মঙ্গলবার, ২০শে ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ ইং, ৮ই ফাল্গুন, ১৪২৪ বঙ্গাব্দ, সকাল ৭:৫৫
শিরোনাম
  • ঘৃণাকে বিজয়ী হতে দেয়া যাবে না, ট্রাম্পকে ইঙ্গিত করে জর্জ ক্লুনি
  • আমার একটাই চিন্তা দেশের মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন করা: প্রধানমন্ত্রী
  • ‘কেন্দ্রীয় সরকারের আগ্রাসী নীতির কারণে কাশ্মীরকে হারাতে হবে’
  • সাড়ে চারমাস পর মুখোমুখি, খাদিজাকে উদ্দেশ্য করে যা বলল বদরুল
  • খালেদার ‘সাজা’ বিরোধী নেতাকর্মীদের মনোবল ভাঙ্গার কৌশল!
  • বিএনপির কর্মসূচি ‘যথাসময়ে’ জানানো হবে: রিজভী
  • দলের জন্য বোলিং করতেও রাজি মুশফিক
  • শিশু জিহাদের মৃত্যু: চার জনের ১০ বছর করে কারাদণ্ড
  • অবশেষে বাড়ি অবরুদ্ধ করে রাখা সেই দেয়াল ভেঙ্গে ফেলা হচ্ছে
  • সাক্ষ্য দিলেন খাদিজা, চাইলেন বদরুলের সর্বোচ্চ শাস্তি
  • বদরুলের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিতে আদালতে খাদিজা
  • আজ বগুড়ায় যেসব প্রকল্প উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী
  • রোহিঙ্গা স্থানান্তরের সরকারি পরিকল্পনার সঙ্গে দ্বিমত মানবাধিকার কমিশনের
  • মহেশখালীতে ইয়াবা ব্যবসায়ীদের সঙ্গে পুলিশের ‘বন্দুকযুদ্ধ’
  • হোয়াইট হাউসে কাজ করার দীর্ঘ অভিজ্ঞতার কথা জানালেন এই বাংলাদেশি সাংবাদিক
Monday, December 19, 2016 6:53 am
A- A A+ Print

পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগে লেনদেন ৩ থেকে ২০ লাখ টাকা

5

পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগে ৩ থেকে ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত লেনদেনের ঘটনা ঘটছে বলে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) এর গবেষণা প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। এছাড়াও আরো অন্তত ৩৬টি ধাপে শিক্ষক নিয়োগে অস্বচ্ছতা, স্বজনপ্রীতি, রাজনৈতিক প্রভাব, মতার্দশ ও দল ভারী করার মতো ঘটনা ঘটছে। ধমীয় পরিচয়ে বাতিল ও প্রাধান্য, আঞ্চলিকতা, বিধি-বহির্ভূত আর্থিক লেনদেন, দুর্নীতি, অনিয়ম, পছন্দের প্রার্থীর ক্ষেত্রে যোগ্যতা শিথিল বা কঠিন করা, চাহিদার কম-বেশি শিক্ষক নিয়োগ দেয়া হয় বলে উঠে এসেছে ওই প্রতিবেদনে। গতকাল রাজধানীর ধানমন্ডিতে টিআইবি কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে সংস্থাটির পক্ষ থেকে রিপোর্টের বিস্তারিত তুলে ধরা হয়। ২০০১ সাল থেকে ২০১৬ সালের ঘটনা গবেষণায় স্থান পেলেও তা করা হয়েছে এ বছরের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত। দেশের ৩৭টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে ১৩টি বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে গবেষণাটি পরিচালিত হয়। সংবাদ সম্মেলনে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রভাষক নিয়োগে তিন থেকে ২০ লাখ টাকা লেনদেনের ঘটনা ঘটছে। প্রভাষক নিয়োগের ক্ষেত্রে ১৩টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্য সংগ্রহ করে আটটিতে শিক্ষক নিয়োগে অস্বচ্ছতা, স্বজনপ্রীতি ও অর্থ লেনদেনের তথ্য পাওয়া গেছে। ড. ইফতেখারুজ্জামান আরো বলেন, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগে প্রতিষ্ঠানের প্রধান অর্থাৎ ভিসির অভিপ্রায়ই চূড়ান্ত বলে বিবেচিত হয়। সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের মন্ত্রী, সংসদ সদস্য, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রভাবশালী শিক্ষক, ছাত্র নেতা, ভিসি, প্রো-ভিসি, ডিন, বিভাগীয় প্রধানদের প্রভাব বিস্তারের মাধ্যমে শিক্ষক নিয়োগ দেয়া হয়। অপেক্ষাকৃত কম যোগ্যদের নিয়োগ দিতে শর্ত শিথিল করে শিক্ষকের সন্তান, স্বামী, স্ত্রী, শ্যালক, শ্যালিকা ও আত্মীয়দের নিয়োগ দেয়ার ঘটনা প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ে রয়েছে। প্রতিবেদনে এ অবস্থা থেকে উত্তরণে প্রভাষক নিয়োগে সুনির্দিষ্ট ও স্বচ্ছ বিধিমালা তৈরিসহ বিভিন্ন সুপারিশ করেছে টিআইবি। সুপারিশগুলোর মধ্যে রয়েছে ভিসি, প্রো-ভিসি নিয়োগে বিধিমালা প্রণয়নে যোগ্যতার মানদণ্ড ও নিয়োগ প্রক্রিয়ার উল্লেখকরণ, নিয়োগ প্রক্রিয়া শিক্ষক সমিতির প্রভাবমুক্ত করা, ফলাফল ইঞ্জিনিয়ারিং বন্ধ করা ইত্যাদি। সংবাদ সম্মেলনে গবেষণাপত্র উপস্থাপন করেন টিআইবির রিসার্স অ্যান্ড পলিসি প্রোগ্রাম ম্যানেজার রেজাউল করিম ও দিপু রায়। গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়, নিয়োগের আগে থেকেই বিভিন্ন ধরনের অনিয়ম শুরু হয়। নিয়োগ বোর্ড গঠন, সুবিধামতো যোগ্যতা পরিবর্তন বা শিথিল করা, জবাবদিহি না থাকার মাধ্যমে এই অনিয়মের শুরুটা হয়। গবেষণায় দেখা গেছে, ১৩টি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে ১২টি বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়োগ বোর্ড গঠনে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের মতাদর্শের সুযোগ বিদ্যমান ছিল। নিয়োগের আগেই আরো যেভাবে অনিয়ম শুরু হয়, তারও কিছু চিত্র তুলে ধরা হয় এই প্রতিবেদনে। এতে বলা হয়, কোনো কোনো শিক্ষক পছন্দের শিক্ষার্থীদের একাডেমিক পরীক্ষার ফল প্রভাবিত করেন এবং পরবর্তী সময়ে তাদের নিয়োগ দেয়া হয়। এ ছাড়া বাজার করাসহ ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহার করে আগে থেকেই একাডেমিক পরীক্ষার সম্ভাব্য প্রশ্ন সম্পর্কে ধারণা দেয়া হয়। ক্ষেত্র বিশেষে নারী শিক্ষার্থীর একাংশের সঙ্গে বিশেষ সম্পর্ক স্থাপনের মাধ্যমে একাডেমিক পরীক্ষায় নম্বর বাড়িয়ে দেয়া, পরীক্ষার পূর্বে প্রশ্ন জানানো ও পরবর্তী সময়ে শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়। ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের মতাদর্শের সমর্থনকারী বা পছন্দের প্রার্থীকে নিয়োগ দেয়ার জন্য একাডেমিক পরীক্ষা ফল দ্রুত প্রকাশ, অপছন্দের প্রার্থীর নিয়োগ ঠেকাতে ফল দেরিতে প্রকাশ, কখন ফল প্রকাশের পূর্বে দ্রুত নিয়োগ পরীক্ষা অনুষ্ঠিত করা, বিশেষ প্রার্থীর জন্য শর্ত শিথিল, গ্রেডিং হ্রাস-বৃদ্ধি, থিসিস প্রকাশের নির্দিষ্ট সময় নির্ধারণ করে দেয়া, পছন্দের প্রার্থীকে নিয়োগে দেয়ার জন্য বিজ্ঞপ্তির কম-বেশি সংখ্যক উল্লেখ করে নিয়মের অপব্যবহার করা, বিশেষ সিন্ডেকেটের অনুমোদন ছাড়াই নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ, ভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শের অনুসারীকে ঠেকাতে কম প্রচারিত পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ, ভোটার বা নিজের লোক নিয়োগ দিতে নতুন বিভাগ, ইনস্টিটিউট খোলা, একটি বিভাগ ভেঙে একাধিক বিভাগ খোলা, নিয়োগের চাহিদা আটকে রাখা বা বিলম্বিত করা, সনদ, নথিপত্র, ব্যাংক ড্রাফট ও প্রকাশনা কপি সরিয়ে অযোগ্য করা, দেরিতে আমন্ত্রণপত্র পাঠানো, আবেদনের যোগ্যতা না থাকার পরও পছন্দের প্রার্থীকে সুযোগ দেয়া, লিখিত পরীক্ষার জন্য প্রশ্ন তৈরি ও পছন্দের প্রার্থীকে আগেই প্রশ্ন জানিয়ে দেয়া, ভাইভা বোর্ডে অছন্দের প্রার্থীকে অবান্তর প্রশ্ন, পছন্দের প্রার্থীকে অকারণে প্রশংসা, প্রশাসন ও গোয়েন্দা সংস্থার মাধ্যমে রাজনৈতিক মতাদর্শ যাচাই এবং প্রথার অপব্যবহার, মেধাবী হওয়ার পরও ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে বঞ্চিত, কখনও নিয়োগের প্রাধান্য দেয়া হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের যে জেলা এলাকায় অবস্থিত সেই জেলা বা পাশাপাশি জেলার প্রার্থীকে প্রাধান্য দেয়া, ক্ষমতাসীন স্থানীয় ও জাতীয় রাজনৈতিক নেতাদের চাপে নিয়োগ দেয়া, ভিসি ও প্রো-ভিসি নিজ এলাকা ও জেলা প্রার্থীকে প্রাধান্য দেয়া, ভিসি, শিক্ষক নেতা, রেজিস্ট্রার অফিস কর্মকর্তা-কর্মচারী বিশেষজ্ঞ, ছাত্রনেতা, ক্ষমতাসীন দলের নেতা ও জনপ্রতিনিধি একাংশের নেতারা আর্থিক লেনদেনের জড়িত থাকে। এসব অনিয়মের কারণে নিয়োগ প্রক্রিয়ায় নোট অব ডিসেন্টের সুযোগ থাকলেও সেটিকে গুরুত্ব না দিয়ে সিন্ডিকেট নিয়োগ চূড়ান্ত করে। ১৩টি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে ১২টিতেই কোনো না কোনো নিয়োগের ক্ষেত্রে নোট অব ডিসেন্ট’কে কার্যকর পদক্ষেপ হিসেবে দেখা যায়নি। এ ছাড়া ১১টি বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়মবহির্ভূতভাবে বিজ্ঞপ্তির চেয়েও বেশি শিক্ষক নিয়োগ করা হয়। রাজনৈতিক মতাদর্শ ও দল ভারী করা এসব অনিয়মের একটি বড় প্রভাবক। প্রতিবেদনে বেশ কিছু সুপারিশও তুলে ধরা হয়। সংবাদ সম্মেলনে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, সার্বিক চিত্রটি হতাশাব্যঞ্জক ও উদ্বেগজনক। তিনি প্রভাষক নিয়োগে সমন্বিত ও পূর্ণাঙ্গ নিয়োগ বিধিমালা করার দাবি জানান। তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়গুলো রাজনৈতিক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। জাতীয় রাজনৈতিক বিভাজন এখন দেশের শিক্ষকদের মধ্যকার দ্বিধা-বিভাজনের কারণ হয়ে র্দাড়িয়েছে। তিনি আরো বলেন, রাজনৈতিক দলের প্রভাবশালীর সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের প্রভাবশালীর একাংশের সমঝোতার ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগে নানা ধরনের অনিয়মের ঘটনা ঘটছে। এক্ষেত্রে বিদ্যমান পরিস্থিতির উন্নয়নে সুশাসন নিশ্চিত করতে পারলে উচ্চ শিক্ষার গুণগত মান নিশ্চিত করা সম্ভব। অনুষ্ঠানে শিক্ষাবিদ ও টিআইবির ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্য সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম বলেন, আমার অভিজ্ঞতা বলেন, যে চিত্র তুলে ধরা হয়েছে, তা বাস্তব। কত শতাংশ অনিয়ম-দুর্নীতি হলো, সেটা বিচার করছি না। কারণ, নিম্ন মেধার একজন শিক্ষক নিয়োগ হলে প্রায় ৪০ বছর ওই বিশ্ববিদ্যালয়কে শ্রেষ্ঠ শিক্ষা দেয়া থেকে বঞ্চিত করবেন। তাই এ ধরনের একটি ঘটনা হলেও তা মানতে চাই না। এটি অশনিসংকেত। গবেষণায় উত্থাপিত প্রধান কয়েকটি সুপারিশ হলো- পূর্ণাঙ্গ নীতিমালা বা নির্দেশিকা প্রণয়ন, নিয়োগ প্রক্রিয়াকে শিক্ষক সমিতির প্রভাবমুক্ত রাখা, ভিসি ও প্রো-ভিসি নিয়োগ বিধিমালা প্রণয়ন, শিক্ষক সমিতির কার্যক্রম সীমিতকরণ এবং ফলাফল ইঞ্জিনিয়ারিং বন্ধকরণ। এছাড়া, শিক্ষকদের কর্মভার বিবেচনা করে শিক্ষক নিয়োগের চাহিদা যাচাই ও উপস্থাপন, প্রভাষক পদে আবেদন করার যোগ্যতা বা নিয়ম পূর্ব থেকে সুনির্দিষ্ট করা, নিয়োগ কমিটি গঠনের সুনির্দিষ্ট নীতিমালা প্রণয়ন, আবেদনের জন্য পর্যাপ্ত সময় প্রদান, স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় প্রার্থিতা মূল্যায়ন নিশ্চিতকরণ, নিয়োগ পরীক্ষার নম্বর প্রদানের সুনির্দিষ্ট পদ্ধতি থাকা, নোট অব ডিসেন্ট’কে গুরুত্বসহকারে বিবেচনায় নেয়া, নিয়োগ সংক্রান্ত অভিযোগ দায়ের ও নিষ্পত্তির ব্যবস্থা, প্রার্থীদের আবেদন সাপেক্ষে নিয়োগ সংক্রান্ত তথ্য জানার ব্যবস্থা এবং নিয়োগ-বিধি লঙ্ঘনের কার্যকর জবাবদিহিতা ও শাস্তির ব্যবস্থা নিশ্চিতের সুপারিশ করা হয়েছে গবেষণা প্রতিবেদনে। এ সময় আরো উপস্থিত ছিলেন টিআইবির উপ-নির্বাহী পরিচালক ড. সুমাইয়া খায়ের, ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্য অধ্যাপক সৈয়দ মঞ্জুরুল ইসলাম প্রমুখ।

Comments

Comments!

 পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগে লেনদেন ৩ থেকে ২০ লাখ টাকাAmarbangladeshonlineAmarbangladeshonline | Amarbangladeshonline

পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগে লেনদেন ৩ থেকে ২০ লাখ টাকা

Monday, December 19, 2016 6:53 am
5

পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগে ৩ থেকে ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত লেনদেনের ঘটনা ঘটছে বলে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) এর গবেষণা প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। এছাড়াও আরো অন্তত ৩৬টি ধাপে শিক্ষক নিয়োগে অস্বচ্ছতা, স্বজনপ্রীতি, রাজনৈতিক প্রভাব, মতার্দশ ও দল ভারী করার মতো ঘটনা ঘটছে। ধমীয় পরিচয়ে বাতিল ও প্রাধান্য, আঞ্চলিকতা, বিধি-বহির্ভূত আর্থিক লেনদেন, দুর্নীতি, অনিয়ম, পছন্দের প্রার্থীর ক্ষেত্রে যোগ্যতা শিথিল বা কঠিন করা, চাহিদার কম-বেশি শিক্ষক নিয়োগ দেয়া হয় বলে উঠে এসেছে ওই প্রতিবেদনে। গতকাল রাজধানীর ধানমন্ডিতে টিআইবি কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে সংস্থাটির পক্ষ থেকে রিপোর্টের বিস্তারিত তুলে ধরা হয়।
২০০১ সাল থেকে ২০১৬ সালের ঘটনা গবেষণায় স্থান পেলেও তা করা হয়েছে এ বছরের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত। দেশের ৩৭টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে ১৩টি বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে গবেষণাটি পরিচালিত হয়। সংবাদ সম্মেলনে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রভাষক নিয়োগে তিন থেকে ২০ লাখ টাকা লেনদেনের ঘটনা ঘটছে। প্রভাষক নিয়োগের ক্ষেত্রে ১৩টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্য সংগ্রহ করে আটটিতে শিক্ষক নিয়োগে অস্বচ্ছতা, স্বজনপ্রীতি ও অর্থ লেনদেনের তথ্য পাওয়া গেছে।
ড. ইফতেখারুজ্জামান আরো বলেন, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগে প্রতিষ্ঠানের প্রধান অর্থাৎ ভিসির অভিপ্রায়ই চূড়ান্ত বলে বিবেচিত হয়। সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের মন্ত্রী, সংসদ সদস্য, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রভাবশালী শিক্ষক, ছাত্র নেতা, ভিসি, প্রো-ভিসি, ডিন, বিভাগীয় প্রধানদের প্রভাব বিস্তারের মাধ্যমে শিক্ষক নিয়োগ দেয়া হয়। অপেক্ষাকৃত কম যোগ্যদের নিয়োগ দিতে শর্ত শিথিল করে শিক্ষকের সন্তান, স্বামী, স্ত্রী, শ্যালক, শ্যালিকা ও আত্মীয়দের নিয়োগ দেয়ার ঘটনা প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ে রয়েছে। প্রতিবেদনে এ অবস্থা থেকে উত্তরণে প্রভাষক নিয়োগে সুনির্দিষ্ট ও স্বচ্ছ বিধিমালা তৈরিসহ বিভিন্ন সুপারিশ করেছে টিআইবি। সুপারিশগুলোর মধ্যে রয়েছে ভিসি, প্রো-ভিসি নিয়োগে বিধিমালা প্রণয়নে যোগ্যতার মানদণ্ড ও নিয়োগ প্রক্রিয়ার উল্লেখকরণ, নিয়োগ প্রক্রিয়া শিক্ষক সমিতির প্রভাবমুক্ত করা, ফলাফল ইঞ্জিনিয়ারিং বন্ধ করা ইত্যাদি। সংবাদ সম্মেলনে গবেষণাপত্র উপস্থাপন করেন টিআইবির রিসার্স অ্যান্ড পলিসি প্রোগ্রাম ম্যানেজার রেজাউল করিম ও দিপু রায়।
গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়, নিয়োগের আগে থেকেই বিভিন্ন ধরনের অনিয়ম শুরু হয়। নিয়োগ বোর্ড গঠন, সুবিধামতো যোগ্যতা পরিবর্তন বা শিথিল করা, জবাবদিহি না থাকার মাধ্যমে এই অনিয়মের শুরুটা হয়। গবেষণায় দেখা গেছে, ১৩টি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে ১২টি বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়োগ বোর্ড গঠনে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের মতাদর্শের সুযোগ বিদ্যমান ছিল। নিয়োগের আগেই আরো যেভাবে অনিয়ম শুরু হয়, তারও কিছু চিত্র তুলে ধরা হয় এই প্রতিবেদনে। এতে বলা হয়, কোনো কোনো শিক্ষক পছন্দের শিক্ষার্থীদের একাডেমিক পরীক্ষার ফল প্রভাবিত করেন এবং পরবর্তী সময়ে তাদের নিয়োগ দেয়া হয়। এ ছাড়া বাজার করাসহ ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহার করে আগে থেকেই একাডেমিক পরীক্ষার সম্ভাব্য প্রশ্ন সম্পর্কে ধারণা দেয়া হয়। ক্ষেত্র বিশেষে নারী শিক্ষার্থীর একাংশের সঙ্গে বিশেষ সম্পর্ক স্থাপনের মাধ্যমে একাডেমিক পরীক্ষায় নম্বর বাড়িয়ে দেয়া, পরীক্ষার পূর্বে প্রশ্ন জানানো ও পরবর্তী সময়ে শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়। ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের মতাদর্শের সমর্থনকারী বা পছন্দের প্রার্থীকে নিয়োগ দেয়ার জন্য একাডেমিক পরীক্ষা ফল দ্রুত প্রকাশ, অপছন্দের প্রার্থীর নিয়োগ ঠেকাতে ফল দেরিতে প্রকাশ, কখন ফল প্রকাশের পূর্বে দ্রুত নিয়োগ পরীক্ষা অনুষ্ঠিত করা, বিশেষ প্রার্থীর জন্য শর্ত শিথিল, গ্রেডিং হ্রাস-বৃদ্ধি, থিসিস প্রকাশের নির্দিষ্ট সময় নির্ধারণ করে দেয়া, পছন্দের প্রার্থীকে নিয়োগে দেয়ার জন্য বিজ্ঞপ্তির কম-বেশি সংখ্যক উল্লেখ করে নিয়মের অপব্যবহার করা, বিশেষ সিন্ডেকেটের অনুমোদন ছাড়াই নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ, ভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শের অনুসারীকে ঠেকাতে কম প্রচারিত পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ, ভোটার বা নিজের লোক নিয়োগ দিতে নতুন বিভাগ, ইনস্টিটিউট খোলা, একটি বিভাগ ভেঙে একাধিক বিভাগ খোলা, নিয়োগের চাহিদা আটকে রাখা বা বিলম্বিত করা, সনদ, নথিপত্র, ব্যাংক ড্রাফট ও প্রকাশনা কপি সরিয়ে অযোগ্য করা, দেরিতে আমন্ত্রণপত্র পাঠানো, আবেদনের যোগ্যতা না থাকার পরও পছন্দের প্রার্থীকে সুযোগ দেয়া, লিখিত পরীক্ষার জন্য প্রশ্ন তৈরি ও পছন্দের প্রার্থীকে আগেই প্রশ্ন জানিয়ে দেয়া, ভাইভা বোর্ডে অছন্দের প্রার্থীকে অবান্তর প্রশ্ন, পছন্দের প্রার্থীকে অকারণে প্রশংসা, প্রশাসন ও গোয়েন্দা সংস্থার মাধ্যমে রাজনৈতিক মতাদর্শ যাচাই এবং প্রথার অপব্যবহার, মেধাবী হওয়ার পরও ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে বঞ্চিত, কখনও নিয়োগের প্রাধান্য দেয়া হয়।
বিশ্ববিদ্যালয়ের যে জেলা এলাকায় অবস্থিত সেই জেলা বা পাশাপাশি জেলার প্রার্থীকে প্রাধান্য দেয়া, ক্ষমতাসীন স্থানীয় ও জাতীয় রাজনৈতিক নেতাদের চাপে নিয়োগ দেয়া, ভিসি ও প্রো-ভিসি নিজ এলাকা ও জেলা প্রার্থীকে প্রাধান্য দেয়া, ভিসি, শিক্ষক নেতা, রেজিস্ট্রার অফিস কর্মকর্তা-কর্মচারী বিশেষজ্ঞ, ছাত্রনেতা, ক্ষমতাসীন দলের নেতা ও জনপ্রতিনিধি একাংশের নেতারা আর্থিক লেনদেনের জড়িত থাকে।
এসব অনিয়মের কারণে নিয়োগ প্রক্রিয়ায় নোট অব ডিসেন্টের সুযোগ থাকলেও সেটিকে গুরুত্ব না দিয়ে সিন্ডিকেট নিয়োগ চূড়ান্ত করে। ১৩টি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে ১২টিতেই কোনো না কোনো নিয়োগের ক্ষেত্রে নোট অব ডিসেন্ট’কে কার্যকর পদক্ষেপ হিসেবে দেখা যায়নি। এ ছাড়া ১১টি বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়মবহির্ভূতভাবে বিজ্ঞপ্তির চেয়েও বেশি শিক্ষক নিয়োগ করা হয়। রাজনৈতিক মতাদর্শ ও দল ভারী করা এসব অনিয়মের একটি বড় প্রভাবক। প্রতিবেদনে বেশ কিছু সুপারিশও তুলে ধরা হয়। সংবাদ সম্মেলনে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, সার্বিক চিত্রটি হতাশাব্যঞ্জক ও উদ্বেগজনক। তিনি প্রভাষক নিয়োগে সমন্বিত ও পূর্ণাঙ্গ নিয়োগ বিধিমালা করার দাবি জানান। তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়গুলো রাজনৈতিক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। জাতীয় রাজনৈতিক বিভাজন এখন দেশের শিক্ষকদের মধ্যকার দ্বিধা-বিভাজনের কারণ হয়ে র্দাড়িয়েছে। তিনি আরো বলেন, রাজনৈতিক দলের প্রভাবশালীর সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের প্রভাবশালীর একাংশের সমঝোতার ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগে নানা ধরনের অনিয়মের ঘটনা ঘটছে। এক্ষেত্রে বিদ্যমান পরিস্থিতির উন্নয়নে সুশাসন নিশ্চিত করতে পারলে উচ্চ শিক্ষার গুণগত মান নিশ্চিত করা সম্ভব।
অনুষ্ঠানে শিক্ষাবিদ ও টিআইবির ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্য সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম বলেন, আমার অভিজ্ঞতা বলেন, যে চিত্র তুলে ধরা হয়েছে, তা বাস্তব। কত শতাংশ অনিয়ম-দুর্নীতি হলো, সেটা বিচার করছি না। কারণ, নিম্ন মেধার একজন শিক্ষক নিয়োগ হলে প্রায় ৪০ বছর ওই বিশ্ববিদ্যালয়কে শ্রেষ্ঠ শিক্ষা দেয়া থেকে বঞ্চিত করবেন। তাই এ ধরনের একটি ঘটনা হলেও তা মানতে চাই না। এটি অশনিসংকেত। গবেষণায় উত্থাপিত প্রধান কয়েকটি সুপারিশ হলো- পূর্ণাঙ্গ নীতিমালা বা নির্দেশিকা প্রণয়ন, নিয়োগ প্রক্রিয়াকে শিক্ষক সমিতির প্রভাবমুক্ত রাখা, ভিসি ও প্রো-ভিসি নিয়োগ বিধিমালা প্রণয়ন, শিক্ষক সমিতির কার্যক্রম সীমিতকরণ এবং ফলাফল ইঞ্জিনিয়ারিং বন্ধকরণ। এছাড়া, শিক্ষকদের কর্মভার বিবেচনা করে শিক্ষক নিয়োগের চাহিদা যাচাই ও উপস্থাপন, প্রভাষক পদে আবেদন করার যোগ্যতা বা নিয়ম পূর্ব থেকে সুনির্দিষ্ট করা, নিয়োগ কমিটি গঠনের সুনির্দিষ্ট নীতিমালা প্রণয়ন, আবেদনের জন্য পর্যাপ্ত সময় প্রদান, স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় প্রার্থিতা মূল্যায়ন নিশ্চিতকরণ, নিয়োগ পরীক্ষার নম্বর প্রদানের সুনির্দিষ্ট পদ্ধতি থাকা, নোট অব ডিসেন্ট’কে গুরুত্বসহকারে বিবেচনায় নেয়া, নিয়োগ সংক্রান্ত অভিযোগ দায়ের ও নিষ্পত্তির ব্যবস্থা, প্রার্থীদের আবেদন সাপেক্ষে নিয়োগ সংক্রান্ত তথ্য জানার ব্যবস্থা এবং নিয়োগ-বিধি লঙ্ঘনের কার্যকর জবাবদিহিতা ও শাস্তির ব্যবস্থা নিশ্চিতের সুপারিশ করা হয়েছে গবেষণা প্রতিবেদনে। এ সময় আরো উপস্থিত ছিলেন টিআইবির উপ-নির্বাহী পরিচালক ড. সুমাইয়া খায়ের, ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্য অধ্যাপক সৈয়দ মঞ্জুরুল ইসলাম প্রমুখ।

Comments

comments

সম্পাদক : মোহাম্মদ আবদুল বাছির
প্রকাশক: মোহাম্মদ জহিরুল ইসলাম
ফোন : ‎০১৭১৩৪০৯০৯০
৩৪৫/১, দিলু রোড, নিউ ইস্কাটন, ঢাকা-১০০০
X
 
নিয়মিত খবর পড়তে আমাদের ফেসবুক পেজে লাইক দিয়ে যুক্ত থাকুন
X