সোমবার, ১৯শে ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ ইং, ৭ই ফাল্গুন, ১৪২৪ বঙ্গাব্দ, রাত ১১:৫৬
শিরোনাম
  • ঘৃণাকে বিজয়ী হতে দেয়া যাবে না, ট্রাম্পকে ইঙ্গিত করে জর্জ ক্লুনি
  • আমার একটাই চিন্তা দেশের মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন করা: প্রধানমন্ত্রী
  • ‘কেন্দ্রীয় সরকারের আগ্রাসী নীতির কারণে কাশ্মীরকে হারাতে হবে’
  • সাড়ে চারমাস পর মুখোমুখি, খাদিজাকে উদ্দেশ্য করে যা বলল বদরুল
  • খালেদার ‘সাজা’ বিরোধী নেতাকর্মীদের মনোবল ভাঙ্গার কৌশল!
  • বিএনপির কর্মসূচি ‘যথাসময়ে’ জানানো হবে: রিজভী
  • দলের জন্য বোলিং করতেও রাজি মুশফিক
  • শিশু জিহাদের মৃত্যু: চার জনের ১০ বছর করে কারাদণ্ড
  • অবশেষে বাড়ি অবরুদ্ধ করে রাখা সেই দেয়াল ভেঙ্গে ফেলা হচ্ছে
  • সাক্ষ্য দিলেন খাদিজা, চাইলেন বদরুলের সর্বোচ্চ শাস্তি
  • বদরুলের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিতে আদালতে খাদিজা
  • আজ বগুড়ায় যেসব প্রকল্প উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী
  • রোহিঙ্গা স্থানান্তরের সরকারি পরিকল্পনার সঙ্গে দ্বিমত মানবাধিকার কমিশনের
  • মহেশখালীতে ইয়াবা ব্যবসায়ীদের সঙ্গে পুলিশের ‘বন্দুকযুদ্ধ’
  • হোয়াইট হাউসে কাজ করার দীর্ঘ অভিজ্ঞতার কথা জানালেন এই বাংলাদেশি সাংবাদিক
Saturday, July 23, 2016 12:19 pm
A- A A+ Print

জাতীয় সংকটে দরকার সমন্বিত ও কার্যকর উদ্যোগ

photo-1469194201

কবির য়াহমদ: গুলশানে দেশি-বিদেশি সাধারণ মানুষদের জিম্মি করে চালানো হত্যাকাণ্ড বাংলাদেশের ইতিহাসে এক অন্যতম কালো অধ্যায়। এ হামলা সাম্প্রতিক সময়ে দেশে ঘটে যাওয়া বিভিন্ন হত্যাকাণ্ডের বৃহৎ রূপ বলে অনুমিত। গুলশানের সে হত্যাকাণ্ডের পর শোলাকিয়ায় ঈদের জামাতের পাশে পুলিশের ওপর হামলা চালায় জঙ্গিরা। গণমাধ্যমে প্রকাশ, শোলাকিয়ার ঈদ জামাতের ইমামকে উদ্দেশ করে জঙ্গিরা আক্রমণ করতে চেয়েছিল, লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে না পারলেও সেখানেও পুলিশ সদস্যসহ একাধিক লোক প্রাণ হারান। হামলাকারীদের একজন ঘটনাস্থলে নিহত হলেও তাদের উদ্দেশ্য ব্যর্থ হয়নি। এসব ঘটনা ছিল নজিরবিহীন, তবে অবাস্তব কোনো কিছু নয়। কারণ দীর্ঘদিন ধরে জেঁকে বসা উগ্র জঙ্গিবাদ আমাদের সমাজে ক্রমে বিস্তৃত হচ্ছে এটা তার একেকটা প্রমাণ। এর আগে গত দুই বছরে জঙ্গিরা একজন-দুজনকে হত্যা করে তাদের প্রস্তুতি সম্পন্ন করে বড় ধরনের অপারেশনে অংশ নিয়েছে। ব্লগার, লেখক, প্রকাশক, ইমাম, পুরোহিত, ভিক্ষু, এলজিবিটি-কর্মী, সংস্কৃতিকর্মী, বিদেশি নাগরিকসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষকে খুন করার মাধ্যমে খুনিরা হাত পাকিয়েছে, ভিন্ন ভিন্ন কৌশল প্রয়োগ করে পরিকল্পনার গভীরতা যাচাই-বাছাই করেছে; অপেক্ষা করেছে রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক প্রতিক্রিয়ার এবং এরপরই এ ধরনের এক হত্যাকাণ্ড চালিয়েছে। এর মাধ্যমে আছে দীর্ঘ পরিকল্পনার ছাপ, আর ভবিষ্যতে আরো বড় ধরনের হামলার আভাস। ধর্মীয় মৌলবাদীদের মাধ্যমে সংঘটিত এ সন্ত্রাসী হামলা সাম্প্রতিক সময়ের বাংলাদেশে বিস্তৃত হওয়া উগ্রবাদের দিকনির্দেশক। এ জন্য নির্মোহ দৃষ্টিতে এর বিচার-বিশ্লেষণ শেষে নির্মূলের পদক্ষেপ গ্রহণ করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। রাষ্ট্রীয় এ দায়িত্ব পালনে সরকার ও প্রশাসন দায়বদ্ধ এটা অস্বীকার করার উপায় নেই। একই সঙ্গে দেশের সকল শ্রেণির মানুষকে সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক এবং অন্য সকল উপায়ে উগ্রবাদীদের বর্জন করা উচিত। উগ্রবাদের এ আস্ফালন রুখতে পরমুখাপেক্ষী না হয়ে আমাদের সবার উচিত স্ব স্ব অবস্থান থেকে নিজ দায়িত্ব পালন করা। ঢাকার গুলশানে ১ জুলাই রাতে ৫, মতান্তরে ৬ জঙ্গি কেবল সেখানে অবস্থানরত অর্ধশতাধিক লোককেই জিম্মি করেনি, তারা কার্যত জিম্মি করে রেখেছিল পুরো দেশকে। পুরো রাতের দুর্বিষহ, আতঙ্ক ও ভয়াল অবস্থায় উদ্বিগ্ন ছিল দেশের মানুষ। জঙ্গিদের প্রতিরোধ করতে গিয়ে দুই পুলিশ কর্মকর্তার নিহত হওয়া দেশপ্রেমের অনন্য নজির। দেশকে রক্ষা করতে গিয়ে নিজেদের জীবনকে তুচ্ছজ্ঞান করেছিলেন তাঁরা। বাংলাদেশ তাঁদের এ মৃত্যু না চাইলেও দেশপ্রেমিক এ দুই পুলিশ কর্মকর্তাকে বাংলাদেশ স্থান দেবে গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায়। সেখানে জিম্মি থাকা আরো ২০ জনের প্রাণহানি বাংলাদেশের জন্য সব দিক থেকে অপূরণীয় ক্ষতি; দেশে, দেশের বাইরে। নয় ইতালীয়, সাত জাপানি, এক ভারতীয় ও তিন বাংলাদেশি নাগরিক জঙ্গিদের ভয়াল আক্রোশের শিকার হয়েছেন, মানবতা লুণ্ঠিত হয়েছে গুলশানে। দেশের বাইরে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ম্লান হয়েছে। সরকারের সামর্থ্য নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে সবখানে। গুলশানের এ জিম্মি সংকটের নেপথ্যে যারা, তারা ধর্মীয় মৌলবাদের একেকটা প্রতীক। বিশ্বব্যাপী চলমান ধর্মীয় সন্ত্রাসের একটা অংশ এ ঘটনা ও হত্যাকাণ্ড। বিশ্বব্যাপী ইসলামিক স্টেট, আল-কায়েদা, বোকোহারামসহ যেসব জঙ্গি সংগঠনের অস্তিত্ব রয়েছে, তারা জোরপূর্বক ধর্মপ্রচারের অভিপ্রায়ে এসব নারকীয় হত্যাকাণ্ড ঘটাচ্ছে। এটাকে বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা ভাবার কোনো কারণ নেই। কেবল দেশীয় জঙ্গিরা অনাকাঙ্ক্ষিত এসব ঘটনার জন্মদাতা - এভাবে ভেবে জঙ্গিদের সঙ্গে আন্তর্জাতিক সংযোগকে অস্বীকার করার উপায় নেই। প্রত্যেক জঙ্গি একে অন্যের সঙ্গে আদর্শিকভাবে সম্পর্কিত, এখানে ভৌগোলিক দূরত্বের অজুহাত ঘটনাকে আড়াল করার নামান্তর। আমাদের ক্ষেত্রে দুঃখজনক বাস্তবতা হচ্ছে, সরকার ও প্রশাসন জঙ্গিবাদী কোনো ঘটনার সঙ্গে আন্তর্জাতিক যোগকে স্বীকার করতে চায় না। ‘দেশীয় জঙ্গিদের দ্বারা হত্যাকাণ্ড’, ‘বাংলাদেশে আইএস নেই’, ‘এসব বিচ্ছিন্ন ঘটনা’, ‘উন্নত দেশগুলোতে এর চেয়ে বেশি সন্ত্রাসী হামলার ঘটনা ঘটে’ – এ ধরনের দাবির কারণে অপরাধীরা লাভবান হয়েছে। জঙ্গি দমনে সরকার আন্তরিক নয় এমন অভিযোগ শক্তিশালী হয়েছে। জঙ্গিরা ইসলাম ধর্মের নামে হত্যাকাণ্ডগুলো ঘটাচ্ছে এ কারণে ওদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নিলে ধর্মীয় অনুভূতির বিষয়টি সামনে এসেছে, ফলে ব্যবস্থা গ্রহণে এগিয়ে গিয়েও বারবার পিছু হটেছে সরকার; আর এতে জঙ্গিবাদ তার ডালপালা বিস্তারে অনুকূল পরিবেশ পেয়েছে। গুলশান- শোলাকিয়ার জঙ্গি হামলার ঘটনার আগে সরকার ধর্মের নামে চালানো হত্যাকাণ্ডগুলোর আক্রান্ত ব্যক্তি, ব্যক্তিবর্গের দোষ খুঁজে অপরাধীদের একপ্রকার দায়মুক্তিই দিয়েছে। ধর্মীয় জিঘাংসাকে এভাবে আশকারা দেওয়ার কারণে একদিকে যেমন আক্রান্ত ব্যক্তি ও তাদের পরিবার ন্যায়বিচার পায়নি, অন্যদিকে অপরাধীরা ফের অপরাধ সংঘটনের উৎসাহ পেয়েছে। যেকোনো সরকার ও প্রশাসন হয়তো আনুষ্ঠানিকভাবে এ ধরনের উৎসাহ ও সমর্থন দেয় না, দিতে পারে না; কিন্তু অপরাধীদের নৈতিক (অনৈতিক) শক্তিকে শক্তিশালী করেছে। বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠন ইসলামিক স্টেট (আইএস) নেই, জঙ্গিবাদী কার্যক্রমগুলো হিযবুত তাহরীর, আনসারুল্লাহ বাংলা টিম, জামায়াতুল মুজাহিদীন (জেএমবি) তথা দেশীয় জঙ্গিদের মাধ্যমে সম্পাদিত হচ্ছে -এটা সরকারের পরিচিত ও ভুল চর্চিত দাবি। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, আইএস হতে হলে কাউকে ইরাক, সিরিয়া কিংবা তুরস্কে গিয়ে ট্রেনিং নিয়ে আসতে হবে এমন ধারণা ভুল। আইএসের লক্ষ্য ইসলামী খিলাফত, তাদের লক্ষ্য গণতন্ত্র নয়; আল্লাহর আইন প্রতিষ্ঠা- এমন দাবিতে তারা বিশ্বব্যাপী হত্যাকাণ্ডগুলো ঘটাচ্ছে। এখানে কাউকে দেশ ছেড়ে অন্য দেশে গিয়ে ট্রেনিং নিয়ে না আসলে আদর্শিক যুদ্ধ হবে না- এ ধরনের ধারণা সেকেলের ও অপরিণামদর্শী। প্রযুক্তির উৎকর্ষতার এই সময়ে ৫০ বছর আগের বিশ্বপরিস্থিতি ও যোগাযোগ পরিস্থিতিকে মাথায় নিয়ে সবকিছু নির্ধারণ করা উচিত না। এ ক্ষেত্রে আধুনিকমনস্কতা জরুরি, কিন্তু সরকার ও প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীলরা এটা অনুধাবন করছেন না, কিংবা করতে সক্ষম নন। যার খেসারত দিতে হচ্ছে বাংলাদেশকে। আমাদের দুঃখজনক অভিজ্ঞতা হচ্ছে, আমরা সত্য বলতে গেলে ভাবি, এই বুঝি হেরে যাচ্ছি। তাই অস্বীকার করার প্রবণতা জেঁকে বসে সকল স্তরে। এই অস্বীকার তত্ত্বের কারণে লাভবান হয় অপরাধীরা; আর অস্বীকার তত্ত্বের অতিপ্রচারের কারণে ভেবে বসি, জয়ী আমরা। অথচ বাস্তবতা ঠিক উল্টো! তাই এমতাবস্থায় প্রকৃত সত্যকে স্বীকার করে ব্যবস্থা গ্রহণই হবে সরকার, প্রশাসনের প্রাথমিক দায়িত্ব। কারণ অস্বীকার কোনো সমাধান নয়, বরং সত্য স্বীকার করে সমাধানের পথ নিরূপণই প্রকৃত উপায়। বাংলাদেশে আইএসের অস্তিত্ব স্বীকার করে নিলে সরকারকে পদত্যাগ করতে হবে, সরকার বড় ধরনের আন্তর্জাতিক চাপে পড়ে এ দেশে আমেরিকা, ভারত, ব্রিটেনের বিভিন্ন বাহিনীকে জায়গা করে দিতে হবে, এমন নয়। আইএস যেহেতু সারা বিশ্বের এক সমস্যা, এবং আমরা এই বিশ্বপরিস্থিতির বাইরের কোনো দেশ নয় সেহেতু আইএস বাংলাদেশে থাকা অস্বাভাবিক কিছু নয়। তাই শুরুতে বাস্তবতা মেনে নিলে সমস্যা ছিল না। প্রথম দিকে প্রতি হত্যাকাণ্ডের পর আইএস দায় স্বীকার করেছে, বাংলাদেশ বারবার অস্বীকার করে গেছে। এতে ছোট ছোট সমস্যাগুলো মহামারী রূপলাভ করতে শুরু করেছে। তবে আশার কথা, এখনই সব শেষ হয়ে যায়নি। এ জন্য দরকার জঙ্গিবাদ নির্মূলে সৎ ও কার্যকর উদ্যোগ। গুলশানের ঘটনা দেশি, না বিদেশি জঙ্গিদের দ্বারা সংঘটিত হয়েছে এটা এই মুহূর্তের অগ্রাধিকারভিত্তিক আলোচনা নয়। বাংলাদেশ এ ঘটনায় আক্রান্ত হয়েছে। এর পেছনে বিদেশি জঙ্গি নেই বলে তৃপ্তির ঢেঁকুর তোলা নেহাত অপরাধ। এ ক্ষেত্রে যদি আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠন ইসলামিক স্টেট (আইএস) কিংবা অন্য যেকোনো জঙ্গি সংগঠনের যোগ থাকে, তবে সেটা স্বীকার করা উচিত। ক্রমে বিশ্বমানবতার হুমকি হয়ে ওঠা আইএস সংশ্লিষ্টতা স্বীকার করলে বিশ্বের শক্তিধর রাষ্ট্রগুলো বিভিন্ন ছুতোয় এখানে ঘাঁটি গেড়ে বসতে চাইবে -এ আশঙ্কা অমূলক ও ঠুনকো। বরং অস্বীকার সংস্কৃতি অন্ধকারের পূজারি ধর্মান্ধ মৌলবাদকে আরো বেশি শক্তিশালী করবে। গুলশানের এ দুঃখজনক ঘটনা আমাদের জাতীয় সংকট। এমন পরিস্থিতিতে সরকারকে একা মোকাবিলা করতে হবে এটা অর্বাচীন ভাবনা। উগ্রবাদ নির্মূলে দলমত নির্বিশেষে সমন্বিত উদ্যোগ জরুরি। এখানে কে আওয়ামী লীগ, কে বিএনপি, কে বামপন্থী দল, আর কে অন্যান্য দল সেটা মুখ্য নয়। কারণ এ রাষ্ট্র আমাদের, রাষ্ট্রের অস্তিত্ব হুমকির মুখে পড়লে রাজনৈতিক দলগুলো কাদের নিয়ে রাজনীতি করবে? গুলশান ট্র্যাজেডিতে দেশি-বিদেশি যে লোকগুলো প্রাণ হারিয়েছে তাদেরকে আর ফেরানো যাবে না ঠিক, কিন্তু আর যাতে কেউ এভাবে প্রাণ না হারায় সে ব্যবস্থা করা দরকার। এ জন্য সরকার, প্রশাসন, রাজনৈতিক দল ও জনগণের জঙ্গি নির্মূলে সৎ আর আন্তরিক প্রচেষ্টা জরুরি।   লেখক : প্রধান সম্পাদক, সিলেটটুডে টোয়েন্টিফোর ডটকম  

Comments

Comments!

 জাতীয় সংকটে দরকার সমন্বিত ও কার্যকর উদ্যোগAmarbangladeshonlineAmarbangladeshonline | Amarbangladeshonline

জাতীয় সংকটে দরকার সমন্বিত ও কার্যকর উদ্যোগ

Saturday, July 23, 2016 12:19 pm
photo-1469194201

কবির য়াহমদ: গুলশানে দেশি-বিদেশি সাধারণ মানুষদের জিম্মি করে চালানো হত্যাকাণ্ড বাংলাদেশের ইতিহাসে এক অন্যতম কালো অধ্যায়। এ হামলা সাম্প্রতিক সময়ে দেশে ঘটে যাওয়া বিভিন্ন হত্যাকাণ্ডের বৃহৎ রূপ বলে অনুমিত। গুলশানের সে হত্যাকাণ্ডের পর শোলাকিয়ায় ঈদের জামাতের পাশে পুলিশের ওপর হামলা চালায় জঙ্গিরা। গণমাধ্যমে প্রকাশ, শোলাকিয়ার ঈদ জামাতের ইমামকে উদ্দেশ করে জঙ্গিরা আক্রমণ করতে চেয়েছিল, লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে না পারলেও সেখানেও পুলিশ সদস্যসহ একাধিক লোক প্রাণ হারান। হামলাকারীদের একজন ঘটনাস্থলে নিহত হলেও তাদের উদ্দেশ্য ব্যর্থ হয়নি।

এসব ঘটনা ছিল নজিরবিহীন, তবে অবাস্তব কোনো কিছু নয়। কারণ দীর্ঘদিন ধরে জেঁকে বসা উগ্র জঙ্গিবাদ আমাদের সমাজে ক্রমে বিস্তৃত হচ্ছে এটা তার একেকটা প্রমাণ। এর আগে গত দুই বছরে জঙ্গিরা একজন-দুজনকে হত্যা করে তাদের প্রস্তুতি সম্পন্ন করে বড় ধরনের অপারেশনে অংশ নিয়েছে। ব্লগার, লেখক, প্রকাশক, ইমাম, পুরোহিত, ভিক্ষু, এলজিবিটি-কর্মী, সংস্কৃতিকর্মী, বিদেশি নাগরিকসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষকে খুন করার মাধ্যমে খুনিরা হাত পাকিয়েছে, ভিন্ন ভিন্ন কৌশল প্রয়োগ করে পরিকল্পনার গভীরতা যাচাই-বাছাই করেছে; অপেক্ষা করেছে রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক প্রতিক্রিয়ার এবং এরপরই এ ধরনের এক হত্যাকাণ্ড চালিয়েছে। এর মাধ্যমে আছে দীর্ঘ পরিকল্পনার ছাপ, আর ভবিষ্যতে আরো বড় ধরনের হামলার আভাস।

ধর্মীয় মৌলবাদীদের মাধ্যমে সংঘটিত এ সন্ত্রাসী হামলা সাম্প্রতিক সময়ের বাংলাদেশে বিস্তৃত হওয়া উগ্রবাদের দিকনির্দেশক। এ জন্য নির্মোহ দৃষ্টিতে এর বিচার-বিশ্লেষণ শেষে নির্মূলের পদক্ষেপ গ্রহণ করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। রাষ্ট্রীয় এ দায়িত্ব পালনে সরকার ও প্রশাসন দায়বদ্ধ এটা অস্বীকার করার উপায় নেই। একই সঙ্গে দেশের সকল শ্রেণির মানুষকে সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক এবং অন্য সকল উপায়ে উগ্রবাদীদের বর্জন করা উচিত। উগ্রবাদের এ আস্ফালন রুখতে পরমুখাপেক্ষী না হয়ে আমাদের সবার উচিত স্ব স্ব অবস্থান থেকে নিজ দায়িত্ব পালন করা।

ঢাকার গুলশানে ১ জুলাই রাতে ৫, মতান্তরে ৬ জঙ্গি কেবল সেখানে অবস্থানরত অর্ধশতাধিক লোককেই জিম্মি করেনি, তারা কার্যত জিম্মি করে রেখেছিল পুরো দেশকে। পুরো রাতের দুর্বিষহ, আতঙ্ক ও ভয়াল অবস্থায় উদ্বিগ্ন ছিল দেশের মানুষ। জঙ্গিদের প্রতিরোধ করতে গিয়ে দুই পুলিশ কর্মকর্তার নিহত হওয়া দেশপ্রেমের অনন্য নজির। দেশকে রক্ষা করতে গিয়ে নিজেদের জীবনকে তুচ্ছজ্ঞান করেছিলেন তাঁরা। বাংলাদেশ তাঁদের এ মৃত্যু না চাইলেও দেশপ্রেমিক এ দুই পুলিশ কর্মকর্তাকে বাংলাদেশ স্থান দেবে গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায়। সেখানে জিম্মি থাকা আরো ২০ জনের প্রাণহানি বাংলাদেশের জন্য সব দিক থেকে অপূরণীয় ক্ষতি; দেশে, দেশের বাইরে। নয় ইতালীয়, সাত জাপানি, এক ভারতীয় ও তিন বাংলাদেশি নাগরিক জঙ্গিদের ভয়াল আক্রোশের শিকার হয়েছেন, মানবতা লুণ্ঠিত হয়েছে গুলশানে। দেশের বাইরে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ম্লান হয়েছে। সরকারের সামর্থ্য নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে সবখানে।

গুলশানের এ জিম্মি সংকটের নেপথ্যে যারা, তারা ধর্মীয় মৌলবাদের একেকটা প্রতীক। বিশ্বব্যাপী চলমান ধর্মীয় সন্ত্রাসের একটা অংশ এ ঘটনা ও হত্যাকাণ্ড। বিশ্বব্যাপী ইসলামিক স্টেট, আল-কায়েদা, বোকোহারামসহ যেসব জঙ্গি সংগঠনের অস্তিত্ব রয়েছে, তারা জোরপূর্বক ধর্মপ্রচারের অভিপ্রায়ে এসব নারকীয় হত্যাকাণ্ড ঘটাচ্ছে। এটাকে বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা ভাবার কোনো কারণ নেই। কেবল দেশীয় জঙ্গিরা অনাকাঙ্ক্ষিত এসব ঘটনার জন্মদাতা – এভাবে ভেবে জঙ্গিদের সঙ্গে আন্তর্জাতিক সংযোগকে অস্বীকার করার উপায় নেই। প্রত্যেক জঙ্গি একে অন্যের সঙ্গে আদর্শিকভাবে সম্পর্কিত, এখানে ভৌগোলিক দূরত্বের অজুহাত ঘটনাকে আড়াল করার নামান্তর।

আমাদের ক্ষেত্রে দুঃখজনক বাস্তবতা হচ্ছে, সরকার ও প্রশাসন জঙ্গিবাদী কোনো ঘটনার সঙ্গে আন্তর্জাতিক যোগকে স্বীকার করতে চায় না। ‘দেশীয় জঙ্গিদের দ্বারা হত্যাকাণ্ড’, ‘বাংলাদেশে আইএস নেই’, ‘এসব বিচ্ছিন্ন ঘটনা’, ‘উন্নত দেশগুলোতে এর চেয়ে বেশি সন্ত্রাসী হামলার ঘটনা ঘটে’ – এ ধরনের দাবির কারণে অপরাধীরা লাভবান হয়েছে। জঙ্গি দমনে সরকার আন্তরিক নয় এমন অভিযোগ শক্তিশালী হয়েছে। জঙ্গিরা ইসলাম ধর্মের নামে হত্যাকাণ্ডগুলো ঘটাচ্ছে এ কারণে ওদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নিলে ধর্মীয় অনুভূতির বিষয়টি সামনে এসেছে, ফলে ব্যবস্থা গ্রহণে এগিয়ে গিয়েও বারবার পিছু হটেছে সরকার; আর এতে জঙ্গিবাদ তার ডালপালা বিস্তারে অনুকূল পরিবেশ পেয়েছে।

গুলশান- শোলাকিয়ার জঙ্গি হামলার ঘটনার আগে সরকার ধর্মের নামে চালানো হত্যাকাণ্ডগুলোর আক্রান্ত ব্যক্তি, ব্যক্তিবর্গের দোষ খুঁজে অপরাধীদের একপ্রকার দায়মুক্তিই দিয়েছে। ধর্মীয় জিঘাংসাকে এভাবে আশকারা দেওয়ার কারণে একদিকে যেমন আক্রান্ত ব্যক্তি ও তাদের পরিবার ন্যায়বিচার পায়নি, অন্যদিকে অপরাধীরা ফের অপরাধ সংঘটনের উৎসাহ পেয়েছে। যেকোনো সরকার ও প্রশাসন হয়তো আনুষ্ঠানিকভাবে এ ধরনের উৎসাহ ও সমর্থন দেয় না, দিতে পারে না; কিন্তু অপরাধীদের নৈতিক (অনৈতিক) শক্তিকে শক্তিশালী করেছে।

বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠন ইসলামিক স্টেট (আইএস) নেই, জঙ্গিবাদী কার্যক্রমগুলো হিযবুত তাহরীর, আনসারুল্লাহ বাংলা টিম, জামায়াতুল মুজাহিদীন (জেএমবি) তথা দেশীয় জঙ্গিদের মাধ্যমে সম্পাদিত হচ্ছে -এটা সরকারের পরিচিত ও ভুল চর্চিত দাবি। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, আইএস হতে হলে কাউকে ইরাক, সিরিয়া কিংবা তুরস্কে গিয়ে ট্রেনিং নিয়ে আসতে হবে এমন ধারণা ভুল। আইএসের লক্ষ্য ইসলামী খিলাফত, তাদের লক্ষ্য গণতন্ত্র নয়; আল্লাহর আইন প্রতিষ্ঠা- এমন দাবিতে তারা বিশ্বব্যাপী হত্যাকাণ্ডগুলো ঘটাচ্ছে। এখানে কাউকে দেশ ছেড়ে অন্য দেশে গিয়ে ট্রেনিং নিয়ে না আসলে আদর্শিক যুদ্ধ হবে না- এ ধরনের ধারণা সেকেলের ও অপরিণামদর্শী। প্রযুক্তির উৎকর্ষতার এই সময়ে ৫০ বছর আগের বিশ্বপরিস্থিতি ও যোগাযোগ পরিস্থিতিকে মাথায় নিয়ে সবকিছু নির্ধারণ করা উচিত না। এ ক্ষেত্রে আধুনিকমনস্কতা জরুরি, কিন্তু সরকার ও প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীলরা এটা অনুধাবন করছেন না, কিংবা করতে সক্ষম নন। যার খেসারত দিতে হচ্ছে বাংলাদেশকে।

আমাদের দুঃখজনক অভিজ্ঞতা হচ্ছে, আমরা সত্য বলতে গেলে ভাবি, এই বুঝি হেরে যাচ্ছি। তাই অস্বীকার করার প্রবণতা জেঁকে বসে সকল স্তরে। এই অস্বীকার তত্ত্বের কারণে লাভবান হয় অপরাধীরা; আর অস্বীকার তত্ত্বের অতিপ্রচারের কারণে ভেবে বসি, জয়ী আমরা। অথচ বাস্তবতা ঠিক উল্টো!

তাই এমতাবস্থায় প্রকৃত সত্যকে স্বীকার করে ব্যবস্থা গ্রহণই হবে সরকার, প্রশাসনের প্রাথমিক দায়িত্ব। কারণ অস্বীকার কোনো সমাধান নয়, বরং সত্য স্বীকার করে সমাধানের পথ নিরূপণই প্রকৃত উপায়। বাংলাদেশে আইএসের অস্তিত্ব স্বীকার করে নিলে সরকারকে পদত্যাগ করতে হবে, সরকার বড় ধরনের আন্তর্জাতিক চাপে পড়ে এ দেশে আমেরিকা, ভারত, ব্রিটেনের বিভিন্ন বাহিনীকে জায়গা করে দিতে হবে, এমন নয়। আইএস যেহেতু সারা বিশ্বের এক সমস্যা, এবং আমরা এই বিশ্বপরিস্থিতির বাইরের কোনো দেশ নয় সেহেতু আইএস বাংলাদেশে থাকা অস্বাভাবিক কিছু নয়। তাই শুরুতে বাস্তবতা মেনে নিলে সমস্যা ছিল না। প্রথম দিকে প্রতি হত্যাকাণ্ডের পর আইএস দায় স্বীকার করেছে, বাংলাদেশ বারবার অস্বীকার করে গেছে। এতে ছোট ছোট সমস্যাগুলো মহামারী রূপলাভ করতে শুরু করেছে। তবে আশার কথা, এখনই সব শেষ হয়ে যায়নি। এ জন্য দরকার জঙ্গিবাদ নির্মূলে সৎ ও কার্যকর উদ্যোগ।

গুলশানের ঘটনা দেশি, না বিদেশি জঙ্গিদের দ্বারা সংঘটিত হয়েছে এটা এই মুহূর্তের অগ্রাধিকারভিত্তিক আলোচনা নয়। বাংলাদেশ এ ঘটনায় আক্রান্ত হয়েছে। এর পেছনে বিদেশি জঙ্গি নেই বলে তৃপ্তির ঢেঁকুর তোলা নেহাত অপরাধ। এ ক্ষেত্রে যদি আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠন ইসলামিক স্টেট (আইএস) কিংবা অন্য যেকোনো জঙ্গি সংগঠনের যোগ থাকে, তবে সেটা স্বীকার করা উচিত। ক্রমে বিশ্বমানবতার হুমকি হয়ে ওঠা আইএস সংশ্লিষ্টতা স্বীকার করলে বিশ্বের শক্তিধর রাষ্ট্রগুলো বিভিন্ন ছুতোয় এখানে ঘাঁটি গেড়ে বসতে চাইবে -এ আশঙ্কা অমূলক ও ঠুনকো। বরং অস্বীকার সংস্কৃতি অন্ধকারের পূজারি ধর্মান্ধ মৌলবাদকে আরো বেশি শক্তিশালী করবে।

গুলশানের এ দুঃখজনক ঘটনা আমাদের জাতীয় সংকট। এমন পরিস্থিতিতে সরকারকে একা মোকাবিলা করতে হবে এটা অর্বাচীন ভাবনা। উগ্রবাদ নির্মূলে দলমত নির্বিশেষে সমন্বিত উদ্যোগ জরুরি। এখানে কে আওয়ামী লীগ, কে বিএনপি, কে বামপন্থী দল, আর কে অন্যান্য দল সেটা মুখ্য নয়। কারণ এ রাষ্ট্র আমাদের, রাষ্ট্রের অস্তিত্ব হুমকির মুখে পড়লে রাজনৈতিক দলগুলো কাদের নিয়ে রাজনীতি করবে?

গুলশান ট্র্যাজেডিতে দেশি-বিদেশি যে লোকগুলো প্রাণ হারিয়েছে তাদেরকে আর ফেরানো যাবে না ঠিক, কিন্তু আর যাতে কেউ এভাবে প্রাণ না হারায় সে ব্যবস্থা করা দরকার। এ জন্য সরকার, প্রশাসন, রাজনৈতিক দল ও জনগণের জঙ্গি নির্মূলে সৎ আর আন্তরিক প্রচেষ্টা জরুরি।

 

লেখক : প্রধান সম্পাদক, সিলেটটুডে টোয়েন্টিফোর ডটকম

 

Comments

comments

সম্পাদক : মোহাম্মদ আবদুল বাছির
প্রকাশক: মোহাম্মদ জহিরুল ইসলাম
ফোন : ‎০১৭১৩৪০৯০৯০
৩৪৫/১, দিলু রোড, নিউ ইস্কাটন, ঢাকা-১০০০
X
 
নিয়মিত খবর পড়তে আমাদের ফেসবুক পেজে লাইক দিয়ে যুক্ত থাকুন
X