মঙ্গলবার, ২০শে ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ ইং, ৮ই ফাল্গুন, ১৪২৪ বঙ্গাব্দ, দুপুর ১:৩৫
শিরোনাম
  • ঘৃণাকে বিজয়ী হতে দেয়া যাবে না, ট্রাম্পকে ইঙ্গিত করে জর্জ ক্লুনি
  • আমার একটাই চিন্তা দেশের মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন করা: প্রধানমন্ত্রী
  • ‘কেন্দ্রীয় সরকারের আগ্রাসী নীতির কারণে কাশ্মীরকে হারাতে হবে’
  • সাড়ে চারমাস পর মুখোমুখি, খাদিজাকে উদ্দেশ্য করে যা বলল বদরুল
  • খালেদার ‘সাজা’ বিরোধী নেতাকর্মীদের মনোবল ভাঙ্গার কৌশল!
  • বিএনপির কর্মসূচি ‘যথাসময়ে’ জানানো হবে: রিজভী
  • দলের জন্য বোলিং করতেও রাজি মুশফিক
  • শিশু জিহাদের মৃত্যু: চার জনের ১০ বছর করে কারাদণ্ড
  • অবশেষে বাড়ি অবরুদ্ধ করে রাখা সেই দেয়াল ভেঙ্গে ফেলা হচ্ছে
  • সাক্ষ্য দিলেন খাদিজা, চাইলেন বদরুলের সর্বোচ্চ শাস্তি
  • বদরুলের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিতে আদালতে খাদিজা
  • আজ বগুড়ায় যেসব প্রকল্প উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী
  • রোহিঙ্গা স্থানান্তরের সরকারি পরিকল্পনার সঙ্গে দ্বিমত মানবাধিকার কমিশনের
  • মহেশখালীতে ইয়াবা ব্যবসায়ীদের সঙ্গে পুলিশের ‘বন্দুকযুদ্ধ’
  • হোয়াইট হাউসে কাজ করার দীর্ঘ অভিজ্ঞতার কথা জানালেন এই বাংলাদেশি সাংবাদিক
Saturday, May 13, 2017 9:48 am
A- A A+ Print

জঙ্গি সাজ্জাদ সপরিবারে ছয় মাস নিরুদ্দেশ ছিল

11

রাজশাহীর গোদাগাড়ীতে জঙ্গি আস্তানায় অভিযানে নিহত জঙ্গি সাজ্জাদ আলী (৫০) সপরিবার ছয় মাস নিরুদ্দেশ ছিলেন। দেড় মাস আগে হঠাৎ এসে মায়ের হাত-পা ধরে কিছু জমি নেন। বাড়ি থেকে পৌনে এক কিলোমিটার দূরে গ্রামের শেষ মাথায় ওই কৃষিজমিতে বাড়ি করেন। বৃহস্পতিবার পুলিশের অভিযানের আগ পর্যন্ত গ্রামের কেউ টের পায়নি কাপড় ফেরিওয়ালা সাজ্জাদ পুরো পরিবারসহ জঙ্গিবাদে জড়িয়েছেন এবং বাড়িকে জঙ্গি আস্তানায় পরিণত করেছিলেন। সেখানে বিস্ফোরকের মজুত গড়ে তুলেছিলেন।

গোদাগাড়ী উপজেলা সদর থেকে ১২ কিলোমিটার দূরে বেনীপুর গ্রামের ধানখেতের মাঝে ওই বাড়িতে বৃহস্পতিবার সকালে অভিযান শুরু করে পুলিশ। অভিযানের নাম দেওয়া হয় ‘অপারশেন সান ডেভিল’। এই অভিযানের শুরুতে জঙ্গিরা ফায়ার সার্ভিসের এক সদস্যকে হত্যা করে। এরপর অভিযানে পাঁচজন নিহত হন। অক্ষত অবস্থায় সাজ্জাদ আলীর এক মেয়ে ও তাঁর দুই শিশুসন্তানকে উদ্ধার করে পুলিশ।

.

রাজশাহীর গোদাগাড়ীতে জঙ্গি আস্তানায় অভিযানের সময় জঙ্গিদের হামলায় আহত পুলিশ সদস্যকে উদ্ধার করে নিয়ে যাচ্ছেন তাঁর সহকর্মীরা l প্রথম আলোরাজশাহীর গোদাগাড়ীতে জঙ্গি আস্তানায় অভিযানের সময় জঙ্গিদের হামলায় আহত পুলিশ সদস্যকে উদ্ধার করে নিয়ে যাচ্ছেন তাঁর সহকর্মীরা l প্রথম আলোপুলিশ ও প্রত্যক্ষদর্শী ব্যক্তিরা জানিয়েছেন, গত বুধবার দিবাগত রাত একটার দিকে পুলিশ সাজ্জাদের বাড়ি ঘেরাও করে। বৃহস্পতিবার সকালে অভিযান শুরুর আগে ভোর থেকে হ্যান্ডমাইকে বাড়ির লোকদের আত্মসমর্পণের আহ্বান জানায় পুলিশ। এর আগে বুধবার চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে গ্রেপ্তার হওয়া কয়েক ব্যক্তির দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে রাজশাহীর গোদাগাড়ীর জঙ্গি আস্তানাটি শনাক্ত করা হয় বলে জানান চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার পুলিশ সুপার টি এম মোজাহিদুল ইসলাম।

গোদাগাড়ীতে অভিযানে নিহতদের মধ্যে চারজনই সাজ্জাদের পরিবারের সদস্য। তাঁরা হলেন সাজ্জাদ, তাঁর স্ত্রী বেলী আক্তার (৪৫), ছোট ছেলে আল আমিন (১৮) ও ছোট মেয়ে কারিমা খাতুন (১৭)। নিহত অপর ব্যক্তির নাম আশরাফুল (২২)। পুলিশ বলছে, আশরাফুলের বাড়ি চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর থানার দেবীনগর গ্রামে। তিনি বিএসসি ইঞ্জিনিয়ার ছিলেন। তিনি জঙ্গিগোষ্ঠীর সক্রিয় সদস্য। তিনি ওই জঙ্গি আস্তানায় ছিলেন।

নিহত ফায়ার সার্ভিস সদস্যের নাম আব্দুল মতিন (৪৫)। তাঁর বাড়ি গোদাগাড়ী উপজেলার মাটিকাটা গ্রামে। তিনি গোদাগাড়ী ফায়ার স্টেশনের একজন ফায়ারম্যান। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, অভিযানের প্রস্তুতিকালে সাজ্জাদ ও তাঁর স্ত্রী হঠাৎ বেরিয়ে এসে শাবল ও হাঁসুয়া দিয়ে মতিনের ওপর হামলা চালায়। উপস্থিত গণমাধ্যমকর্মীরা তা ভিডিওতে ধারণ করেন।

এ সময় পুলিশের চার সদস্য আহত হন। তাঁরা হলেন রাজশাহীর অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সুমিত চৌধুরী, গোদাগাড়ী থানার উপপরিদর্শক (এসআই) আহসান আলী, গোদাগাড়ী গোয়েন্দা পুলিশের এএসআই উৎপল কুমার ও জেলা পুলিশ লাইনসের কনস্টেবল তাইজুল ইসলাম। তাঁদের মধ্যে তাইজুলের অবস্থা গুরুতর। তিনিসহ তিনজন রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছেন। সুমিত চৌধুরী প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়েছেন।

বৃহস্পতিবার রাত পৌনে আটটায় অভিযান স্থগিত করা হয়। গতকাল শুক্রবার সকাল পৌনে নয়টায় আবার অভিযান শুরু হয়। বেলা ১টায় সমাপ্ত ঘোষণা করে পুলিশ জানায়, বাড়িতে চারটি কক্ষ রয়েছে। সেখানে থেকে ১১টি বোমা, ১টি পিস্তল ও ২টি ম্যাগাজিন, ২টি সুইসাইড ভেস্ট, গানপাউডার ও ২টি ‘জিহাদি বই’ উদ্ধার করা হয়েছে। পরে বোমাগুলো ধ্বংস করা হয়।

কে এই সাজ্জাদ

২৫-২৬ বছর আগে বিয়ে করে নিজ গ্রাম বেনীপুর ছেড়ে পাশেই মাছমারা গ্রামে শ্বশুরবাড়িতে থাকা শুরু করেন সাজ্জাদ। এলাকার লোকজন জানান, সাজ্জাদের শ্বশুর লুৎফর রহমান ইউনিয়ন জামায়াতের আমির ছিলেন। সাজ্জাদ আলীও জামায়াতের কর্মী ছিলেন। গত বছরের শেষ দিকে হঠাৎ করেই পরিবার নিয়ে নিরুদ্দেশ হন সাজ্জাদ। এর আগ পর্যন্ত তিনি মাছমারা গ্রামেই ছিলেন।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সাজ্জাদ আলীর দুই ছেলে ও দুই মেয়ে। বড় ছেলে মো. সোয়ায়েবকে (২২) নিয়ে বাইসাইকেলে করে এলাকায় ফেরি করে কাপড় বিক্রি করতেন তিনি।

পুলিশের অভিযানে জীবিত অবস্থায় উদ্ধার হওয়া সাজ্জাদের মেয়ে সুমাইয়া খাতুনের (২৫) স্বামী জহুরুল ইসলাম প্রায় ছয় মাস আগে নাশকতার মামলায় গ্রেপ্তার হন। পুলিশ বলছে, জহুরুল জেএমবির সদস্য।

সাজ্জাদের ছোট মেয়ে কারিমা খাতুনেরও বিয়ে হয়েছিল। বছরখানেক পর সংসার ভেঙে গেছে। তারপর থেকে সে বাবা-মায়ের কাছেই থাকত। ছোট ছেলে আল-আমিন চাঁপাইনবাবগঞ্জে একটি মাদ্রাসায় পড়তেন। ছয় বছর আগে তিনি মাদ্রাসা ছাড়েন।

সাজ্জাদ আলীর বাবা আব্দুল মতিন মারা গেছেন অনেক আগে। সাজ্জাদের দুই ভাই ও চার বোন। বেনীপুর গ্রামে পৈতৃক ভিটায় এখন মা মারজাহান বেওয়া ছোট ছেলে মুক্তার আলীর সঙ্গে থাকেন।

বৃহস্পতিবার ওই বাড়িতে গিয়ে সাজ্জাদের মা ও তাঁর ছোট ভাইয়ের স্ত্রী শামীমা বেগমের সঙ্গে এই প্রতিবেদকের কথা হয়। শামীমা বলেন, তাঁর ভাশুর সাজ্জাদ আলী পরিবারের কারও সঙ্গে যোগাযোগ রাখতেন না। বিয়ের পর শ্বশুরের বাড়ির পাশে গিয়ে বাড়ি করেছিলেন, সেখানেই ছিলেন।

শামীমা বলেন, সপরিবার ছয় মাস নিরুদ্দেশ থাকার পর সাজ্জাদ মাস দেড়েক আগে হঠাৎ বাড়িতে আসেন। মায়ের কাছে বাড়ি করার জন্য জায়গা দাবি করেন। মা মারজাহান প্রথমে রাজি না হলে তাঁর হাত-পা ধরে কান্নাকাটি শুরু করেন। পরে মারজাহান বেওয়া তাঁর একমাত্র সম্বল এক বিঘা কৃষিজমির একাংশে সাজ্জাদকে বাড়ি করার অনুমতি দেন। জমিটি বেনীপুর গ্রামের শেষ মাথায়। আশপাশে কোনো বাড়ি নেই।

সাজ্জাদের করা টিনের ছাউনির বাড়িটির এক পাশে মাটির দেয়াল, অন্য পাশে টিনের বেড়া। কোনো রাস্তা নেই, জমির আলপথে যাতায়াত করতেন। বাড়িটিতে কোনো নলকূপও নেই। প্রতিবেশীরা জানান, ওই বাড়ির পুরুষ অথবা মেয়েরা ভোরের দিকে গ্রামের ভেতর থেকে পানি নিয়ে যেতেন।

গত বৃহস্পতিবার মাছমারা গ্রামে সাজ্জাদের শ্বশুরবাড়িতে গিয়ে তাঁর শ্বশুর লুৎফর রহমানকে পাওয়া যায়নি। শাশুড়ি সকিনা বেগম প্রথম আলোকে বলেন, সাজ্জাদ সবার সঙ্গে ঝামেলায় জড়াতেন। সর্বশেষ গণ্ডগোল হওয়ার পরে শ্বশুরবাড়ি থেকে পরিবারের সবাইকে নিয়ে চলে যান। তারপর প্রায় ছয় মাস বাইরে ছিলেন।

বাইরে কোথায় ছিলেন জানতে চাইলে সকিনা বেগম বলেন, গোদাগাড়ী উপজেলা সদরে ছিলেন বলে শুনেছেন। সকিনা দাবি করেন, তাঁর স্বামী কোনো রাজনীতি করেন না। তাঁর জামাতা সাজ্জাদ হয়তো করতেন।

তবে মাটিকাটা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আলী আজম তৌহিদ প্রথম আলোকে বলেছেন, সাজ্জাদের শ্বশুর লুৎফর রহমান মাটিকাটা ইউনিয়ন জামায়াতের সাবেক আমির।

যেভাবে অভিযান শুরু

পুলিশ ও প্রত্যক্ষদর্শী ব্যক্তিরা জানিয়েছেন, গত বুধবার দিবাগত রাত একটার দিকে পুলিশ সাজ্জাদের বাড়ি ঘেরাও করে। বৃহস্পতিবার ভোর চারটার দিকে বাড়ির ভেতরে একটি বিস্ফোরণের শব্দ পাওয়া যায়। তারপর ভেতরে আর কোনো সাড়াশব্দ পাওয়া যায় না। ভোর পাঁচটার দিকে পুলিশ হ্যান্ডমাইকে বাড়ির লোকদের আত্মসমর্পণের আহ্বান জানাতে থাকে। ঘণ্টাখানেক পর আরেকটি বিস্ফোরণের শব্দ পাওয়া যায়। সকাল সাতটার দিকে ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা পানি দিয়ে বাড়ির মাটির দেয়াল ভেজাতে শুরু করেন। সকাল ৭টা ৪০ মিনিটের দিকে চিৎকার দিয়ে বাড়ির পেছনের একটি দরজা খুলে বল্লম, শাবল ও হাঁসুয়া নিয়ে বের হয়ে আসে বাড়ির সব সদস্য। সাজ্জাদ ও তাঁর স্ত্রী ফায়ারম্যান মতিনের ওপর হামলা চালান। অন্যরা পুলিশকে ধাওয়া করে। এ সময় দুটি বোমা ফাটায় তারা। পুলিশ সদস্যরা দৌড়ে নিরাপদ দূরত্বে যান। একপর্যায়ে পুলিশ গুলি শুরু করে। এক পর্যায়ে বাড়ির ভেতর থেকে বের হওয়া সবাই মাটিতে পড়ে যান। শুধু পেছনে দুই শিশুসন্তান নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন সাজ্জাদের মেয়ে সুমাইয়া। দুই শিশুর একটির বয়স দেড় মাস, আরেকটির ৭ বছর।

এরপর পুলিশ সুমাইয়ার কাছ থেকে শিশু দুটিকে উদ্ধারপ্রক্রিয়া শুরু করে। দুই শিশুকে আত্মঘাতী বোমাসহ পাঠানো হতে পারে, এ আশঙ্কায় পুলিশ শিশু দুটির পরিধেয় বস্ত্র খুলে দেখাতে বলে। সেটা করা হয়। এই অবস্থায় সুমাইয়া পুলিশের নির্দেশ অনুযায়ী ছেলের কোলে দেড় মাস বয়সী মেয়েটাকে দিয়ে পুলিশের কাছে পাঠান।

ছেলেমেয়েকে পাঠিয়ে সুমাইয়া বাড়ির সামনে বসে থাকেন। পুলিশ বারবার তাঁকে আত্মসমর্পণের জন্য মাইকে অনুরোধ করলেও তিনি বসে থাকেন। পুলিশ ধারণা করছিলেন, সুমাইয়া আত্মঘাতী বোমা নিয়ে বসে আছেন। প্রায় তিন ঘণ্টা পরিবারের সদস্যদের লাশের পাশে বসে থাকার পর সকাল ১০টা ৪০ মিনিটে সুমাইয়া আত্মসমর্পণে রাজি হন। তাঁর কাছে বোমা নেই, নানা প্রক্রিয়ায় তা নিশ্চিত হওয়ার পর পুলিশ তাঁকে আটক করে দুই সন্তানসহ গোদাগাড়ী থানায় পাঠায়।

বৃহস্পতিবার রাত পৌনে আটটার দিকে অভিযান স্থগিত ঘোষণা করেন পুলিশের অতিরিক্ত উপমহাপরিদর্শক মাসুদুর রহমান। তিনি তখন সাংবাদিকদের বলেন, সাজ্জাদ আলী একজন জঙ্গি ছিলেন। তাঁর পরিবারের চার সদস্য আত্মঘাতী বিস্ফোরণে নিহত হয়েছেন। তাঁদের বোমার স্প্লিন্টারে ফায়ারম্যান আব্দুল মতিন মারা গেছেন।

এই অভিযানে পুলিশ, র‌্যাব ও পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) সদস্যরা অংশ নেন। গতকাল বেলা ১টায় অভিযান সমাপ্ত ঘোষণা করা হয়। লাশগুলো উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়।

Comments

Comments!

 জঙ্গি সাজ্জাদ সপরিবারে ছয় মাস নিরুদ্দেশ ছিলAmarbangladeshonlineAmarbangladeshonline | Amarbangladeshonline

জঙ্গি সাজ্জাদ সপরিবারে ছয় মাস নিরুদ্দেশ ছিল

Saturday, May 13, 2017 9:48 am
11

রাজশাহীর গোদাগাড়ীতে জঙ্গি আস্তানায় অভিযানে নিহত জঙ্গি সাজ্জাদ আলী (৫০) সপরিবার ছয় মাস নিরুদ্দেশ ছিলেন। দেড় মাস আগে হঠাৎ এসে মায়ের হাত-পা ধরে কিছু জমি নেন। বাড়ি থেকে পৌনে এক কিলোমিটার দূরে গ্রামের শেষ মাথায় ওই কৃষিজমিতে বাড়ি করেন। বৃহস্পতিবার পুলিশের অভিযানের আগ পর্যন্ত গ্রামের কেউ টের পায়নি কাপড় ফেরিওয়ালা সাজ্জাদ পুরো পরিবারসহ জঙ্গিবাদে জড়িয়েছেন এবং বাড়িকে জঙ্গি আস্তানায় পরিণত করেছিলেন। সেখানে বিস্ফোরকের মজুত গড়ে তুলেছিলেন।

গোদাগাড়ী উপজেলা সদর থেকে ১২ কিলোমিটার দূরে বেনীপুর গ্রামের ধানখেতের মাঝে ওই বাড়িতে বৃহস্পতিবার সকালে অভিযান শুরু করে পুলিশ। অভিযানের নাম দেওয়া হয় ‘অপারশেন সান ডেভিল’। এই অভিযানের শুরুতে জঙ্গিরা ফায়ার সার্ভিসের এক সদস্যকে হত্যা করে। এরপর অভিযানে পাঁচজন নিহত হন। অক্ষত অবস্থায় সাজ্জাদ আলীর এক মেয়ে ও তাঁর দুই শিশুসন্তানকে উদ্ধার করে পুলিশ।

.

রাজশাহীর গোদাগাড়ীতে জঙ্গি আস্তানায় অভিযানের সময় জঙ্গিদের হামলায় আহত পুলিশ সদস্যকে উদ্ধার করে নিয়ে যাচ্ছেন তাঁর সহকর্মীরা l প্রথম আলোরাজশাহীর গোদাগাড়ীতে জঙ্গি আস্তানায় অভিযানের সময় জঙ্গিদের হামলায় আহত পুলিশ সদস্যকে উদ্ধার করে নিয়ে যাচ্ছেন তাঁর সহকর্মীরা l প্রথম আলোপুলিশ ও প্রত্যক্ষদর্শী ব্যক্তিরা জানিয়েছেন, গত বুধবার দিবাগত রাত একটার দিকে পুলিশ সাজ্জাদের বাড়ি ঘেরাও করে। বৃহস্পতিবার সকালে অভিযান শুরুর আগে ভোর থেকে হ্যান্ডমাইকে বাড়ির লোকদের আত্মসমর্পণের আহ্বান জানায় পুলিশ। এর আগে বুধবার চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে গ্রেপ্তার হওয়া কয়েক ব্যক্তির দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে রাজশাহীর গোদাগাড়ীর জঙ্গি আস্তানাটি শনাক্ত করা হয় বলে জানান চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার পুলিশ সুপার টি এম মোজাহিদুল ইসলাম।

গোদাগাড়ীতে অভিযানে নিহতদের মধ্যে চারজনই সাজ্জাদের পরিবারের সদস্য। তাঁরা হলেন সাজ্জাদ, তাঁর স্ত্রী বেলী আক্তার (৪৫), ছোট ছেলে আল আমিন (১৮) ও ছোট মেয়ে কারিমা খাতুন (১৭)। নিহত অপর ব্যক্তির নাম আশরাফুল (২২)। পুলিশ বলছে, আশরাফুলের বাড়ি চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর থানার দেবীনগর গ্রামে। তিনি বিএসসি ইঞ্জিনিয়ার ছিলেন। তিনি জঙ্গিগোষ্ঠীর সক্রিয় সদস্য। তিনি ওই জঙ্গি আস্তানায় ছিলেন।

নিহত ফায়ার সার্ভিস সদস্যের নাম আব্দুল মতিন (৪৫)। তাঁর বাড়ি গোদাগাড়ী উপজেলার মাটিকাটা গ্রামে। তিনি গোদাগাড়ী ফায়ার স্টেশনের একজন ফায়ারম্যান। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, অভিযানের প্রস্তুতিকালে সাজ্জাদ ও তাঁর স্ত্রী হঠাৎ বেরিয়ে এসে শাবল ও হাঁসুয়া দিয়ে মতিনের ওপর হামলা চালায়। উপস্থিত গণমাধ্যমকর্মীরা তা ভিডিওতে ধারণ করেন।

এ সময় পুলিশের চার সদস্য আহত হন। তাঁরা হলেন রাজশাহীর অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সুমিত চৌধুরী, গোদাগাড়ী থানার উপপরিদর্শক (এসআই) আহসান আলী, গোদাগাড়ী গোয়েন্দা পুলিশের এএসআই উৎপল কুমার ও জেলা পুলিশ লাইনসের কনস্টেবল তাইজুল ইসলাম। তাঁদের মধ্যে তাইজুলের অবস্থা গুরুতর। তিনিসহ তিনজন রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছেন। সুমিত চৌধুরী প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়েছেন।

বৃহস্পতিবার রাত পৌনে আটটায় অভিযান স্থগিত করা হয়। গতকাল শুক্রবার সকাল পৌনে নয়টায় আবার অভিযান শুরু হয়। বেলা ১টায় সমাপ্ত ঘোষণা করে পুলিশ জানায়, বাড়িতে চারটি কক্ষ রয়েছে। সেখানে থেকে ১১টি বোমা, ১টি পিস্তল ও ২টি ম্যাগাজিন, ২টি সুইসাইড ভেস্ট, গানপাউডার ও ২টি ‘জিহাদি বই’ উদ্ধার করা হয়েছে। পরে বোমাগুলো ধ্বংস করা হয়।

কে এই সাজ্জাদ

২৫-২৬ বছর আগে বিয়ে করে নিজ গ্রাম বেনীপুর ছেড়ে পাশেই মাছমারা গ্রামে শ্বশুরবাড়িতে থাকা শুরু করেন সাজ্জাদ। এলাকার লোকজন জানান, সাজ্জাদের শ্বশুর লুৎফর রহমান ইউনিয়ন জামায়াতের আমির ছিলেন। সাজ্জাদ আলীও জামায়াতের কর্মী ছিলেন। গত বছরের শেষ দিকে হঠাৎ করেই পরিবার নিয়ে নিরুদ্দেশ হন সাজ্জাদ। এর আগ পর্যন্ত তিনি মাছমারা গ্রামেই ছিলেন।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সাজ্জাদ আলীর দুই ছেলে ও দুই মেয়ে। বড় ছেলে মো. সোয়ায়েবকে (২২) নিয়ে বাইসাইকেলে করে এলাকায় ফেরি করে কাপড় বিক্রি করতেন তিনি।

পুলিশের অভিযানে জীবিত অবস্থায় উদ্ধার হওয়া সাজ্জাদের মেয়ে সুমাইয়া খাতুনের (২৫) স্বামী জহুরুল ইসলাম প্রায় ছয় মাস আগে নাশকতার মামলায় গ্রেপ্তার হন। পুলিশ বলছে, জহুরুল জেএমবির সদস্য।

সাজ্জাদের ছোট মেয়ে কারিমা খাতুনেরও বিয়ে হয়েছিল। বছরখানেক পর সংসার ভেঙে গেছে। তারপর থেকে সে বাবা-মায়ের কাছেই থাকত। ছোট ছেলে আল-আমিন চাঁপাইনবাবগঞ্জে একটি মাদ্রাসায় পড়তেন। ছয় বছর আগে তিনি মাদ্রাসা ছাড়েন।

সাজ্জাদ আলীর বাবা আব্দুল মতিন মারা গেছেন অনেক আগে। সাজ্জাদের দুই ভাই ও চার বোন। বেনীপুর গ্রামে পৈতৃক ভিটায় এখন মা মারজাহান বেওয়া ছোট ছেলে মুক্তার আলীর সঙ্গে থাকেন।

বৃহস্পতিবার ওই বাড়িতে গিয়ে সাজ্জাদের মা ও তাঁর ছোট ভাইয়ের স্ত্রী শামীমা বেগমের সঙ্গে এই প্রতিবেদকের কথা হয়। শামীমা বলেন, তাঁর ভাশুর সাজ্জাদ আলী পরিবারের কারও সঙ্গে যোগাযোগ রাখতেন না। বিয়ের পর শ্বশুরের বাড়ির পাশে গিয়ে বাড়ি করেছিলেন, সেখানেই ছিলেন।

শামীমা বলেন, সপরিবার ছয় মাস নিরুদ্দেশ থাকার পর সাজ্জাদ মাস দেড়েক আগে হঠাৎ বাড়িতে আসেন। মায়ের কাছে বাড়ি করার জন্য জায়গা দাবি করেন। মা মারজাহান প্রথমে রাজি না হলে তাঁর হাত-পা ধরে কান্নাকাটি শুরু করেন। পরে মারজাহান বেওয়া তাঁর একমাত্র সম্বল এক বিঘা কৃষিজমির একাংশে সাজ্জাদকে বাড়ি করার অনুমতি দেন। জমিটি বেনীপুর গ্রামের শেষ মাথায়। আশপাশে কোনো বাড়ি নেই।

সাজ্জাদের করা টিনের ছাউনির বাড়িটির এক পাশে মাটির দেয়াল, অন্য পাশে টিনের বেড়া। কোনো রাস্তা নেই, জমির আলপথে যাতায়াত করতেন। বাড়িটিতে কোনো নলকূপও নেই। প্রতিবেশীরা জানান, ওই বাড়ির পুরুষ অথবা মেয়েরা ভোরের দিকে গ্রামের ভেতর থেকে পানি নিয়ে যেতেন।

গত বৃহস্পতিবার মাছমারা গ্রামে সাজ্জাদের শ্বশুরবাড়িতে গিয়ে তাঁর শ্বশুর লুৎফর রহমানকে পাওয়া যায়নি। শাশুড়ি সকিনা বেগম প্রথম আলোকে বলেন, সাজ্জাদ সবার সঙ্গে ঝামেলায় জড়াতেন। সর্বশেষ গণ্ডগোল হওয়ার পরে শ্বশুরবাড়ি থেকে পরিবারের সবাইকে নিয়ে চলে যান। তারপর প্রায় ছয় মাস বাইরে ছিলেন।

বাইরে কোথায় ছিলেন জানতে চাইলে সকিনা বেগম বলেন, গোদাগাড়ী উপজেলা সদরে ছিলেন বলে শুনেছেন। সকিনা দাবি করেন, তাঁর স্বামী কোনো রাজনীতি করেন না। তাঁর জামাতা সাজ্জাদ হয়তো করতেন।

তবে মাটিকাটা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আলী আজম তৌহিদ প্রথম আলোকে বলেছেন, সাজ্জাদের শ্বশুর লুৎফর রহমান মাটিকাটা ইউনিয়ন জামায়াতের সাবেক আমির।

যেভাবে অভিযান শুরু

পুলিশ ও প্রত্যক্ষদর্শী ব্যক্তিরা জানিয়েছেন, গত বুধবার দিবাগত রাত একটার দিকে পুলিশ সাজ্জাদের বাড়ি ঘেরাও করে। বৃহস্পতিবার ভোর চারটার দিকে বাড়ির ভেতরে একটি বিস্ফোরণের শব্দ পাওয়া যায়। তারপর ভেতরে আর কোনো সাড়াশব্দ পাওয়া যায় না। ভোর পাঁচটার দিকে পুলিশ হ্যান্ডমাইকে বাড়ির লোকদের আত্মসমর্পণের আহ্বান জানাতে থাকে। ঘণ্টাখানেক পর আরেকটি বিস্ফোরণের শব্দ পাওয়া যায়। সকাল সাতটার দিকে ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা পানি দিয়ে বাড়ির মাটির দেয়াল ভেজাতে শুরু করেন। সকাল ৭টা ৪০ মিনিটের দিকে চিৎকার দিয়ে বাড়ির পেছনের একটি দরজা খুলে বল্লম, শাবল ও হাঁসুয়া নিয়ে বের হয়ে আসে বাড়ির সব সদস্য। সাজ্জাদ ও তাঁর স্ত্রী ফায়ারম্যান মতিনের ওপর হামলা চালান। অন্যরা পুলিশকে ধাওয়া করে। এ সময় দুটি বোমা ফাটায় তারা। পুলিশ সদস্যরা দৌড়ে নিরাপদ দূরত্বে যান। একপর্যায়ে পুলিশ গুলি শুরু করে। এক পর্যায়ে বাড়ির ভেতর থেকে বের হওয়া সবাই মাটিতে পড়ে যান। শুধু পেছনে দুই শিশুসন্তান নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন সাজ্জাদের মেয়ে সুমাইয়া। দুই শিশুর একটির বয়স দেড় মাস, আরেকটির ৭ বছর।

এরপর পুলিশ সুমাইয়ার কাছ থেকে শিশু দুটিকে উদ্ধারপ্রক্রিয়া শুরু করে। দুই শিশুকে আত্মঘাতী বোমাসহ পাঠানো হতে পারে, এ আশঙ্কায় পুলিশ শিশু দুটির পরিধেয় বস্ত্র খুলে দেখাতে বলে। সেটা করা হয়। এই অবস্থায় সুমাইয়া পুলিশের নির্দেশ অনুযায়ী ছেলের কোলে দেড় মাস বয়সী মেয়েটাকে দিয়ে পুলিশের কাছে পাঠান।

ছেলেমেয়েকে পাঠিয়ে সুমাইয়া বাড়ির সামনে বসে থাকেন। পুলিশ বারবার তাঁকে আত্মসমর্পণের জন্য মাইকে অনুরোধ করলেও তিনি বসে থাকেন। পুলিশ ধারণা করছিলেন, সুমাইয়া আত্মঘাতী বোমা নিয়ে বসে আছেন। প্রায় তিন ঘণ্টা পরিবারের সদস্যদের লাশের পাশে বসে থাকার পর সকাল ১০টা ৪০ মিনিটে সুমাইয়া আত্মসমর্পণে রাজি হন। তাঁর কাছে বোমা নেই, নানা প্রক্রিয়ায় তা নিশ্চিত হওয়ার পর পুলিশ তাঁকে আটক করে দুই সন্তানসহ গোদাগাড়ী থানায় পাঠায়।

বৃহস্পতিবার রাত পৌনে আটটার দিকে অভিযান স্থগিত ঘোষণা করেন পুলিশের অতিরিক্ত উপমহাপরিদর্শক মাসুদুর রহমান। তিনি তখন সাংবাদিকদের বলেন, সাজ্জাদ আলী একজন জঙ্গি ছিলেন। তাঁর পরিবারের চার সদস্য আত্মঘাতী বিস্ফোরণে নিহত হয়েছেন। তাঁদের বোমার স্প্লিন্টারে ফায়ারম্যান আব্দুল মতিন মারা গেছেন।

এই অভিযানে পুলিশ, র‌্যাব ও পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) সদস্যরা অংশ নেন। গতকাল বেলা ১টায় অভিযান সমাপ্ত ঘোষণা করা হয়। লাশগুলো উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়।

Comments

comments

সম্পাদক : মোহাম্মদ আবদুল বাছির
প্রকাশক: মোহাম্মদ জহিরুল ইসলাম
ফোন : ‎০১৭১৩৪০৯০৯০
৩৪৫/১, দিলু রোড, নিউ ইস্কাটন, ঢাকা-১০০০
X
 
নিয়মিত খবর পড়তে আমাদের ফেসবুক পেজে লাইক দিয়ে যুক্ত থাকুন
X