সোমবার, ১৯শে ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ ইং, ৭ই ফাল্গুন, ১৪২৪ বঙ্গাব্দ, বিকাল ৫:৪৩
শিরোনাম
  • ঘৃণাকে বিজয়ী হতে দেয়া যাবে না, ট্রাম্পকে ইঙ্গিত করে জর্জ ক্লুনি
  • আমার একটাই চিন্তা দেশের মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন করা: প্রধানমন্ত্রী
  • ‘কেন্দ্রীয় সরকারের আগ্রাসী নীতির কারণে কাশ্মীরকে হারাতে হবে’
  • সাড়ে চারমাস পর মুখোমুখি, খাদিজাকে উদ্দেশ্য করে যা বলল বদরুল
  • খালেদার ‘সাজা’ বিরোধী নেতাকর্মীদের মনোবল ভাঙ্গার কৌশল!
  • বিএনপির কর্মসূচি ‘যথাসময়ে’ জানানো হবে: রিজভী
  • দলের জন্য বোলিং করতেও রাজি মুশফিক
  • শিশু জিহাদের মৃত্যু: চার জনের ১০ বছর করে কারাদণ্ড
  • অবশেষে বাড়ি অবরুদ্ধ করে রাখা সেই দেয়াল ভেঙ্গে ফেলা হচ্ছে
  • সাক্ষ্য দিলেন খাদিজা, চাইলেন বদরুলের সর্বোচ্চ শাস্তি
  • বদরুলের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিতে আদালতে খাদিজা
  • আজ বগুড়ায় যেসব প্রকল্প উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী
  • রোহিঙ্গা স্থানান্তরের সরকারি পরিকল্পনার সঙ্গে দ্বিমত মানবাধিকার কমিশনের
  • মহেশখালীতে ইয়াবা ব্যবসায়ীদের সঙ্গে পুলিশের ‘বন্দুকযুদ্ধ’
  • হোয়াইট হাউসে কাজ করার দীর্ঘ অভিজ্ঞতার কথা জানালেন এই বাংলাদেশি সাংবাদিক
Wednesday, December 28, 2016 10:53 am
A- A A+ Print

পরিবারভিত্তিক ইউনিট জঙ্গিদের নতুন কৌশল

90aa0974c311d9382f5faeab53ef321f-1

জঙ্গিদের এই প্রবণতাকে ‘ভয়াবহ’ বলে মন্তব্য করেছেন বিশ্লেষকেরা। তাঁদের মতে, এতে একটি পরিবার চরমপন্থায় যুক্ত হলেও তা অন্য স্বজন বা আশপাশের লোকজনের চোখে সহজে ধরা পড়ে না।

দেশে গত দুই দশকের জঙ্গি তৎপরতার ধরন পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, শুরুতে জঙ্গিরা তাদের মতাদর্শ প্রচার ও সদস্য সংগ্রহের ক্ষেত্রে আত্মীয়, প্রতিবেশী, বন্ধু বা নিজস্ব পরিমণ্ডলের লোকদের অগ্রাধিকার দিয়ে আসছিল। এরপর তারা নিজেদের মধ্যে বিয়েশাদি তথা আত্মীয়তার বন্ধন তৈরিতে নজর দেয়। নিহত-আহত হওয়া, বিচার ও ধরপাকড়ের চাপে পড়ে জনবল কিছুটা কমে যাওয়ার পর তারা একটি পরিবার একটি ইউনিট—এ কাঠামোয় যাওয়া শুরু করেছে। সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোয় এ প্রবণতা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

গুলশান হামলার পর এমন বেশ কয়েকটি পারিবারিক ইউনিটের অস্তিত্ব প্রকাশ পায়। আইএস (ইসলামিক স্টেট) মতাদর্শ অনুসরণকারী ‘নব্য জেএমবি’তে এ প্রবণতা বেশি। অবশ্য পরিবারের নারী সদস্যদের নিজ থেকে উদ্বুদ্ধ হয়ে জঙ্গিবাদে জড়ানোর উদাহরণ থাকলেও তা নগণ্য। পরিবারপ্রধানের চাপ বা প্রভাবই সেখানে মুখ্য।

প্রথম আলোর অনুসন্ধানে দেখা যায়, ১৯৯২ সালে জন্ম নেওয়া জঙ্গি সংগঠন হরকাতুল জিহাদ আল ইসলামী (হুজি-বি) মূলত একই মতাদর্শের লোকদের সংগঠনে যুক্ত করত। তাদের মধ্যে সংগঠনের জন্য আত্মীয়তার বন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার প্রবণতা সেভাবে দেখা যায়নি। যদিও হুজি-বির নেতৃত্ব পর্যায়ে কয়েকজনের মধ্যে আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিল। যেমন হুজির ঢাকা মহানগর কমিটির সভাপতি হাফেজ আবু তাহেরের ভায়রা হলেন ২১ আগস্ট হামলায় গ্রেনেড সরবরাহকারী মাওলানা তাজউদ্দিন। আবার তাহেরের ভাই মাওলানা ইদ্রিস আলীর ভায়রা হুজি-বির আরেক গুরুত্বপূর্ণ নেতা মুফতি মনির উদ্দিন। এর বাইরে সংগঠনের নেতা-কর্মীদের মধ্যে খুব বেশি আত্মীয়তার যোগসূত্র ছিল না।

কিন্তু ১৯৯৮ সালে জন্ম নেওয়া জামাআতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশ (জেএমবি) মূলত পরিবার ও আত্মীয়স্বজনকেন্দ্রিক জঙ্গি নেটওয়ার্ক বিস্তারের কৌশল গ্রহণ করে। শুরুতেই এর প্রতিষ্ঠাতা শায়খ আবদুর রহমান পরিবারের সদস্যদের নেতৃত্বে এনেছেন। জেএমবির শ‌ুরা কমিটিতে তাঁর পরেই ছিলেন ছোট ভাই আতাউর রহমান (সানি) ও জামাতা আবদুল আউয়াল। তাঁদের পর স্থান পান সিদ্দিকুল ইসলাম (বাংলা ভাই)। এর মধ্যে সানিকে করেছিলেন জেএমবির কথিত সামরিক শাখার প্রধান।

আবার শায়খ আবদুর রহমানের জামাতা আউয়ালের ভাগনে মামুনুর রশীদ ওরফে রিপন নব্য জেএমবির সামরিক সদস্য। বাড়ি বগুড়ার দুপচাঁচিয়ায়। রিপন বিয়ে করেন পুরোনো জেএমবির বর্তমান আমির মাওলানা সাইদুর রহমানের দ্বিতীয় স্ত্রীর বড় বোনের মেয়েকে।

২০০৭ সালে শায়খ আবদুর রহমান, সানি, আউয়াল ও বাংলা ভাইয়ের ফাঁসির পর জেএমবির আমিরের দায়িত্ব পান হবিগঞ্জের মাওলানা সাইদুর রহমান। তাঁর বড় ছেলে শামীম ছিলেন জেএমবির তথ্যপ্রযুক্তি শাখার প্রধান। শামীম ও তাঁর স্ত্রী আলেয়া ২০০৫ সালের আগস্টে ঢাকায় গ্রেপ্তার হন। সাইদুর গ্রেপ্তার হওয়ার পর তৃতীয় ছেলে ফাহিম ওরফে বাশার জেএমবির আর্থিক বিষয়াদি দেখাশোনা করতেন। তিনি পরে আটক হন।

সাইদুরের একমাত্র মেয়ে শিরিনের বিয়ে হয়েছে জেএমবির প্রতিষ্ঠাকালীন সামরিক শাখার প্রধান আতাউর রহমান ওরফে সানির সঙ্গে। সানির ফাঁসি হওয়ার পর শিরিনকে বিয়ে করেছেন আরেক জঙ্গি সংগঠন জামাআতুল মুসলেমিনের অন্যতম শীর্ষ নেতা সাজ্জাদ এজাজ ওরফে কারগিল। পাকিস্তানের ডন পত্রিকার খবর অনুযায়ী, কারগিলসহ চার জঙ্গি গত বছরের ৯ জানুয়ারি ভোরে করাচিতে এক বন্দুকযুদ্ধে নিহত হন।

সাইদুর রহমান তিনটি বিয়ে করেন। জেএমবির আমির হওয়ার বছর খানেক পর ২০০৮ সালের সেপ্টেম্বরে দ্বিতীয় বিয়ে করেন। স্ত্রীর নাম নুরুন্নাহার, বাড়ি দিনাজপুরে। নুরুন্নাহারের দুই ভাই মোশতাকিম বিল্লাহ ওরফে মুশতাক (নিহত) ও মোহতাসিম বিল্লাহ ওরফে রুবেল (২০১১-তে গ্রেপ্তার) জেএমবির সঙ্গে যুক্ত।

নুরুন্নাহারের বোন বদরুন্নাহারকে বিয়ে করেছেন জেএমবির সামরিক শাখার সাবেক প্রধান নাজমুল ওরফে ভাগিনা শহীদ। নাজমুলের বোন সুফিয়াকে বিয়ে দিয়েছেন আরেক জঙ্গির কাছে।

সাইদুর রহমানের দ্বিতীয় স্ত্রী নুরুন্নাহার ২০০৯ সালের ৩১ অক্টোবর ঢাকার খিলগাঁও থেকে গ্রেপ্তার হন। এরপর সাইদুর রহমান জেএমবির এক জঙ্গির বিধবা বোন নাইমা আক্তারকে বিয়ে করেন। ২০১০ সালের ২৪ মে রাজধানীর পূর্ব দনিয়ায় নাইমাসহ গ্রেপ্তার হন সাইদুর।

সাইদুর ও তাঁর দুই স্ত্রীকে জিজ্ঞাসাবাদে পুলিশ জঙ্গিদের আত্মীয়তার বন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার এসব তথ্য পায়। শীর্ষ নেতাদের মতো জেএমবির মাঠ পর্যায়ের সদস্যদের অনেকেই একইভাবে পরস্পর আত্মীয়তার বন্ধনে যুক্ত হন। এ রকম আরও অন্তত ১০টি উদাহরণ আছে আত্মীয়তার। ঝালকাঠির পিপি হায়দার হত্যা এবং চট্টগ্রামে ঈশা খাঁ ঘাঁটি মসজিদে বোমা হামলার পরিকল্পনাকারী ও এজাহারভুক্ত আসামিরাসহ আলোচিত অনেক জঙ্গি একই প্রক্রিয়ায় আত্মীয়তার বন্ধনে আবদ্ধ হন। একে অন্যের আত্মীয়কে বিয়ে করে লতাপাতায় জড়িয়ে থাকার এই প্রবণতা বেশি ছিল উত্তরাঞ্চলে। নিহত জঙ্গির বিধবা স্ত্রীকে সংগঠনের সিদ্ধান্তে কেউ না কেউ বিয়ে করতেন। যাতে ওই নারীর কাছ থেকে কোনো তথ্য ফাঁস না হয়।

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সন্ত্রাসবাদ বিষয়ে বিশেষজ্ঞ জাকার্তার ইনস্টিটিউট অব পলিসি অ্যানালাইসিস অব কনফ্লিক্টের পরিচালক সিডনি জোনস ২০০৯ সালে ঢাকায় এলে এ প্রতিবেদকের সঙ্গে তাঁর কথা হয়। তিনি তখন বলেছিলেন, ইন্দোনেশিয়াতেও জঙ্গিগোষ্ঠীগুলোর সদস্যদের মধ্যেও বিয়েশাদি ও আত্মীয়তা গড়ে তোলার প্রবণতা রয়েছে। এর প্রধান কারণ সংগঠনের গোপনীয়তা রক্ষা।

সিডনি জোনস সাম্প্রতিক এক বিশ্লেষণে বলেছে, ইন্দোনেশিয়ার নতুন জঙ্গি গোষ্ঠী আইএস কেবল একক ব্যক্তি নয়, পুরো পরিবারকে তাদের মতাদর্শের দিকে টানছে।

এই প্রবণতা এখন বাংলাদেশের নব্য জেএমবিতেও দেখা যাচ্ছে। এই বিষয়ে কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের অতিরিক্ত উপকমিশনার ছানোয়ার হোসেনের পর্যবেক্ষণ হচ্ছে, আগে যখন জঙ্গিদের প্রচুর সদস্য ছিল, তখন এই প্রবণতা ছিল না। তখন অনেক জঙ্গি স্ত্রী-পরিবারকে বাড়িতে রেখে নিজেরা গোপন তৎপরতায় যুক্ত হয়েছিল। পরিবার স্বাভাবিক জীবনযাপন করত। কিন্তু যখন জঙ্গিদের সদস্যসংখ্যা কমে গেল এবং নতুন সদস্য সংগ্রহও কঠিন হয়ে গেল, তখন তারা পুরো পরিবারকে যুক্ত করতে থাকল, যাতে পরিবারের প্রত্যেক সদস্যকে ব্যবহার করা যায়।

ছানোয়ার হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, মূলত পরিবারের কর্তাব্যক্তিরাই বাকিদের এ পথে আনেন। আর ছোট ছোট দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে নারী সদস্য, এমনকি কিশোরেরাও আক্রমণাত্মক হয়ে উঠছে, যা আশকোনা ও আজিমপুরের আস্তানায় অভিযানের সময় দেখা গেছে।

অবশ্য কেবল জঙ্গি তানভীর কাদেরী, মেজর জাহিদ, বাশারুজ্জামান, মারজানেরাই নন, আইএসে যোগ দিতে দেশ ছেড়েছেন এমন ব্যক্তিরাও স্ত্রী-বাচ্চাসহ পুরো পরিবার নিয়ে বিপথগামী হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে গোপালগঞ্জের সাইফুল হক (সুজন) অন্যতম। তিনি উচ্চশিক্ষার জন্য যুক্তরাজ্য যান। সেখানে তথ্যপ্রযুক্তির প্রতিষ্ঠান দিয়ে অল্পদিনে সফল ব্যবসায়ীও হন। ২০০৫ সালে দেশে আসেন। কিছুদিন পর অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী ও ছোট দুই বাচ্চা নিয়ে সিরিয়া চলে যান। গত বছরের ১০ ডিসেম্বর রাকায় ড্রোন হামলায় নিহত হন। তখন মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর জানায়, সাইফুল আইএসের শীর্ষ ১০ জনের একজন ছিলেন।

সাইফুল তাঁর বড় ভাই, ছোট এক ভাই ও বাবাকেও এই মতাদর্শে উদ্বুদ্ধ করেন। সাইফুলের ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান আইব্যাকসের বাংলাদেশ কার্যালয় ছিল ঢাকার কারওয়ান বাজারে। ৮ ডিসেম্বর কারওয়ান বাজার থেকে সাইফুলের বাবা, ভাই, শ্যালক ও আইব্যাকসের হিসাবরক্ষককে গ্রেপ্তার করে গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। তাঁদের কাছ থেকে ৩৫ লাখ টাকা উদ্ধার করা হয়।

তদন্ত-সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, ৫০ হাজার মার্কিন ডলারের সমপরিমাণ এ টাকা হুন্ডির মাধ্যমে বিদেশ থেকে এসেছে নব্য জেএমবির নেতা ও গুলশান হামলার মূল পরিকল্পনাকারী তামিম চৌধুরীকে দেওয়ার জন্য।

আবার ঢাকা শিশু হাসপাতালের চিকিৎসক খন্দকার রোকনুদ্দীন (৫০) স্ত্রী কলেজশিক্ষক নাইমা আক্তার (৪৫), তাঁদের দুই মেয়ে, জামাতাসহ সিরিয়ায় যাওয়ার উদ্দেশে দেশ ছেড়েছেন। যাওয়ার আগে বাড়ি বিক্রি করে টাকা দিয়ে গেছেন নব্য জেএমবিকে। গুলশান হামলার আগ পর্যন্ত এ পরিবারটির দেশত্যাগের কথা কেউ জানত না। এ রকম আরও বেশ কয়েকজনের সপরিবারে দেশের ভেতরে বা বাইরে গিয়ে জঙ্গিবাদে জড়ানোর খবর পাওয়া গেছে।

জানতে চাইলে পুলিশের কাউন্টার টেররিজম বিভাগের উপকমিশনার মহিবুল ইসলাম খান প্রথম আলোকে বলেন, অভিযানে নিহত নব্য জেএমবির নেতা তানভীর কাদেরী, মেজর (অব.) জাহিদুল ইসলাম, পলাতক বাশারুজ্জামান, নুরুল ইসলাম ওরফে মারজান, মাইনুল ওরফে মুসা পুরো পরিবার নিয়ে জঙ্গিবাদে জড়িয়েছেন। তাঁরা সবাই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে গুলশান হামলায় যুক্ত ছিলেন। তিনি বলেন, নারীরা মূলত স্বামীদের দ্বারা উদ্বুদ্ধ হয়ে বা তাঁদের চাপে বিপথগামী হন।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব পিস অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের প্রেসিডেন্ট মেজর জেনারেল (অব.) এম মুনিরুজ্জামান এ প্রবণতাকে ভয়াবহ বলে মন্তব্য করেছেন। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, এখানে দেখা যাচ্ছে পুরো পরিবারকে একটা সন্ত্রাসী ইউনিটে রূপান্তর করা হচ্ছে। এ ধরনের ফ্যামিলি ইউনিটে বাইরে থেকে কেউ অনুপ্রবেশ করতে পারে না, প্যানিট্রেট করা কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে সহজে তাদের সম্পর্কে কোনো তথ্য বের করা যায় না।

Comments

Comments!

 পরিবারভিত্তিক ইউনিট জঙ্গিদের নতুন কৌশলAmarbangladeshonlineAmarbangladeshonline | Amarbangladeshonline

পরিবারভিত্তিক ইউনিট জঙ্গিদের নতুন কৌশল

Wednesday, December 28, 2016 10:53 am
90aa0974c311d9382f5faeab53ef321f-1

জঙ্গিদের এই প্রবণতাকে ‘ভয়াবহ’ বলে মন্তব্য করেছেন বিশ্লেষকেরা। তাঁদের মতে, এতে একটি পরিবার চরমপন্থায় যুক্ত হলেও তা অন্য স্বজন বা আশপাশের লোকজনের চোখে সহজে ধরা পড়ে না।

দেশে গত দুই দশকের জঙ্গি তৎপরতার ধরন পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, শুরুতে জঙ্গিরা তাদের মতাদর্শ প্রচার ও সদস্য সংগ্রহের ক্ষেত্রে আত্মীয়, প্রতিবেশী, বন্ধু বা নিজস্ব পরিমণ্ডলের লোকদের অগ্রাধিকার দিয়ে আসছিল। এরপর তারা নিজেদের মধ্যে বিয়েশাদি তথা আত্মীয়তার বন্ধন তৈরিতে নজর দেয়। নিহত-আহত হওয়া, বিচার ও ধরপাকড়ের চাপে পড়ে জনবল কিছুটা কমে যাওয়ার পর তারা একটি পরিবার একটি ইউনিট—এ কাঠামোয় যাওয়া শুরু করেছে। সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোয় এ প্রবণতা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

গুলশান হামলার পর এমন বেশ কয়েকটি পারিবারিক ইউনিটের অস্তিত্ব প্রকাশ পায়। আইএস (ইসলামিক স্টেট) মতাদর্শ অনুসরণকারী ‘নব্য জেএমবি’তে এ প্রবণতা বেশি। অবশ্য পরিবারের নারী সদস্যদের নিজ থেকে উদ্বুদ্ধ হয়ে জঙ্গিবাদে জড়ানোর উদাহরণ থাকলেও তা নগণ্য। পরিবারপ্রধানের চাপ বা প্রভাবই সেখানে মুখ্য।

প্রথম আলোর অনুসন্ধানে দেখা যায়, ১৯৯২ সালে জন্ম নেওয়া জঙ্গি সংগঠন হরকাতুল জিহাদ আল ইসলামী (হুজি-বি) মূলত একই মতাদর্শের লোকদের সংগঠনে যুক্ত করত। তাদের মধ্যে সংগঠনের জন্য আত্মীয়তার বন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার প্রবণতা সেভাবে দেখা যায়নি। যদিও হুজি-বির নেতৃত্ব পর্যায়ে কয়েকজনের মধ্যে আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিল। যেমন হুজির ঢাকা মহানগর কমিটির সভাপতি হাফেজ আবু তাহেরের ভায়রা হলেন ২১ আগস্ট হামলায় গ্রেনেড সরবরাহকারী মাওলানা তাজউদ্দিন। আবার তাহেরের ভাই মাওলানা ইদ্রিস আলীর ভায়রা হুজি-বির আরেক গুরুত্বপূর্ণ নেতা মুফতি মনির উদ্দিন। এর বাইরে সংগঠনের নেতা-কর্মীদের মধ্যে খুব বেশি আত্মীয়তার যোগসূত্র ছিল না।

কিন্তু ১৯৯৮ সালে জন্ম নেওয়া জামাআতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশ (জেএমবি) মূলত পরিবার ও আত্মীয়স্বজনকেন্দ্রিক জঙ্গি নেটওয়ার্ক বিস্তারের কৌশল গ্রহণ করে। শুরুতেই এর প্রতিষ্ঠাতা শায়খ আবদুর রহমান পরিবারের সদস্যদের নেতৃত্বে এনেছেন। জেএমবির শ‌ুরা কমিটিতে তাঁর পরেই ছিলেন ছোট ভাই আতাউর রহমান (সানি) ও জামাতা আবদুল আউয়াল। তাঁদের পর স্থান পান সিদ্দিকুল ইসলাম (বাংলা ভাই)। এর মধ্যে সানিকে করেছিলেন জেএমবির কথিত সামরিক শাখার প্রধান।

আবার শায়খ আবদুর রহমানের জামাতা আউয়ালের ভাগনে মামুনুর রশীদ ওরফে রিপন নব্য জেএমবির সামরিক সদস্য। বাড়ি বগুড়ার দুপচাঁচিয়ায়। রিপন বিয়ে করেন পুরোনো জেএমবির বর্তমান আমির মাওলানা সাইদুর রহমানের দ্বিতীয় স্ত্রীর বড় বোনের মেয়েকে।

২০০৭ সালে শায়খ আবদুর রহমান, সানি, আউয়াল ও বাংলা ভাইয়ের ফাঁসির পর জেএমবির আমিরের দায়িত্ব পান হবিগঞ্জের মাওলানা সাইদুর রহমান। তাঁর বড় ছেলে শামীম ছিলেন জেএমবির তথ্যপ্রযুক্তি শাখার প্রধান। শামীম ও তাঁর স্ত্রী আলেয়া ২০০৫ সালের আগস্টে ঢাকায় গ্রেপ্তার হন। সাইদুর গ্রেপ্তার হওয়ার পর তৃতীয় ছেলে ফাহিম ওরফে বাশার জেএমবির আর্থিক বিষয়াদি দেখাশোনা করতেন। তিনি পরে আটক হন।

সাইদুরের একমাত্র মেয়ে শিরিনের বিয়ে হয়েছে জেএমবির প্রতিষ্ঠাকালীন সামরিক শাখার প্রধান আতাউর রহমান ওরফে সানির সঙ্গে। সানির ফাঁসি হওয়ার পর শিরিনকে বিয়ে করেছেন আরেক জঙ্গি সংগঠন জামাআতুল মুসলেমিনের অন্যতম শীর্ষ নেতা সাজ্জাদ এজাজ ওরফে কারগিল। পাকিস্তানের ডন পত্রিকার খবর অনুযায়ী, কারগিলসহ চার জঙ্গি গত বছরের ৯ জানুয়ারি ভোরে করাচিতে এক বন্দুকযুদ্ধে নিহত হন।

সাইদুর রহমান তিনটি বিয়ে করেন। জেএমবির আমির হওয়ার বছর খানেক পর ২০০৮ সালের সেপ্টেম্বরে দ্বিতীয় বিয়ে করেন। স্ত্রীর নাম নুরুন্নাহার, বাড়ি দিনাজপুরে। নুরুন্নাহারের দুই ভাই মোশতাকিম বিল্লাহ ওরফে মুশতাক (নিহত) ও মোহতাসিম বিল্লাহ ওরফে রুবেল (২০১১-তে গ্রেপ্তার) জেএমবির সঙ্গে যুক্ত।

নুরুন্নাহারের বোন বদরুন্নাহারকে বিয়ে করেছেন জেএমবির সামরিক শাখার সাবেক প্রধান নাজমুল ওরফে ভাগিনা শহীদ। নাজমুলের বোন সুফিয়াকে বিয়ে দিয়েছেন আরেক জঙ্গির কাছে।

সাইদুর রহমানের দ্বিতীয় স্ত্রী নুরুন্নাহার ২০০৯ সালের ৩১ অক্টোবর ঢাকার খিলগাঁও থেকে গ্রেপ্তার হন। এরপর সাইদুর রহমান জেএমবির এক জঙ্গির বিধবা বোন নাইমা আক্তারকে বিয়ে করেন। ২০১০ সালের ২৪ মে রাজধানীর পূর্ব দনিয়ায় নাইমাসহ গ্রেপ্তার হন সাইদুর।

সাইদুর ও তাঁর দুই স্ত্রীকে জিজ্ঞাসাবাদে পুলিশ জঙ্গিদের আত্মীয়তার বন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার এসব তথ্য পায়। শীর্ষ নেতাদের মতো জেএমবির মাঠ পর্যায়ের সদস্যদের অনেকেই একইভাবে পরস্পর আত্মীয়তার বন্ধনে যুক্ত হন। এ রকম আরও অন্তত ১০টি উদাহরণ আছে আত্মীয়তার। ঝালকাঠির পিপি হায়দার হত্যা এবং চট্টগ্রামে ঈশা খাঁ ঘাঁটি মসজিদে বোমা হামলার পরিকল্পনাকারী ও এজাহারভুক্ত আসামিরাসহ আলোচিত অনেক জঙ্গি একই প্রক্রিয়ায় আত্মীয়তার বন্ধনে আবদ্ধ হন। একে অন্যের আত্মীয়কে বিয়ে করে লতাপাতায় জড়িয়ে থাকার এই প্রবণতা বেশি ছিল উত্তরাঞ্চলে। নিহত জঙ্গির বিধবা স্ত্রীকে সংগঠনের সিদ্ধান্তে কেউ না কেউ বিয়ে করতেন। যাতে ওই নারীর কাছ থেকে কোনো তথ্য ফাঁস না হয়।

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সন্ত্রাসবাদ বিষয়ে বিশেষজ্ঞ জাকার্তার ইনস্টিটিউট অব পলিসি অ্যানালাইসিস অব কনফ্লিক্টের পরিচালক সিডনি জোনস ২০০৯ সালে ঢাকায় এলে এ প্রতিবেদকের সঙ্গে তাঁর কথা হয়। তিনি তখন বলেছিলেন, ইন্দোনেশিয়াতেও জঙ্গিগোষ্ঠীগুলোর সদস্যদের মধ্যেও বিয়েশাদি ও আত্মীয়তা গড়ে তোলার প্রবণতা রয়েছে। এর প্রধান কারণ সংগঠনের গোপনীয়তা রক্ষা।

সিডনি জোনস সাম্প্রতিক এক বিশ্লেষণে বলেছে, ইন্দোনেশিয়ার নতুন জঙ্গি গোষ্ঠী আইএস কেবল একক ব্যক্তি নয়, পুরো পরিবারকে তাদের মতাদর্শের দিকে টানছে।

এই প্রবণতা এখন বাংলাদেশের নব্য জেএমবিতেও দেখা যাচ্ছে। এই বিষয়ে কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের অতিরিক্ত উপকমিশনার ছানোয়ার হোসেনের পর্যবেক্ষণ হচ্ছে, আগে যখন জঙ্গিদের প্রচুর সদস্য ছিল, তখন এই প্রবণতা ছিল না। তখন অনেক জঙ্গি স্ত্রী-পরিবারকে বাড়িতে রেখে নিজেরা গোপন তৎপরতায় যুক্ত হয়েছিল। পরিবার স্বাভাবিক জীবনযাপন করত। কিন্তু যখন জঙ্গিদের সদস্যসংখ্যা কমে গেল এবং নতুন সদস্য সংগ্রহও কঠিন হয়ে গেল, তখন তারা পুরো পরিবারকে যুক্ত করতে থাকল, যাতে পরিবারের প্রত্যেক সদস্যকে ব্যবহার করা যায়।

ছানোয়ার হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, মূলত পরিবারের কর্তাব্যক্তিরাই বাকিদের এ পথে আনেন। আর ছোট ছোট দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে নারী সদস্য, এমনকি কিশোরেরাও আক্রমণাত্মক হয়ে উঠছে, যা আশকোনা ও আজিমপুরের আস্তানায় অভিযানের সময় দেখা গেছে।

অবশ্য কেবল জঙ্গি তানভীর কাদেরী, মেজর জাহিদ, বাশারুজ্জামান, মারজানেরাই নন, আইএসে যোগ দিতে দেশ ছেড়েছেন এমন ব্যক্তিরাও স্ত্রী-বাচ্চাসহ পুরো পরিবার নিয়ে বিপথগামী হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে গোপালগঞ্জের সাইফুল হক (সুজন) অন্যতম। তিনি উচ্চশিক্ষার জন্য যুক্তরাজ্য যান। সেখানে তথ্যপ্রযুক্তির প্রতিষ্ঠান দিয়ে অল্পদিনে সফল ব্যবসায়ীও হন। ২০০৫ সালে দেশে আসেন। কিছুদিন পর অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী ও ছোট দুই বাচ্চা নিয়ে সিরিয়া চলে যান। গত বছরের ১০ ডিসেম্বর রাকায় ড্রোন হামলায় নিহত হন। তখন মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর জানায়, সাইফুল আইএসের শীর্ষ ১০ জনের একজন ছিলেন।

সাইফুল তাঁর বড় ভাই, ছোট এক ভাই ও বাবাকেও এই মতাদর্শে উদ্বুদ্ধ করেন। সাইফুলের ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান আইব্যাকসের বাংলাদেশ কার্যালয় ছিল ঢাকার কারওয়ান বাজারে। ৮ ডিসেম্বর কারওয়ান বাজার থেকে সাইফুলের বাবা, ভাই, শ্যালক ও আইব্যাকসের হিসাবরক্ষককে গ্রেপ্তার করে গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। তাঁদের কাছ থেকে ৩৫ লাখ টাকা উদ্ধার করা হয়।

তদন্ত-সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, ৫০ হাজার মার্কিন ডলারের সমপরিমাণ এ টাকা হুন্ডির মাধ্যমে বিদেশ থেকে এসেছে নব্য জেএমবির নেতা ও গুলশান হামলার মূল পরিকল্পনাকারী তামিম চৌধুরীকে দেওয়ার জন্য।

আবার ঢাকা শিশু হাসপাতালের চিকিৎসক খন্দকার রোকনুদ্দীন (৫০) স্ত্রী কলেজশিক্ষক নাইমা আক্তার (৪৫), তাঁদের দুই মেয়ে, জামাতাসহ সিরিয়ায় যাওয়ার উদ্দেশে দেশ ছেড়েছেন। যাওয়ার আগে বাড়ি বিক্রি করে টাকা দিয়ে গেছেন নব্য জেএমবিকে। গুলশান হামলার আগ পর্যন্ত এ পরিবারটির দেশত্যাগের কথা কেউ জানত না। এ রকম আরও বেশ কয়েকজনের সপরিবারে দেশের ভেতরে বা বাইরে গিয়ে জঙ্গিবাদে জড়ানোর খবর পাওয়া গেছে।

জানতে চাইলে পুলিশের কাউন্টার টেররিজম বিভাগের উপকমিশনার মহিবুল ইসলাম খান প্রথম আলোকে বলেন, অভিযানে নিহত নব্য জেএমবির নেতা তানভীর কাদেরী, মেজর (অব.) জাহিদুল ইসলাম, পলাতক বাশারুজ্জামান, নুরুল ইসলাম ওরফে মারজান, মাইনুল ওরফে মুসা পুরো পরিবার নিয়ে জঙ্গিবাদে জড়িয়েছেন। তাঁরা সবাই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে গুলশান হামলায় যুক্ত ছিলেন। তিনি বলেন, নারীরা মূলত স্বামীদের দ্বারা উদ্বুদ্ধ হয়ে বা তাঁদের চাপে বিপথগামী হন।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব পিস অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের প্রেসিডেন্ট মেজর জেনারেল (অব.) এম মুনিরুজ্জামান এ প্রবণতাকে ভয়াবহ বলে মন্তব্য করেছেন। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, এখানে দেখা যাচ্ছে পুরো পরিবারকে একটা সন্ত্রাসী ইউনিটে রূপান্তর করা হচ্ছে। এ ধরনের ফ্যামিলি ইউনিটে বাইরে থেকে কেউ অনুপ্রবেশ করতে পারে না, প্যানিট্রেট করা কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে সহজে তাদের সম্পর্কে কোনো তথ্য বের করা যায় না।

Comments

comments

সম্পাদক : মোহাম্মদ আবদুল বাছির
প্রকাশক: মোহাম্মদ জহিরুল ইসলাম
ফোন : ‎০১৭১৩৪০৯০৯০
৩৪৫/১, দিলু রোড, নিউ ইস্কাটন, ঢাকা-১০০০
X
 
নিয়মিত খবর পড়তে আমাদের ফেসবুক পেজে লাইক দিয়ে যুক্ত থাকুন
X