বৃহস্পতিবার, ২২শে ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ ইং, ১০ই ফাল্গুন, ১৪২৪ বঙ্গাব্দ, দুপুর ১:০৯
শিরোনাম
  • ঘৃণাকে বিজয়ী হতে দেয়া যাবে না, ট্রাম্পকে ইঙ্গিত করে জর্জ ক্লুনি
  • আমার একটাই চিন্তা দেশের মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন করা: প্রধানমন্ত্রী
  • ‘কেন্দ্রীয় সরকারের আগ্রাসী নীতির কারণে কাশ্মীরকে হারাতে হবে’
  • সাড়ে চারমাস পর মুখোমুখি, খাদিজাকে উদ্দেশ্য করে যা বলল বদরুল
  • খালেদার ‘সাজা’ বিরোধী নেতাকর্মীদের মনোবল ভাঙ্গার কৌশল!
  • বিএনপির কর্মসূচি ‘যথাসময়ে’ জানানো হবে: রিজভী
  • দলের জন্য বোলিং করতেও রাজি মুশফিক
  • শিশু জিহাদের মৃত্যু: চার জনের ১০ বছর করে কারাদণ্ড
  • অবশেষে বাড়ি অবরুদ্ধ করে রাখা সেই দেয়াল ভেঙ্গে ফেলা হচ্ছে
  • সাক্ষ্য দিলেন খাদিজা, চাইলেন বদরুলের সর্বোচ্চ শাস্তি
  • বদরুলের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিতে আদালতে খাদিজা
  • আজ বগুড়ায় যেসব প্রকল্প উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী
  • রোহিঙ্গা স্থানান্তরের সরকারি পরিকল্পনার সঙ্গে দ্বিমত মানবাধিকার কমিশনের
  • মহেশখালীতে ইয়াবা ব্যবসায়ীদের সঙ্গে পুলিশের ‘বন্দুকযুদ্ধ’
  • হোয়াইট হাউসে কাজ করার দীর্ঘ অভিজ্ঞতার কথা জানালেন এই বাংলাদেশি সাংবাদিক
Saturday, July 29, 2017 10:08 pm
A- A A+ Print

দোকলাম মালভূমির সংকট

76150_d1

সুহাসিনী হায়দার | ভুটানকে বিশেষ ও অনন্য সম্পর্কে ভারতের সঙ্গে  বেঁধে রাখতে অনেক দড়ি আছে। তবে এসবের  কোনোটিই হিমালয় রাজ্যটির সবচেয়ে দুর্গম পর্বতমালা ও গিরিখাত ধরে ভারতের তৈরি ১,৫০০ কিলোমিটার দীর্ঘ রাস্তাগুলোর মতো তত শক্ত নয়। ১৯৬০ সালে ভুটানের রাজা জিগমে ওয়াঙচুক (বর্তমান রাজার দাদা) ওই সময় পর্যন্ত বিশ্বের কাছে বন্ধ থাকায় দেশটিকে আধুনিকায়নের দায়িত্ব দিয়েছিলেন তদানীন্তন প্রধানমন্ত্রী জিগমে দরজিকে। তারপর থেকে প্রজেক্ট দানতকের আওতায় ইন্ডিয়ান বর্ডার রোডস অরগানাইজেশনের (বিআরও) তৈরি ও রক্ষণাবেক্ষণে থাকা রাস্তাগুলো দুইদেশকে একাধিক কারণে একত্রিত করে রেখেছে। একমুখী সড়ক? ‘[তারা] নতুন করে যেসব রাস্তা নির্মাণের প্রস্তাব করেছে, তার সবই হয়েছে ভুটানের মূল কেন্দ্রগুলো  থেকে দক্ষিণমুখী হয়ে ভারতের দিকে। একটি রাস্তাও তিব্বত (চীন) সীমান্তের দিকে নির্মিত হয়নি।’ কথাগুলো বলেছিলেন ভুটানের সঙ্গে জোরালো সম্পর্ক স্থাপনে অন্যতম ব্যক্তিত্ব নরি রোস্তমজি। এই আমলা ১৯৫৪ থেকে ১৯৫৯ পর্যন্ত সিকিমের প্রধানমন্ত্রী (দেওয়ান) ছিলেন। কথাগুলো তিনি বলেছেন তার ‘ড্রাগন কিংডম ইন ক্রাইসিস’ গ্রন্থে। তিনি জানান, ‘ভুটানকে নিজেদের প্রভাব বলয়ে নিয়ে আসার তাগিদে’ যখন চীন রাস্তায় কোনো ফর্ক ফেলেছে, ভুটান তখন দৃঢ়ভাবে ‘স্বাধীন অবস্থান বজায় রেখেছে।’ মাত্র কয়েক বছর পর ১৯৬২ সালে ভারত-চীন যুদ্ধের সময় ভুটান স্পষ্টভাবেই ভারতের প্রতি তার সহানুভূতির বিষয়টি প্রকাশ করেছিল। কিন্তু তারপরও সে তার স্বাধীন অবস্থান নিয়ে তখনো আপস করেনি: অরুণাচল প্রদেশের যুদ্ধক্ষেত্র থেকে ভারতীয় সৈন্যরা যখন পিছু হটছিল, তখন তাদেরকে পূর্ব ভুটান দিয়ে নিরাপদ রাস্তা দেয়া হয়। তবে শর্ত দেয়া হয়েছিল, ভারতীয় সৈন্যরা তরাশিগ্যাঙ ডঙ অস্ত্রাগারে তাদের রাইফেল জমা দিয়ে নিরস্ত্রভাবে ভুটান থেকে ভারতে যাবে। (রাইফেলগুলো এখনো সেখানেই রয়ে গেছে)। ভারত যখন দোকলাম অচলাবস্থায় চীন সরকারের উদ্দেশ্য বোঝার চেষ্টা করছে, তখন এটা নিশ্চিত ও স্বাভাবিক বিষয় যে, তা দেখা হবে গত তিনবছর ধরে নয়া দিল্লি ও বেইজিংয়ের মধ্যে অবনতিশীল সম্পর্ক কিংবা চীনের নিজস্ব বৈশ্বিক উচ্চাভিলাষের প্রেক্ষাপটে। তাছাড়া এশিয়ান প্রতিবেশীগুলোকে তার পেশীশক্তি প্রদর্শন করার দরকারও রয়েছে বৈকি। কিন্তু চলমান মুখোমুখি অবস্থানে ভারত ও ভুটানের মধ্যে ফাঁক সৃষ্টির চীনা আকাঙ্ক্ষার বিষয়টি বিবেচনা না করার যে কোনো ব্যাখ্যাই হবে অপর্যাপ্ত এবং বড়রকমের সরলীকরণ। অচলাবস্থা সৃষ্টি হয়েছে যে এলাকাকে কেন্দ্র করে তা নিয়ে সর্বপ্রথম ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ক্লু হলো এই স্থানটি নিয়ে চীন ও ভুটান দীর্ঘদিন আলোচনা করেছে। সেই ১৯৮৪ সাল থেকে ২৪ রাউন্ড আলোচনা হয়েছে তাদের মধ্যে। ১৯৯০-এর দশকে চীন বেশ বড় ধরনের প্রস্তাব দেয় ভুটানকে। প্রস্তাবটি থিম্পু সরকারের কাছে অত্যন্ত আকর্ষণীয়ই মনে হতে পারে। চীনের ‘প্যাকেজ ডিলে’ তারা পাসামরাঙে ৪৯৫ বর্গ কিলোমিটার এলাকা থেকে তাদের অধিকার ছেড়ে দিতে রাজি হয়, বিনিময়ে বিতর্কিত দোকলাম মালভূমিতে অনেক ছোট আয়তনের- মাত্র ২৬৯ বর্গ কিলোমিটার এলাকা দাবি করে। বেশ কয়েকজন মধ্যস্থতাকারী নিশ্চিত করেছেন, কয়েক রাউন্ড বৈঠকে প্রবারই প্রস্তাবটি উত্থাপন করেছে বেইজিং। অনেক সময় ভুটানের রাজা এবং সরকার বিষয়টি ভারতকেও অবহিত করেছে। এ ব্যাপারে ভিন্নতার বিষয়টি ভুটানতে বোঝাতে সক্ষম হয়েছিল ভারত। তবে ২০০৭ সালে মৈত্রী চুক্তি নিয়ে নতুন করে আলোচনার সময় এবং ২০০৮ সালের পর ভুটানের প্রথম নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী জিগমে থিনলে আরো স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি অবলম্বন করতে শুরু করলে পরিস্থিতি বদলে যায়। এই সময়কালের কোনো একপর্যায়ে পিএলএ দোকলামে গাড়ি চলাচলের রাস্তা নির্মাণের উদ্যোগ নেয়। এটাই বর্তমান অচলাবস্থার কেন্দ্রবিন্দু এবং সেইসাথে ‘টার্নিং পয়েন্টও’। তবে মনে হচ্ছে, চীনা বাহিনী যখন রাস্তা নির্মাণের কাজে নেমেছিল, তখন ভুটানি সেনাবাহিনী তাতে আপত্তি করেনি। দায়িত্ব পালনের পরের পাঁচ বছরে মি. থিনলে আরো কয়েক রাউন্ড আলোচনা করেন। তিনি ‘দোকলাম প্যাকেজ’ নিয়েও কথা বলেন। তিনি এমনকি চীনা প্রধানমন্ত্রী ওয়েন জিয়াবাওয়ের (২০১২ সালে রিও ডি জেনিরোতে) সঙ্গে বিতর্কিত একটি সভাও করেন। এতে মনে হয়, চীনের সাথে কনস্যুলার সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করার কথা ভাবছে ভুটান। এটা ভারতের জন্য বেশ বিপর্যয়কর ব্যাপার। এই সময়কালে ভুটান বিভিন্ন দেশের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেয়। ভুটানের কূটনৈতিক সম্পর্ক আছে, এমন দেশের সংখ্যা ২২ থেকে বেড়ে ৫৩ হয়। দেশটি এমনকি জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে অস্থায়ী সদস্যপদে নির্বাচনও করে। অবশ্য হেরে যায়। ২০১৩ সাল নাগাদ ভারত বিষয়টিতে নাক গলায়। মনমোহন সিংয়ের সরকার ভুটানের নির্বাচনের প্রাক্কালে দেশটির ওপর থেকে জ্বালানি ভর্তুকি প্রত্যাহার করে। গ্রীষ্মকালে নেয়া ওই পদক্ষেপ জিগমে থিনলের শোচনীয় পরাজয়ে ভূমিকা রাখে। নতুন প্রধানমন্ত্রী তশেরিং তোবগের সরকার যখন কয়েক মাস পর বেইজিংয়ের সাথে সীমান্ত নিয়ে তার প্রথম রাউন্ড আলোচনার প্রস্তুতি নেন, তখন নয়া দিল্লি আর কোনো ঝুঁকি নেয়নি। নতুন প্রধানমন্ত্রীর কী করা উচিত, তা জানানোর জন্য নয়াদিল্লি জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা শিবশঙ্কর মেনন এবং পররাষ্ট্র সচিব সুজাতা সিং উভয়কেই থিম্পু পাঠায়। চীন সম্ভবত বুঝতে পারে, তার আর দোকলাম পয়েন্ট নিয়ে চাপ দেয়া উচিত হবে না। বরং বেইজিং এক বছর পর কৈলাশ-মানসসরোবর যাত্রীদের জন্য সিকিমের মধ্য দিয়ে নাথু লা পাস খুলে দেয়ার প্রস্তাব দেয় ভারতকে। বর্তমানে যে অচলাবস্থা চলছে, তার মধ্যে ওই নাথু লা পাস রুটটি বাতিলও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। মনে হচ্ছে, চীন প্রাচ্যের মহা খেলায় নেমেছে। আর ভুটানের এক সিনিয়র ভাষ্যকার ভুটানের অবস্থানকে অভিহিত করেছেন ‘দুই পাথরের মাঝে থাকা ডিমের’ মতো অবস্থা হিসেবে। চীনা সেনাবাহিনীর রাস্তা নির্মাণের কারণেই ভারতীয় সৈন্যরা ভুটানে গেছে বলে দাবি করে দিল্লি একে দাবায় ‘বাধ্যতামূলক চাল’ হিসেবে অভিহিত করতে পারে। ভারত সৈন্য পাঠাক, সেটাই হয়তো মনে মনে চেয়েছিল চীন। যে স্থানে দীর্ঘদিন ভারতীয় সৈন্যরা ছিল না, সেই স্থানটি ভারতীয় সৈন্যদের দখল করাটা ভুটানি জনগণের কাছে ভারতের অসৎ উদ্দেশ্যটি ধরিয়ে দেয়াই হয়তো চীনের লক্ষ্য। সরকারকে অবশ্যই দেখাতে হবে, ভুটানের সার্বভৌমত্ব তুচ্ছ কোনো বিষয় নয় এবং গত সপ্তাহে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় যে অশ্রদ্ধাপূর্ণ মনোভাব প্রকাশ করেছে, তা এড়ানো। ত্রিদেশীয় সীমান্তে ভারতীয়  সৈন্যদের সহায়তা ভুটান চেয়েছে কিনা সেটাকে তুলনা করা হয় এভাবে: ‘বল আগে এলো, না বোলার বল করার আগেই ব্যাটসম্যান স্থান গ্রহণ করেছেন?’ প্রশ্নটা ভুটানি জনগণের কাছে বড় ধরনের বিষয়। তাদের সরকার যদিও এখন দোকলাম অচলাবস্থা নিয়ে মুখ বন্ধ রাখতে অনুরোধ করেছে, কিন্তু শ্রদ্ধাভাজন ভাষ্যকারদের ব্লগ পোস্ট এবং সামাজিক মাধ্যমে লেখালেখিতে আভাস পাওয়া যাচ্ছে, কয়েক মাস ধরে চলা তীব্র উত্তেজনার মধ্যে ভারতীয় বা চীনা সৈন্যরা মালভূমিটি দখল করে নেয়ার আইডিয়াটির ব্যাপারে অনেক মতানৈক্য রয়েছে। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এটা চোখ এড়িয়ে যাওয়ার কথা নয়, ভুটানি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় চলতি সপ্তাহে একমাত্র যে বিবৃতি ইস্যু করেছে তাতে ভারতের প্রতি কোনো ‘সাহায্যের আবেদনের’ কথা উল্লেখ করেনি বরং এতে চীনের প্রতি রাজনৈতিক উদ্যোগ গ্রহণের আহ্বান জানানো হয়েছে। পরিশেষে বলা যায়, নয়া দিল্লির জন্য খুবই ভালো হবে ভুটানের ভেতরে রাজনৈতিক উপদলের মধ্যে পার্থক্য করা থেকে বিরত থাকা, যেমনটি তারা করেছিল নেপাল, বাংলাদেশ ও শ্রীলঙ্কার বেলায়। তাদের উচিত হবে ভুটানে কোনো ‘ভারতবিরোধী’ উপদল নেই, এমনটাই স্বীকৃতি দেয়া, যদিও তাদের কেউ কেউ চীনের সাথে সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার আহ্বান জানাচ্ছে। প্রতিবেশীদের পূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গিতে ভারতের অবশ্যই সতর্ক থাকা উচিত, অন্য প্রতিবেশীরাও অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ দৃষ্টিতে দোকলাম উত্তেজনা প্রত্যক্ষ করছে। ভারত ও চীনের সঙ্গে ত্রিদেশীয় একটি ত্রিপক্ষীয় অবস্থানে রয়েছে ভুটান, এমন ক্ষীণ দৃষ্টি স্বীকৃতি দেয়া উচিত নয়। বরং উভয় দেশের সঙ্গে নেপাল, মিয়ানমার ও পাকিস্তানেরও ত্রিদেশীয় সীমান্ত (অন্তত মানচিত্রে) আছে। এছাড়া পাকিস্তান-অধিকৃত কাশ্মীরে ‘তৃতীয় দেশের’ উপস্থিতির ইঙ্গিত চীন দেয়াতে এসব সীমান্তের ওপরও আলো পড়েছে। এই অঞ্চলে ভুটানই একমাত্র দেশ, যে চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিঙে বেল্ট ও সড়ক উদ্যোগের মহাসম্মেলন বয়কটে ভারতের সঙ্গে যোগ দিয়েছিল। চীনা ভাবনা অনুযায়ী, দশকের পর দশক ধরে এসফল্ট ও কনক্রিটের জোরদার হওয়া ভারতের সাথে ভুটানের অনন্য সম্পর্কের যে কোনো ধরনের পুনর্বিবেচনা করাটা কেবল পুরস্কারই হবে না, বরং সম্ভাব্য লাভজনকও হবে। ভারতীয় ভাষ্যে বেইজিংয়ের সঙ্গে নরেন্দ্র মোদি সরকারের দ্বিপক্ষীয় সমস্যার দিকে আলোকপাত করা হলেও চীনের আগ্রাসী অবস্থানের সঙ্গে ভারতের বৃহত্তর সমস্যাটা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে। তবে সত্য হলো, এই সঙ্কটটি ভুটানের নিজেকে আড়াআড়ি পথে দেখার ব্যাপারেও পরিণত হয়েছে। ভুটানের সাথে যে সম্পর্ক আছে, সেটার জের ধরে দেশটিকে নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখার যে বার্তা দিয়েছে এবং সামরিক পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে, তাতে ভারতের অবশ্যই খুশি হওয়া উচিত। মূল: দ্য হিন্দু, অনুবাদ নেয়া হয়েছে সাউথ এশিয়ান মনিটর থেকে

Comments

Comments!

 দোকলাম মালভূমির সংকটAmarbangladeshonlineAmarbangladeshonline | Amarbangladeshonline

দোকলাম মালভূমির সংকট

Saturday, July 29, 2017 10:08 pm
76150_d1

সুহাসিনী হায়দার | ভুটানকে বিশেষ ও অনন্য সম্পর্কে ভারতের সঙ্গে  বেঁধে রাখতে অনেক দড়ি আছে। তবে এসবের  কোনোটিই হিমালয় রাজ্যটির সবচেয়ে দুর্গম পর্বতমালা ও গিরিখাত ধরে ভারতের তৈরি ১,৫০০ কিলোমিটার দীর্ঘ রাস্তাগুলোর মতো তত শক্ত নয়।
১৯৬০ সালে ভুটানের রাজা জিগমে ওয়াঙচুক (বর্তমান রাজার দাদা) ওই সময় পর্যন্ত বিশ্বের কাছে বন্ধ থাকায় দেশটিকে আধুনিকায়নের দায়িত্ব দিয়েছিলেন তদানীন্তন প্রধানমন্ত্রী জিগমে দরজিকে। তারপর থেকে প্রজেক্ট দানতকের আওতায় ইন্ডিয়ান বর্ডার রোডস অরগানাইজেশনের (বিআরও) তৈরি ও রক্ষণাবেক্ষণে থাকা রাস্তাগুলো দুইদেশকে একাধিক কারণে একত্রিত করে রেখেছে।
একমুখী সড়ক?
‘[তারা] নতুন করে যেসব রাস্তা নির্মাণের প্রস্তাব করেছে, তার সবই হয়েছে ভুটানের মূল কেন্দ্রগুলো  থেকে দক্ষিণমুখী হয়ে ভারতের দিকে। একটি রাস্তাও তিব্বত (চীন) সীমান্তের দিকে নির্মিত হয়নি।’ কথাগুলো বলেছিলেন ভুটানের সঙ্গে জোরালো সম্পর্ক স্থাপনে অন্যতম ব্যক্তিত্ব নরি রোস্তমজি। এই আমলা ১৯৫৪ থেকে ১৯৫৯ পর্যন্ত সিকিমের প্রধানমন্ত্রী (দেওয়ান) ছিলেন। কথাগুলো তিনি বলেছেন তার ‘ড্রাগন কিংডম ইন ক্রাইসিস’ গ্রন্থে। তিনি জানান, ‘ভুটানকে নিজেদের প্রভাব বলয়ে নিয়ে আসার তাগিদে’ যখন চীন রাস্তায় কোনো ফর্ক ফেলেছে, ভুটান তখন দৃঢ়ভাবে ‘স্বাধীন অবস্থান বজায় রেখেছে।’ মাত্র কয়েক বছর পর ১৯৬২ সালে ভারত-চীন যুদ্ধের সময় ভুটান স্পষ্টভাবেই ভারতের প্রতি তার সহানুভূতির বিষয়টি প্রকাশ করেছিল। কিন্তু তারপরও সে তার স্বাধীন অবস্থান নিয়ে তখনো আপস করেনি: অরুণাচল প্রদেশের যুদ্ধক্ষেত্র থেকে ভারতীয় সৈন্যরা যখন পিছু হটছিল, তখন তাদেরকে পূর্ব ভুটান দিয়ে নিরাপদ রাস্তা দেয়া হয়। তবে শর্ত দেয়া হয়েছিল, ভারতীয় সৈন্যরা তরাশিগ্যাঙ ডঙ অস্ত্রাগারে তাদের রাইফেল জমা দিয়ে নিরস্ত্রভাবে ভুটান থেকে ভারতে যাবে। (রাইফেলগুলো এখনো সেখানেই রয়ে গেছে)।
ভারত যখন দোকলাম অচলাবস্থায় চীন সরকারের উদ্দেশ্য বোঝার চেষ্টা করছে, তখন এটা নিশ্চিত ও স্বাভাবিক বিষয় যে, তা দেখা হবে গত তিনবছর ধরে নয়া দিল্লি ও বেইজিংয়ের মধ্যে অবনতিশীল সম্পর্ক কিংবা চীনের নিজস্ব বৈশ্বিক উচ্চাভিলাষের প্রেক্ষাপটে। তাছাড়া এশিয়ান প্রতিবেশীগুলোকে তার পেশীশক্তি প্রদর্শন করার দরকারও রয়েছে বৈকি। কিন্তু চলমান মুখোমুখি অবস্থানে ভারত ও ভুটানের মধ্যে ফাঁক সৃষ্টির চীনা আকাঙ্ক্ষার বিষয়টি বিবেচনা না করার যে কোনো ব্যাখ্যাই হবে অপর্যাপ্ত এবং বড়রকমের সরলীকরণ। অচলাবস্থা সৃষ্টি হয়েছে যে এলাকাকে কেন্দ্র করে তা নিয়ে সর্বপ্রথম ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ক্লু হলো এই স্থানটি নিয়ে চীন ও ভুটান দীর্ঘদিন আলোচনা করেছে। সেই ১৯৮৪ সাল থেকে ২৪ রাউন্ড আলোচনা হয়েছে তাদের মধ্যে। ১৯৯০-এর দশকে চীন বেশ বড় ধরনের প্রস্তাব দেয় ভুটানকে। প্রস্তাবটি থিম্পু সরকারের কাছে অত্যন্ত আকর্ষণীয়ই মনে হতে পারে। চীনের ‘প্যাকেজ ডিলে’ তারা পাসামরাঙে ৪৯৫ বর্গ কিলোমিটার এলাকা থেকে তাদের অধিকার ছেড়ে দিতে রাজি হয়, বিনিময়ে বিতর্কিত দোকলাম মালভূমিতে অনেক ছোট আয়তনের- মাত্র ২৬৯ বর্গ কিলোমিটার এলাকা দাবি করে। বেশ কয়েকজন মধ্যস্থতাকারী নিশ্চিত করেছেন, কয়েক রাউন্ড বৈঠকে প্রবারই প্রস্তাবটি উত্থাপন করেছে বেইজিং। অনেক সময় ভুটানের রাজা এবং সরকার বিষয়টি ভারতকেও অবহিত করেছে। এ ব্যাপারে ভিন্নতার বিষয়টি ভুটানতে বোঝাতে সক্ষম হয়েছিল ভারত। তবে ২০০৭ সালে মৈত্রী চুক্তি নিয়ে নতুন করে আলোচনার সময় এবং ২০০৮ সালের পর ভুটানের প্রথম নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী জিগমে থিনলে আরো স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি অবলম্বন করতে শুরু করলে পরিস্থিতি বদলে যায়। এই সময়কালের কোনো একপর্যায়ে পিএলএ দোকলামে গাড়ি চলাচলের রাস্তা নির্মাণের উদ্যোগ নেয়। এটাই বর্তমান অচলাবস্থার কেন্দ্রবিন্দু এবং সেইসাথে ‘টার্নিং পয়েন্টও’। তবে মনে হচ্ছে, চীনা বাহিনী যখন রাস্তা নির্মাণের কাজে নেমেছিল, তখন ভুটানি সেনাবাহিনী তাতে আপত্তি করেনি।
দায়িত্ব পালনের পরের পাঁচ বছরে মি. থিনলে আরো কয়েক রাউন্ড আলোচনা করেন। তিনি ‘দোকলাম প্যাকেজ’ নিয়েও কথা বলেন। তিনি এমনকি চীনা প্রধানমন্ত্রী ওয়েন জিয়াবাওয়ের (২০১২ সালে রিও ডি জেনিরোতে) সঙ্গে বিতর্কিত একটি সভাও করেন। এতে মনে হয়, চীনের সাথে কনস্যুলার সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করার কথা ভাবছে ভুটান। এটা ভারতের জন্য বেশ বিপর্যয়কর ব্যাপার। এই সময়কালে ভুটান বিভিন্ন দেশের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেয়। ভুটানের কূটনৈতিক সম্পর্ক আছে, এমন দেশের সংখ্যা ২২ থেকে বেড়ে ৫৩ হয়। দেশটি এমনকি জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে অস্থায়ী সদস্যপদে নির্বাচনও করে। অবশ্য হেরে যায়।
২০১৩ সাল নাগাদ ভারত বিষয়টিতে নাক গলায়। মনমোহন সিংয়ের সরকার ভুটানের নির্বাচনের প্রাক্কালে দেশটির ওপর থেকে জ্বালানি ভর্তুকি প্রত্যাহার করে। গ্রীষ্মকালে নেয়া ওই পদক্ষেপ জিগমে থিনলের শোচনীয় পরাজয়ে ভূমিকা রাখে। নতুন প্রধানমন্ত্রী তশেরিং তোবগের সরকার যখন কয়েক মাস পর বেইজিংয়ের সাথে সীমান্ত নিয়ে তার প্রথম রাউন্ড আলোচনার প্রস্তুতি নেন, তখন নয়া দিল্লি আর কোনো ঝুঁকি নেয়নি। নতুন প্রধানমন্ত্রীর কী করা উচিত, তা জানানোর জন্য নয়াদিল্লি জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা শিবশঙ্কর মেনন এবং পররাষ্ট্র সচিব সুজাতা সিং উভয়কেই থিম্পু পাঠায়। চীন সম্ভবত বুঝতে পারে, তার আর দোকলাম পয়েন্ট নিয়ে চাপ দেয়া উচিত হবে না। বরং বেইজিং এক বছর পর কৈলাশ-মানসসরোবর যাত্রীদের জন্য সিকিমের মধ্য দিয়ে নাথু লা পাস খুলে দেয়ার প্রস্তাব দেয় ভারতকে।
বর্তমানে যে অচলাবস্থা চলছে, তার মধ্যে ওই নাথু লা পাস রুটটি বাতিলও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। মনে হচ্ছে, চীন প্রাচ্যের মহা খেলায় নেমেছে। আর ভুটানের এক সিনিয়র ভাষ্যকার ভুটানের অবস্থানকে অভিহিত করেছেন ‘দুই পাথরের মাঝে থাকা ডিমের’ মতো অবস্থা হিসেবে। চীনা সেনাবাহিনীর রাস্তা নির্মাণের কারণেই ভারতীয় সৈন্যরা ভুটানে গেছে বলে দাবি করে দিল্লি একে দাবায় ‘বাধ্যতামূলক চাল’ হিসেবে অভিহিত করতে পারে। ভারত সৈন্য পাঠাক, সেটাই হয়তো মনে মনে চেয়েছিল চীন। যে স্থানে দীর্ঘদিন ভারতীয় সৈন্যরা ছিল না, সেই স্থানটি ভারতীয় সৈন্যদের দখল করাটা ভুটানি জনগণের কাছে ভারতের অসৎ উদ্দেশ্যটি ধরিয়ে দেয়াই হয়তো চীনের লক্ষ্য। সরকারকে অবশ্যই দেখাতে হবে, ভুটানের সার্বভৌমত্ব তুচ্ছ কোনো বিষয় নয় এবং গত সপ্তাহে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় যে অশ্রদ্ধাপূর্ণ মনোভাব প্রকাশ করেছে, তা এড়ানো। ত্রিদেশীয় সীমান্তে ভারতীয়  সৈন্যদের সহায়তা ভুটান চেয়েছে কিনা সেটাকে তুলনা করা হয় এভাবে: ‘বল আগে এলো, না বোলার বল করার আগেই ব্যাটসম্যান স্থান গ্রহণ করেছেন?’ প্রশ্নটা ভুটানি জনগণের কাছে বড় ধরনের বিষয়। তাদের সরকার যদিও এখন দোকলাম অচলাবস্থা নিয়ে মুখ বন্ধ রাখতে অনুরোধ করেছে, কিন্তু শ্রদ্ধাভাজন ভাষ্যকারদের ব্লগ পোস্ট এবং সামাজিক মাধ্যমে লেখালেখিতে আভাস পাওয়া যাচ্ছে, কয়েক মাস ধরে চলা তীব্র উত্তেজনার মধ্যে ভারতীয় বা চীনা সৈন্যরা মালভূমিটি দখল করে নেয়ার আইডিয়াটির ব্যাপারে অনেক মতানৈক্য রয়েছে। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এটা চোখ এড়িয়ে যাওয়ার কথা নয়, ভুটানি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় চলতি সপ্তাহে একমাত্র যে বিবৃতি ইস্যু করেছে তাতে ভারতের প্রতি কোনো ‘সাহায্যের আবেদনের’ কথা উল্লেখ করেনি বরং এতে চীনের প্রতি রাজনৈতিক উদ্যোগ গ্রহণের আহ্বান জানানো হয়েছে।
পরিশেষে বলা যায়, নয়া দিল্লির জন্য খুবই ভালো হবে ভুটানের ভেতরে রাজনৈতিক উপদলের মধ্যে পার্থক্য করা থেকে বিরত থাকা, যেমনটি তারা করেছিল নেপাল, বাংলাদেশ ও শ্রীলঙ্কার বেলায়। তাদের উচিত হবে ভুটানে কোনো ‘ভারতবিরোধী’ উপদল নেই, এমনটাই স্বীকৃতি দেয়া, যদিও তাদের কেউ কেউ চীনের সাথে সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার আহ্বান জানাচ্ছে।
প্রতিবেশীদের পূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গিতে ভারতের অবশ্যই সতর্ক থাকা উচিত, অন্য প্রতিবেশীরাও অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ দৃষ্টিতে দোকলাম উত্তেজনা প্রত্যক্ষ করছে। ভারত ও চীনের সঙ্গে ত্রিদেশীয় একটি ত্রিপক্ষীয় অবস্থানে রয়েছে ভুটান, এমন ক্ষীণ দৃষ্টি স্বীকৃতি দেয়া উচিত নয়। বরং উভয় দেশের সঙ্গে নেপাল, মিয়ানমার ও পাকিস্তানেরও ত্রিদেশীয় সীমান্ত (অন্তত মানচিত্রে) আছে। এছাড়া পাকিস্তান-অধিকৃত কাশ্মীরে ‘তৃতীয় দেশের’ উপস্থিতির ইঙ্গিত চীন দেয়াতে এসব সীমান্তের ওপরও আলো পড়েছে। এই অঞ্চলে ভুটানই একমাত্র দেশ, যে চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিঙে বেল্ট ও সড়ক উদ্যোগের মহাসম্মেলন বয়কটে ভারতের সঙ্গে যোগ দিয়েছিল। চীনা ভাবনা অনুযায়ী, দশকের পর দশক ধরে এসফল্ট ও কনক্রিটের জোরদার হওয়া ভারতের সাথে ভুটানের অনন্য সম্পর্কের যে কোনো ধরনের পুনর্বিবেচনা করাটা কেবল পুরস্কারই হবে না, বরং সম্ভাব্য লাভজনকও হবে।
ভারতীয় ভাষ্যে বেইজিংয়ের সঙ্গে নরেন্দ্র মোদি সরকারের দ্বিপক্ষীয় সমস্যার দিকে আলোকপাত করা হলেও চীনের আগ্রাসী অবস্থানের সঙ্গে ভারতের বৃহত্তর সমস্যাটা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে। তবে সত্য হলো, এই সঙ্কটটি ভুটানের নিজেকে আড়াআড়ি পথে দেখার ব্যাপারেও পরিণত হয়েছে। ভুটানের সাথে যে সম্পর্ক আছে, সেটার জের ধরে দেশটিকে নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখার যে বার্তা দিয়েছে এবং সামরিক পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে, তাতে ভারতের অবশ্যই খুশি হওয়া উচিত।
মূল: দ্য হিন্দু, অনুবাদ নেয়া হয়েছে সাউথ এশিয়ান মনিটর থেকে

Comments

comments

সম্পাদক : মোহাম্মদ আবদুল বাছির
প্রকাশক: মোহাম্মদ জহিরুল ইসলাম
ফোন : ‎০১৭১৩৪০৯০৯০
৩৪৫/১, দিলু রোড, নিউ ইস্কাটন, ঢাকা-১০০০
X
 
নিয়মিত খবর পড়তে আমাদের ফেসবুক পেজে লাইক দিয়ে যুক্ত থাকুন
X