শুক্রবার, ২৩শে ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ ইং, ১১ই ফাল্গুন, ১৪২৪ বঙ্গাব্দ, সকাল ৬:২৫
শিরোনাম
  • ঘৃণাকে বিজয়ী হতে দেয়া যাবে না, ট্রাম্পকে ইঙ্গিত করে জর্জ ক্লুনি
  • আমার একটাই চিন্তা দেশের মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন করা: প্রধানমন্ত্রী
  • ‘কেন্দ্রীয় সরকারের আগ্রাসী নীতির কারণে কাশ্মীরকে হারাতে হবে’
  • সাড়ে চারমাস পর মুখোমুখি, খাদিজাকে উদ্দেশ্য করে যা বলল বদরুল
  • খালেদার ‘সাজা’ বিরোধী নেতাকর্মীদের মনোবল ভাঙ্গার কৌশল!
  • বিএনপির কর্মসূচি ‘যথাসময়ে’ জানানো হবে: রিজভী
  • দলের জন্য বোলিং করতেও রাজি মুশফিক
  • শিশু জিহাদের মৃত্যু: চার জনের ১০ বছর করে কারাদণ্ড
  • অবশেষে বাড়ি অবরুদ্ধ করে রাখা সেই দেয়াল ভেঙ্গে ফেলা হচ্ছে
  • সাক্ষ্য দিলেন খাদিজা, চাইলেন বদরুলের সর্বোচ্চ শাস্তি
  • বদরুলের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিতে আদালতে খাদিজা
  • আজ বগুড়ায় যেসব প্রকল্প উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী
  • রোহিঙ্গা স্থানান্তরের সরকারি পরিকল্পনার সঙ্গে দ্বিমত মানবাধিকার কমিশনের
  • মহেশখালীতে ইয়াবা ব্যবসায়ীদের সঙ্গে পুলিশের ‘বন্দুকযুদ্ধ’
  • হোয়াইট হাউসে কাজ করার দীর্ঘ অভিজ্ঞতার কথা জানালেন এই বাংলাদেশি সাংবাদিক
Saturday, November 12, 2016 9:15 am
A- A A+ Print

দখল উচ্ছেদ আবার দখল

u

দখল, উচ্ছেদ, আবার দখল। আবাসিক এলাকায় অননুমোদিত বাণিজ্যিক স্থাপনাসহ বিভিন্ন অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) বিশেষ অভিযানও একই চক্রে ঘুরপাক খাচ্ছে। গত তিন মাসে রাজধানীর ধানমন্ডি, মিরপুর, গুলশান ও উত্তরায় উচ্ছেদ হওয়া শতাধিক প্রতিষ্ঠান আগের অবস্থায় ফিরিয়ে এনেছেন এর মালিকেরা। প্রতিষ্ঠানগুলোর মালিক ও ব্যবস্থাপকদের ভাষ্য, এগুলো পুনরায় চালু করতে তাঁরা কেউ কেউ রাজউককে ‘ম্যানেজ’ করেছেন, আবার কেউ কেউ প্রতিকার পেতে উচ্চ আদালত থেকে স্থগিতাদেশ এনেছেন। তাই ফলাফলের বিচারে রাজউকের নিয়মিত উচ্ছেদ অভিযানের সঙ্গে এই বিশেষ অভিযানের দৃশ্যমান কোনো পার্থক্য দেখা যাচ্ছে না। নগর-পরিকল্পনাবিদ ও রাজউক কর্মকর্তারা বলছেন, উচ্ছেদ-পরবর্তী পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে সংশ্লিষ্ট এলাকার দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ও ইমারত পরিদর্শকদের তৎপরতার ঘাটতি রয়েছে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে বিভিন্নভাবে তাদের ‘ম্যানেজ’ করার অভিযোগও রয়েছে। এ অবস্থায় উচ্ছেদ কার্যক্রম পরিচালনা ও উচ্ছেদ-পরবর্তী পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে স্থানীয় সরকার তথা সিটি করপোরেশনকে সম্পৃক্ত করার পরামর্শ দিয়েছেন নগর-পরিকল্পনাবিদ ও বিশেষজ্ঞরা। এ বিষয়টি আমলে নেওয়ার পাশাপাশি অভিযানে জরিমানার পরিমাণ বাড়ানোর পরিকল্পনা করছে রাজউক। তিন মাসে ৩১৫ উচ্ছেদ: গত ১ জুলাই গুলশানের হলি আর্টিজান বেকারিতে সন্ত্রাসবাদী হামলার পর আইনশৃঙ্খলাবিষয়ক মন্ত্রিসভা কমিটি আবাসিক এলাকার অননুমোদিত বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধের সিদ্ধান্ত নেয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে হালনাগাদ জরিপের মাধ্যমে গুলশান এলাকায় ৫৫২টি, ধানমন্ডিতে ২৫০ ও উত্তরায় চার শতাধিক প্রতিষ্ঠান চিহ্নিত করে রাজউক। মিরপুরে এ ধরনের প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ৭০-এর কাছাকাছি বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা। রাজউকের হিসাবে ২৫ জুলাই থেকে শুরু হওয়া এ বিশেষ অভিযানে এখন পর্যন্ত ধানমন্ডি, গুলশান, উত্তরা, মিরপুর, লালমাটিয়া, বারিধারা ও বনানীতে অবৈধভাবে নির্মিত ১৫২টি র্যাম্প (গাড়ি ওঠানামার পথ), আবাসিক ভবনে অননুমোদিত ৬৩টি বাণিজ্যিক স্থাপনা ও গাড়ি পার্কিংয়ের নির্ধারিত জায়গায় অবৈধভাবে গড়ে তোলা ১০০টি স্থাপনা উচ্ছেদ করা হয়েছে। এ সময় জরিমানা আদায় করা হয়েছে ৪৫ লাখ টাকা। এর আগে ১৮ জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ের নিয়মিত অভিযানে কেবল র্যাম্প ও গাড়ি পার্কিংয়ের জায়গায় অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করা হয়। এ সময়ে কলাবাগান, পান্থপথ, গ্রিনরোডসহ উল্লিখিত জায়গাগুলোতে মোট ৩৩৩টি র্যাম্প ও ২৩৬টি গাড়ি পার্কিংয়ের জায়গা মুক্ত করা হয়। এ সময় আদায়কৃত জরিমানার পরিমাণ ৪ কোটি ৫ লাখ টাকা। উচ্ছেদ হতে না হতেই দখল ২৭ সেপ্টেম্বর রাজউকের অভিযানে রোকেয়া সরণির তালতলা বাসস্ট্যান্ড এলাকায় ২৪৩ নম্বর ভবনের নিচতলায় গাড়ি পার্কিংয়ের জায়গায় গড়ে ওঠা একটি বেকারি প্রতিষ্ঠানের বিক্রয়কেন্দ্র উচ্ছেদ করা হয়। একইভাবে পাশের ২৪৩/১ নম্বর ভবনের নিচতলায় গাড়ি পার্কিংয়ের জায়গায় মোটরগাড়ির যন্ত্রাংশ বিক্রির চারটি দোকান উচ্ছেদ করেন ভ্রাম্যমাণ আদালত। সেই সঙ্গে ভবন মালিক আবদুল হামিদকে এক লাখ টাকা জরিমানা করা হয়। একই দিন ভ্রাম্যমাণ আদালত পাশাপাশি গড়ে ওঠা তিনটি আসবাবের দোকান পরিদর্শন করেন। দেখা যায়, যেসব ভবনে দোকানগুলোর কার্যক্রম চলছে, রাজউক থেকে তার কোনো অনুমোদনই নেওয়া হয়নি। এ অবস্থায় ভ্রাম্যমাণ আদালত ভবন ও দোকানমালিকদের এক লাখ টাকা করে জরিমানা করেন। সেই সঙ্গে এক সপ্তাহের মধ্যে দোকানের মালামাল সরিয়ে নিয়ে ভবনে সব ধরনের বাণিজ্যিক কার্যক্রম বন্ধের নির্দেশ দেওয়া হয়। ১ নভেম্বর ২০১৬,আবার আগের অবস্থায় ফিরে গেছে রাজউকের ভেঙে দেওয়া স্থাপনা l ছবি: প্রথম আলো২০ দিন পর ১৭ অক্টোবর পরিদর্শনে গিয়ে দেখা যায়, উচ্ছেদ হওয়া মিষ্টি ও মোটরগাড়ির যন্ত্রাংশ বিক্রির চারটি দোকানই বহাল আছে। অভিযানকালে দোকানগুলোর সামনের অংশ বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল। সেগুলো আবার মেরামত করা হয়েছে। রহমান মটরস নামে একটি দোকানের ব্যবস্থাপক শামসুল হক প্রথম আলোকে বলেন, ‘মালিক কয় আপনারা ব্যবসা করেন। যা হয় আমি দেখব।’ অন্য দোকানগুলোর কর্মচারীরা জানালেন, উচ্ছেদের তিন দিনের মধ্যে তাঁরা আবার এখানে কার্যক্রম শুরু করেছেন। এ সময় দেখা গেল, নোটিশ উপেক্ষা করে একই এলাকায় পাশাপাশি গড়ে ওঠা তিনটি আসবাবের দোকানেও কার্যক্রম চলছে। জৈনপুর ফার্নিশার্সের ব্যবস্থাপক আবু তাহের বলেন, ‘আমাদের কাছ থেকে মুচলেকা নিয়েছিল। কিন্তু আল্লাহর রহমতে সব ম্যানেজ হয়ে গেছে। রাজউকের লোক আর আসে নাই।’ এম এস ফার্নিশার্সের ব্যবস্থাপক বাবুল কিছুটা ক্ষোভের সঙ্গে বললেন, ‘একটা-দুইটা ছাড়া রোকেয়া সরণির বেশির ভাগ ফার্নিচারের দোকানের কোনো অনুমোদন নাই। তাইলে আমাদের এখানে আসছেন কেন?’ এই দুই ব্যবস্থাপকেরই ভাষ্য, অভিযান শেষ হওয়ার পর তাঁদের মালিকেরা রাজউকে গিয়ে সবকিছু ঠিক করে নিয়েছেন। মালিকদের সঙ্গে কথা বলার জন্য তাঁদের মুঠোফোনের নম্বর চাইলে দুজনই বলেন, মালিক বিদেশে আছেন। কথা বলা সম্ভব নয়। এ বিষয়ে জানতে চাইলে রাজউকের সদস্য (উন্নয়ন নিয়ন্ত্রণ) আসমাউল হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, ‘ভ্রাম্যমাণ আদালতের নোটিশের পর সবকিছু কীভাবে ঠিক হলো বুঝতে পারছি না।’ এদিকে ৩১ জুলাইয়ের অভিযানে ধানমন্ডির ১২/এ নম্বর সড়কে ধাবা নামের একটি রেস্তোরাঁর সামনের অংশ পুরোপুরি গুঁড়িয়ে দেয় রাজউক। দোকানের গ্যাস-বিদ্যুতের সংযোগও বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়। সম্প্রতি সেখানে গিয়ে দেখা যায়, ভেঙে দেওয়া দেয়াল আবার তোলা হয়েছে। চড়ানো হয়েছে নতুন রং। রেস্তোরাঁর ব্যবস্থাপক হারুন অর রশীদ বলেন, ‘আদালত থেকে আমরা ছয় মাসের স্থগিতাদেশ নিয়ে এসেছি। রেস্টুরেন্টের জন্য নতুন জায়গা দেখা চলছে।’ একইভাবে ধানমন্ডির ৬ নম্বর সড়কের ৩০ নম্বর প্লটে পুরোনো দোতলা একটি আবাসিক ভবনের সামনের অংশে গড়ে উঠেছিল একটি রেস্তোরাঁ, দুটি মুদি দোকান ও একটি সেলুন। ২৭ জুলাইয়ের অভিযানে এগুলো ভেঙে দেওয়া হলেও আবার গড়ে উঠেছে। একই অবস্থা উত্তরা শায়েস্তা খাঁ অ্যাভিনিউয়ের ২৭ নম্বর প্লটে অবস্থিত হোটেল নগর ভ্যালি, ৭ নম্বর সড়কের হোটেল ব্লুবেল ইন্টারন্যাশনাল, ১৮ নম্বর সড়কের হোটেল অ্যাঙ্করেজ দ্য রেসিডেন্স ও ১১ নম্বর সড়কের শেষ মাথায় অবস্থিত হোটেল কমফোর্ট ইনের। ২৫ জুলাই থেকে পরবর্তী কয়েকটি অভিযানে এসব হোটেল বন্ধ করে দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এগুলোর গ্যাস-বিদ্যুতের সংযোগও বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়। রাজউক কর্মকর্তারা বলছেন, উচ্চ আদালত থেকে স্থগিতাদেশ এনেই এই হোটেলগুলো আবার তাদের কার্যক্রম শুরু করেছে। ‘কিছুই হবে না’ উত্তরার হোটেলগুলোর মতোই আদালতের স্থগিতাদেশ নিয়ে গুলশান-১-এর ১ নম্বর সড়কের ৪/এ নম্বর ভবনের নিচতলায় ইস্টার্ন ট্যুরস অ্যান্ড ট্রাভেলস নামের একটি প্রতিষ্ঠান চালাচ্ছেন শরীফ শরাফ উদ্দীন। ২৭ জুলাইয়ের অভিযানে এই ব্যক্তির প্রতিষ্ঠানসহ একই ভবনের আরও তিনটি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান উচ্ছেদ করে রাজউক। ছয় মাসের স্থগিতাদেশ শেষ হওয়ার পর প্রতিষ্ঠানটি এখান থেকে সরিয়ে নেবে কি না, জানতে চাইলে শরাফ উদ্দীন বলেন, ‘সেই প্রস্তুতি কিছুটা আছে। কিন্তু আমার বিশ্বাস, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সবকিছু ঠিক হয়ে যাবে। সরকার এটাতে সফল হবে না। এর আগেও অনেকবার এমন ঘটেছে।’ শরাফ উদ্দীনের মতোই এমন বিশ্বাস ধরে রেখেছেন পান্থপথ, গ্রিনরোড ও কলাবাগানে বিভিন্ন সময়ে উচ্ছেদ হওয়া অন্তত ১০টি প্রতিষ্ঠানের মালিক ও কর্মচারীরা। সিটি করপোরেশনকে অন্তর্ভুক্ত করার পরামর্শ রাজউকের উচ্ছেদ কার্যক্রমকে ফলপ্রসূ করতে ও উচ্ছেদ-পরবর্তী পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে সিটি করপোরেশনকে যুক্ত করার পরামর্শ দিয়েছেন বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের যুগ্ম সম্পাদক স্থপতি ইকবাল হাবিব। তিনি বলেন, এই উচ্ছেদ কার্যক্রমের সুফল পেতে হলে এর সঙ্গে ওয়ার্ড কাউন্সিলরদের যুক্ত করার কোনো বিকল্প নেই। কারণ, তাঁরা নির্বাচিত প্রতিনিধি। উচ্ছেদ হওয়া প্রতিষ্ঠান যেন আবার দখল না হয় সেটা তাঁরা এলাকাবাসীকে সঙ্গে নিয়ে পর্যবেক্ষণ করবেন। এতে করে কাউকে অবৈধভাবে সুবিধা দেওয়ার ক্ষেত্রে রাজউকের অথরাইজড কর্মকর্তা ও ইমারত পরিদর্শকেরাও সাবধান হবেন। বিষয়টির সঙ্গে সহমত পোষণ করেন নগর-পরিকল্পনাবিদ অধ্যাপক নজরুল ইসলাম। তাঁর ভাষ্য, সবার আগে প্রয়োজন মানুষের সচেতনতা ও সুশাসন নিশ্চিত করা। এই শহরের ভালো-মন্দের বিষয়টি যদি নগরবাসী নিজেরা উপলব্ধি না করেন, তাহলে কোনো উদ্যোগই কাজে আসবে না। রাজউকের বক্তব্য উচ্ছেদ কার্যক্রমের বিদ্যমান পরিস্থিতি সম্পর্কে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে রাজউকের সদস্য (উন্নয়ন নিয়ন্ত্রণ) আসমাউল হোসেন বলেন, ‘আমরা জানি যে উচ্ছেদ করা প্রতিষ্ঠানের অনেকগুলোই আবার আগের অবস্থায় ফিরে গেছে। এটাও জানি যে বারবার উচ্ছেদ করা ছাড়া গতি নেই। এটা করতে করতেই হয়তো মানুষ সচেতন হবে।’ তবে উচ্ছেদ করা প্রতিষ্ঠান পুনরায় দখলে নিরুৎসাহিত করার জন্য ন্যূনতম জরিমানার পরিমাণ বাড়ানোর একটি প্রক্রিয়া চলমান আছে বলে জানান তিনি। এখন ন্যূনতম জরিমানার পরিমাণ ৫০ হাজার টাকা।

Comments

Comments!

 দখল উচ্ছেদ আবার দখলAmarbangladeshonlineAmarbangladeshonline | Amarbangladeshonline

দখল উচ্ছেদ আবার দখল

Saturday, November 12, 2016 9:15 am
u

দখল, উচ্ছেদ, আবার দখল। আবাসিক এলাকায় অননুমোদিত বাণিজ্যিক স্থাপনাসহ বিভিন্ন অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) বিশেষ অভিযানও একই চক্রে ঘুরপাক খাচ্ছে। গত তিন মাসে রাজধানীর ধানমন্ডি, মিরপুর, গুলশান ও উত্তরায় উচ্ছেদ হওয়া শতাধিক প্রতিষ্ঠান আগের অবস্থায় ফিরিয়ে এনেছেন এর মালিকেরা।
প্রতিষ্ঠানগুলোর মালিক ও ব্যবস্থাপকদের ভাষ্য, এগুলো পুনরায় চালু করতে তাঁরা কেউ কেউ রাজউককে ‘ম্যানেজ’ করেছেন, আবার কেউ কেউ প্রতিকার পেতে উচ্চ আদালত থেকে স্থগিতাদেশ এনেছেন। তাই ফলাফলের বিচারে রাজউকের নিয়মিত উচ্ছেদ অভিযানের সঙ্গে এই বিশেষ অভিযানের দৃশ্যমান কোনো পার্থক্য দেখা যাচ্ছে না।
নগর-পরিকল্পনাবিদ ও রাজউক কর্মকর্তারা বলছেন, উচ্ছেদ-পরবর্তী পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে সংশ্লিষ্ট এলাকার দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ও ইমারত পরিদর্শকদের তৎপরতার ঘাটতি রয়েছে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে বিভিন্নভাবে তাদের ‘ম্যানেজ’ করার অভিযোগও রয়েছে।
এ অবস্থায় উচ্ছেদ কার্যক্রম পরিচালনা ও উচ্ছেদ-পরবর্তী পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে স্থানীয় সরকার তথা সিটি করপোরেশনকে সম্পৃক্ত করার পরামর্শ দিয়েছেন নগর-পরিকল্পনাবিদ ও বিশেষজ্ঞরা। এ বিষয়টি আমলে নেওয়ার পাশাপাশি অভিযানে জরিমানার পরিমাণ বাড়ানোর পরিকল্পনা করছে রাজউক।
তিন মাসে ৩১৫ উচ্ছেদ: গত ১ জুলাই গুলশানের হলি আর্টিজান বেকারিতে সন্ত্রাসবাদী হামলার পর আইনশৃঙ্খলাবিষয়ক মন্ত্রিসভা কমিটি আবাসিক এলাকার অননুমোদিত বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধের সিদ্ধান্ত নেয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে হালনাগাদ জরিপের মাধ্যমে গুলশান এলাকায় ৫৫২টি, ধানমন্ডিতে ২৫০ ও উত্তরায় চার শতাধিক প্রতিষ্ঠান চিহ্নিত করে রাজউক। মিরপুরে এ ধরনের প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ৭০-এর কাছাকাছি বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা।
রাজউকের হিসাবে ২৫ জুলাই থেকে শুরু হওয়া এ বিশেষ অভিযানে এখন পর্যন্ত ধানমন্ডি, গুলশান, উত্তরা, মিরপুর, লালমাটিয়া, বারিধারা ও বনানীতে অবৈধভাবে নির্মিত ১৫২টি র্যাম্প (গাড়ি ওঠানামার পথ), আবাসিক ভবনে অননুমোদিত ৬৩টি বাণিজ্যিক স্থাপনা ও গাড়ি পার্কিংয়ের নির্ধারিত জায়গায় অবৈধভাবে গড়ে তোলা ১০০টি স্থাপনা উচ্ছেদ করা হয়েছে। এ সময় জরিমানা আদায় করা হয়েছে ৪৫ লাখ টাকা।
এর আগে ১৮ জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ের নিয়মিত অভিযানে কেবল র্যাম্প ও গাড়ি পার্কিংয়ের জায়গায় অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করা হয়। এ সময়ে কলাবাগান, পান্থপথ, গ্রিনরোডসহ উল্লিখিত জায়গাগুলোতে মোট ৩৩৩টি র্যাম্প ও ২৩৬টি গাড়ি পার্কিংয়ের জায়গা মুক্ত করা হয়। এ সময় আদায়কৃত জরিমানার পরিমাণ ৪ কোটি ৫ লাখ টাকা।
উচ্ছেদ হতে না হতেই দখল
২৭ সেপ্টেম্বর রাজউকের অভিযানে রোকেয়া সরণির তালতলা বাসস্ট্যান্ড এলাকায় ২৪৩ নম্বর ভবনের নিচতলায় গাড়ি পার্কিংয়ের জায়গায় গড়ে ওঠা একটি বেকারি প্রতিষ্ঠানের বিক্রয়কেন্দ্র উচ্ছেদ করা হয়। একইভাবে পাশের ২৪৩/১ নম্বর ভবনের নিচতলায় গাড়ি পার্কিংয়ের জায়গায় মোটরগাড়ির যন্ত্রাংশ বিক্রির চারটি দোকান উচ্ছেদ করেন ভ্রাম্যমাণ আদালত। সেই সঙ্গে ভবন মালিক আবদুল হামিদকে এক লাখ টাকা জরিমানা করা হয়।
একই দিন ভ্রাম্যমাণ আদালত পাশাপাশি গড়ে ওঠা তিনটি আসবাবের দোকান পরিদর্শন করেন। দেখা যায়, যেসব ভবনে দোকানগুলোর কার্যক্রম চলছে, রাজউক থেকে তার কোনো অনুমোদনই নেওয়া হয়নি। এ অবস্থায় ভ্রাম্যমাণ আদালত ভবন ও দোকানমালিকদের এক লাখ টাকা করে জরিমানা করেন। সেই সঙ্গে এক সপ্তাহের মধ্যে দোকানের মালামাল সরিয়ে নিয়ে ভবনে সব ধরনের বাণিজ্যিক কার্যক্রম বন্ধের নির্দেশ দেওয়া হয়।
১ নভেম্বর ২০১৬,আবার আগের অবস্থায় ফিরে গেছে রাজউকের ভেঙে দেওয়া স্থাপনা l ছবি: প্রথম আলো২০ দিন পর ১৭ অক্টোবর পরিদর্শনে গিয়ে দেখা যায়, উচ্ছেদ হওয়া মিষ্টি ও মোটরগাড়ির যন্ত্রাংশ বিক্রির চারটি দোকানই বহাল আছে। অভিযানকালে দোকানগুলোর সামনের অংশ বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল। সেগুলো আবার মেরামত করা হয়েছে। রহমান মটরস নামে একটি দোকানের ব্যবস্থাপক শামসুল হক প্রথম আলোকে বলেন, ‘মালিক কয় আপনারা ব্যবসা করেন। যা হয় আমি দেখব।’ অন্য দোকানগুলোর কর্মচারীরা জানালেন, উচ্ছেদের তিন দিনের মধ্যে তাঁরা আবার এখানে কার্যক্রম শুরু করেছেন।
এ সময় দেখা গেল, নোটিশ উপেক্ষা করে একই এলাকায় পাশাপাশি গড়ে ওঠা তিনটি আসবাবের দোকানেও কার্যক্রম চলছে। জৈনপুর ফার্নিশার্সের ব্যবস্থাপক আবু তাহের বলেন, ‘আমাদের কাছ থেকে মুচলেকা নিয়েছিল। কিন্তু আল্লাহর রহমতে সব ম্যানেজ হয়ে গেছে। রাজউকের লোক আর আসে নাই।’
এম এস ফার্নিশার্সের ব্যবস্থাপক বাবুল কিছুটা ক্ষোভের সঙ্গে বললেন, ‘একটা-দুইটা ছাড়া রোকেয়া সরণির বেশির ভাগ ফার্নিচারের দোকানের কোনো অনুমোদন নাই। তাইলে আমাদের এখানে আসছেন কেন?’
এই দুই ব্যবস্থাপকেরই ভাষ্য, অভিযান শেষ হওয়ার পর তাঁদের মালিকেরা রাজউকে গিয়ে সবকিছু ঠিক করে নিয়েছেন। মালিকদের সঙ্গে কথা বলার জন্য তাঁদের মুঠোফোনের নম্বর চাইলে দুজনই বলেন, মালিক বিদেশে আছেন। কথা বলা সম্ভব নয়।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে রাজউকের সদস্য (উন্নয়ন নিয়ন্ত্রণ) আসমাউল হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, ‘ভ্রাম্যমাণ আদালতের নোটিশের পর সবকিছু কীভাবে ঠিক হলো বুঝতে পারছি না।’
এদিকে ৩১ জুলাইয়ের অভিযানে ধানমন্ডির ১২/এ নম্বর সড়কে ধাবা নামের একটি রেস্তোরাঁর সামনের অংশ পুরোপুরি গুঁড়িয়ে দেয় রাজউক। দোকানের গ্যাস-বিদ্যুতের সংযোগও বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়। সম্প্রতি সেখানে গিয়ে দেখা যায়, ভেঙে দেওয়া দেয়াল আবার তোলা হয়েছে। চড়ানো হয়েছে নতুন রং। রেস্তোরাঁর ব্যবস্থাপক হারুন অর রশীদ বলেন, ‘আদালত থেকে আমরা ছয় মাসের স্থগিতাদেশ নিয়ে এসেছি। রেস্টুরেন্টের জন্য নতুন জায়গা দেখা চলছে।’
একইভাবে ধানমন্ডির ৬ নম্বর সড়কের ৩০ নম্বর প্লটে পুরোনো দোতলা একটি আবাসিক ভবনের সামনের অংশে গড়ে উঠেছিল একটি রেস্তোরাঁ, দুটি মুদি দোকান ও একটি সেলুন। ২৭ জুলাইয়ের অভিযানে এগুলো ভেঙে দেওয়া হলেও আবার গড়ে উঠেছে।
একই অবস্থা উত্তরা শায়েস্তা খাঁ অ্যাভিনিউয়ের ২৭ নম্বর প্লটে অবস্থিত হোটেল নগর ভ্যালি, ৭ নম্বর সড়কের হোটেল ব্লুবেল ইন্টারন্যাশনাল, ১৮ নম্বর সড়কের হোটেল অ্যাঙ্করেজ দ্য রেসিডেন্স ও ১১ নম্বর সড়কের শেষ মাথায় অবস্থিত হোটেল কমফোর্ট ইনের। ২৫ জুলাই থেকে পরবর্তী কয়েকটি অভিযানে এসব হোটেল বন্ধ করে দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এগুলোর গ্যাস-বিদ্যুতের সংযোগও বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়। রাজউক কর্মকর্তারা বলছেন, উচ্চ আদালত থেকে স্থগিতাদেশ এনেই এই হোটেলগুলো আবার তাদের কার্যক্রম শুরু করেছে।
‘কিছুই হবে না’
উত্তরার হোটেলগুলোর মতোই আদালতের স্থগিতাদেশ নিয়ে গুলশান-১-এর ১ নম্বর সড়কের ৪/এ নম্বর ভবনের নিচতলায় ইস্টার্ন ট্যুরস অ্যান্ড ট্রাভেলস নামের একটি প্রতিষ্ঠান চালাচ্ছেন শরীফ শরাফ উদ্দীন। ২৭ জুলাইয়ের অভিযানে এই ব্যক্তির প্রতিষ্ঠানসহ একই ভবনের আরও তিনটি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান উচ্ছেদ করে রাজউক। ছয় মাসের স্থগিতাদেশ শেষ হওয়ার পর প্রতিষ্ঠানটি এখান থেকে সরিয়ে নেবে কি না, জানতে চাইলে শরাফ উদ্দীন বলেন, ‘সেই প্রস্তুতি কিছুটা আছে। কিন্তু আমার বিশ্বাস, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সবকিছু ঠিক হয়ে যাবে। সরকার এটাতে সফল হবে না। এর আগেও অনেকবার এমন ঘটেছে।’
শরাফ উদ্দীনের মতোই এমন বিশ্বাস ধরে রেখেছেন পান্থপথ, গ্রিনরোড ও কলাবাগানে বিভিন্ন সময়ে উচ্ছেদ হওয়া অন্তত ১০টি প্রতিষ্ঠানের মালিক ও কর্মচারীরা।
সিটি করপোরেশনকে অন্তর্ভুক্ত করার পরামর্শ
রাজউকের উচ্ছেদ কার্যক্রমকে ফলপ্রসূ করতে ও উচ্ছেদ-পরবর্তী পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে সিটি করপোরেশনকে যুক্ত করার পরামর্শ দিয়েছেন বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের যুগ্ম সম্পাদক স্থপতি ইকবাল হাবিব। তিনি বলেন, এই উচ্ছেদ কার্যক্রমের সুফল পেতে হলে এর সঙ্গে ওয়ার্ড কাউন্সিলরদের যুক্ত করার কোনো বিকল্প নেই। কারণ, তাঁরা নির্বাচিত প্রতিনিধি। উচ্ছেদ হওয়া প্রতিষ্ঠান যেন আবার দখল না হয় সেটা তাঁরা এলাকাবাসীকে সঙ্গে নিয়ে পর্যবেক্ষণ করবেন। এতে করে কাউকে অবৈধভাবে সুবিধা দেওয়ার ক্ষেত্রে রাজউকের অথরাইজড কর্মকর্তা ও ইমারত পরিদর্শকেরাও সাবধান হবেন।
বিষয়টির সঙ্গে সহমত পোষণ করেন নগর-পরিকল্পনাবিদ অধ্যাপক নজরুল ইসলাম। তাঁর ভাষ্য, সবার আগে প্রয়োজন মানুষের সচেতনতা ও সুশাসন নিশ্চিত করা। এই শহরের ভালো-মন্দের বিষয়টি যদি নগরবাসী নিজেরা উপলব্ধি না করেন, তাহলে কোনো উদ্যোগই কাজে আসবে না।
রাজউকের বক্তব্য
উচ্ছেদ কার্যক্রমের বিদ্যমান পরিস্থিতি সম্পর্কে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে রাজউকের সদস্য (উন্নয়ন নিয়ন্ত্রণ) আসমাউল হোসেন বলেন, ‘আমরা জানি যে উচ্ছেদ করা প্রতিষ্ঠানের অনেকগুলোই আবার আগের অবস্থায় ফিরে গেছে। এটাও জানি যে বারবার উচ্ছেদ করা ছাড়া গতি নেই। এটা করতে করতেই হয়তো মানুষ সচেতন হবে।’ তবে উচ্ছেদ করা প্রতিষ্ঠান পুনরায় দখলে নিরুৎসাহিত করার জন্য ন্যূনতম জরিমানার পরিমাণ বাড়ানোর একটি প্রক্রিয়া চলমান আছে বলে জানান তিনি। এখন ন্যূনতম জরিমানার পরিমাণ ৫০ হাজার টাকা।

Comments

comments

সম্পাদক : মোহাম্মদ আবদুল বাছির
প্রকাশক: মোহাম্মদ জহিরুল ইসলাম
ফোন : ‎০১৭১৩৪০৯০৯০
৩৪৫/১, দিলু রোড, নিউ ইস্কাটন, ঢাকা-১০০০
X
 
নিয়মিত খবর পড়তে আমাদের ফেসবুক পেজে লাইক দিয়ে যুক্ত থাকুন
X