রবিবার, ১৮ই ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ ইং, ৬ই ফাল্গুন, ১৪২৪ বঙ্গাব্দ, দুপুর ১২:৩৫
শিরোনাম
  • ঘৃণাকে বিজয়ী হতে দেয়া যাবে না, ট্রাম্পকে ইঙ্গিত করে জর্জ ক্লুনি
  • আমার একটাই চিন্তা দেশের মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন করা: প্রধানমন্ত্রী
  • ‘কেন্দ্রীয় সরকারের আগ্রাসী নীতির কারণে কাশ্মীরকে হারাতে হবে’
  • সাড়ে চারমাস পর মুখোমুখি, খাদিজাকে উদ্দেশ্য করে যা বলল বদরুল
  • খালেদার ‘সাজা’ বিরোধী নেতাকর্মীদের মনোবল ভাঙ্গার কৌশল!
  • বিএনপির কর্মসূচি ‘যথাসময়ে’ জানানো হবে: রিজভী
  • দলের জন্য বোলিং করতেও রাজি মুশফিক
  • শিশু জিহাদের মৃত্যু: চার জনের ১০ বছর করে কারাদণ্ড
  • অবশেষে বাড়ি অবরুদ্ধ করে রাখা সেই দেয়াল ভেঙ্গে ফেলা হচ্ছে
  • সাক্ষ্য দিলেন খাদিজা, চাইলেন বদরুলের সর্বোচ্চ শাস্তি
  • বদরুলের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিতে আদালতে খাদিজা
  • আজ বগুড়ায় যেসব প্রকল্প উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী
  • রোহিঙ্গা স্থানান্তরের সরকারি পরিকল্পনার সঙ্গে দ্বিমত মানবাধিকার কমিশনের
  • মহেশখালীতে ইয়াবা ব্যবসায়ীদের সঙ্গে পুলিশের ‘বন্দুকযুদ্ধ’
  • হোয়াইট হাউসে কাজ করার দীর্ঘ অভিজ্ঞতার কথা জানালেন এই বাংলাদেশি সাংবাদিক
Monday, July 25, 2016 4:27 pm
A- A A+ Print

চলছে মিলেমিশে লুটপাট

230071_1

প্রায় ২৭৫ কোটি টাকা ব্যয়ে ২০১২ সালে কুষ্টিয়া মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল স্থাপন প্রকল্পের কাজ শুরু করে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। এ প্রকল্পের আওতায় বড় ছয়টি প্যাকেজে ঠিকাদারদের সঙ্গে যোগসাজশে অনুমোদন ছাড়াই বেশি মূল্যে চুক্তি করে কার্যাদেশ দেয় প্রকল্প বাস্তবায়নকারী সংস্থা। আবার প্রতিটি প্যাকেজে উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবও (ডিপিপি) কাটছাঁট করা হয়। এ ধরনের বিভিন্ন অনিয়মের মাধ্যমে প্রকল্পটির অর্থ লুটপাট করা হয়েছে বলে মনে করছে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ এবং মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি)। সম্প্রতি সরেজমিন পরিদর্শন করে এ রকম প্রায় অর্ধশত প্রকল্পে প্রকৌশলীদের এবং ডিপিপির প্রাক্কলনের তুলনায় বেশি দরে অনুমোদন ছাড়াই ঠিকাদারদের কাজ দেওয়ার তথ্য পেয়েছে আইএমইডি। আইএমইডির প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, অনেক ক্ষেত্রে আর্থিক অনিয়ম এত ব্যাপক যে আরও তদন্ত করা প্রয়োজন। এসব প্রকল্পের কেনাকাটার নথি বিশ্লেষণে নানা অনিয়ম ও অসঙ্গতি চিহ্নিত করা হয়েছে। দেখা গেছে, যোগসাজশে ঠিকাদারদের বেশি দরে কাজ দিয়ে সরকারি বরাদ্দের টাকা ভাগাভাগি করে নেওয়া হয়েছে। কাজের পরিমাণ কমিয়ে ঠিকাদারদের বেশি দরে কাজ দেওয়া হয়েছে। আর্থিক হিসাব-নিকাশেও লুকোচুরি করা হয়েছে। আইএমইডি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে এ প্রতিবেদন পাঠিয়ে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করেছে। এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) সাবেক গবেষণা পরিচালক ড. জায়েদ বখত সমকালকে বলেন, 'প্রকল্পে ঠিকাদার নিয়োগে ক্রয় আইন লঙ্ঘন করার কারণে এ ধরনের অনিয়ম হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে সরকারি সংস্থাগুলোর নজরদারির ঘাটতি রয়েছে। অনিয়ম ঠেকাতে হলে সঠিকভাবে সরকারি ক্রয় আইন (পিপিআর) মানা হচ্ছে কি না, তা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে দেখভাল করতে হবে।' ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান সমকালকে বলেন, 'যারা এ ধরনের অনিয়মের সঙ্গে জড়িত বলে আইএমইডির প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, তাদের বিচারের আওতায় আনতে হবে। শুধু চিহ্নিত করে লাভ নেই, অনিয়মে জড়িত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিলে এ ধরনের ঘটনা ঘটতে থাকবে।' আইএমইডির সচিব ফরিদ উদ্দিন সমকালকে বলেন, 'যেসব প্রকল্পে অনিয়ম পাওয়া গেছে, সেগুলো সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগকে জানানো হয়েছে। দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশও করা হয়েছে। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় থেকে আধা-সরকারি পত্র দিয়ে ব্যবস্থা নিতে বলা হচ্ছে। আইএমইডি এসব দিক বিবেচনায় আগের চেয়ে কঠোর অবস্থান নিয়েছে।' তদন্তে উঠে এসেছে, বেশ কিছু প্রকল্পে প্রথমে ঠিকাদারদের যোগাসাজশে বেশি দরে কাজ দিয়ে অনুমোদন পরে নেওয়া হয়েছে। কাজ দেওয়ার সময় সেন্ট্রাল টেকনিক্যাল ইউনিট (সিপিটিইউ), পরিকল্পনা কমিশন, আইএমইডি এবং অর্থ মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন প্রয়োজন হলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এর তোয়াক্কা করা হয়নি। কার্যাদেশ দিয়ে চুক্তির অনেক পরে পরিকল্পনা কমিশনে প্রকল্প সংশোধনের জন্য পাঠানো হয়েছে। তখন নানা অজুহাতে ব্যয় বাড়িয়েছেন প্রকল্প কর্মকর্তারা। এ জন্য সম্প্রতি একনেকে অনুমোদন পাওয়া কোনো কোনো প্রকল্পের ব্যয় ৪০০ থেকে ৫০০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। এমন সময়ে সংশোধনের প্রস্তাব দেওয়া হলে পরিকল্পনা কমিশন এবং আইএমইডির কিছু করার থাকে না। কুষ্টিয়া মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল নির্মাণ :এ প্রকল্পের আওতায় ছয়তলা একাডেমিক ভবন নির্মাণে ২৬ কোটি ৪৪ লাখ টাকা বরাদ্দ ছিল। কিন্তু ছয়তলার পরিবর্তে চারতলা ভবন নির্মাণে ঠিকাদারের সঙ্গে ২৯ কোটি ৮১ লাখ টাকার চুক্তি হয়। দুই তলা কম হলেও বরাদ্দের চেয়ে ১২ দশমিক ৭৬ শতাংশ বেশি অর্থে এ কাজ দেওয়া হয়েছে। একইভাবে প্রকল্পটির আওতায় হাসপাতাল ভবন নির্মাণ, ছাত্রছাত্রীদের দুটি পৃথক হোস্টেল নির্মাণ, পুরুষ ও নারীদের দুটি পৃথক সিঙ্গেল ডক্টরস ডরমিটরি নির্মাণে অনিয়ম পেয়েছে আইএমইডি। গণপূর্ত অধিদপ্তরের হিসাবে, একাডেমিক ভবন নির্মাণে ৩০ কোটি ৪৪ লাখ টাকা ব্যয় হয়েছে। কিন্তু স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয় বলছে, একাডেমিক ভবন নির্মাণে ৪০ কোটি টাকা খরচ হয়ে গেছে। কুষ্টিয়া মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের প্রকল্প পরিচালক ডা. আশরাফুল হক দারা সমকালকে বলেন, 'প্রকল্পের আওতায় ভবনের নির্মাণকাজ চলছে। এর দরপত্র আহ্বান ও ঠিকাদার নিয়োগ থেকে শুরু করে যাবতীয় কাজ সম্পন্ন করেছে গণপূর্ত অধিদপ্তর।' তিনি বলেন, 'প্রকল্পের পরিচালক হিসেবে বিভিন্ন ধরনের রুটিন কাজ করি। সুতরাং কোনো অনিয়মের ঘটনা ঘটে থাকলেও আমার তা জানা নেই।' ইলেকশন রিসোর্স সেন্টার নির্মাণ :রাজধানীর আগারগাঁওয়ে নির্মাণাধীন ১৮৫ কোটি টাকা ব্যয়ে ইলেকশন রিসোর্স সেন্টার নির্মাণকাজেও অনুমোদন ছাড়াই বেশি মূল্যে ঠিকাদারকে কাজ দেওয়ার প্রমাণ পেয়েছে আইএমইডি। ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান টিইএল-টিবিএল কনসোর্টিয়ামকে প্রায় সাড়ে চার কোটি টাকা বেশি দরে কাজ দিয়ে চুক্তি করেছে নির্বাচন কমিশন। চুক্তির অনুমোদনহীন অতিরিক্ত অর্থ আটকে দেওয়া হয়েছে বলে আইএমইডির প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এ প্রতিবেদনের সঙ্গে একমত নন এ প্রকল্পের পরিচালক এস এম আশফাক হোসেন। তিনি বলেন, 'ঠিকাদার নিয়োগে কোনো অনিয়ম হয়নি। এ জন্য কোনো তদন্ত হওয়ার কথা নয়। সুতরাং কোনো প্রতিবেদন তৈরির বিষয়টি পুরোপুরি অসত্য।' শ্রীপুর থেকে জয়দেবপুর গ্যাসের সঞ্চালন লাইন নির্মাণ :প্রায় ২০০ কোটি টাকা ব্যয়ে শ্রীপুর থেকে জয়দেবপুর গ্যাসলাইন নির্মাণ প্রকল্পের কাজ চলছে। এ প্রকল্পের আওতায় জমি অধিগ্রহণে ৪৪ কোটি ৫৫ লাখ টাকা ব্যয়ের অনুমোদন ছিল। কিন্তু অনুমোদন ছাড়াই আরও ৪৮ কোটি টাকা ব্যয় করা হয়েছে। অর্থাৎ ৪৪ কোটি টাকার কাজে খরচ করা হয়েছে ৯২ কোটি টাকা। অথচ জমি অধিগ্রহণের জন্য স্থানীয়ভাবে জমির মূল্য সংগ্রহ করে এ খাতের ডিপিপিতে ব্যয় নির্ধারণ করা হয়। শেখ আবু নাসের বিশেষায়িত হাসপাতাল :খুলনায় নির্মাণাধীন এ হাসপাতালের কার্যক্রম শুরু হলেও প্রকল্প শেষ হয়নি। এ প্রকল্পের টাওয়ার ব্লক, সার্ভিস ব্লক নির্মাণে অনুমোদনহীন বেশি মূল্যে কাজ দেওয়া হয়েছে। প্রকল্পটির টাওয়ার ব্লক নির্মাণে প্রকৌশলীদের প্রাক্কলন অনুযায়ী আট কোটি ৬৭ লাখ টাকা প্রয়োজন। কিন্তু এর চেয়ে প্রায় ৫ শতাংশ বেশি মূল্যে ঠিকাদারকে কাজ দেওয়া হয়েছে। একদিকে বেশি মূল্যে কাজ দেওয়া হয়েছে, অন্যদিকে প্যাকেজের অনেক কাজ বাদ দেওয়া হয়েছে। এ ব্লকের কনফারেন্স ও লাইব্রেরি নির্মাণে কোনো অনুমোদন ছাড়াই অর্ধকোটি টাকার কাজ দেওয়া হয়েছে। সার্ভিস ব্লক নির্মাণেও অনিয়ম পেয়েছে আইএমইডি। চার কোটি টাকা ব্যয়ে সার্ভিস ব্লক নির্মাণের কথা থাকলেও ১০ শতাংশ বেশি মূল্যে চার কোটি ৬২ লাখ টাকায় ঠিকাদারদের সঙ্গে চুক্তি করা হয়েছে। এ প্রকল্পের সাবেক এক কর্মকর্তা সমকালকে বলেন, 'কয়েকজন প্রভাবশালী ঠিকাদার এ প্রকল্পের কাজ পেয়েছেন। তৎকালীন পিডির সঙ্গে যোগসাজশে এ প্রকল্পের কাজ দেওয়া হয়। অনেক ছোট প্যাকেজের কোনো অনুমোদন নেই। এর সঙ্গে গণপূর্ত অধিদপ্তরের কয়েক কর্মকর্তাও জড়িত।' তবে প্রকল্প পরিচালক ডা. পরিতোষ চৌধুরী সমকালকে বলেন, 'এর আগে কোনো অনিয়ম হয়ে থাকলে তা আমার জানা নেই। ঠিকাদারদের সঙ্গে আগের পিডিরা চুক্তি করেছে। এখন শুধু অগ্রগতি এবং রুটিন কাজ দেখভাল করা হচ্ছে।' গোপালগঞ্জ ট্রমা সেন্টার :গোপালগঞ্জ ট্রমা সেন্টার নির্মাণেও ক্রয় প্রক্রিয়ায় অনিয়ম পেয়েছে আইএমইডি। প্রকল্পটির কেনাকাটায় সাড়ে ১৪ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। এ অর্থে ২০০৮ সালের মূল্যতালিকা অনুযায়ী ঠিকাদারদের কাজ দেওয়ার কথা থাকলেও ২০১১ ও ২০১৪ সালের মূল্যতালিকা অনুযায়ী কার্যাদেশ দেওয়া হয়েছে। বেশি মূল্যে কাজ দেওয়া হলেও ডিপিপিভুক্ত অনেক কাজ বাদ দেওয়া হয়েছে। অন্যান্য প্রকল্প :আরও যেসব প্রকল্পের বিভিন্ন প্যাকেজে অনুমোদনের চেয়ে বেশি মূল্যে কাজ দেওয়া হয়েছে সেগুলোর মধ্যে রয়েছে_ প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়ন প্রকল্প, লক্ষ্মীপুর জেলার রামগতি ও কমলনগর উপজেলা এবং এর আশপাশের এলাকাকে মেঘনা নদীর অব্যাহত ভাঙন থেকে রক্ষাকল্পে নদীতীর সংরক্ষণ, ৪০ পৌরসভা ও গোথ সেন্টারে অবস্থিত পানি সরবরাহ এবং এনভায়রনমেন্টাল স্যানিটেশন (দ্বিতীয় পর্যায়), ডেমরা-আমুলিয়া রামপুরা সড়ক নির্মাণ এবং ডেমরা-সায়েদাবাদ সংযোগ সড়ক উন্নয়ন, গফরগাঁও-মাওনা সড়কের ২৬তম কিলোমিটারে সুতিয়া নদীর ওপর পিসি গার্ডার সেতু নির্মাণ, স্মার্ট কার্ড বেইজড প্রিপেইড পাম্প ব্যবহার, রাজশাহী, নওগাঁ ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলায় পুরাতন গভীর নলকূপ পুনর্বাসন, ভেড়ামারা কম্বাইন্ড সাইকেল পাওয়ার প্ল্যান্ট ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য।

Comments

Comments!

 চলছে মিলেমিশে লুটপাটAmarbangladeshonlineAmarbangladeshonline | Amarbangladeshonline

চলছে মিলেমিশে লুটপাট

Monday, July 25, 2016 4:27 pm
230071_1

প্রায় ২৭৫ কোটি টাকা ব্যয়ে ২০১২ সালে কুষ্টিয়া মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল স্থাপন প্রকল্পের কাজ শুরু করে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। এ প্রকল্পের আওতায় বড় ছয়টি প্যাকেজে ঠিকাদারদের সঙ্গে যোগসাজশে অনুমোদন ছাড়াই বেশি মূল্যে চুক্তি করে কার্যাদেশ দেয় প্রকল্প বাস্তবায়নকারী সংস্থা। আবার প্রতিটি প্যাকেজে উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবও (ডিপিপি) কাটছাঁট করা হয়। এ ধরনের বিভিন্ন অনিয়মের মাধ্যমে প্রকল্পটির অর্থ লুটপাট করা হয়েছে বলে মনে করছে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ এবং মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি)। সম্প্রতি সরেজমিন পরিদর্শন করে এ রকম প্রায় অর্ধশত প্রকল্পে প্রকৌশলীদের এবং ডিপিপির প্রাক্কলনের তুলনায় বেশি দরে অনুমোদন ছাড়াই ঠিকাদারদের কাজ দেওয়ার তথ্য পেয়েছে আইএমইডি।
আইএমইডির প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, অনেক ক্ষেত্রে আর্থিক অনিয়ম এত ব্যাপক যে আরও তদন্ত করা প্রয়োজন। এসব প্রকল্পের কেনাকাটার নথি বিশ্লেষণে নানা অনিয়ম ও অসঙ্গতি চিহ্নিত করা হয়েছে। দেখা গেছে, যোগসাজশে ঠিকাদারদের বেশি দরে কাজ দিয়ে সরকারি বরাদ্দের টাকা ভাগাভাগি করে নেওয়া হয়েছে। কাজের পরিমাণ কমিয়ে ঠিকাদারদের বেশি দরে কাজ দেওয়া হয়েছে। আর্থিক হিসাব-নিকাশেও লুকোচুরি করা হয়েছে। আইএমইডি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে এ প্রতিবেদন পাঠিয়ে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করেছে।
এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) সাবেক গবেষণা পরিচালক ড. জায়েদ বখত সমকালকে বলেন, ‘প্রকল্পে ঠিকাদার নিয়োগে ক্রয় আইন লঙ্ঘন করার কারণে এ ধরনের অনিয়ম হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে সরকারি সংস্থাগুলোর নজরদারির ঘাটতি রয়েছে। অনিয়ম ঠেকাতে হলে সঠিকভাবে সরকারি ক্রয় আইন (পিপিআর) মানা হচ্ছে কি না, তা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে দেখভাল করতে হবে।’ ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক
ড. ইফতেখারুজ্জামান সমকালকে বলেন, ‘যারা এ ধরনের অনিয়মের সঙ্গে জড়িত বলে আইএমইডির প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, তাদের বিচারের আওতায় আনতে হবে। শুধু চিহ্নিত করে লাভ নেই, অনিয়মে জড়িত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিলে এ ধরনের ঘটনা ঘটতে থাকবে।’
আইএমইডির সচিব ফরিদ উদ্দিন সমকালকে বলেন, ‘যেসব প্রকল্পে অনিয়ম পাওয়া গেছে, সেগুলো সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগকে জানানো হয়েছে। দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশও করা হয়েছে। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় থেকে আধা-সরকারি পত্র দিয়ে ব্যবস্থা নিতে বলা হচ্ছে। আইএমইডি এসব দিক বিবেচনায় আগের চেয়ে কঠোর অবস্থান নিয়েছে।’
তদন্তে উঠে এসেছে, বেশ কিছু প্রকল্পে প্রথমে ঠিকাদারদের যোগাসাজশে বেশি দরে কাজ দিয়ে অনুমোদন পরে নেওয়া হয়েছে। কাজ দেওয়ার সময় সেন্ট্রাল টেকনিক্যাল ইউনিট (সিপিটিইউ), পরিকল্পনা কমিশন, আইএমইডি এবং অর্থ মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন প্রয়োজন হলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এর তোয়াক্কা করা হয়নি। কার্যাদেশ দিয়ে চুক্তির অনেক পরে পরিকল্পনা কমিশনে প্রকল্প সংশোধনের জন্য পাঠানো হয়েছে। তখন নানা অজুহাতে ব্যয় বাড়িয়েছেন প্রকল্প কর্মকর্তারা। এ জন্য সম্প্রতি একনেকে অনুমোদন পাওয়া কোনো কোনো প্রকল্পের ব্যয় ৪০০ থেকে ৫০০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। এমন সময়ে সংশোধনের প্রস্তাব দেওয়া হলে পরিকল্পনা কমিশন এবং আইএমইডির কিছু করার থাকে না।
কুষ্টিয়া মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল নির্মাণ :এ প্রকল্পের আওতায় ছয়তলা একাডেমিক ভবন নির্মাণে ২৬ কোটি ৪৪ লাখ টাকা বরাদ্দ ছিল। কিন্তু ছয়তলার পরিবর্তে চারতলা ভবন নির্মাণে ঠিকাদারের সঙ্গে ২৯ কোটি ৮১ লাখ টাকার চুক্তি হয়। দুই তলা কম হলেও বরাদ্দের চেয়ে ১২ দশমিক ৭৬ শতাংশ বেশি অর্থে এ কাজ দেওয়া হয়েছে। একইভাবে প্রকল্পটির আওতায় হাসপাতাল ভবন নির্মাণ, ছাত্রছাত্রীদের দুটি পৃথক হোস্টেল নির্মাণ, পুরুষ ও নারীদের দুটি পৃথক সিঙ্গেল ডক্টরস ডরমিটরি নির্মাণে অনিয়ম পেয়েছে আইএমইডি। গণপূর্ত অধিদপ্তরের হিসাবে, একাডেমিক ভবন নির্মাণে ৩০ কোটি ৪৪ লাখ টাকা ব্যয় হয়েছে। কিন্তু স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয় বলছে, একাডেমিক ভবন নির্মাণে ৪০ কোটি টাকা খরচ হয়ে গেছে।
কুষ্টিয়া মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের প্রকল্প পরিচালক ডা. আশরাফুল হক দারা সমকালকে বলেন, ‘প্রকল্পের আওতায় ভবনের নির্মাণকাজ চলছে। এর দরপত্র আহ্বান ও ঠিকাদার নিয়োগ থেকে শুরু করে যাবতীয় কাজ সম্পন্ন করেছে গণপূর্ত অধিদপ্তর।’ তিনি বলেন, ‘প্রকল্পের পরিচালক হিসেবে বিভিন্ন ধরনের রুটিন কাজ করি। সুতরাং কোনো অনিয়মের ঘটনা ঘটে থাকলেও আমার তা জানা নেই।’
ইলেকশন রিসোর্স সেন্টার নির্মাণ :রাজধানীর আগারগাঁওয়ে নির্মাণাধীন ১৮৫ কোটি টাকা ব্যয়ে ইলেকশন রিসোর্স সেন্টার নির্মাণকাজেও অনুমোদন ছাড়াই বেশি মূল্যে ঠিকাদারকে কাজ দেওয়ার প্রমাণ পেয়েছে আইএমইডি। ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান টিইএল-টিবিএল কনসোর্টিয়ামকে প্রায় সাড়ে চার কোটি টাকা বেশি দরে কাজ দিয়ে চুক্তি করেছে নির্বাচন কমিশন। চুক্তির অনুমোদনহীন অতিরিক্ত অর্থ আটকে দেওয়া হয়েছে বলে আইএমইডির প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে এ প্রতিবেদনের সঙ্গে একমত নন এ প্রকল্পের পরিচালক এস এম আশফাক হোসেন। তিনি বলেন, ‘ঠিকাদার নিয়োগে কোনো অনিয়ম হয়নি। এ জন্য কোনো তদন্ত হওয়ার কথা নয়। সুতরাং কোনো প্রতিবেদন তৈরির বিষয়টি পুরোপুরি অসত্য।’
শ্রীপুর থেকে জয়দেবপুর গ্যাসের সঞ্চালন লাইন নির্মাণ :প্রায় ২০০ কোটি টাকা ব্যয়ে শ্রীপুর থেকে জয়দেবপুর গ্যাসলাইন নির্মাণ প্রকল্পের কাজ চলছে। এ প্রকল্পের আওতায় জমি অধিগ্রহণে ৪৪ কোটি ৫৫ লাখ টাকা ব্যয়ের অনুমোদন ছিল। কিন্তু অনুমোদন ছাড়াই আরও ৪৮ কোটি টাকা ব্যয় করা হয়েছে। অর্থাৎ ৪৪ কোটি টাকার কাজে খরচ করা হয়েছে ৯২ কোটি টাকা। অথচ জমি অধিগ্রহণের জন্য স্থানীয়ভাবে জমির মূল্য সংগ্রহ করে এ খাতের ডিপিপিতে ব্যয় নির্ধারণ করা হয়।
শেখ আবু নাসের বিশেষায়িত হাসপাতাল :খুলনায় নির্মাণাধীন এ হাসপাতালের কার্যক্রম শুরু হলেও প্রকল্প শেষ হয়নি। এ প্রকল্পের টাওয়ার ব্লক, সার্ভিস ব্লক নির্মাণে অনুমোদনহীন বেশি মূল্যে কাজ দেওয়া হয়েছে। প্রকল্পটির টাওয়ার ব্লক নির্মাণে প্রকৌশলীদের প্রাক্কলন অনুযায়ী আট কোটি ৬৭ লাখ টাকা প্রয়োজন। কিন্তু এর চেয়ে প্রায় ৫ শতাংশ বেশি মূল্যে ঠিকাদারকে কাজ দেওয়া হয়েছে। একদিকে বেশি মূল্যে কাজ দেওয়া হয়েছে, অন্যদিকে প্যাকেজের অনেক কাজ বাদ দেওয়া হয়েছে। এ ব্লকের কনফারেন্স ও লাইব্রেরি নির্মাণে কোনো অনুমোদন ছাড়াই অর্ধকোটি টাকার কাজ দেওয়া হয়েছে। সার্ভিস ব্লক নির্মাণেও অনিয়ম পেয়েছে আইএমইডি। চার কোটি টাকা ব্যয়ে সার্ভিস ব্লক নির্মাণের কথা থাকলেও ১০ শতাংশ বেশি মূল্যে চার কোটি ৬২ লাখ টাকায় ঠিকাদারদের সঙ্গে চুক্তি করা হয়েছে।
এ প্রকল্পের সাবেক এক কর্মকর্তা সমকালকে বলেন, ‘কয়েকজন প্রভাবশালী ঠিকাদার এ প্রকল্পের কাজ পেয়েছেন। তৎকালীন পিডির সঙ্গে যোগসাজশে এ প্রকল্পের কাজ দেওয়া হয়। অনেক ছোট প্যাকেজের কোনো অনুমোদন নেই। এর সঙ্গে গণপূর্ত অধিদপ্তরের কয়েক কর্মকর্তাও জড়িত।’
তবে প্রকল্প পরিচালক ডা. পরিতোষ চৌধুরী সমকালকে বলেন, ‘এর আগে কোনো অনিয়ম হয়ে থাকলে তা আমার জানা নেই। ঠিকাদারদের সঙ্গে আগের পিডিরা চুক্তি করেছে। এখন শুধু অগ্রগতি এবং রুটিন কাজ দেখভাল করা হচ্ছে।’
গোপালগঞ্জ ট্রমা সেন্টার :গোপালগঞ্জ ট্রমা সেন্টার নির্মাণেও ক্রয় প্রক্রিয়ায় অনিয়ম পেয়েছে আইএমইডি। প্রকল্পটির কেনাকাটায় সাড়ে ১৪ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। এ অর্থে ২০০৮ সালের মূল্যতালিকা অনুযায়ী ঠিকাদারদের কাজ দেওয়ার কথা থাকলেও ২০১১ ও ২০১৪ সালের মূল্যতালিকা অনুযায়ী কার্যাদেশ দেওয়া হয়েছে। বেশি মূল্যে কাজ দেওয়া হলেও ডিপিপিভুক্ত অনেক কাজ বাদ দেওয়া হয়েছে।
অন্যান্য প্রকল্প :আরও যেসব প্রকল্পের বিভিন্ন প্যাকেজে অনুমোদনের চেয়ে বেশি মূল্যে কাজ দেওয়া হয়েছে সেগুলোর মধ্যে রয়েছে_ প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়ন প্রকল্প, লক্ষ্মীপুর জেলার রামগতি ও কমলনগর উপজেলা এবং এর আশপাশের এলাকাকে মেঘনা নদীর অব্যাহত ভাঙন থেকে রক্ষাকল্পে নদীতীর সংরক্ষণ, ৪০ পৌরসভা ও গোথ সেন্টারে অবস্থিত পানি সরবরাহ এবং এনভায়রনমেন্টাল স্যানিটেশন (দ্বিতীয় পর্যায়), ডেমরা-আমুলিয়া রামপুরা সড়ক নির্মাণ এবং ডেমরা-সায়েদাবাদ সংযোগ সড়ক উন্নয়ন, গফরগাঁও-মাওনা সড়কের ২৬তম কিলোমিটারে সুতিয়া নদীর ওপর পিসি গার্ডার সেতু নির্মাণ, স্মার্ট কার্ড বেইজড প্রিপেইড পাম্প ব্যবহার, রাজশাহী, নওগাঁ ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলায় পুরাতন গভীর নলকূপ পুনর্বাসন, ভেড়ামারা কম্বাইন্ড সাইকেল পাওয়ার প্ল্যান্ট ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য।

Comments

comments

সম্পাদক : মোহাম্মদ আবদুল বাছির
প্রকাশক: মোহাম্মদ জহিরুল ইসলাম
ফোন : ‎০১৭১৩৪০৯০৯০
৩৪৫/১, দিলু রোড, নিউ ইস্কাটন, ঢাকা-১০০০
X
 
নিয়মিত খবর পড়তে আমাদের ফেসবুক পেজে লাইক দিয়ে যুক্ত থাকুন
X