মঙ্গলবার, ২০শে ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ ইং, ৮ই ফাল্গুন, ১৪২৪ বঙ্গাব্দ, রাত ১:৩৭
শিরোনাম
  • ঘৃণাকে বিজয়ী হতে দেয়া যাবে না, ট্রাম্পকে ইঙ্গিত করে জর্জ ক্লুনি
  • আমার একটাই চিন্তা দেশের মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন করা: প্রধানমন্ত্রী
  • ‘কেন্দ্রীয় সরকারের আগ্রাসী নীতির কারণে কাশ্মীরকে হারাতে হবে’
  • সাড়ে চারমাস পর মুখোমুখি, খাদিজাকে উদ্দেশ্য করে যা বলল বদরুল
  • খালেদার ‘সাজা’ বিরোধী নেতাকর্মীদের মনোবল ভাঙ্গার কৌশল!
  • বিএনপির কর্মসূচি ‘যথাসময়ে’ জানানো হবে: রিজভী
  • দলের জন্য বোলিং করতেও রাজি মুশফিক
  • শিশু জিহাদের মৃত্যু: চার জনের ১০ বছর করে কারাদণ্ড
  • অবশেষে বাড়ি অবরুদ্ধ করে রাখা সেই দেয়াল ভেঙ্গে ফেলা হচ্ছে
  • সাক্ষ্য দিলেন খাদিজা, চাইলেন বদরুলের সর্বোচ্চ শাস্তি
  • বদরুলের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিতে আদালতে খাদিজা
  • আজ বগুড়ায় যেসব প্রকল্প উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী
  • রোহিঙ্গা স্থানান্তরের সরকারি পরিকল্পনার সঙ্গে দ্বিমত মানবাধিকার কমিশনের
  • মহেশখালীতে ইয়াবা ব্যবসায়ীদের সঙ্গে পুলিশের ‘বন্দুকযুদ্ধ’
  • হোয়াইট হাউসে কাজ করার দীর্ঘ অভিজ্ঞতার কথা জানালেন এই বাংলাদেশি সাংবাদিক
Saturday, December 17, 2016 9:10 am
A- A A+ Print

পদ্মায় জেগেছে স্বপ্ন

44974_f1

শরীয়তপুরের শফিপুর উপজেলার সরদারকান্দি গ্রামের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী আবুল কাশেম (৬০)। জীবিকার তাগিদে তিনি এখন মুন্সীগঞ্জের মাওয়া ঘাটের নিকটবর্তী চৌরাস্তা এলাকায় ব্যবসা করেন। পদ্মা বহুমুখী সেতুর জন্য তার জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছে। তাতেও কোনো দুঃখ নেই তার। মাওয়া চৌরাস্তা এলাকায় নিজ ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে আলাপকালে আবুল কাশেম ও তার স্ত্রী মোসাম্মৎ বেগম  (৫০) অভিন্ন সুরে জানান, আগে ওপার থেকে এপার আসতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা সময় লাগতো। কিছুদিন পরে চোখের নিমিষে এপার ওপার হওয়া যাবে। জীবনযাপনও পাল্টে যাবে। আবেগমথিত কণ্ঠে তারা বলেন, ‘একসময় চিন্তাও করতে পারতাম না। এখন পদ্মা সেতু হইতাছে। আমরা যারা খাইট্যা খাই তাদের কাছে এই পদ্মা সেতু কি জিনিস তা সময় হইলে বুঝা যাইবো। এই সেতু এখন চোখের সামনে পদ্মার ওপর দ্যাখতাছি’। শুধু আবুল কাশেম বা বেগম নন, পদ্মা সেতু দৃশ্যমান-সে খবরও পুরনো। যে পদ্মা সেতু ছিল অলীক স্বপ্ন সেই পদ্মা সেতু এখন লাখো মানুষের স্বপ্ন পূরণের কেন্দ্রে। পদ্মার এপার-ওপারের সাধারণ মানুষরা জানান, যখনই পদ্মায় চোখ পড়ে তখনই তারা আশায় বুক বাঁধেন। পদ্মা বহুমুখী সেতু প্রকল্প কর্মকর্তারা জানান, এরই মধ্যে এই সেতুর ৩৮ ভাগ নির্মাণকাজ শেষ হয়েছে। বাকি কাজ সম্পন্ন হলে ২০১৮ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে এই সেতু যানবাহন ও ট্রেন চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করে দেয়ার কথা রয়েছে। ৬ দশমিক ১৫ কিলোমিটার দ্বিতল পদ্মা সেতুর উপর দিয়ে চলবে যানবাহন ও নিচ দিয়ে চলবে ট্রেন। নির্বাচনী অঙ্গীকার হিসেবে ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার পদ্মা বহুমুখী সেতু নির্মাণের উদ্যোগ নেয়। নিজস্ব অর্থায়নেই পদ্মা সেতু নির্মাণ করার ঘোষণা দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তখন তার এ ঘোষণাকে অনেকেই অসম্ভবতার নিরিখে হিসেব করেছিলেন। কিন্তু পদ্মা সেতুকে নিয়ে বর্তমান সরকার বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অদম্য ইচ্ছা, চ্যালেঞ্জ ও দৃঢ়তায় তা এখন দৃশ্যমান হচ্ছে। সেতু নির্মাণের আগে দীর্ঘ নাটকীয়তা, আর নানা টানাপড়েন শেষে এখন কত দ্রুত তা শেষ হবে- এ নিয়ে চলছে ক্ষণ গণনা। দ্বিতল এই সেতু তৈরিতে মোট ২৮ হাজার ৭৯৩ কোটি ৩৯ লাখ টাকা ব্যয় ধরা হয়েছে। ২০১৪ সালের জুন মাসে চায়না মেজর ব্রিজ কোম্পানিকে মূল সেতু নির্মাণের কাজ দেয়া হয়। একই সেতুর জন্য গুরুত্বপূর্ণ নদী শাসনের কাজ দেয়া হয় চায়নার সিনো হাইড্রো করপোরেশনকে। গত বছরের ১২ই ডিসেম্বর পদ্মা নদীর ওপর দীর্ঘ এই সেতু নির্মাণের মূলকাজ যখন উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, তখনই স্বপ্নের ক্ষণ গণনা শুরু হয় তখন থেকেই। সম্প্রতি পদ্মা বহুমুখী সেতু এলাকার বিভিন্ন পয়েন্ট ঘুরে ও প্রকল্প সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ইতিমধ্যে এই সেতুর প্রায় ৩৮ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে। পদ্মা সেতু উন্মুক্ত করে দেয়ার নির্ধারিত সময় ধরা হয়েছে ২০১৮ সালের ডিসেম্বর মাসকে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই এই কাজ সম্পন্ন করতে মাওয়া ও জাজিরা দু’প্রান্তেই চলছে দিন-রাতের কর্মযজ্ঞ। পদ্মা বহুমুখী সেতু প্রকল্পের পরিচালক মো. শফিকুল ইসলাম মানবজমিনকে বলেন, ইতিমধ্যে সেতুর ৩৮ ভাগ কাজ শেষ হয়েছে। আমরা এখন এই প্রকল্পের সকল কাজকে গুরুত্ব দিয়ে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছি। পদ্মায় এখন স্প্যান তৈরির পাশাপাশি মূল সেতুর পাইল বসানোর কাজ চলছে। ৪১টি স্প্যান দিয়ে তৈরি হবে এই সেতু। মোট পিলার থাকবে ৪২টি। সেতুর মাওয়া প্রান্ত এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, সেতুর ট্রানজিশন পিলারের কাজ ইতিমধ্যে শুরু হয়ে গেছে। ২০১৭ সালের মধ্যে সবগুলো পাইল স্থাপন শেষ হবে বলে আশা করছেন প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা। ট্রানজিশন পিলারে মোট ১৬টি পাইল স্থাপন হচ্ছে বলে জানান প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা। মূল সেতুর শেষ প্রান্তের ৪২ নম্বর পিলারে চলছে পাইল স্থাপনের কাজ। প্রকল্প কর্মকর্তারা জানান, জাজিরা প্রান্তের পদ্মা তীরের এই পাইলটিই মূল সেতু এবং সংযোগ সেতুর বন্ধন তৈরি করবে। মাওয়া প্রান্তের পদ্মা তীরে ওই পাইলের অনুরূপ পাইলে স্থাপন হবে সেতুর এক নম্বর পিলার। প্রকল্প কর্মকর্তারা  জানান, নদীর পাইলগুলোর গভীরতা গড়ে প্রায় ১২৮ মিটার। এছাড়া মূল সেতুর ৪২টি পিলারের মধ্যে ৪০টি পিলারের অবস্থান হবে নদীর মধ্যে। মাঝ নদীর পিলারগুলোতে ৬টি করে পাইল স্থাপন করা হলেও দু’তীরের দু’টি পিলারকে আরো মজবুত করে প্রস্তুত করা হচ্ছে। তবে নদী তীরবর্তী এলাকায় শুকনো স্থান হওয়ার কারণে এই পিলারগুলোতে হ্যামার ব্যবহার করা হবে না। এ জন্য আধুনিক মেশিনে মাটি খুঁড়ে ৮০ মিটার গভীর এবং তিন মিটার ব্যাসের ১৬টি পাইল স্থাপন করা হবে। এদিকে জাজিরা প্রান্তের পাইল স্থাপন হয়ে যাওয়ায় ৩৭ নম্বর পিলারকে কংক্রিটিং করা এবং পরবর্তী কাজ এগিয়ে নেয়ার কাজ চলছে দ্রুতগতিতে। ইতিমধ্যে ৩৮ নম্বর পিলারে ছয়টি পাইল বসানো হয়েছে। আর ৩৯ নম্বর পিলারে বসেছে চারটি পাইল। পর্যায়ক্রমে সকল পাইলকে কংক্রিটিং করা হবে বলে জানান প্রকৌশলীরা। এছাড়া নদীর আরো ৭টি পিলারে ৩টি করে পাইল স্থাপন সম্পন্ন হয়েছে। সেতুর মাওয়া প্রান্তে লৌহজংয়ের কুমারভোগ এলাকায় কনস্ট্রাকশন ইয়ার্ডে তৈরি করা হয়েছে ব্রিজের বিশেষ প্ল্যাটফরম। তৈরি করা হয়েছে পাইল ক্যাপ। পাইল ক্যাপের ওপর বসানো হয়েছে সুপার স্ট্রাকচার স্প্যান। এই লোড টেস্ট সফল হলে এক স্প্যান পরিমাণ এই সুপার স্ট্রাকচার আগামী বছরের ফেব্রুয়ারির প্রথমদিকে স্থাপন করা সম্ভব হবে বলে জানা গেছে। পদ্মা সেতুর মাওয়া প্রান্ত ঘুরে দেখা গেছে, সুপার স্ট্রাকচারের অগ্রগতি হচ্ছে দ্রুততার সঙ্গে। মাওয়ার কুমারভোগের ওয়ার্কশপে ফিটিং করা প্রথম স্প্যানটির (১৫০ মিটার দীর্ঘ সুপার স্ট্রাকচার) লোড টেস্ট চলছে। কর্তব্যরত শ্রমিকরা জানান, ছয় ধাপের লোড টেস্টের এখন চলছে চতুর্থ ধাপের কাজ। অধ্যাপক ড. জামিলুর রেজা চৌধুরীর নেতৃত্বে বিশেষজ্ঞ প্যানেলের পাঁচজন বিশেষজ্ঞ গত ৬ই ডিসেম্বর প্রকল্প এলাকায় অবস্থান করে সুপার স্ট্রাকচারের এই লোডটেস্ট নিয়ে কাজ করেন। বিশেষজ্ঞ প্যানেল সদস্যরা এ সময় নদী শাসনের বিষয়ে কিছু দিকনির্দেশনা দেন। পদ্মা সেতু প্রকল্পের নির্বাহী প্রকৌশলী (মূল সেতু) দেওয়ান আবদুল কাদের মানবজমিনকে বলেন, সেতুর কাজ দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলছে। ২০১৮ সালের ডিসেম্বরের মধ্যেই তা সম্পন্ন হবে বলে আশা করি। তিনি বলেন, যেভাবে কাজ চলছে তাতে পদ্মা সেতু এখন দাঁড়িয়েই যাচ্ছে বলা যায়। প্রকল্পের (সেতু বিভাগ) একজন প্রকৌশলী জানান, পদ্মা ব্রিজে মালামাল ও যানবাহনসহ ধারণক্ষমতা ধরা হয়েছে ৮শ’ ৯৬ টন।  তবে, এর চেয়ে বেশি পরিমাণ ওজনের ধারণক্ষমতা থাকবে এই সেতুর। এ জন্য ১ হাজার ৩ শ’ টন লোড দিয়ে এর পরীক্ষা করা হবে। এদিকে পদ্মা বহুমুখী প্রকল্পের জাজিরা ও মাওয়া প্রান্তে জি ও ব্যাগ’র (বস্তায় বালি ভরে নদীর তলদেশ সমতল করার পদ্ধতি) মাধ্যমে নদী শাসনের ড্রেজিং- এর কাজ চলছে পুরোদমে। জাজিরা প্রান্তে ড্রেজিংয়ের পাশাপাশি ১শ’ কেজি ও তার বেশি ওজনের বস্তা ফেলা হচ্ছে। মাওয়া প্রান্তের উজানে জসলদিয়া-কান্দিপাড়া এলাকায় এক দশমিক ৩ কিলোমিটার দীর্ঘ এলাকায় নদী শাসনের কাজ করছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী। সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীরা জানান, নদী তীরের পানির নিচে স্রোতে গর্ত হয়ে থাকা তলদেশে আড়াই শ’ কেজি ওজনের বালির বস্তা ফেলা হচ্ছে। এই প্রক্রিয়ায় তলদেশ সমতল হওয়ার পর দুই ফুট  দৈর্ঘ্য, প্রস্ত, উচ্চতার ব্লক ফেলা হচ্ছে। এই অংশে ২৫ লাখ ব্লক ফেলার পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানা গেছে। প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা জানান, বর্ষকালে নদী শাসনের কাজ বেশি করা যায়নি। তাই এই শুষ্ক মৌসুমে নদী শাসনের কাজকে গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে।

Comments

Comments!

 পদ্মায় জেগেছে স্বপ্নAmarbangladeshonlineAmarbangladeshonline | Amarbangladeshonline

পদ্মায় জেগেছে স্বপ্ন

Saturday, December 17, 2016 9:10 am
44974_f1

শরীয়তপুরের শফিপুর উপজেলার সরদারকান্দি গ্রামের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী আবুল কাশেম (৬০)। জীবিকার তাগিদে তিনি এখন মুন্সীগঞ্জের মাওয়া ঘাটের নিকটবর্তী চৌরাস্তা এলাকায় ব্যবসা করেন। পদ্মা বহুমুখী সেতুর জন্য তার জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছে। তাতেও কোনো দুঃখ নেই তার। মাওয়া চৌরাস্তা এলাকায় নিজ ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে আলাপকালে আবুল কাশেম ও তার স্ত্রী মোসাম্মৎ বেগম  (৫০) অভিন্ন সুরে জানান, আগে ওপার থেকে এপার আসতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা সময় লাগতো। কিছুদিন পরে চোখের নিমিষে এপার ওপার হওয়া যাবে। জীবনযাপনও পাল্টে যাবে। আবেগমথিত কণ্ঠে তারা বলেন, ‘একসময় চিন্তাও করতে পারতাম না। এখন পদ্মা সেতু হইতাছে। আমরা যারা খাইট্যা খাই তাদের কাছে এই পদ্মা সেতু কি জিনিস তা সময় হইলে বুঝা যাইবো। এই সেতু এখন চোখের সামনে পদ্মার ওপর দ্যাখতাছি’। শুধু আবুল কাশেম বা বেগম নন, পদ্মা সেতু দৃশ্যমান-সে খবরও পুরনো। যে পদ্মা সেতু ছিল অলীক স্বপ্ন সেই পদ্মা সেতু এখন লাখো মানুষের স্বপ্ন পূরণের কেন্দ্রে। পদ্মার এপার-ওপারের সাধারণ মানুষরা জানান, যখনই পদ্মায় চোখ পড়ে তখনই তারা আশায় বুক বাঁধেন। পদ্মা বহুমুখী সেতু প্রকল্প কর্মকর্তারা জানান, এরই মধ্যে এই সেতুর ৩৮ ভাগ নির্মাণকাজ শেষ হয়েছে। বাকি কাজ সম্পন্ন হলে ২০১৮ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে এই সেতু যানবাহন ও ট্রেন চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করে দেয়ার কথা রয়েছে। ৬ দশমিক ১৫ কিলোমিটার দ্বিতল পদ্মা সেতুর উপর দিয়ে চলবে যানবাহন ও নিচ দিয়ে চলবে ট্রেন। নির্বাচনী অঙ্গীকার হিসেবে ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার পদ্মা বহুমুখী সেতু নির্মাণের উদ্যোগ নেয়। নিজস্ব অর্থায়নেই পদ্মা সেতু নির্মাণ করার ঘোষণা দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তখন তার এ ঘোষণাকে অনেকেই অসম্ভবতার নিরিখে হিসেব করেছিলেন। কিন্তু পদ্মা সেতুকে নিয়ে বর্তমান সরকার বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অদম্য ইচ্ছা, চ্যালেঞ্জ ও দৃঢ়তায় তা এখন দৃশ্যমান হচ্ছে। সেতু নির্মাণের আগে দীর্ঘ নাটকীয়তা, আর নানা টানাপড়েন শেষে এখন কত দ্রুত তা শেষ হবে- এ নিয়ে চলছে ক্ষণ গণনা। দ্বিতল এই সেতু তৈরিতে মোট ২৮ হাজার ৭৯৩ কোটি ৩৯ লাখ টাকা ব্যয় ধরা হয়েছে। ২০১৪ সালের জুন মাসে চায়না মেজর ব্রিজ কোম্পানিকে মূল সেতু নির্মাণের কাজ দেয়া হয়। একই সেতুর জন্য গুরুত্বপূর্ণ নদী শাসনের কাজ দেয়া হয় চায়নার সিনো হাইড্রো করপোরেশনকে। গত বছরের ১২ই ডিসেম্বর পদ্মা নদীর ওপর দীর্ঘ এই সেতু নির্মাণের মূলকাজ যখন উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, তখনই স্বপ্নের ক্ষণ গণনা শুরু হয় তখন থেকেই। সম্প্রতি পদ্মা বহুমুখী সেতু এলাকার বিভিন্ন পয়েন্ট ঘুরে ও প্রকল্প সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ইতিমধ্যে এই সেতুর প্রায় ৩৮ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে। পদ্মা সেতু উন্মুক্ত করে দেয়ার নির্ধারিত সময় ধরা হয়েছে ২০১৮ সালের ডিসেম্বর মাসকে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই এই কাজ সম্পন্ন করতে মাওয়া ও জাজিরা দু’প্রান্তেই চলছে দিন-রাতের কর্মযজ্ঞ। পদ্মা বহুমুখী সেতু প্রকল্পের পরিচালক মো. শফিকুল ইসলাম মানবজমিনকে বলেন, ইতিমধ্যে সেতুর ৩৮ ভাগ কাজ শেষ হয়েছে। আমরা এখন এই প্রকল্পের সকল কাজকে গুরুত্ব দিয়ে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছি। পদ্মায় এখন স্প্যান তৈরির পাশাপাশি মূল সেতুর পাইল বসানোর কাজ চলছে। ৪১টি স্প্যান দিয়ে তৈরি হবে এই সেতু। মোট পিলার থাকবে ৪২টি। সেতুর মাওয়া প্রান্ত এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, সেতুর ট্রানজিশন পিলারের কাজ ইতিমধ্যে শুরু হয়ে গেছে। ২০১৭ সালের মধ্যে সবগুলো পাইল স্থাপন শেষ হবে বলে আশা করছেন প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা। ট্রানজিশন পিলারে মোট ১৬টি পাইল স্থাপন হচ্ছে বলে জানান প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা। মূল সেতুর শেষ প্রান্তের ৪২ নম্বর পিলারে চলছে পাইল স্থাপনের কাজ। প্রকল্প কর্মকর্তারা জানান, জাজিরা প্রান্তের পদ্মা তীরের এই পাইলটিই মূল সেতু এবং সংযোগ সেতুর বন্ধন তৈরি করবে। মাওয়া প্রান্তের পদ্মা তীরে ওই পাইলের অনুরূপ পাইলে স্থাপন হবে সেতুর এক নম্বর পিলার। প্রকল্প কর্মকর্তারা  জানান, নদীর পাইলগুলোর গভীরতা গড়ে প্রায় ১২৮ মিটার। এছাড়া মূল সেতুর ৪২টি পিলারের মধ্যে ৪০টি পিলারের অবস্থান হবে নদীর মধ্যে। মাঝ নদীর পিলারগুলোতে ৬টি করে পাইল স্থাপন করা হলেও দু’তীরের দু’টি পিলারকে আরো মজবুত করে প্রস্তুত করা হচ্ছে। তবে নদী তীরবর্তী এলাকায় শুকনো স্থান হওয়ার কারণে এই পিলারগুলোতে হ্যামার ব্যবহার করা হবে না। এ জন্য আধুনিক মেশিনে মাটি খুঁড়ে ৮০ মিটার গভীর এবং তিন মিটার ব্যাসের ১৬টি পাইল স্থাপন করা হবে।
এদিকে জাজিরা প্রান্তের পাইল স্থাপন হয়ে যাওয়ায় ৩৭ নম্বর পিলারকে কংক্রিটিং করা এবং পরবর্তী কাজ এগিয়ে নেয়ার কাজ চলছে দ্রুতগতিতে। ইতিমধ্যে ৩৮ নম্বর পিলারে ছয়টি পাইল বসানো হয়েছে। আর ৩৯ নম্বর পিলারে বসেছে চারটি পাইল। পর্যায়ক্রমে সকল পাইলকে কংক্রিটিং করা হবে বলে জানান প্রকৌশলীরা। এছাড়া নদীর আরো ৭টি পিলারে ৩টি করে পাইল স্থাপন সম্পন্ন হয়েছে। সেতুর মাওয়া প্রান্তে লৌহজংয়ের কুমারভোগ এলাকায় কনস্ট্রাকশন ইয়ার্ডে তৈরি করা হয়েছে ব্রিজের বিশেষ প্ল্যাটফরম। তৈরি করা হয়েছে পাইল ক্যাপ। পাইল ক্যাপের ওপর বসানো হয়েছে সুপার স্ট্রাকচার স্প্যান। এই লোড টেস্ট সফল হলে এক স্প্যান পরিমাণ এই সুপার স্ট্রাকচার আগামী বছরের ফেব্রুয়ারির প্রথমদিকে স্থাপন করা সম্ভব হবে বলে জানা গেছে।
পদ্মা সেতুর মাওয়া প্রান্ত ঘুরে দেখা গেছে, সুপার স্ট্রাকচারের অগ্রগতি হচ্ছে দ্রুততার সঙ্গে। মাওয়ার কুমারভোগের ওয়ার্কশপে ফিটিং করা প্রথম স্প্যানটির (১৫০ মিটার দীর্ঘ সুপার স্ট্রাকচার) লোড টেস্ট চলছে। কর্তব্যরত শ্রমিকরা জানান, ছয় ধাপের লোড টেস্টের এখন চলছে চতুর্থ ধাপের কাজ। অধ্যাপক ড. জামিলুর রেজা চৌধুরীর নেতৃত্বে বিশেষজ্ঞ প্যানেলের পাঁচজন বিশেষজ্ঞ গত ৬ই ডিসেম্বর প্রকল্প এলাকায় অবস্থান করে সুপার স্ট্রাকচারের এই লোডটেস্ট নিয়ে কাজ করেন। বিশেষজ্ঞ প্যানেল সদস্যরা এ সময় নদী শাসনের বিষয়ে কিছু দিকনির্দেশনা দেন। পদ্মা সেতু প্রকল্পের নির্বাহী প্রকৌশলী (মূল সেতু) দেওয়ান আবদুল কাদের মানবজমিনকে বলেন, সেতুর কাজ দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলছে। ২০১৮ সালের ডিসেম্বরের মধ্যেই তা সম্পন্ন হবে বলে আশা করি। তিনি বলেন, যেভাবে কাজ চলছে তাতে পদ্মা সেতু এখন দাঁড়িয়েই যাচ্ছে বলা যায়। প্রকল্পের (সেতু বিভাগ) একজন প্রকৌশলী জানান, পদ্মা ব্রিজে মালামাল ও যানবাহনসহ ধারণক্ষমতা ধরা হয়েছে ৮শ’ ৯৬ টন।  তবে, এর চেয়ে বেশি পরিমাণ ওজনের ধারণক্ষমতা থাকবে এই সেতুর। এ জন্য ১ হাজার ৩ শ’ টন লোড দিয়ে এর পরীক্ষা করা হবে। এদিকে পদ্মা বহুমুখী প্রকল্পের জাজিরা ও মাওয়া প্রান্তে জি ও ব্যাগ’র (বস্তায় বালি ভরে নদীর তলদেশ সমতল করার পদ্ধতি) মাধ্যমে নদী শাসনের ড্রেজিং- এর কাজ চলছে পুরোদমে। জাজিরা প্রান্তে ড্রেজিংয়ের পাশাপাশি ১শ’ কেজি ও তার বেশি ওজনের বস্তা ফেলা হচ্ছে। মাওয়া প্রান্তের উজানে জসলদিয়া-কান্দিপাড়া এলাকায় এক দশমিক ৩ কিলোমিটার দীর্ঘ এলাকায় নদী শাসনের কাজ করছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী। সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীরা জানান, নদী তীরের পানির নিচে স্রোতে গর্ত হয়ে থাকা তলদেশে আড়াই শ’ কেজি ওজনের বালির বস্তা ফেলা হচ্ছে। এই প্রক্রিয়ায় তলদেশ সমতল হওয়ার পর দুই ফুট  দৈর্ঘ্য, প্রস্ত, উচ্চতার ব্লক ফেলা হচ্ছে। এই অংশে ২৫ লাখ ব্লক ফেলার পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানা গেছে। প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা জানান, বর্ষকালে নদী শাসনের কাজ বেশি করা যায়নি। তাই এই শুষ্ক মৌসুমে নদী শাসনের কাজকে গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে।

Comments

comments

সম্পাদক : মোহাম্মদ আবদুল বাছির
প্রকাশক: মোহাম্মদ জহিরুল ইসলাম
ফোন : ‎০১৭১৩৪০৯০৯০
৩৪৫/১, দিলু রোড, নিউ ইস্কাটন, ঢাকা-১০০০
X
 
নিয়মিত খবর পড়তে আমাদের ফেসবুক পেজে লাইক দিয়ে যুক্ত থাকুন
X