বুধবার, ২১শে ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ ইং, ৯ই ফাল্গুন, ১৪২৪ বঙ্গাব্দ, সকাল ৯:৩৯
শিরোনাম
  • ঘৃণাকে বিজয়ী হতে দেয়া যাবে না, ট্রাম্পকে ইঙ্গিত করে জর্জ ক্লুনি
  • আমার একটাই চিন্তা দেশের মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন করা: প্রধানমন্ত্রী
  • ‘কেন্দ্রীয় সরকারের আগ্রাসী নীতির কারণে কাশ্মীরকে হারাতে হবে’
  • সাড়ে চারমাস পর মুখোমুখি, খাদিজাকে উদ্দেশ্য করে যা বলল বদরুল
  • খালেদার ‘সাজা’ বিরোধী নেতাকর্মীদের মনোবল ভাঙ্গার কৌশল!
  • বিএনপির কর্মসূচি ‘যথাসময়ে’ জানানো হবে: রিজভী
  • দলের জন্য বোলিং করতেও রাজি মুশফিক
  • শিশু জিহাদের মৃত্যু: চার জনের ১০ বছর করে কারাদণ্ড
  • অবশেষে বাড়ি অবরুদ্ধ করে রাখা সেই দেয়াল ভেঙ্গে ফেলা হচ্ছে
  • সাক্ষ্য দিলেন খাদিজা, চাইলেন বদরুলের সর্বোচ্চ শাস্তি
  • বদরুলের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিতে আদালতে খাদিজা
  • আজ বগুড়ায় যেসব প্রকল্প উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী
  • রোহিঙ্গা স্থানান্তরের সরকারি পরিকল্পনার সঙ্গে দ্বিমত মানবাধিকার কমিশনের
  • মহেশখালীতে ইয়াবা ব্যবসায়ীদের সঙ্গে পুলিশের ‘বন্দুকযুদ্ধ’
  • হোয়াইট হাউসে কাজ করার দীর্ঘ অভিজ্ঞতার কথা জানালেন এই বাংলাদেশি সাংবাদিক
Friday, July 29, 2016 2:15 pm
A- A A+ Print

ট্রাম্প ডকট্রিনে বিশ্ব পরিণতি

18_172

দৃশ্যমান ও অদৃশ্যমান বিশ্ব পরিস্থিতি যেন দ্রুত পরিবর্তন হতে শুরু করেছে। এক সময়ের অর্ধেক পৃথিবীর নিয়ন্ত্রক গ্রেট ব্রিটেন ইউরোপীয় জোট থেকে বেরিয়ে একটি বিচ্ছিন্ন ক্ষুদ্র শক্তিতে রূপান্তরিত হওয়ার ব্যাপক সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে। বিশ্বের একক পরাশক্তি আমেরিকা যেন ক্লান্ত-শ্রান্ত হয়ে এককালের দাপুটে রানীর পরিণতির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। ষোড়শ শতাব্দীর ফরাসি দার্শনিক ও জ্যোতির্বিজ্ঞানী মিসেল দ্য নস্ট্রেডাম নক্ষত্রের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করে ভবিষ্যৎ পৃথিবীর ব্যাপারে কিছু বক্তব্য রেখে গিয়েছিলেন। ২০১৬ সালের জন্যও তার কিছু ভবিষ্যদ্বাণী ছিল। এর আগে তার দেয়া পূর্বাভাসের সাথে কেনেডি ভ্রাতৃদ্বয়ের খুন, হিটলারের উত্থান, নেপোলিয়ানের পরাজয়, যুক্তরাষ্ট্রে ‘এক-এগারো’র সন্ত্রাসী হামলার ঘটনার মতো বেশ কিছু বাঁক পরিবর্তনকারী ঘটনার মিল ঘটে যায়। ফলে তার বক্তব্যকে অনেকেই গুরুত্ব দিতে শুরু করেন। নস্ট্রেডাম তার ভবিষ্যদ্বাণীতে ওবামার পুনর্নির্বাচনের কথা বলেছিলেন। আর তিনি এটাও বলেছেন, ওবামা হবেন আমেরিকার সর্বশেষ প্রেসিডেন্ট। এর কয়েক শতাব্দী পরে ১৯৯৪ সালে পরলোকগত এবং ঈশ্বরের দূত দাবিকারী বুলগেরীয় রমণী বাবাভাঙ্গাও বলেছিলেন, এক কালো আমেরিকান যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হবেন। আর তিনি হবেন আমেরিকার সর্বশেষ (ক্ষমতাধর) প্রেসিডেন্ট। এক সময় অনেকেই অন্ধ এই নারীর কথাটাকে হাস্যকর কল্পনা মনে করেছিলেন। কিন্তু বারাক ওবামা নামের এক কেনীয় বংশোদ্ভূত কালো আমেরিকান সত্যি সত্যিই আমেরিকার প্রেসিডেন্ট হয়ে আট বছরের মেয়াদ শেষ করতে চলেছেন। আর পরবর্তী মার্কিন প্রেসিডেন্ট হিসেবে যে দু’জন প্রার্থিতা চূড়ান্ত করেছেন, তাদের একজন হলেন দেশের বড় দুই দলের প্রথম একজন নারী প্রার্থী; অপরজন রিপাবলিকান না হয়েও দলের মনোনয়ন পেয়েছেন। ট্রাম্প-হিলারি দু’জনই দলের আনুষ্ঠানিক কনভেনশনে মনোনয়ন লাভ করার পর তারাই যে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে নিশ্চিতভাবে বড় দুই দলের প্রার্থী হচ্ছেন, তাতে আর কোনো সন্দেহের অবকাশ থাকল না। আমেরিকার খ্যাতিমান আবাসন ও ক্যাসিনো ব্যবসায়ী ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন প্রথম নিজের প্রার্থিতাঘোষণা করেন তখন কেউ তাকে পাত্তা দিতে চায়নি। এর আগে যারা বড় দুই দলের প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন তাদের কেউ হয়তোবা কংগ্রেস বা সিনেটের প্রভাবশালী সদস্য অথবা কোনো রাজ্যের গভর্নর অথবা জাঁদরেল সাবেক চার-পাঁচ তারকা জেনারেল ছিলেন। ট্রাম্প কিন্তু এর কোনো কিছুই ছিলেন না। রিপাবলিকান দলের আনুষ্ঠানিক কোনো পদে অথবা আঞ্চলিক কোনো আইনসভারও সদস্য ছিলেন না তিনি। প্রার্থী হয়ে এমন সব উদ্ভট কথাবার্তা বলেছেন, যাতে তিনি রিপাবলিকান প্রার্থী শেষ পর্যন্ত হবেন বলে অনেকে ভাবতে পারেননি। বিশ্বের এখন এক-তৃতীয়াংশ জনসংখ্যা হলো মুসলিম। তিনি এই মুসলিমদের যুক্তরাষ্ট্রে ঢুকতে না দেয়া, এমনকি তাদের মঙ্গল গ্রহে পাঠিয়ে দেয়ার অভিপ্রায় ব্যক্ত করেছেন। আমেরিকার কাছের প্রতিবেশী দেশ মেক্সিকোর সীমান্তে উঁচু দেয়াল নির্মাণের ঘোষণাও দিয়েছেন। ব্রিটেনের ইউরোপ থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়ে জাতীয়তাবাদী ব্রিটিশদের ‘ফার্স্ট ব্রিটেন’ স্লোগানের জয়যুক্ত হওয়াকে ‘ফার্স্ট আমেরিকা’ স্লোগানের জয় হওয়ার লক্ষণ হিসেবে ধরে নিয়েছেন ট্রাম্প। এক সময় বলা হয়েছিল, ট্রাম্প কোনোভাবেই রিপাবলিকান দলের মনোনয়ন পাবেন না। এখন বলা হচ্ছে, তিনি মনোনয়ন পেলেও নির্বাচনে হিলারির কাছে পরাভূত হবেন। আমেরিকান জনমতের যেসব জরিপ প্রকাশ করা হচ্ছে, তার মধ্যে মানুষের হৃদরেখার মতো অস্থিরতা প্রত্যক্ষ করা যাচ্ছে। এই লেখাটি যখন লেখা হচ্ছে, ঠিক সে সময় পাওয়া মার্কিন জনমত জরিপের অধিকাংশেই ট্রাম্প এগিয়ে রয়েছেন। ২৬ জুলাই প্রকাশিত লস অ্যাঞ্জেলস টাইমস ও ইউএসসির জরিপ অনুসারে ট্রাম্পের পক্ষে পাওয়া গেছে ৪৭ শতাংশ আর হিলারির পক্ষে ৪০ শতাংশ আমেরিকানের সমর্থন। এর আগের দিন সিএনএন এবং ওআরসির জরিপের ফলাফল অনুযায়ী সাধারণ নির্বাচনে ট্রাম্পের পক্ষে ৪৮ এবং হিলারির পক্ষে ৪৩ জনের সমর্থন পাওয়া গেছে। একই দিন প্রকাশিত সিবিএস নিউজের জরিপেও ট্রাম্প ৪৪ এবং হিলারি ৪৩ শতাংশের সমর্থন পেয়েছেন বলে উল্লেখ করা হয়। এ দিনের ইকোনমিস্ট ও ইউগভের ফলাফলে অবশ্য হিলারি ৪৭ এবং ট্রাম্প ৪০ শতাংশের সমর্থন পাওয়ার কথা বলা হয়েছে। কয়েক সপ্তাহ আগেও অধিকাংশ জরিপে মার্কিন সাধারণ নির্বাচনে ট্রাম্পের চেয়ে হিলারি অগ্রসর রয়েছেন মর্মে দেখানো হচ্ছিল। এখন যতই দিন যাচ্ছে, ততই ট্রাম্পের পাল্লা ভারী হচ্ছে। ডেমোক্র্যাট কনভেনশনের পরে হিলারি যেভাবে চাঙা হবেন বলে মনে করা হয়েছিল, বাস্তবে সেটি ঘটছে না। আমেরিকায় ট্রাম্প যে প্রেসিডেন্ট হতে পারেন, সেটিকে কেউই আর অবাস্তব কল্পনাবিলাস মনে করছেন না। ইংল্যান্ডে বরিস জনসনদের ‘ফার্স্ট ব্রিটেন’ নামে দেয়া জাতীয়তাবাদী বক্তব্যের প্রতি যেভাবে ব্রিটিশরা আকৃষ্ট হয়েছিলেন, সে প্রবণতা আমেরিকানদের ওপরও আছর করছে বলে মনে হচ্ছে। জনসনরা ইউরোপ থেকে ব্রিটেনকে স্বাধীন করার জন্য ব্রেক্সিটের পক্ষে মত দিতে ব্রিটিশদের প্রতি আবেগময় আহ্বান জানিয়েছিলেন। ট্রাম্প বলছেন, বিশ্বের প্রতি মিথ্যা অঙ্গীকার থেকে স্বাধীন করে আমেরিকানদের স্বার্থ রক্ষার প্রতি দায়বদ্ধ করতে হবে যুক্তরাষ্ট্রকে। আগে হলো, আমেরিকা ও তার জনগণ। এরপর আমরা বাকি মিত্রদের বিষয় দেখব।’ তার এ বক্তব্যে ইতোমধ্যে ৪ নভেম্বরের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনকে অনেকে ব্রেক্সিটের মতো অ্যাক্সিটের নির্বাচন হিসেবে চিহ্নিত করতে শুরু করেছেন। ব্রেক্সিট ছিল ইউরোপ জোট থেকে ব্রিটেনের বের হয়ে যাওয়া। আর অ্যাক্সিট হলো বাকি বিশ্বের নিরাপত্তার অঙ্গীকার থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে বের করে আনা। এ ব্যাপারে ট্রাম্পের বক্তব্যের মধ্যে কোনো রাখঢাক নেই। তিনি তিরিশের দশকের জাতীয়তাবাদী আমেরিকান নেতাদের মতোই বলেছেন, ‘সবার আগে আমেরিকা’। ট্রাম্প বলছেন, ইউরোপের নিরাপত্তার জন্য আমেরিকা তার টাকা খরচ করবে, সেনাশক্তি বিনিয়োগ কেন করবে? হ্যাঁ, করতে পারে যদি এর সব ব্যয়ভার ইউরোপিয়ানরা বহন করে। অন্য অঞ্চলের মিত্রদের বিষয়টিও হবে একই রকম।’ ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট হওয়ার (যদি হন) অনেক আগে থেকে যুক্তরাষ্ট্র নিজেকে বিশ্বনেতৃত্ব থেকে ক্রমেই প্রত্যাহার করে নিচ্ছে বলে জোরালো বিতর্ক তৈরি হয়েছে। ওবামার নমনীয় এবং যুদ্ধকে পাশ কাটানোর পররাষ্ট্রনীতিকে রিপাবলিকান চিন্তকেরা বলছেন, আমেরিকাকে বিশ্ব নেতৃত্ব থেকে সরিয়ে নিয়ে আসা। আটলান্টিক ম্যাগাজিনে ওবামা ডকট্রিনের ব্যাপারে এক বিরাট নিবন্ধ প্রকাশ করা হয়েছে। এতে দেখানো হয়েছে, কিভাবে আমেরিকা তার মিত্রদের দেয়া অঙ্গীকার পালন করতে যুদ্ধে জড়ানোর ঝুঁকি থেকে নিজেকে বের করে এনেছে। আসাদ রেডলাইন ক্রস করলে প্রতিশোধের মুখে পড়বেন বলে কঠোর হুমকি দেয়া হয়েছিল। কিন্তু এ ব্যাপারে ঠিক করে দেয়া সীমারেখা সিরিয়ায় বিষাক্ত গ্যাস প্রয়োগ করে ১৪ শতাধিক ব্যক্তিকে হত্যা করার মাধ্যমে অতিক্রম করার পরও ওবামা চার্চিলীয় স্টাইলে একটি ঝাড়া বক্তৃতা দেয়ার মাধ্যমে ব্যবস্থা গ্রহণ থেকে পিছু হটেছেন। পিছু হটেছেন ইউক্রেন ইস্যুতেও। এসব ইস্যুতে হিলারির সাথে কিছুটা মতান্তরও ঘটেছে ওবামার। বারাক ওবামা আমেরিকার মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি তেল নির্ভরতা কাটানোর যেসব পদক্ষেপ নিয়েছেন, তার সাথে আমেরিকার বিশ্ব থেকে ক্রমেই গুটিয়ে নেয়ার একটি প্রবণতার যে সম্পর্ক রয়েছে, সে ব্যাপারটি বিশ্ব পরিস্থিতি বিশ্লেষকদের উপলব্ধির বাইরে থাকার কথা নয়। ওবামা নিজস্ব জ্বালানির ওপর নির্ভর করার পরিস্থিতি তৈরি করেছেন আমেরিকাকে বাইরের বিশ্ব থেকে ক্রমশ প্রত্যাহারের জন্য। তিনি যে পটভূমি তৈরি করেছেন হিলারি যদি প্রেসিডেন্ট হন, তাহলে সে পথই হয়তোবা অনুসরণ করবেন। অর্থাৎ আমেরিকাকে বিশ^ নিয়ন্ত্রক কর্মকাণ্ড থেকে প্রত্যাহার করে নেবেন; তবে ধীরে ধীরে। কিন্তু ট্রাম্প যদি প্রেসিডেন্ট হন তাহলে ব্রেক্সিটের মতো দৃশ্যমানভাবেই আমেরিকাকে বাকি দুনিয়ার দায় (পড়–ন, নেতৃত্ব) থেকে প্রত্যাহারের ‘অ্যাক্সিট’ ঘটাবেন। রিপাবলিকানরা যতই বিশ্ব নেতৃত্ব থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে সরিয়ে আনার জন্য ওবামার সমালোচনা করুন না কেন, বাস্তবে নতুন রিপাবলিকান প্রেসিডেন্ট সে পথেই হাঁটবেন এবং হাঁটবেন দ্রুত গতিতে । এসব ব্যাপারে যারা দৃশ্যের অন্তরালে বা ওপর থেকে কলকাঠি নাড়ছেন, তাদের ওপর রিপাবলিকান চিন্তাবিদদের খুব একটা নিয়ন্ত্রণ রয়েছে বলে মনে হয় না। অতীতে মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপে রাশিয়ার কাছে অনেকটা অপমানকরভাবে প্রভাব হারানোর বিষয়টিকে নানাভাবে সমালোচনা করেছেন রিপাবলিকানরা। কিন্তু ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট হলে যা করবেন বলে ইতোমধ্যে বলা হচ্ছে, তাতে অর্থের বিনিময়েই নিরাপত্তা সেবা দেয়ার এক ব্যবস্থার দিকে তিনি এগোবেন বলে মনে হয়। মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকার প্রধান আঞ্চলিক মিত্র ছিল ইসরাইল। এরপর সৌদি আরব ও তার সহযোগী উপসাগরীয় দেশগুলো এবং তুরস্ক। খানিকটা সাইডলাইনে ছিল মিসর ও জর্ডানের মতো দেশগুলো। ইসরাইলের অস্তিত্ব ও নিরাপত্তার ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্র বরাবরই দলনির্বিশেষে ছিল অঙ্গীকারবদ্ধ। সেই অঙ্গীকারের ব্যতিক্রম ঘটবে, এমনটি তেলআবিব হয়তো এখনো মনে করে না। কিন্তু এর পরও নিজস্ব নিরাপত্তা ভিশনগুলো বাস্তবায়নে এগিয়ে যাচ্ছে ইসরাইল। এ ক্ষেত্রে তাদের সাফল্য হলো, মধ্যপ্রাচ্যের সব শক্তিশালী দেশ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে ইসরাইলের সাথে সম্পর্ক তৈরি করেছে। তুরস্কও ভেঙে পড়া সম্পর্ক পুনর্নির্মাণে চুক্তি করেছে তেলআবিবের সাথে। সংযুক্ত আরব আমিরাত এখন তার নিরাপত্তার জন্য ইসরাইল-নির্ভরশীল একটি দেশে পরিণত হয়েছে। তেলআবিবের সাথে সৌদি যোগাযোগ এখন আর গোপন কোনো বিষয় নয়। ইসরাইল ক্ষুব্ধ হতে পারে, এমন কোনো কাজ থেকে যথাসম্ভব দূরে থাকে মিসর। ইসরাইলকে মোকাবেলা করার ইরানের সামরিক প্রস্তুতি এখন শিয়া-সুন্নি দ্বন্দ্বে ক্ষয় হচ্ছে। ইসরাইল-ফিলিস্তিন স্বাধীন দু’টি দেশ প্রতিষ্ঠার আন্তর্জাতিক পরিকল্পনার চাপকে এখন নেতানিয়াহু থোড়াই পরোয়া করছেন। অধিকন্তু মধ্যপ্রাচ্যের প্রতিবেশী দেশগুলোকে অস্থির ও ভঙ্গুর করে রেখে তাদের নিরাপত্তার জন্য ইসরাইল-নির্ভরশীল করে রাখার ইনোন পরিকল্পনার অনেকখানি এখন বাস্তবায়নের পথে বলেই মনে হচ্ছে। আমেরিকা মধ্যপ্রাচ্য থেকে সৈন্য প্রত্যাহারের আগে সেখানে মানচিত্র পরিবর্তনের জন্য যে কাজ করছিল, সে সময়টা ট্রাম্পের আগমনের পদধ্বনিতে দ্রুত ফুরিয়ে আসছে বলে মনে হচ্ছে। সিরিয়া-ইরাকে আইএসের পতন ঘটিয়ে সেখানে কুর্দিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করার কাজ এখনো পরিণতির দিকে নিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়নি। অনেকের ধারণা, তুরস্কে অভ্যুত্থান ঘটিয়ে সামরিক জান্তাকে ক্ষমতায় নিয়ে আসার চেষ্টা ছিল এ ক্ষেত্রে একটি বড় পদক্ষেপ। এখন নতুন পরিস্থিতিতে কতটুকু এই অ্যাজেন্ডা নিয়ে অগ্রসর হওয়া যাবে তা বলা মুশকিল। তুরস্কের ব্যর্থ অভ্যুত্থানের পর এরদোগানের ভূমিকার জন্য ট্রাম্প তার প্রশংসা করেছেন। ট্রাম্প এটাও গোপন করেননি যে, তিনি কুর্দিদের ভালোবাসেন। আইএসের নিতম্বে পদাঘাত করতে তিনি তাদের সাথে কাজ করতে চান। এ জন্য তিনি তুরস্ক ও তুর্কিদের একসাথে বৈঠকে বসানোর কথা বলেছেন। ট্রাম্প ন্যাটোকে বলেছেন ‘একটি অর্থহীন প্রতিষ্ঠান।’ তিনি ন্যাটোর ৫ নম্বর ধারা অনুযায়ী, এক সদস্য দেশ আক্রান্ত হলে অন্য দেশগুলোর হামলে পড়ার দায় থেকে সরে আসার স্পষ্ট ইঙ্গিত দিয়েছেন। ফলে ন্যাটোর অবস্থান প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের আমলে কী দাঁড়াবে, তা স্পষ্ট নয়। ওবামা তার ডকট্রিনের অংশ হিসেবে আমেরিকাকে যুদ্ধ থেকে বাঁচাতে মিত্রদের জন্য লিপ সার্ভিসকে বড় অস্ত্র বানিয়েছিলেন। ট্রাম্পের মধ্যে যেহেতু রাখঢাক নেই, তার জন্য সে অস্ত্রেরও প্রয়োজন হবে না। তিনি প্রেসিডেন্ট হয়ে তার ঘোষণার বাস্তবায়ন শুরু করলে মুসলিম মিত্রদেশগুলো তার কাছে কোনো নিরাপত্তাছায়া পাওয়ার আশা নেই। পূর্ব ইউরোপের ভঙ্গুর দেশগুলো এখনই আতঙ্কের মধ্যে পড়ে গেছে, যাদেরকে ন্যাটোর ছায়াতলে এনে সিনিয়র বুশ ও তার পরবর্তী সরকারগুলো এক ধরনের নিরাপত্তাছায়া দিয়েছিল। সেই ছায়া ট্রাম্পের আমলে অবশিষ্ট না থাকার সম্ভাবনাই প্রবল হয়ে উঠছে। ট্রাম্প দর্শন বাস্তবায়িত হলে আমেরিকা সত্যিকার অর্থে বিশ্বনেতা আর থাকবে বলে মনে হচ্ছে না। নস্ট্রেডাম অথবা বাবাভাঙ্গা সেটিকে বিবেচনায় এনে বারাক ওবামাকে ‘শেষ প্রেসিডেন্ট’ মর্মে ভবিষ্যদ্বাণী উচ্চারণ করেছিলেন কি না কে জানে। তবে ট্রাম্প জমানার বিশ্ব পরিস্থিতিতে যে অনেক কিছুও ওলটপালট হতে যাচ্ছে, তাতে সন্দেহ নেই। তত দিন পর্যন্ত এখনকার মধ্যপ্রাচ্যের ভাঙচুরের শিকার দেশগুলো নিজেদের টিকিয়ে রাখতে পারলে তারা নতুন বিশ্বে ক্রমেই শক্তিমান হয়ে উঠতে সক্ষম হতে পারে। এর মধ্যে প্রথম কাতারের দেশগুলোর মধ্যে ইরান-তুরস্ক, এমনকি সৌদি আরবও থাকতে পারে। mrkmmb@gmail.com - See more at: http://www.dailynayadiganta.com/detail/news/139781#sthash.TicRcRlo.dpuf

Comments

Comments!

 ট্রাম্প ডকট্রিনে বিশ্ব পরিণতিAmarbangladeshonlineAmarbangladeshonline | Amarbangladeshonline

ট্রাম্প ডকট্রিনে বিশ্ব পরিণতি

Friday, July 29, 2016 2:15 pm
18_172

দৃশ্যমান ও অদৃশ্যমান বিশ্ব পরিস্থিতি যেন দ্রুত পরিবর্তন হতে শুরু করেছে। এক সময়ের অর্ধেক পৃথিবীর নিয়ন্ত্রক গ্রেট ব্রিটেন ইউরোপীয় জোট থেকে বেরিয়ে একটি বিচ্ছিন্ন ক্ষুদ্র শক্তিতে রূপান্তরিত হওয়ার ব্যাপক সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে। বিশ্বের একক পরাশক্তি আমেরিকা যেন ক্লান্ত-শ্রান্ত হয়ে এককালের দাপুটে রানীর পরিণতির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। ষোড়শ শতাব্দীর ফরাসি দার্শনিক ও জ্যোতির্বিজ্ঞানী মিসেল দ্য নস্ট্রেডাম নক্ষত্রের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করে ভবিষ্যৎ পৃথিবীর ব্যাপারে কিছু বক্তব্য রেখে গিয়েছিলেন। ২০১৬ সালের জন্যও তার কিছু ভবিষ্যদ্বাণী ছিল। এর আগে তার দেয়া পূর্বাভাসের সাথে কেনেডি ভ্রাতৃদ্বয়ের খুন, হিটলারের উত্থান, নেপোলিয়ানের পরাজয়, যুক্তরাষ্ট্রে ‘এক-এগারো’র সন্ত্রাসী হামলার ঘটনার মতো বেশ কিছু বাঁক পরিবর্তনকারী ঘটনার মিল ঘটে যায়। ফলে তার বক্তব্যকে অনেকেই গুরুত্ব দিতে শুরু করেন। নস্ট্রেডাম তার ভবিষ্যদ্বাণীতে ওবামার পুনর্নির্বাচনের কথা বলেছিলেন। আর তিনি এটাও বলেছেন, ওবামা হবেন আমেরিকার সর্বশেষ প্রেসিডেন্ট। এর কয়েক শতাব্দী পরে ১৯৯৪ সালে পরলোকগত এবং ঈশ্বরের দূত দাবিকারী বুলগেরীয় রমণী বাবাভাঙ্গাও বলেছিলেন, এক কালো আমেরিকান যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হবেন। আর তিনি হবেন আমেরিকার সর্বশেষ (ক্ষমতাধর) প্রেসিডেন্ট। এক সময় অনেকেই অন্ধ এই নারীর কথাটাকে হাস্যকর কল্পনা মনে করেছিলেন। কিন্তু বারাক ওবামা নামের এক কেনীয় বংশোদ্ভূত কালো আমেরিকান সত্যি সত্যিই আমেরিকার প্রেসিডেন্ট হয়ে আট বছরের মেয়াদ শেষ করতে চলেছেন। আর পরবর্তী মার্কিন প্রেসিডেন্ট হিসেবে যে দু’জন প্রার্থিতা চূড়ান্ত করেছেন, তাদের একজন হলেন দেশের বড় দুই দলের প্রথম একজন নারী প্রার্থী; অপরজন রিপাবলিকান না হয়েও দলের মনোনয়ন পেয়েছেন। ট্রাম্প-হিলারি দু’জনই দলের আনুষ্ঠানিক কনভেনশনে মনোনয়ন লাভ করার পর তারাই যে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে নিশ্চিতভাবে বড় দুই দলের প্রার্থী হচ্ছেন, তাতে আর কোনো সন্দেহের অবকাশ থাকল না।
আমেরিকার খ্যাতিমান আবাসন ও ক্যাসিনো ব্যবসায়ী ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন প্রথম নিজের প্রার্থিতাঘোষণা করেন তখন কেউ তাকে পাত্তা দিতে চায়নি। এর আগে যারা বড় দুই দলের প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন তাদের কেউ হয়তোবা কংগ্রেস বা সিনেটের প্রভাবশালী সদস্য অথবা কোনো রাজ্যের গভর্নর অথবা জাঁদরেল সাবেক চার-পাঁচ তারকা জেনারেল ছিলেন। ট্রাম্প কিন্তু এর কোনো কিছুই ছিলেন না। রিপাবলিকান দলের আনুষ্ঠানিক কোনো পদে অথবা আঞ্চলিক কোনো আইনসভারও সদস্য ছিলেন না তিনি। প্রার্থী হয়ে এমন সব উদ্ভট কথাবার্তা বলেছেন, যাতে তিনি রিপাবলিকান প্রার্থী শেষ পর্যন্ত হবেন বলে অনেকে ভাবতে পারেননি। বিশ্বের এখন এক-তৃতীয়াংশ জনসংখ্যা হলো মুসলিম। তিনি এই মুসলিমদের যুক্তরাষ্ট্রে ঢুকতে না দেয়া, এমনকি তাদের মঙ্গল গ্রহে পাঠিয়ে দেয়ার অভিপ্রায় ব্যক্ত করেছেন। আমেরিকার কাছের প্রতিবেশী দেশ মেক্সিকোর সীমান্তে উঁচু দেয়াল নির্মাণের ঘোষণাও দিয়েছেন। ব্রিটেনের ইউরোপ থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়ে জাতীয়তাবাদী ব্রিটিশদের ‘ফার্স্ট ব্রিটেন’ স্লোগানের জয়যুক্ত হওয়াকে ‘ফার্স্ট আমেরিকা’ স্লোগানের জয় হওয়ার লক্ষণ হিসেবে ধরে নিয়েছেন ট্রাম্প।
এক সময় বলা হয়েছিল, ট্রাম্প কোনোভাবেই রিপাবলিকান দলের মনোনয়ন পাবেন না। এখন বলা হচ্ছে, তিনি মনোনয়ন পেলেও নির্বাচনে হিলারির কাছে পরাভূত হবেন। আমেরিকান জনমতের যেসব জরিপ প্রকাশ করা হচ্ছে, তার মধ্যে মানুষের হৃদরেখার মতো অস্থিরতা প্রত্যক্ষ করা যাচ্ছে। এই লেখাটি যখন লেখা হচ্ছে, ঠিক সে সময় পাওয়া মার্কিন জনমত জরিপের অধিকাংশেই ট্রাম্প এগিয়ে রয়েছেন। ২৬ জুলাই প্রকাশিত লস অ্যাঞ্জেলস টাইমস ও ইউএসসির জরিপ অনুসারে ট্রাম্পের পক্ষে পাওয়া গেছে ৪৭ শতাংশ আর হিলারির পক্ষে ৪০ শতাংশ আমেরিকানের সমর্থন। এর আগের দিন সিএনএন এবং ওআরসির জরিপের ফলাফল অনুযায়ী সাধারণ নির্বাচনে ট্রাম্পের পক্ষে ৪৮ এবং হিলারির পক্ষে ৪৩ জনের সমর্থন পাওয়া গেছে। একই দিন প্রকাশিত সিবিএস নিউজের জরিপেও ট্রাম্প ৪৪ এবং হিলারি ৪৩ শতাংশের সমর্থন পেয়েছেন বলে উল্লেখ করা হয়। এ দিনের ইকোনমিস্ট ও ইউগভের ফলাফলে অবশ্য হিলারি ৪৭ এবং ট্রাম্প ৪০ শতাংশের সমর্থন পাওয়ার কথা বলা হয়েছে। কয়েক সপ্তাহ আগেও অধিকাংশ জরিপে মার্কিন সাধারণ নির্বাচনে ট্রাম্পের চেয়ে হিলারি অগ্রসর রয়েছেন মর্মে দেখানো হচ্ছিল। এখন যতই দিন যাচ্ছে, ততই ট্রাম্পের পাল্লা ভারী হচ্ছে। ডেমোক্র্যাট কনভেনশনের পরে হিলারি যেভাবে চাঙা হবেন বলে মনে করা হয়েছিল, বাস্তবে সেটি ঘটছে না। আমেরিকায় ট্রাম্প যে প্রেসিডেন্ট হতে পারেন, সেটিকে কেউই আর অবাস্তব কল্পনাবিলাস মনে করছেন না।
ইংল্যান্ডে বরিস জনসনদের ‘ফার্স্ট ব্রিটেন’ নামে দেয়া জাতীয়তাবাদী বক্তব্যের প্রতি যেভাবে ব্রিটিশরা আকৃষ্ট হয়েছিলেন, সে প্রবণতা আমেরিকানদের ওপরও আছর করছে বলে মনে হচ্ছে। জনসনরা ইউরোপ থেকে ব্রিটেনকে স্বাধীন করার জন্য ব্রেক্সিটের পক্ষে মত দিতে ব্রিটিশদের প্রতি আবেগময় আহ্বান জানিয়েছিলেন। ট্রাম্প বলছেন, বিশ্বের প্রতি মিথ্যা অঙ্গীকার থেকে স্বাধীন করে আমেরিকানদের স্বার্থ রক্ষার প্রতি দায়বদ্ধ করতে হবে যুক্তরাষ্ট্রকে। আগে হলো, আমেরিকা ও তার জনগণ। এরপর আমরা বাকি মিত্রদের বিষয় দেখব।’ তার এ বক্তব্যে ইতোমধ্যে ৪ নভেম্বরের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনকে অনেকে ব্রেক্সিটের মতো অ্যাক্সিটের নির্বাচন হিসেবে চিহ্নিত করতে শুরু করেছেন। ব্রেক্সিট ছিল ইউরোপ জোট থেকে ব্রিটেনের বের হয়ে যাওয়া। আর অ্যাক্সিট হলো বাকি বিশ্বের নিরাপত্তার অঙ্গীকার থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে বের করে আনা। এ ব্যাপারে ট্রাম্পের বক্তব্যের মধ্যে কোনো রাখঢাক নেই। তিনি তিরিশের দশকের জাতীয়তাবাদী আমেরিকান নেতাদের মতোই বলেছেন, ‘সবার আগে আমেরিকা’। ট্রাম্প বলছেন, ইউরোপের নিরাপত্তার জন্য আমেরিকা তার টাকা খরচ করবে, সেনাশক্তি বিনিয়োগ কেন করবে? হ্যাঁ, করতে পারে যদি এর সব ব্যয়ভার ইউরোপিয়ানরা বহন করে। অন্য অঞ্চলের মিত্রদের বিষয়টিও হবে একই রকম।’
ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট হওয়ার (যদি হন) অনেক আগে থেকে যুক্তরাষ্ট্র নিজেকে বিশ্বনেতৃত্ব থেকে ক্রমেই প্রত্যাহার করে নিচ্ছে বলে জোরালো বিতর্ক তৈরি হয়েছে। ওবামার নমনীয় এবং যুদ্ধকে পাশ কাটানোর পররাষ্ট্রনীতিকে রিপাবলিকান চিন্তকেরা বলছেন, আমেরিকাকে বিশ্ব নেতৃত্ব থেকে সরিয়ে নিয়ে আসা। আটলান্টিক ম্যাগাজিনে ওবামা ডকট্রিনের ব্যাপারে এক বিরাট নিবন্ধ প্রকাশ করা হয়েছে। এতে দেখানো হয়েছে, কিভাবে আমেরিকা তার মিত্রদের দেয়া অঙ্গীকার পালন করতে যুদ্ধে জড়ানোর ঝুঁকি থেকে নিজেকে বের করে এনেছে। আসাদ রেডলাইন ক্রস করলে প্রতিশোধের মুখে পড়বেন বলে কঠোর হুমকি দেয়া হয়েছিল। কিন্তু এ ব্যাপারে ঠিক করে দেয়া সীমারেখা সিরিয়ায় বিষাক্ত গ্যাস প্রয়োগ করে ১৪ শতাধিক ব্যক্তিকে হত্যা করার মাধ্যমে অতিক্রম করার পরও ওবামা চার্চিলীয় স্টাইলে একটি ঝাড়া বক্তৃতা দেয়ার মাধ্যমে ব্যবস্থা গ্রহণ থেকে পিছু হটেছেন। পিছু হটেছেন ইউক্রেন ইস্যুতেও। এসব ইস্যুতে হিলারির সাথে কিছুটা মতান্তরও ঘটেছে ওবামার।
বারাক ওবামা আমেরিকার মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি তেল নির্ভরতা কাটানোর যেসব পদক্ষেপ নিয়েছেন, তার সাথে আমেরিকার বিশ্ব থেকে ক্রমেই গুটিয়ে নেয়ার একটি প্রবণতার যে সম্পর্ক রয়েছে, সে ব্যাপারটি বিশ্ব পরিস্থিতি বিশ্লেষকদের উপলব্ধির বাইরে থাকার কথা নয়। ওবামা নিজস্ব জ্বালানির ওপর নির্ভর করার পরিস্থিতি তৈরি করেছেন আমেরিকাকে বাইরের বিশ্ব থেকে ক্রমশ প্রত্যাহারের জন্য। তিনি যে পটভূমি তৈরি করেছেন হিলারি যদি প্রেসিডেন্ট হন, তাহলে সে পথই হয়তোবা অনুসরণ করবেন। অর্থাৎ আমেরিকাকে বিশ^ নিয়ন্ত্রক কর্মকাণ্ড থেকে প্রত্যাহার করে নেবেন; তবে ধীরে ধীরে। কিন্তু ট্রাম্প যদি প্রেসিডেন্ট হন তাহলে ব্রেক্সিটের মতো দৃশ্যমানভাবেই আমেরিকাকে বাকি দুনিয়ার দায় (পড়–ন, নেতৃত্ব) থেকে প্রত্যাহারের ‘অ্যাক্সিট’ ঘটাবেন। রিপাবলিকানরা যতই বিশ্ব নেতৃত্ব থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে সরিয়ে আনার জন্য ওবামার সমালোচনা করুন না কেন, বাস্তবে নতুন রিপাবলিকান প্রেসিডেন্ট সে পথেই হাঁটবেন এবং হাঁটবেন দ্রুত গতিতে । এসব ব্যাপারে যারা দৃশ্যের অন্তরালে বা ওপর থেকে কলকাঠি নাড়ছেন, তাদের ওপর রিপাবলিকান চিন্তাবিদদের খুব একটা নিয়ন্ত্রণ রয়েছে বলে মনে হয় না। অতীতে মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপে রাশিয়ার কাছে অনেকটা অপমানকরভাবে প্রভাব হারানোর বিষয়টিকে নানাভাবে সমালোচনা করেছেন রিপাবলিকানরা। কিন্তু ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট হলে যা করবেন বলে ইতোমধ্যে বলা হচ্ছে, তাতে অর্থের বিনিময়েই নিরাপত্তা সেবা দেয়ার এক ব্যবস্থার দিকে তিনি এগোবেন বলে মনে হয়।
মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকার প্রধান আঞ্চলিক মিত্র ছিল ইসরাইল। এরপর সৌদি আরব ও তার সহযোগী উপসাগরীয় দেশগুলো এবং তুরস্ক। খানিকটা সাইডলাইনে ছিল মিসর ও জর্ডানের মতো দেশগুলো। ইসরাইলের অস্তিত্ব ও নিরাপত্তার ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্র বরাবরই দলনির্বিশেষে ছিল অঙ্গীকারবদ্ধ। সেই অঙ্গীকারের ব্যতিক্রম ঘটবে, এমনটি তেলআবিব হয়তো এখনো মনে করে না। কিন্তু এর পরও নিজস্ব নিরাপত্তা ভিশনগুলো বাস্তবায়নে এগিয়ে যাচ্ছে ইসরাইল। এ ক্ষেত্রে তাদের সাফল্য হলো, মধ্যপ্রাচ্যের সব শক্তিশালী দেশ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে ইসরাইলের সাথে সম্পর্ক তৈরি করেছে। তুরস্কও ভেঙে পড়া সম্পর্ক পুনর্নির্মাণে চুক্তি করেছে তেলআবিবের সাথে। সংযুক্ত আরব আমিরাত এখন তার নিরাপত্তার জন্য ইসরাইল-নির্ভরশীল একটি দেশে পরিণত হয়েছে। তেলআবিবের সাথে সৌদি যোগাযোগ এখন আর গোপন কোনো বিষয় নয়। ইসরাইল ক্ষুব্ধ হতে পারে, এমন কোনো কাজ থেকে যথাসম্ভব দূরে থাকে মিসর। ইসরাইলকে মোকাবেলা করার ইরানের সামরিক প্রস্তুতি এখন শিয়া-সুন্নি দ্বন্দ্বে ক্ষয় হচ্ছে। ইসরাইল-ফিলিস্তিন স্বাধীন দু’টি দেশ প্রতিষ্ঠার আন্তর্জাতিক পরিকল্পনার চাপকে এখন নেতানিয়াহু থোড়াই পরোয়া করছেন। অধিকন্তু মধ্যপ্রাচ্যের প্রতিবেশী দেশগুলোকে অস্থির ও ভঙ্গুর করে রেখে তাদের নিরাপত্তার জন্য ইসরাইল-নির্ভরশীল করে রাখার ইনোন পরিকল্পনার অনেকখানি এখন বাস্তবায়নের পথে বলেই মনে হচ্ছে।
আমেরিকা মধ্যপ্রাচ্য থেকে সৈন্য প্রত্যাহারের আগে সেখানে মানচিত্র পরিবর্তনের জন্য যে কাজ করছিল, সে সময়টা ট্রাম্পের আগমনের পদধ্বনিতে দ্রুত ফুরিয়ে আসছে বলে মনে হচ্ছে। সিরিয়া-ইরাকে আইএসের পতন ঘটিয়ে সেখানে কুর্দিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করার কাজ এখনো পরিণতির দিকে নিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়নি। অনেকের ধারণা, তুরস্কে অভ্যুত্থান ঘটিয়ে সামরিক জান্তাকে ক্ষমতায় নিয়ে আসার চেষ্টা ছিল এ ক্ষেত্রে একটি বড় পদক্ষেপ। এখন নতুন পরিস্থিতিতে কতটুকু এই অ্যাজেন্ডা নিয়ে অগ্রসর হওয়া যাবে তা বলা মুশকিল।
তুরস্কের ব্যর্থ অভ্যুত্থানের পর এরদোগানের ভূমিকার জন্য ট্রাম্প তার প্রশংসা করেছেন। ট্রাম্প এটাও গোপন করেননি যে, তিনি কুর্দিদের ভালোবাসেন। আইএসের নিতম্বে পদাঘাত করতে তিনি তাদের সাথে কাজ করতে চান। এ জন্য তিনি তুরস্ক ও তুর্কিদের একসাথে বৈঠকে বসানোর কথা বলেছেন। ট্রাম্প ন্যাটোকে বলেছেন ‘একটি অর্থহীন প্রতিষ্ঠান।’ তিনি ন্যাটোর ৫ নম্বর ধারা অনুযায়ী, এক সদস্য দেশ আক্রান্ত হলে অন্য দেশগুলোর হামলে পড়ার দায় থেকে সরে আসার স্পষ্ট ইঙ্গিত দিয়েছেন। ফলে ন্যাটোর অবস্থান প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের আমলে কী দাঁড়াবে, তা স্পষ্ট নয়। ওবামা তার ডকট্রিনের অংশ হিসেবে আমেরিকাকে যুদ্ধ থেকে বাঁচাতে মিত্রদের জন্য লিপ সার্ভিসকে বড় অস্ত্র বানিয়েছিলেন। ট্রাম্পের মধ্যে যেহেতু রাখঢাক নেই, তার জন্য সে অস্ত্রেরও প্রয়োজন হবে না। তিনি প্রেসিডেন্ট হয়ে তার ঘোষণার বাস্তবায়ন শুরু করলে মুসলিম মিত্রদেশগুলো তার কাছে কোনো নিরাপত্তাছায়া পাওয়ার আশা নেই। পূর্ব ইউরোপের ভঙ্গুর দেশগুলো এখনই আতঙ্কের মধ্যে পড়ে গেছে, যাদেরকে ন্যাটোর ছায়াতলে এনে সিনিয়র বুশ ও তার পরবর্তী সরকারগুলো এক ধরনের নিরাপত্তাছায়া দিয়েছিল। সেই ছায়া ট্রাম্পের আমলে অবশিষ্ট না থাকার সম্ভাবনাই প্রবল হয়ে উঠছে।
ট্রাম্প দর্শন বাস্তবায়িত হলে আমেরিকা সত্যিকার অর্থে বিশ্বনেতা আর থাকবে বলে মনে হচ্ছে না। নস্ট্রেডাম অথবা বাবাভাঙ্গা সেটিকে বিবেচনায় এনে বারাক ওবামাকে ‘শেষ প্রেসিডেন্ট’ মর্মে ভবিষ্যদ্বাণী উচ্চারণ করেছিলেন কি না কে জানে। তবে ট্রাম্প জমানার বিশ্ব পরিস্থিতিতে যে অনেক কিছুও ওলটপালট হতে যাচ্ছে, তাতে সন্দেহ নেই। তত দিন পর্যন্ত এখনকার মধ্যপ্রাচ্যের ভাঙচুরের শিকার দেশগুলো নিজেদের টিকিয়ে রাখতে পারলে তারা নতুন বিশ্বে ক্রমেই শক্তিমান হয়ে উঠতে সক্ষম হতে পারে। এর মধ্যে প্রথম কাতারের দেশগুলোর মধ্যে ইরান-তুরস্ক, এমনকি সৌদি আরবও থাকতে পারে।
mrkmmb@gmail.com – See more at: http://www.dailynayadiganta.com/detail/news/139781#sthash.TicRcRlo.dpuf

Comments

comments

সম্পাদক : মোহাম্মদ আবদুল বাছির
প্রকাশক: মোহাম্মদ জহিরুল ইসলাম
ফোন : ‎০১৭১৩৪০৯০৯০
৩৪৫/১, দিলু রোড, নিউ ইস্কাটন, ঢাকা-১০০০
X
 
নিয়মিত খবর পড়তে আমাদের ফেসবুক পেজে লাইক দিয়ে যুক্ত থাকুন
X