রবিবার, ১৮ই ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ ইং, ৬ই ফাল্গুন, ১৪২৪ বঙ্গাব্দ, সকাল ৭:৩৬
শিরোনাম
  • ঘৃণাকে বিজয়ী হতে দেয়া যাবে না, ট্রাম্পকে ইঙ্গিত করে জর্জ ক্লুনি
  • আমার একটাই চিন্তা দেশের মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন করা: প্রধানমন্ত্রী
  • ‘কেন্দ্রীয় সরকারের আগ্রাসী নীতির কারণে কাশ্মীরকে হারাতে হবে’
  • সাড়ে চারমাস পর মুখোমুখি, খাদিজাকে উদ্দেশ্য করে যা বলল বদরুল
  • খালেদার ‘সাজা’ বিরোধী নেতাকর্মীদের মনোবল ভাঙ্গার কৌশল!
  • বিএনপির কর্মসূচি ‘যথাসময়ে’ জানানো হবে: রিজভী
  • দলের জন্য বোলিং করতেও রাজি মুশফিক
  • শিশু জিহাদের মৃত্যু: চার জনের ১০ বছর করে কারাদণ্ড
  • অবশেষে বাড়ি অবরুদ্ধ করে রাখা সেই দেয়াল ভেঙ্গে ফেলা হচ্ছে
  • সাক্ষ্য দিলেন খাদিজা, চাইলেন বদরুলের সর্বোচ্চ শাস্তি
  • বদরুলের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিতে আদালতে খাদিজা
  • আজ বগুড়ায় যেসব প্রকল্প উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী
  • রোহিঙ্গা স্থানান্তরের সরকারি পরিকল্পনার সঙ্গে দ্বিমত মানবাধিকার কমিশনের
  • মহেশখালীতে ইয়াবা ব্যবসায়ীদের সঙ্গে পুলিশের ‘বন্দুকযুদ্ধ’
  • হোয়াইট হাউসে কাজ করার দীর্ঘ অভিজ্ঞতার কথা জানালেন এই বাংলাদেশি সাংবাদিক
Saturday, July 1, 2017 10:39 am
A- A A+ Print

তাদের শূন্যতা পূরণ হচ্ছে কি?

72007_b1

তারা প্রত্যেকেই ছিলেন দিকপাল। তাদের আলোয় আলোকিত ছিল বাংলাদেশ। নিজ নিজ পরিমণ্ডলে তারা নিজেদের কাজের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত রেখে গেছেন। সমাজ, রাষ্ট্র, সভ্যতা উপকৃত হয়েছে তাদের কর্মের দ্বারা। প্রকৃতির নিজস্ব নিয়মে চলে গেছেন তারা। কিন্তু তাদের শূন্যতা কী পূরণ হচ্ছে। তরুণরা কি পারছেন তাদের জায়গা নিতে। প্রফেসর আবদুর রাজ্জাক, বিচারপতি হাবিবুর রহমান, এবিএম মূসা এইসব ব্যতিক্রম মানুষদের অভাব কি আমরা অনুভব করছি। তাকে বলা হয় ‘জ্ঞান তাপস’। শিক্ষকদের শিক্ষক। তিনি জাতীয় অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাক। তাঁর জ্ঞানের পরিধি বিস্মৃত ছিল ইতিহাস, রাষ্ট্র  ও রাজনীতিতে। দাবা খেলাতেও পারদর্শী ছিলেন তিনি। জীবনযাপনে ছিলেন অত্যন্ত সাদামাটা। অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাক ১৯৩৬ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রাজনৈতিক-অর্থনীতি বিভাগে প্রভাষক হিসেবে যোগ দেন। পরবর্তীতে অর্থনীতি এবং রাষ্ট্রবিজ্ঞান দুটি পৃথক বিভাগ প্রতিষ্ঠিত হলে তিনি রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে যোগ দেন। ১৯৭৫ সালে তিনি শিক্ষকতা থেকে অবসর নেন। অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাক অল্প কিছু প্রবন্ধ রচনা করলেও তার অসাধারণ জ্ঞান, পাণ্ডিত্য ও প্রজ্ঞার কারণে কিংবদন্তি খ্যাতি অর্জন করেন। লেখক, সমাজবিজ্ঞানী, বুদ্ধিজীবী আহমদ ছফা তাকে নিয়ে ‘যদ্যপি আমার গুরু’ নামে একটি বই রচনা  করেছিলেন। এছাড়া দার্শনিক, শিক্ষাবিদ ও সাহিত্যিক সরদার ফজলুল করিম তাঁর সঙ্গে আলাপচারিতার ওপর ভিত্তি করে লিখেছিলেন ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও পূর্ববঙ্গীয় সমাজ: অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাক’ নামে আরো একটি বই। জাতির ‘বাতিঘর’ হিসেবে পরিচিত ছিলেন প্রয়াত প্রধান বিচারপতি মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান। জীবদ্দশায় জাতির ক্রান্তিলগ্নে সংবিধানকে সমুন্নত রাখতে তিনি পালন করেছিলেন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। সর্বজন শ্রদ্ধেয় বিচারপতি হাবিবুর রহমান বাংলাদেশের ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে শিক্ষার অগ্রগতি, রাষ্ট্রের সমৃদ্ধির পথ রচনা একই সঙ্গে রাজনৈতিক অচলাবস্থায় বাতিঘরের মতো পথ দেখিয়েছিলেন জাতিকে। বাংলাদেশের  গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতা রক্ষায় ১৯৯৬ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব নেন বিচারপতি হাবিবুর রহমান। ওই সময়ের রাজনৈতিক পরিস্থিতি মোকাবিলায় তার ভূমিকা ছিল প্রশংসনীয়। একই সঙ্গে তিনি সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষভাবে পরিচালনা করে সবার প্রশংসা কুড়িয়েছিলেন। জীবদ্দশায় সাহিত্য ও শিক্ষাক্ষেত্রেও যথেষ্ট অবদান রেখেছিলেন বিচারপতি হাবিবুর রহমান। একজন গবেষক ও লেখক হিসেবেও পরিচিত ছিলেন তিনি। বিচারপতি হিসেবে তিনি সংবিধানের অষ্টম সংশোধনী মামলাসহ অসংখ্য গুরুত্বপূর্ণ মামলার রায় দিয়েছেন। তার চলে যাওয়াকে দেশ ও বিচারাঙ্গনের জন্য অপূরণীয় ক্ষতি হিসেবে এখনো উল্লেখ করেন বিভিন্ন শ্রেণি- পেশার মানুষেরা। প্রখ্যাত সাহিত্যিক সৈয়দ শামসুল হক। কবিতা, উপন্যাস, নাটক, ছোটগল্প, অনুবাদসহ সাহিত্যের সকল শাখায় সাবলীল পদচারণার জন্য তাঁকে অভিহিত করা হয় ‘সব্যসাচী’ লেখক হিসেবে। তিনি ১৯৩৫ সালের ২৭শে ডিসেম্বর কুড়িগ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। সৈয়দ হক না ফেরার দেশে চলে যান ২০১৬ সালের ২৭শে সেপ্টেম্বর। লেখালেখি জীবনের প্রায় ষাট দশকই তিনি ছিলেন সাবলীল। দীর্ঘ জীবনে সাহিত্যের সকল ক্ষেত্রে মেধা ও প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছেন সৈয়দ হক। সমসাময়িক বাংলাদেশ ও বাঙালি মধ্যবিত্ত সমাজের আবেগ-অনুভূতি-ভালো-মন্দ সবই সহজ কথা ও ছন্দে উঠে এসেছে তার লেখনীতে। একই সঙ্গে ফুটে উঠেছে সমকালিন বাস্তবতাও। পরবর্তী প্রজন্মের সাহিত্যিকদের জন্য তিনি পালন করেছেন পথিকৃতের ভূমিকা। নজরুল সংগীতের অবিসংবাদিত শিল্পী ফিরোজা বেগম। সংগীত বিশারদদের মতে বাংলাদেশে নজরুল সংগীতকে জনপ্রিয়তার শীর্ষ পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার প্রায় পুরো কৃতিত্বই ফিরোজা বেগমের।  ১৯৪০-এর দশকে সংগীত ভুবনে পদার্পণ করেন ফিরোজা বেগম। ষষ্ঠ শ্রেণিতে অধ্যয়নকালে অল ইন্ডিয়া রেডিওতে প্রথম গানে কণ্ঠ দেন। ১৯৪২ সালে মাত্র ১২ বছর বয়সে বিখ্যাত গ্রামোফোন কোম্পানি এইচএমভি থেকে ৭৮ আরপিএম ডিস্কে  ইসলামী গান নিয়ে তাঁর প্রথম রেকর্ড বের  হয়। ফিরোজা বেগম মাত্র দশ বছর বয়সে বাংলা সাহিত্যের অবিস্মরণীয় কবি ও গীতিকার কাজী নজরুল ইসলামের সান্নিধ্যে এসে তার কাছ থেকে তালিম গ্রহণ করেন। নজরুলের গান নিয়ে তার প্রকাশিত প্রথম রেকর্ড বের হয় ১৯৪৯ সালে। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম অসুস্থ হওয়ার পর ফিরোজা বেগম নজরুল সংগীতের শুদ্ধ স্বরলিপি ও সুর সংরক্ষণের উদ্যোগ গ্রহণ করেন। জীবদ্দশায় পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ৩৮০টির বেশি একক সংগীতানুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করেছিলেন ফিরোজা বেগম। নজরুল সংগীত ছাড়াও আধুনিক গান, গজল, কাওয়ালি, ভজন, হামদ ও নাতসহ বিভিন্ন ধরনের সংগীতে কণ্ঠ দিয়েছেন। ২০১৪ সালের  ৯ই সেপ্টেম্বর মৃত্যুবরণ করেন তিনি। তার মতো একজন গুণী আবার কবে আসবে সে অপেক্ষায় থাকতে হবে সংগীত পিপাসুদের। সরদার ফজলুল করিম। দার্শনিক, চিন্তক। সরদার ফজলুল করিম ১৯২৫ সালের পহেলা  মে বরিশালের আটিপাড়ায় এক কৃষক পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৪৫ সালে দর্শনশাস্ত্রে অনার্স ও ১৯৪৬ সালে এম.এ. ডিগ্রি লাভ করে ওই বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা শুরু করেন। পরবর্তীতে সাম্যবাদী বামপন্থি সামাজিক-রাজনৈতিক আন্দোলনে যুক্ত থাকার অভিযোগে তৎকালীন পাকিস্তান সরকার কর্তৃক নানাভাবে নিগৃহীত হন। রাজবন্দি হিসেবে কারাজীবনযাপন করেন দীর্ঘ ১১ বছর। পরবর্তীতে ১৯৭২ থেকে ১৯৮৫ সাল পর্যন্ত আবারো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করে অবসরে যান। ২০১৪ সালের ১৫ই জুন মৃত্যুবরণ করেন তিনি। জ্ঞানপিপাসু বিপ্লবী এই শিক্ষাবিদ ও দার্শনিকের জীবনের প্রতিটি অধ্যায় ছিল বৈচিত্র্যে ভরপুর। আমৃত্যু লালিত আদর্শকে কখনো বিসর্জন দেননি তিনি। রাষ্ট্র, রাজনীতি ও সরকার নিয়ে সরদার ফজলুল করিম  রচিত ও অনূদিত গ্রন্থগুলো পাঠক সমাজে ব্যাপক পছন্দনীয়। আহমদ ছফা। লেখক, কবি, সমাজবিজ্ঞানী, বুদ্ধিজীবী। তাঁর লেখায় জাতিসত্তার পরিচয় নির্ধারণ প্রাধান্য পেয়েছে। জীবদ্দশায় আহমদ ছফা তাঁর প্রথাবিরোধী, নির্মোহ, অকপট দৃষ্টিভঙ্গির জন্য বুদ্ধিজীবী মহলে বিশেষ আলোচিত ছিলেন। বাংলাদেশের কথাসাহিত্যে একজন সফল লেখক আহমদ ছফা। ২০০১ সালের ২৮শে জুলাই মৃত্যুবরণ করেন তিনি। আহমদ ছফা ছিলেন তীক্ষ্ণ মেধার অধিকারী একজন সৃষ্টিশীল লেখক। তার সাহিত্য জীবনের সূচনা হয় ষাটের দশকে। সৃষ্টিধর্মী লেখক হিসেবে তিনি গল্প, উপন্যাস, কবিতা, প্রবন্ধ, সমালোচনা, অনুবাদ, শিশুসাহিত্যে উল্লেখযোগ্য কৃতিত্ব দেখান। তবে, গবেষক ও প্রাবন্ধিক হিসেবেই তাঁর পরিচিতি সর্বাধিক। জীবনের বহু বিচিত্র অভিজ্ঞতাকে তিনি গল্প-উপন্যাস রচনার কাজে লাগিয়েছেন। তাঁর আখ্যানমূলক রচনায় বাংলাদেশের মানুষের আশা-আকাঙক্ষা বেঁচে থাকার অনুপ্রেরণা, মুক্তিকামনা ও স্বাধীনতাস্পৃহা, সামাজিক অসঙ্গতি ও বৈষম্যের চিত্র রূপায়িত হয়েছে। অনুভূতির প্রত্যক্ষ প্রকাশ, লোকজ ভাষা, পুথিপুরাণের শব্দ ও বাকরীতির প্রকাশ তাঁর কবিতার ধরন হয়ে উঠে। আহমদ ছফা ছিলেন সুবিধাবাদের বিরুদ্ধে এক প্রতিবাদী কণ্ঠ এবং আদর্শনিষ্ঠ ও প্রগতিপন্থি একজন সংস্কৃতিকর্মী। প্রগতির সংঘ শান্তিতে তিনি ছিলেন আস্থাবান। তাঁর সাংগঠনিক দক্ষতা ও ক্ষমতাও ছিল উল্লেখ করার মতো। ডা. মোহাম্মদ ইব্রাহিম। বাংলাদেশের ইতিহাসে এক নিবেদিতপ্রাণ চিকিৎসকের নাম। বাংলাদেশে ডায়াবেটিস রোগ সম্পর্কে সচেতনতা ও এর প্রতিকারে একটি অবিস্মরণীয় নাম ডা. মোহাম্মদ ইব্রাহিম। একই সঙ্গে চিকিৎসা ইতিহাসের এক অনুকরণীয় ও অনুসরণীয় নামও। মানব  সেবার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন গুণী এই ব্যক্তি। গড়ে তোলেন বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতি। মানবসেবার সেই ধারাবাহিকতায় গড়ে উঠেছে বারডেম, ইব্রাহিম কার্ডিয়াক হাসপাতাল, ইব্রাহিম জেনারেল হাসপাতালসহ বহু প্রতিষ্ঠান। ডায়াবেটিক রোগীদের জন্য এই হাসপাতালগুলোই এখন পর্যন্ত শেষ ভরসার জায়গা। ১৯৬৫ সালে তারই প্রতিষ্ঠিত ডায়াবেটিক হাসপাতাল যা বর্তমানে বারডেম হাসপাতাল নামে পরিচিত। ১৯৮৪ সালে তিনি জাতীয় অধ্যাপক হন। দেশে তিনিই প্রথম চিকিৎসাবিদ যিনি এই মর্যাদা লাভ করেন। ডা. মোহাম্মদ ইব্রাহিম তাঁর জীবন উৎসর্গ করেছিলেন মানুষের সেবায়। ‘কোনো ডায়াবেটিক রোগী দরিদ্র হলেও বিনা চিকিৎসায়, অনাহারে, বেকার অবস্থায় মারা যাবে না’-এই ছিল তাঁর আদর্শ ও লক্ষ্য। আর এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে তিনি আমৃত্যু কাজ করে গেছেন। আরেকজন ডা. ইব্রাহিমের জন্য অপেক্ষায় থাকতে হবে দীর্ঘ সময়। ২০১২ সালের ১৯শে জুলাই সবাইকে কাঁদিয়ে না ফেরার দেশে চলে যান নন্দিত কথা সাহিত্যিক, চলচ্চিত্রকার হুমায়ূন আহমেদ। সেদিনই দেশের সাহিত্যাঙ্গনের একটি নক্ষত্রের পতন ঘটে। হুমায়ূন আহমেদকে গণ্য করা হয় বাংলাদেশের স্বাধীনতা পরবর্তী সবচেয়ে জনপ্রিয় লেখক হিসেবে। একাধারে তিনি ছিলেন ঔপন্যাসিক, নাট্যকার, ছোট গল্পকার, চলচ্চিত্রকার একই সঙ্গে একজন গীতিকারও। সত্তর দশকের শেষভাগ থেকে শুরু করে আমৃত্যু পর্যন্ত তিনি ছিলেন বাংলা গল্প-উপন্যাসের অপ্রতিদ্বন্দ্বী কারিগর। এই সময়ে তাঁর গল্প-উপন্যাসের জনপ্রিয়তা ছিল তুলনারহিত। প্রায় তিন শতাধিক গ্রন্থের রচয়িতা ছিলেন তিনি। জনপ্রিয় চরিত্র হিমু, মিসির আলী, শুভ্রর রচয়িতা তিনি। বাংলাদেশে বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনীর জনপ্রিয়তা তার হাত ধরেই। হুমায়ূন আহমেদের নির্মিত চলচ্চিত্রগুলোও পেয়েছে অসামান্য দর্শকপ্রিয়তা। একই সঙ্গে তার টেলিভিশন নাটকগুলোও ছিল সমসাময়িকদের থেকে জনপ্রিয়। এমনকি তাঁর রচিত গানও জনপ্রিয়তা লাভ করে। ১৯৪৮ সালের ১৩ই নভেম্বর নেত্রকোনার কেন্দুয়ায় জন্ম নেয়া হুমায়ূন আহমেদ বেঁচে ছিলেন ৬৪ বছর। মৃত্যুর পরও তার জনপ্রিয়তায় তেমন ভাটা পড়েনি। এখনো প্রতি বছরের বইমেলাগুলোতে তার বই থাকে পাঠকদের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে। বিজ্ঞজনদের অনেকেই বলেন, বাংলা সাহিত্যে আরেকজন হুমায়ূন আহমেদ কবে আসবেন কে জানে? কেউ কেউ বলেন, তার অভাব আদৌ পূরণ হবে কি? পথে পথে দিলাম ছড়াইয়া রে, সেই দুঃখে চোখেরও পানি, ও আমার চক্ষু  নাই... ভরাট কণ্ঠের এই গান স্মৃতিকাতর করে তোলে মানুষকে। এ গানের কথা মনে হলেই ভেসে ওঠে সর্বজনশ্রদ্ধেয় সংগীতজ্ঞ কিংবদন্তি কলিম শরাফীর মুখ। বাংলাদেশের স্বনামধন্য রবীন্দ্র সংগীত শিল্পী কলিম শরাফী। পুরো নাম মাখদুমজাদা শাহ সৈয়দ কলিম আহমেদ শরাফী। শিল্পী কলিম শরাফী ছিলেন পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে রবীন্দ্র সংগীত জগতের শ্রেষ্ঠ পুরুষ কণ্ঠ। ২০১০ সালের ২রা নভেম্বর মৃত্যুবরণ করেন কলিম শরাফী। প্রগতিশীলতার মশাল হাতে তরুণ বয়সে যে সংগ্রাম তিনি সূচনা করেছিলেন, জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তা চালিয়ে গেছেন। একজন কবি, ঔপন্যাসিক, গল্পকার, সমালোচক, গবেষক, ভাষাবিজ্ঞানী এবং রাজনৈতিক ভাষ্যকার ছিলেন ড. হুমায়ুন আজাদ। জীবদ্দশায় গতানুগতিক চিন্তাধারা সচেতনভাবে পরিহার করেছিলেন তিনি। একই সঙ্গে দেশের প্রধান প্রথাবিরোধী এবং বহুমাত্রিক লেখক হিসেবে পরিচিতও  হয়েছিলেন ড. আজাদ। ধর্ম, মৌলবাদ, প্রতিষ্ঠান ও সংস্কারবিরোধিতা, নিরাবরণ যৌনতা, নারীবাদ, রাজনৈতিক এবং নির্মম সমালোচনামূলক বক্তব্যের জন্য ৮০’র দশক থেকে পাঠকগোষ্ঠীর দৃষ্টি আর্কষণ করতে সক্ষম হন তিনি। ২০০৪ সালের ২৭শে ফেব্রুয়ারি বাংলা একাডেমিতে অনুষ্ঠিত বইমেলা থেকে বেরিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে নিজ বাসায় যাওয়ার পথে জঙ্গিদের চাপাতির আক্রমণের শিকার হন হুমায়ুন আজাদ। বিদেশে  চিকিৎসার মাধ্যমে তিনি কিছুটা সুস্থ হলেও ওই বছরের ১১ই আগস্ট মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন তিনি। ‘জাতির অভিভাবক’ হিসেবে পরিচিত ছিলেন আইনজীবী ও সংবিধান বিশেষজ্ঞ ব্যারিস্টার  সৈয়দ ইশতিয়াক আহমেদ। ২০০৩ সালের ১২ই জুলাই মৃত্যুবরণ করেন এই ঝানু আইনজীবী। তিনি সব সময় রাজনৈতিক পরিচিতি এবং সম্পৃক্ততা থেকে নিজেকে বিরত রেখেছেন। সৈয়দ ইশতিয়াক আহমেদ একাধিকবার তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালনসহ বাংলাদেশের অ্যাটর্নি জেনারেলের দায়িত্ব পালন করেছিলেন। দীর্ঘ চার দশকের আইন পেশায় সৈয়দ ইশতিয়াক আহমেদ মূলত সিভিল আইন ও সাংবিধানিক আইন বিশেষজ্ঞ হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেন। নির্দলীয়, নিরপেক্ষ ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ধারণা এবং এর বাস্তবায়নেও তিনি পালন করেন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। তার মৃত্যুতে দেশের আইন অঙ্গনে অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে বলে মতামত দেন আইন সংশ্লিষ্টরা। এমনই আরেক খ্যাতিমান আইনজীবী ছিলেন মাহমুদুল ইসলাম। বিতর্ককে যিনি কখনো নিজের পাশে ঘেঁষতে দেননি। অর্থনীতিবিদ, শিক্ষাবিদ সর্বজনশ্রদ্ধেয় অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এই ইমেরিটাস অধ্যাপক মৃত্যুবরণ করেন ২০১২ সালের ২২শে মে। জীবদ্দশায় ছিলেন স্বনামধন্য একজন অর্থনীতিবিদ। অর্থনীতির জটিল সমীকরণের ব্যাখ্যা দিতেন তিনি অত্যন্ত সাবলীল ও সহজ ভাষায়। নাগরিক সংগঠন সুজনের  (সুশাসনের জন্য নাগরিক)-এর সভাপতি ছিলেন তিনি। এছাড়া দীর্ঘদিন ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) চেয়ারম্যানের দায়িত্বও পালন করেন অধ্যাপক মোজাফফর আহমেদ। জীবদ্দশায় দীর্ঘ কর্মময় জীবন ছিল। জাতির যেকোনো সংকট ও প্রয়োজনে তার কণ্ঠ ছিল উচ্চকিত। বাংলাদেশের যেক’জন মেধাবী সন্তান বিশ্বের বুকে বাংলাদেশের মানচিত্রকে সগৌরবে তুলে ধরেছিলেন প্রফেসর জামাল নজরুল ইসলাম ছিলেন অন্যতম। একজন বিশিষ্ট পদার্থবিজ্ঞানী, গণিতবিদ, জ্যোতির্বিজ্ঞানী, বিশ্বতত্ত্ববিদ ছিলেন প্রফেসর জামাল নজরুল ইসলাম। তিনি মহাবিশ্বের উদ্ভব ও পরিণতি বিষয়ে মৌলিক গবেষণার জন্য বিশেষভাবে খ্যাত ছিলেন। তিনি বিশ্বের নামকরা  ও প্রাচীন বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে পদার্থবিদ্যা ও গণিতবিদ্যায় অধ্যাপনা করেছেন। পরে মাতৃভূমির টানে দেশে ফিরে আসেন। ২০১৩ সালের মার্চে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের রিসার্চ সেন্টার ফর ম্যাথমেটিক্যাল অ্যান্ড ফিজিক্যাল সায়েন্সের গবেষক এবং চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট  সদস্য ছিলেন। ভাষাবিদ, খ্যাতনামা মনীষী এবং বিংশ শতাব্দীর শেষভাগে আবির্ভূত বাংলা সাহিত্য ও সাংস্কৃতি পরিমণ্ডলের অন্যতম প্রতিভূ ছিলেন ড. আহমদ শরীফ। উপমহাদেশের সাহিত্য, সংস্কৃতি ও রাজনীতির ক্ষেত্রে অসামান্য পণ্ডিত, বিদ্রোহী, অসামপ্রদায়িক যুক্তিবাদী, দার্শনিক, প্রগতিশীল, মানবতাবাদী চিন্তার এক অনন্য ধারক ছিলেন তিনি। ১৯৪৫ সালে কলেজ অধ্যাপনার মাধ্যমে পেশাগত জীবনের শুরু। পরে তার জীবনের ৩৬ বছর ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সঙ্গে সম্পর্ক। একই সঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাদেশ ১৯৭৬’ প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের অন্যতম রূপকারও ছিলেন তিনি। সর্বজন শ্রদ্ধেয় প্রখ্যাত সাংবাদিক এবিএম মূসা। একাধারে তিনি ছিলেন সাংবাদিক, সম্পাদক, কলামিস্ট। টানা ছয় দশকের সাংবাদিকতা ও বর্ণাঢ্য কর্মজীবনে তিনি দীর্ঘকাল ইংরেজি দৈনিক বাংলাদেশ অবজারভার-এর বার্তা সম্পাদক, বাংলাদেশ প্রেস ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক ও বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার মহাব্যবস্থাপক ও প্রধান সম্পাদক-এর দায়িত্ব পালন করেছেন। যেকোনো সরকারের নির্মোহ সমালোচনায় সোচ্চার ছিলেন তিনি। ছিলেন নির্ভীক, অকুতোভয়। তাঁর লেখনীও ছিল ক্ষুরধার। আমৃত্যু তিনি সাধারণ মানুষের অধিকারের কথা বলে গেছেন। টেলিভিশন টকশোতে গণতান্ত্রিক অধিকার নিয়ে কথা বলে তুমুল জনপ্রিয়তা অর্জন করেন তিনি। এবিএম মূসা ছিলেন সাংবাদিক সমাজের জ্যেষ্ঠতম সদস্য ও অভিভাবক। বাংলাদেশের সাংবাদিক মহলে ‘মূসা ভাই’ বলে খ্যাত ছিলেন তিনি। বাংলাদেশে নারী সাংবাদিকতার অগ্রদূত কে? এমন প্রশ্নের একটাই উত্তর-নূরজাহান বেগম। উপমহাদেশের প্রথম নারী বিষয়ক  সাপ্তাহিক ‘বেগম’ পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন তিনি। নূরজাহান বেগমের জন্ম ১৯২৫ সালের ৪ঠা জুন। তিনি মৃত্যুবরণ করেন ২০১৬ সালের ২৩শে মে। বেগম পত্রিকার সূচনালগ্ন থেকে আমৃত্যু প্রায় ষাট দশকের বেশি সময় ধরে তিনি এই পত্রিকা  সম্পাদনা করেছেন। তাকে বলা হয় জাত শিল্পী। তিনি হুমায়ুন ফরীদি। একজন খ্যাতিমান অভিনেতা। মঞ্চ, টেলিভিশন ও চলচ্চিত্রের একজন কিংবদন্তি অভিনেতা ছিলেন হুমায়ুন ফরীদি। ১৯৫২ সালে জন্মগ্রহণ করা হুমায়ুন ফরীদি বেঁচেছিলেন ৬০ বছর। ষাট দশকের জীবনে তিনি তার প্রতিভার মুন্সিয়ানা দেখিয়েছেন। অভিনেতা হুমায়ুন ফরীদি বিখ্যাত হয়েছিলেন বাংলাদেশ টেলিভিশনে প্রচারিত নাটক ‘সংশপ্তক’ এ ‘কানকাটা রমজান’ চরিত্রে অভিনয়ের মাধ্যমে। বাংলাদেশের নাট্য ও  সিনেমা জগতে তিনি অসাধারণ ও অবিসংবাদিত চরিত্রে অভিনয়ের জন্য চির স্মরণীয় হয়ে আছেন। যেদিন তিনি (২০১২ সালের ১২ই ফেব্রুয়ারি) মৃত্যুবরণ করেন সেদিনই বাংলাদেশের অভিনয় ইতিহাসের একটি নক্ষত্রের পতন হয়। এখনো দেশের নাট্যাঙ্গন ও চলচ্চিত্রে একজন হুমায়ুন ফরীদির অভাব অনুভূত হয় পদে পদে। কবি শামসুর রাহমান ছিলেন বাংলা ভাষার অন্যতম প্রধান কবি। জন্ম ২৩শে অক্টোবর ১৯২৯ ঢাকায়। বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী শামসুর রাহমান পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন সাংবাদিকতাকে। শামসুর রাহমানের ৬৬টি কাব্যগ্রন্থ, চারটি উপন্যাস, অনেক প্রবন্ধ, ছড়াসহ শতাধিক গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। শুধু সংখ্যাতাত্ত্বিক বিচারে নয়, তাঁর রচনাসমগ্র গুণেমানেও অনন্য। ২০০৬ সালের ১৭ই আগস্টে জাতির শোকাবহ মাসে সকল ভক্তকুলকে শোকের সাগরে ভাসিয়ে ৭৬ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন কবি শামসুর রাহমান।

Comments

Comments!

 তাদের শূন্যতা পূরণ হচ্ছে কি?AmarbangladeshonlineAmarbangladeshonline | Amarbangladeshonline

তাদের শূন্যতা পূরণ হচ্ছে কি?

Saturday, July 1, 2017 10:39 am
72007_b1

তারা প্রত্যেকেই ছিলেন দিকপাল। তাদের আলোয় আলোকিত ছিল বাংলাদেশ। নিজ নিজ পরিমণ্ডলে তারা নিজেদের কাজের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত রেখে গেছেন। সমাজ, রাষ্ট্র, সভ্যতা উপকৃত হয়েছে তাদের কর্মের দ্বারা। প্রকৃতির নিজস্ব নিয়মে চলে গেছেন তারা। কিন্তু তাদের শূন্যতা কী পূরণ হচ্ছে। তরুণরা কি পারছেন তাদের জায়গা নিতে। প্রফেসর আবদুর রাজ্জাক, বিচারপতি হাবিবুর রহমান, এবিএম মূসা
এইসব ব্যতিক্রম মানুষদের অভাব কি আমরা অনুভব করছি। তাকে বলা হয় ‘জ্ঞান তাপস’। শিক্ষকদের শিক্ষক। তিনি জাতীয় অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাক। তাঁর জ্ঞানের পরিধি বিস্মৃত ছিল ইতিহাস, রাষ্ট্র  ও রাজনীতিতে। দাবা খেলাতেও পারদর্শী ছিলেন তিনি। জীবনযাপনে ছিলেন অত্যন্ত সাদামাটা। অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাক ১৯৩৬ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রাজনৈতিক-অর্থনীতি বিভাগে প্রভাষক হিসেবে যোগ দেন। পরবর্তীতে অর্থনীতি এবং রাষ্ট্রবিজ্ঞান দুটি পৃথক বিভাগ প্রতিষ্ঠিত হলে তিনি রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে যোগ দেন। ১৯৭৫ সালে তিনি শিক্ষকতা থেকে অবসর নেন। অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাক অল্প কিছু প্রবন্ধ রচনা করলেও তার অসাধারণ জ্ঞান, পাণ্ডিত্য ও প্রজ্ঞার কারণে কিংবদন্তি খ্যাতি অর্জন করেন। লেখক, সমাজবিজ্ঞানী, বুদ্ধিজীবী আহমদ ছফা তাকে নিয়ে ‘যদ্যপি আমার গুরু’ নামে একটি বই রচনা  করেছিলেন। এছাড়া দার্শনিক, শিক্ষাবিদ ও সাহিত্যিক সরদার ফজলুল করিম তাঁর সঙ্গে আলাপচারিতার ওপর ভিত্তি করে লিখেছিলেন ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও পূর্ববঙ্গীয় সমাজ: অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাক’ নামে আরো একটি বই।
জাতির ‘বাতিঘর’ হিসেবে পরিচিত ছিলেন প্রয়াত প্রধান বিচারপতি মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান। জীবদ্দশায় জাতির ক্রান্তিলগ্নে সংবিধানকে সমুন্নত রাখতে তিনি পালন করেছিলেন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। সর্বজন শ্রদ্ধেয় বিচারপতি হাবিবুর রহমান বাংলাদেশের ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে শিক্ষার অগ্রগতি, রাষ্ট্রের সমৃদ্ধির পথ রচনা একই সঙ্গে রাজনৈতিক অচলাবস্থায় বাতিঘরের মতো পথ দেখিয়েছিলেন জাতিকে। বাংলাদেশের  গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতা রক্ষায় ১৯৯৬ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব নেন বিচারপতি হাবিবুর রহমান। ওই সময়ের রাজনৈতিক পরিস্থিতি মোকাবিলায় তার ভূমিকা ছিল প্রশংসনীয়। একই সঙ্গে তিনি সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষভাবে পরিচালনা করে সবার প্রশংসা কুড়িয়েছিলেন। জীবদ্দশায় সাহিত্য ও শিক্ষাক্ষেত্রেও যথেষ্ট অবদান রেখেছিলেন বিচারপতি হাবিবুর রহমান। একজন গবেষক ও লেখক হিসেবেও পরিচিত ছিলেন তিনি। বিচারপতি হিসেবে তিনি সংবিধানের অষ্টম সংশোধনী মামলাসহ অসংখ্য গুরুত্বপূর্ণ মামলার রায় দিয়েছেন। তার চলে যাওয়াকে দেশ ও বিচারাঙ্গনের জন্য অপূরণীয় ক্ষতি হিসেবে এখনো উল্লেখ করেন বিভিন্ন শ্রেণি- পেশার মানুষেরা।
প্রখ্যাত সাহিত্যিক সৈয়দ শামসুল হক। কবিতা, উপন্যাস, নাটক, ছোটগল্প, অনুবাদসহ সাহিত্যের সকল শাখায় সাবলীল পদচারণার জন্য তাঁকে অভিহিত করা হয় ‘সব্যসাচী’ লেখক হিসেবে। তিনি ১৯৩৫ সালের ২৭শে ডিসেম্বর কুড়িগ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। সৈয়দ হক না ফেরার দেশে চলে যান ২০১৬ সালের ২৭শে সেপ্টেম্বর। লেখালেখি জীবনের প্রায় ষাট দশকই তিনি ছিলেন সাবলীল। দীর্ঘ জীবনে সাহিত্যের সকল ক্ষেত্রে মেধা ও প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছেন সৈয়দ হক। সমসাময়িক বাংলাদেশ ও বাঙালি মধ্যবিত্ত সমাজের আবেগ-অনুভূতি-ভালো-মন্দ সবই সহজ কথা ও ছন্দে উঠে এসেছে তার লেখনীতে। একই সঙ্গে ফুটে উঠেছে সমকালিন বাস্তবতাও। পরবর্তী প্রজন্মের সাহিত্যিকদের জন্য তিনি পালন করেছেন পথিকৃতের ভূমিকা।
নজরুল সংগীতের অবিসংবাদিত শিল্পী ফিরোজা বেগম। সংগীত বিশারদদের মতে বাংলাদেশে নজরুল সংগীতকে জনপ্রিয়তার শীর্ষ পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার প্রায় পুরো কৃতিত্বই ফিরোজা বেগমের।  ১৯৪০-এর দশকে সংগীত ভুবনে পদার্পণ করেন ফিরোজা বেগম। ষষ্ঠ শ্রেণিতে অধ্যয়নকালে অল ইন্ডিয়া রেডিওতে প্রথম গানে কণ্ঠ দেন। ১৯৪২ সালে মাত্র ১২ বছর বয়সে বিখ্যাত গ্রামোফোন কোম্পানি এইচএমভি থেকে ৭৮ আরপিএম ডিস্কে  ইসলামী গান নিয়ে তাঁর প্রথম রেকর্ড বের  হয়। ফিরোজা বেগম মাত্র দশ বছর বয়সে বাংলা সাহিত্যের অবিস্মরণীয় কবি ও গীতিকার কাজী নজরুল ইসলামের সান্নিধ্যে এসে তার কাছ থেকে তালিম গ্রহণ করেন। নজরুলের গান নিয়ে তার প্রকাশিত প্রথম রেকর্ড বের হয় ১৯৪৯ সালে। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম অসুস্থ হওয়ার পর ফিরোজা বেগম নজরুল সংগীতের শুদ্ধ স্বরলিপি ও সুর সংরক্ষণের উদ্যোগ গ্রহণ করেন। জীবদ্দশায় পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ৩৮০টির বেশি একক সংগীতানুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করেছিলেন ফিরোজা বেগম। নজরুল সংগীত ছাড়াও আধুনিক গান, গজল, কাওয়ালি, ভজন, হামদ ও নাতসহ বিভিন্ন ধরনের সংগীতে কণ্ঠ দিয়েছেন। ২০১৪ সালের  ৯ই সেপ্টেম্বর মৃত্যুবরণ করেন তিনি। তার মতো একজন গুণী আবার কবে আসবে সে অপেক্ষায় থাকতে হবে সংগীত পিপাসুদের।
সরদার ফজলুল করিম। দার্শনিক, চিন্তক। সরদার ফজলুল করিম ১৯২৫ সালের পহেলা  মে বরিশালের আটিপাড়ায় এক কৃষক পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৪৫ সালে দর্শনশাস্ত্রে অনার্স ও ১৯৪৬ সালে এম.এ. ডিগ্রি লাভ করে ওই বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা শুরু করেন। পরবর্তীতে সাম্যবাদী বামপন্থি সামাজিক-রাজনৈতিক আন্দোলনে যুক্ত থাকার অভিযোগে তৎকালীন পাকিস্তান সরকার কর্তৃক নানাভাবে নিগৃহীত হন। রাজবন্দি হিসেবে কারাজীবনযাপন করেন দীর্ঘ ১১ বছর। পরবর্তীতে ১৯৭২ থেকে ১৯৮৫ সাল পর্যন্ত আবারো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করে অবসরে যান। ২০১৪ সালের ১৫ই জুন মৃত্যুবরণ করেন তিনি। জ্ঞানপিপাসু বিপ্লবী এই শিক্ষাবিদ ও দার্শনিকের জীবনের প্রতিটি অধ্যায় ছিল বৈচিত্র্যে ভরপুর। আমৃত্যু লালিত আদর্শকে কখনো বিসর্জন দেননি তিনি। রাষ্ট্র, রাজনীতি ও সরকার নিয়ে সরদার ফজলুল করিম  রচিত ও অনূদিত গ্রন্থগুলো পাঠক সমাজে ব্যাপক পছন্দনীয়।
আহমদ ছফা। লেখক, কবি, সমাজবিজ্ঞানী, বুদ্ধিজীবী। তাঁর লেখায় জাতিসত্তার পরিচয় নির্ধারণ প্রাধান্য পেয়েছে। জীবদ্দশায় আহমদ ছফা তাঁর প্রথাবিরোধী, নির্মোহ, অকপট দৃষ্টিভঙ্গির জন্য বুদ্ধিজীবী মহলে বিশেষ আলোচিত ছিলেন। বাংলাদেশের কথাসাহিত্যে একজন সফল লেখক আহমদ ছফা। ২০০১ সালের ২৮শে জুলাই মৃত্যুবরণ করেন তিনি। আহমদ ছফা ছিলেন তীক্ষ্ণ মেধার অধিকারী একজন সৃষ্টিশীল লেখক। তার সাহিত্য জীবনের সূচনা হয় ষাটের দশকে। সৃষ্টিধর্মী লেখক হিসেবে তিনি গল্প, উপন্যাস, কবিতা, প্রবন্ধ, সমালোচনা, অনুবাদ, শিশুসাহিত্যে উল্লেখযোগ্য কৃতিত্ব দেখান। তবে, গবেষক ও প্রাবন্ধিক হিসেবেই তাঁর পরিচিতি সর্বাধিক। জীবনের বহু বিচিত্র অভিজ্ঞতাকে তিনি গল্প-উপন্যাস রচনার কাজে লাগিয়েছেন। তাঁর আখ্যানমূলক রচনায় বাংলাদেশের মানুষের আশা-আকাঙক্ষা বেঁচে থাকার অনুপ্রেরণা, মুক্তিকামনা ও স্বাধীনতাস্পৃহা, সামাজিক অসঙ্গতি ও বৈষম্যের চিত্র রূপায়িত হয়েছে। অনুভূতির প্রত্যক্ষ প্রকাশ, লোকজ ভাষা, পুথিপুরাণের শব্দ ও বাকরীতির প্রকাশ তাঁর কবিতার ধরন হয়ে উঠে। আহমদ ছফা ছিলেন সুবিধাবাদের বিরুদ্ধে এক প্রতিবাদী কণ্ঠ এবং আদর্শনিষ্ঠ ও প্রগতিপন্থি একজন সংস্কৃতিকর্মী। প্রগতির সংঘ শান্তিতে তিনি ছিলেন আস্থাবান। তাঁর সাংগঠনিক দক্ষতা ও ক্ষমতাও ছিল উল্লেখ করার মতো।
ডা. মোহাম্মদ ইব্রাহিম। বাংলাদেশের ইতিহাসে এক নিবেদিতপ্রাণ চিকিৎসকের নাম। বাংলাদেশে ডায়াবেটিস রোগ সম্পর্কে সচেতনতা ও এর প্রতিকারে একটি অবিস্মরণীয় নাম ডা. মোহাম্মদ ইব্রাহিম। একই সঙ্গে চিকিৎসা ইতিহাসের এক অনুকরণীয় ও অনুসরণীয় নামও। মানব  সেবার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন গুণী এই ব্যক্তি। গড়ে তোলেন বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতি। মানবসেবার সেই ধারাবাহিকতায় গড়ে উঠেছে বারডেম, ইব্রাহিম কার্ডিয়াক হাসপাতাল, ইব্রাহিম জেনারেল হাসপাতালসহ বহু প্রতিষ্ঠান। ডায়াবেটিক রোগীদের জন্য এই হাসপাতালগুলোই এখন পর্যন্ত শেষ ভরসার জায়গা। ১৯৬৫ সালে তারই প্রতিষ্ঠিত ডায়াবেটিক হাসপাতাল যা বর্তমানে বারডেম হাসপাতাল নামে পরিচিত। ১৯৮৪ সালে তিনি জাতীয় অধ্যাপক হন। দেশে তিনিই প্রথম চিকিৎসাবিদ যিনি এই মর্যাদা লাভ করেন। ডা. মোহাম্মদ ইব্রাহিম তাঁর জীবন উৎসর্গ করেছিলেন মানুষের সেবায়। ‘কোনো ডায়াবেটিক রোগী দরিদ্র হলেও বিনা চিকিৎসায়, অনাহারে, বেকার অবস্থায় মারা যাবে না’-এই ছিল তাঁর আদর্শ ও লক্ষ্য। আর এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে তিনি আমৃত্যু কাজ করে গেছেন। আরেকজন ডা. ইব্রাহিমের জন্য অপেক্ষায় থাকতে হবে দীর্ঘ সময়।
২০১২ সালের ১৯শে জুলাই সবাইকে কাঁদিয়ে না ফেরার দেশে চলে যান নন্দিত কথা সাহিত্যিক, চলচ্চিত্রকার হুমায়ূন আহমেদ। সেদিনই দেশের সাহিত্যাঙ্গনের একটি নক্ষত্রের পতন ঘটে। হুমায়ূন আহমেদকে গণ্য করা হয় বাংলাদেশের স্বাধীনতা পরবর্তী সবচেয়ে জনপ্রিয় লেখক হিসেবে। একাধারে তিনি ছিলেন ঔপন্যাসিক, নাট্যকার, ছোট গল্পকার, চলচ্চিত্রকার একই সঙ্গে একজন গীতিকারও। সত্তর দশকের শেষভাগ থেকে শুরু করে আমৃত্যু পর্যন্ত তিনি ছিলেন বাংলা গল্প-উপন্যাসের অপ্রতিদ্বন্দ্বী কারিগর। এই সময়ে তাঁর গল্প-উপন্যাসের জনপ্রিয়তা ছিল তুলনারহিত। প্রায় তিন শতাধিক গ্রন্থের রচয়িতা ছিলেন তিনি। জনপ্রিয় চরিত্র হিমু, মিসির আলী, শুভ্রর রচয়িতা তিনি। বাংলাদেশে বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনীর জনপ্রিয়তা তার হাত ধরেই। হুমায়ূন আহমেদের নির্মিত চলচ্চিত্রগুলোও পেয়েছে অসামান্য দর্শকপ্রিয়তা। একই সঙ্গে তার টেলিভিশন নাটকগুলোও ছিল সমসাময়িকদের থেকে জনপ্রিয়। এমনকি তাঁর রচিত গানও জনপ্রিয়তা লাভ করে। ১৯৪৮ সালের ১৩ই নভেম্বর নেত্রকোনার কেন্দুয়ায় জন্ম নেয়া হুমায়ূন আহমেদ বেঁচে ছিলেন ৬৪ বছর। মৃত্যুর পরও তার জনপ্রিয়তায় তেমন ভাটা পড়েনি। এখনো প্রতি বছরের বইমেলাগুলোতে তার বই থাকে পাঠকদের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে। বিজ্ঞজনদের অনেকেই বলেন, বাংলা সাহিত্যে আরেকজন হুমায়ূন আহমেদ কবে আসবেন কে জানে? কেউ কেউ বলেন, তার অভাব আদৌ পূরণ হবে কি?
পথে পথে দিলাম ছড়াইয়া রে, সেই দুঃখে চোখেরও পানি, ও আমার চক্ষু  নাই… ভরাট কণ্ঠের এই গান স্মৃতিকাতর করে তোলে মানুষকে। এ গানের কথা মনে হলেই ভেসে ওঠে সর্বজনশ্রদ্ধেয় সংগীতজ্ঞ কিংবদন্তি কলিম শরাফীর মুখ। বাংলাদেশের স্বনামধন্য রবীন্দ্র সংগীত শিল্পী কলিম শরাফী। পুরো নাম মাখদুমজাদা শাহ সৈয়দ কলিম আহমেদ শরাফী। শিল্পী কলিম শরাফী ছিলেন পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে রবীন্দ্র সংগীত জগতের শ্রেষ্ঠ পুরুষ কণ্ঠ। ২০১০ সালের ২রা নভেম্বর মৃত্যুবরণ করেন কলিম শরাফী। প্রগতিশীলতার মশাল হাতে তরুণ বয়সে যে সংগ্রাম তিনি সূচনা করেছিলেন, জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তা চালিয়ে গেছেন।
একজন কবি, ঔপন্যাসিক, গল্পকার, সমালোচক, গবেষক, ভাষাবিজ্ঞানী এবং রাজনৈতিক ভাষ্যকার ছিলেন ড. হুমায়ুন আজাদ। জীবদ্দশায় গতানুগতিক চিন্তাধারা সচেতনভাবে পরিহার করেছিলেন তিনি। একই সঙ্গে দেশের প্রধান প্রথাবিরোধী এবং বহুমাত্রিক লেখক হিসেবে পরিচিতও  হয়েছিলেন ড. আজাদ। ধর্ম, মৌলবাদ, প্রতিষ্ঠান ও সংস্কারবিরোধিতা, নিরাবরণ যৌনতা, নারীবাদ, রাজনৈতিক এবং নির্মম সমালোচনামূলক বক্তব্যের জন্য ৮০’র দশক থেকে পাঠকগোষ্ঠীর দৃষ্টি আর্কষণ করতে সক্ষম হন তিনি। ২০০৪ সালের ২৭শে ফেব্রুয়ারি বাংলা একাডেমিতে অনুষ্ঠিত বইমেলা থেকে বেরিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে নিজ বাসায় যাওয়ার পথে জঙ্গিদের চাপাতির আক্রমণের শিকার হন হুমায়ুন আজাদ। বিদেশে  চিকিৎসার মাধ্যমে তিনি কিছুটা সুস্থ হলেও ওই বছরের ১১ই আগস্ট মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন তিনি।
‘জাতির অভিভাবক’ হিসেবে পরিচিত ছিলেন আইনজীবী ও সংবিধান বিশেষজ্ঞ ব্যারিস্টার  সৈয়দ ইশতিয়াক আহমেদ। ২০০৩ সালের ১২ই জুলাই মৃত্যুবরণ করেন এই ঝানু আইনজীবী। তিনি সব সময় রাজনৈতিক পরিচিতি এবং সম্পৃক্ততা থেকে নিজেকে বিরত রেখেছেন। সৈয়দ ইশতিয়াক আহমেদ একাধিকবার তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালনসহ বাংলাদেশের অ্যাটর্নি জেনারেলের দায়িত্ব পালন করেছিলেন। দীর্ঘ চার দশকের আইন পেশায় সৈয়দ ইশতিয়াক আহমেদ মূলত সিভিল আইন ও সাংবিধানিক আইন বিশেষজ্ঞ হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেন। নির্দলীয়, নিরপেক্ষ ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ধারণা এবং এর বাস্তবায়নেও তিনি পালন করেন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। তার মৃত্যুতে দেশের আইন অঙ্গনে অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে বলে মতামত দেন আইন সংশ্লিষ্টরা। এমনই আরেক খ্যাতিমান আইনজীবী ছিলেন মাহমুদুল ইসলাম। বিতর্ককে যিনি কখনো নিজের পাশে ঘেঁষতে দেননি।
অর্থনীতিবিদ, শিক্ষাবিদ সর্বজনশ্রদ্ধেয় অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এই ইমেরিটাস অধ্যাপক মৃত্যুবরণ করেন ২০১২ সালের ২২শে মে। জীবদ্দশায় ছিলেন স্বনামধন্য একজন অর্থনীতিবিদ। অর্থনীতির জটিল সমীকরণের ব্যাখ্যা দিতেন তিনি অত্যন্ত সাবলীল ও সহজ ভাষায়। নাগরিক সংগঠন সুজনের  (সুশাসনের জন্য নাগরিক)-এর সভাপতি ছিলেন তিনি। এছাড়া দীর্ঘদিন ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) চেয়ারম্যানের দায়িত্বও পালন করেন অধ্যাপক মোজাফফর আহমেদ। জীবদ্দশায় দীর্ঘ কর্মময় জীবন ছিল। জাতির যেকোনো সংকট ও প্রয়োজনে তার কণ্ঠ ছিল উচ্চকিত।
বাংলাদেশের যেক’জন মেধাবী সন্তান বিশ্বের বুকে বাংলাদেশের মানচিত্রকে সগৌরবে তুলে ধরেছিলেন প্রফেসর জামাল নজরুল ইসলাম ছিলেন অন্যতম। একজন বিশিষ্ট পদার্থবিজ্ঞানী, গণিতবিদ, জ্যোতির্বিজ্ঞানী, বিশ্বতত্ত্ববিদ ছিলেন প্রফেসর জামাল নজরুল ইসলাম। তিনি মহাবিশ্বের উদ্ভব ও পরিণতি বিষয়ে মৌলিক গবেষণার জন্য বিশেষভাবে খ্যাত ছিলেন। তিনি বিশ্বের নামকরা  ও প্রাচীন বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে পদার্থবিদ্যা ও গণিতবিদ্যায় অধ্যাপনা করেছেন। পরে মাতৃভূমির টানে দেশে ফিরে আসেন। ২০১৩ সালের মার্চে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের রিসার্চ সেন্টার ফর ম্যাথমেটিক্যাল অ্যান্ড ফিজিক্যাল সায়েন্সের গবেষক এবং চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট  সদস্য ছিলেন।
ভাষাবিদ, খ্যাতনামা মনীষী এবং বিংশ শতাব্দীর শেষভাগে আবির্ভূত বাংলা সাহিত্য ও সাংস্কৃতি পরিমণ্ডলের অন্যতম প্রতিভূ ছিলেন ড. আহমদ শরীফ। উপমহাদেশের সাহিত্য, সংস্কৃতি ও রাজনীতির ক্ষেত্রে অসামান্য পণ্ডিত, বিদ্রোহী, অসামপ্রদায়িক যুক্তিবাদী, দার্শনিক, প্রগতিশীল, মানবতাবাদী চিন্তার এক অনন্য ধারক ছিলেন তিনি। ১৯৪৫ সালে কলেজ অধ্যাপনার মাধ্যমে পেশাগত জীবনের শুরু। পরে তার জীবনের ৩৬ বছর ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সঙ্গে সম্পর্ক। একই সঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাদেশ ১৯৭৬’ প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের অন্যতম রূপকারও ছিলেন তিনি।
সর্বজন শ্রদ্ধেয় প্রখ্যাত সাংবাদিক এবিএম মূসা। একাধারে তিনি ছিলেন সাংবাদিক, সম্পাদক, কলামিস্ট। টানা ছয় দশকের সাংবাদিকতা ও বর্ণাঢ্য কর্মজীবনে তিনি দীর্ঘকাল ইংরেজি দৈনিক বাংলাদেশ অবজারভার-এর বার্তা সম্পাদক, বাংলাদেশ প্রেস ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক ও বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার মহাব্যবস্থাপক ও প্রধান সম্পাদক-এর দায়িত্ব পালন করেছেন। যেকোনো সরকারের নির্মোহ সমালোচনায় সোচ্চার ছিলেন তিনি। ছিলেন নির্ভীক, অকুতোভয়। তাঁর লেখনীও ছিল ক্ষুরধার। আমৃত্যু তিনি সাধারণ মানুষের অধিকারের কথা বলে গেছেন। টেলিভিশন টকশোতে গণতান্ত্রিক অধিকার নিয়ে কথা বলে তুমুল জনপ্রিয়তা অর্জন করেন তিনি। এবিএম মূসা ছিলেন সাংবাদিক সমাজের জ্যেষ্ঠতম সদস্য ও অভিভাবক। বাংলাদেশের সাংবাদিক মহলে ‘মূসা ভাই’ বলে খ্যাত ছিলেন তিনি।
বাংলাদেশে নারী সাংবাদিকতার অগ্রদূত কে? এমন প্রশ্নের একটাই উত্তর-নূরজাহান বেগম। উপমহাদেশের প্রথম নারী বিষয়ক  সাপ্তাহিক ‘বেগম’ পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন তিনি। নূরজাহান বেগমের জন্ম ১৯২৫ সালের ৪ঠা জুন। তিনি মৃত্যুবরণ করেন ২০১৬ সালের ২৩শে মে। বেগম পত্রিকার সূচনালগ্ন থেকে আমৃত্যু প্রায় ষাট দশকের বেশি সময় ধরে তিনি এই পত্রিকা  সম্পাদনা করেছেন।
তাকে বলা হয় জাত শিল্পী। তিনি হুমায়ুন ফরীদি। একজন খ্যাতিমান অভিনেতা। মঞ্চ, টেলিভিশন ও চলচ্চিত্রের একজন কিংবদন্তি অভিনেতা ছিলেন হুমায়ুন ফরীদি। ১৯৫২ সালে জন্মগ্রহণ করা হুমায়ুন ফরীদি বেঁচেছিলেন ৬০ বছর। ষাট দশকের জীবনে তিনি তার প্রতিভার মুন্সিয়ানা দেখিয়েছেন। অভিনেতা হুমায়ুন ফরীদি বিখ্যাত হয়েছিলেন বাংলাদেশ টেলিভিশনে প্রচারিত নাটক ‘সংশপ্তক’ এ ‘কানকাটা রমজান’ চরিত্রে অভিনয়ের মাধ্যমে। বাংলাদেশের নাট্য ও  সিনেমা জগতে তিনি অসাধারণ ও অবিসংবাদিত চরিত্রে অভিনয়ের জন্য চির স্মরণীয় হয়ে আছেন। যেদিন তিনি (২০১২ সালের ১২ই ফেব্রুয়ারি) মৃত্যুবরণ করেন সেদিনই বাংলাদেশের অভিনয় ইতিহাসের একটি নক্ষত্রের পতন হয়। এখনো দেশের নাট্যাঙ্গন ও চলচ্চিত্রে একজন হুমায়ুন ফরীদির অভাব অনুভূত হয় পদে পদে।
কবি শামসুর রাহমান ছিলেন বাংলা ভাষার অন্যতম প্রধান কবি। জন্ম ২৩শে অক্টোবর ১৯২৯ ঢাকায়। বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী শামসুর রাহমান পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন সাংবাদিকতাকে। শামসুর রাহমানের ৬৬টি কাব্যগ্রন্থ, চারটি উপন্যাস, অনেক প্রবন্ধ, ছড়াসহ শতাধিক গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। শুধু সংখ্যাতাত্ত্বিক বিচারে নয়, তাঁর রচনাসমগ্র গুণেমানেও অনন্য। ২০০৬ সালের ১৭ই আগস্টে জাতির শোকাবহ মাসে সকল ভক্তকুলকে শোকের সাগরে ভাসিয়ে ৭৬ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন কবি শামসুর রাহমান।

Comments

comments

সম্পাদক : মোহাম্মদ আবদুল বাছির
প্রকাশক: মোহাম্মদ জহিরুল ইসলাম
ফোন : ‎০১৭১৩৪০৯০৯০
৩৪৫/১, দিলু রোড, নিউ ইস্কাটন, ঢাকা-১০০০
X
 
নিয়মিত খবর পড়তে আমাদের ফেসবুক পেজে লাইক দিয়ে যুক্ত থাকুন
X