বুধবার, ২৪শে মে, ২০১৭ ইং, ১০ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪২৪ বঙ্গাব্দ, সকাল ১০:০৯
শিরোনাম
  • ঘৃণাকে বিজয়ী হতে দেয়া যাবে না, ট্রাম্পকে ইঙ্গিত করে জর্জ ক্লুনি
  • আমার একটাই চিন্তা দেশের মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন করা: প্রধানমন্ত্রী
  • ‘কেন্দ্রীয় সরকারের আগ্রাসী নীতির কারণে কাশ্মীরকে হারাতে হবে’
  • সাড়ে চারমাস পর মুখোমুখি, খাদিজাকে উদ্দেশ্য করে যা বলল বদরুল
  • খালেদার ‘সাজা’ বিরোধী নেতাকর্মীদের মনোবল ভাঙ্গার কৌশল!
  • বিএনপির কর্মসূচি ‘যথাসময়ে’ জানানো হবে: রিজভী
  • দলের জন্য বোলিং করতেও রাজি মুশফিক
  • শিশু জিহাদের মৃত্যু: চার জনের ১০ বছর করে কারাদণ্ড
  • অবশেষে বাড়ি অবরুদ্ধ করে রাখা সেই দেয়াল ভেঙ্গে ফেলা হচ্ছে
  • সাক্ষ্য দিলেন খাদিজা, চাইলেন বদরুলের সর্বোচ্চ শাস্তি
  • বদরুলের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিতে আদালতে খাদিজা
  • আজ বগুড়ায় যেসব প্রকল্প উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী
  • রোহিঙ্গা স্থানান্তরের সরকারি পরিকল্পনার সঙ্গে দ্বিমত মানবাধিকার কমিশনের
  • মহেশখালীতে ইয়াবা ব্যবসায়ীদের সঙ্গে পুলিশের ‘বন্দুকযুদ্ধ’
  • হোয়াইট হাউসে কাজ করার দীর্ঘ অভিজ্ঞতার কথা জানালেন এই বাংলাদেশি সাংবাদিক
Tuesday, February 21, 2017 9:42 am
A- A A+ Print

তৃতীয় মত : একুশের প্রভাতফেরি কোথাও যায়নি

17

আমাদের জাতীয় জীবনে যে দিবসটি সবচেয়ে অবিতর্কিত এবং সর্বজনীন, সে দিবসটি হল একুশে ফেব্রুয়ারি। শুধু বাংলাদেশের বাঙালিরা নয়, সারা বিশ্বে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা বাংলা ভাষাভাষী মানুষ মাত্রেই এ দিবসটি অত্যন্ত শ্রদ্ধার সঙ্গে উদযাপন করে। এ দিনটি ভাষা-সংস্কৃতি চর্চার দিন। রাজনৈতিক বাকবিতণ্ডা সৃষ্টি বা বিদ্বেষ প্রচারের দিন নয়। একুশের দিনটিতে সব দল-মতের মানুষই ভাষা শহীদ মিনারে জমায়েত হয়, শহীদদের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানায়। এ দিনটিতে তাই বিদ্বেষ ও অসত্য প্রচার থেকে আমাদের সবারই বিরত থাকা উচিত। দুঃখের বিষয়, এ বছর এই একুশের মাঝেও একটি বিতর্কে জড়িত হতে হল। এজন্য পাঠকদের কাছে আগেই জোড়হস্তে ক্ষমা চাই। ঢাকায় একটি কাগজে বাম বুদ্ধিজীবী বদরুদ্দীন উমরের একটি লেখা পড়ে লেখাটির ইতিহাস বিকৃতির দিকটি নিয়ে আলোচনায় প্রবৃত্ত না হয়ে পারলাম না। বদরুদ্দীন উমরের রাজনৈতিক মতামতের সঙ্গে সহমত পোষণ না করলেও সমবয়সী পণ্ডিত বন্ধু হিসেবে তাকে আমি শ্রদ্ধা করি। তিনি বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের একটা বৃহৎ ইতিহাস গ্রন্থ জাতিকে সর্বপ্রথম উপহার দিয়ে সব দেশের বাংলা ভাষাভাষীদের ধন্যবাদভাজন হয়েছেন। তার ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসে অনেক ভুল আছে, সত্য-অসত্যের মিশ্রণ আছে, ব্যক্তিবিশেষ ও দলবিশেষের প্রতি বিদ্বেষ পোষণের প্রমাণ আছে। তথাপি নানা সূত্র থেকে নানা তথ্য সংগ্রহ করে তিনি যে ভাষা আন্দোলনের প্রথম ইতিহাসটি লিখেছেন, এজন্য আমরা সবাই তার কাছে কৃতজ্ঞ। তার সঙ্গে বহু বিষয়ে অতীতে আমার কলমযুদ্ধ হয়েছে। কিন্তু কখনও তার বিরুদ্ধে এ অভিযোগ তুলিনি যে, তিনি একজন সুবিধাবাদী। অনেক বাম পণ্ডিতের মতো তিনি সামরিক শাসক বা স্বৈরশাসকদের চাকরি করেননি; তাদের অনুগ্রহের ভিখারি হননি, এটা তার চরিত্রের একটা বড় গুণ। কিন্তু কেন যে তিনি একটি দল এবং একজন ক্ষণজন্মা নেতার প্রতি অন্ধ বিদ্বেষ পোষণ করেন এবং সেজন্য প্রায় লেখায় অর্ধ সত্য, বিকৃত তথ্য পরিবেশনে দ্বিধা করেন না, তা বোঝা আমার বুদ্ধির অগম্য। এ বছর একুশকে নিয়ে লিখতে গিয়েও তিনি অপ্রয়োজনীয় বিদ্বেষ প্রচার, তথ্য বিকৃতির আশ্রয় নিয়েছেন। এটি যে মহান ভাষা দিবসের অবমাননা এবং নিজেকেও সচেতন পাঠকদের কাছে ছোট করে ফেলা এটা তিনি কেন বুঝতে পারেন না, অথবা বুঝতে চান না তাও আমার কাছে রহস্য। তিনি তো কোনো স্বার্থসংশ্লিষ্ট মহলের কাছে কোনোভাবেই দায়বদ্ধ নন। দেশ যখন মৌলবাদের হিংস্র থাবার নিচে কাঁপছে, আমাদের সেক্যুলার ভাষা-সংস্কৃতির বিরুদ্ধে নতুন নতুন চক্রান্ত চলছে, তখন একজন সচেতন বাম বুদ্ধিজীবী হিসেবে জাতিকে তার ভয়াবহ বিপদ সম্পর্কে তার লেখায় সতর্ক না করে ‘প্রভাতফেরি কোথায় গেল’ শীর্ষক প্রবন্ধ লিখে আওয়ামী লীগ ও মুজিব-ফোবিয়ায় ভুগে এত সাম্প্রতিককালের ইতিহাস নিয়ে কেন তথ্য বিকৃতি ঘটাচ্ছেন তার কারণ আমি জানি না। বদরুদ্দীন উমর একুশে ফেব্রুয়ারির প্রভাতফেরি যে আজকাল আর হয় না, তার কারণ দর্শাতে গিয়ে লিখেছেন, ‘বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর রাতারাতি প্রভাতফেরি উঠে গেল ১৯৭২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি। কেউ আইন করে বা নির্দেশ দিয়ে তা উঠায়নি। সেটি উঠানো হল বেশ কৌশলের সঙ্গে ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে। ১৯৫৩ সাল থেকে ২১ ফেব্রুয়ারি পালিত হতো প্রতিরোধের দিবস হিসেবে। আমাদের দেশের জনগণের ওপর পাকিস্তান সরকারের যে নির্যাতন ছিল, শুধু ভাষা নির্যাতন নয়, সর্বক্ষেত্রে নির্যাতন, তার বিরুদ্ধে প্রতিরোধের দিবস ২১ ফেব্রুয়ারি। সেই হিসেবে সরকার, তৎকালীন সরকারের রাজনৈতিক দল থেকে নিয়ে বিভিন্ন মহল ভয় করত ২১ ফেব্রুয়ারি উদযাপনের মধ্যে প্রতিরোধের দিকটিকে। সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশের নব্য শাসকদের প্রাণেও সেই ভয় ঢুকল তাদের প্রতি জনগণের বিপুল সমর্থন সত্ত্বেও।’ এরপর উমর সদ্যস্বাধীন বাংলাদেশের নব্য শাসক অর্থাৎ বঙ্গবন্ধুর সরকার ও আওয়ামী লীগের মনেও (জনসমর্থন সত্ত্বেও) সেই ভয় কেন ঢুকল তার কারণ ব্যাখ্যা করেছেন। তিনি লিখেছেন, ‘যেহেতু তারা (নব্য শাসকেরা) জানত ২১ ফেব্রুয়ারির প্রতিরোধের শক্তির কথা, সে কারণে ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়েই তারা ২১ ফেব্রুয়ারির মধ্যে প্রতিরোধের যে শক্তি ছিল, তাকে প্রথম থেকেই অকার্যকর করতে নিযুক্ত হয়েছিল। নিজেদের পরিচয় তারা জানত, ক্ষমতা হাতে পেয়ে তারা কী করবে এ বিষয়ে তাদের কোনো অস্পষ্টতা ছিল না এবং এর ফলে তাদের বিরুদ্ধে জনগণের প্রতিরোধ যে অবশ্যম্ভাবী, এ নিয়ে তাদের কোনো সংশয়ও ছিল না। কাজেই সেই ভবিষ্যৎ প্রতিরোধ মোকাবেলার কৌশল হিসেবেই তারা ২১ ফেব্রুয়ারিকে আর সেভাবে ব্যবহৃত হতে দেয়ার পক্ষপাতী ছিল না।’ উমর তার এ কল্পিত ও অভিনব ব্যাখ্যাদানের পর এ ব্যাখ্যার পক্ষে কিছু তথ্যও দিয়েছেন। তিনি লিখেছেন, ‘এ কারণেই প্রভাতফেরি বন্ধ করা থেকে নিয়ে ২১ ফেব্রুয়ারি উদযাপনের চরিত্র তারা প্রথম সুযোগেই একেবারে পাল্টে দিয়েছিল। খুব ভোরে, ঊষালগ্নে যে প্রভাতফেরি শুরু হতো, তা এক আঘাতে শেষ করার জন্য রাত ১২টায় ব্যবস্থা করা হল প্রধানমন্ত্রীকে দিয়ে একুশে ফেব্রুয়ারি উদ্বোধন। অর্থাৎ যে ২১ ফেব্রুয়ারির অনুষ্ঠান শুরু হতো সর্বস্তরের জনগণের অংশগ্রহণে প্রভাতফেরির মধ্য দিয়ে, তার পরিবর্তে তাকে পরিণত করা হল বিপুলসংখ্যক পুলিশের উপস্থিতিতে সরকারি অনুষ্ঠানে।’ বদরুদ্দীন উমর নিজেই তার এ লেখায় স্বীকার করেছেন, ‘কেউ আইন করে বা নির্দেশ দিয়ে একুশে ফেব্রুয়ারির প্রভাতফেরি বন্ধ করেনি।’ তাহলে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর একুশের প্রভাতফেরি বন্ধ হয়ে গেল কেন? একজন সমাজবিজ্ঞানী হিসেবে এর উত্তরটি খুঁজলে সহজেই তিনি তা পেয়ে যেতেন। পাকিস্তান আমলে প্রতি একুশের ভোরে বিশ্ববিদ্যালয়, স্কুল, কলেজের ছাত্রছাত্রীদের এবং সেই সঙ্গে সাধারণ মানুষের নগ্নপদে মিছিল করা ছিল একটি স্বতঃস্ফূর্ত ব্যাপার। দলমত নির্বিশেষে সবাই এ প্রভাতফেরিতে শামিল হতো। এ প্রভাতফেরির উদ্দেশ্য ছিল আজিমপুর গোরস্তান পর্যন্ত গিয়ে কয়েকজন ভাষা শহীদের সমাধিতে শ্রদ্ধা নিবেদন এবং ভাষার দাবিতে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার সংকল্প প্রকাশ। অবশ্যই এ প্রভাতফেরিতে একটা প্রতিরোধ-চেতনা ছিল। পাকিস্তান সরকার একুশে ফেব্রুয়ারি উদযাপনে শুধু বাধা দিয়েই ক্ষান্ত হয়নি, ১৯৫৫ সালে জেনারেল ইস্কান্দার মির্জা যখন পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর হয়ে আসেন, তখন একুশে ফেব্রুয়ারিতে কালো ব্যাজ ধারণ এবং নগ্নপদ প্রভাতফেরির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেন। এই নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে প্রবল প্রতিবাদ ওঠে। ঢাকায় স্কুল, কলেজে, বিশ্ববিদ্যালয় ভবনে কালো পতাকা উড্ডীন হয়। ১৪৪ ধারা অমান্য করে প্রভাতফেরি বের করা হয়। পুলিশ মিছিলের ওপর, এমনকি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ভবনে ঢুকে বেপরোয়া লাঠি চালায়। দেড়শ’র মতো ছাত্রছাত্রীকে গ্রেফতার করা হয়। এই গ্রেফতারকৃত ছাত্রনেতাদের মধ্যে বর্তমান সরকারের অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতও ছিলেন। ১৯৫৫ সালে পূর্ব পাকিস্তানে গভর্নর শাসন (৯৩ ধারা) উঠে যায়; বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার কথা ঘোষণা করা হয়। ফলে স্বাভাবিকভাবে একুশের আন্দোলনের মিলিট্যান্সি অনেকটা কমে যায়। এরপরও একুশের প্রভাতফেরি প্রতিবছর বের হয়েছে। তাতে ’৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানের এবং পরবর্তী স্বাধিকার আন্দোলনের উদ্দীপনা যুক্ত হয়েছে। কিন্তু দেশ স্বাধীন হওয়ার পর যখন বাংলা ভাষা একমাত্র সরকারি ভাষা হিসেবে ঘোষিত হয় এবং একুশে ফেব্রুয়ারি উদযাপনে সব বাধা ও নিষেধাজ্ঞা অপসারণ করে স্বাধীন দেশের সরকার এটিকে রাষ্ট্রীয় দিবস হিসেবে পালনের ব্যবস্থা করে, তখন স্বাভাবিকভাবেই এ দিবস পালনের উদ্দীপনা ও প্রতিরোধ চেতনা আর থাকেনি। তা থাকার কথাও নয়। একুশের প্রতিরোধ চেতনা তখন কার বিরুদ্ধে, কিসের লক্ষ্যে? প্রভাতফেরি করার স্বতঃস্ফূর্ততা ছাত্র-জনতার মধ্য থেকে ধীরে ধীরে চলে যায়। সরকারি নির্দেশে প্রভাতফেরি বন্ধ হয়নি। উমরও তার লেখায় সে কথা স্বীকার করেছেন। তাহলে প্রভাতফেরি কেন বন্ধ হয়ে গেল, তার প্রকৃত কারণ বিশ্লেষণ না করে তিনি উদোর পিণ্ডি বুধোর ঘাড়ে চাপাতে গেলেন কেন? ভবিষ্যতে দেশে সরকারবিরোধী আন্দোলন হবে, সেই ভয়ে সদ্য স্বাধীন হওয়া দেশের সরকার (মুজিব সরকার) একুশের প্রতিরোধ চেতনা মুছে দিয়েছেন, দিবসটিকে সরকারি দিবসে পরিণত করেছেন এ কথা বলা হাস্যকর নয় কি? উমর নিজেই লিখেছেন, তখন সরকারের পেছনে জনসমর্থন ছিল। তাহলে কোন্ দূর ভবিষ্যতে সরকার জনপ্রিয়তা হারাবে এই কল্পিত ভয়ে সরকার আগে থেকেই একুশে ফেব্রুয়ারির চরিত্র বদলাবে, কৌশলে প্রভাতফেরি বন্ধ করে দিতে চাইবে, এটা কি খুবই কষ্ট-কল্পনা নয়? আর দেশ স্বাধীন হওয়ার পর একুশে ফেব্রুয়ারি তো জাতীয় দিবস হবেই, এবং এ দিবসে সরকারি অনুষ্ঠান হবেই। স্বাধীনতা অর্জনে যে দিবসটি সবচেয়ে বেশি অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে, স্বাধীনতার পর সে দিবসটি অবশ্যই সরকারি স্বীকৃতি পাবে, জাতীয় দিবস হিসেবে পালিত হবে। রাষ্ট্রের প্রধানদের সেই অনুষ্ঠানে আসতেই হবে এবং তাদের পাহারা দেয়ার জন্যও পুলিশ আসবে। কোন্ দেশে এর ব্যত্যয় হয়েছে? বাংলাদেশ এর ব্যত্যয় হলে জনগণই সরকারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াত। ফ্রান্সে বাস্তিল দুর্গ ভাঙার দিবসটি একটি বিপ্লব দিবস। বিপ্লব সফল হওয়ার পর অর্থাৎ দেশে রাজতন্ত্রের পতন ও প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পর বাস্তিল দিবসের সেই আগের মিলিট্যান্সি আর নেই। এটি এখন সরকারিভাবে পালিত একটি জাতীয় দিবস। জনগণ তাতে যোগ দেয়। আগের মতো বন্দুক-রাইফেল নিয়ে মিছিল করে না, উত্তেজক স্লোগান দেয় না। ভারতে বিয়াল্লিশের আগস্ট-আন্দোলনের স্মরণ দিবস এখন সরকারি বেসরকারি দু’ভাবেই পালিত হয়। স্বাধীনতার আগে এ দিবস ছিল প্রতিরোধ দিবস। ব্রিটিশরাজবিরোধী স্লোগানে রাজপথ মুখরিত হতো। এখন তা হয় না। এখন মিছিল-শোভাযাত্রা নেই। অনুষ্ঠান আছে। তাতে শান্ত সমাহিতভাবে বিয়াল্লিশের শহীদদের স্মরণ করা হয়। বাংলাদেশেও তা-ই হয়েছে। বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে। বাংলা ভাষা সব নির্যাতনমুক্ত। সুতরাং মিছিল-মিটিংয়ে গর্জন করা হবে কিসের দাবিতে? দেশের সরকার যদি অত্যাচারী হয়, নির্যাতন চালায় তার বিরুদ্ধে নতুন আন্দোলন হবে, দাবিভিত্তিক সংগ্রাম চলবে। ভাষা আন্দোলনকে তাতে টেনে নামানো যাবে কীভাবে? একুশ এখন একটি স্মরণ দিবস (জবসবসনৎধহপব ফধু)। একাডেমিক আলোচনার দিবস। বাংলাকে জাতীয় জীবনের সর্বপর্যায়ে ব্যবহারযোগ্য করে তোলার উদ্যোগ গ্রহণের দিবস। এ কাজে সরকার ও জনগণের সর্বপ্রকার সহযোগিতার দরকার। একুশ সেই সহযোগিতার দিবস। সংঘর্ষের নয়। এ কথা সত্য, স্বাধীনতার পর সকালের পরিবর্তে মধ্যরাত বারোটায় প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতিতে একুশের উদ্বোধন করা শুরু হয়। আন্তর্জাতিক সময়ের সঙ্গে সংহতি রক্ষার জন্যই (রাত বারোটায় নতুন দিন শুরু) এই ব্যবস্থা করা হয়েছিল। প্রভাতফেরি বন্ধ করার জন্য নয়। ইচ্ছা থাকলে প্রভাতফেরি মধ্যরাতেও করা যায়। লন্ডনে একুশের মধ্যরাতে আলতাব আলী পার্কে সবাই এসে ভাষা শহীদ মিনারে ফুল দেয়। তাতে কেউ আপত্তি তোলেনি। একুশের অনুষ্ঠানে শুধু প্রধানমন্ত্রী বা রাষ্ট্রপতিকে পাহারা দেয়ার জন্য নয়, এমনিতেও শান্তিশৃংখলা রক্ষার জন্য, বিশেষ করে এই সন্ত্রাসের যুগে পুলিশের উপস্থিতি প্রয়োজন। উমর হয়তো ভুলে গেছেন, স্বাধীনতার পর সামরিক শাসনামলে একুশের পবিত্রতা নষ্ট করে শহীদ মিনারেও প্রচণ্ড হাতাহাতি, মারামারির অনুষ্ঠান শুরু হয়েছিল। প্রয়াত মিজানুর রহমান চৌধুরী শহীদ মিনারে মালা দিতে এসে নির্যাতিত হয়েছিলেন। নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করার কারণেই তা বন্ধ হয়েছে। এই নিরাপত্তা ব্যবস্থা না থাকলে বর্তমানের হিংস্র মৌলবাদীদের তাণ্ডবে একুশের মধ্যরাতের অনুষ্ঠান উদীচীর রমনা বটমূলের নববর্ষ অনুষ্ঠানের মতো মর্মান্তিক রক্তাক্ত ঘটনায় পরিণত হতো। বর্তমানের একুশের অনুষ্ঠানে সর্বস্তরের জনগণের অংশগ্রহণ কি কমেছে, না বেড়েছে? এ বছরের একুশের অনুষ্ঠানও কী বলে? আমার তো মনে হয়, সন্ত্রাসকবলিত দেশে সাধারণ মানুষ স্বাভাবিক নিরাপত্তা ব্যবস্থায় একুশে উদযাপনে অনেক বেশি স্বচ্ছন্দবোধ করে। উমর আগের দিনের একুশে উদযাপন নিয়ে বিলাপ করেছেন। কিন্তু সময় কি এক জায়গায় এক অবস্থানে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে? পরিবর্তনই তো জগৎ-সংসারের স্বাভাবিক ধর্ম। সরকারি অনুষ্ঠানের পাশাপাশি অসংখ্য বেসরকারি অনুষ্ঠানে কি আগের মতো রাজনৈতিক বক্তৃতা দেয়া হয় না, গণসঙ্গীত গাওয়া হয় না? আরও বেশি গাওয়া হয়। যার বাৎসরিক পুনরাবৃত্তিতে এখন পরিবর্তন প্রয়োজন। একজন সমাজবিজ্ঞানী হিসেবে বদরুদ্দীন উমর লিখতে পারতেন, আমরা একুশকে (কেবল সরকার নয়) অতি বেশি আনুষ্ঠানিকতায় বন্দি করে ফেলেছি। একুশের ভাষা আন্দোলন ক্রমশ তার তাৎপর্য হারাচ্ছে। আমরা ভাষাকে রেখে তার আন্দোলনকে নিয়ে বড় বেশি মাতামাতি করছি। ভাষাকে আমরা কেবল রাষ্ট্রভাষার স্বীকৃতি দিয়েছি। কিন্তু তাকে ব্যবহারিক ভাষা, সরকারি সব কাজকর্মের ভাষা করে তুলতে পারিনি। এ ব্যাপারে সরকারের ত্রুটি আছে, আমাদেরও গাফিলতি আছে। প্রতি বছর একুশে উদযাপনের সময় আমাদের এই ত্রুটি ও গাফিলতি সম্পর্কে সচেতন হওয়া আবশ্যক। একুশ এখন বিপ্লব নয়, প্রতিরোধ নয়, একটি সংস্কার ও উন্নয়নের আন্দোলন। প্রতিক্রিয়াশীল মহল থেকেই এই ভাষার বিরুদ্ধে চক্রান্ত এখনও চালানো হচ্ছে। সে সম্পর্কে সচেতন থেকে এ ভাষাকে কী করে জনজীবনে প্রকৃত প্রতিষ্ঠা দেয়া যায়, আমাদের সেক্যুলার গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থার শক্তিশালী ভিত্তি করে তোলা যায় সেদিকেই আজ বাংলাদেশের সব মানুষের উদ্যোগ নিয়োজিত হওয়া দরকার। একুশ এখন সংগ্রাম নয়, একটি আন্দোলন। একটি ধারাবাহিক আন্দোলন। এ আন্দোলন সম্পর্কে অবাঞ্ছিত বিতর্ক সৃষ্টি করা আমাদের কারোই উচিত নয়। লন্ডন, ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০১৭

Comments

Comments!

 তৃতীয় মত : একুশের প্রভাতফেরি কোথাও যায়নিAmarbangladeshonlineAmarbangladeshonline | Amarbangladeshonline

তৃতীয় মত : একুশের প্রভাতফেরি কোথাও যায়নি

Tuesday, February 21, 2017 9:42 am
17

আমাদের জাতীয় জীবনে যে দিবসটি সবচেয়ে অবিতর্কিত এবং সর্বজনীন, সে দিবসটি হল একুশে ফেব্রুয়ারি। শুধু বাংলাদেশের বাঙালিরা নয়, সারা বিশ্বে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা বাংলা ভাষাভাষী মানুষ মাত্রেই এ দিবসটি অত্যন্ত শ্রদ্ধার সঙ্গে উদযাপন করে। এ দিনটি ভাষা-সংস্কৃতি চর্চার দিন। রাজনৈতিক বাকবিতণ্ডা সৃষ্টি বা বিদ্বেষ প্রচারের দিন নয়। একুশের দিনটিতে সব দল-মতের মানুষই ভাষা শহীদ মিনারে জমায়েত হয়, শহীদদের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানায়। এ দিনটিতে তাই বিদ্বেষ ও অসত্য প্রচার থেকে আমাদের সবারই বিরত থাকা উচিত।

দুঃখের বিষয়, এ বছর এই একুশের মাঝেও একটি বিতর্কে জড়িত হতে হল। এজন্য পাঠকদের কাছে আগেই জোড়হস্তে ক্ষমা চাই। ঢাকায় একটি কাগজে বাম বুদ্ধিজীবী বদরুদ্দীন উমরের একটি লেখা পড়ে লেখাটির ইতিহাস বিকৃতির দিকটি নিয়ে আলোচনায় প্রবৃত্ত না হয়ে পারলাম না। বদরুদ্দীন উমরের রাজনৈতিক মতামতের সঙ্গে সহমত পোষণ না করলেও সমবয়সী পণ্ডিত বন্ধু হিসেবে তাকে আমি শ্রদ্ধা করি। তিনি বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের একটা বৃহৎ ইতিহাস গ্রন্থ জাতিকে সর্বপ্রথম উপহার দিয়ে সব দেশের বাংলা ভাষাভাষীদের ধন্যবাদভাজন হয়েছেন।

তার ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসে অনেক ভুল আছে, সত্য-অসত্যের মিশ্রণ আছে, ব্যক্তিবিশেষ ও দলবিশেষের প্রতি বিদ্বেষ পোষণের প্রমাণ আছে। তথাপি নানা সূত্র থেকে নানা তথ্য সংগ্রহ করে তিনি যে ভাষা আন্দোলনের প্রথম ইতিহাসটি লিখেছেন, এজন্য আমরা সবাই তার কাছে কৃতজ্ঞ। তার সঙ্গে বহু বিষয়ে অতীতে আমার কলমযুদ্ধ হয়েছে। কিন্তু কখনও তার বিরুদ্ধে এ অভিযোগ তুলিনি যে, তিনি একজন সুবিধাবাদী। অনেক বাম পণ্ডিতের মতো তিনি সামরিক শাসক বা স্বৈরশাসকদের চাকরি করেননি; তাদের অনুগ্রহের ভিখারি হননি, এটা তার চরিত্রের একটা বড় গুণ। কিন্তু কেন যে তিনি একটি দল এবং একজন ক্ষণজন্মা নেতার প্রতি অন্ধ বিদ্বেষ পোষণ করেন এবং সেজন্য প্রায় লেখায় অর্ধ সত্য, বিকৃত তথ্য পরিবেশনে দ্বিধা করেন না, তা বোঝা আমার বুদ্ধির অগম্য।

এ বছর একুশকে নিয়ে লিখতে গিয়েও তিনি অপ্রয়োজনীয় বিদ্বেষ প্রচার, তথ্য বিকৃতির আশ্রয় নিয়েছেন। এটি যে মহান ভাষা দিবসের অবমাননা এবং নিজেকেও সচেতন পাঠকদের কাছে ছোট করে ফেলা এটা তিনি কেন বুঝতে পারেন না, অথবা বুঝতে চান না তাও আমার কাছে রহস্য। তিনি তো কোনো স্বার্থসংশ্লিষ্ট মহলের কাছে কোনোভাবেই দায়বদ্ধ নন। দেশ যখন মৌলবাদের হিংস্র থাবার নিচে কাঁপছে, আমাদের সেক্যুলার ভাষা-সংস্কৃতির বিরুদ্ধে নতুন নতুন চক্রান্ত চলছে, তখন একজন সচেতন বাম বুদ্ধিজীবী হিসেবে জাতিকে তার ভয়াবহ বিপদ সম্পর্কে তার লেখায় সতর্ক না করে ‘প্রভাতফেরি কোথায় গেল’ শীর্ষক প্রবন্ধ লিখে আওয়ামী লীগ ও মুজিব-ফোবিয়ায় ভুগে এত সাম্প্রতিককালের ইতিহাস নিয়ে কেন তথ্য বিকৃতি ঘটাচ্ছেন তার কারণ আমি জানি না।

বদরুদ্দীন উমর একুশে ফেব্রুয়ারির প্রভাতফেরি যে আজকাল আর হয় না, তার কারণ দর্শাতে গিয়ে লিখেছেন, ‘বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর রাতারাতি প্রভাতফেরি উঠে গেল ১৯৭২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি। কেউ আইন করে বা নির্দেশ দিয়ে তা উঠায়নি। সেটি উঠানো হল বেশ কৌশলের সঙ্গে ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে। ১৯৫৩ সাল থেকে ২১ ফেব্রুয়ারি পালিত হতো প্রতিরোধের দিবস হিসেবে। আমাদের দেশের জনগণের ওপর পাকিস্তান সরকারের যে নির্যাতন ছিল, শুধু ভাষা নির্যাতন নয়, সর্বক্ষেত্রে নির্যাতন, তার বিরুদ্ধে প্রতিরোধের দিবস ২১ ফেব্রুয়ারি। সেই হিসেবে সরকার, তৎকালীন সরকারের রাজনৈতিক দল থেকে নিয়ে বিভিন্ন মহল ভয় করত ২১ ফেব্রুয়ারি উদযাপনের মধ্যে প্রতিরোধের দিকটিকে। সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশের নব্য শাসকদের প্রাণেও সেই ভয় ঢুকল তাদের প্রতি জনগণের বিপুল সমর্থন সত্ত্বেও।’

এরপর উমর সদ্যস্বাধীন বাংলাদেশের নব্য শাসক অর্থাৎ বঙ্গবন্ধুর সরকার ও আওয়ামী লীগের মনেও (জনসমর্থন সত্ত্বেও) সেই ভয় কেন ঢুকল তার কারণ ব্যাখ্যা করেছেন। তিনি লিখেছেন, ‘যেহেতু তারা (নব্য শাসকেরা) জানত ২১ ফেব্রুয়ারির প্রতিরোধের শক্তির কথা, সে কারণে ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়েই তারা ২১ ফেব্রুয়ারির মধ্যে প্রতিরোধের যে শক্তি ছিল, তাকে প্রথম থেকেই অকার্যকর করতে নিযুক্ত হয়েছিল। নিজেদের পরিচয় তারা জানত, ক্ষমতা হাতে পেয়ে তারা কী করবে এ বিষয়ে তাদের কোনো অস্পষ্টতা ছিল না এবং এর ফলে তাদের বিরুদ্ধে জনগণের প্রতিরোধ যে অবশ্যম্ভাবী, এ নিয়ে তাদের কোনো সংশয়ও ছিল না। কাজেই সেই ভবিষ্যৎ প্রতিরোধ মোকাবেলার কৌশল হিসেবেই তারা ২১ ফেব্রুয়ারিকে আর সেভাবে ব্যবহৃত হতে দেয়ার পক্ষপাতী ছিল না।’

উমর তার এ কল্পিত ও অভিনব ব্যাখ্যাদানের পর এ ব্যাখ্যার পক্ষে কিছু তথ্যও দিয়েছেন। তিনি লিখেছেন, ‘এ কারণেই প্রভাতফেরি বন্ধ করা থেকে নিয়ে ২১ ফেব্রুয়ারি উদযাপনের চরিত্র তারা প্রথম সুযোগেই একেবারে পাল্টে দিয়েছিল। খুব ভোরে, ঊষালগ্নে যে প্রভাতফেরি শুরু হতো, তা এক আঘাতে শেষ করার জন্য রাত ১২টায় ব্যবস্থা করা হল প্রধানমন্ত্রীকে দিয়ে একুশে ফেব্রুয়ারি উদ্বোধন। অর্থাৎ যে ২১ ফেব্রুয়ারির অনুষ্ঠান শুরু হতো সর্বস্তরের জনগণের অংশগ্রহণে প্রভাতফেরির মধ্য দিয়ে, তার পরিবর্তে তাকে পরিণত করা হল বিপুলসংখ্যক পুলিশের উপস্থিতিতে সরকারি অনুষ্ঠানে।’

বদরুদ্দীন উমর নিজেই তার এ লেখায় স্বীকার করেছেন, ‘কেউ আইন করে বা নির্দেশ দিয়ে একুশে ফেব্রুয়ারির প্রভাতফেরি বন্ধ করেনি।’ তাহলে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর একুশের প্রভাতফেরি বন্ধ হয়ে গেল কেন? একজন সমাজবিজ্ঞানী হিসেবে এর উত্তরটি খুঁজলে সহজেই তিনি তা পেয়ে যেতেন। পাকিস্তান আমলে প্রতি একুশের ভোরে বিশ্ববিদ্যালয়, স্কুল, কলেজের ছাত্রছাত্রীদের এবং সেই সঙ্গে সাধারণ মানুষের নগ্নপদে মিছিল করা ছিল একটি স্বতঃস্ফূর্ত ব্যাপার। দলমত নির্বিশেষে সবাই এ প্রভাতফেরিতে শামিল হতো।

এ প্রভাতফেরির উদ্দেশ্য ছিল আজিমপুর গোরস্তান পর্যন্ত গিয়ে কয়েকজন ভাষা শহীদের সমাধিতে শ্রদ্ধা নিবেদন এবং ভাষার দাবিতে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার সংকল্প প্রকাশ। অবশ্যই এ প্রভাতফেরিতে একটা প্রতিরোধ-চেতনা ছিল। পাকিস্তান সরকার একুশে ফেব্রুয়ারি উদযাপনে শুধু বাধা দিয়েই ক্ষান্ত হয়নি, ১৯৫৫ সালে জেনারেল ইস্কান্দার মির্জা যখন পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর হয়ে আসেন, তখন একুশে ফেব্রুয়ারিতে কালো ব্যাজ ধারণ এবং নগ্নপদ প্রভাতফেরির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেন।

এই নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে প্রবল প্রতিবাদ ওঠে। ঢাকায় স্কুল, কলেজে, বিশ্ববিদ্যালয় ভবনে কালো পতাকা উড্ডীন হয়। ১৪৪ ধারা অমান্য করে প্রভাতফেরি বের করা হয়। পুলিশ মিছিলের ওপর, এমনকি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ভবনে ঢুকে বেপরোয়া লাঠি চালায়। দেড়শ’র মতো ছাত্রছাত্রীকে গ্রেফতার করা হয়। এই গ্রেফতারকৃত ছাত্রনেতাদের মধ্যে বর্তমান সরকারের অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতও ছিলেন। ১৯৫৫ সালে পূর্ব পাকিস্তানে গভর্নর শাসন (৯৩ ধারা) উঠে যায়; বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার কথা ঘোষণা করা হয়। ফলে স্বাভাবিকভাবে একুশের আন্দোলনের মিলিট্যান্সি অনেকটা কমে যায়।

এরপরও একুশের প্রভাতফেরি প্রতিবছর বের হয়েছে। তাতে ’৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানের এবং পরবর্তী স্বাধিকার আন্দোলনের উদ্দীপনা যুক্ত হয়েছে। কিন্তু দেশ স্বাধীন হওয়ার পর যখন বাংলা ভাষা একমাত্র সরকারি ভাষা হিসেবে ঘোষিত হয় এবং একুশে ফেব্রুয়ারি উদযাপনে সব বাধা ও নিষেধাজ্ঞা অপসারণ করে স্বাধীন দেশের সরকার এটিকে রাষ্ট্রীয় দিবস হিসেবে পালনের ব্যবস্থা করে, তখন স্বাভাবিকভাবেই এ দিবস পালনের উদ্দীপনা ও প্রতিরোধ চেতনা আর থাকেনি। তা থাকার কথাও নয়। একুশের প্রতিরোধ চেতনা তখন কার বিরুদ্ধে, কিসের লক্ষ্যে? প্রভাতফেরি করার স্বতঃস্ফূর্ততা ছাত্র-জনতার মধ্য থেকে ধীরে ধীরে চলে যায়। সরকারি নির্দেশে প্রভাতফেরি বন্ধ হয়নি। উমরও তার লেখায় সে কথা স্বীকার করেছেন। তাহলে প্রভাতফেরি কেন বন্ধ হয়ে গেল, তার প্রকৃত কারণ বিশ্লেষণ না করে তিনি উদোর পিণ্ডি বুধোর ঘাড়ে চাপাতে গেলেন কেন?

ভবিষ্যতে দেশে সরকারবিরোধী আন্দোলন হবে, সেই ভয়ে সদ্য স্বাধীন হওয়া দেশের সরকার (মুজিব সরকার) একুশের প্রতিরোধ চেতনা মুছে দিয়েছেন, দিবসটিকে সরকারি দিবসে পরিণত করেছেন এ কথা বলা হাস্যকর নয় কি? উমর নিজেই লিখেছেন, তখন সরকারের পেছনে জনসমর্থন ছিল। তাহলে কোন্ দূর ভবিষ্যতে সরকার জনপ্রিয়তা হারাবে এই কল্পিত ভয়ে সরকার আগে থেকেই একুশে ফেব্রুয়ারির চরিত্র বদলাবে, কৌশলে প্রভাতফেরি বন্ধ করে দিতে চাইবে, এটা কি খুবই কষ্ট-কল্পনা নয়?

আর দেশ স্বাধীন হওয়ার পর একুশে ফেব্রুয়ারি তো জাতীয় দিবস হবেই, এবং এ দিবসে সরকারি অনুষ্ঠান হবেই। স্বাধীনতা অর্জনে যে দিবসটি সবচেয়ে বেশি অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে, স্বাধীনতার পর সে দিবসটি অবশ্যই সরকারি স্বীকৃতি পাবে, জাতীয় দিবস হিসেবে পালিত হবে। রাষ্ট্রের প্রধানদের সেই অনুষ্ঠানে আসতেই হবে এবং তাদের পাহারা দেয়ার জন্যও পুলিশ আসবে। কোন্ দেশে এর ব্যত্যয় হয়েছে? বাংলাদেশ এর ব্যত্যয় হলে জনগণই সরকারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াত।

ফ্রান্সে বাস্তিল দুর্গ ভাঙার দিবসটি একটি বিপ্লব দিবস। বিপ্লব সফল হওয়ার পর অর্থাৎ দেশে রাজতন্ত্রের পতন ও প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পর বাস্তিল দিবসের সেই আগের মিলিট্যান্সি আর নেই। এটি এখন সরকারিভাবে পালিত একটি জাতীয় দিবস। জনগণ তাতে যোগ দেয়। আগের মতো বন্দুক-রাইফেল নিয়ে মিছিল করে না, উত্তেজক স্লোগান দেয় না। ভারতে বিয়াল্লিশের আগস্ট-আন্দোলনের স্মরণ দিবস এখন সরকারি বেসরকারি দু’ভাবেই পালিত হয়। স্বাধীনতার আগে এ দিবস ছিল প্রতিরোধ দিবস। ব্রিটিশরাজবিরোধী স্লোগানে রাজপথ মুখরিত হতো। এখন তা হয় না। এখন মিছিল-শোভাযাত্রা নেই। অনুষ্ঠান আছে। তাতে শান্ত সমাহিতভাবে বিয়াল্লিশের শহীদদের স্মরণ করা হয়।

বাংলাদেশেও তা-ই হয়েছে। বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে। বাংলা ভাষা সব নির্যাতনমুক্ত। সুতরাং মিছিল-মিটিংয়ে গর্জন করা হবে কিসের দাবিতে? দেশের সরকার যদি অত্যাচারী হয়, নির্যাতন চালায় তার বিরুদ্ধে নতুন আন্দোলন হবে, দাবিভিত্তিক সংগ্রাম চলবে। ভাষা আন্দোলনকে তাতে টেনে নামানো যাবে কীভাবে? একুশ এখন একটি স্মরণ দিবস (জবসবসনৎধহপব ফধু)। একাডেমিক আলোচনার দিবস। বাংলাকে জাতীয় জীবনের সর্বপর্যায়ে ব্যবহারযোগ্য করে তোলার উদ্যোগ গ্রহণের দিবস। এ কাজে সরকার ও জনগণের সর্বপ্রকার সহযোগিতার দরকার। একুশ সেই সহযোগিতার দিবস। সংঘর্ষের নয়।

এ কথা সত্য, স্বাধীনতার পর সকালের পরিবর্তে মধ্যরাত বারোটায় প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতিতে একুশের উদ্বোধন করা শুরু হয়। আন্তর্জাতিক সময়ের সঙ্গে সংহতি রক্ষার জন্যই (রাত বারোটায় নতুন দিন শুরু) এই ব্যবস্থা করা হয়েছিল। প্রভাতফেরি বন্ধ করার জন্য নয়। ইচ্ছা থাকলে প্রভাতফেরি মধ্যরাতেও করা যায়। লন্ডনে একুশের মধ্যরাতে আলতাব আলী পার্কে সবাই এসে ভাষা শহীদ মিনারে ফুল দেয়। তাতে কেউ আপত্তি তোলেনি।

একুশের অনুষ্ঠানে শুধু প্রধানমন্ত্রী বা রাষ্ট্রপতিকে পাহারা দেয়ার জন্য নয়, এমনিতেও শান্তিশৃংখলা রক্ষার জন্য, বিশেষ করে এই সন্ত্রাসের যুগে পুলিশের উপস্থিতি প্রয়োজন। উমর হয়তো ভুলে গেছেন, স্বাধীনতার পর সামরিক শাসনামলে একুশের পবিত্রতা নষ্ট করে শহীদ মিনারেও প্রচণ্ড হাতাহাতি, মারামারির অনুষ্ঠান শুরু হয়েছিল। প্রয়াত মিজানুর রহমান চৌধুরী শহীদ মিনারে মালা দিতে এসে নির্যাতিত হয়েছিলেন। নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করার কারণেই তা বন্ধ হয়েছে। এই নিরাপত্তা ব্যবস্থা না থাকলে বর্তমানের হিংস্র মৌলবাদীদের তাণ্ডবে একুশের মধ্যরাতের অনুষ্ঠান উদীচীর রমনা বটমূলের নববর্ষ অনুষ্ঠানের মতো মর্মান্তিক রক্তাক্ত ঘটনায় পরিণত হতো।

বর্তমানের একুশের অনুষ্ঠানে সর্বস্তরের জনগণের অংশগ্রহণ কি কমেছে, না বেড়েছে? এ বছরের একুশের অনুষ্ঠানও কী বলে? আমার তো মনে হয়, সন্ত্রাসকবলিত দেশে সাধারণ মানুষ স্বাভাবিক নিরাপত্তা ব্যবস্থায় একুশে উদযাপনে অনেক বেশি স্বচ্ছন্দবোধ করে। উমর আগের দিনের একুশে উদযাপন নিয়ে বিলাপ করেছেন। কিন্তু সময় কি এক জায়গায় এক অবস্থানে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে? পরিবর্তনই তো জগৎ-সংসারের স্বাভাবিক ধর্ম। সরকারি অনুষ্ঠানের পাশাপাশি অসংখ্য বেসরকারি অনুষ্ঠানে কি আগের মতো রাজনৈতিক বক্তৃতা দেয়া হয় না, গণসঙ্গীত গাওয়া হয় না? আরও বেশি গাওয়া হয়। যার বাৎসরিক পুনরাবৃত্তিতে এখন পরিবর্তন প্রয়োজন।

একজন সমাজবিজ্ঞানী হিসেবে বদরুদ্দীন উমর লিখতে পারতেন, আমরা একুশকে (কেবল সরকার নয়) অতি বেশি আনুষ্ঠানিকতায় বন্দি করে ফেলেছি। একুশের ভাষা আন্দোলন ক্রমশ তার তাৎপর্য হারাচ্ছে। আমরা ভাষাকে রেখে তার আন্দোলনকে নিয়ে বড় বেশি মাতামাতি করছি। ভাষাকে আমরা কেবল রাষ্ট্রভাষার স্বীকৃতি দিয়েছি। কিন্তু তাকে ব্যবহারিক ভাষা, সরকারি সব কাজকর্মের ভাষা করে তুলতে পারিনি। এ ব্যাপারে সরকারের ত্রুটি আছে, আমাদেরও গাফিলতি আছে। প্রতি বছর একুশে উদযাপনের সময় আমাদের এই ত্রুটি ও গাফিলতি সম্পর্কে সচেতন হওয়া আবশ্যক।

একুশ এখন বিপ্লব নয়, প্রতিরোধ নয়, একটি সংস্কার ও উন্নয়নের আন্দোলন। প্রতিক্রিয়াশীল মহল থেকেই এই ভাষার বিরুদ্ধে চক্রান্ত এখনও চালানো হচ্ছে। সে সম্পর্কে সচেতন থেকে এ ভাষাকে কী করে জনজীবনে প্রকৃত প্রতিষ্ঠা দেয়া যায়, আমাদের সেক্যুলার গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থার শক্তিশালী ভিত্তি করে তোলা যায় সেদিকেই আজ বাংলাদেশের সব মানুষের উদ্যোগ নিয়োজিত হওয়া দরকার। একুশ এখন সংগ্রাম নয়, একটি আন্দোলন। একটি ধারাবাহিক আন্দোলন। এ আন্দোলন সম্পর্কে অবাঞ্ছিত বিতর্ক সৃষ্টি করা আমাদের কারোই উচিত নয়।

লন্ডন, ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০১৭

Comments

comments

সম্পাদক : মোহাম্মদ আবদুল বাছির
প্রকাশক: মোহাম্মদ জহিরুল ইসলাম
ফোন : ‎০১৭১৩৪০৯০৯০
৩৪৫/১, দিলু রোড, নিউ ইস্কাটন, ঢাকা-১০০০
X
 
নিয়মিত খবর পড়তে আমাদের ফেসবুক পেজে লাইক দিয়ে যুক্ত থাকুন
X