সোমবার, ১৯শে ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ ইং, ৭ই ফাল্গুন, ১৪২৪ বঙ্গাব্দ, রাত ৩:৪৩
শিরোনাম
  • ঘৃণাকে বিজয়ী হতে দেয়া যাবে না, ট্রাম্পকে ইঙ্গিত করে জর্জ ক্লুনি
  • আমার একটাই চিন্তা দেশের মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন করা: প্রধানমন্ত্রী
  • ‘কেন্দ্রীয় সরকারের আগ্রাসী নীতির কারণে কাশ্মীরকে হারাতে হবে’
  • সাড়ে চারমাস পর মুখোমুখি, খাদিজাকে উদ্দেশ্য করে যা বলল বদরুল
  • খালেদার ‘সাজা’ বিরোধী নেতাকর্মীদের মনোবল ভাঙ্গার কৌশল!
  • বিএনপির কর্মসূচি ‘যথাসময়ে’ জানানো হবে: রিজভী
  • দলের জন্য বোলিং করতেও রাজি মুশফিক
  • শিশু জিহাদের মৃত্যু: চার জনের ১০ বছর করে কারাদণ্ড
  • অবশেষে বাড়ি অবরুদ্ধ করে রাখা সেই দেয়াল ভেঙ্গে ফেলা হচ্ছে
  • সাক্ষ্য দিলেন খাদিজা, চাইলেন বদরুলের সর্বোচ্চ শাস্তি
  • বদরুলের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিতে আদালতে খাদিজা
  • আজ বগুড়ায় যেসব প্রকল্প উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী
  • রোহিঙ্গা স্থানান্তরের সরকারি পরিকল্পনার সঙ্গে দ্বিমত মানবাধিকার কমিশনের
  • মহেশখালীতে ইয়াবা ব্যবসায়ীদের সঙ্গে পুলিশের ‘বন্দুকযুদ্ধ’
  • হোয়াইট হাউসে কাজ করার দীর্ঘ অভিজ্ঞতার কথা জানালেন এই বাংলাদেশি সাংবাদিক
Friday, October 21, 2016 9:52 am
A- A A+ Print

জামদানি বাংলাদেশেরই থাকল

d09da7f0278df21431522d71b2469f29-labo0212

বাংলাদেশের জামদানি বাংলাদেশেরই থাকল। জামদানি নামক বস্ত্রের আদিভূমি যে এই দেশ, পাওয়া গেল তার পাকাপাকি আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি। আন্তর্জাতিক মেধাস্বত্ববিষয়ক সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল প্রোপার্টি রাইটস অর্গানাইজেশনের (ওয়াইপিও) নিয়ম মেনে জামদানিকে বাংলাদেশের ভৌগোলিক নির্দেশক (জিওগ্রাফিক্যাল ইনডিকেশন—জিআই) পণ্য হিসেবে ঘোষণার ধাপগুলো শেষ করা হয়েছে। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশনকে (বিসিক) এই জিআই স্বত্ব দেওয়া হয়েছে।

বিসিকের পক্ষে জামদানির জিআই স্বত্ব দেওয়ার সার্টিফিকেট তৈরির জন্য ইতিমধ্যে রাষ্ট্রীয় প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান বিজি প্রেসকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। চলতি মাসের শেষের দিকে সরকারের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারকদের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশের জামদানির জিআই পাওয়ার ঘোষণা দেওয়া হতে পারে বলে শিল্প মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে। ওয়াইপিওর নিয়ম অনুযায়ী, বাংলাদেশের কোনো সংস্থা বা গোষ্ঠীকে জিআই দেওয়ার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে শিল্প মন্ত্রণালয়ের অন্তর্ভুক্ত সংস্থা পেটেন্ট, ডিজাইন ও ট্রেডমার্ক অধিদপ্তরকে।

কোনো একটি দেশের নির্দিষ্ট ভূখণ্ডের মাটি, পানি, আবহাওয়া ও সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে উচ্চতা এবং সেখানকার জনগোষ্ঠীর সংস্কৃতি যদি কোনো একটি পণ্য উৎপাদনের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে, তাহলে সেটিকে সেই দেশের ভৌগোলিক নির্দেশক পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। অর্থাৎ, সেই পণ্য শুধু ওই এলাকা ছাড়া অন্য কোথাও উৎপাদন করা সম্ভব নয়। যেমন হিমালয় পর্বতমালার চূড়ায় যে তুলা উৎপাদিত হয় এবং তা থেকে যে শাল হয়, তা বিশ্বের সবচেয়ে উন্নত প্রযুক্তি দিয়েও উৎপাদন সম্ভব নয়। তাই সেটা ওই এলাকার জিআই পণ্য। আমাদের জামদানিকে বাংলাদেশের জিআই পণ্য হিসেবে দাবি করা হয়েছে।

তবে বাংলাদেশ শুধু জামদানি শাড়ির জিআই পায়নি, পেয়েছে জামদানিশিল্পের সুনির্দিষ্ট নকশা যেসব পণ্যের ওপর করা হয়, তার সব কটির স্বত্ব। যেমন জামদানির কাজ করা সালোয়ার-কামিজ, ওড়না, রুমাল, পর্দা, কুর্তা, পাগড়ি থেকে শুরু করে ঘর সাজানোর সরঞ্জাম।

জিআই বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ তৈরি পোশাক ও গৃহসামগ্রীর বিশ্ববাজারে জামদানির নকশা অন্তর্ভুক্ত করে বাংলাদেশের ঐতিহ্য প্রচার করতে পারবে। পাশাপাশি এসব পণ্যে বাড়তি দামও পেতে পারে। ভারত, চীন, মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপের দেশগুলো তাদের দূতাবাস ও বেসরকারি উদ্যোক্তাদের মাধ্যমে নিজেদের জিআই পণ্যকে আলাদা গুরুত্ব দিয়ে বিশ্ববাজারে বিক্রি করছে।

যেভাবে জিআই নিবন্ধ

ওয়াইপিও থেকে বাংলাদেশের জিআই পণ্য নিবন্ধন দেওয়ার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে শিল্প মন্ত্রণালয়ের অন্তর্ভুক্ত সংস্থা পেটেন্ট ডিজাইন ও ট্রেডমার্কস অধিদপ্তরকে। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার নিয়ম অনুযায়ী কোনো পণ্যের ভৌগোলিক নির্দেশকের (জিআই) জন্য নিবন্ধন নিতে হয়।

জিআই নিবন্ধন পেতে হলে ওই পণ্য যে সংশ্লিষ্ট দেশের সীমানা বা ভূখণ্ডে উদ্ভব বা তৈরি হয়েছে, তার ঐতিহাসিক ও বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ হাজির করতে হয়। জিআই নিবন্ধন দেওয়ার জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত রাষ্ট্রীয় সংস্থাকে ওই প্রমাণপত্রসহ একটি প্রবন্ধ তাদের নিজস্ব জার্নালে প্রকাশ করতে হয়। জার্নালে প্রকাশের দুই মাসের মাথায় অন্য কোনো দেশের প্রতিষ্ঠান বা গোষ্ঠীর পক্ষ থেকে যদি ওই তথ্যের ব্যাপারে আপত্তি তোলা না হয় বা অন্য কোনো সংস্থা ওই পণ্যের নিবন্ধনের দাবি না তোলে, তাহলে যে দেশ প্রবন্ধ প্রকাশ করে জিআই নিবন্ধন চেয়েছে, তা সেই দেশের নামে পণ্যটি নিবন্ধিত হয়ে থাকে।

গত ৫ আগস্ট জিআই নিবন্ধনের শর্ত হিসেবে বাংলাদেশের জামদানির জন্ম, উৎপাদন, বিস্তার এবং বিশ্ববাজারে ছড়িয়ে পড়া নিয়ে পেটেন্ট ডিজাইন ও ট্রেডমার্কস অধিদপ্তর তাদের নিজস্ব জার্নালে ২৬ পৃষ্ঠার একটি প্রবন্ধ প্রকাশ করে। ৫ অক্টোবর প্রবন্ধ প্রকাশের দুই মাস পেরিয়েছে। আশঙ্কা ছিল ভারত, নেপাল ও পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশের জামদানির জিআই নিয়ে আপত্তি উঠতে পারে। তা হয়নি। ভারতের অন্ধ্র প্রদেশ থেকে এর আগে ‘উপাধ্যায় জামদানি’ নামের একটি শাড়ির নিবন্ধন দেওয়া হয়েছে। কিন্তু শুধু ‘জামদানি’ নামে নিবন্ধন চেয়ে কেউ দাবি করেননি।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে পেটেন্ট ডিজাইন ও ট্রেডমার্কস অধিদপ্তরের নিবন্ধক সানোয়ার হোসেন এ ব্যাপারে প্রথমআলোকেবলেন, ‘আন্তর্জাতিক ও রাষ্ট্রীয় সব নিয়ম অনুসরণ শেষে আমরা বিসিকের নামে জামদানির নিবন্ধন দিতে যাচ্ছি। আশা করি, আমরা চলতি মাসের শেষের দিকে বড় একটি জামদানি উৎসবের মাধ্যমে এর আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেব।’

তবে জামদানি যে বাংলাদেশের পণ্য, তা এর আগেও জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও ঐতিহ্যবিষয়ক সংস্থা ইউনেসকো থেকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছিল। বাংলাদেশের ইনট্রানজিবল বা নিজস্ব ও অবিকৃত পণ্য হিসেবে ২০১৩ সালে জামদানিকে স্বীকৃতি দিয়েছিল ইউনেসকো। তবে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সংস্থা ডব্লিউটিওর নিয়ম অনুযায়ী জিআই মেধাস্বত্বের আলাদা স্বীকৃতি নিতে হয়।

ওয়াইপিওর মাধ্যমে জিআই নিবন্ধন পাওয়ায় বাংলাদেশের নতুন কী অর্জিত হবে—এই প্রশ্ন করলে মেধাস্বত্ব গবেষক ও বেসরকারি সংস্থা ‘আমাদের গ্রাম’-এর পরিচালক রেজা সেলিম প্রথম আলোকে বলেন, ‘এই স্বীকৃতির প্রধান দাবিদার আমাদের দেশের জামদানি কারিগরেরা। তাঁদের শিল্পরুচি, মেধা ও সৌন্দর্যবোধ যে আন্তর্জাতিক মানের, তা এর মধ্য দিয়ে প্রমাণিত হলো। দেশের জামদানি কারিগরেরা যাতে জিআই স্বত্বের সুবিধা পান, সে জন্য আন্তর্জাতিক বাজারে জামদানি পণ্যের বিক্রি বাড়াতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও দূতাবাসগুলোকে উদ্যোগ নিতে হবে।’

জামদানি কেন আমাদের

জামদানির জিআই পাওয়ার জন্য বাংলাদেশের পক্ষ থেকে প্রকাশ করা নিবন্ধে বেশ কিছু যুক্তি তুলে ধরা হয়। তাতে বলা হয়েছে, খ্রিষ্টপূর্ব তৃতীয় শতকে প্রাচীন ভারতীয় অর্থশাস্ত্রবিদ কৌটিল্য তাঁর অর্থশাস্ত্র বইয়ে ঢাকাই মসলিন ও জামদানির কথা উল্লেখ করেছেন। ১৪ শতকের মুসলিম পরিব্রাজক ইবনে বতুতার লেখায়ও ঢাকার অদূরে সোনারগাঁয়ে জামদানি তৈরির কথা লিপিবদ্ধ আছে। বাংলাদেশের নারায়ণগঞ্জ জেলার সোনারগাঁ, ঢাকার ধামরাই, কিশোরগঞ্জের বাজিতপুর এলাকায় এই বিশেষ ধরনের নকশাসমৃদ্ধ পণ্য ও পোশাকের জন্ম হয়। এই এলাকার মাটি, পানি ও মানুষের সৃজনশীল উদ্যোগের যোগফল হিসেবে সৃষ্টি এই পণ্য একসময় ইউরোপ, ইরান, আর্মেনিয়া, মোগল ও পাঠান ব্যবসায়ীরা কিনে নিয়ে যেতেন।

২০১৪ সালে বিবেক বালরাজ নামের এক গবেষকের প্রকাশিত বই দ্য বেঙ্গলি হারলে, দ্য লস্ট হিস্ট্রি অব বাংলাদেশি আমেরিকান বইয়ে ইউরোপীয় ব্যবসায়ীদের হাত ধরে সুদূর দক্ষিণ আমেরিকায় মসলিন ও জামদানি পৌঁছেছিল বলে উল্লেখ আছে। বর্তমান যুক্তরাষ্ট্রের ব্যবসায়ীদের প্রথম ও আদি পুঁজি মসলিন ও জামদানি থেকে তৈরি হয় বলে বাংলাপিডিয়ারপ্রধান ও ইতিহাসবিদ সিরাজুল ইসলামের গবেষণায় দেখা গেছে।

সরকারের প্রকাশ করা প্রবন্ধে অবশ্য বাংলাদেশে জামদানি সৃষ্টির উপাদান হিসেবে ব্রহ্মপুত্র ও মেঘনা নদীর তীরের কার্পাস তুলা থেকে তৈরি সূক্ষ্ম সুতা এবং ওই দুই নদীতীরের মানুষের সূক্ষ্ম শিল্পবোধের মিশ্রণ বিশেষ ভূমিকা রেখেছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

বিসিকের পক্ষ থেকে জামদানির জিআই চাওয়ার আগে এই পণ্যের মান নিয়ন্ত্রণের জন্য আন্তর্জাতিক মান নিয়ন্ত্রণ সংস্থা এসজিআই থেকে জামদানি কাপড় পরীক্ষা করা হয়েছে। তারা এর মান সম্পর্কে ইতিবাচক সার্টিফিকেট দিয়েছে। দেশি-বিদেশি বিভিন্ন ঐতিহাসিকের গবেষণার সূত্র উল্লেখ করে বাংলাদেশে জামদানির আদিভূমির পক্ষে তথ্য-প্রমাণ তুলে ধরা হয়েছে।

আরও যেসব জিআই স্বীকৃতির অপেক্ষা

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জামদানির পর বাংলাদেশের পরবর্তী পদক্ষেপ হওয়া উচিত ফজলি, হিমসাগর ও লক্ষ্মণভোগ আমের জিআই দাবি করা। এ দুটি পণ্যের জিআই ইতিমধ্যে ভারতের হাতে চলে গেছে। এ ছাড়া জিআই ও মেধাস্বত্ব গবেষক নুরুল হুদা বাংলাদেশের সম্ভাব্য জিআই হতে পারে, এমন শতাধিক পণ্যের তালিকা তৈরি করেছেন।

পেটেন্ট, ডিজাইন অ্যান্ড ট্রেডমার্কস অধিদপ্তরের কাছে সুগন্ধি চাল কালিজিরা ও কাটারিভোগকে বাংলাদেশের জিআই পণ্য হিসেবে ঘোষণা দেওয়ার আবেদন করেছে বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি)। ব্রি আরও ১৮টি দেশি ধানের জাত এবং বাংলাদেশ মৎস্য অধিদপ্তর ইলিশ মাছের জিআই আবেদনের প্রস্তুতিও শেষ করে এনেছে। এগুলোর ব্যাপারে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

Comments

Comments!

 জামদানি বাংলাদেশেরই থাকলAmarbangladeshonlineAmarbangladeshonline | Amarbangladeshonline

জামদানি বাংলাদেশেরই থাকল

Friday, October 21, 2016 9:52 am
d09da7f0278df21431522d71b2469f29-labo0212


বাংলাদেশের জামদানি বাংলাদেশেরই থাকল। জামদানি নামক বস্ত্রের আদিভূমি যে এই দেশ, পাওয়া গেল তার পাকাপাকি আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি। আন্তর্জাতিক মেধাস্বত্ববিষয়ক সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল প্রোপার্টি রাইটস অর্গানাইজেশনের (ওয়াইপিও) নিয়ম মেনে জামদানিকে বাংলাদেশের ভৌগোলিক নির্দেশক (জিওগ্রাফিক্যাল ইনডিকেশন—জিআই) পণ্য হিসেবে ঘোষণার ধাপগুলো শেষ করা হয়েছে। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশনকে (বিসিক) এই জিআই স্বত্ব দেওয়া হয়েছে।

বিসিকের পক্ষে জামদানির জিআই স্বত্ব দেওয়ার সার্টিফিকেট তৈরির জন্য ইতিমধ্যে রাষ্ট্রীয় প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান বিজি প্রেসকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। চলতি মাসের শেষের দিকে সরকারের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারকদের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশের জামদানির জিআই পাওয়ার ঘোষণা দেওয়া হতে পারে বলে শিল্প মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে। ওয়াইপিওর নিয়ম অনুযায়ী, বাংলাদেশের কোনো সংস্থা বা গোষ্ঠীকে জিআই দেওয়ার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে শিল্প মন্ত্রণালয়ের অন্তর্ভুক্ত সংস্থা পেটেন্ট, ডিজাইন ও ট্রেডমার্ক অধিদপ্তরকে।

কোনো একটি দেশের নির্দিষ্ট ভূখণ্ডের মাটি, পানি, আবহাওয়া ও সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে উচ্চতা এবং সেখানকার জনগোষ্ঠীর সংস্কৃতি যদি কোনো একটি পণ্য উৎপাদনের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে, তাহলে সেটিকে সেই দেশের ভৌগোলিক নির্দেশক পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। অর্থাৎ, সেই পণ্য শুধু ওই এলাকা ছাড়া অন্য কোথাও উৎপাদন করা সম্ভব নয়। যেমন হিমালয় পর্বতমালার চূড়ায় যে তুলা উৎপাদিত হয় এবং তা থেকে যে শাল হয়, তা বিশ্বের সবচেয়ে উন্নত প্রযুক্তি দিয়েও উৎপাদন সম্ভব নয়। তাই সেটা ওই এলাকার জিআই পণ্য। আমাদের জামদানিকে বাংলাদেশের জিআই পণ্য হিসেবে দাবি করা হয়েছে।

তবে বাংলাদেশ শুধু জামদানি শাড়ির জিআই পায়নি, পেয়েছে জামদানিশিল্পের সুনির্দিষ্ট নকশা যেসব পণ্যের ওপর করা হয়, তার সব কটির স্বত্ব। যেমন জামদানির কাজ করা সালোয়ার-কামিজ, ওড়না, রুমাল, পর্দা, কুর্তা, পাগড়ি থেকে শুরু করে ঘর সাজানোর সরঞ্জাম।

জিআই বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ তৈরি পোশাক ও গৃহসামগ্রীর বিশ্ববাজারে জামদানির নকশা অন্তর্ভুক্ত করে বাংলাদেশের ঐতিহ্য প্রচার করতে পারবে। পাশাপাশি এসব পণ্যে বাড়তি দামও পেতে পারে। ভারত, চীন, মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপের দেশগুলো তাদের দূতাবাস ও বেসরকারি উদ্যোক্তাদের মাধ্যমে নিজেদের জিআই পণ্যকে আলাদা গুরুত্ব দিয়ে বিশ্ববাজারে বিক্রি করছে।

যেভাবে জিআই নিবন্ধ

ওয়াইপিও থেকে বাংলাদেশের জিআই পণ্য নিবন্ধন দেওয়ার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে শিল্প মন্ত্রণালয়ের অন্তর্ভুক্ত সংস্থা পেটেন্ট ডিজাইন ও ট্রেডমার্কস অধিদপ্তরকে। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার নিয়ম অনুযায়ী কোনো পণ্যের ভৌগোলিক নির্দেশকের (জিআই) জন্য নিবন্ধন নিতে হয়।

জিআই নিবন্ধন পেতে হলে ওই পণ্য যে সংশ্লিষ্ট দেশের সীমানা বা ভূখণ্ডে উদ্ভব বা তৈরি হয়েছে, তার ঐতিহাসিক ও বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ হাজির করতে হয়। জিআই নিবন্ধন দেওয়ার জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত রাষ্ট্রীয় সংস্থাকে ওই প্রমাণপত্রসহ একটি প্রবন্ধ তাদের নিজস্ব জার্নালে প্রকাশ করতে হয়। জার্নালে প্রকাশের দুই মাসের মাথায় অন্য কোনো দেশের প্রতিষ্ঠান বা গোষ্ঠীর পক্ষ থেকে যদি ওই তথ্যের ব্যাপারে আপত্তি তোলা না হয় বা অন্য কোনো সংস্থা ওই পণ্যের নিবন্ধনের দাবি না তোলে, তাহলে যে দেশ প্রবন্ধ প্রকাশ করে জিআই নিবন্ধন চেয়েছে, তা সেই দেশের নামে পণ্যটি নিবন্ধিত হয়ে থাকে।

গত ৫ আগস্ট জিআই নিবন্ধনের শর্ত হিসেবে বাংলাদেশের জামদানির জন্ম, উৎপাদন, বিস্তার এবং বিশ্ববাজারে ছড়িয়ে পড়া নিয়ে পেটেন্ট ডিজাইন ও ট্রেডমার্কস অধিদপ্তর তাদের নিজস্ব জার্নালে ২৬ পৃষ্ঠার একটি প্রবন্ধ প্রকাশ করে। ৫ অক্টোবর প্রবন্ধ প্রকাশের দুই মাস পেরিয়েছে। আশঙ্কা ছিল ভারত, নেপাল ও পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশের জামদানির জিআই নিয়ে আপত্তি উঠতে পারে। তা হয়নি। ভারতের অন্ধ্র প্রদেশ থেকে এর আগে ‘উপাধ্যায় জামদানি’ নামের একটি শাড়ির নিবন্ধন দেওয়া হয়েছে। কিন্তু শুধু ‘জামদানি’ নামে নিবন্ধন চেয়ে কেউ দাবি করেননি।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে পেটেন্ট ডিজাইন ও ট্রেডমার্কস অধিদপ্তরের নিবন্ধক সানোয়ার হোসেন এ ব্যাপারে প্রথমআলোকেবলেন, ‘আন্তর্জাতিক ও রাষ্ট্রীয় সব নিয়ম অনুসরণ শেষে আমরা বিসিকের নামে জামদানির নিবন্ধন দিতে যাচ্ছি। আশা করি, আমরা চলতি মাসের শেষের দিকে বড় একটি জামদানি উৎসবের মাধ্যমে এর আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেব।’

তবে জামদানি যে বাংলাদেশের পণ্য, তা এর আগেও জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও ঐতিহ্যবিষয়ক সংস্থা ইউনেসকো থেকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছিল। বাংলাদেশের ইনট্রানজিবল বা নিজস্ব ও অবিকৃত পণ্য হিসেবে ২০১৩ সালে জামদানিকে স্বীকৃতি দিয়েছিল ইউনেসকো। তবে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সংস্থা ডব্লিউটিওর নিয়ম অনুযায়ী জিআই মেধাস্বত্বের আলাদা স্বীকৃতি নিতে হয়।

ওয়াইপিওর মাধ্যমে জিআই নিবন্ধন পাওয়ায় বাংলাদেশের নতুন কী অর্জিত হবে—এই প্রশ্ন করলে মেধাস্বত্ব গবেষক ও বেসরকারি সংস্থা ‘আমাদের গ্রাম’-এর পরিচালক রেজা সেলিম প্রথম আলোকে বলেন, ‘এই স্বীকৃতির প্রধান দাবিদার আমাদের দেশের জামদানি কারিগরেরা। তাঁদের শিল্পরুচি, মেধা ও সৌন্দর্যবোধ যে আন্তর্জাতিক মানের, তা এর মধ্য দিয়ে প্রমাণিত হলো। দেশের জামদানি কারিগরেরা যাতে জিআই স্বত্বের সুবিধা পান, সে জন্য আন্তর্জাতিক বাজারে জামদানি পণ্যের বিক্রি বাড়াতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও দূতাবাসগুলোকে উদ্যোগ নিতে হবে।’

জামদানি কেন আমাদের

জামদানির জিআই পাওয়ার জন্য বাংলাদেশের পক্ষ থেকে প্রকাশ করা নিবন্ধে বেশ কিছু যুক্তি তুলে ধরা হয়। তাতে বলা হয়েছে, খ্রিষ্টপূর্ব তৃতীয় শতকে প্রাচীন ভারতীয় অর্থশাস্ত্রবিদ কৌটিল্য তাঁর অর্থশাস্ত্র বইয়ে ঢাকাই মসলিন ও জামদানির কথা উল্লেখ করেছেন। ১৪ শতকের মুসলিম পরিব্রাজক ইবনে বতুতার লেখায়ও ঢাকার অদূরে সোনারগাঁয়ে জামদানি তৈরির কথা লিপিবদ্ধ আছে। বাংলাদেশের নারায়ণগঞ্জ জেলার সোনারগাঁ, ঢাকার ধামরাই, কিশোরগঞ্জের বাজিতপুর এলাকায় এই বিশেষ ধরনের নকশাসমৃদ্ধ পণ্য ও পোশাকের জন্ম হয়। এই এলাকার মাটি, পানি ও মানুষের সৃজনশীল উদ্যোগের যোগফল হিসেবে সৃষ্টি এই পণ্য একসময় ইউরোপ, ইরান, আর্মেনিয়া, মোগল ও পাঠান ব্যবসায়ীরা কিনে নিয়ে যেতেন।

২০১৪ সালে বিবেক বালরাজ নামের এক গবেষকের প্রকাশিত বই দ্য বেঙ্গলি হারলে, দ্য লস্ট হিস্ট্রি অব বাংলাদেশি আমেরিকান বইয়ে ইউরোপীয় ব্যবসায়ীদের হাত ধরে সুদূর দক্ষিণ আমেরিকায় মসলিন ও জামদানি পৌঁছেছিল বলে উল্লেখ আছে। বর্তমান যুক্তরাষ্ট্রের ব্যবসায়ীদের প্রথম ও আদি পুঁজি মসলিন ও জামদানি থেকে তৈরি হয় বলে বাংলাপিডিয়ারপ্রধান ও ইতিহাসবিদ সিরাজুল ইসলামের গবেষণায় দেখা গেছে।

সরকারের প্রকাশ করা প্রবন্ধে অবশ্য বাংলাদেশে জামদানি সৃষ্টির উপাদান হিসেবে ব্রহ্মপুত্র ও মেঘনা নদীর তীরের কার্পাস তুলা থেকে তৈরি সূক্ষ্ম সুতা এবং ওই দুই নদীতীরের মানুষের সূক্ষ্ম শিল্পবোধের মিশ্রণ বিশেষ ভূমিকা রেখেছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

বিসিকের পক্ষ থেকে জামদানির জিআই চাওয়ার আগে এই পণ্যের মান নিয়ন্ত্রণের জন্য আন্তর্জাতিক মান নিয়ন্ত্রণ সংস্থা এসজিআই থেকে জামদানি কাপড় পরীক্ষা করা হয়েছে। তারা এর মান সম্পর্কে ইতিবাচক সার্টিফিকেট দিয়েছে। দেশি-বিদেশি বিভিন্ন ঐতিহাসিকের গবেষণার সূত্র উল্লেখ করে বাংলাদেশে জামদানির আদিভূমির পক্ষে তথ্য-প্রমাণ তুলে ধরা হয়েছে।

আরও যেসব জিআই স্বীকৃতির অপেক্ষা

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জামদানির পর বাংলাদেশের পরবর্তী পদক্ষেপ হওয়া উচিত ফজলি, হিমসাগর ও লক্ষ্মণভোগ আমের জিআই দাবি করা। এ দুটি পণ্যের জিআই ইতিমধ্যে ভারতের হাতে চলে গেছে। এ ছাড়া জিআই ও মেধাস্বত্ব গবেষক নুরুল হুদা বাংলাদেশের সম্ভাব্য জিআই হতে পারে, এমন শতাধিক পণ্যের তালিকা তৈরি করেছেন।

পেটেন্ট, ডিজাইন অ্যান্ড ট্রেডমার্কস অধিদপ্তরের কাছে সুগন্ধি চাল কালিজিরা ও কাটারিভোগকে বাংলাদেশের জিআই পণ্য হিসেবে ঘোষণা দেওয়ার আবেদন করেছে বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি)। ব্রি আরও ১৮টি দেশি ধানের জাত এবং বাংলাদেশ মৎস্য অধিদপ্তর ইলিশ মাছের জিআই আবেদনের প্রস্তুতিও শেষ করে এনেছে। এগুলোর ব্যাপারে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

Comments

comments

সম্পাদক : মোহাম্মদ আবদুল বাছির
প্রকাশক: মোহাম্মদ জহিরুল ইসলাম
ফোন : ‎০১৭১৩৪০৯০৯০
৩৪৫/১, দিলু রোড, নিউ ইস্কাটন, ঢাকা-১০০০
X
 
নিয়মিত খবর পড়তে আমাদের ফেসবুক পেজে লাইক দিয়ে যুক্ত থাকুন
X