শনিবার, ২৪শে ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ ইং, ১২ই ফাল্গুন, ১৪২৪ বঙ্গাব্দ, রাত ১১:৩৬
শিরোনাম
  • ঘৃণাকে বিজয়ী হতে দেয়া যাবে না, ট্রাম্পকে ইঙ্গিত করে জর্জ ক্লুনি
  • আমার একটাই চিন্তা দেশের মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন করা: প্রধানমন্ত্রী
  • ‘কেন্দ্রীয় সরকারের আগ্রাসী নীতির কারণে কাশ্মীরকে হারাতে হবে’
  • সাড়ে চারমাস পর মুখোমুখি, খাদিজাকে উদ্দেশ্য করে যা বলল বদরুল
  • খালেদার ‘সাজা’ বিরোধী নেতাকর্মীদের মনোবল ভাঙ্গার কৌশল!
  • বিএনপির কর্মসূচি ‘যথাসময়ে’ জানানো হবে: রিজভী
  • দলের জন্য বোলিং করতেও রাজি মুশফিক
  • শিশু জিহাদের মৃত্যু: চার জনের ১০ বছর করে কারাদণ্ড
  • অবশেষে বাড়ি অবরুদ্ধ করে রাখা সেই দেয়াল ভেঙ্গে ফেলা হচ্ছে
  • সাক্ষ্য দিলেন খাদিজা, চাইলেন বদরুলের সর্বোচ্চ শাস্তি
  • বদরুলের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিতে আদালতে খাদিজা
  • আজ বগুড়ায় যেসব প্রকল্প উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী
  • রোহিঙ্গা স্থানান্তরের সরকারি পরিকল্পনার সঙ্গে দ্বিমত মানবাধিকার কমিশনের
  • মহেশখালীতে ইয়াবা ব্যবসায়ীদের সঙ্গে পুলিশের ‘বন্দুকযুদ্ধ’
  • হোয়াইট হাউসে কাজ করার দীর্ঘ অভিজ্ঞতার কথা জানালেন এই বাংলাদেশি সাংবাদিক
Tuesday, September 6, 2016 9:50 pm
A- A A+ Print

তামিমের ডায়েরিতেই জাহিদের তথ্য

241277_1

নারায়ণগঞ্জের অভিযানে প্রাপ্ত একটি ডায়েরির সূত্র ধরেই রূপনগরে জঙ্গি জাহিদের আস্তানার সন্ধান পান গোয়েন্দারা। ১ জুলাই গুলশানের হলি আর্টিসান রেস্তোরাঁয় হামলার পর থেকেই গোয়েন্দাদের কাছে তথ্য ছিল, হামলাকারীদের প্রশিক্ষণ, অর্থ সরবরাহ করেছিল 'জাহাঙ্গীর আলম মুরাদ' নামে এক ব্যক্তি। তার বয়স ৩৫-৪০-এর মধ্যে। জঙ্গিদের কাছে সে 'মেজর' হিসেবে পরিচয় দিলেও গোয়েন্দারা তার পরিচয় নিশ্চিত হতে পারছিলেন না। অনেকের ধারণা ছিল, হয়তো সে 'সুবেদার মেজর' পদবির সাবেক কোনো সেনাসদস্য হতে পারে। কারও ধারণা ছিল, সে সাবেক সৈনিক হতে পারে। এমনকি কল্যাণপুরে অভিযানের পর ওই আস্তানা থেকে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টাকালে গ্রেফতার রাকিবুল হাসান রিগানও গোয়েন্দাদের জিজ্ঞাসাবাদে জানায়, জাহাঙ্গীর আলম মুরাদ নামে তাদের একজন 'বড় ভাই' রয়েছে। এর পর থেকেই মূলত 'রহস্যজনক' সেই 'বড় ভাই' মুরাদের পরিচয় নিশ্চিত করার মধ্য দিয়ে তাকে গ্রেফতারের চেষ্টা চালিয়ে আসছিলেন সংশ্লিষ্টরা। ২৭ আগস্ট নারায়ণগঞ্জের পাইকপাড়ায় নব্য জেএমবির সমন্বয়ক তামিম চৌধুরীর বাসায় উদ্ধার ডায়েরির মধ্যে লুকিয়ে রাখা একটি কাগজের সূত্র ধরে মিলল অনেক প্রশ্নের জবাব। জট খুলে যায় 'জাহাঙ্গীর আলম মুরাদ' রহস্যের। ডায়েরিতে লুকিয়ে থাকা একটি তথ্যের সূত্র ধরে পাওয়া রাজধানীর রূপনগরের 'জাহাঙ্গীর আলমের' বাসার খোঁজ মেলে। পরে জানা যায়, জাহাঙ্গীর আলম তার প্রকৃত নাম নয়, তার আসল নাম জাহিদুল ইসলাম। মেজর পদমর্যাদার এই কর্মকর্তা ২০১৫ সালের জুলাইয়ে সেনাবাহিনী থেকে স্বেচ্ছায় অবসরে গেছে। নারায়ণগঞ্জে তামিম চৌধুরীর ওই বাসাটি ভাড়া করে দিয়েছিল জাহিদ। সেখানে প্রায়ই সে যাতায়াত করত। গোয়েন্দারা বলছেন, গুলশানের হামলার আগে জাহিদুলের জঙ্গি তৎপরতায় জড়ানোর তথ্য তদন্ত-সংশ্লিষ্টদের কাছে ছিল না। যদিও তারা বলছেন, ২০১৫ সালের শুরুর দিকে জাহিদ উগ্রবাদে জড়িয়েছে। তদন্ত-সংশ্লিষ্ট একাধিক দায়িত্বশীল সূত্র থেকে এসব তথ্য জানা গেছে। সূত্র জানায়, রূপনগরের ৩৩ নম্বর সড়কের ষষ্ঠ তলার ফ্ল্যাটটি জাহিদুল ইসলাম ভাড়া নিয়েছিল জাহাঙ্গীর আলম মুরাদ নামে। ভাড়াটিয়া হিসেবে বাড়ির মালিকের কাছে দেওয়া তথ্য ফরমে জাহিদুল তার স্ত্রীর নাম লিখেছিল সেলিনা আক্তার (৩০)। ওই তথ্য ফরমে তাদের দুই শিশুসন্তান রামিসা আলম (৭) ও লামিহা আলম (৩) বলে উল্লেখ করে। জাহিদুলের পরিচয় হিসেবে লেখা হয়, 'সাইট অফিসার, বিশ্বাস বিল্ডার্স'। বাবার নাম লেখা হয় মোখলেছুর রহমান। জাহিদুল তার স্থায়ী ঠিকানা উল্লেখ করে টাঙ্গাইল সদর, মোল্লাপাড়া। তবে নারায়ণগঞ্জে জাহিদুল ভাড়াটিয়ার ফরমে তার বাবার নাম শাহজাহান আলী বলে উল্লেখ করে। ভাড়াটিয়া ফরমে সব ধরনের তথ্য ভুল দিলেও দুই জায়গায় ফরমে নিজের আসল ছবি ব্যবহার করে জাহিদুল। পরে গোয়েন্দা অনুসন্ধানে বের হয়, জাহিদুলের বড় মেয়ের নাম জুনায়রা বিনতে জাহিদ। কিছুদিন আগেও সে রাজধানীর উত্তরার চার নম্বর সেক্টরে আহলে হাদিসের পরিচালিত একটি স্কুলে পড়ত। দায়িত্বশীল একাধিক সূত্র জানায়, গুলশানের হামলার সূত্র ধরে পুলিশ রাজধানীর কল্যাণপুরে একটি জঙ্গি আস্তানার খোঁজ পায়। সেখান থেকে উদ্ধার কিছু আলামত থেকে দেখা যায়, গুলশানে হামলায় নিহত সব জঙ্গি ও জাহিদুল কিছুদিন একত্রে ওই বাসায় অবস্থান করছিল। গুলশানে হামলায় নিহতদের মধ্যে নিবরাসের সঙ্গে জাহিদুলের ভালো সম্পর্ক ছিল। ২০১৫ সালের জুলাইয়ে সেনাবাহিনী থেকে জাহিদুল স্বেচ্ছায় চাকরি ছাড়ার পর গুলশানে একটি স্কুলে কিছুদিন শিক্ষকতা করত। সেখান থেকে মাসে লক্ষাধিক টাকা বেতন পেত। কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ইউনিটের এক কর্মকর্তা জানান, নারায়ণগঞ্জের ঘটনার পর শুধু কাউন্টার টেররিজম ইউনিট নয়, পুলিশ সদর দপ্তর ও বগুড়া জেলা পুলিশও জাহিদুলের ব্যাপারে কিছু তথ্য পায়। রূপনগরের আস্তানা সম্পর্কে একটি মোটামুটি ধারণা পায়। তবে ফ্ল্যাটটি সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট তথ্য পাচ্ছিল না। রূপনগরের অভিযান চালাতে পুলিশ সদর দপ্তর, কাউন্টার টেররিজম ও বগুড়া জেলা পুুলিশ সম্মিলিতভাবে একটি কমিটি গঠন করে। তামিম নিহত হওয়ার পর একবার দুই শতাধিক পুলিশ সদস্য নিয়ে রূপনগরের বাসায় অভিযানও চালানো হয়। পরে জানা যায়, পাইকপাড়ার আস্তানায় অভিযান চালানোর দিন বিকেলে স্ত্রী ও দুই শিশুসন্তান নিয়ে তাড়াহুড়ো করে রূপনগরের বাসা ছাড়ে জাহিদুল। তবে পুলিশের বিশ্বাস ছিল, যেহেতু বাসায় গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র ফেলে গেছে, তাই আবার এই বাসায় জাহিদুল আসতে পারে। এরপর পুলিশের পক্ষ থেকে বাড়িওয়ালাকে জাহিদুল সম্পর্কে ধারণা দিয়ে বলা হয়, ছয়তলার ফ্ল্যাটের ভাড়াটিয়া ফিরলে কৌশলে বাইরে থেকে দরজা বন্ধ করে পুলিশে খবর দিতে। ২ সেপ্টেম্বর জাহিদুল বাসায় ঢোকার পরই বাড়ির মালিক পুলিশকে তথ্য দেন। তদন্ত-সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, সিলেটে অবস্থানের সময়ই জাহিদ উগ্রবাদে জড়ায়। সেখানকার একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে সে কয়েকবার যাতায়াত করেছে। ওই বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষককে উগ্রপন্থি তৎপরতায় জড়িত সন্দেহে গোয়েন্দা নজরদারিতে রাখা হয়েছে। তাদের সঙ্গে জাহিদুলের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ছিল। সূত্র বলছে, কার মাধ্যমে জাহিদুল উগ্রপন্থায় জড়িয়েছিল, সেটা সন্দেহাতীতভাবে বের করার চেষ্টা করছেন গোয়েন্দারা। তবে নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গি সংগঠন আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের (এবিটি) প্রধান সমন্বয়ক মেজর (বরখাস্ত) সৈয়দ জিয়াউল হকের কাজে উদ্বুদ্ধ হয়ে জাহিদুল নব্য জেএমবিতে জড়াতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। গোয়েন্দারা বলছেন, জেএমবির শীর্ষ পর্যায় থেকে সংগঠনের মাঠ পর্যায়ের সদস্যদের বলা হতো, "এবিটিতে 'মেজর জিয়া' রয়েছে, তেমনি আমাদেরও একজন 'বড় ভাই' আছে।" গুলশানে হামলার পর প্রথমে গোয়েন্দাদের ধারণা ছিল, বসুন্ধরায় জঙ্গিদের জন্য যে ব্যক্তি বাসাটি ভাড়া করে দিয়েছিল, সে-ই হয়তো অনেক জায়গায় উগ্রপন্থিদের বাসা করে দেয়। পরে দেখা যায়, জঙ্গিদের জন্য রাজধানী ও দেশের বিভিন্ন এলাকায় পরিচয় গোপন করে একাধিক বাসা ভাড়া করে জাহিদুল। মূলত চলতি বছরের এপ্রিলের পর থেকে পরিবার ও স্বজনদের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে সে। এখন গোয়েন্দারা জাহিদুলের অন্য সাঙ্গোপাঙ্গদের গ্রেফতারের চেষ্টা করছে। রূপনগরে জঙ্গি আস্তানায় অভিযানে জাহিদুল নিহত হওয়ার ঘটনায় সন্ত্রাস দমন আইনে একটি মামলা করা হয়েছে। ওই মামলায় আরও চারজনকে আসামি করা হয়। পুলিশের মিরপুর বিভাগের ডিসি মাসুদ আহম্মেদ সমকালকে বলেন, জাহিদুলের শ্বশুর ও শাশুড়িকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। রূপনগরের আস্তানায় যারা যাতায়াত করত: পুলিশের প্রাথমিক অনুসন্ধানে জানা গেছে, রূপনগরে জাহিদুলের বাসায় বিভিন্ন সময় যাতায়াত করত তার সহযোগী মানিক, ইকবাল, আকাশ, সাগরসহ অজ্ঞাত আরও পাঁচ-ছয়জন। সেখানে জেএমবি ও অন্যান্য উগ্রপন্থি সংগঠনের সহায়তায় জঙ্গিদের অস্ত্র প্রশিক্ষণ ও পরামর্শ দেওয়া হয়। গোয়েন্দা সূত্র বলছে, এবিটির মেজর জিয়া সংগঠনে সাগর নামে পরিচিত। যা মিলল সেই আস্তানায়: মামলার এজাহারে বলা হয়, রূপনগরের আস্তানায় এক রাউন্ড গুলিসহ একটি সিলভার রঙের পিস্তল, ৭ দশমিক ৫ ইঞ্চি লম্বা একটি চাকু, বিকৃত বুলেট তিনটি, পিস্তলের গুলি একটি, এসএমজির খোসা ৪টি, এক জোড়া সেনাবাহিনীর মোজা, কিছু বই, যেগুলোর নাম- 'জান্নাত-জাহান্নাম', 'সালাতুল রাসুল', 'ইমাম ইবনে তাইমিয়াহ', 'তাওহীদি দুর্গ', 'শুধু আপনার সাহায্যে প্রার্থনা করি', 'তাওহীদ জিজ্ঞাসা ও জবাব', 'ইসলামে বন্ধুত্ব ও শত্রুতা', 'দ্য লাস্ট কোরানিক কুইজ', 'মন দিয়ে নামাজ পড়ার উপায়', 'জান্নাতী সুধা', আহলে সুন্নাত ইসলামী, জিকিরের বই, নামাজ ত্যাগকারীর বিধান, 'দ্য পিলারস অব ফাথ', 'বাংলাদেশে প্রচলিত শির্ক', বিদ, আত ও কুসংস্কার পর্যালোচনা, তাফসীর ইবনে কাসীর খণ্ড, আল কোরআনের ভাষা নামক বই, দুটি চাপাতি (একটি বাঁটসহ), লোহার র‌্যাত একটি, একটি স্টূ্ক্রড্রাইভার ও একটি ধারালো পাটা।

Comments

Comments!

 তামিমের ডায়েরিতেই জাহিদের তথ্যAmarbangladeshonlineAmarbangladeshonline | Amarbangladeshonline

তামিমের ডায়েরিতেই জাহিদের তথ্য

Tuesday, September 6, 2016 9:50 pm
241277_1

নারায়ণগঞ্জের অভিযানে প্রাপ্ত একটি ডায়েরির সূত্র ধরেই রূপনগরে জঙ্গি জাহিদের আস্তানার সন্ধান পান গোয়েন্দারা। ১ জুলাই গুলশানের হলি আর্টিসান রেস্তোরাঁয় হামলার পর থেকেই গোয়েন্দাদের কাছে তথ্য ছিল, হামলাকারীদের প্রশিক্ষণ, অর্থ সরবরাহ করেছিল ‘জাহাঙ্গীর আলম মুরাদ’ নামে এক ব্যক্তি। তার বয়স ৩৫-৪০-এর মধ্যে। জঙ্গিদের কাছে সে ‘মেজর’ হিসেবে পরিচয় দিলেও গোয়েন্দারা তার পরিচয় নিশ্চিত হতে পারছিলেন না। অনেকের ধারণা ছিল, হয়তো সে ‘সুবেদার মেজর’ পদবির সাবেক কোনো সেনাসদস্য হতে পারে। কারও ধারণা ছিল, সে সাবেক সৈনিক হতে পারে। এমনকি কল্যাণপুরে অভিযানের পর ওই আস্তানা থেকে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টাকালে গ্রেফতার রাকিবুল হাসান রিগানও গোয়েন্দাদের জিজ্ঞাসাবাদে জানায়, জাহাঙ্গীর আলম মুরাদ নামে তাদের একজন ‘বড় ভাই’ রয়েছে। এর পর থেকেই মূলত ‘রহস্যজনক’ সেই ‘বড় ভাই’ মুরাদের পরিচয় নিশ্চিত করার মধ্য দিয়ে তাকে গ্রেফতারের চেষ্টা চালিয়ে আসছিলেন সংশ্লিষ্টরা।

২৭ আগস্ট নারায়ণগঞ্জের পাইকপাড়ায় নব্য জেএমবির সমন্বয়ক তামিম চৌধুরীর বাসায় উদ্ধার ডায়েরির মধ্যে লুকিয়ে রাখা একটি কাগজের সূত্র ধরে মিলল অনেক প্রশ্নের জবাব। জট খুলে যায় ‘জাহাঙ্গীর আলম মুরাদ’ রহস্যের। ডায়েরিতে লুকিয়ে থাকা একটি তথ্যের সূত্র ধরে পাওয়া রাজধানীর রূপনগরের ‘জাহাঙ্গীর আলমের’ বাসার খোঁজ মেলে। পরে জানা যায়, জাহাঙ্গীর আলম তার প্রকৃত নাম নয়, তার আসল নাম জাহিদুল ইসলাম। মেজর পদমর্যাদার এই কর্মকর্তা ২০১৫ সালের জুলাইয়ে সেনাবাহিনী থেকে স্বেচ্ছায় অবসরে গেছে। নারায়ণগঞ্জে তামিম চৌধুরীর ওই বাসাটি ভাড়া করে দিয়েছিল জাহিদ। সেখানে প্রায়ই সে যাতায়াত করত। গোয়েন্দারা বলছেন, গুলশানের হামলার আগে জাহিদুলের জঙ্গি তৎপরতায় জড়ানোর তথ্য তদন্ত-সংশ্লিষ্টদের কাছে ছিল না। যদিও তারা বলছেন, ২০১৫ সালের শুরুর দিকে জাহিদ উগ্রবাদে জড়িয়েছে। তদন্ত-সংশ্লিষ্ট একাধিক দায়িত্বশীল সূত্র থেকে এসব তথ্য জানা গেছে।

সূত্র জানায়, রূপনগরের ৩৩ নম্বর সড়কের ষষ্ঠ তলার ফ্ল্যাটটি জাহিদুল ইসলাম ভাড়া নিয়েছিল জাহাঙ্গীর আলম মুরাদ নামে। ভাড়াটিয়া হিসেবে বাড়ির মালিকের কাছে দেওয়া তথ্য ফরমে জাহিদুল তার স্ত্রীর নাম লিখেছিল সেলিনা আক্তার (৩০)। ওই তথ্য ফরমে তাদের দুই শিশুসন্তান রামিসা আলম (৭) ও লামিহা আলম (৩) বলে উল্লেখ করে। জাহিদুলের পরিচয় হিসেবে লেখা হয়, ‘সাইট অফিসার, বিশ্বাস বিল্ডার্স’। বাবার নাম লেখা হয় মোখলেছুর রহমান। জাহিদুল তার স্থায়ী ঠিকানা উল্লেখ করে টাঙ্গাইল সদর, মোল্লাপাড়া। তবে নারায়ণগঞ্জে জাহিদুল ভাড়াটিয়ার ফরমে তার বাবার নাম শাহজাহান আলী বলে উল্লেখ করে। ভাড়াটিয়া ফরমে সব ধরনের তথ্য ভুল দিলেও দুই জায়গায় ফরমে নিজের আসল ছবি ব্যবহার করে জাহিদুল। পরে গোয়েন্দা অনুসন্ধানে বের হয়, জাহিদুলের বড় মেয়ের নাম জুনায়রা বিনতে জাহিদ। কিছুদিন আগেও সে রাজধানীর উত্তরার চার নম্বর সেক্টরে আহলে হাদিসের পরিচালিত একটি স্কুলে পড়ত।

দায়িত্বশীল একাধিক সূত্র জানায়, গুলশানের হামলার সূত্র ধরে পুলিশ রাজধানীর কল্যাণপুরে একটি জঙ্গি আস্তানার খোঁজ পায়। সেখান থেকে উদ্ধার কিছু আলামত থেকে দেখা যায়, গুলশানে হামলায় নিহত সব জঙ্গি ও জাহিদুল কিছুদিন একত্রে ওই বাসায় অবস্থান করছিল। গুলশানে হামলায় নিহতদের মধ্যে নিবরাসের সঙ্গে জাহিদুলের ভালো সম্পর্ক ছিল। ২০১৫ সালের জুলাইয়ে সেনাবাহিনী থেকে জাহিদুল স্বেচ্ছায় চাকরি ছাড়ার পর গুলশানে একটি স্কুলে কিছুদিন শিক্ষকতা করত। সেখান থেকে মাসে লক্ষাধিক টাকা বেতন পেত।

কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ইউনিটের এক কর্মকর্তা জানান, নারায়ণগঞ্জের ঘটনার পর শুধু কাউন্টার টেররিজম ইউনিট নয়, পুলিশ সদর দপ্তর ও বগুড়া জেলা পুলিশও জাহিদুলের ব্যাপারে কিছু তথ্য পায়। রূপনগরের আস্তানা সম্পর্কে একটি মোটামুটি ধারণা পায়। তবে ফ্ল্যাটটি সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট তথ্য পাচ্ছিল না। রূপনগরের অভিযান চালাতে পুলিশ সদর দপ্তর, কাউন্টার টেররিজম ও বগুড়া জেলা পুুলিশ সম্মিলিতভাবে একটি কমিটি গঠন করে। তামিম নিহত হওয়ার পর একবার দুই শতাধিক পুলিশ সদস্য নিয়ে রূপনগরের বাসায় অভিযানও চালানো হয়। পরে জানা যায়, পাইকপাড়ার আস্তানায় অভিযান চালানোর দিন বিকেলে স্ত্রী ও দুই শিশুসন্তান নিয়ে তাড়াহুড়ো করে রূপনগরের বাসা ছাড়ে জাহিদুল। তবে পুলিশের বিশ্বাস ছিল, যেহেতু বাসায় গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র ফেলে গেছে, তাই আবার এই বাসায় জাহিদুল আসতে পারে। এরপর পুলিশের পক্ষ থেকে বাড়িওয়ালাকে জাহিদুল সম্পর্কে ধারণা দিয়ে বলা হয়, ছয়তলার ফ্ল্যাটের ভাড়াটিয়া ফিরলে কৌশলে বাইরে থেকে দরজা বন্ধ করে পুলিশে খবর দিতে। ২ সেপ্টেম্বর জাহিদুল বাসায় ঢোকার পরই বাড়ির মালিক পুলিশকে তথ্য দেন।

তদন্ত-সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, সিলেটে অবস্থানের সময়ই জাহিদ উগ্রবাদে জড়ায়। সেখানকার একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে সে কয়েকবার যাতায়াত করেছে। ওই বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষককে উগ্রপন্থি তৎপরতায় জড়িত সন্দেহে গোয়েন্দা নজরদারিতে রাখা হয়েছে। তাদের সঙ্গে জাহিদুলের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ছিল।

সূত্র বলছে, কার মাধ্যমে জাহিদুল উগ্রপন্থায় জড়িয়েছিল, সেটা সন্দেহাতীতভাবে বের করার চেষ্টা করছেন গোয়েন্দারা। তবে নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গি সংগঠন আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের (এবিটি) প্রধান সমন্বয়ক মেজর (বরখাস্ত) সৈয়দ জিয়াউল হকের কাজে উদ্বুদ্ধ হয়ে জাহিদুল নব্য জেএমবিতে জড়াতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। গোয়েন্দারা বলছেন, জেএমবির শীর্ষ পর্যায় থেকে সংগঠনের মাঠ পর্যায়ের সদস্যদের বলা হতো, “এবিটিতে ‘মেজর জিয়া’ রয়েছে, তেমনি আমাদেরও একজন ‘বড় ভাই’ আছে।”

গুলশানে হামলার পর প্রথমে গোয়েন্দাদের ধারণা ছিল, বসুন্ধরায় জঙ্গিদের জন্য যে ব্যক্তি বাসাটি ভাড়া করে দিয়েছিল, সে-ই হয়তো অনেক জায়গায় উগ্রপন্থিদের বাসা করে দেয়। পরে দেখা যায়, জঙ্গিদের জন্য রাজধানী ও দেশের বিভিন্ন এলাকায় পরিচয় গোপন করে একাধিক বাসা ভাড়া করে জাহিদুল। মূলত চলতি বছরের এপ্রিলের পর থেকে পরিবার ও স্বজনদের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে সে। এখন গোয়েন্দারা জাহিদুলের অন্য সাঙ্গোপাঙ্গদের গ্রেফতারের চেষ্টা করছে।

রূপনগরে জঙ্গি আস্তানায় অভিযানে জাহিদুল নিহত হওয়ার ঘটনায় সন্ত্রাস দমন আইনে একটি মামলা করা হয়েছে। ওই মামলায় আরও চারজনকে আসামি করা হয়।

পুলিশের মিরপুর বিভাগের ডিসি মাসুদ আহম্মেদ সমকালকে বলেন, জাহিদুলের শ্বশুর ও শাশুড়িকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে।

রূপনগরের আস্তানায় যারা যাতায়াত করত: পুলিশের প্রাথমিক অনুসন্ধানে জানা গেছে, রূপনগরে জাহিদুলের বাসায় বিভিন্ন সময় যাতায়াত করত তার সহযোগী মানিক, ইকবাল, আকাশ, সাগরসহ অজ্ঞাত আরও পাঁচ-ছয়জন। সেখানে জেএমবি ও অন্যান্য উগ্রপন্থি সংগঠনের সহায়তায় জঙ্গিদের অস্ত্র প্রশিক্ষণ ও পরামর্শ দেওয়া হয়। গোয়েন্দা সূত্র বলছে, এবিটির মেজর জিয়া সংগঠনে সাগর নামে পরিচিত।

যা মিলল সেই আস্তানায়: মামলার এজাহারে বলা হয়, রূপনগরের আস্তানায় এক রাউন্ড গুলিসহ একটি সিলভার রঙের পিস্তল, ৭ দশমিক ৫ ইঞ্চি লম্বা একটি চাকু, বিকৃত বুলেট তিনটি, পিস্তলের গুলি একটি, এসএমজির খোসা ৪টি, এক জোড়া সেনাবাহিনীর মোজা, কিছু বই, যেগুলোর নাম- ‘জান্নাত-জাহান্নাম’, ‘সালাতুল রাসুল’, ‘ইমাম ইবনে তাইমিয়াহ’, ‘তাওহীদি দুর্গ’, ‘শুধু আপনার সাহায্যে প্রার্থনা করি’, ‘তাওহীদ জিজ্ঞাসা ও জবাব’, ‘ইসলামে বন্ধুত্ব ও শত্রুতা’, ‘দ্য লাস্ট কোরানিক কুইজ’, ‘মন দিয়ে নামাজ পড়ার উপায়’, ‘জান্নাতী সুধা’, আহলে সুন্নাত ইসলামী, জিকিরের বই, নামাজ ত্যাগকারীর বিধান, ‘দ্য পিলারস অব ফাথ’, ‘বাংলাদেশে প্রচলিত শির্ক’, বিদ, আত ও কুসংস্কার পর্যালোচনা, তাফসীর ইবনে কাসীর খণ্ড, আল কোরআনের ভাষা নামক বই, দুটি চাপাতি (একটি বাঁটসহ), লোহার র‌্যাত একটি, একটি স্টূ্ক্রড্রাইভার ও একটি ধারালো পাটা।

Comments

comments

সম্পাদক : মোহাম্মদ আবদুল বাছির
প্রকাশক: মোহাম্মদ জহিরুল ইসলাম
ফোন : ‎০১৭১৩৪০৯০৯০
৩৪৫/১, দিলু রোড, নিউ ইস্কাটন, ঢাকা-১০০০
X
 
নিয়মিত খবর পড়তে আমাদের ফেসবুক পেজে লাইক দিয়ে যুক্ত থাকুন
X