড দেয় আদালত। তবে, এখনো অনেক মানুষ ন্যায়বিচারের জন্য অপেক্ষার প্রহর গুনছে।

পনেরো বছর পর বিলকিস বানোর চোখে এখনো অশ্রু ঝরছে কারণ তিনি সেই দিনের ভয়ঙ্কর স্মৃতি তাকে এখনো তাড়িয়ে বেড়ায়।

দাঙ্গার সময় তিনি তার বাবার বাড়িতে ছিলেন। গোধরা শহরের অদূরে রন্ধুপুর গ্রামে তার বাবা-মা বসবাস করেন। ওই সময় তার বয়স ছিল মাত্রই ১৯ বছর এবং তিন বছর বয়সী কন্যা শিশুর মা এবং তার দ্বিতীয় সন্তান তখন তার গর্ভে ছিল।

তিনি বলেন, ‘এটা ছিল ট্রেনে আগুন লাগার পরের দিন সকাল। আমি রান্নাঘরে সকালের খাবার খাচ্ছিলাম। তখন আমার চাচী ও তার ছেলেমেয়েরা দৌড়ে আমাদের বাড়িতে আসে। তারা এসে জানায়, তাদের বাড়ি আগুনে পুড়িয়ে দেয়া হচ্ছে এবং আমাদেরকে শিগগিরই এই এলাকা থেকে চলে যেতে হবে।’

‘আমরা কেবল আমাদের শরীরের পরিহিত পোশাক ছাড়া সব কিছু ফেলে এলাকা ত্যাগ করি। এমনকি আমাদের পায়ে জুতা পরারও সময় ছিল না।’

কয়েক মিনিটের মধ্যে আশেপাশের সমস্ত মুসলিম বাড়িগুলো খালি করা হয়। নিরাপত্তার খুঁজে সেখানে বসবাসকারী ৫০টি পরিবারের সদস্যরা অন্যত্র চলে গেছে।’

বিলকিস বানো ১৭ জনের একটি দলে ছিলেন। তাদের মধ্যে ছিল তার তিন বছর বয়সী মেয়ে, তার মা, তার গর্ভবতী চাচাতো বোন, তার ছোট ছোট ভাইবোন, ভ্রাতুষ্পুত্র এবং ভাগ্নী এবং দুই প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ।

‘আমরা প্রথমে গ্রাম্য পরিষদের প্রধানের কাছে যাই। তিনি ছিলেন একজন হিন্দু। আমরা তার কাছে আশ্রয় প্রার্থণা করি। কিন্তু মুসলমানদেরকে আশ্রয় দেয়ায় বিক্ষোভকারীরা তাকেও মেরে ফেলার হুমকি দিচ্ছিল। তখন আমাদেরকে চলে যেতে বাধ্য করা হয়েছিল।’

পরের কয়েকদিন উগ্র হিন্দু গোষ্ঠী মুসলিমদের খুঁজে গ্রাম থেকে গ্রামে তল্লাশি চালায়। প্রতিবেশিদের প্রতি দয়া দেখানো হিন্দু পরিবারসহ মসজিদে মসজিদে গিয়ে তারা তল্লাশি চালায়।

৩ মার্চ সকালে তারা কাছাকাছি একটি গ্রামকে নিরাপদ মনে দুইটি জীপে করে সেখানে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। রাস্তায় একদল লোক তাদের গাড়ি থামিয়ে দেয়।

তিনি বলেন, ‘তারা তলোয়ার এবং লাঠি নিয়ে আমাদেরকে আক্রমণ করে। তাদের মধ্যে একজন আমার কন্যাকে আমার কোল থেকে ছিনিয়ে নিয়ে মাটিতে ছুঁড়ে মারে। তার মাথার উপর একটা পাথর দিয়ে সজোরে আঘাত করে।’

 

তলোয়ারের আঘাতে বিলকিস বানোর হাত ও পা কেটে যায়। আক্রমণকারীরা ছিল তার গ্রামেরই তার প্রতিবেশি। মুহূর্তের মধ্যেই ১২ জন পুরুষকে তারা হত্যা করে।

তারা তার কাপড় টেনে ছিঁড়ে ফেলে এবং তাদের বেশ কয়েকজন মিলে তাকে ধর্ষণ করে। তিনি তাদের কাছে অনুগ্রহ প্রার্থণা করেন এবং তাদের বলেন যে, তিনি পাঁচ মাস গর্ভবতী। কিন্তু তার আবেদন তাদের বধির কানে সেদিন প্রবেশ করেনি।

তার চাচাত বোন যিনি মাত্রই দুই দিন আগে একটি মেয়ে শিশুর জন্ম দিয়েছিলেন। তারা তাকেও ধর্ষণের পর হত্যা করে। সঙ্গে তার নবজাতকও মেরে ফেলা হয়।

বিলকিস বানো বেঁচে গিয়েছিল কারণ ওই সময় তার চেতনা হারিয়ে ফেলেছিল এবং তার আক্রমণকারীরা তাকে মৃত মনে করে চলে গিয়েছিল। ওই গণহত্যায় দুজন বালকসহ মাত্র চারজন বেঁচে ছিল।

চেতনা ফিরে আসলে রক্তাক্ত ক্ষুদ্র একটি পেটিকোট দিয়ে তার শরীরকে ঢেকে কাছাকাছি একটি পাহাড়ের ওপর চলে যান এবং একটি গুহায় এক দিন নিজেকে লুকিয়ে রাখেন।

‘পরের দিন আমি খুব তৃষ্ণার্ত ছিলাম। তাই পানির খুঁজে নিকটবর্তী একটি উপজাতীয় গ্রামে যাই। গ্রামবাসীরা প্রথমে আমাকে সন্দেহ করেছিল এবং তারা লাঠি নিয়ে বেরিয়ে এসেছিল। কিন্তু পরে তারা আমাকে সাহায্য করেছিল। আমার শরীর ঢেকে রাখতে তারা আমাকে একটি ব্লাউজ এবং একটি স্কার্ফ দিয়েছিল।’

তিনি পুলিশের একটি জিপ গাড়ির দেখা পান এবং তারা তাকে পুলিশ স্টেশনে নিয়ে যান। সেখানে তিনি তার ঘটনার বর্ণনা দেন।

তিনি বলেন, ‘আমি অশিক্ষিত, তাই পুলিশি কর্মকর্তাদের লিখিত অভিযোগ একবার পড়ে শুনানোর জন্য অনুরোধ করেছিলাম, কিন্তু তারা তা করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিল। তারা কেবল আমার আঙ্গুলের ছাপ নিয়েছিল এবং তারা তাদের নিজেদের মতো করে সেটি লিখেছিল। আমি আমার সব আক্রমণকারীকে চিনি এবং আমি তাদের নামও বলেছিলাম। কিন্তু পুলিশ কোনো নাম লিখেনি।’

পরের দিন তাকে দাঙ্গায় বিচ্ছিন্নদের জন্য নির্মিত গোধরার একটি ক্যাম্পে পাঠিয়ে দেয়া হয়। ১৫ দিন পর সেখানে তিনি তার স্বামী সঙ্গে পুনরায় মিলিত হন এবং পরবর্তী কয়েক মাস তারা সেখানে বসবাস করেন। তার অজাত সন্তান বেঁচে যায় এবং পরে তিনি একটি মেয়ে শিশুর জন্ম দেন।

গত ১৫ বছর ‘খুব কঠিন’ সময় পার করেছেন তারা। কিন্তু এই দম্পতি জানিয়েছেন, হাইকোর্টের আদেশে তারা কিছুটা হলেও শান্তনা পাচ্ছেন।

বিলকিস বানোর মামলায় তার আক্রমণকারীদের মৃত্যুদণ্ড হবে কিনা তা নিয়ে অনেকেই সন্দিহান ছিলেন। প্রসিকিউটররা তিনজনের মৃত্যুদণ্ডের দাবি জানিয়েছিল।

তবে, বিলকিস বানু প্রতিশোধে বিশ্বাস করেন না।

তিনি বলেন, ‘উভয় অপরাধই সমানভাবে ভয়াবহ ছিল। কিন্তু আমি কারো জীবন নেয়াতে বিশ্বাস করি না। আমি তাদের মৃত্যুদণ্ড চাই না।’

বিলকিস বানু বলেন, ‘আমি চাই তারা আজীবন জেলখানায় থাকুক। আমি আশা করি, তারা একদিন তাদের অপরাধের বিষয়টি উপলব্ধি করবে, কিভাবে তারা ছোট শিশুদের হত্যা করেছে এবং নারীদের ধর্ষণ করেছে।’

তিনি বলেন, ‘আমি প্রতিশোধ নিতে আগ্রহী নই। আমি কেবল চাই তারা যেন বুঝতে পারে যে তারা কী খারাপ কাজ করেছে।’

সূত্র: বিবিসি

Comments

comments

সম্পাদক : মোহাম্মদ আবদুল বাছির
প্রকাশক: মোহাম্মদ জহিরুল ইসলাম
ফোন : ‎০১৭১৩৪০৯০৯০
৩৪৫/১, দিলু রোড, নিউ ইস্কাটন, ঢাকা-১০০০
X
 
নিয়মিত খবর পড়তে আমাদের ফেসবুক পেজে লাইক দিয়ে যুক্ত থাকুন
X