রবিবার, ২৫শে ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ ইং, ১৩ই ফাল্গুন, ১৪২৪ বঙ্গাব্দ, সকাল ১১:৪১
শিরোনাম
  • ঘৃণাকে বিজয়ী হতে দেয়া যাবে না, ট্রাম্পকে ইঙ্গিত করে জর্জ ক্লুনি
  • আমার একটাই চিন্তা দেশের মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন করা: প্রধানমন্ত্রী
  • ‘কেন্দ্রীয় সরকারের আগ্রাসী নীতির কারণে কাশ্মীরকে হারাতে হবে’
  • সাড়ে চারমাস পর মুখোমুখি, খাদিজাকে উদ্দেশ্য করে যা বলল বদরুল
  • খালেদার ‘সাজা’ বিরোধী নেতাকর্মীদের মনোবল ভাঙ্গার কৌশল!
  • বিএনপির কর্মসূচি ‘যথাসময়ে’ জানানো হবে: রিজভী
  • দলের জন্য বোলিং করতেও রাজি মুশফিক
  • শিশু জিহাদের মৃত্যু: চার জনের ১০ বছর করে কারাদণ্ড
  • অবশেষে বাড়ি অবরুদ্ধ করে রাখা সেই দেয়াল ভেঙ্গে ফেলা হচ্ছে
  • সাক্ষ্য দিলেন খাদিজা, চাইলেন বদরুলের সর্বোচ্চ শাস্তি
  • বদরুলের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিতে আদালতে খাদিজা
  • আজ বগুড়ায় যেসব প্রকল্প উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী
  • রোহিঙ্গা স্থানান্তরের সরকারি পরিকল্পনার সঙ্গে দ্বিমত মানবাধিকার কমিশনের
  • মহেশখালীতে ইয়াবা ব্যবসায়ীদের সঙ্গে পুলিশের ‘বন্দুকযুদ্ধ’
  • হোয়াইট হাউসে কাজ করার দীর্ঘ অভিজ্ঞতার কথা জানালেন এই বাংলাদেশি সাংবাদিক
Wednesday, December 28, 2016 9:12 am
A- A A+ Print

জ্বালানি পরিস্থিতি : বাংলাদেশে জ্বালানির নিকট, মধ্যম ও দূর ভবিষ্যৎ

%e0%a7%a7%e0%a7%a8

বদরূল ইমাম | সম্প্রতি ঢাকায় অনুষ্ঠিত ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি কর্তৃক আয়োজিত এক আন্তর্জাতিক সম্মেলনে জ্বালানিবিষয়ক মূল প্রবন্ধ উপস্থাপক ডেনমার্কের জ্বালানি বিশেষজ্ঞ এন্ডার্স হেসেলার্জার নিকট ও দূরবর্তী ভবিষ্যতের জ্বালানি ব্যবস্থাপনায় বহুমাত্রিক জ্বালানি ব্যবহারের গুরুত্ব উল্লেখ করে বলেন, বাংলাদেশের পক্ষে নবায়নযোগ্য—যেমন সৌর, বায়ু, জৈব জ্বালানির ব্যাপক প্রসারের পথে যথেষ্ট জোর দেওয়া উচিত। তিনি জানান, ডেনমার্কে বর্তমানে ব্যবহৃত মোট জ্বালানির ৩০ শতাংশ জোগান দেয় নবায়নযোগ্য সৌর ও বায়ুশক্তি। আর এগুলোর ব্যাপক ব্যবহার বৃদ্ধি ঘটার মাধ্যমে ২০৩০ সালে তা দেশটির মোট ব্যবহৃত জ্বালানির ৫০ শতাংশ জোগান দেবে। অনেক ইউরোপীয় দেশ একইভাবে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহারে সমতালে অগ্রসর হয়ে চলেছে। ১৯৯০-এর দশকে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক পিটার ওডেল ভবিষ্যদ্বাণী করেন, ২০৪০ সাল পর্যন্ত বিশ্ব সনাতনী জ্বালানি তেল, গ্যাস ও কয়লার ওপর মূলত নির্ভর করে থাকবে। ২০৬০ থেকে তেল-গ্যাস-কয়লা সনাতনী জ্বালানির সঙ্গে সৌর, বায়ু ও অন্যান্য নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রতিযোগিতা চরমে পৌঁছাবে এবং ২০৭০ সালের পরই এ প্রতিযোগিতায় নবায়নযোগ্য জ্বালানি বিজয়ের পথ দেখতে পাবে। ডেনমার্ক বা অনেক ইউরোপীয় দেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যাপক প্রসার দেখে অনেকেই প্রশ্ন করছেন, তবে কি নবায়নযোগ্য জ্বালানির বিশ্ববিজয় ২০৭০ সালের আগেই ঘটে যাবে? ডেনমার্ক বা অন্যান্য ইউরোপীয় দেশে পর্যাপ্ত সূর্যের আলো সহজলভ্য নয়, যেমনটি বাংলাদেশে রয়েছে। তথাপি বাংলাদেশে জ্বালানি মিশ্রণে নবায়নযোগ্য জ্বালানির (সৌর, বায়ু, জৈব ইত্যাদি) অংশীদারত্ব মাত্র ৩ শতাংশ, যা কিনা ডেনমার্কের তুলনায় অনেক অনেক কম। সরকারি পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০১৫ সালে বাংলাদেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানির অংশীদারত্ব মোট জ্বালানি ব্যবহারের ৫ শতাংশ হওয়ার কথা থাকলেও তা বাস্তবায়িত হয়নি। বাংলাদেশে ২০২১ সালের মধ্যে জ্বালানি মিশ্রণে নবায়নযোগ্য জ্বালানির অংশীদারত্ব ১০ শতাংশ হবে বলে সরকার প্রাক্কলন করে। সে অনুযায়ী ২০২১ সালে নবায়নযোগ্য জ্বালানিনির্ভর বিদ্যুৎ উৎপাদন ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট

(সে সময় পরিকল্পিত মোট বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা ২৪ হাজারের ১০ শতাংশ) হওয়ার কথা। অর্থাৎ আগামী পাঁচ বছরে নবায়নযোগ্য জ্বালানি (মূলত সৌর ও জলবিদ্যুৎনির্ভর) বিদ্যুতের পরিমাণ বর্তমান ৪৫০ মেগাওয়াট থেকে বেড়ে ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট হওয়ার কথা। অথচ সেই লক্ষ্য অর্জনের জন্য পর্যাপ্ত প্রকল্প দৃশ্যমান না থাকায় তা বাস্তবায়িত হবে বলে পর্যবেক্ষক মহল মনে করে না। বাংলাদেশে জ্বালানি মিশ্রণে সৌর জ্বালানির অংশ খুব কম তথা ২ শতাংশের নিচে। তবু সৌর জ্বালানি এ দেশে এক অর্থে সফলতা অর্জনের দাবি রাখে এ কারণে যে এ দেশে বিশ্বের দ্রুততম গতিতে সোলার হোম সিস্টেমের (এসএমএস) প্রসার ঘটে চলেছে। দেশে প্রতি মাসে প্রায় ৬০ হাজার এসএমএস স্থাপিত হয়ে থাকে, যার মাধ্যমে এ পর্যন্ত প্রায় ৪৫ লাখ বাড়িতে সৌরবিদ্যুৎ পৌঁছেছে, যাদের মোট উৎপাদন ক্ষমতা ১৯৫ মেগাওয়াট। পরিমাণগত দিক থেকে এ পরিমাণ বিদ্যুৎ সামান্যই বটে (দেশে বিদ্যুতের মোট উৎপাদন ক্ষমতা ১৩ হাজার মেগাওয়াট)। কিন্তু এটির অবদান এই অর্থে বিশাল যে এর ফলে দেশের গ্রিডহীন ও দূরবর্তী অঞ্চলে বিরাট এক সুবিধাবঞ্চিত গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর কাছে বিদ্যুৎ পৌঁছেছে। এই জনগোষ্ঠী গ্রিড লাইনের মাধ্যমে কখনো বিদ্যুতের সুবিধা পেত না। সৌরবিদ্যুৎ তাদের জীবনযাত্রার মান বৃদ্ধি করে নীরব বিপ্লব ঘটিয়েছে। দূরবর্তী এক গ্রামীণ বাসস্থানে বিদ্যুৎ পৌঁছে দেওয়া এক কথা আর দ্রুত ও ব্যাপক শিল্পায়নের লক্ষ্য নিয়ে অপেক্ষমাণ একটি বিরাট জনগোষ্ঠীর বিদ্যুৎ চাহিদা মেটানো ভিন্নতর বটে। এটি একটি বড় চ্যালেঞ্জ। বাংলাদেশ বর্তমানে জ্বালানি-সংকটে রয়েছে। নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশ ছাড়িয়ে উচ্চ মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হতে হলে বাংলাদেশের জনপ্রতি আয় বৃদ্ধি করতে হবে, যার জন্য জনপ্রতি জ্বালানি ব্যবহার আরও বৃদ্ধি করা অত্যাবশ্যক। বর্তমানে বাংলাদেশে দ্রুত ও ব্যাপক শিল্পায়ন ও বিদ্যুতায়নের অন্যতম প্রধান সমস্যা হলো প্রাথমিক জ্বালানির স্বল্পতা। দেশটি দীর্ঘ সময় ধরে নিজস্ব প্রাকৃতিক গ্যাসনির্ভর প্রায় একক জ্বালানির দেশ হিসেবে পরিচিত ছিল। ক্রমাগতভাবে গ্যাস মজুত কমে গিয়ে নিঃশেষ হওয়ার আশঙ্কা বাস্তবে আসন্ন হওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ শিগগিরই জ্বালানি-সংকটে পড়ে। আর এর জন্য কোনো পূর্বপ্রস্তুতি ছিল না বিধায় নেহাত অপ্রস্তুত বাংলাদেশ এ-সংকট থেকে বের হতে পারে না। দেশের উত্তরাঞ্চলে বড় কয়লার মজুত থাকা সত্ত্বেও কয়লাখনি উন্নয়নের পর্যাপ্ত ব্যবস্থাপনা না থাকায় গ্যাসের বিকল্প হিসেবে কয়লা ব্যবহার সম্ভব হয় না। তাই সরকার বর্তমান, নিকট ও দূরবর্তী ভবিষ্যতের সমাধান খুঁজতে আমদানি করা জ্বালানি—যেমন আমদানি করা কয়লা, এলএনজি ও তেলের ওপর নির্ভর করার সিদ্ধান্ত নেয়। এক হিসাব অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশে ব্যবহৃত মোট জ্বালানির ৯০ শতাংশ হবে আমদানি করা। আর এটি সম্ভব করতে বাংলাদেশকে মোটা অঙ্কের অর্থ জোগান দিতে হবে।

বিশ্ববাজারে তেল, এলএনজি বা কয়লার দামের বর্তমান নিম্ন অবস্থান দীর্ঘস্থায়ী হবে না; বরং তা আবার আগের মূল্যে বা অধিকতর মূল্যে ফিরে যাবে। সুতরাং দীর্ঘ মেয়াদে আমদানি করা জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল হলে অর্থনীতির ওপর চাপ সৃষ্টি হবে

বিশ্ববাজারে তেল, এলএনজি বা কয়লার দামের বর্তমান নিম্ন অবস্থান দীর্ঘস্থায়ী হবে না; বরং তা আবার আগের মূল্যে বা অধিকতর মূল্যে ফিরে যাবে। সুতরাং দীর্ঘ মেয়াদে আমদানি করা জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল হলে অর্থনীতির ওপর চাপ সৃষ্টি হবে, শিল্পজাত দ্রব্য ও বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি পাবে এবং মুদ্রাস্ফীতি ঘটবে। দেশে চলমান গ্যাসঘাটতি মেটাতে স্বল্প মেয়াদের জন্য উচ্চমূল্যের এলএনজি আমদানি যৌক্তিক মনে করা যায়, কিন্তু দীর্ঘ মেয়াদের জন্য উচ্চমূল্যের এলএনজির ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল হওয়ার যুক্তি প্রশ্নবিদ্ধ। এটির মোক্ষম বিকল্প হলো দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান জোরালো করা এবং প্রাপ্ত গ্যাস সম্পদের দ্রুত উন্নয়ন করা। বাংলাদেশে তেল-গ্যাসের জন্য জোরালো অনুসন্ধানকাজ প্রায় এক দশক ধরে হয় না। এর ফলে দীর্ঘদিন দেশের মজুতে উল্লেখযোগ্য কোনো গ্যাস সংযোজন ঘটেনি। গত ১০ বছরে বাংলাদেশে ১০টির কম অনুসন্ধান কূপ খননের ধারা যেকোনো মানদণ্ডে একটি অবহেলিত কর্মযজ্ঞের সাক্ষ্য বহন করে। যদিও সমুদ্রবিরোধ নিষ্পত্তির রায়ে আন্তর্জাতিক আদালত কর্তৃক বাংলাদেশ বড় একটি বিরোধহীন সমুদ্র অঞ্চল অর্জন করে, সেখানে গ্যাস-তেল অনুসন্ধানে জোরালো কার্যক্রম শুরু হয়নি। অপরপক্ষে মিয়ানমার ২০১২ সালে এ রায় ঘোষণার পর থেকেই তার সমুদ্র অঞ্চলে জোরালো অনুসন্ধানকাজ করার মাধ্যমে বেশসংখ্যক গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কার করে। ভূতত্ত্ববিদদের মতে, বঙ্গোপসাগরে মিয়ানমার অংশে (রাখাইন বেসিন) গ্যাস প্রাপ্তির যে সাফল্য দেখা গেছে, একই রকম সাফল্য সমুদ্র সীমানার এপারে বাংলাদেশের সমুদ্র অংশেও পাওয়া যাবে। কারণ, মিয়ানমারের রাখাইন বেসিন ও বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্ব সমুদ্র বেসিন মূলত একই ভূতাত্ত্বিক কাঠামোর অংশ। এটি হতাশাজনক যে বাংলাদেশ সমুদ্রে যথেষ্ট অনুসন্ধানকাজের মাধ্যমে উপরিউক্ত তত্ত্বটি প্রমাণ করার উদ্যোগ গ্রহণ করেনি। বাংলাদেশের জ্বালানি ও বিদ্যুৎ দৃশ্যপট বড় আকারের পরিবর্তনের দ্বারপ্রান্তে অবস্থান করছে। সরকারি প্রাক্কলন ও প্রচার অনুযায়ী, ২০২০ দশকে বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতার বহর বহুগুণে বৃদ্ধি পেতে যাচ্ছে। এ লক্ষ্য বাস্তবায়নের পথে সবচেয়ে বড় বাধা দীর্ঘস্থায়ী ও সাশ্রয়ী প্রাথমিক জ্বালানি সরবরাহ করা। দেশে ভবিষ্যতে জ্বালানি মিশ্রণে বিরাট পরিমাণ আমদানি করা কয়লা, আমদানি করা এলএনজি, আমদানি করা ভারতীয় বিদ্যুৎ, আমদানি করা তেজস্ক্রিয় জ্বালানি, আমদানি করা তেল অন্তর্ভুক্ত হতে যাচ্ছে। তবে এ ধরনের পরিকল্পনা অনুযায়ী বিপুল পরিমাণ জ্বালানির দীর্ঘমেয়াদি আমদানি দেশের অর্থনীতিতে যে ধাক্কা দেবে, তা কীভাবে সামাল দেওয়া যাবে, সে প্রশ্ন রয়েই যায়। সম্পূর্ণ বা প্রায় সম্পূর্ণ আমদানিনির্ভর জ্বালানি ব্যবস্থাপনা বাংলাদেশকে অপর এক সংকটে ফেলে দিতে পারে। নিকট ও মধ্যবর্তী (২০২০-৩০) ভবিষ্যতে এই সংকট এড়াতে জ্বালানি আমদানি নির্ভরশীলতা কমিয়ে বাংলাদেশের উচিত অনতিবিলম্বে দেশে, বিশেষ করে সমুদ্রের গ্যাস অনুসন্ধানের জোরালো ও চূড়ান্ত কার্যক্রম শুরু করা, সম্ভাব্য সর্বোচ্চ মাত্রায় সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন করা ও দেশীয় কয়লা উত্তোলনে বাস্তবধর্মী পদক্ষেপ নেওয়া। মধ্যম ও দূরবর্তী (২০৩০-৫০) ভবিষ্যতের জন্য বাংলাদেশকে নেপাল, ভুটান ও ভারতের জলবিদ্যুৎ প্রকল্প এবং বাস্তবায়ন সাপেক্ষে আন্তদেশীয় পাইপলাইন গ্যাসসংযোগ প্রকল্প (ইরান-পাকিস্তান-ভারত অথবা তুর্কমেনিস্তান-আফগানিস্তান- পাকিস্তান-ভারত) সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে হবে। অতি দূরবর্তী ভবিষ্যতে (২০৬০ ও তারপর) কেবল বাংলাদেশই নয়; বরং সমগ্র বিশ্বের জ্বালানি বাজারে নবায়নযোগ্য (মূলত সৌর, বায়ু ও জৈব) জ্বালানি সাশ্রয়ী ও সহজলভ্য হয়ে দেখা দেবে এবং ক্রমান্বয়ে এগুলো বিশ্ব জ্বালানি বাজারকে সম্পূর্ণভাবে গ্রাস করবে। সে সময়টি (২০৮০?) বাংলাদেশের জন্য অপেক্ষাকৃত সুখকর হতে পারে যখন তেল-গ্যাস-কয়লার মতো জ্বালানিগুলো কেবল ইতিহাসের পাতায় স্থান করে নেবে। ড. বদরূল ইমাম: অধ্যাপক, ভূতত্ত্ব বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

Comments

Comments!

 জ্বালানি পরিস্থিতি : বাংলাদেশে জ্বালানির নিকট, মধ্যম ও দূর ভবিষ্যৎAmarbangladeshonlineAmarbangladeshonline | Amarbangladeshonline

জ্বালানি পরিস্থিতি : বাংলাদেশে জ্বালানির নিকট, মধ্যম ও দূর ভবিষ্যৎ

Wednesday, December 28, 2016 9:12 am
%e0%a7%a7%e0%a7%a8

বদরূল ইমাম | সম্প্রতি ঢাকায় অনুষ্ঠিত ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি কর্তৃক আয়োজিত এক আন্তর্জাতিক সম্মেলনে জ্বালানিবিষয়ক মূল প্রবন্ধ উপস্থাপক ডেনমার্কের জ্বালানি বিশেষজ্ঞ এন্ডার্স হেসেলার্জার নিকট ও দূরবর্তী ভবিষ্যতের জ্বালানি ব্যবস্থাপনায় বহুমাত্রিক জ্বালানি ব্যবহারের গুরুত্ব উল্লেখ করে বলেন, বাংলাদেশের পক্ষে নবায়নযোগ্য—যেমন সৌর, বায়ু, জৈব জ্বালানির ব্যাপক প্রসারের পথে যথেষ্ট জোর দেওয়া উচিত। তিনি জানান, ডেনমার্কে বর্তমানে ব্যবহৃত মোট জ্বালানির ৩০ শতাংশ জোগান দেয় নবায়নযোগ্য সৌর ও বায়ুশক্তি। আর এগুলোর ব্যাপক ব্যবহার বৃদ্ধি ঘটার মাধ্যমে ২০৩০ সালে তা দেশটির মোট ব্যবহৃত জ্বালানির ৫০ শতাংশ জোগান দেবে। অনেক ইউরোপীয় দেশ একইভাবে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহারে সমতালে অগ্রসর হয়ে চলেছে।
১৯৯০-এর দশকে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক পিটার ওডেল ভবিষ্যদ্বাণী করেন, ২০৪০ সাল পর্যন্ত বিশ্ব সনাতনী জ্বালানি তেল, গ্যাস ও কয়লার ওপর মূলত নির্ভর করে থাকবে। ২০৬০ থেকে তেল-গ্যাস-কয়লা সনাতনী জ্বালানির সঙ্গে সৌর, বায়ু ও অন্যান্য নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রতিযোগিতা চরমে পৌঁছাবে এবং ২০৭০ সালের পরই এ প্রতিযোগিতায় নবায়নযোগ্য জ্বালানি বিজয়ের পথ দেখতে পাবে। ডেনমার্ক বা অনেক ইউরোপীয় দেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যাপক প্রসার দেখে অনেকেই প্রশ্ন করছেন, তবে কি নবায়নযোগ্য জ্বালানির বিশ্ববিজয় ২০৭০ সালের আগেই ঘটে যাবে?
ডেনমার্ক বা অন্যান্য ইউরোপীয় দেশে পর্যাপ্ত সূর্যের আলো সহজলভ্য নয়, যেমনটি বাংলাদেশে রয়েছে। তথাপি বাংলাদেশে জ্বালানি মিশ্রণে নবায়নযোগ্য জ্বালানির (সৌর, বায়ু, জৈব ইত্যাদি) অংশীদারত্ব মাত্র ৩ শতাংশ, যা কিনা ডেনমার্কের তুলনায় অনেক অনেক কম। সরকারি পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০১৫ সালে বাংলাদেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানির অংশীদারত্ব মোট জ্বালানি ব্যবহারের ৫ শতাংশ হওয়ার কথা থাকলেও তা বাস্তবায়িত হয়নি। বাংলাদেশে ২০২১ সালের মধ্যে জ্বালানি মিশ্রণে নবায়নযোগ্য জ্বালানির অংশীদারত্ব ১০ শতাংশ হবে বলে সরকার প্রাক্কলন করে। সে অনুযায়ী ২০২১ সালে নবায়নযোগ্য জ্বালানিনির্ভর বিদ্যুৎ উৎপাদন ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট

(সে সময় পরিকল্পিত মোট বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা ২৪ হাজারের ১০ শতাংশ) হওয়ার কথা। অর্থাৎ আগামী পাঁচ বছরে নবায়নযোগ্য জ্বালানি (মূলত সৌর ও জলবিদ্যুৎনির্ভর) বিদ্যুতের পরিমাণ বর্তমান ৪৫০ মেগাওয়াট থেকে বেড়ে ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট হওয়ার কথা। অথচ সেই লক্ষ্য অর্জনের জন্য পর্যাপ্ত প্রকল্প দৃশ্যমান না থাকায় তা বাস্তবায়িত হবে বলে পর্যবেক্ষক মহল মনে করে না।
বাংলাদেশে জ্বালানি মিশ্রণে সৌর জ্বালানির অংশ খুব কম তথা ২ শতাংশের নিচে। তবু সৌর জ্বালানি এ দেশে এক অর্থে সফলতা অর্জনের দাবি রাখে এ কারণে যে এ দেশে বিশ্বের দ্রুততম গতিতে সোলার হোম সিস্টেমের (এসএমএস) প্রসার ঘটে চলেছে। দেশে প্রতি মাসে প্রায় ৬০ হাজার এসএমএস স্থাপিত হয়ে থাকে, যার মাধ্যমে এ পর্যন্ত প্রায় ৪৫ লাখ বাড়িতে সৌরবিদ্যুৎ পৌঁছেছে, যাদের মোট উৎপাদন ক্ষমতা ১৯৫ মেগাওয়াট। পরিমাণগত দিক থেকে এ পরিমাণ বিদ্যুৎ সামান্যই বটে (দেশে বিদ্যুতের মোট উৎপাদন ক্ষমতা ১৩ হাজার মেগাওয়াট)। কিন্তু এটির অবদান এই অর্থে বিশাল যে এর ফলে দেশের গ্রিডহীন ও দূরবর্তী অঞ্চলে বিরাট এক সুবিধাবঞ্চিত গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর কাছে বিদ্যুৎ পৌঁছেছে। এই জনগোষ্ঠী গ্রিড লাইনের মাধ্যমে কখনো বিদ্যুতের সুবিধা পেত না। সৌরবিদ্যুৎ তাদের জীবনযাত্রার মান বৃদ্ধি করে নীরব বিপ্লব ঘটিয়েছে।
দূরবর্তী এক গ্রামীণ বাসস্থানে বিদ্যুৎ পৌঁছে দেওয়া এক কথা আর দ্রুত ও ব্যাপক শিল্পায়নের লক্ষ্য নিয়ে অপেক্ষমাণ একটি বিরাট জনগোষ্ঠীর বিদ্যুৎ চাহিদা মেটানো ভিন্নতর বটে। এটি একটি বড় চ্যালেঞ্জ। বাংলাদেশ বর্তমানে জ্বালানি-সংকটে রয়েছে। নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশ ছাড়িয়ে উচ্চ মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হতে হলে বাংলাদেশের জনপ্রতি আয় বৃদ্ধি করতে হবে, যার জন্য জনপ্রতি জ্বালানি ব্যবহার আরও বৃদ্ধি করা অত্যাবশ্যক।
বর্তমানে বাংলাদেশে দ্রুত ও ব্যাপক শিল্পায়ন ও বিদ্যুতায়নের অন্যতম প্রধান সমস্যা হলো প্রাথমিক জ্বালানির স্বল্পতা। দেশটি দীর্ঘ সময় ধরে নিজস্ব প্রাকৃতিক গ্যাসনির্ভর প্রায় একক জ্বালানির দেশ হিসেবে পরিচিত ছিল। ক্রমাগতভাবে গ্যাস মজুত কমে গিয়ে নিঃশেষ হওয়ার আশঙ্কা বাস্তবে আসন্ন হওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ শিগগিরই জ্বালানি-সংকটে পড়ে। আর এর জন্য কোনো পূর্বপ্রস্তুতি ছিল না বিধায় নেহাত অপ্রস্তুত বাংলাদেশ এ-সংকট থেকে বের হতে পারে না। দেশের উত্তরাঞ্চলে বড় কয়লার মজুত থাকা সত্ত্বেও কয়লাখনি উন্নয়নের পর্যাপ্ত ব্যবস্থাপনা না থাকায় গ্যাসের বিকল্প হিসেবে কয়লা ব্যবহার সম্ভব হয় না। তাই সরকার বর্তমান, নিকট ও দূরবর্তী ভবিষ্যতের সমাধান খুঁজতে আমদানি করা জ্বালানি—যেমন আমদানি করা কয়লা, এলএনজি ও তেলের ওপর নির্ভর করার সিদ্ধান্ত নেয়। এক হিসাব অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশে ব্যবহৃত মোট জ্বালানির ৯০ শতাংশ হবে আমদানি করা। আর এটি সম্ভব করতে বাংলাদেশকে মোটা অঙ্কের অর্থ জোগান দিতে হবে।

বিশ্ববাজারে তেল, এলএনজি বা কয়লার দামের বর্তমান নিম্ন অবস্থান দীর্ঘস্থায়ী হবে না; বরং তা আবার আগের মূল্যে বা অধিকতর মূল্যে ফিরে যাবে। সুতরাং দীর্ঘ মেয়াদে আমদানি করা জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল হলে অর্থনীতির ওপর চাপ সৃষ্টি হবে

বিশ্ববাজারে তেল, এলএনজি বা কয়লার দামের বর্তমান নিম্ন অবস্থান দীর্ঘস্থায়ী হবে না; বরং তা আবার আগের মূল্যে বা অধিকতর মূল্যে ফিরে যাবে। সুতরাং দীর্ঘ মেয়াদে আমদানি করা জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল হলে অর্থনীতির ওপর চাপ সৃষ্টি হবে, শিল্পজাত দ্রব্য ও বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি পাবে এবং মুদ্রাস্ফীতি ঘটবে। দেশে চলমান গ্যাসঘাটতি মেটাতে স্বল্প মেয়াদের জন্য উচ্চমূল্যের এলএনজি আমদানি যৌক্তিক মনে করা যায়, কিন্তু দীর্ঘ মেয়াদের জন্য উচ্চমূল্যের এলএনজির ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল হওয়ার যুক্তি প্রশ্নবিদ্ধ। এটির মোক্ষম বিকল্প হলো দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান জোরালো করা এবং প্রাপ্ত গ্যাস সম্পদের দ্রুত উন্নয়ন করা।
বাংলাদেশে তেল-গ্যাসের জন্য জোরালো অনুসন্ধানকাজ প্রায় এক দশক ধরে হয় না। এর ফলে দীর্ঘদিন দেশের মজুতে উল্লেখযোগ্য কোনো গ্যাস সংযোজন ঘটেনি। গত ১০ বছরে বাংলাদেশে ১০টির কম অনুসন্ধান কূপ খননের ধারা যেকোনো মানদণ্ডে একটি অবহেলিত কর্মযজ্ঞের সাক্ষ্য বহন করে। যদিও সমুদ্রবিরোধ নিষ্পত্তির রায়ে আন্তর্জাতিক আদালত কর্তৃক বাংলাদেশ বড় একটি বিরোধহীন সমুদ্র অঞ্চল অর্জন করে, সেখানে গ্যাস-তেল অনুসন্ধানে জোরালো কার্যক্রম শুরু হয়নি। অপরপক্ষে মিয়ানমার ২০১২ সালে এ রায় ঘোষণার পর থেকেই তার সমুদ্র অঞ্চলে জোরালো অনুসন্ধানকাজ করার মাধ্যমে বেশসংখ্যক গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কার করে। ভূতত্ত্ববিদদের মতে, বঙ্গোপসাগরে মিয়ানমার অংশে (রাখাইন বেসিন) গ্যাস প্রাপ্তির যে সাফল্য দেখা গেছে, একই রকম সাফল্য সমুদ্র সীমানার এপারে বাংলাদেশের সমুদ্র অংশেও পাওয়া যাবে। কারণ, মিয়ানমারের রাখাইন বেসিন ও বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্ব সমুদ্র বেসিন মূলত একই ভূতাত্ত্বিক কাঠামোর অংশ। এটি হতাশাজনক যে বাংলাদেশ সমুদ্রে যথেষ্ট অনুসন্ধানকাজের মাধ্যমে উপরিউক্ত তত্ত্বটি প্রমাণ করার উদ্যোগ গ্রহণ করেনি।
বাংলাদেশের জ্বালানি ও বিদ্যুৎ দৃশ্যপট বড় আকারের পরিবর্তনের দ্বারপ্রান্তে অবস্থান করছে। সরকারি প্রাক্কলন ও প্রচার অনুযায়ী, ২০২০ দশকে বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতার বহর বহুগুণে বৃদ্ধি পেতে যাচ্ছে। এ লক্ষ্য বাস্তবায়নের পথে সবচেয়ে বড় বাধা দীর্ঘস্থায়ী ও সাশ্রয়ী প্রাথমিক জ্বালানি সরবরাহ করা। দেশে ভবিষ্যতে জ্বালানি মিশ্রণে বিরাট পরিমাণ আমদানি করা কয়লা, আমদানি করা এলএনজি, আমদানি করা ভারতীয় বিদ্যুৎ, আমদানি করা তেজস্ক্রিয় জ্বালানি, আমদানি করা তেল অন্তর্ভুক্ত হতে যাচ্ছে। তবে এ ধরনের পরিকল্পনা অনুযায়ী বিপুল পরিমাণ জ্বালানির দীর্ঘমেয়াদি আমদানি দেশের অর্থনীতিতে যে ধাক্কা দেবে, তা কীভাবে সামাল দেওয়া যাবে, সে প্রশ্ন রয়েই যায়। সম্পূর্ণ বা প্রায় সম্পূর্ণ আমদানিনির্ভর জ্বালানি ব্যবস্থাপনা বাংলাদেশকে অপর এক সংকটে ফেলে দিতে পারে।
নিকট ও মধ্যবর্তী (২০২০-৩০) ভবিষ্যতে এই সংকট এড়াতে জ্বালানি আমদানি নির্ভরশীলতা কমিয়ে বাংলাদেশের উচিত অনতিবিলম্বে দেশে, বিশেষ করে সমুদ্রের গ্যাস অনুসন্ধানের জোরালো ও চূড়ান্ত কার্যক্রম শুরু করা, সম্ভাব্য সর্বোচ্চ মাত্রায় সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন করা ও দেশীয় কয়লা উত্তোলনে বাস্তবধর্মী পদক্ষেপ নেওয়া। মধ্যম ও দূরবর্তী (২০৩০-৫০) ভবিষ্যতের জন্য বাংলাদেশকে নেপাল, ভুটান ও ভারতের জলবিদ্যুৎ প্রকল্প এবং বাস্তবায়ন সাপেক্ষে আন্তদেশীয় পাইপলাইন গ্যাসসংযোগ প্রকল্প (ইরান-পাকিস্তান-ভারত অথবা তুর্কমেনিস্তান-আফগানিস্তান- পাকিস্তান-ভারত) সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে হবে। অতি দূরবর্তী ভবিষ্যতে (২০৬০ ও তারপর) কেবল বাংলাদেশই নয়; বরং সমগ্র বিশ্বের জ্বালানি বাজারে নবায়নযোগ্য (মূলত সৌর, বায়ু ও জৈব) জ্বালানি সাশ্রয়ী ও সহজলভ্য হয়ে দেখা দেবে এবং ক্রমান্বয়ে এগুলো বিশ্ব জ্বালানি বাজারকে সম্পূর্ণভাবে গ্রাস করবে। সে সময়টি (২০৮০?) বাংলাদেশের জন্য অপেক্ষাকৃত সুখকর হতে পারে যখন তেল-গ্যাস-কয়লার মতো জ্বালানিগুলো কেবল ইতিহাসের পাতায় স্থান করে নেবে।
ড. বদরূল ইমাম: অধ্যাপক, ভূতত্ত্ব বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

Comments

comments

সম্পাদক : মোহাম্মদ আবদুল বাছির
প্রকাশক: মোহাম্মদ জহিরুল ইসলাম
ফোন : ‎০১৭১৩৪০৯০৯০
৩৪৫/১, দিলু রোড, নিউ ইস্কাটন, ঢাকা-১০০০
X
 
নিয়মিত খবর পড়তে আমাদের ফেসবুক পেজে লাইক দিয়ে যুক্ত থাকুন
X