বুধবার, ২১শে ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ ইং, ৯ই ফাল্গুন, ১৪২৪ বঙ্গাব্দ, বিকাল ৩:৩৯
শিরোনাম
  • ঘৃণাকে বিজয়ী হতে দেয়া যাবে না, ট্রাম্পকে ইঙ্গিত করে জর্জ ক্লুনি
  • আমার একটাই চিন্তা দেশের মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন করা: প্রধানমন্ত্রী
  • ‘কেন্দ্রীয় সরকারের আগ্রাসী নীতির কারণে কাশ্মীরকে হারাতে হবে’
  • সাড়ে চারমাস পর মুখোমুখি, খাদিজাকে উদ্দেশ্য করে যা বলল বদরুল
  • খালেদার ‘সাজা’ বিরোধী নেতাকর্মীদের মনোবল ভাঙ্গার কৌশল!
  • বিএনপির কর্মসূচি ‘যথাসময়ে’ জানানো হবে: রিজভী
  • দলের জন্য বোলিং করতেও রাজি মুশফিক
  • শিশু জিহাদের মৃত্যু: চার জনের ১০ বছর করে কারাদণ্ড
  • অবশেষে বাড়ি অবরুদ্ধ করে রাখা সেই দেয়াল ভেঙ্গে ফেলা হচ্ছে
  • সাক্ষ্য দিলেন খাদিজা, চাইলেন বদরুলের সর্বোচ্চ শাস্তি
  • বদরুলের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিতে আদালতে খাদিজা
  • আজ বগুড়ায় যেসব প্রকল্প উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী
  • রোহিঙ্গা স্থানান্তরের সরকারি পরিকল্পনার সঙ্গে দ্বিমত মানবাধিকার কমিশনের
  • মহেশখালীতে ইয়াবা ব্যবসায়ীদের সঙ্গে পুলিশের ‘বন্দুকযুদ্ধ’
  • হোয়াইট হাউসে কাজ করার দীর্ঘ অভিজ্ঞতার কথা জানালেন এই বাংলাদেশি সাংবাদিক
Monday, November 7, 2016 4:30 pm
A- A A+ Print

দেশই আমার সবকিছু

%e0%a7%ac

চিকিত্সক বা প্রকৌশলী হতে হবে কিংবা পড়াশোনা করে অনেক বড় হতে হবে—খুব ছোটবেলায় এসব ভাবনা আসলে মোটেও কাজ করেনি। ক্রিকেট খেলব, খেলোয়াড় হব—এমন কোনো স্বপ্নও আমার ছিল না। আমার মনে হয়, খুব ছোটবেলায় এসব কেউ ভাবেও না। তবে একটা জিনিসই বুঝতাম, সেটি হচ্ছে ক্রিকেট। শৈশবে অবশ্য বুঝে না–বুঝেই ক্রিকেট খেলেছি। বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে অনুভব করেছি, ক্রিকেটের প্রতি আমার ভালোবাসা ক্রমেই বাড়ছে। যেখানেই যেতাম, ক্রিকেটেই মেতে থাকতাম। ক্রিকেটে এতটাই ঝুঁকে গেলাম যে পড়ালেখায় খুব একটা মনোযোগ দিতে পারিনি। সবাই জানে, আমি খুলনা থেকে উঠে এসেছি। আমার কিন্তু আরও একটা ঠিকানা আছে। আমার জন্ম বরিশালের বাকেরগঞ্জের আউলিয়াপুর গ্রামে। ওটাই বাপ-দাদার ভিটা। শৈশবের সাত-আট বছর ওখানেই কাটিয়েছি। আব্বু চাকরি নিয়ে আমাদের খুলনা শহরে নিয়ে আসেন ২০০৩ সালের দিকে। তারপর থেকে অবশ্য প্রতিবছরেই এক-দুবার গ্রামের বাড়িতে যাওয়া হয়। খুলনার খালিশপুরে আমার বর্তমান ঠিকানা। তবে ক্রিকেটের শুরু বরিশালেই। চাচাদের সঙ্গেই প্রথম খেলতে শুরু করি। আমাদের গ্রামের সঙ্গে অন্য গ্রামের খেলার আয়োজন করা হতো। সেখানে আমি খেলতাম। টিভিতে দেখতাম, খেলোয়াড়েরা কাঠের বল দিয়ে খেলেন। সেটি দেখে আমরা নিজেরাই কাঠের বল তৈরি করতাম। বল হতো বাঁশের গোড়া দিয়ে। কলাগাছের খোলা দিয়ে প্যাড বানাতাম। আর তক্তা দিয়ে বানাতাম ব্যাট। খুব মজা হতো তখন। এরপর তো চলে এলাম খুলনা শহরে। ক্রিকেটের আনুষ্ঠানিক শুরুটা এখানেই। তখন মনে মনে লক্ষ্য স্থির করি, ক্রিকেট আমাকে খেলতেই হবে। গ্রামে শুধু মজার জন্য খেললেও ক্রিকেটার হওয়ার স্বপ্নটা দেখি খুলনা থেকে। খুলনায় আসার পর শুরুর দিকে বিএল কলেজ মাঠে টেপ টেনিসে খেলতে যেতাম। এলাকার বড় ভাই রাসেলকে দেখতাম ডিউজ বলে অনুশীলন করতে। একদিন তাঁর সঙ্গে অনুশীলন করে খুব মজা পেলাম। রাসেল ভাইকে বললাম, ‘তোমার কোচের সঙ্গে আমার পরিচয় করিয়ে দাও, আমি অনুশীলন করব।’ তিনি তাঁর কোচের সঙ্গে আমাকে পরিচয় করিয়ে দিলেন। এটা ১০-১১ বছর আগের কথা। তবে পরিবার থেকে মোটেও চাইত না আমি ক্রিকেট খেলি। অনুশীলনের জন্য পরিবার কোনো টাকাপয়সাও দিত না। তাহলে উপায়? কোচকে বিষয়টা খুলে বলি এবং তাঁর কাছে সহায়তা চাই। তিনি অবশ্য অভয় দেন। এরপর ধীরে ধীরে অনুশীলন শুরু করি। তখন আবার আরেক সমস্যা দেখা দেয়। বাসা থেকে চাপ বেড়ে যায়। বিশেষ করে আব্বু খুব বকাঝকা, মারধর করতেন। আব্বু তখন গাড়ি চালাতেন। সকালে যেতেন, আসতেন দুপুরে। খানিকটা বিশ্রাম নিয়ে তিনটা-চারটার দিকে আবার কাজে বেরিয়ে পড়তেন। আমি নিজেই একটা সময় ঠিক করে নিয়েছিলাম, আব্বু যখন চলে যাবেন তখন অনুশীলনে যাব। যেদিন আব্বু বাসা থেকে দেরি করে বের হতেন খুব সমস্যায় পড়তে হতো। অনেক সময় পালিয়েই চলে যেতাম। এটা ঠেকানোর জন্য আব্বু আরেক উপায় বের করলেন। বিছানায় এক পাশে আমাকে আরেক পাশে আমার ছোট বোন রুমানাকে নিয়ে তিনি মাঝে ঘুমাতেন। যাতে আমি পালিয়ে গেলে তিনি বুঝতে পারেন! অভিষেকেই তারুণ্যের দ্যুতি ছড়িয়েছেন ক্রিকেটার মেহেদী হাসান মিরাজ। ছবি: শামসুল হকআমিও খেয়াল রাখতাম, আব্বু কখন ঘুমান। তিনি চোখ বোজার সঙ্গে সঙ্গে আমাকে আর কে পায়! নিঃশব্দে বিছানা থেকে নেমে গেঞ্জি আর প্যান্ট নিয়ে এক দৌড়ে মাঠে। অনেক দিন এমনও হয়েছে, আব্বু রাতে বাসায় ফিরে আমাকে মারধর করেছেন। মার থেকে বাঁচার জন্য তখন আরেক বুদ্ধি আটতাম, আব্বু আসার আগেই ঘুমিয়ে পড়তাম। ঘুম না এলেও ভান ধরে থাকতাম। ক্রিকেটের আনুষ্ঠানিক যাত্রার শুরুতেই সহায়তা করেছেন স্থানীয় কোচ আল মাহমুদ ভাই। তিনি অনেক নির্দেশনা দিয়েছেন আমাকে, ভীষণ যত্ন নিয়েছেন। এই পর্যায়ে আসতে আসলে অনেকের অবদান আছে, যাঁদের সবার কথা ছোট্ট পরিসরে বলা কঠিন। তবুও কয়েকজনের কথা অবশ্যই বলতে হবে। বিভাগীয় পর্যায়ে যখন খেলি তখন সালাউদ্দিন স্যার আমাকে নানাভাবে সহায়তা করেছেন। স্যার মারা গেছেন বছর তিনেক আগে। তিনি আমাকে খুব পছন্দ করতেন। অনূর্ধ্ব-১৭ ও অনূর্ধ্ব-১৯ দলে থাকার সময় মিজানুর রহমান ও সোহেল ইসলাম স্যারের মূল্যবান নির্দেশনা অনেক কাজে দিয়েছে। আমার স্পিনার হওয়ার পেছনে সবচেয়ে বড় অবদান সোহেল স্যারের। স্পিনের যত কলাকৌশল তাঁর কাছ থেকেই শেখা। জীবনের গুরুত্বপূর্ণ এক বাঁকের কথা বলি। বয়স বেশি হওয়ায় ২০০৯ সালে অনূর্ধ্ব-১৪ দল থেকে বাদ পড়ে যাই। আমার বয়স তখনো ১৫-র নিচেই ছিল। কিন্তু কাগজে সেটি বেশি থাকায় সমস্যাটা তৈরি হয়। নিয়মটা হচ্ছে, দুই বছর অনূর্ধ্ব-১৪ খেলা যাবে। কিন্তু দুই বছর তত দিনে খেলে ফেলেছি। যদিও আমার আসল যে বয়স তখনো খেলার সুযোগ ছিল। বয়সের গ্যাঁড়াকলে পড়ে আমি না পারি অনূর্ধ্ব-১৪ খেলতে, না পারি পরের ধাপে যেতে। তখন দিপু রায় চৌধুরী স্যার এগিয়ে এলেন। বিসিবিতে বলে ২০১০ সালে আমাকে নতুন করে খেলার সুযোগ করে দিলেন। অতিরিক্ত আরও একটা বছর অনূর্ধ্ব-১৪ খেলার সুযোগ পেলাম। জীবনের মোড়টা ঘুরে গেল সেবারই। স্যারের প্রতি আমার কৃতজ্ঞতার শেষ নেই। বিসিবির বয়সভিত্তিক ক্রিকেটের নির্বাচক এহসানুল হক স্যারও আমাকে অনেক সহায়তা করেছেন। খুলনা জেলা ক্রীড়া সংস্থার সম্পাদক শামীম ভাইয়ের প্রতিও কৃতজ্ঞ আমি। একটা মজার তথ্য জানাই। জাতীয় দল কী, সেটা তখনো বুঝতাম না। শুধু টিভিতেই দেখতাম সাকিব-তামিম ভাইয়েরা খেলছেন। কীভাবে জাতীয় দলে যেতে হবে, সেখানে পৌঁছানোর সিঁড়িটা কী, জানা ছিল না। ২০১০ সালে অনূর্ধ্ব-১৪ ক্রিকেটে দেশের সেরা খেলোয়াড় হলাম। তখনকার বিসিবি সভাপতি আ হ ম মুস্তফা কামাল আমাকে ২৫ হাজার টাকা পুরস্কার দেওয়ার ঘোষণা দেন। পুরস্কারটা আমার হাতে একটু ভিন্নভাবেই তুলে দেওয়া হয়। ২০১০ সালের মার্চে বাংলাদেশে আসা ওই সময়ের আইসিসি সভাপতি ডেভিড মরগানের হাত থেকে পুরস্কারটা নিই আমি। আমাকে পুরস্কারটা যখন দেওয়া হয়, তখন ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ঢাকায় টেস্ট খেলছে বাংলাদেশ। ওই প্রথম সুযোগ পাই প্রথম আন্তর্জাতিক ম্যাচ দেখার। সেদিন এতটাই শিহরিত ছিলাম, একবার টিভিতে চোখ রাখি, আরেকবার মাঠে। কোনটা দেখব ভেবে পাই না! সাকিব-তামিম-মুশফিক ভাইকে এত দিন টিভিতে দেখেছি। প্রথম তাঁদের খেলা দেখছি মাঠে বসে। ভীষণ রোমাঞ্চিত ছিলাম সেদিন। জাতীয় দলে খেলব—এই স্বপ্নটা প্রথম দেখতে শুরু করি ওই দিনের পর থেকেই। তখনই সিদ্ধান্ত নিই, জাতীয় দলে সাকিব-তামিম-মুশফিক ভাইদের সঙ্গে খেলতে আমাকে যত পরিশ্রম করতে হয়, যত ত্যাগ স্বীকার করতে হয় আমি করব। সময় কখনো এত চমক উপহার দেয় কল্পনাও করা যায় না। ছয় বছর পর দেখুন, সেই ইংল্যান্ডের বিপক্ষেই আমার আন্তর্জাতিক অভিষেক হয়ে গেল। অভিষেকের আগের দিন যখন নিশ্চিত হই চট্টগ্রাম টেস্টে খেলছি, তখন অনেক রোমাঞ্চিত ছিলাম। সংবাদটা পাওয়ার পর বাসার সবার সঙ্গে তো বটেই, মোবাইল ফোনে নম্বর খুঁজে খুঁজে সব কোচের সঙ্গে কথা বলেছি, যাঁদের ভীষণ অবদান আমার জীবনে। আল মাহমুদ ভাই, দিপু স্যার, বাবুল স্যার, সোহেল স্যার, কাছের সব মানুষের সঙ্গে কথা বলেছি। আগের রাতে মাশরাফি ভাই এসএমএস দিয়ে অভিনন্দন জানিয়েছেন। ভাবিওনি অভিষেকটা এমন স্বপ্নের মতো হবে। প্রথম ইনিংসে ৬ উইকেট পেয়েছি সেটির একটা আনন্দ তো আছেই। তবে খুব চেয়েছিলাম, প্রথম ম্যাচটাই যেন জিতি। সেটা হয়নি। কিন্তু দ্বিতীয় ম্যাচটা তো স্বপ্নের মতো! আমরা জিতে গেলাম, সেই সঙ্গে আমি হলাম ম্যান অব দ্য সিরিজ! স্বপ্নের মতো লাগছে এখনো। সাকিব-মুশফিক-তামিম-রিয়াদ ভাইসহ দলের সবাই আমাকে যেভাবে সহায়তা করেছেন, মনেই হয়নি বাংলাদেশের হয়ে কেবল খেলতে শুরু করেছি। জীবন নিয়ে যে স্বপ্নটা সব সময়ই দেখি, এমন কিছু করতে চাই সবাই আমাকে ভালোবাসবে, আমাকে অনেক দিন মনে রাখবে। ভালো মানুষ হয়ে বেঁচে থাকতে চাই। ক্রিকেট তো সারা জীবন খেলব না। একটা নির্দিষ্ট সময় পর এটা ছাড়তে হবে। শুধু ভালো খেলোয়াড় হিসেবে নয়, ব্যক্তি জীবনে নিজেকে এমনভাবে গড়ে তুলতে চাই, যাতে সবাই আমাকে বলে, মানুষটা ভালো ছিল। আর দেশই আমার সবকিছু। বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে আমার অনেক গর্ব। দেশের জন্য কিছু করতে পারলে মনে অনেক শান্তি লাগে। দেশ আমাকে অনেক কিছু দিয়েছে। এখন দেশকেও কিছু দিতে চাই। এত দূর আসতে প্রতিটি ধাপেই অনেক বাধা পেয়েছি। তবুও হাল ছাড়িনি, আত্মবিশ্বাস হারাইনি। সব সময়ই সামনে এগোতে চেয়েছি। এগোতে চাই আরও সামনে।

Comments

Comments!

 দেশই আমার সবকিছুAmarbangladeshonlineAmarbangladeshonline | Amarbangladeshonline

দেশই আমার সবকিছু

Monday, November 7, 2016 4:30 pm
%e0%a7%ac

চিকিত্সক বা প্রকৌশলী হতে হবে কিংবা পড়াশোনা করে অনেক বড় হতে হবে—খুব ছোটবেলায় এসব ভাবনা আসলে মোটেও কাজ করেনি। ক্রিকেট খেলব, খেলোয়াড় হব—এমন কোনো স্বপ্নও আমার ছিল না। আমার মনে হয়, খুব ছোটবেলায় এসব কেউ ভাবেও না। তবে একটা জিনিসই বুঝতাম, সেটি হচ্ছে ক্রিকেট। শৈশবে অবশ্য বুঝে না–বুঝেই ক্রিকেট খেলেছি। বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে অনুভব করেছি, ক্রিকেটের প্রতি আমার ভালোবাসা ক্রমেই বাড়ছে। যেখানেই যেতাম, ক্রিকেটেই মেতে থাকতাম। ক্রিকেটে এতটাই ঝুঁকে গেলাম যে পড়ালেখায় খুব একটা মনোযোগ দিতে পারিনি।
সবাই জানে, আমি খুলনা থেকে উঠে এসেছি। আমার কিন্তু আরও একটা ঠিকানা আছে। আমার জন্ম বরিশালের বাকেরগঞ্জের আউলিয়াপুর গ্রামে। ওটাই বাপ-দাদার ভিটা। শৈশবের সাত-আট বছর ওখানেই কাটিয়েছি। আব্বু চাকরি নিয়ে আমাদের খুলনা শহরে নিয়ে আসেন ২০০৩ সালের দিকে। তারপর থেকে অবশ্য প্রতিবছরেই এক-দুবার গ্রামের বাড়িতে যাওয়া হয়। খুলনার খালিশপুরে আমার বর্তমান ঠিকানা। তবে ক্রিকেটের শুরু বরিশালেই। চাচাদের সঙ্গেই প্রথম খেলতে শুরু করি। আমাদের গ্রামের সঙ্গে অন্য গ্রামের খেলার আয়োজন করা হতো। সেখানে আমি খেলতাম। টিভিতে দেখতাম, খেলোয়াড়েরা কাঠের বল দিয়ে খেলেন। সেটি দেখে আমরা নিজেরাই কাঠের বল তৈরি করতাম। বল হতো বাঁশের গোড়া দিয়ে। কলাগাছের খোলা দিয়ে প্যাড বানাতাম। আর তক্তা দিয়ে বানাতাম ব্যাট। খুব মজা হতো তখন।
এরপর তো চলে এলাম খুলনা শহরে। ক্রিকেটের আনুষ্ঠানিক শুরুটা এখানেই। তখন মনে মনে লক্ষ্য স্থির করি, ক্রিকেট আমাকে খেলতেই হবে। গ্রামে শুধু মজার জন্য খেললেও ক্রিকেটার হওয়ার স্বপ্নটা দেখি খুলনা থেকে।
খুলনায় আসার পর শুরুর দিকে বিএল কলেজ মাঠে টেপ টেনিসে খেলতে যেতাম। এলাকার বড় ভাই রাসেলকে দেখতাম ডিউজ বলে অনুশীলন করতে। একদিন তাঁর সঙ্গে অনুশীলন করে খুব মজা পেলাম। রাসেল ভাইকে বললাম, ‘তোমার কোচের সঙ্গে আমার পরিচয় করিয়ে দাও, আমি অনুশীলন করব।’ তিনি তাঁর কোচের সঙ্গে আমাকে পরিচয় করিয়ে দিলেন। এটা ১০-১১ বছর আগের কথা।
তবে পরিবার থেকে মোটেও চাইত না আমি ক্রিকেট খেলি। অনুশীলনের জন্য পরিবার কোনো টাকাপয়সাও দিত না। তাহলে উপায়? কোচকে বিষয়টা খুলে বলি এবং তাঁর কাছে সহায়তা চাই। তিনি অবশ্য অভয় দেন। এরপর ধীরে ধীরে অনুশীলন শুরু করি। তখন আবার আরেক সমস্যা দেখা দেয়। বাসা থেকে চাপ বেড়ে যায়। বিশেষ করে আব্বু খুব বকাঝকা, মারধর করতেন।
আব্বু তখন গাড়ি চালাতেন। সকালে যেতেন, আসতেন দুপুরে। খানিকটা বিশ্রাম নিয়ে তিনটা-চারটার দিকে আবার কাজে বেরিয়ে পড়তেন। আমি নিজেই একটা সময় ঠিক করে নিয়েছিলাম, আব্বু যখন চলে যাবেন তখন অনুশীলনে যাব। যেদিন আব্বু বাসা থেকে দেরি করে বের হতেন খুব সমস্যায় পড়তে হতো। অনেক সময় পালিয়েই চলে যেতাম। এটা ঠেকানোর জন্য আব্বু আরেক উপায় বের করলেন। বিছানায় এক পাশে আমাকে আরেক পাশে আমার ছোট বোন রুমানাকে নিয়ে তিনি মাঝে ঘুমাতেন। যাতে আমি পালিয়ে গেলে তিনি বুঝতে পারেন!
অভিষেকেই তারুণ্যের দ্যুতি ছড়িয়েছেন ক্রিকেটার মেহেদী হাসান মিরাজ। ছবি: শামসুল হকআমিও খেয়াল রাখতাম, আব্বু কখন ঘুমান। তিনি চোখ বোজার সঙ্গে সঙ্গে আমাকে আর কে পায়! নিঃশব্দে বিছানা থেকে নেমে গেঞ্জি আর প্যান্ট নিয়ে এক দৌড়ে মাঠে। অনেক দিন এমনও হয়েছে, আব্বু রাতে বাসায় ফিরে আমাকে মারধর করেছেন। মার থেকে বাঁচার জন্য তখন আরেক বুদ্ধি আটতাম, আব্বু আসার আগেই ঘুমিয়ে পড়তাম। ঘুম না এলেও ভান ধরে থাকতাম।
ক্রিকেটের আনুষ্ঠানিক যাত্রার শুরুতেই সহায়তা করেছেন স্থানীয় কোচ আল মাহমুদ ভাই। তিনি অনেক নির্দেশনা দিয়েছেন আমাকে, ভীষণ যত্ন নিয়েছেন। এই পর্যায়ে আসতে আসলে অনেকের অবদান আছে, যাঁদের সবার কথা ছোট্ট পরিসরে বলা কঠিন। তবুও কয়েকজনের কথা অবশ্যই বলতে হবে। বিভাগীয় পর্যায়ে যখন খেলি তখন সালাউদ্দিন স্যার আমাকে নানাভাবে সহায়তা করেছেন। স্যার মারা গেছেন বছর তিনেক আগে। তিনি আমাকে খুব পছন্দ করতেন। অনূর্ধ্ব-১৭ ও অনূর্ধ্ব-১৯ দলে থাকার সময় মিজানুর রহমান ও সোহেল ইসলাম স্যারের মূল্যবান নির্দেশনা অনেক কাজে দিয়েছে। আমার স্পিনার হওয়ার পেছনে সবচেয়ে বড় অবদান সোহেল স্যারের। স্পিনের যত কলাকৌশল তাঁর কাছ থেকেই শেখা।
জীবনের গুরুত্বপূর্ণ এক বাঁকের কথা বলি। বয়স বেশি হওয়ায় ২০০৯ সালে অনূর্ধ্ব-১৪ দল থেকে বাদ পড়ে যাই। আমার বয়স তখনো ১৫-র নিচেই ছিল। কিন্তু কাগজে সেটি বেশি থাকায় সমস্যাটা তৈরি হয়। নিয়মটা হচ্ছে, দুই বছর অনূর্ধ্ব-১৪ খেলা যাবে। কিন্তু দুই বছর তত দিনে খেলে ফেলেছি। যদিও আমার আসল যে বয়স তখনো খেলার সুযোগ ছিল। বয়সের গ্যাঁড়াকলে পড়ে আমি না পারি অনূর্ধ্ব-১৪ খেলতে, না পারি পরের ধাপে যেতে। তখন দিপু রায় চৌধুরী স্যার এগিয়ে এলেন। বিসিবিতে বলে ২০১০ সালে আমাকে নতুন করে খেলার সুযোগ করে দিলেন। অতিরিক্ত আরও একটা বছর অনূর্ধ্ব-১৪ খেলার সুযোগ পেলাম। জীবনের মোড়টা ঘুরে গেল সেবারই। স্যারের প্রতি আমার কৃতজ্ঞতার শেষ নেই। বিসিবির বয়সভিত্তিক ক্রিকেটের নির্বাচক এহসানুল হক স্যারও আমাকে অনেক সহায়তা করেছেন। খুলনা জেলা ক্রীড়া সংস্থার সম্পাদক শামীম ভাইয়ের প্রতিও কৃতজ্ঞ আমি।
একটা মজার তথ্য জানাই। জাতীয় দল কী, সেটা তখনো বুঝতাম না। শুধু টিভিতেই দেখতাম সাকিব-তামিম ভাইয়েরা খেলছেন। কীভাবে জাতীয় দলে যেতে হবে, সেখানে পৌঁছানোর সিঁড়িটা কী, জানা ছিল না। ২০১০ সালে অনূর্ধ্ব-১৪ ক্রিকেটে দেশের সেরা খেলোয়াড় হলাম। তখনকার বিসিবি সভাপতি আ হ ম মুস্তফা কামাল আমাকে ২৫ হাজার টাকা পুরস্কার দেওয়ার ঘোষণা দেন। পুরস্কারটা আমার হাতে একটু ভিন্নভাবেই তুলে দেওয়া হয়। ২০১০ সালের মার্চে বাংলাদেশে আসা ওই সময়ের আইসিসি সভাপতি ডেভিড মরগানের হাত থেকে পুরস্কারটা নিই আমি।
আমাকে পুরস্কারটা যখন দেওয়া হয়, তখন ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ঢাকায় টেস্ট খেলছে বাংলাদেশ। ওই প্রথম সুযোগ পাই প্রথম আন্তর্জাতিক ম্যাচ দেখার। সেদিন এতটাই শিহরিত ছিলাম, একবার টিভিতে চোখ রাখি, আরেকবার মাঠে। কোনটা দেখব ভেবে পাই না! সাকিব-তামিম-মুশফিক ভাইকে এত দিন টিভিতে দেখেছি। প্রথম তাঁদের খেলা দেখছি মাঠে বসে। ভীষণ রোমাঞ্চিত ছিলাম সেদিন। জাতীয় দলে খেলব—এই স্বপ্নটা প্রথম দেখতে শুরু করি ওই দিনের পর থেকেই। তখনই সিদ্ধান্ত নিই, জাতীয় দলে সাকিব-তামিম-মুশফিক ভাইদের সঙ্গে খেলতে আমাকে যত পরিশ্রম করতে হয়, যত ত্যাগ স্বীকার করতে হয় আমি করব।
সময় কখনো এত চমক উপহার দেয় কল্পনাও করা যায় না। ছয় বছর পর দেখুন, সেই ইংল্যান্ডের বিপক্ষেই আমার আন্তর্জাতিক অভিষেক হয়ে গেল। অভিষেকের আগের দিন যখন নিশ্চিত হই চট্টগ্রাম টেস্টে খেলছি, তখন অনেক রোমাঞ্চিত ছিলাম। সংবাদটা পাওয়ার পর বাসার সবার সঙ্গে তো বটেই, মোবাইল ফোনে নম্বর খুঁজে খুঁজে সব কোচের সঙ্গে কথা বলেছি, যাঁদের ভীষণ অবদান আমার জীবনে। আল মাহমুদ ভাই, দিপু স্যার, বাবুল স্যার, সোহেল স্যার, কাছের সব মানুষের সঙ্গে কথা বলেছি। আগের রাতে মাশরাফি ভাই এসএমএস দিয়ে অভিনন্দন জানিয়েছেন।
ভাবিওনি অভিষেকটা এমন স্বপ্নের মতো হবে। প্রথম ইনিংসে ৬ উইকেট পেয়েছি সেটির একটা আনন্দ তো আছেই। তবে খুব চেয়েছিলাম, প্রথম ম্যাচটাই যেন জিতি। সেটা হয়নি। কিন্তু দ্বিতীয় ম্যাচটা তো স্বপ্নের মতো! আমরা জিতে গেলাম, সেই সঙ্গে আমি হলাম ম্যান অব দ্য সিরিজ! স্বপ্নের মতো লাগছে এখনো। সাকিব-মুশফিক-তামিম-রিয়াদ ভাইসহ দলের সবাই আমাকে যেভাবে সহায়তা করেছেন, মনেই হয়নি বাংলাদেশের হয়ে কেবল খেলতে শুরু করেছি।
জীবন নিয়ে যে স্বপ্নটা সব সময়ই দেখি, এমন কিছু করতে চাই সবাই আমাকে ভালোবাসবে, আমাকে অনেক দিন মনে রাখবে। ভালো মানুষ হয়ে বেঁচে থাকতে চাই। ক্রিকেট তো সারা জীবন খেলব না। একটা নির্দিষ্ট সময় পর এটা ছাড়তে হবে। শুধু ভালো খেলোয়াড় হিসেবে নয়, ব্যক্তি জীবনে নিজেকে এমনভাবে গড়ে তুলতে চাই, যাতে সবাই আমাকে বলে, মানুষটা ভালো ছিল। আর দেশই আমার সবকিছু। বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে আমার অনেক গর্ব। দেশের জন্য কিছু করতে পারলে মনে অনেক শান্তি লাগে। দেশ আমাকে অনেক কিছু দিয়েছে। এখন দেশকেও কিছু দিতে চাই।
এত দূর আসতে প্রতিটি ধাপেই অনেক বাধা পেয়েছি। তবুও হাল ছাড়িনি, আত্মবিশ্বাস হারাইনি। সব সময়ই সামনে এগোতে চেয়েছি। এগোতে চাই আরও সামনে।

Comments

comments

সম্পাদক : মোহাম্মদ আবদুল বাছির
প্রকাশক: মোহাম্মদ জহিরুল ইসলাম
ফোন : ‎০১৭১৩৪০৯০৯০
৩৪৫/১, দিলু রোড, নিউ ইস্কাটন, ঢাকা-১০০০
X
 
নিয়মিত খবর পড়তে আমাদের ফেসবুক পেজে লাইক দিয়ে যুক্ত থাকুন
X