রবিবার, ২৫শে ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ ইং, ১৩ই ফাল্গুন, ১৪২৪ বঙ্গাব্দ, রাত ২:০৩
শিরোনাম
  • ঘৃণাকে বিজয়ী হতে দেয়া যাবে না, ট্রাম্পকে ইঙ্গিত করে জর্জ ক্লুনি
  • আমার একটাই চিন্তা দেশের মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন করা: প্রধানমন্ত্রী
  • ‘কেন্দ্রীয় সরকারের আগ্রাসী নীতির কারণে কাশ্মীরকে হারাতে হবে’
  • সাড়ে চারমাস পর মুখোমুখি, খাদিজাকে উদ্দেশ্য করে যা বলল বদরুল
  • খালেদার ‘সাজা’ বিরোধী নেতাকর্মীদের মনোবল ভাঙ্গার কৌশল!
  • বিএনপির কর্মসূচি ‘যথাসময়ে’ জানানো হবে: রিজভী
  • দলের জন্য বোলিং করতেও রাজি মুশফিক
  • শিশু জিহাদের মৃত্যু: চার জনের ১০ বছর করে কারাদণ্ড
  • অবশেষে বাড়ি অবরুদ্ধ করে রাখা সেই দেয়াল ভেঙ্গে ফেলা হচ্ছে
  • সাক্ষ্য দিলেন খাদিজা, চাইলেন বদরুলের সর্বোচ্চ শাস্তি
  • বদরুলের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিতে আদালতে খাদিজা
  • আজ বগুড়ায় যেসব প্রকল্প উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী
  • রোহিঙ্গা স্থানান্তরের সরকারি পরিকল্পনার সঙ্গে দ্বিমত মানবাধিকার কমিশনের
  • মহেশখালীতে ইয়াবা ব্যবসায়ীদের সঙ্গে পুলিশের ‘বন্দুকযুদ্ধ’
  • হোয়াইট হাউসে কাজ করার দীর্ঘ অভিজ্ঞতার কথা জানালেন এই বাংলাদেশি সাংবাদিক
Wednesday, November 9, 2016 6:19 pm
A- A A+ Print

ট্রাম্পের আমেরিকা জয় ; ধোঁকা খাওয়া মার্কিন মিডিয়া ও জরিপ

0

মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রচারণাপর্ব শুরু হওয়ার পর থেকেই ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রার্থী, সাবেক ফার্স্ট লেডি ও সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিন্টনের পক্ষে যে মাত্রার জনসমর্থনের খবর পশ্চিমা সংবাদমাধ্যমে দেখা গেছে, তাতে কেউ দুঃস্বপ্নেও কল্পনা করতে পারেনি যে ডোনাল্ড ট্রাম্পের মতো একজন পাগলাটে ও শ্বেত জাত্যভিমানী বাক্যবাগীশের কাছে তাঁর পরাজয় ঘটবে। লন্ডনের দৈনিক গার্ডিয়ান ট্রাম্পের বিজয়কে অভিহিত করেছে ‘যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে সবচেয়ে অসম্ভব রাজনৈতিক বিজয়’ হিসেবে। প্রথমত, আমেরিকার সংবাদমাধ্যমের প্রধান অংশের প্রবল সমর্থন ছিল হিলারির পক্ষে। এমনকি প্রথাগত সাংবাদিকতার তথাকথিত নিরপেক্ষতার নীতি উপেক্ষা করে অধিকাংশ বড় পত্রিকা ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিরুদ্ধে প্রচারণা চালিয়েছে। যেমন, নিউইয়র্ক টাইমস, ওয়াশিংটন পোস্ট, ওয়াল স্ট্রিট জার্নালসহ যুক্তরাষ্ট্রের মূলধারার সংবাদমাধ্যমের প্রথম সারির পত্রিকাগুলো প্রকাশ্যে ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিরুদ্ধে নিজ নিজ অবস্থান ঘোষণা করেছিল। সম্পাদকীয় নিবন্ধসহ প্রচুর বিশ্লেষণী লেখায় পত্রিকাগুলো বলেছিল, কেন ডোনাল্ড ট্রাম্পকে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট করা উচিত হবে না। প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী হিসেবে ট্রাম্পের অযোগ্যতা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বিভিন্ন পত্রিকা ডজন ডজন যুক্তি তুলে ধরেছিল। নিউইয়র্ক টাইমসের সম্পাদকীয়র শিরোনাম ছিল, ‘হোয়াই ডোনাল্ড ট্রাম্প শুড নট বি প্রেসিডেন্ট’। হাফিংটোন পোস্ট লিখেছিল: ‘টেন রিজনস ট্রাম্প শুড নেভার বি প্রেসিডেন্ট’। একই ধরনের শিরোনামে অজস্র পত্রিকা ও অনলাইন নিউজপোর্টালে ট্রাম্পের বিরুদ্ধে জোর প্রচারণা চলেছে। সবচেয়ে ব্যতিক্রমী সিদ্ধান্ত নিয়েছিল আমেরিকার অ্যারিজোনা অঙ্গরাজ্যের সর্বাধিক প্রচারসংখ্যার দৈনিক দ্য অ্যারিজোনা রিপাবলিক। ১২৬ বছরের পুরোনো এই সংবাদপত্রটি রক্ষণশীল মূল্যবোধ ও রাজনৈতিক আদর্শের প্রচারক। প্রকাশনার শুরু থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত আমেরিকার প্রতিটি প্রেসিডেন্ট নির্বাচনেই পত্রিকাটি রিপাবলিকান দলের প্রার্থীর পক্ষে প্রচারণা চালিয়েছে। কিন্তু ২০১৬ সালের নির্বাচনে রিপাবলিকান প্রার্থী ডোনাল্ড ট্রাম্পকে আমেরিকান প্রেসিডেন্ট হিসেবে এতই অযোগ্য মনে করেছে যে ২৭ সেপ্টেম্বর এক সম্পাদকীয় লেখে ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রার্থীর সমর্থনে : ‘হিলারি ক্লিনটন ইজ দ্য অনলি চয়েস টু মুভ অ্যামেরিকা অ্যাহেড।’ পত্রিকাটি সোজাসাপটা লেখে : ডোনাল্ড ট্রাম্প আমেরিকার প্রেসিডেন্ট হওয়ার উপযুক্ত নন। বরং প্রেসিডেন্ট হিসেবে ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রার্থীর হিলারি ক্লিনটনের যোগ্যতা অনেক। যেমন, ‘দেশের ভেতরে ও আন্তর্জাতিক পরিসরে যুক্তরাষ্ট্র যেসব চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি রয়েছে, সেগুলো মোকাবিলা করার জন্য প্রয়োজন একটা দৃঢ় ও সুস্থির হাত, ঠান্ডা মাথা এবং কোনো কিছু করার আগে সবদিক ভেবেচিন্তে দেখার সামর্থ্য। হিলারি ক্লিনটন এটা বোঝেন। ডোনাল্ড ট্রাম্প বোঝেন না। প্রেসিডেন্ট হওয়ার জন্য যে ধরনের মানসিক গঠন ও অভিজ্ঞতা প্রয়োজন, হিলারি ক্লিনটনের তা আছে। ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেই। হিলারি ক্লিনটন জানেন কীভাবে বোঝাপড়া বা আপস-সমঝোতা করতে হয়; তিনি বুদ্ধিমত্তা ও সৌজন্যের সঙ্গে নেতৃত্ব দিতে জানেন; তাঁর পরিপ্রেক্ষিত-জ্ঞান আছে। তাঁর আরও আছে ফার্স্ট লেডি, সিনেটর ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে পাবলিক সার্ভিসের রেকর্ড। হিলারি অসতর্কভাবে হুটহাট এমন কথা বলেন না, যা আমাদের প্রতিপক্ষদের সাহসী করে তোলে আর আমাদের মিত্রদের ভয় পাইয়ে দেয়। দেশ পরিচালনার ব্যাপারে তাঁর আচরণ পরিপক্ব, দৃঢ়প্রত্যয়ী ও যুক্তিবুদ্ধিসম্মত। তাঁর প্রতিপক্ষ সম্পর্কে এ কথা বলা যায় না। হিলারি ক্লিনটন চাপের মুখে স্থৈর্য বজায় রাখতে জানেন। তিনি দৃঢ়চেতা। তিনি পরাজয় মানেন না। ট্রাম্প সমালোচনার জবাবে অসহিষ্ণুভাবে এমন সব কথা বলেন, যেন থুতু ছুড়ে মারছেন। এটা আমাদের জাতীয় মর্যাদাবোধের পক্ষে হানিকর। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট যখন কিছু বলেন, তখন বিশ্ববাসী তাঁর কথায় সারবস্তু প্রত্যাশা করে, হাড়জ্বালানো কিচিরমিচির নয়।’ আমেরিকার একমাত্র জাতীয়ভিত্তিক পত্রিকা দ্য ইউএসএ টুডে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে কোনো দলের পক্ষে বা বিপক্ষে অবস্থান নেয় না। ১৯৮২ সালে প্রকাশনার দিন থেকে পরবর্তী ৩৪ বছর পত্রিকাটি এই নীতি মেনে এসেছে। কিন্তু গত ৩০ সেপ্টেম্বর পত্রিকাটির সম্পাদনা পরিষদ একটি সম্পাদকীয় ছাপে এই শিরোনামে : ‘ট্রাম্প ইজ আনফিট ফর দ্য প্রেসিডেন্সি’। পত্রিকাটি লিখেছে, সম্পাদনা পরিষদের সব সদস্যই মনে করেন, ডোনাল্ড ট্রাম্প আমেরিকার প্রেসিডেন্ট হওয়ার যোগ্য নন। কারণ, ট্রাম্প তাঁর প্রার্থিতা ঘোষণার পর থেকে গত ১৫ মাস যেসব কথাবার্তা বলেছেন এবং যে ধরনের আচরণ করেছেন, তাতে পত্রিকাটির মনে হয়েছে যে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট হওয়ার জন্য যে ধরনের মানসিক গঠন, জ্ঞানবুদ্ধি, দৃঢ়তা, স্থৈর্য ও সততা প্রয়োজন, ট্রাম্পের মধ্যে তার অভাব রয়েছে। এখন দেখা যাচ্ছে, সংবাদমাধ্যমের প্রচারণার প্রভাব আমেরিকান ভোটারদের আদৌ পড়েনি। কিন্তু নির্বাচনের আগে যেসব জনমত জরিপ হয়েছিল, সেগুলোর ফল এভাবে মিথ্যা প্রমাণিত হলো কীভাবে এবং কেন? সব জনমত জরিপেই হিলারির রেটিং ট্রাম্পের চেয়ে বেশি ছিল। হিলারির ই–মেইল কেলেঙ্কারির পর এফবিআই যখন ঘোষণা করল যে তারা বিষয়টি তদন্ত করবে, তারপরের জনমত জরিপে হিলারির রেটিং কিছুটা কমে গেছে, কিন্তু তারপরেও সিএনএন/ওআরসি জরিপে হিলারি ট্রাম্পের চেয়ে ৩ পয়েন্ট এগিয়ে ছিলেন। কিন্তু নির্বাচনের ফলাফলে সেটাও মিথ্যা প্রমাণিত হলো। তাহলে আমেরিকান জনমত জরিপগুলোর পদ্ধতিতে কি কোনো গুরুতর গলদ রয়ে গেছে, যার কারণে এবার ভোটারদের প্রকৃত মনোভাব জরিপে ধরা পড়েনি? এই বিষয়টি নিয়ে আমেরিকায় ইতিমধ্যে বেশ কথাবার্তা শুরু হয়ে গেছে। যেমন, ওয়াশিংটনভিত্তিক জনমত গবেষণা সংস্থা পিআরআরআইয়ের প্রধান রবার্ট পি জোনস সিএনএনকে বলেছেন, জনমত জরিপের প্রশ্নগুলোর উত্তর সব সময় আন্তরিক হয় না; অনেক উত্তরদাতা তাঁর মনের কথাটি বলতে বিব্রত বোধ করতে পারেন। ‘সোশ্যালি অ্যাকসেপ্টেবল’ বা সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্য উত্তরই বেশির ভাগ উত্তরদাতা দিয়ে থাকেন। ডোনাল্ড ট্রাম্পের ক্ষেত্রে এমন হয়ে থাকতে পারে যে যেসব ভোটার তাঁকে সমর্থন করেছেন, তাঁরা জরিপকারীদের সেটা বলেননি, কারণ তাতে করে ওই উত্তরদাতাকে বর্ণবাদী, অভিবাসী-বিদ্বেষী, শ্বেত জাত্যভিমানী ও নারীর মর্যাদার প্রতি অসংবেদনশীল মনে হতে পারে। তাঁকে এ রকম ভাবা হোক, তিনি তা চান না। কিন্তু মনে মনে তিনি ট্রাম্পের এসব স্লোগানের প্রতিই একাত্ম বোধ করেন। এবারের নির্বাচনে ডোনাল্ড ট্রাম্পের মূল স্লোগান ছিল ‘উই আর গোয়িং টু মেক আওয়ার কান্ট্রি গ্রেট অ্যাগেইন’। সম্ভবত, এই স্লোগানই আমেরিকার ৭২ শতাংশ শ্বেতাঙ্গ জনগোষ্ঠীকে ট্রাম্পের প্রতি আকৃষ্ট করেছে। তাদের অধিকাংশের স্বপ্নের ‘গ্রেট আমেরিকা’ হলো শ্বেত জাত্যভিমানী আমেরিকা। এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার অভিবাসীরা গিয়ে সেই আমেরিকার ‘গ্রেটনেস’ নষ্ট করেছে। অভিবাসন বন্ধ করে দিয়ে, অবৈধ অভিবাসীদের তাড়িয়ে দিয়ে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সেই পুরোনো ‘গ্রেটনেস’ ফিরিয়ে আনবেন। এই হলো ট্রাম্পের ভোটারদের আকাঙ্ক্ষা। এই ভোটারদের এক বিরাট অংশ ছিল ‘হিডেন’ বা অপ্রকাশ্য; এরা মনের কথা প্রকাশ্যে বলেননি, জনমত জরিপকারীদের ধোঁকা দিয়েছেন। কারণ গণতন্ত্র, মুক্তি, সর্বজনীন মানবাধিকার, সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য ও বহুত্ববাদ—এসব আমেরিকান আদর্শের বিপরীত কথা প্রকাশ্যে উচ্চারণ করার সময় সেদেশে এখনো আসেনি। কিন্তু দেশটির সংখ্যাগুরু শ্বেতাঙ্গ ভোটারদের বড় অংশই মনে মনে এসব আদর্শ আর মানতে চান না। ইউরোপসহ পৃথিবীর দেশে দেশে যে ‘বিশুদ্ধ’ জাত্যভিমান মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছে; ধর্মীয়, বর্ণগত, জাতিগত—যাবতীয় রকমের সংকীর্ণতায় মোড়ানো জাতীয়তাবাদের যে বাতাস পৃথিবীব্যাপী বইছে, হ্যামিল্টন-জেফারসনদের মহান দেশ আমেরিকাও যে তার বাইরে নেই, ডোনাল্ড ট্রাম্পের মতো ব্যক্তির প্রেসিডেন্ট হওয়ার মধ্য দিয়ে সেটাই প্রমাণিত হলো। মশিউল আলম : সাহিত্যিক ও সাংবাদিক mashiul. alam@gmail. com

Comments

Comments!

 ট্রাম্পের আমেরিকা জয় ; ধোঁকা খাওয়া মার্কিন মিডিয়া ও জরিপAmarbangladeshonlineAmarbangladeshonline | Amarbangladeshonline

ট্রাম্পের আমেরিকা জয় ; ধোঁকা খাওয়া মার্কিন মিডিয়া ও জরিপ

Wednesday, November 9, 2016 6:19 pm
0

মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রচারণাপর্ব শুরু হওয়ার পর থেকেই ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রার্থী, সাবেক ফার্স্ট লেডি ও সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিন্টনের পক্ষে যে মাত্রার জনসমর্থনের খবর পশ্চিমা সংবাদমাধ্যমে দেখা গেছে, তাতে কেউ দুঃস্বপ্নেও কল্পনা করতে পারেনি যে ডোনাল্ড ট্রাম্পের মতো একজন পাগলাটে ও শ্বেত জাত্যভিমানী বাক্যবাগীশের কাছে তাঁর পরাজয় ঘটবে। লন্ডনের দৈনিক গার্ডিয়ান ট্রাম্পের বিজয়কে অভিহিত করেছে ‘যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে সবচেয়ে অসম্ভব রাজনৈতিক বিজয়’ হিসেবে।
প্রথমত, আমেরিকার সংবাদমাধ্যমের প্রধান অংশের প্রবল সমর্থন ছিল হিলারির পক্ষে। এমনকি প্রথাগত সাংবাদিকতার তথাকথিত নিরপেক্ষতার নীতি উপেক্ষা করে অধিকাংশ বড় পত্রিকা ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিরুদ্ধে প্রচারণা চালিয়েছে।
যেমন, নিউইয়র্ক টাইমস, ওয়াশিংটন পোস্ট, ওয়াল স্ট্রিট জার্নালসহ যুক্তরাষ্ট্রের মূলধারার সংবাদমাধ্যমের প্রথম সারির পত্রিকাগুলো প্রকাশ্যে ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিরুদ্ধে নিজ নিজ অবস্থান ঘোষণা করেছিল। সম্পাদকীয় নিবন্ধসহ প্রচুর বিশ্লেষণী লেখায় পত্রিকাগুলো বলেছিল, কেন ডোনাল্ড ট্রাম্পকে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট করা উচিত হবে না। প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী হিসেবে ট্রাম্পের অযোগ্যতা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বিভিন্ন পত্রিকা ডজন ডজন যুক্তি তুলে ধরেছিল। নিউইয়র্ক টাইমসের সম্পাদকীয়র শিরোনাম ছিল, ‘হোয়াই ডোনাল্ড ট্রাম্প শুড নট বি প্রেসিডেন্ট’। হাফিংটোন পোস্ট লিখেছিল: ‘টেন রিজনস ট্রাম্প শুড নেভার বি প্রেসিডেন্ট’। একই ধরনের শিরোনামে অজস্র পত্রিকা ও অনলাইন নিউজপোর্টালে ট্রাম্পের বিরুদ্ধে জোর প্রচারণা চলেছে।
সবচেয়ে ব্যতিক্রমী সিদ্ধান্ত নিয়েছিল আমেরিকার অ্যারিজোনা অঙ্গরাজ্যের সর্বাধিক প্রচারসংখ্যার দৈনিক দ্য অ্যারিজোনা রিপাবলিক। ১২৬ বছরের পুরোনো এই সংবাদপত্রটি রক্ষণশীল মূল্যবোধ ও রাজনৈতিক আদর্শের প্রচারক। প্রকাশনার শুরু থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত আমেরিকার প্রতিটি প্রেসিডেন্ট নির্বাচনেই পত্রিকাটি রিপাবলিকান দলের প্রার্থীর পক্ষে প্রচারণা চালিয়েছে। কিন্তু ২০১৬ সালের নির্বাচনে রিপাবলিকান প্রার্থী ডোনাল্ড ট্রাম্পকে আমেরিকান প্রেসিডেন্ট হিসেবে এতই অযোগ্য মনে করেছে যে ২৭ সেপ্টেম্বর এক সম্পাদকীয় লেখে ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রার্থীর সমর্থনে : ‘হিলারি ক্লিনটন ইজ দ্য অনলি চয়েস টু মুভ অ্যামেরিকা অ্যাহেড।’ পত্রিকাটি সোজাসাপটা লেখে : ডোনাল্ড ট্রাম্প আমেরিকার প্রেসিডেন্ট হওয়ার উপযুক্ত নন। বরং প্রেসিডেন্ট হিসেবে ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রার্থীর হিলারি ক্লিনটনের যোগ্যতা অনেক।
যেমন, ‘দেশের ভেতরে ও আন্তর্জাতিক পরিসরে যুক্তরাষ্ট্র যেসব চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি রয়েছে, সেগুলো মোকাবিলা করার জন্য প্রয়োজন একটা দৃঢ় ও সুস্থির হাত, ঠান্ডা মাথা এবং কোনো কিছু করার আগে সবদিক ভেবেচিন্তে দেখার সামর্থ্য। হিলারি ক্লিনটন এটা বোঝেন। ডোনাল্ড ট্রাম্প বোঝেন না। প্রেসিডেন্ট হওয়ার জন্য যে ধরনের মানসিক গঠন ও অভিজ্ঞতা প্রয়োজন, হিলারি ক্লিনটনের তা আছে। ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেই। হিলারি ক্লিনটন জানেন কীভাবে বোঝাপড়া বা আপস-সমঝোতা করতে হয়; তিনি বুদ্ধিমত্তা ও সৌজন্যের সঙ্গে নেতৃত্ব দিতে জানেন; তাঁর পরিপ্রেক্ষিত-জ্ঞান আছে। তাঁর আরও আছে ফার্স্ট লেডি, সিনেটর ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে পাবলিক সার্ভিসের রেকর্ড। হিলারি অসতর্কভাবে হুটহাট এমন কথা বলেন না, যা আমাদের প্রতিপক্ষদের সাহসী করে তোলে আর আমাদের মিত্রদের ভয় পাইয়ে দেয়। দেশ পরিচালনার ব্যাপারে তাঁর আচরণ পরিপক্ব, দৃঢ়প্রত্যয়ী ও যুক্তিবুদ্ধিসম্মত। তাঁর প্রতিপক্ষ সম্পর্কে এ কথা বলা যায় না। হিলারি ক্লিনটন চাপের মুখে স্থৈর্য বজায় রাখতে জানেন। তিনি দৃঢ়চেতা। তিনি পরাজয় মানেন না। ট্রাম্প সমালোচনার জবাবে অসহিষ্ণুভাবে এমন সব কথা বলেন, যেন থুতু ছুড়ে মারছেন। এটা আমাদের জাতীয় মর্যাদাবোধের পক্ষে হানিকর। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট যখন কিছু বলেন, তখন বিশ্ববাসী তাঁর কথায় সারবস্তু প্রত্যাশা করে, হাড়জ্বালানো কিচিরমিচির নয়।’
আমেরিকার একমাত্র জাতীয়ভিত্তিক পত্রিকা দ্য ইউএসএ টুডে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে কোনো দলের পক্ষে বা বিপক্ষে অবস্থান নেয় না। ১৯৮২ সালে প্রকাশনার দিন থেকে পরবর্তী ৩৪ বছর পত্রিকাটি এই নীতি মেনে এসেছে। কিন্তু গত ৩০ সেপ্টেম্বর পত্রিকাটির সম্পাদনা পরিষদ একটি সম্পাদকীয় ছাপে এই শিরোনামে : ‘ট্রাম্প ইজ আনফিট ফর দ্য প্রেসিডেন্সি’। পত্রিকাটি লিখেছে, সম্পাদনা পরিষদের সব সদস্যই মনে করেন, ডোনাল্ড ট্রাম্প আমেরিকার প্রেসিডেন্ট হওয়ার যোগ্য নন। কারণ, ট্রাম্প তাঁর প্রার্থিতা ঘোষণার পর থেকে গত ১৫ মাস যেসব কথাবার্তা বলেছেন এবং যে ধরনের আচরণ করেছেন, তাতে পত্রিকাটির মনে হয়েছে যে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট হওয়ার জন্য যে ধরনের মানসিক গঠন, জ্ঞানবুদ্ধি, দৃঢ়তা, স্থৈর্য ও সততা প্রয়োজন, ট্রাম্পের মধ্যে তার অভাব রয়েছে।
এখন দেখা যাচ্ছে, সংবাদমাধ্যমের প্রচারণার প্রভাব আমেরিকান ভোটারদের আদৌ পড়েনি। কিন্তু নির্বাচনের আগে যেসব জনমত জরিপ হয়েছিল, সেগুলোর ফল এভাবে মিথ্যা প্রমাণিত হলো কীভাবে এবং কেন? সব জনমত জরিপেই হিলারির রেটিং ট্রাম্পের চেয়ে বেশি ছিল। হিলারির ই–মেইল কেলেঙ্কারির পর এফবিআই যখন ঘোষণা করল যে তারা বিষয়টি তদন্ত করবে, তারপরের জনমত জরিপে হিলারির রেটিং কিছুটা কমে গেছে, কিন্তু তারপরেও সিএনএন/ওআরসি জরিপে হিলারি ট্রাম্পের চেয়ে ৩ পয়েন্ট এগিয়ে ছিলেন। কিন্তু নির্বাচনের ফলাফলে সেটাও মিথ্যা প্রমাণিত হলো।
তাহলে আমেরিকান জনমত জরিপগুলোর পদ্ধতিতে কি কোনো গুরুতর গলদ রয়ে গেছে, যার কারণে এবার ভোটারদের প্রকৃত মনোভাব জরিপে ধরা পড়েনি? এই বিষয়টি নিয়ে আমেরিকায় ইতিমধ্যে বেশ কথাবার্তা শুরু হয়ে গেছে। যেমন, ওয়াশিংটনভিত্তিক জনমত গবেষণা সংস্থা পিআরআরআইয়ের প্রধান রবার্ট পি জোনস সিএনএনকে বলেছেন, জনমত জরিপের প্রশ্নগুলোর উত্তর সব সময় আন্তরিক হয় না; অনেক উত্তরদাতা তাঁর মনের কথাটি বলতে বিব্রত বোধ করতে পারেন। ‘সোশ্যালি অ্যাকসেপ্টেবল’ বা সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্য উত্তরই বেশির ভাগ উত্তরদাতা দিয়ে থাকেন। ডোনাল্ড ট্রাম্পের ক্ষেত্রে এমন হয়ে থাকতে পারে যে যেসব ভোটার তাঁকে সমর্থন করেছেন, তাঁরা জরিপকারীদের সেটা বলেননি, কারণ তাতে করে ওই উত্তরদাতাকে বর্ণবাদী, অভিবাসী-বিদ্বেষী, শ্বেত জাত্যভিমানী ও নারীর মর্যাদার প্রতি অসংবেদনশীল মনে হতে পারে। তাঁকে এ রকম ভাবা হোক, তিনি তা চান না। কিন্তু মনে মনে তিনি ট্রাম্পের এসব স্লোগানের প্রতিই একাত্ম বোধ করেন।
এবারের নির্বাচনে ডোনাল্ড ট্রাম্পের মূল স্লোগান ছিল ‘উই আর গোয়িং টু মেক আওয়ার কান্ট্রি গ্রেট অ্যাগেইন’। সম্ভবত, এই স্লোগানই আমেরিকার ৭২ শতাংশ শ্বেতাঙ্গ জনগোষ্ঠীকে ট্রাম্পের প্রতি আকৃষ্ট করেছে। তাদের অধিকাংশের স্বপ্নের ‘গ্রেট আমেরিকা’ হলো শ্বেত জাত্যভিমানী আমেরিকা। এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার অভিবাসীরা গিয়ে সেই আমেরিকার ‘গ্রেটনেস’ নষ্ট করেছে। অভিবাসন বন্ধ করে দিয়ে, অবৈধ অভিবাসীদের তাড়িয়ে দিয়ে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সেই পুরোনো ‘গ্রেটনেস’ ফিরিয়ে আনবেন। এই হলো ট্রাম্পের ভোটারদের আকাঙ্ক্ষা। এই ভোটারদের এক বিরাট অংশ ছিল ‘হিডেন’ বা অপ্রকাশ্য; এরা মনের কথা প্রকাশ্যে বলেননি, জনমত জরিপকারীদের ধোঁকা দিয়েছেন। কারণ গণতন্ত্র, মুক্তি, সর্বজনীন মানবাধিকার, সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য ও বহুত্ববাদ—এসব আমেরিকান আদর্শের বিপরীত কথা প্রকাশ্যে উচ্চারণ করার সময় সেদেশে এখনো আসেনি। কিন্তু দেশটির সংখ্যাগুরু শ্বেতাঙ্গ ভোটারদের বড় অংশই মনে মনে এসব আদর্শ আর মানতে চান না। ইউরোপসহ পৃথিবীর দেশে দেশে যে ‘বিশুদ্ধ’ জাত্যভিমান মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছে; ধর্মীয়, বর্ণগত, জাতিগত—যাবতীয় রকমের সংকীর্ণতায় মোড়ানো জাতীয়তাবাদের যে বাতাস পৃথিবীব্যাপী বইছে, হ্যামিল্টন-জেফারসনদের মহান দেশ আমেরিকাও যে তার বাইরে নেই, ডোনাল্ড ট্রাম্পের মতো ব্যক্তির প্রেসিডেন্ট হওয়ার মধ্য দিয়ে সেটাই প্রমাণিত হলো।
মশিউল আলম : সাহিত্যিক ও সাংবাদিক
mashiul. alam@gmail. com

Comments

comments

সম্পাদক : মোহাম্মদ আবদুল বাছির
প্রকাশক: মোহাম্মদ জহিরুল ইসলাম
ফোন : ‎০১৭১৩৪০৯০৯০
৩৪৫/১, দিলু রোড, নিউ ইস্কাটন, ঢাকা-১০০০
X
 
নিয়মিত খবর পড়তে আমাদের ফেসবুক পেজে লাইক দিয়ে যুক্ত থাকুন
X