রবিবার, ১৮ই ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ ইং, ৬ই ফাল্গুন, ১৪২৪ বঙ্গাব্দ, দুপুর ১২:৩৯
শিরোনাম
  • ঘৃণাকে বিজয়ী হতে দেয়া যাবে না, ট্রাম্পকে ইঙ্গিত করে জর্জ ক্লুনি
  • আমার একটাই চিন্তা দেশের মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন করা: প্রধানমন্ত্রী
  • ‘কেন্দ্রীয় সরকারের আগ্রাসী নীতির কারণে কাশ্মীরকে হারাতে হবে’
  • সাড়ে চারমাস পর মুখোমুখি, খাদিজাকে উদ্দেশ্য করে যা বলল বদরুল
  • খালেদার ‘সাজা’ বিরোধী নেতাকর্মীদের মনোবল ভাঙ্গার কৌশল!
  • বিএনপির কর্মসূচি ‘যথাসময়ে’ জানানো হবে: রিজভী
  • দলের জন্য বোলিং করতেও রাজি মুশফিক
  • শিশু জিহাদের মৃত্যু: চার জনের ১০ বছর করে কারাদণ্ড
  • অবশেষে বাড়ি অবরুদ্ধ করে রাখা সেই দেয়াল ভেঙ্গে ফেলা হচ্ছে
  • সাক্ষ্য দিলেন খাদিজা, চাইলেন বদরুলের সর্বোচ্চ শাস্তি
  • বদরুলের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিতে আদালতে খাদিজা
  • আজ বগুড়ায় যেসব প্রকল্প উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী
  • রোহিঙ্গা স্থানান্তরের সরকারি পরিকল্পনার সঙ্গে দ্বিমত মানবাধিকার কমিশনের
  • মহেশখালীতে ইয়াবা ব্যবসায়ীদের সঙ্গে পুলিশের ‘বন্দুকযুদ্ধ’
  • হোয়াইট হাউসে কাজ করার দীর্ঘ অভিজ্ঞতার কথা জানালেন এই বাংলাদেশি সাংবাদিক
Tuesday, June 6, 2017 9:10 am
A- A A+ Print

জঙ্গি তৎপরতা : এখনো নিখোঁজ ৪২

4

সেনাবাহিনীর সাবেক কর্মকর্তা মোহাম্মদ মহিবুর রহমান নিখোঁজ এক বছরের বেশি সময় ধরে। সাবেক এক সচিবের ছেলে সাইমুন হাছিবেরও (মোনাজ) সন্ধান নেই আড়াই বছরের বেশি সময়। মেরিন ইঞ্জিনিয়ার নজিবুল্লাহ আনসারীরও কোনো হদিস নেই। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও পারিবারিক সূত্র বলছে, তাঁরা আইএসে (ইসলামিক স্টেট) যোগ দিয়ে সিরিয়া বা ইরাকে চলে গেছেন।

প্রথম আলোর অনুসন্ধান ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, কথিত হিজরতের নামে ঘর ছেড়েছেন এমন অন্তত ৪২ জন এখনো নিখোঁজ রয়েছেন। অন্তত ৩৩ জন জঙ্গিবাদে জড়িয়ে গত তিন বছরে দেশ ছেড়েছেন, যাঁদের মধ্যে ২৩ জন সিরিয়া বা ইরাকে গেছেন। চারজন সেখানে নিহত হয়েছেন। মৃত্যুসংবাদসহ তাঁদের ছবি আইএস বিভিন্ন সময়ে প্রকাশও করেছে। চারজন মালয়েশিয়ার উদ্দেশে ঢাকা ছাড়ার পর নিখোঁজ, যাঁদের বিরুদ্ধে আল-কায়েদাসংশ্লিষ্টতার অভিযোগ আছে। আরও ছয়জনের দেশ ছাড়ার খবর পাওয়া গেছে। তাঁরা ঠিক কোন দেশে গেছেন, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

এর বাইরে কথিত হিজরতের নামে অনেক তরুণ ঘর ছেড়ে দেশের ভেতরেই জঙ্গি তৎপরতায় যুক্ত হয়েছেন। এমন অন্তত ১৩ জনের এখনো নিখোঁজ থাকার খবর পাওয়া গেছে।

গত বছরের ১ জুলাই গুলশানের হলি আর্টিজান রেস্তোরাঁয় জঙ্গি হামলার পর নিখোঁজ ব্যক্তিদের বিষয়টি জানাজানি হয়। ওই হামলায় অংশগ্রহণকারী পাঁচ জঙ্গিও বাড়ি ছেড়ে দেশের ভেতরেই নিখোঁজ ছিলেন। এরপরই মূলত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী নিখোঁজ ব্যক্তিদের খোঁজ শুরু করে। পুলিশ সদর দপ্তর বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে দীর্ঘদিন ধরে অনুপস্থিত ছাত্রদের তালিকা চেয়ে পাঠায়।

হলি আর্টিজানে হামলার ১৮ দিনের মাথায় র‍্যাব ২৬২ জনের নিখোঁজ তালিকা প্রকাশ করে। ওই তালিকায় অবশ্য ত্রুটি ছিল। এ নিয়ে গণমাধ্যমে খবর প্রকাশের পর ওই বছরের ২৫ জুলাই দ্বিতীয় দফা ও ৯ আগস্ট তৃতীয় দফা সংশোধিত তালিকা প্রকাশ করে র‍্যাব। সর্বশেষ তালিকায় ৭০ জনের নাম ছিল। যাঁদের মধ্যে সাগরপথে মানব পাচারের শিকার হওয়া ব্যক্তি এবং পরিবারের ওপর রাগ করে বাড়ি ছেড়ে যাওয়া ব্যক্তিদের নামও ছিল।

পরে অনুসন্ধানে দেখা যায়, সর্বশেষ নিখোঁজ তালিকার ৭০ জনের মধ্যে ২৫ জনের বিরুদ্ধে জঙ্গি তৎপরতায় যুক্ত থাকার অভিযোগ পাওয়া গেছে। তাঁদের মধ্যে দুজন গত বছরের ২৭ আগস্ট জঙ্গি আস্তানায় পুলিশের অভিযানে নিহত হন। তাঁরা হলেন নব্য জেএমবির শীর্ষ নেতা তামিম চৌধুরী ও তাঁর সহযোগী তাওসিফ হোসেন।

র‍্যাবের তালিকার ১৭ জন এখন দেশের বাইরে রয়েছেন বলে জানা গেছে। তাঁদের মধ্যে ১০ জনের নাম ও ছবি হলি আর্টিজানে হামলার পর গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়।

র‍্যাবের তালিকায় থাকা আরও ছয়জনের জঙ্গিবাদে জড়িয়ে বাড়ি ছাড়ার তথ্য পাওয়া গেছে। তাঁরা হলেন ঢাকার লালবাগের সাদমান হোসেন (পাপন), ঢাকা কলেজের পদার্থবিজ্ঞানে স্নাতক দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র আকরাম হোসেন, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের ছাত্র মো. শরিফুল ইসলাম, মো. বাশারুজ্জামান ওরফে চকলেট এবং সিলেটের কানাইঘাট উপজেলার ঝিঙ্গাবাড়ি গ্রামের কলেজছাত্র তাজুল ইসলাম চৌধুরী ও নকতিপাড়া গ্রামের হোসেন আহমদ। তাঁদের মধ্যে বাশারুজ্জামান নব্য জেএমবির গুরুত্বপূর্ণ নেতা বলে জানিয়েছে পুলিশ। তাঁর স্ত্রী শায়লা আফরিন (২৩) গত বছরের ১০ সেপ্টেম্বর ঢাকার আজিমপুরে এক জঙ্গি আস্তানা থেকে গ্রেপ্তার হন।

র‍্যাবের তালিকার বাইরে আরও ১৮ জনের নাম পাওয়া গেছে, যাঁরা জঙ্গি তৎপরতায় যুক্ত হয়ে হলি আর্টিজানে হামলার আগে-পরে নিখোঁজ হয়েছেন বা বাড়ি ছেড়েছেন।

জাপানে পড়তে গিয়ে নিখোঁজ

র‍্যাবের সর্বশেষ নিখোঁজ তালিকার ১ নম্বরে রয়েছেন মহিবুর রহমান। তিনি সিলেট ক্যাডেট কলেজ থেকে ২০০৪ সালে উচ্চমাধ্যমিক পাস করেন। পরে সেনাবাহিনীতে যোগ দেন। প্যারা কমান্ডোর প্রশিক্ষণ পাওয়া এই কর্মকর্তা ক্যাপ্টেন পদে থাকা অবস্থায় স্বেচ্ছায় অবসর নেন। তিনি ২০১৩ সালের আগস্টে উচ্চশিক্ষার জন্য জাপান যান।

মহিবুরের বাবা আবদুস ছোবাহানও অবসরপ্রাপ্ত সেনাসদস্য। তিনি গত বছরের ২৫ জুলাই ছেলের নিখোঁজের ঘটনায় গাজীপুরের জয়দেবপুর থানায় সাধারণ ডায়েরি করেন। গাজীপুর চৌরাস্তার কাছেই মহিবুরের বাসা। তিনতলা বাসাটির নিচতলায় বিভিন্ন দোকানপাট। দোতলায় থাকে তাঁর পরিবার। গত ১৪ মে সেখানে মহিবুরের বাবা, মা ও বড় ভাইয়ের সঙ্গে এ প্রতিবেদকের কথা হয়।

আবদুস ছোবাহান বলেন, মহিবুর সেনাবাহিনীতে থাকা অবস্থায় বিয়ে করেন। স্ত্রী যুক্তরাজ্যপ্রবাসী। জাপান যাওয়ার আনুমানিক ছয় মাস পর স্ত্রীকেও নিয়ে যান ওই দেশে। ছয় মাস পর সন্তান প্রসবের জন্য স্ত্রীকে যুক্তরাজ্যে পাঠিয়ে দেন।

মহিবুরের বড় ভাই মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, জাপানে যাওয়ার পর কিছুদিন মায়ের সঙ্গে যোগাযোগ রেখেছিলেন। কিন্তু একসময় তা-ও বাদ দিয়ে দেন। এখন মহিবুর কোথায় আছেন, কেমন আছেন, সে বিষয়ে তাঁরা কিছুই জানেন না।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীসহ সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র থেকে জানা যায়, আগে থেকে জাপানে থাকা বাংলাদেশি সাইফুল্লাহ ওজাকির মাধ্যমে মহিবুর জাপানে পড়াশোনা করতে যান। সিলেট ক্যাডেট কলেজের প্রাক্তন ছাত্র ওজাকি জাপানের রিসুমেকান ইউনিভার্সিটির আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ছিলেন। ওজাকিও তাঁর জাপানি স্ত্রী ও বাচ্চাদের নিয়ে সিরিয়া চলে যান বলে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে খবর বের হয়েছে। তাঁর হাত ধরে সিরিয়ায় গিয়ে আবার ফিরে এসেছেন ফৌজদারহাট ক্যাডেট কলেজের প্রাক্তন ছাত্র ও ডেসকোর প্রকৌশলী গাজী কামরুস সালাম সোহান। তিনি এখন কারাগারে আছেন। সোহান গ্রেপ্তারের পর যে জবানবন্দি দিয়েছেন, তাতে তিনি ওজাকির আইএস-সম্পৃক্ততার কথা বলেছেন।

ওজাকি ও দেলোয়ার একই গ্রামের

ওজাকির মাধ্যমে জাপানে গিয়েছিলেন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগর উপজেলার কড়ইবাড়ি গ্রামের দেলোয়ার হোসেন। সাইফুল্লাহ ওজাকির বাড়িও একই গ্রামে। দেলোয়ার গত ২৩ এপ্রিল জাপান থেকে দেশে ফেরেন। হজরত শাহজালাল বিমানবন্দরে নামার পর থেকে তিনি নিখোঁজ। পরদিন তাঁর বাবা মো. আবদুর রউফ বিমানবন্দর থানায় নিখোঁজ হওয়ার বিষয়ে সাধারণ ডায়েরি করেন।

আবদুর রউফ আওয়ামী লীগের নবীনগর থানা কমিটির সদস্য ও জিনদপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান। তিনি গত বুধবার প্রথম আলোকে বলেন, তাঁর ছেলে ২০০৬ সালে জাপানে বৃত্তি পেয়ে পড়তে যান। ওজাকি ও দেলোয়ার পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তেন, থাকতেনও পাশাপাশি কক্ষে। ২০১০ সালে পড়াশোনা শেষ হওয়ার পর দেলোয়ার একটি মোটর কোম্পানিতে চাকরি নিয়ে জাপানের অন্য প্রদেশে চলে যান।

আবদুর রউফের ধারণা, ওজাকির সঙ্গে পরিচয় ও যোগাযোগ থাকায় তাঁর ছেলেকে কোনো গোয়েন্দা সংস্থা ধরে নিয়ে গেছে।

দেশের বাইরে আরও যাঁরা

সংগীতশিল্পী তাহমিদ রহমান সাফি ও তাঁর স্ত্রী সায়মা খান ২০১৫ সালের ২৩ এপ্রিল মালয়েশিয়ায় যান। সেখান থেকে মাস তিনেক পর এই দম্পতি সিরিয়ার আইএস-অধ্যুষিত এলাকায় চলে যান বলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সূত্রে জানা গেছে। এর আগে ২০১৪ সালের ডিসেম্বরে দেশ ছাড়েন ছেলে ডা. আরাফাত হোসেন (তুষার)। হলি আর্টিজানে হামলার পাঁচ দিন পর এক ভিডিও বার্তায় হামলাকারী জঙ্গিদের অভিনন্দন জানান এই তাহমিদ ও আরাফাত। ওই ভিডিওটি সিরিয়ার রাকায় ধারণ করা হয়েছিল বলে পরে খবর বের হয়।

রাজশাহী ক্যাডেট কলেজের প্রাক্তন ছাত্র ও মেরিন ইঞ্জিনিয়ার নজিবুল্লাহ আনসারী প্রায় আড়াই বছর ধরে নিখোঁজ। নজিবুল্লাহ মালয়েশিয়া মেরিন একাডেমি থেকে পাস করেছিলেন। এরপর আমেরিকায় প্রশিক্ষণ নিয়ে সমুদ্রগামী জাহাজে চাকরি নিয়েছিলেন।

তাঁর বাবা নৌবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত সদস্য রফিকুল্লাহ আনসারী গত বছরের ১০ জুলাই চট্টগ্রাম ইপিজেড থানায় জিডি করেন। তাতে বলা হয়, গত বছরের জানুয়ারিতে নজিবুল্লাহ তাঁর ভাইকে ফেসবুকের ম্যাসেঞ্জারে লেখেন যে, তিনি আইএসে যোগ দিয়ে ইরাকে চলে গেছে। আর ফিরবেন না।

 ২০১৫ সালের জুন থেকে শিশু বিশেষজ্ঞ ডা. রোকনুদ্দীন খন্দকার, তাঁর স্ত্রী নাঈমা আক্তার, দুই মেয়ে রেজওয়ানা রোকন ও রমিতা রোকন এবং এক মেয়ের স্বামী সাদ কায়েস নিখোঁজ।

রোকনুদ্দীনের বড় ভাই হাফিজ উদ্দীন প্রথম আলোকে বলেন, ‘দেশ ছেড়ে যাওয়ার পর অনেক আগে যোগাযোগ হয়েছিল। কখনো ইন্টারনেটে যোগাযোগ করত, আবার কখনো এমন নম্বর থেকে ফোন করত যেখানে পরে ফোন করলে কেউ ধরত না। ওরা কোথায় আছে, কীভাবে আছে, সে সম্পর্কে কোনো ধারণা নেই।’

লক্ষ্মীপুরের এ টি এম তাজউদ্দীন ছিলেন অস্ট্রেলিয়ায়। সেখান থেকে তিনি সিরিয়া গেছেন বলে অস্ট্রেলিয়ার গণমাধ্যমে খবর বের হয়।

বগুড়ার ধনাঢ্য ব্যবসায়ীর লন্ডনফেরত ব্যারিস্টার ছেলে এ কে এম তাকিউর রহমান, তাঁর স্ত্রী রিদিতা রাহেলা দেড় বছরের শিশুসন্তান নিয়ে সিরিয়া চলে গেছেন বলে ধারণা করছে পুলিশ।

কেবল আইএস মতাদর্শীরাই নয়, এ দেশে আল-কায়েদা মতাদর্শ অনুসরণকারী আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের সদস্য জুন্নুন শিকদারও মালয়েশিয়া হয়ে সিরিয়া গেছেন বলে জানা গেছে।

নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সৈয়দ মো. গালিব ও তাঁর ভাই স্কলাস্টিকা স্কুলের শিক্ষক সৈয়দ মো. রাজীব, সৌদিপ্রবাসী ইব্রাহীম হাসান খান ও ভাই জুনায়েদ হাসান খান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার সায়েন্স বিভাগ থেকে পাস করা রিদওয়ান ইসলাম (তুহিন) ও আশুলিয়ার আবদুর রহমান মাসুদও দেশ ছেড়েছেন বলে জানা গেছে।

ঢাকার কাঁঠালবাগানের মাইনউদ্দীন শরীফ, তাঁর স্ত্রী তানিয়া শরীফ, মা পান্না শরীফ ও ভাই রেজওয়ান শরীফ মালয়েশিয়ার উদ্দেশে ঢাকা ছাড়েন। এখন তাঁরা কোথায় আছেন জানা যায়নি। মাইনউদ্দীন ও রেজওয়ান ২০১০ সালে ইয়েমেনে আল-কায়েদাবিরোধী অভিযানে গ্রেপ্তার হন। পরে তাঁদের দেশে ফেরত পাঠানো হয়। এরপর দীর্ঘদিন গোয়েন্দা নজরদারিতে ছিলেন দুই ভাই।

আরও যাঁরা নিখোঁজ

এছাড়া আরও নিখোঁজ রয়েছেন ব্যান্ডশিল্পী জুবায়েদুর রহিম, গোপালগঞ্জের সায়মা আক্তার (মুক্তা), ঢাকার পান্থপথের আশরাফ মোহাম্মদ ইসলাম, চট্টগ্রাম আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সাব্বিরুল হক চৌধুরী (কনিক), দিনাজপুরের নবাবগঞ্জ উপজেলার বল্লভপুরের আবদুস সামাদ ও আবদুল বারিক, চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ের রুবেল ও ইমরানুল ইসলাম, চন্দনাইশের জসিম, চিটাগাং গ্রামার স্কুলের ছাত্র সাঈদ আনোয়ার খান। তাঁরাসহ ১৩ জন দেশের ভেতরেই আছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।

জানতে চাইলে পুলিশের কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ইউনিটের প্রধান মনিরুল ইসলাম গত রোববার প্রথম আলোকে বলেন, জঙ্গিবাদে উদ্বুদ্ধ হয়ে এই সময়ে ১০-১২ জন কথিত হিজরতে (বাড়ি ছেড়ে অন্যত্র যাওয়া) রয়েছেন। আর আগে যাঁরা নিখোঁজ হয়েছিলেন, তাঁদের একটি অংশ সিরিয়ায় গেছে। তিনি বলেন, আগে যাঁরা নিখোঁজ ছিলেন তাঁদের অনেকেই পুলিশের অভিযানে এরই মধ্যে নিহত হয়েছেন। নিহত অনেকের পরিচয় এখনো জানা যায়নি। তাই নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না কারা কারা এখনো নিখোঁজ রয়েছেন।

হলি আর্টিজানে হামলার পর র‍্যাব ও পুলিশের জঙ্গিবিরোধী ১৭টি অভিযানে পাঁচ নারীসহ ৫৯ জন সন্দেহভাজন জঙ্গি ও ৬টি শিশু নিহত হয়েছে। এর মধ্যে ১৫ জনের পরিচয় পাওয়া যায়নি। যাঁদের পরিচয় পাওয়া গেছে, তাঁরা সবাই বাড়ি ছেড়ে নিখোঁজ ছিলেন।

জানতে চাইলে নিরাপত্তা বিশ্লেষক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, নিখোঁজ বিষয়টাই এখন একটা রহস্যজনক বিষয়। কখনো দেখা যাচ্ছে নিখোঁজের কয়েক মাস পর ফিরে আসছে। কখনো দেখা যাচ্ছে গ্রেপ্তারের পর বা অভিযানে নিহত হওয়ার পর পরিবার বলছে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পরিচয়ে তাঁকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। তাই নিখোঁজ ব্যক্তিরা আসলে সংখ্যায় কত বা তাঁরা কোথায়, সেটা নিশ্চিত করে বলা মুশকিল। তিনি বলেন, জঙ্গিবাদের সংশ্লিষ্টতায় যুবকদের নিখোঁজ হওয়ার বিষয়টি উদ্বেগজনক। যাঁরা নিখোঁজ রয়েছেন, তাঁরা প্রত্যেকেই হুমকি। বিষয়টিতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে অত্যন্ত সচেতন থাকতে হবে।

Comments

Comments!

 জঙ্গি তৎপরতা : এখনো নিখোঁজ ৪২AmarbangladeshonlineAmarbangladeshonline | Amarbangladeshonline

জঙ্গি তৎপরতা : এখনো নিখোঁজ ৪২

Tuesday, June 6, 2017 9:10 am
4

সেনাবাহিনীর সাবেক কর্মকর্তা মোহাম্মদ মহিবুর রহমান নিখোঁজ এক বছরের বেশি সময় ধরে। সাবেক এক সচিবের ছেলে সাইমুন হাছিবেরও (মোনাজ) সন্ধান নেই আড়াই বছরের বেশি সময়। মেরিন ইঞ্জিনিয়ার নজিবুল্লাহ আনসারীরও কোনো হদিস নেই। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও পারিবারিক সূত্র বলছে, তাঁরা আইএসে (ইসলামিক স্টেট) যোগ দিয়ে সিরিয়া বা ইরাকে চলে গেছেন।

প্রথম আলোর অনুসন্ধান ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, কথিত হিজরতের নামে ঘর ছেড়েছেন এমন অন্তত ৪২ জন এখনো নিখোঁজ রয়েছেন। অন্তত ৩৩ জন জঙ্গিবাদে জড়িয়ে গত তিন বছরে দেশ ছেড়েছেন, যাঁদের মধ্যে ২৩ জন সিরিয়া বা ইরাকে গেছেন। চারজন সেখানে নিহত হয়েছেন। মৃত্যুসংবাদসহ তাঁদের ছবি আইএস বিভিন্ন সময়ে প্রকাশও করেছে। চারজন মালয়েশিয়ার উদ্দেশে ঢাকা ছাড়ার পর নিখোঁজ, যাঁদের বিরুদ্ধে আল-কায়েদাসংশ্লিষ্টতার অভিযোগ আছে। আরও ছয়জনের দেশ ছাড়ার খবর পাওয়া গেছে। তাঁরা ঠিক কোন দেশে গেছেন, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

এর বাইরে কথিত হিজরতের নামে অনেক তরুণ ঘর ছেড়ে দেশের ভেতরেই জঙ্গি তৎপরতায় যুক্ত হয়েছেন। এমন অন্তত ১৩ জনের এখনো নিখোঁজ থাকার খবর পাওয়া গেছে।

গত বছরের ১ জুলাই গুলশানের হলি আর্টিজান রেস্তোরাঁয় জঙ্গি হামলার পর নিখোঁজ ব্যক্তিদের বিষয়টি জানাজানি হয়। ওই হামলায় অংশগ্রহণকারী পাঁচ জঙ্গিও বাড়ি ছেড়ে দেশের ভেতরেই নিখোঁজ ছিলেন। এরপরই মূলত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী নিখোঁজ ব্যক্তিদের খোঁজ শুরু করে। পুলিশ সদর দপ্তর বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে দীর্ঘদিন ধরে অনুপস্থিত ছাত্রদের তালিকা চেয়ে পাঠায়।

হলি আর্টিজানে হামলার ১৮ দিনের মাথায় র‍্যাব ২৬২ জনের নিখোঁজ তালিকা প্রকাশ করে। ওই তালিকায় অবশ্য ত্রুটি ছিল। এ নিয়ে গণমাধ্যমে খবর প্রকাশের পর ওই বছরের ২৫ জুলাই দ্বিতীয় দফা ও ৯ আগস্ট তৃতীয় দফা সংশোধিত তালিকা প্রকাশ করে র‍্যাব। সর্বশেষ তালিকায় ৭০ জনের নাম ছিল। যাঁদের মধ্যে সাগরপথে মানব পাচারের শিকার হওয়া ব্যক্তি এবং পরিবারের ওপর রাগ করে বাড়ি ছেড়ে যাওয়া ব্যক্তিদের নামও ছিল।

পরে অনুসন্ধানে দেখা যায়, সর্বশেষ নিখোঁজ তালিকার ৭০ জনের মধ্যে ২৫ জনের বিরুদ্ধে জঙ্গি তৎপরতায় যুক্ত থাকার অভিযোগ পাওয়া গেছে। তাঁদের মধ্যে দুজন গত বছরের ২৭ আগস্ট জঙ্গি আস্তানায় পুলিশের অভিযানে নিহত হন। তাঁরা হলেন নব্য জেএমবির শীর্ষ নেতা তামিম চৌধুরী ও তাঁর সহযোগী তাওসিফ হোসেন।

র‍্যাবের তালিকার ১৭ জন এখন দেশের বাইরে রয়েছেন বলে জানা গেছে। তাঁদের মধ্যে ১০ জনের নাম ও ছবি হলি আর্টিজানে হামলার পর গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়।

র‍্যাবের তালিকায় থাকা আরও ছয়জনের জঙ্গিবাদে জড়িয়ে বাড়ি ছাড়ার তথ্য পাওয়া গেছে। তাঁরা হলেন ঢাকার লালবাগের সাদমান হোসেন (পাপন), ঢাকা কলেজের পদার্থবিজ্ঞানে স্নাতক দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র আকরাম হোসেন, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের ছাত্র মো. শরিফুল ইসলাম, মো. বাশারুজ্জামান ওরফে চকলেট এবং সিলেটের কানাইঘাট উপজেলার ঝিঙ্গাবাড়ি গ্রামের কলেজছাত্র তাজুল ইসলাম চৌধুরী ও নকতিপাড়া গ্রামের হোসেন আহমদ। তাঁদের মধ্যে বাশারুজ্জামান নব্য জেএমবির গুরুত্বপূর্ণ নেতা বলে জানিয়েছে পুলিশ। তাঁর স্ত্রী শায়লা আফরিন (২৩) গত বছরের ১০ সেপ্টেম্বর ঢাকার আজিমপুরে এক জঙ্গি আস্তানা থেকে গ্রেপ্তার হন।

র‍্যাবের তালিকার বাইরে আরও ১৮ জনের নাম পাওয়া গেছে, যাঁরা জঙ্গি তৎপরতায় যুক্ত হয়ে হলি আর্টিজানে হামলার আগে-পরে নিখোঁজ হয়েছেন বা বাড়ি ছেড়েছেন।

জাপানে পড়তে গিয়ে নিখোঁজ

র‍্যাবের সর্বশেষ নিখোঁজ তালিকার ১ নম্বরে রয়েছেন মহিবুর রহমান। তিনি সিলেট ক্যাডেট কলেজ থেকে ২০০৪ সালে উচ্চমাধ্যমিক পাস করেন। পরে সেনাবাহিনীতে যোগ দেন। প্যারা কমান্ডোর প্রশিক্ষণ পাওয়া এই কর্মকর্তা ক্যাপ্টেন পদে থাকা অবস্থায় স্বেচ্ছায় অবসর নেন। তিনি ২০১৩ সালের আগস্টে উচ্চশিক্ষার জন্য জাপান যান।

মহিবুরের বাবা আবদুস ছোবাহানও অবসরপ্রাপ্ত সেনাসদস্য। তিনি গত বছরের ২৫ জুলাই ছেলের নিখোঁজের ঘটনায় গাজীপুরের জয়দেবপুর থানায় সাধারণ ডায়েরি করেন। গাজীপুর চৌরাস্তার কাছেই মহিবুরের বাসা। তিনতলা বাসাটির নিচতলায় বিভিন্ন দোকানপাট। দোতলায় থাকে তাঁর পরিবার। গত ১৪ মে সেখানে মহিবুরের বাবা, মা ও বড় ভাইয়ের সঙ্গে এ প্রতিবেদকের কথা হয়।

আবদুস ছোবাহান বলেন, মহিবুর সেনাবাহিনীতে থাকা অবস্থায় বিয়ে করেন। স্ত্রী যুক্তরাজ্যপ্রবাসী। জাপান যাওয়ার আনুমানিক ছয় মাস পর স্ত্রীকেও নিয়ে যান ওই দেশে। ছয় মাস পর সন্তান প্রসবের জন্য স্ত্রীকে যুক্তরাজ্যে পাঠিয়ে দেন।

মহিবুরের বড় ভাই মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, জাপানে যাওয়ার পর কিছুদিন মায়ের সঙ্গে যোগাযোগ রেখেছিলেন। কিন্তু একসময় তা-ও বাদ দিয়ে দেন। এখন মহিবুর কোথায় আছেন, কেমন আছেন, সে বিষয়ে তাঁরা কিছুই জানেন না।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীসহ সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র থেকে জানা যায়, আগে থেকে জাপানে থাকা বাংলাদেশি সাইফুল্লাহ ওজাকির মাধ্যমে মহিবুর জাপানে পড়াশোনা করতে যান। সিলেট ক্যাডেট কলেজের প্রাক্তন ছাত্র ওজাকি জাপানের রিসুমেকান ইউনিভার্সিটির আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ছিলেন। ওজাকিও তাঁর জাপানি স্ত্রী ও বাচ্চাদের নিয়ে সিরিয়া চলে যান বলে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে খবর বের হয়েছে। তাঁর হাত ধরে সিরিয়ায় গিয়ে আবার ফিরে এসেছেন ফৌজদারহাট ক্যাডেট কলেজের প্রাক্তন ছাত্র ও ডেসকোর প্রকৌশলী গাজী কামরুস সালাম সোহান। তিনি এখন কারাগারে আছেন। সোহান গ্রেপ্তারের পর যে জবানবন্দি দিয়েছেন, তাতে তিনি ওজাকির আইএস-সম্পৃক্ততার কথা বলেছেন।

ওজাকি ও দেলোয়ার একই গ্রামের

ওজাকির মাধ্যমে জাপানে গিয়েছিলেন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগর উপজেলার কড়ইবাড়ি গ্রামের দেলোয়ার হোসেন। সাইফুল্লাহ ওজাকির বাড়িও একই গ্রামে। দেলোয়ার গত ২৩ এপ্রিল জাপান থেকে দেশে ফেরেন। হজরত শাহজালাল বিমানবন্দরে নামার পর থেকে তিনি নিখোঁজ। পরদিন তাঁর বাবা মো. আবদুর রউফ বিমানবন্দর থানায় নিখোঁজ হওয়ার বিষয়ে সাধারণ ডায়েরি করেন।

আবদুর রউফ আওয়ামী লীগের নবীনগর থানা কমিটির সদস্য ও জিনদপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান। তিনি গত বুধবার প্রথম আলোকে বলেন, তাঁর ছেলে ২০০৬ সালে জাপানে বৃত্তি পেয়ে পড়তে যান। ওজাকি ও দেলোয়ার পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তেন, থাকতেনও পাশাপাশি কক্ষে। ২০১০ সালে পড়াশোনা শেষ হওয়ার পর দেলোয়ার একটি মোটর কোম্পানিতে চাকরি নিয়ে জাপানের অন্য প্রদেশে চলে যান।

আবদুর রউফের ধারণা, ওজাকির সঙ্গে পরিচয় ও যোগাযোগ থাকায় তাঁর ছেলেকে কোনো গোয়েন্দা সংস্থা ধরে নিয়ে গেছে।

দেশের বাইরে আরও যাঁরা

সংগীতশিল্পী তাহমিদ রহমান সাফি ও তাঁর স্ত্রী সায়মা খান ২০১৫ সালের ২৩ এপ্রিল মালয়েশিয়ায় যান। সেখান থেকে মাস তিনেক পর এই দম্পতি সিরিয়ার আইএস-অধ্যুষিত এলাকায় চলে যান বলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সূত্রে জানা গেছে। এর আগে ২০১৪ সালের ডিসেম্বরে দেশ ছাড়েন ছেলে ডা. আরাফাত হোসেন (তুষার)। হলি আর্টিজানে হামলার পাঁচ দিন পর এক ভিডিও বার্তায় হামলাকারী জঙ্গিদের অভিনন্দন জানান এই তাহমিদ ও আরাফাত। ওই ভিডিওটি সিরিয়ার রাকায় ধারণ করা হয়েছিল বলে পরে খবর বের হয়।

রাজশাহী ক্যাডেট কলেজের প্রাক্তন ছাত্র ও মেরিন ইঞ্জিনিয়ার নজিবুল্লাহ আনসারী প্রায় আড়াই বছর ধরে নিখোঁজ। নজিবুল্লাহ মালয়েশিয়া মেরিন একাডেমি থেকে পাস করেছিলেন। এরপর আমেরিকায় প্রশিক্ষণ নিয়ে সমুদ্রগামী জাহাজে চাকরি নিয়েছিলেন।

তাঁর বাবা নৌবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত সদস্য রফিকুল্লাহ আনসারী গত বছরের ১০ জুলাই চট্টগ্রাম ইপিজেড থানায় জিডি করেন। তাতে বলা হয়, গত বছরের জানুয়ারিতে নজিবুল্লাহ তাঁর ভাইকে ফেসবুকের ম্যাসেঞ্জারে লেখেন যে, তিনি আইএসে যোগ দিয়ে ইরাকে চলে গেছে। আর ফিরবেন না।

 ২০১৫ সালের জুন থেকে শিশু বিশেষজ্ঞ ডা. রোকনুদ্দীন খন্দকার, তাঁর স্ত্রী নাঈমা আক্তার, দুই মেয়ে রেজওয়ানা রোকন ও রমিতা রোকন এবং এক মেয়ের স্বামী সাদ কায়েস নিখোঁজ।

রোকনুদ্দীনের বড় ভাই হাফিজ উদ্দীন প্রথম আলোকে বলেন, ‘দেশ ছেড়ে যাওয়ার পর অনেক আগে যোগাযোগ হয়েছিল। কখনো ইন্টারনেটে যোগাযোগ করত, আবার কখনো এমন নম্বর থেকে ফোন করত যেখানে পরে ফোন করলে কেউ ধরত না। ওরা কোথায় আছে, কীভাবে আছে, সে সম্পর্কে কোনো ধারণা নেই।’

লক্ষ্মীপুরের এ টি এম তাজউদ্দীন ছিলেন অস্ট্রেলিয়ায়। সেখান থেকে তিনি সিরিয়া গেছেন বলে অস্ট্রেলিয়ার গণমাধ্যমে খবর বের হয়।

বগুড়ার ধনাঢ্য ব্যবসায়ীর লন্ডনফেরত ব্যারিস্টার ছেলে এ কে এম তাকিউর রহমান, তাঁর স্ত্রী রিদিতা রাহেলা দেড় বছরের শিশুসন্তান নিয়ে সিরিয়া চলে গেছেন বলে ধারণা করছে পুলিশ।

কেবল আইএস মতাদর্শীরাই নয়, এ দেশে আল-কায়েদা মতাদর্শ অনুসরণকারী আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের সদস্য জুন্নুন শিকদারও মালয়েশিয়া হয়ে সিরিয়া গেছেন বলে জানা গেছে।

নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সৈয়দ মো. গালিব ও তাঁর ভাই স্কলাস্টিকা স্কুলের শিক্ষক সৈয়দ মো. রাজীব, সৌদিপ্রবাসী ইব্রাহীম হাসান খান ও ভাই জুনায়েদ হাসান খান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার সায়েন্স বিভাগ থেকে পাস করা রিদওয়ান ইসলাম (তুহিন) ও আশুলিয়ার আবদুর রহমান মাসুদও দেশ ছেড়েছেন বলে জানা গেছে।

ঢাকার কাঁঠালবাগানের মাইনউদ্দীন শরীফ, তাঁর স্ত্রী তানিয়া শরীফ, মা পান্না শরীফ ও ভাই রেজওয়ান শরীফ মালয়েশিয়ার উদ্দেশে ঢাকা ছাড়েন। এখন তাঁরা কোথায় আছেন জানা যায়নি। মাইনউদ্দীন ও রেজওয়ান ২০১০ সালে ইয়েমেনে আল-কায়েদাবিরোধী অভিযানে গ্রেপ্তার হন। পরে তাঁদের দেশে ফেরত পাঠানো হয়। এরপর দীর্ঘদিন গোয়েন্দা নজরদারিতে ছিলেন দুই ভাই।

আরও যাঁরা নিখোঁজ

এছাড়া আরও নিখোঁজ রয়েছেন ব্যান্ডশিল্পী জুবায়েদুর রহিম, গোপালগঞ্জের সায়মা আক্তার (মুক্তা), ঢাকার পান্থপথের আশরাফ মোহাম্মদ ইসলাম, চট্টগ্রাম আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সাব্বিরুল হক চৌধুরী (কনিক), দিনাজপুরের নবাবগঞ্জ উপজেলার বল্লভপুরের আবদুস সামাদ ও আবদুল বারিক, চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ের রুবেল ও ইমরানুল ইসলাম, চন্দনাইশের জসিম, চিটাগাং গ্রামার স্কুলের ছাত্র সাঈদ আনোয়ার খান। তাঁরাসহ ১৩ জন দেশের ভেতরেই আছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।

জানতে চাইলে পুলিশের কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ইউনিটের প্রধান মনিরুল ইসলাম গত রোববার প্রথম আলোকে বলেন, জঙ্গিবাদে উদ্বুদ্ধ হয়ে এই সময়ে ১০-১২ জন কথিত হিজরতে (বাড়ি ছেড়ে অন্যত্র যাওয়া) রয়েছেন। আর আগে যাঁরা নিখোঁজ হয়েছিলেন, তাঁদের একটি অংশ সিরিয়ায় গেছে। তিনি বলেন, আগে যাঁরা নিখোঁজ ছিলেন তাঁদের অনেকেই পুলিশের অভিযানে এরই মধ্যে নিহত হয়েছেন। নিহত অনেকের পরিচয় এখনো জানা যায়নি। তাই নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না কারা কারা এখনো নিখোঁজ রয়েছেন।

হলি আর্টিজানে হামলার পর র‍্যাব ও পুলিশের জঙ্গিবিরোধী ১৭টি অভিযানে পাঁচ নারীসহ ৫৯ জন সন্দেহভাজন জঙ্গি ও ৬টি শিশু নিহত হয়েছে। এর মধ্যে ১৫ জনের পরিচয় পাওয়া যায়নি। যাঁদের পরিচয় পাওয়া গেছে, তাঁরা সবাই বাড়ি ছেড়ে নিখোঁজ ছিলেন।

জানতে চাইলে নিরাপত্তা বিশ্লেষক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, নিখোঁজ বিষয়টাই এখন একটা রহস্যজনক বিষয়। কখনো দেখা যাচ্ছে নিখোঁজের কয়েক মাস পর ফিরে আসছে। কখনো দেখা যাচ্ছে গ্রেপ্তারের পর বা অভিযানে নিহত হওয়ার পর পরিবার বলছে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পরিচয়ে তাঁকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। তাই নিখোঁজ ব্যক্তিরা আসলে সংখ্যায় কত বা তাঁরা কোথায়, সেটা নিশ্চিত করে বলা মুশকিল। তিনি বলেন, জঙ্গিবাদের সংশ্লিষ্টতায় যুবকদের নিখোঁজ হওয়ার বিষয়টি উদ্বেগজনক। যাঁরা নিখোঁজ রয়েছেন, তাঁরা প্রত্যেকেই হুমকি। বিষয়টিতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে অত্যন্ত সচেতন থাকতে হবে।

Comments

comments

সম্পাদক : মোহাম্মদ আবদুল বাছির
প্রকাশক: মোহাম্মদ জহিরুল ইসলাম
ফোন : ‎০১৭১৩৪০৯০৯০
৩৪৫/১, দিলু রোড, নিউ ইস্কাটন, ঢাকা-১০০০
X
 
নিয়মিত খবর পড়তে আমাদের ফেসবুক পেজে লাইক দিয়ে যুক্ত থাকুন
X