শনিবার, ২৪শে ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ ইং, ১২ই ফাল্গুন, ১৪২৪ বঙ্গাব্দ, সকাল ৮:২৬
শিরোনাম
  • ঘৃণাকে বিজয়ী হতে দেয়া যাবে না, ট্রাম্পকে ইঙ্গিত করে জর্জ ক্লুনি
  • আমার একটাই চিন্তা দেশের মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন করা: প্রধানমন্ত্রী
  • ‘কেন্দ্রীয় সরকারের আগ্রাসী নীতির কারণে কাশ্মীরকে হারাতে হবে’
  • সাড়ে চারমাস পর মুখোমুখি, খাদিজাকে উদ্দেশ্য করে যা বলল বদরুল
  • খালেদার ‘সাজা’ বিরোধী নেতাকর্মীদের মনোবল ভাঙ্গার কৌশল!
  • বিএনপির কর্মসূচি ‘যথাসময়ে’ জানানো হবে: রিজভী
  • দলের জন্য বোলিং করতেও রাজি মুশফিক
  • শিশু জিহাদের মৃত্যু: চার জনের ১০ বছর করে কারাদণ্ড
  • অবশেষে বাড়ি অবরুদ্ধ করে রাখা সেই দেয়াল ভেঙ্গে ফেলা হচ্ছে
  • সাক্ষ্য দিলেন খাদিজা, চাইলেন বদরুলের সর্বোচ্চ শাস্তি
  • বদরুলের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিতে আদালতে খাদিজা
  • আজ বগুড়ায় যেসব প্রকল্প উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী
  • রোহিঙ্গা স্থানান্তরের সরকারি পরিকল্পনার সঙ্গে দ্বিমত মানবাধিকার কমিশনের
  • মহেশখালীতে ইয়াবা ব্যবসায়ীদের সঙ্গে পুলিশের ‘বন্দুকযুদ্ধ’
  • হোয়াইট হাউসে কাজ করার দীর্ঘ অভিজ্ঞতার কথা জানালেন এই বাংলাদেশি সাংবাদিক
Tuesday, September 20, 2016 11:09 pm
A- A A+ Print

ধূসর সাদা বরফ আচ্ছাদিত কাশ্মীর, লাল রক্তে রঞ্জিত

244797_1-1

‘ওহ, আমি তো বাংলাদেশকে সমর্থন করি। বাংলাদেশ খুব ভালো ক্রিকেট খেলে।’ বাংলাদেশের খেলা দেখেন? হ্যাঁ, টিভিতে দেখি। মাশরাফি খুব ভালো পেস বোলার। আমি মাশরাফির ভক্ত।’ বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের খেলা হলে, কোন দেশকে সমর্থন করেন? ‘বাংলাদেশ।’ ভারত না? ‘না, বাংলাদেশ।’ ভারত-পাকিস্তান ম্যাচে কোন দেশকে সমর্থন করেন? ‘পাকিস্তান।’ বাংলাদেশ-পাকিস্তান ম্যাচে? ‘পাকিস্তান।’ শ্রীনগর শহরের পাশে একটি আপেল বাগান। এই বাগানের কেয়ারটেকার বিশ বাইশ বছরের যুবকের সঙ্গে কথোপকথন, বছর তিনেক আগে । কাশ্মীর নিয়ে গবেষণা করে লিখছি না। সাধারণভাবে কাশ্মীর ও কাশ্মীরের মানুষ দেখে, তাদের সঙ্গে কথা বলে, কিছু পড়াশোনা করে জানা কাশ্মীর। কাশ্মীর, জম্মু ও লাদাখ এই তিনটি অঞ্চল নিয়ে জম্মু ও কাশ্মীর। রাজ্যটি গঠিত হয়েছিল ১৮৪৬ সালে। ইতিহাসের এত পেছনে যাচ্ছি না। ১৯৪৭ সালে দেশ ভাগের সময় জম্মু ও কাশ্মীর ভারতের সঙ্গে থাকতে চায়নি। তাদের রাখা হয়েছে। কিছু অংশ পাকিস্তানে, কিছু অংশ চীনের সঙ্গে থেকেছে। কাশ্মীরের ৪৩% ভারত, ৩৭% পাকিস্তান নিয়ন্ত্রণ করে। ১. আপেল বাগানের কেয়ারটেকার যুবকের মতো কাশ্মীরের সব মানুষই যে পাকিস্তানের পক্ষে, বিষয়টি তেমন নয়। তবে কাশ্মীরের অধিকাংশ মানুষের অবস্থান ভারতের বিরুদ্ধে। তারা পাকিস্তানের সঙ্গে একীভূত হতে চান না। ভারতের সঙ্গেও থাকতে চান না। পাকিস্তানের সঙ্গে গেলে তাদের সমস্যা আরও বাড়ত, এই উপলব্ধি আছে অনেকেরই। তারা আবার তীব্রভাবে ভারতীয় সেনাশাসনের বিরুদ্ধে। কাশ্মীর মুসলমান অধ্যুষিত, জম্মু হিন্দু অধ্যুষিত। জম্মু ও কাশ্মীরের মোট জনসংখ্যার ৫৭% বসবাস করে কাশ্মীরে। আন্দোলন-সংগ্রামও কাশ্মীর কেন্দ্রিক। কাশ্মীরীরা কেউ স্বাধীনতা চান, অনেকে পূর্ণাঙ্গ স্বায়ত্ত্বশাসন চান। জম্মু ভারতের সঙ্গে থাকতে চায়। লাদাখিরা সরাসরি দিল্লির নিয়ন্ত্রণে থাকতে চান। এক জটিল সমীকরণের মধ্যে পড়েছেজম্মু ও কাশ্মীর। যুদ্ধ-সন্ত্রাস-হত্যা রক্ত হয়ে গেছে জীবনের অংশ। গত কয়েকমাস ধরে কাশ্মীর উত্তাল। ২. কাশ্মীরের স্বাধীনতার জন্য যারা যুদ্ধ করছেন তাদের একজন নেতা ছিলেন বুরহান ওয়ানি। বলা যায় কাশ্মীরী তরুণদের আইকনে পরিণত হয়েছিলেন বুরহান। নিরাপত্তা বাহিনী তাকে হত্যার পর কাশ্মীর আবার বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছে।ভারতীয় সশস্ত্র বাহিনী শক্তভাবে দমন করছে। শতাধিক কাশ্মীরী নিহত হয়েছেন নিরাপত্তাবাহিনীর গুলিতে। বিক্ষোভ থামেনি। স্বাধীনতাকামীদের আক্রমণে ১৭ জন সেনা সদস্য নিহত হলেন সম্প্রতি। যা ভারতে আলোড়ন তৈরি করেছে। সাত-আট লাখ নিরাপত্তাবাহিনী কাশ্মীরে অবস্থান করছে বছরের পর বছর ধরে। তারপরও একবারে ১৭ জন সেনা সদস্যকে হত্যা করতে পারল কী করে? এই প্রশ্ন সর্বত্র। ৩. কাশ্মীরে যারা স্বাধীনতার দাবিতে সশস্ত্র সংগ্রাম করছে, ভারতের চোখে তারা সন্ত্রাসী-বিচ্ছিন্নতাবাদী। নিজেদেরকে তারা সন্ত্রাসী বা বিচ্ছিন্নতাবাদী মনে করেন না। তারা মনে করেন কাশ্মীরীদের মুক্তির জন্যে তারা সংগ্রাম করছেন, তারা মোজাহিদ। পাকিস্তান তাদের আশ্রয়-প্রশ্রয়-সহায়তা দেয়। কাশ্মীরের জনগণ ভারত-পাকিস্তানের রাজনীতির ফাঁদে পড়ে গেছে। যে কোনো ঘটনা-দুর্ঘটনা ঘটলেই ভারত দায়ি করছে পাকিস্তানকে, পাকিস্তান দায়ি করছে ভারতকে। ভারত সমগ্র জম্মু ও কাশ্মীরকে তার অধীনে চায়, পাকিস্তানও তাই চায়। কাশ্মীর নিয়ে এখন পর্যন্ত ১৯৪৭, ১৯৬৫, ১৯৯৯ সালে তিনটি যুদ্ধ করেছে ভারত-পাকিস্তান। খণ্ড যুদ্ধ হয়েছে অসংখ্য। কাশ্মীর সমস্যার সামান্যতমও সমাধান হয়নি, আরও জটিল হয়েছে। এখন আরেকটি যুদ্ধাবস্থা তৈরি হয়েছে। ভারত-পাকিস্তানের শাসকেরা তাদের রাজনৈতিক সুবিধার কথা যতটা ভাবছে, কাশ্মীরী জনগণের কথা ততটা ভাবছে না। ভারত সশস্ত্র সংগ্রামরত কাশ্মিরীদের বলছে 'সন্ত্রাসী -বিচ্ছিন্নতাবাদী' আবার পাকিস্তানের বেলুচিস্তানের স্বাধীনতার পক্ষে কথা বলছে। একটির সঙ্গে আরেকটি মিলছে না। ৪. কাশ্মীরের মুসলমানরা কেনো ভারতকে পছন্দ করেন না, কেনো ভারতের অধীনে থাকতে চান না, ভারতীয় শাসকরা কখনো তা সংবেদনশীল মন নিয়ে ভেবে দেখেননি। সায়ত্ত্বশাসন দিতে চাইলেও নানা টালবাহানা করেছেন। কাশ্মিরীদের কাছে ভারতীয় শাসকরা বিশ্বাসযোগ্যতা হারিয়েছেন। ফলে কখনো কখনো সমস্যা সমাধানে অগ্রগতি পরিলক্ষিত হলেও, তা স্থায়ী রূপ পায়নি। স্থায়ী রূপ না পাওয়ার পেছনে নিশ্চয়ই পাকিস্তানের একটা ভূমিকা আছে। তার চেয়ে বড় দায় আছে ভারতীয় শাসকদের। ভারত একটি গণতান্ত্রিক দেশ। কিন্তু জম্মু ও কাশ্মীর শাসন করতে চেয়েছে শক্তি প্রয়োগের নীতিতে। রাজনৈতিক উপায়ের চেয়ে সামরিক উপায়ে সমাধানে জোর দিয়েছে ভারত। সামরিক উপায়ে যে এমন সমস্যার সমাধান হয় না, তার বহু নজির আছে। ভারতেই আছে। বাংলাদেশ সংলগ্ন সেভেন সিস্টারস রাজ্যগুলোর সমস্যা সামরিক উপায়ে সমাধান করতে পারেনি ভারত। বহু বছর চেষ্টা করেও পারেনি। বাংলাদেশে আশ্রয়-প্রশ্রয় নিয়ে রাজ্যগুলো অশান্ত করে রেখেছিল বিদ্রোহীরা। গত কয়েক বছরে শেখ হাসিনার সরকারের সহায়তায় আলোচনার মাধ্যমে এই সমস্যার সমাধানের ক্ষেত্রে অনেক দূর এগিয়েছে ভারত। বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রাম সমস্যা ২৭ বছরেও সমাধান করা যায়নি সামরিক উপায়ে। রাজনৈতিক উপায়ে হাঁটা গেছে সমাধানের পথে। ৫. কাশ্মীরের যুবকরা কেন দলে দলে সশস্ত্র সংগ্রামে যোগ দিল, একজন বুরহান কেন কাশ্মীরী যুবকদের আইকনে পরিণত হলো, তা ভারতীয় শাসকরা ভেবে দেখেনি, দেখছে না। এটা যে শুধুই সন্ত্রাসী কর্মকান্ড নয়, এর পেছনে যে নিপীড়ন-নির্যাতনের দায় আছে শাসকদের, তা বিবেচনায় নেয়া হয়নি। শুধু পাকিস্তানের প্ররোচনায় যুবকরা সশস্ত্র সংগ্রামে যোগ দিয়েছে, মোটেই বিষয়টি এত সরল নয়। পাকিস্তানের সহায়তা প্ররোচনা বা আশ্রয়-প্রশ্রয় আছে সত্য, যুবকদের মনে ভারতীয় শাসকদের প্রতি তীব্র ঘৃণাও আছে। যা পাকিস্তান তৈরি করে দিতে পারেনি, ভারতীয় শাসকদের নীতি-এই ঘৃণা তৈরি করেছে। ৬. শ্রীনগরের যুবক জিপ চালক জাভেদ। স্ত্রী এবং দুই সন্তান নিয়ে তার সংসার। সে কোনো কিছু চায় না, শান্ত পরিবেশ চায়। সেনা ছাউনির দিকে হাত দেখিয়ে বলে, এই দুঃশাসন বন্ধ হোক। কথায় কথায় তারা আমাদের হত্যা করে।জাভেদের বক্তব্যের সত্য-মিথ্যা নিয়ে আমরা তর্ক করতে পারব। কিন্তু সেনাদের বিষয়ে তার এই অনুভূতি তো সত্য। সেনা দিয়ে দমন পীড়ন করে তো তার আনুগত্য পাওয়া যাবে না। ডাল লেকে একটি হাউজবোটের মালিক রাজ্জাক চাচা। তিনি বঙ্গবন্ধুকে জানেন। পাকিস্তানি শাসকদের নিপীড়নের কারণেই বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার ডাক দিয়েছিলেন বলে বিশ্বাস করেন। মনে করেন, ভারতীয় শাসকরাও তাদের উপর নিপীড়ন করছেন। নিপীড়নে বাধ্য হয়ে কাশ্মীরের যুবকরা সশস্ত্র সংগ্রামে যেতে বাধ্য হচ্ছেন। তিনি মনে করেন, এই সংগ্রামের শেষ নেই। আবার কাশ্মীরীদের অন্য কোনো উপায়ও নেই। রাজ্জাক চাচা বলেন, যত পর্যটক আসবে, আমরা তত ভালো থাকব। সেনাদের নিপীড়ন নির্যাতনে বারবার পরিবেশ অশান্ত হয়ে ওঠে। পর্যটক আসে না। ৭.কাশ্মিরীরা মানুষ হিসেবে অসাধারণ। কোথাও কোনো দালাল বা টাউট -বাটপার দেখিনি। অসম্ভব ভদ্র -নম্র -বিনয়ী। অল্প কয়েকদিনের দেখা -জানায় তাদেরকে ভালো মানুষ মনে হয়েছে। ভারতের অনেক জায়গায় পর্যটকদের নানা রকমের প্রতারণার শিকার হতে হয়। কাশ্মীরে তার ছিটেফোঁটাও আছে বলে মনে হয় নি। আবার এই কাশ্মীরীরাই নির্যাতনের শিকার হচ্ছে, অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করছে, মরছে -মারছে! ৮. কাশ্মীরীরা মনে করেন, ভারতের অধীনে তারা ভালো নেই। ভালো থাকবেন না, পাকিস্তানের অধীনে গেলেও। সশস্ত্র সংগ্রাম করে স্বাধীন হওয়াও প্রায় অসম্ভব। পূর্ণাঙ্গ সায়ত্ত্বশাসনের মাধ্যমে সেনা শাসনের অবসান, অধিকাংশ কাশ্মীরীর চাওয়া। শাসকদের কাছে সেই চাওয়ার কোনো মূল্য নেই। কাশ্মীরীদের নিয়ে রাজনীতি হয়, কাশ্মীরীরা কি চান, তা জানতে চাওয়া হয় না।কাশ্মীরীদের ভালো রাখা ভারত বা পাকিস্তানের উদ্দেশ্য নয়। গোটা কাশ্মীরের নিয়ন্ত্রণ নেয়া তাদের মূল লক্ষ্য। কাশ্মীরের নিয়ন্ত্রণ ভারতের অধীনে থাকলে তার অনেক সুবিধা। পাকিস্তানকে এড়িয়ে রাশিয়া, মধ্য এশিয়া, আফগানিস্তান ও আরব বিশ্বের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ স্থাপন করতে পারবে ভারত। পূর্ণ-নিয়ন্ত্রণ থাকলে পাকিস্তানেরও লাভ। তারা সরাসরি চীনের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করতে পারবে। পাকিস্তানের প্রায় সবগুলো নদীর উৎস কাশ্মীর। ভারত-পাকিস্তানের জটিল রাজনৈতিক সমীকরণে অসহায় কাশ্মীরী জনগণ। যুবকরা যুগযুগ ধরে আন্দোলন করবেন, জীবন দিবেন। শাসকরা সেনা শাসন চালাবেন। সেনারা মারবেন, মরবেনও। জাভেদ, রাজ্জাক চাচারা পর্যটকের অপেক্ষায় থাকবেন, বছরের অধিকাংশ সময় পর্যটক পাবেন না। তীব্র ভারতবিরোধী মনোভাব নিয়ে জীবন চলতে থাকবে...। ৯. শ্রীনগর, গুলমার্গ, সোনমার্গ সত্যি অপরূপা। কাশ্মীর সত্যি ভূ-স্বর্গ। ধূসর সাদা বরফ আচ্ছাদিত ভূ-স্বর্গ, লাল রক্তে ঢাকা পড়ছে দিন দিন। গোলাম মোর্তোজা : সম্পাদক, সাপ্তাহিক।

Comments

Comments!

 ধূসর সাদা বরফ আচ্ছাদিত কাশ্মীর, লাল রক্তে রঞ্জিতAmarbangladeshonlineAmarbangladeshonline | Amarbangladeshonline

ধূসর সাদা বরফ আচ্ছাদিত কাশ্মীর, লাল রক্তে রঞ্জিত

Tuesday, September 20, 2016 11:09 pm
244797_1-1

‘ওহ, আমি তো বাংলাদেশকে সমর্থন করি। বাংলাদেশ খুব ভালো ক্রিকেট খেলে।’ বাংলাদেশের খেলা দেখেন? হ্যাঁ, টিভিতে দেখি। মাশরাফি খুব ভালো পেস বোলার। আমি মাশরাফির ভক্ত।’ বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের খেলা হলে, কোন দেশকে সমর্থন করেন? ‘বাংলাদেশ।’ ভারত না? ‘না, বাংলাদেশ।’ ভারত-পাকিস্তান ম্যাচে কোন দেশকে সমর্থন করেন? ‘পাকিস্তান।’ বাংলাদেশ-পাকিস্তান ম্যাচে? ‘পাকিস্তান।’

শ্রীনগর শহরের পাশে একটি আপেল বাগান। এই বাগানের কেয়ারটেকার বিশ বাইশ বছরের যুবকের সঙ্গে কথোপকথন, বছর তিনেক আগে । কাশ্মীর নিয়ে গবেষণা করে লিখছি না। সাধারণভাবে কাশ্মীর ও কাশ্মীরের মানুষ দেখে, তাদের সঙ্গে কথা বলে, কিছু পড়াশোনা করে জানা কাশ্মীর। কাশ্মীর, জম্মু ও লাদাখ এই তিনটি অঞ্চল নিয়ে জম্মু ও কাশ্মীর। রাজ্যটি গঠিত হয়েছিল ১৮৪৬ সালে।

ইতিহাসের এত পেছনে যাচ্ছি না। ১৯৪৭ সালে দেশ ভাগের সময় জম্মু ও কাশ্মীর ভারতের সঙ্গে থাকতে চায়নি। তাদের রাখা হয়েছে। কিছু অংশ পাকিস্তানে, কিছু অংশ চীনের সঙ্গে থেকেছে। কাশ্মীরের ৪৩% ভারত, ৩৭% পাকিস্তান নিয়ন্ত্রণ করে।

১. আপেল বাগানের কেয়ারটেকার যুবকের মতো কাশ্মীরের সব মানুষই যে পাকিস্তানের পক্ষে, বিষয়টি তেমন নয়। তবে কাশ্মীরের অধিকাংশ মানুষের অবস্থান ভারতের বিরুদ্ধে। তারা পাকিস্তানের সঙ্গে একীভূত হতে চান না। ভারতের সঙ্গেও থাকতে চান না। পাকিস্তানের সঙ্গে গেলে তাদের সমস্যা আরও বাড়ত, এই উপলব্ধি আছে অনেকেরই। তারা আবার তীব্রভাবে ভারতীয় সেনাশাসনের বিরুদ্ধে।

কাশ্মীর মুসলমান অধ্যুষিত, জম্মু হিন্দু অধ্যুষিত। জম্মু ও কাশ্মীরের মোট জনসংখ্যার ৫৭% বসবাস করে কাশ্মীরে। আন্দোলন-সংগ্রামও কাশ্মীর কেন্দ্রিক। কাশ্মীরীরা কেউ স্বাধীনতা চান, অনেকে পূর্ণাঙ্গ স্বায়ত্ত্বশাসন চান। জম্মু ভারতের সঙ্গে থাকতে চায়। লাদাখিরা সরাসরি দিল্লির নিয়ন্ত্রণে থাকতে চান। এক জটিল সমীকরণের মধ্যে পড়েছেজম্মু ও কাশ্মীর। যুদ্ধ-সন্ত্রাস-হত্যা রক্ত হয়ে গেছে জীবনের অংশ। গত কয়েকমাস ধরে কাশ্মীর উত্তাল।

২. কাশ্মীরের স্বাধীনতার জন্য যারা যুদ্ধ করছেন তাদের একজন নেতা ছিলেন বুরহান ওয়ানি। বলা যায় কাশ্মীরী তরুণদের আইকনে পরিণত হয়েছিলেন বুরহান। নিরাপত্তা বাহিনী তাকে হত্যার পর কাশ্মীর আবার বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছে।ভারতীয় সশস্ত্র বাহিনী শক্তভাবে দমন করছে। শতাধিক কাশ্মীরী নিহত হয়েছেন নিরাপত্তাবাহিনীর গুলিতে। বিক্ষোভ থামেনি।

স্বাধীনতাকামীদের আক্রমণে ১৭ জন সেনা সদস্য নিহত হলেন সম্প্রতি। যা ভারতে আলোড়ন তৈরি করেছে। সাত-আট লাখ নিরাপত্তাবাহিনী কাশ্মীরে অবস্থান করছে বছরের পর বছর ধরে। তারপরও একবারে ১৭ জন সেনা সদস্যকে হত্যা করতে পারল কী করে? এই প্রশ্ন সর্বত্র।

৩. কাশ্মীরে যারা স্বাধীনতার দাবিতে সশস্ত্র সংগ্রাম করছে, ভারতের চোখে তারা সন্ত্রাসী-বিচ্ছিন্নতাবাদী। নিজেদেরকে তারা সন্ত্রাসী বা বিচ্ছিন্নতাবাদী মনে করেন না। তারা মনে করেন কাশ্মীরীদের মুক্তির জন্যে তারা সংগ্রাম করছেন, তারা মোজাহিদ। পাকিস্তান তাদের আশ্রয়-প্রশ্রয়-সহায়তা দেয়। কাশ্মীরের জনগণ ভারত-পাকিস্তানের রাজনীতির ফাঁদে পড়ে গেছে। যে কোনো ঘটনা-দুর্ঘটনা ঘটলেই ভারত দায়ি করছে পাকিস্তানকে, পাকিস্তান দায়ি করছে ভারতকে।

ভারত সমগ্র জম্মু ও কাশ্মীরকে তার অধীনে চায়, পাকিস্তানও তাই চায়। কাশ্মীর নিয়ে এখন পর্যন্ত ১৯৪৭, ১৯৬৫, ১৯৯৯ সালে তিনটি যুদ্ধ করেছে ভারত-পাকিস্তান। খণ্ড যুদ্ধ হয়েছে অসংখ্য। কাশ্মীর সমস্যার সামান্যতমও সমাধান হয়নি, আরও জটিল হয়েছে। এখন আরেকটি যুদ্ধাবস্থা তৈরি হয়েছে।

ভারত-পাকিস্তানের শাসকেরা তাদের রাজনৈতিক সুবিধার কথা যতটা ভাবছে, কাশ্মীরী জনগণের কথা ততটা ভাবছে না। ভারত সশস্ত্র সংগ্রামরত কাশ্মিরীদের বলছে ‘সন্ত্রাসী -বিচ্ছিন্নতাবাদী’ আবার পাকিস্তানের বেলুচিস্তানের স্বাধীনতার পক্ষে কথা বলছে। একটির সঙ্গে আরেকটি মিলছে না।

৪. কাশ্মীরের মুসলমানরা কেনো ভারতকে পছন্দ করেন না, কেনো ভারতের অধীনে থাকতে চান না, ভারতীয় শাসকরা কখনো তা সংবেদনশীল মন নিয়ে ভেবে দেখেননি। সায়ত্ত্বশাসন দিতে চাইলেও নানা টালবাহানা করেছেন। কাশ্মিরীদের কাছে ভারতীয় শাসকরা বিশ্বাসযোগ্যতা হারিয়েছেন।

ফলে কখনো কখনো সমস্যা সমাধানে অগ্রগতি পরিলক্ষিত হলেও, তা স্থায়ী রূপ পায়নি। স্থায়ী রূপ না পাওয়ার পেছনে নিশ্চয়ই পাকিস্তানের একটা ভূমিকা আছে। তার চেয়ে বড় দায় আছে ভারতীয় শাসকদের। ভারত একটি গণতান্ত্রিক দেশ। কিন্তু জম্মু ও কাশ্মীর শাসন করতে চেয়েছে শক্তি প্রয়োগের নীতিতে।

রাজনৈতিক উপায়ের চেয়ে সামরিক উপায়ে সমাধানে জোর দিয়েছে ভারত। সামরিক উপায়ে যে এমন সমস্যার সমাধান হয় না, তার বহু নজির আছে। ভারতেই আছে। বাংলাদেশ সংলগ্ন সেভেন সিস্টারস রাজ্যগুলোর সমস্যা সামরিক উপায়ে সমাধান করতে পারেনি ভারত। বহু বছর চেষ্টা করেও পারেনি। বাংলাদেশে আশ্রয়-প্রশ্রয় নিয়ে রাজ্যগুলো অশান্ত করে রেখেছিল বিদ্রোহীরা। গত কয়েক বছরে শেখ হাসিনার সরকারের সহায়তায় আলোচনার মাধ্যমে এই সমস্যার সমাধানের ক্ষেত্রে অনেক দূর এগিয়েছে ভারত। বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রাম সমস্যা ২৭ বছরেও সমাধান করা যায়নি সামরিক উপায়ে। রাজনৈতিক উপায়ে হাঁটা গেছে সমাধানের পথে।

৫. কাশ্মীরের যুবকরা কেন দলে দলে সশস্ত্র সংগ্রামে যোগ দিল, একজন বুরহান কেন কাশ্মীরী যুবকদের আইকনে পরিণত হলো, তা ভারতীয় শাসকরা ভেবে দেখেনি, দেখছে না। এটা যে শুধুই সন্ত্রাসী কর্মকান্ড নয়, এর পেছনে যে নিপীড়ন-নির্যাতনের দায় আছে শাসকদের, তা বিবেচনায় নেয়া হয়নি।

শুধু পাকিস্তানের প্ররোচনায় যুবকরা সশস্ত্র সংগ্রামে যোগ দিয়েছে, মোটেই বিষয়টি এত সরল নয়। পাকিস্তানের সহায়তা প্ররোচনা বা আশ্রয়-প্রশ্রয় আছে সত্য, যুবকদের মনে ভারতীয় শাসকদের প্রতি তীব্র ঘৃণাও আছে। যা পাকিস্তান তৈরি করে দিতে পারেনি, ভারতীয় শাসকদের নীতি-এই ঘৃণা তৈরি করেছে।

৬. শ্রীনগরের যুবক জিপ চালক জাভেদ। স্ত্রী এবং দুই সন্তান নিয়ে তার সংসার। সে কোনো কিছু চায় না, শান্ত পরিবেশ চায়। সেনা ছাউনির দিকে হাত দেখিয়ে বলে, এই দুঃশাসন বন্ধ হোক। কথায় কথায় তারা আমাদের হত্যা করে।জাভেদের বক্তব্যের সত্য-মিথ্যা নিয়ে আমরা তর্ক করতে পারব। কিন্তু সেনাদের বিষয়ে তার এই অনুভূতি তো সত্য।

সেনা দিয়ে দমন পীড়ন করে তো তার আনুগত্য পাওয়া যাবে না। ডাল লেকে একটি হাউজবোটের মালিক রাজ্জাক চাচা। তিনি বঙ্গবন্ধুকে জানেন। পাকিস্তানি শাসকদের নিপীড়নের কারণেই বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার ডাক দিয়েছিলেন বলে বিশ্বাস করেন। মনে করেন, ভারতীয় শাসকরাও তাদের উপর নিপীড়ন করছেন। নিপীড়নে বাধ্য হয়ে কাশ্মীরের যুবকরা সশস্ত্র সংগ্রামে যেতে বাধ্য হচ্ছেন। তিনি মনে করেন, এই সংগ্রামের শেষ নেই। আবার কাশ্মীরীদের অন্য কোনো উপায়ও নেই। রাজ্জাক চাচা বলেন, যত পর্যটক আসবে, আমরা তত ভালো থাকব। সেনাদের নিপীড়ন নির্যাতনে বারবার পরিবেশ অশান্ত হয়ে ওঠে। পর্যটক আসে না।

৭.কাশ্মিরীরা মানুষ হিসেবে অসাধারণ। কোথাও কোনো দালাল বা টাউট -বাটপার দেখিনি। অসম্ভব ভদ্র -নম্র -বিনয়ী। অল্প কয়েকদিনের দেখা -জানায় তাদেরকে ভালো মানুষ মনে হয়েছে। ভারতের অনেক জায়গায় পর্যটকদের নানা রকমের প্রতারণার শিকার হতে হয়। কাশ্মীরে তার ছিটেফোঁটাও আছে বলে মনে হয় নি। আবার এই কাশ্মীরীরাই নির্যাতনের শিকার হচ্ছে, অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করছে, মরছে -মারছে!

৮. কাশ্মীরীরা মনে করেন, ভারতের অধীনে তারা ভালো নেই। ভালো থাকবেন না, পাকিস্তানের অধীনে গেলেও। সশস্ত্র সংগ্রাম করে স্বাধীন হওয়াও প্রায় অসম্ভব। পূর্ণাঙ্গ সায়ত্ত্বশাসনের মাধ্যমে সেনা শাসনের অবসান, অধিকাংশ কাশ্মীরীর চাওয়া। শাসকদের কাছে সেই চাওয়ার কোনো মূল্য নেই।

কাশ্মীরীদের নিয়ে রাজনীতি হয়, কাশ্মীরীরা কি চান, তা জানতে চাওয়া হয় না।কাশ্মীরীদের ভালো রাখা ভারত বা পাকিস্তানের উদ্দেশ্য নয়। গোটা কাশ্মীরের নিয়ন্ত্রণ নেয়া তাদের মূল লক্ষ্য। কাশ্মীরের নিয়ন্ত্রণ ভারতের অধীনে থাকলে তার অনেক সুবিধা। পাকিস্তানকে এড়িয়ে রাশিয়া, মধ্য এশিয়া, আফগানিস্তান ও আরব বিশ্বের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ স্থাপন করতে পারবে ভারত। পূর্ণ-নিয়ন্ত্রণ থাকলে পাকিস্তানেরও লাভ। তারা সরাসরি চীনের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করতে পারবে।

পাকিস্তানের প্রায় সবগুলো নদীর উৎস কাশ্মীর। ভারত-পাকিস্তানের জটিল রাজনৈতিক সমীকরণে অসহায় কাশ্মীরী জনগণ। যুবকরা যুগযুগ ধরে আন্দোলন করবেন, জীবন দিবেন। শাসকরা সেনা শাসন চালাবেন। সেনারা মারবেন, মরবেনও। জাভেদ, রাজ্জাক চাচারা পর্যটকের অপেক্ষায় থাকবেন, বছরের অধিকাংশ সময় পর্যটক পাবেন না। তীব্র ভারতবিরোধী মনোভাব নিয়ে জীবন চলতে থাকবে…।

৯. শ্রীনগর, গুলমার্গ, সোনমার্গ সত্যি অপরূপা। কাশ্মীর সত্যি ভূ-স্বর্গ। ধূসর সাদা বরফ আচ্ছাদিত ভূ-স্বর্গ, লাল রক্তে ঢাকা পড়ছে দিন দিন।

গোলাম মোর্তোজা : সম্পাদক, সাপ্তাহিক।

Comments

comments

সম্পাদক : মোহাম্মদ আবদুল বাছির
প্রকাশক: মোহাম্মদ জহিরুল ইসলাম
ফোন : ‎০১৭১৩৪০৯০৯০
৩৪৫/১, দিলু রোড, নিউ ইস্কাটন, ঢাকা-১০০০
X
 
নিয়মিত খবর পড়তে আমাদের ফেসবুক পেজে লাইক দিয়ে যুক্ত থাকুন
X