শনিবার, ২৪শে ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ ইং, ১২ই ফাল্গুন, ১৪২৪ বঙ্গাব্দ, রাত ১০:২০
শিরোনাম
  • ঘৃণাকে বিজয়ী হতে দেয়া যাবে না, ট্রাম্পকে ইঙ্গিত করে জর্জ ক্লুনি
  • আমার একটাই চিন্তা দেশের মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন করা: প্রধানমন্ত্রী
  • ‘কেন্দ্রীয় সরকারের আগ্রাসী নীতির কারণে কাশ্মীরকে হারাতে হবে’
  • সাড়ে চারমাস পর মুখোমুখি, খাদিজাকে উদ্দেশ্য করে যা বলল বদরুল
  • খালেদার ‘সাজা’ বিরোধী নেতাকর্মীদের মনোবল ভাঙ্গার কৌশল!
  • বিএনপির কর্মসূচি ‘যথাসময়ে’ জানানো হবে: রিজভী
  • দলের জন্য বোলিং করতেও রাজি মুশফিক
  • শিশু জিহাদের মৃত্যু: চার জনের ১০ বছর করে কারাদণ্ড
  • অবশেষে বাড়ি অবরুদ্ধ করে রাখা সেই দেয়াল ভেঙ্গে ফেলা হচ্ছে
  • সাক্ষ্য দিলেন খাদিজা, চাইলেন বদরুলের সর্বোচ্চ শাস্তি
  • বদরুলের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিতে আদালতে খাদিজা
  • আজ বগুড়ায় যেসব প্রকল্প উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী
  • রোহিঙ্গা স্থানান্তরের সরকারি পরিকল্পনার সঙ্গে দ্বিমত মানবাধিকার কমিশনের
  • মহেশখালীতে ইয়াবা ব্যবসায়ীদের সঙ্গে পুলিশের ‘বন্দুকযুদ্ধ’
  • হোয়াইট হাউসে কাজ করার দীর্ঘ অভিজ্ঞতার কথা জানালেন এই বাংলাদেশি সাংবাদিক
Monday, July 24, 2017 7:31 am
A- A A+ Print

ধৈর্য ধরার নির্দেশনা উপেক্ষা, মারমুখী পুলিশ

ca65114555669e45d8a1442fa67a1fc4-597506d7b7dd4

ধৈর্য ও সহনশীলতা প্রদর্শনে সদর দপ্তরের নির্দেশনা উপেক্ষা করে মিছিল-সমাবেশ নিয়ন্ত্রণে কঠোর পন্থা বজায় রাখছেন মাঠপর্যায়ে পুলিশ সদস্যরা। এসব ক্ষেত্রে কৌশলের চেয়ে জবরদস্তিতেই তাঁদের আগ্রহ বেশি। সবশেষ শাহবাগে পুলিশি হামলায় একজন ছাত্র দৃষ্টিশক্তি হারানোয় পুলিশের এ মারমুখী প্রবণতা আবার আলোচনায় এসেছে। পদস্থ পুলিশ কর্মকর্তারাও এ নিয়ে বিব্রত।

পুলিশ সদর দপ্তরের সহকারী মহাপরিদর্শক মনিরুজ্জামান প্রথম আলোকে বলেন, সদর দপ্তর থেকে পুলিশ সুপারদের কাছে একটি বার্তা দেওয়া হয়েছে শাহবাগের ওই ঘটনার আগে আগে। সেখানে জনশৃঙ্খলা রক্ষায় সর্বোচ্চ ধৈর্য, সহনশীলতা ও পেশাদারি দেখাতে বলা হয়েছিল।

মানবাধিকার কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মধ্যে চেইন অব কমান্ড কতটা আছে, সেটা দেখা দরকার। পুলিশের বিরুদ্ধে যখনই কোনো অভিযোগ ওঠে, তখনই বলা হয় জানমালের নিরাপত্তার স্বার্থে পুলিশ দায়িত্ব পালন করেছে। আসলে কতটা কী সেটা ভালোভাবে তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। কারও বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিলেও সেটা যেন দৃশ্যমান হয়, সেটাও নিশ্চিত হওয়া দরকার।

এ দফায় পুলিশের বলপ্রয়োগের প্রথম ঘটনাটি ঘটে গত মঙ্গলবার রাতে খুলনায়। এর শিকার শাহজামাল ওরফে শাহজালাল (৩১)। পরিবারের অভিযোগ, পুলিশ শাহজালালের দুই চোখ নষ্ট করে দিয়েছে। শাহজামালের স্ত্রী রাহেলা বেগম জানান, ছিনতাইকারী সন্দেহে ওই রাতে তাঁর স্বামীকে থানায় নিয়ে যাওয়া হয়। তিনি নিজে থানায় তাঁর স্বামীকে সুস্থ-স্বাভাবিক দেখেছেন। পরদিন সকালে শোনেন তাঁর স্বামী খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি। শাহজামালের বাবা মো. জাকির হোসেন গতকাল রোববার প্রথম আলোকে বলেন, ঢাকা মেডিকেল কলেজে অস্ত্রোপচার করে তাঁর ছেলের দুই চোখ তুলে নেওয়া হয়েছে। শাহজালাল এখন অন্ধ।

খুলনায় মহানগর পুলিশের (কেএমপি) খালিশপুর জোনের সহকারী পুলিশ কমিশনার মো. আশরাফ হোসেন বলেন, গণপিটুনির সময় ওই ছিনতাইকারীর চোখ উপড়ে ফেলে উত্তেজিত জনতা।

এ ছাড়া এ বছরের জানুয়ারিতে সুন্দরবনে রামপাল প্রকল্পের বিরুদ্ধে আন্দোলনের সময় পুলিশ শাহবাগে এক ব্যক্তিকে মাটিতে ফেলে পেটায়।

গত ১৮ মে মেডিক্যাল অ্যাসিসটেন্ট ট্রেনিং স্কুলের শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভে পুলিশ লাঠিপেটা করে ও টিয়ারশেল ছোঁড়ে। ওই ঘটনায় কমপক্ষে তিনশ ছাত্র আহত হয় বলে দাবি করে শিক্ষার্থীরা।

এ ছাড়া বরগুনা সদরের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা গাজী তারেক সালমনকে কোর্ট-হাজতে নিয়ে যাওয়ার সময় অযথা টানাহেঁচড়া করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

সর্বশেষ ঘটনাটি ঘটে বৃহস্পতিবার। ওই দিন শাহবাগে বিক্ষোভের সময় সিদ্দিকুর রহমান নামে তিতুমীর কলেজের যে শিক্ষার্থী দৃষ্টিশক্তি হারাতে বসেছেন, প্রত্যক্ষদর্শীদের অভিযোগ, তিনি আহত হয়েছেন পুলিশের ছোড়া টিয়ার শেলের আঘাতে।

এ ঘটনায় মাত্রাতিরিক্ত বলপ্রয়োগের প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও পুলিশ দায় এড়ানোর চেষ্টা করেছে। শাহবাগে ছাত্র সমাবেশে পুলিশের হামলার একাধিক ভিডিও ফুটেজ রয়েছে। জাতীয় জাদুঘর প্রান্তের পদচারী-সেতু থেকে ধারণ করা একটি ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, জনা পঞ্চাশেক ছাত্রের একটি মিছিল জাদুঘরের সামনে থেকে এগোনোর চেষ্টা করছে। সে সময় অতর্কিতে একদল পুলিশ তাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের দিকে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করে। এর মধ্যেই সমাবেশ থেকে কয়েক হাত দূরত্বে থাকা একজন পুলিশ সদস্য ছাত্রদের লক্ষ্য করে টিয়ার শেল ছোড়েন। ঘটনাস্থলে সিদ্দিকুর পড়ে যান। এরপর ঘটনাস্থল থেকে পুলিশ সদস্যরা কিছুটা দূরে সরে যান। পরে আন্দোলনরত তরুণেরা সিদ্দিকুরকে ধরাধরি করে তুলে হাসপাতালের দিকে নিয়ে যান। তাঁকে তোলার পর ঘটনাস্থলে চাপ চাপ রক্ত দেখা যায়।

ওই হামলার ভিডিও ভাইরাল হওয়ার পরও ঢাকা মহানগর পুলিশ কমিশনার মো. আছাদুজ্জামান মিয়া বলেন, ‘আমি পরস্পরবিরোধী বক্তব্য শুনেছি। পুলিশ আমাকে বলেছে ছাত্রদের ছোড়া ইট-পাটকেলের আঘাতে তার এমন হয়েছে। ছাত্ররা দাবি করেছে টিয়ার শেল তার কপালে লেগেছে। আমরা বিষয়টি তদন্ত করছি।’

এর আগে পয়লা বৈশাখে যৌন নিপীড়নবিরোধী বিক্ষোভ পুলিশের নির্যাতনে ৩৩ জন আহত হন। ছাত্র ইউনিয়নের একজন নারী কর্মী ইসমত জাহানকে পুলিশ বেদম পেটায়। সমালোচনার মুখে পুলিশ বলে, ওই নারী পুলিশের গাড়িতে টব ছুড়ে মেরেছেন।

বরগুনা সদরের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা গাজী তারেক সালমনকে বলপ্রয়োগ করে টেনেহিঁচড়ে কোর্ট-হাজতে নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ তথ্যনির্ভর নয় বলে দাবি করেছে পুলিশ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশন। যদিও পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক সচিব ও পুলিশের সাবেক শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তা নব বিক্রম কিশোর ত্রিপুরা তাঁর ফেসবুক স্ট্যাটাসে লিখেছেন, আসামি পালিয়ে যাওয়া প্রতিরোধে যতটুকু কড়াকড়ি করা দরকার, শুধু ততটুকুই করার কথা বলা হয়েছে পুলিশ প্রবিধানে। তিনি উপজেলা পর্যায়ে সর্বোচ্চ পদে থাকা একজন কর্মকর্তাকে হাতকড়া পরানোর যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তিনি আরও বলেন, বিচার প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন যাঁরা, সেই বিচারক থেকে শুরু করে একেবারে মাঠপর্যায়ে যাঁরা আইন প্রয়োগ করছেন, তাঁদের আইনকানুন ভালোভাবে জানা প্রয়োজন।

তবে পুলিশের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, পুরো পরিস্থিতি নিয়ে তাঁরা নিজেরাই অস্বস্তিতে আছেন। মানুষের মধ্যে যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে, তা প্রশমনের জন্য তিতুমীর কলেজের ছাত্র সিদ্দিকুর রহমানের দায়িত্ব নেওয়ার কথা তাঁরা ভাবছেন। পুলিশের অতিরিক্ত উপকমিশনার পর্যায়ের একজন কর্মকর্তা বলেন, দাঙ্গা দমন সম্পর্কে সুস্পষ্ট নির্দেশনা আছে। পুলিশ প্রবিধানে অভিযান পরিচালনাকারী পুলিশ কর্মকর্তাকে বলা হয়েছে, তিনি পুলিশ সদস্যদের জনতার এত কাছাকাছি নিয়ে যাবেন না, যেন জনতার আকস্মিক হামলায় তাদের নাজেহাল হতে হয়, বা বহু লোকের হতাহতের ঝুঁকি তৈরি হয়। শাহবাগের যে ভিডিওটি দেখা গেছে, তাতে পুলিশ সদস্যদের সমাবেশের কয়েক হাত দূর থেকে টিয়ার শেল ছুড়তে দেখা গেছে। অপর একজন কর্মকর্তা মাঠপর্যায়ে পুলিশ সদস্যদের দায়ী করেন। তিনি বলেন, অনেক পুলিশ সদস্যই মাত্রাজ্ঞান হারিয়ে ফেলছেন।

ব্যাপক সমালোচনার মুখে গতকাল রোববার ঢাকা মহানগর পুলিশ শাহবাগে ছাত্র সমাবেশে পুলিশের হামলার অভিযোগ তদন্তে তিন সদস্যের একটি কমিটি গঠন করেছে। ওই প্রতিবেদনের সুপারিশ অনুযায়ী দোষী ব্যক্তির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

পুলিশ সদর দপ্তরের একজন শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, সব সমাবেশ একভাবে নিয়ন্ত্রণ করার কথা নয়। পাঁচজনের বেশি মানুষ কোথাও একত্র হয়ে যদি জানমালের ক্ষতি করার চেষ্টা করে, তাহলে পুলিশ তা আইনগতভাবে প্রতিহত করতে পারে। তবে ছাত্র সমাবেশ ও সশস্ত্র রাজনৈতিক সমাবেশ এককভাবে পুলিশের নিয়ন্ত্রণ করার কথা নয়। ধাপে ধাপে এগোনোর কথা। পুলিশ প্রথমে ঘটনাস্থলে নিজেদের উপস্থিতির জানান দেবে, তারপর মাইকিং করবে, বিক্ষোভকারীদের বোঝানোর চেষ্টা করবে। হালকা ধাক্কাধাক্কি, মৃদু লাঠিচার্জ, বেপরোয়া লাঠিচার্জের পর টিয়ার শেল ছোড়ার কথা। প্রক্রিয়াগুলো যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়েছে কি না, তার সবই দেখা হবে।

তবে পুলিশের এসব তদন্ত কমিটির ওপর ভরসা রাখতে পারছেন না পুলিশের হামলার শিকার ব্যক্তিরা। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ  বলেন, ‘২০০৯-এ আমার ওপর যখন হামলা হলো, তখন তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাহারা খাতুনসহ অনেকেই এসেছিলেন। কিন্তু অভিযুক্ত পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। পুলিশ ও র‍্যাবের এসব কথা মানুষ বিশ্বাস করে না।’

Comments

Comments!

 ধৈর্য ধরার নির্দেশনা উপেক্ষা, মারমুখী পুলিশAmarbangladeshonlineAmarbangladeshonline | Amarbangladeshonline

ধৈর্য ধরার নির্দেশনা উপেক্ষা, মারমুখী পুলিশ

Monday, July 24, 2017 7:31 am
ca65114555669e45d8a1442fa67a1fc4-597506d7b7dd4

ধৈর্য ও সহনশীলতা প্রদর্শনে সদর দপ্তরের নির্দেশনা উপেক্ষা করে মিছিল-সমাবেশ নিয়ন্ত্রণে কঠোর পন্থা বজায় রাখছেন মাঠপর্যায়ে পুলিশ সদস্যরা। এসব ক্ষেত্রে কৌশলের চেয়ে জবরদস্তিতেই তাঁদের আগ্রহ বেশি। সবশেষ শাহবাগে পুলিশি হামলায় একজন ছাত্র দৃষ্টিশক্তি হারানোয় পুলিশের এ মারমুখী প্রবণতা আবার আলোচনায় এসেছে। পদস্থ পুলিশ কর্মকর্তারাও এ নিয়ে বিব্রত।

পুলিশ সদর দপ্তরের সহকারী মহাপরিদর্শক মনিরুজ্জামান প্রথম আলোকে বলেন, সদর দপ্তর থেকে পুলিশ সুপারদের কাছে একটি বার্তা দেওয়া হয়েছে শাহবাগের ওই ঘটনার আগে আগে। সেখানে জনশৃঙ্খলা রক্ষায় সর্বোচ্চ ধৈর্য, সহনশীলতা ও পেশাদারি দেখাতে বলা হয়েছিল।

মানবাধিকার কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মধ্যে চেইন অব কমান্ড কতটা আছে, সেটা দেখা দরকার। পুলিশের বিরুদ্ধে যখনই কোনো অভিযোগ ওঠে, তখনই বলা হয় জানমালের নিরাপত্তার স্বার্থে পুলিশ দায়িত্ব পালন করেছে। আসলে কতটা কী সেটা ভালোভাবে তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। কারও বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিলেও সেটা যেন দৃশ্যমান হয়, সেটাও নিশ্চিত হওয়া দরকার।

এ দফায় পুলিশের বলপ্রয়োগের প্রথম ঘটনাটি ঘটে গত মঙ্গলবার রাতে খুলনায়। এর শিকার শাহজামাল ওরফে শাহজালাল (৩১)। পরিবারের অভিযোগ, পুলিশ শাহজালালের দুই চোখ নষ্ট করে দিয়েছে। শাহজামালের স্ত্রী রাহেলা বেগম জানান, ছিনতাইকারী সন্দেহে ওই রাতে তাঁর স্বামীকে থানায় নিয়ে যাওয়া হয়। তিনি নিজে থানায় তাঁর স্বামীকে সুস্থ-স্বাভাবিক দেখেছেন। পরদিন সকালে শোনেন তাঁর স্বামী খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি। শাহজামালের বাবা মো. জাকির হোসেন গতকাল রোববার প্রথম আলোকে বলেন, ঢাকা মেডিকেল কলেজে অস্ত্রোপচার করে তাঁর ছেলের দুই চোখ তুলে নেওয়া হয়েছে। শাহজালাল এখন অন্ধ।

খুলনায় মহানগর পুলিশের (কেএমপি) খালিশপুর জোনের সহকারী পুলিশ কমিশনার মো. আশরাফ হোসেন বলেন, গণপিটুনির সময় ওই ছিনতাইকারীর চোখ উপড়ে ফেলে উত্তেজিত জনতা।

এ ছাড়া এ বছরের জানুয়ারিতে সুন্দরবনে রামপাল প্রকল্পের বিরুদ্ধে আন্দোলনের সময় পুলিশ শাহবাগে এক ব্যক্তিকে মাটিতে ফেলে পেটায়।

গত ১৮ মে মেডিক্যাল অ্যাসিসটেন্ট ট্রেনিং স্কুলের শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভে পুলিশ লাঠিপেটা করে ও টিয়ারশেল ছোঁড়ে। ওই ঘটনায় কমপক্ষে তিনশ ছাত্র আহত হয় বলে দাবি করে শিক্ষার্থীরা।

এ ছাড়া বরগুনা সদরের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা গাজী তারেক সালমনকে কোর্ট-হাজতে নিয়ে যাওয়ার সময় অযথা টানাহেঁচড়া করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

সর্বশেষ ঘটনাটি ঘটে বৃহস্পতিবার। ওই দিন শাহবাগে বিক্ষোভের সময় সিদ্দিকুর রহমান নামে তিতুমীর কলেজের যে শিক্ষার্থী দৃষ্টিশক্তি হারাতে বসেছেন, প্রত্যক্ষদর্শীদের অভিযোগ, তিনি আহত হয়েছেন পুলিশের ছোড়া টিয়ার শেলের আঘাতে।

এ ঘটনায় মাত্রাতিরিক্ত বলপ্রয়োগের প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও পুলিশ দায় এড়ানোর চেষ্টা করেছে। শাহবাগে ছাত্র সমাবেশে পুলিশের হামলার একাধিক ভিডিও ফুটেজ রয়েছে। জাতীয় জাদুঘর প্রান্তের পদচারী-সেতু থেকে ধারণ করা একটি ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, জনা পঞ্চাশেক ছাত্রের একটি মিছিল জাদুঘরের সামনে থেকে এগোনোর চেষ্টা করছে। সে সময় অতর্কিতে একদল পুলিশ তাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের দিকে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করে। এর মধ্যেই সমাবেশ থেকে কয়েক হাত দূরত্বে থাকা একজন পুলিশ সদস্য ছাত্রদের লক্ষ্য করে টিয়ার শেল ছোড়েন। ঘটনাস্থলে সিদ্দিকুর পড়ে যান। এরপর ঘটনাস্থল থেকে পুলিশ সদস্যরা কিছুটা দূরে সরে যান। পরে আন্দোলনরত তরুণেরা সিদ্দিকুরকে ধরাধরি করে তুলে হাসপাতালের দিকে নিয়ে যান। তাঁকে তোলার পর ঘটনাস্থলে চাপ চাপ রক্ত দেখা যায়।

ওই হামলার ভিডিও ভাইরাল হওয়ার পরও ঢাকা মহানগর পুলিশ কমিশনার মো. আছাদুজ্জামান মিয়া বলেন, ‘আমি পরস্পরবিরোধী বক্তব্য শুনেছি। পুলিশ আমাকে বলেছে ছাত্রদের ছোড়া ইট-পাটকেলের আঘাতে তার এমন হয়েছে। ছাত্ররা দাবি করেছে টিয়ার শেল তার কপালে লেগেছে। আমরা বিষয়টি তদন্ত করছি।’

এর আগে পয়লা বৈশাখে যৌন নিপীড়নবিরোধী বিক্ষোভ পুলিশের নির্যাতনে ৩৩ জন আহত হন। ছাত্র ইউনিয়নের একজন নারী কর্মী ইসমত জাহানকে পুলিশ বেদম পেটায়। সমালোচনার মুখে পুলিশ বলে, ওই নারী পুলিশের গাড়িতে টব ছুড়ে মেরেছেন।

বরগুনা সদরের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা গাজী তারেক সালমনকে বলপ্রয়োগ করে টেনেহিঁচড়ে কোর্ট-হাজতে নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ তথ্যনির্ভর নয় বলে দাবি করেছে পুলিশ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশন। যদিও পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক সচিব ও পুলিশের সাবেক শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তা নব বিক্রম কিশোর ত্রিপুরা তাঁর ফেসবুক স্ট্যাটাসে লিখেছেন, আসামি পালিয়ে যাওয়া প্রতিরোধে যতটুকু কড়াকড়ি করা দরকার, শুধু ততটুকুই করার কথা বলা হয়েছে পুলিশ প্রবিধানে। তিনি উপজেলা পর্যায়ে সর্বোচ্চ পদে থাকা একজন কর্মকর্তাকে হাতকড়া পরানোর যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তিনি আরও বলেন, বিচার প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন যাঁরা, সেই বিচারক থেকে শুরু করে একেবারে মাঠপর্যায়ে যাঁরা আইন প্রয়োগ করছেন, তাঁদের আইনকানুন ভালোভাবে জানা প্রয়োজন।

তবে পুলিশের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, পুরো পরিস্থিতি নিয়ে তাঁরা নিজেরাই অস্বস্তিতে আছেন। মানুষের মধ্যে যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে, তা প্রশমনের জন্য তিতুমীর কলেজের ছাত্র সিদ্দিকুর রহমানের দায়িত্ব নেওয়ার কথা তাঁরা ভাবছেন। পুলিশের অতিরিক্ত উপকমিশনার পর্যায়ের একজন কর্মকর্তা বলেন, দাঙ্গা দমন সম্পর্কে সুস্পষ্ট নির্দেশনা আছে। পুলিশ প্রবিধানে অভিযান পরিচালনাকারী পুলিশ কর্মকর্তাকে বলা হয়েছে, তিনি পুলিশ সদস্যদের জনতার এত কাছাকাছি নিয়ে যাবেন না, যেন জনতার আকস্মিক হামলায় তাদের নাজেহাল হতে হয়, বা বহু লোকের হতাহতের ঝুঁকি তৈরি হয়। শাহবাগের যে ভিডিওটি দেখা গেছে, তাতে পুলিশ সদস্যদের সমাবেশের কয়েক হাত দূর থেকে টিয়ার শেল ছুড়তে দেখা গেছে। অপর একজন কর্মকর্তা মাঠপর্যায়ে পুলিশ সদস্যদের দায়ী করেন। তিনি বলেন, অনেক পুলিশ সদস্যই মাত্রাজ্ঞান হারিয়ে ফেলছেন।

ব্যাপক সমালোচনার মুখে গতকাল রোববার ঢাকা মহানগর পুলিশ শাহবাগে ছাত্র সমাবেশে পুলিশের হামলার অভিযোগ তদন্তে তিন সদস্যের একটি কমিটি গঠন করেছে। ওই প্রতিবেদনের সুপারিশ অনুযায়ী দোষী ব্যক্তির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

পুলিশ সদর দপ্তরের একজন শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, সব সমাবেশ একভাবে নিয়ন্ত্রণ করার কথা নয়। পাঁচজনের বেশি মানুষ কোথাও একত্র হয়ে যদি জানমালের ক্ষতি করার চেষ্টা করে, তাহলে পুলিশ তা আইনগতভাবে প্রতিহত করতে পারে। তবে ছাত্র সমাবেশ ও সশস্ত্র রাজনৈতিক সমাবেশ এককভাবে পুলিশের নিয়ন্ত্রণ করার কথা নয়। ধাপে ধাপে এগোনোর কথা। পুলিশ প্রথমে ঘটনাস্থলে নিজেদের উপস্থিতির জানান দেবে, তারপর মাইকিং করবে, বিক্ষোভকারীদের বোঝানোর চেষ্টা করবে। হালকা ধাক্কাধাক্কি, মৃদু লাঠিচার্জ, বেপরোয়া লাঠিচার্জের পর টিয়ার শেল ছোড়ার কথা। প্রক্রিয়াগুলো যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়েছে কি না, তার সবই দেখা হবে।

তবে পুলিশের এসব তদন্ত কমিটির ওপর ভরসা রাখতে পারছেন না পুলিশের হামলার শিকার ব্যক্তিরা। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ  বলেন, ‘২০০৯-এ আমার ওপর যখন হামলা হলো, তখন তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাহারা খাতুনসহ অনেকেই এসেছিলেন। কিন্তু অভিযুক্ত পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। পুলিশ ও র‍্যাবের এসব কথা মানুষ বিশ্বাস করে না।’

Comments

comments

সম্পাদক : মোহাম্মদ আবদুল বাছির
প্রকাশক: মোহাম্মদ জহিরুল ইসলাম
ফোন : ‎০১৭১৩৪০৯০৯০
৩৪৫/১, দিলু রোড, নিউ ইস্কাটন, ঢাকা-১০০০
X
 
নিয়মিত খবর পড়তে আমাদের ফেসবুক পেজে লাইক দিয়ে যুক্ত থাকুন
X