শনিবার, ২৪শে ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ ইং, ১২ই ফাল্গুন, ১৪২৪ বঙ্গাব্দ, রাত ১:৫৪
শিরোনাম
  • ঘৃণাকে বিজয়ী হতে দেয়া যাবে না, ট্রাম্পকে ইঙ্গিত করে জর্জ ক্লুনি
  • আমার একটাই চিন্তা দেশের মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন করা: প্রধানমন্ত্রী
  • ‘কেন্দ্রীয় সরকারের আগ্রাসী নীতির কারণে কাশ্মীরকে হারাতে হবে’
  • সাড়ে চারমাস পর মুখোমুখি, খাদিজাকে উদ্দেশ্য করে যা বলল বদরুল
  • খালেদার ‘সাজা’ বিরোধী নেতাকর্মীদের মনোবল ভাঙ্গার কৌশল!
  • বিএনপির কর্মসূচি ‘যথাসময়ে’ জানানো হবে: রিজভী
  • দলের জন্য বোলিং করতেও রাজি মুশফিক
  • শিশু জিহাদের মৃত্যু: চার জনের ১০ বছর করে কারাদণ্ড
  • অবশেষে বাড়ি অবরুদ্ধ করে রাখা সেই দেয়াল ভেঙ্গে ফেলা হচ্ছে
  • সাক্ষ্য দিলেন খাদিজা, চাইলেন বদরুলের সর্বোচ্চ শাস্তি
  • বদরুলের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিতে আদালতে খাদিজা
  • আজ বগুড়ায় যেসব প্রকল্প উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী
  • রোহিঙ্গা স্থানান্তরের সরকারি পরিকল্পনার সঙ্গে দ্বিমত মানবাধিকার কমিশনের
  • মহেশখালীতে ইয়াবা ব্যবসায়ীদের সঙ্গে পুলিশের ‘বন্দুকযুদ্ধ’
  • হোয়াইট হাউসে কাজ করার দীর্ঘ অভিজ্ঞতার কথা জানালেন এই বাংলাদেশি সাংবাদিক
Tuesday, November 1, 2016 8:39 pm
A- A A+ Print

প্রবাসী না স্বদেশি

d9fa16d7ce846a57be01157b76f7117b-pic-4-1

দেশ ছেড়ে এসেছি ঠিক বছর আটকে আগে। রঙিন স্বপ্নের জাল বুনতে। প্রথম যখন প্রবাসে আসি স্বপ্নের ঘোরে কাটতে থাকে দিনগুলি। সবকিছুই ভালো লাগতে থাকে। এমনকি মরা গাছের ঝরা পাতা থেকে শুরু করে সবকিছু। এভাবে ঘোরের মোহে কেটে যায় মাস। এ মোহ যেন কিছুতেই কাটে না। স্বপ্নের ফানুস যেন নাটাই ছাড়াই উঠতে থাকে রংবেরঙের আকাশে। এরপর আরও ছয় মাস কেটে যায়। তারপর আস্তে আস্তে একটু একটু করে ঘোর কাটতে থাকে। এক সময় ঘোর কেটে বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে যাই আমি। ঠিক তখনই ভাবতে থাকি ফেলে আসা আমার দুরন্ত কৈশোরকে। গ্রামের শান্ত পুকুরের লাফ–ঝাঁপ, গ্রীষ্মের আম–কাঁঠাল, নবান্নের ধান ভাঙা, বিকেলের খেলার মাঠ, রাতের জোছনায় চাঁদের আলোয় আলোকিত গ্রামের আলপথ। সন্ধ্যায় পাড়ার চায়ের দোকানির পাতা সেদ্ধ কড়া লিকারের চায়ের সঙ্গে বন্ধুদের আড্ডা। সবচেয়ে বেশি মনে পড়ে দেশে ফেলে আসা মায়াবী চেহারার কিছু মুখ। সব সবকিছুই যেন ভাসতে থাকে আমার চোখের সামনে। অবচেতন মনে আমি স্পর্শ করতে চাই সেই সব। কিন্তু মরীচিকার অদৃশ্য ছায়া যেন আমাকে মিথ্যা প্রমাণ করতে থাকে বারবার। কর্মব্যস্ততার দিন গিয়ে ঠেকে রাতে। আবার রাত শেষে অনেক সময় ভোরের আলো আমার ভেতর প্রবেশ করে। আমি ভুলতে চেষ্টা করি নিকট অতীত। কিন্তু তা কী করে সম্ভব? যে অতীত আমার মন ও মননে। যে অতীতকে ভুলে গেলে আমি যে অস্তিত্বের সংকটে পড়ে যাব। আমার ভেতরকার আমিই থাকব না। ঘড়ির কাঁটা হয়তো বা বন্ধ হয়ে যেতে পারে কিন্তু সকাল নয়টায় আমার বাবাকে ফোন করা বন্ধ হয় না। ফোনের ওপাশ থেকে আমার বাবার মৃদু আওয়াজ যেন আমাকে আশ্বস্ত করে। মায়ের চাপা কান্না আমাকে কাঁদায়। ফোন শেষে কর্মব্যস্ত জীবনে কিছু সময়ের জন্য ভুলিয়ে দেয় আমায়। আবার আরেক সকালের প্রতীক্ষায় রাত পার করে ঠিক নয়টা বাবার ফোনে আমার ফোন। দিন যায়, মাস যায়, ঠিক এভাবেই। স্বজনের বাঁধভাঙা ব্যাকুলতা কিংবা নাড়ির টানে কোনো এক সময় আমার সুর বেজে ওঠে মাতৃকার পথে। সারা রাত নির্ঘুম কাটে এপাশ-ওপাশ করে। এ যেন আগ্রহ, মায়া কিংবা স্বজনের কাছে ফিরে যাওয়ার ব্যাকুলতা। প্লেনের নির্দিষ্ট ওজনের অতিরিক্ত হতে থাকে আমার সঙ্গে যাওয়া লাগেজের ওজন। অনেক সময় মনে হয় পুরো দেশটাই ঢুকিয়ে নিয়ে যাই। সময়ের দুই ঘণ্টা আগে গিয়ে বসে থাকি এয়ারপোর্টে। এটি নিতান্তই আবেগের তাড়না কিংবা মাটির টান। নিজের ক্ষুদ্র মনকে বুঝ দেওয়ার ছোট্ট একটি প্রয়াস। প্লেন যখন ঢাকার আকাশে ঠিক ডাঙ্গায় ওঠা মাছের মতো লাফাতে থাকি। অস্থিরতায় মাথা ঝিমঝিম করে বাংলার মাটিকে স্পর্শ করার জন্য। আবেগঘন মুহূর্তের অবতারণা ঘটে প্রিয়জনকে দেখে। মিলনের শুরু থেকে শেষ অবধি নানান কুশল বিনিময়ে কাটিয়ে নিজ গন্তব্যের পথে পথ বাড়ান সবাই। আমি চোখ বন্ধ করে দীর্ঘশ্বাস নিতে থাকি আমার চারপাশের। শান্ত কোমল পরিবেশ আমাকে বুঝতে শেখায় আমার আপন আলয়ের কথা। মাটির সোঁদা গন্ধ নিতে খালি পায়ে বিচরণ করতে থাকি এদিক ওদিকে। এ চাচা, ওই চাচি, এ দাদা, ওই দাদি ছুটে আসেন আমার আগমনে। বহু দিন না দেখা আমাকে নিজ চোখে দেখার জন্য উদ্বিগ্ন তাঁদের চোখ। আমি ভাষাহীন অপলক তাকিয়ে থাকি তাদের চোখের দিকে। স্বজনের চোখের মায়ায় আমার চোখে আনন্দের অশ্রু নিয়ে আসে। এ যে ভালোবাসা আর মায়া। এ ভালোবাসার মূল্য কী দেব? এ যে মূল্যহীন সাত রাজার ধন। অন্যদিকে সম্পূর্ণ ব্যতিক্রম শুধু আমার মা। পৃথিবীর সমস্ত আলো যেন ফুটে আছে আমার মায়ের মুখে। মায়ের আনন্দ যেন ছড়িয়ে পড়েছে পুরো বাড়ি। রান্নাঘরের রান্না রেখে ছুটে আসেন আমার কাছে। মাথায় হাত বুলাতে থাকেন পরম মমতায়। আমি মায়ের ছোট্ট অবুঝ শিশুটির মতো মাথা গুঁজে দিই মায়ের আচঁলে। এ আঁচলের ঘ্রাণ যে আমার বড়ই চেনা। সারা দুনিয়ার সকল দামি দামি প্রসাধনীর ঘ্রাণকেও হার মানাবে আমার মায়ের আঁচলের ঘ্রাণ। পাড়ায় মহল্লায় সকলের সঙ্গে দেখা হয়। কুশল বিনিময় হয়। একেকজন একেক খবর জানতে চান। এরই মধ্যে নতুন মানুষের বসতি হয়েছে আমাদের পাড়ায়। যাদের সঙ্গে আমার পরিচয় নেই বললেই চলে। পরিচিতদের মধ্যে কেউ একজন নিজ দায়িত্বে পরিচয় করিয়ে দেন আমাকে প্রবাসী বলে। প্রবাসী কথা শুনে বুক ধরে আসে তবুও মানিয়ে নিই নীরবে। প্রবাসী শোনার পর অপরিচিত মুখে যেন এক বিস্ময়কর অবয়ব তৈরি হয়। আমি বুঝি সেই অপরিচিতের না বলা মুখের ভাষা। ঠিক নদীর এপারের লোক মনে করেন ওপারের লোকটি কতই না সুখী। আর ওপারের লোক মনে করেন এপারের কথা। আমার দিন ফুরোতে থাকে। আনন্দের বাজারের প্রবাসে ফিরে যাওয়া ঘণ্টা বেজে ওঠে। আমার আনন্দময় দিনগুলো আস্তে আস্তে অতীতে রূপ নেয়। কোনো এক সকালে মায়ের চাপা কান্নায় ঘুম ভেঙে যায়। ভাবতে থাকি যাওয়ার সময় ঘনিয়ে এসেছে। আধ চোখে ঘুম নিয়ে মায়ের কাছে যেতে না যেতে কান্নার আওয়াজ যেন ক্রমশই বাড়তে থাকে। এ যেন মেলায় হারিয়ে যাওয়া কোনো খোকার জন্য মায়ের আর্তনাদ। মায়ের মুখ মলিন হয়ে যায় যেন পৃথিবীর সমস্ত শোক বিবরণ মায়ের মুখের লেপ্টে আছে। আমার ফিরে আসারও সময় হয়ে আসে এক সময়। যথারীতি বাবা–মা আর নিকট আত্মীয়স্বজন আমাকে বিদায় জানাতে এয়ারপোর্টের হাজির হন। মায়ের কান্না যেন থামতে চায় না। আর বাবা যেন অশ্রু বিসর্জন দেন নীরবে নিভৃতে। মায়ের চোখাচোখি হতে না হতেই বাবা মুহূর্তে চোখ মুছে স্বাভাবিক হওয়ার মিথ্যা অভিনয় করেও হার মানতে হয় তাঁকে। প্রতীকী ছবিআর আমি চেপে ধরে রাখি আমার চোখের অশ্রুকে। অভয় দিয়ে বিদায় নিতে থাকি। মা বায়না ধরেন ফোনে কথা বলার। প্লেন টেকঅফ হওয়ার আগ মুহূর্ত পর্যন্ত। আমি কাঁদি, একা একা কাঁদি, প্লেনের জানালায় যখন দেখি স্বদেশের আকাশ পেরিয়ে প্লেন এখন অন্য আকাশে। তখন আর বুঝতে বাকি থাকে না যে আবার যান্ত্রিক জীবনের ফিরে এসেছি আমি। কর্মব্যস্ত হয়ে ওঠে আমার দিনগুলি। এখানে আমার পরিচয় আমি একজন বাঙালি। একজন বাংলাদেশি। কিন্তু যে স্বদেশে আমার জন্ম, বেড়ে ওঠা সে দেশে আমার পরিচয় আমি প্রবাসী। ঠিক যেমনটি হয়ে এসেছে আমার মতো লাখো প্রবাসী বাংলাদেশি মানুষের ভাগ্য। এরপরের যাত্রাতো আরও কঠিন। সেই যাত্রায় শামিল হয় আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম। যাদের জন্ম ও বেড়ে ওঠা এই প্রবাসে। ঠিক তখনই মৃত্যু ঘটে আমাদের মতো প্রবাসীদের। দেহ পড়ে থাকে এখানে আর মন বিচরণ করে সেই সোনালি অতীতের দিনগুলিতে। আর আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম শেকড় গেড়ে বসে থাকে প্রবাসে আপন দেশ মনে করে। কিন্তু আমরা না পারি ওদের মতো হতে, না পারি স্বদেশি হতে। এ যেন আক্ষেপ। তবে জীবনানন্দের মতো বলতে চাই: আবার আসিব ফিরে ধানসিঁড়িটির তীরে–এই বাংলায়/ হয়তো মানুষ নয়-হয়তো বা শাঁখচিল শালিকের বেশে,/ হয়তো ভোরের কাক হয়ে এই কার্তিকের নবান্নের দেশে/ কুয়াশার বুকে ভেসে একদিন আসিব কাঁঠাল ছায়ায়।/ হয়তো বা হাঁস কোনো-কিশোরীর-ঘুঙুর রহিবে লাল পায় সারা দিন কেটে যাবে কলমির গন্ধভরা জলে ভেসে ভেসে।

Comments

Comments!

 প্রবাসী না স্বদেশিAmarbangladeshonlineAmarbangladeshonline | Amarbangladeshonline

প্রবাসী না স্বদেশি

Tuesday, November 1, 2016 8:39 pm
d9fa16d7ce846a57be01157b76f7117b-pic-4-1
দেশ ছেড়ে এসেছি ঠিক বছর আটকে আগে। রঙিন স্বপ্নের জাল বুনতে। প্রথম যখন প্রবাসে আসি স্বপ্নের ঘোরে কাটতে থাকে দিনগুলি। সবকিছুই ভালো লাগতে থাকে। এমনকি মরা গাছের ঝরা পাতা থেকে শুরু করে সবকিছু। এভাবে ঘোরের মোহে কেটে যায় মাস। এ মোহ যেন কিছুতেই কাটে না। স্বপ্নের ফানুস যেন নাটাই ছাড়াই উঠতে থাকে রংবেরঙের আকাশে। এরপর আরও ছয় মাস কেটে যায়। তারপর আস্তে আস্তে একটু একটু করে ঘোর কাটতে থাকে। এক সময় ঘোর কেটে বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে যাই আমি।
ঠিক তখনই ভাবতে থাকি ফেলে আসা আমার দুরন্ত কৈশোরকে। গ্রামের শান্ত পুকুরের লাফ–ঝাঁপ, গ্রীষ্মের আম–কাঁঠাল, নবান্নের ধান ভাঙা, বিকেলের খেলার মাঠ, রাতের জোছনায় চাঁদের আলোয় আলোকিত গ্রামের আলপথ। সন্ধ্যায় পাড়ার চায়ের দোকানির পাতা সেদ্ধ কড়া লিকারের চায়ের সঙ্গে বন্ধুদের আড্ডা। সবচেয়ে বেশি মনে পড়ে দেশে ফেলে আসা মায়াবী চেহারার কিছু মুখ। সব সবকিছুই যেন ভাসতে থাকে আমার চোখের সামনে। অবচেতন মনে আমি স্পর্শ করতে চাই সেই সব। কিন্তু মরীচিকার অদৃশ্য ছায়া যেন আমাকে মিথ্যা প্রমাণ করতে থাকে বারবার।
কর্মব্যস্ততার দিন গিয়ে ঠেকে রাতে। আবার রাত শেষে অনেক সময় ভোরের আলো আমার ভেতর প্রবেশ করে। আমি ভুলতে চেষ্টা করি নিকট অতীত। কিন্তু তা কী করে সম্ভব? যে অতীত আমার মন ও মননে। যে অতীতকে ভুলে গেলে আমি যে অস্তিত্বের সংকটে পড়ে যাব। আমার ভেতরকার আমিই থাকব না।

ঘড়ির কাঁটা হয়তো বা বন্ধ হয়ে যেতে পারে কিন্তু সকাল নয়টায় আমার বাবাকে ফোন করা বন্ধ হয় না। ফোনের ওপাশ থেকে আমার বাবার মৃদু আওয়াজ যেন আমাকে আশ্বস্ত করে। মায়ের চাপা কান্না আমাকে কাঁদায়। ফোন শেষে কর্মব্যস্ত জীবনে কিছু সময়ের জন্য ভুলিয়ে দেয় আমায়। আবার আরেক সকালের প্রতীক্ষায় রাত পার করে ঠিক নয়টা বাবার ফোনে আমার ফোন। দিন যায়, মাস যায়, ঠিক এভাবেই।
স্বজনের বাঁধভাঙা ব্যাকুলতা কিংবা নাড়ির টানে কোনো এক সময় আমার সুর বেজে ওঠে মাতৃকার পথে। সারা রাত নির্ঘুম কাটে এপাশ-ওপাশ করে। এ যেন আগ্রহ, মায়া কিংবা স্বজনের কাছে ফিরে যাওয়ার ব্যাকুলতা। প্লেনের নির্দিষ্ট ওজনের অতিরিক্ত হতে থাকে আমার সঙ্গে যাওয়া লাগেজের ওজন। অনেক সময় মনে হয় পুরো দেশটাই ঢুকিয়ে নিয়ে যাই।
সময়ের দুই ঘণ্টা আগে গিয়ে বসে থাকি এয়ারপোর্টে। এটি নিতান্তই আবেগের তাড়না কিংবা মাটির টান। নিজের ক্ষুদ্র মনকে বুঝ দেওয়ার ছোট্ট একটি প্রয়াস।
প্লেন যখন ঢাকার আকাশে ঠিক ডাঙ্গায় ওঠা মাছের মতো লাফাতে থাকি। অস্থিরতায় মাথা ঝিমঝিম করে বাংলার মাটিকে স্পর্শ করার জন্য।
আবেগঘন মুহূর্তের অবতারণা ঘটে প্রিয়জনকে দেখে। মিলনের শুরু থেকে শেষ অবধি নানান কুশল বিনিময়ে কাটিয়ে নিজ গন্তব্যের পথে পথ বাড়ান সবাই। আমি চোখ বন্ধ করে দীর্ঘশ্বাস নিতে থাকি আমার চারপাশের। শান্ত কোমল পরিবেশ আমাকে বুঝতে শেখায় আমার আপন আলয়ের কথা। মাটির সোঁদা গন্ধ নিতে খালি পায়ে বিচরণ করতে থাকি এদিক ওদিকে।
এ চাচা, ওই চাচি, এ দাদা, ওই দাদি ছুটে আসেন আমার আগমনে। বহু দিন না দেখা আমাকে নিজ চোখে দেখার জন্য উদ্বিগ্ন তাঁদের চোখ। আমি ভাষাহীন অপলক তাকিয়ে থাকি তাদের চোখের দিকে। স্বজনের চোখের মায়ায় আমার চোখে আনন্দের অশ্রু নিয়ে আসে। এ যে ভালোবাসা আর মায়া। এ ভালোবাসার মূল্য কী দেব? এ যে মূল্যহীন সাত রাজার ধন।
অন্যদিকে সম্পূর্ণ ব্যতিক্রম শুধু আমার মা। পৃথিবীর সমস্ত আলো যেন ফুটে আছে আমার মায়ের মুখে। মায়ের আনন্দ যেন ছড়িয়ে পড়েছে পুরো বাড়ি। রান্নাঘরের রান্না রেখে ছুটে আসেন আমার কাছে। মাথায় হাত বুলাতে থাকেন পরম মমতায়। আমি মায়ের ছোট্ট অবুঝ শিশুটির মতো মাথা গুঁজে দিই মায়ের আচঁলে। এ আঁচলের ঘ্রাণ যে আমার বড়ই চেনা। সারা দুনিয়ার সকল দামি দামি প্রসাধনীর ঘ্রাণকেও হার মানাবে আমার মায়ের আঁচলের ঘ্রাণ।
পাড়ায় মহল্লায় সকলের সঙ্গে দেখা হয়। কুশল বিনিময় হয়। একেকজন একেক খবর জানতে চান। এরই মধ্যে নতুন মানুষের বসতি হয়েছে আমাদের পাড়ায়। যাদের সঙ্গে আমার পরিচয় নেই বললেই চলে। পরিচিতদের মধ্যে কেউ একজন নিজ দায়িত্বে পরিচয় করিয়ে দেন আমাকে প্রবাসী বলে। প্রবাসী কথা শুনে বুক ধরে আসে তবুও মানিয়ে নিই নীরবে। প্রবাসী শোনার পর অপরিচিত মুখে যেন এক বিস্ময়কর অবয়ব তৈরি হয়। আমি বুঝি সেই অপরিচিতের না বলা মুখের ভাষা। ঠিক নদীর এপারের লোক মনে করেন ওপারের লোকটি কতই না সুখী। আর ওপারের লোক মনে করেন এপারের কথা।
আমার দিন ফুরোতে থাকে। আনন্দের বাজারের প্রবাসে ফিরে যাওয়া ঘণ্টা বেজে ওঠে। আমার আনন্দময় দিনগুলো আস্তে আস্তে অতীতে রূপ নেয়। কোনো এক সকালে মায়ের চাপা কান্নায় ঘুম ভেঙে যায়। ভাবতে থাকি যাওয়ার সময় ঘনিয়ে এসেছে। আধ চোখে ঘুম নিয়ে মায়ের কাছে যেতে না যেতে কান্নার আওয়াজ যেন ক্রমশই বাড়তে থাকে। এ যেন মেলায় হারিয়ে যাওয়া কোনো খোকার জন্য মায়ের আর্তনাদ। মায়ের মুখ মলিন হয়ে যায় যেন পৃথিবীর সমস্ত শোক বিবরণ মায়ের মুখের লেপ্টে আছে।
আমার ফিরে আসারও সময় হয়ে আসে এক সময়। যথারীতি বাবা–মা আর নিকট আত্মীয়স্বজন আমাকে বিদায় জানাতে এয়ারপোর্টের হাজির হন। মায়ের কান্না যেন থামতে চায় না। আর বাবা যেন অশ্রু বিসর্জন দেন নীরবে নিভৃতে। মায়ের চোখাচোখি হতে না হতেই বাবা মুহূর্তে চোখ মুছে স্বাভাবিক হওয়ার মিথ্যা অভিনয় করেও হার মানতে হয় তাঁকে।
প্রতীকী ছবিআর আমি চেপে ধরে রাখি আমার চোখের অশ্রুকে। অভয় দিয়ে বিদায় নিতে থাকি। মা বায়না ধরেন ফোনে কথা বলার। প্লেন টেকঅফ হওয়ার আগ মুহূর্ত পর্যন্ত।
আমি কাঁদি, একা একা কাঁদি, প্লেনের জানালায় যখন দেখি স্বদেশের আকাশ পেরিয়ে প্লেন এখন অন্য আকাশে। তখন আর বুঝতে বাকি থাকে না যে আবার যান্ত্রিক জীবনের ফিরে এসেছি আমি।
কর্মব্যস্ত হয়ে ওঠে আমার দিনগুলি। এখানে আমার পরিচয় আমি একজন বাঙালি। একজন বাংলাদেশি।
কিন্তু যে স্বদেশে আমার জন্ম, বেড়ে ওঠা সে দেশে আমার পরিচয় আমি প্রবাসী। ঠিক যেমনটি হয়ে এসেছে আমার মতো লাখো প্রবাসী বাংলাদেশি মানুষের ভাগ্য।
এরপরের যাত্রাতো আরও কঠিন। সেই যাত্রায় শামিল হয় আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম। যাদের জন্ম ও বেড়ে ওঠা এই প্রবাসে। ঠিক তখনই মৃত্যু ঘটে আমাদের মতো প্রবাসীদের। দেহ পড়ে থাকে এখানে আর মন বিচরণ করে সেই সোনালি অতীতের দিনগুলিতে। আর আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম শেকড় গেড়ে বসে থাকে প্রবাসে আপন দেশ মনে করে। কিন্তু আমরা না পারি ওদের মতো হতে, না পারি স্বদেশি হতে।
এ যেন আক্ষেপ। তবে জীবনানন্দের মতো বলতে চাই: আবার আসিব ফিরে ধানসিঁড়িটির তীরে–এই বাংলায়/ হয়তো মানুষ নয়-হয়তো বা শাঁখচিল শালিকের বেশে,/ হয়তো ভোরের কাক হয়ে এই কার্তিকের নবান্নের দেশে/ কুয়াশার বুকে ভেসে একদিন আসিব কাঁঠাল ছায়ায়।/ হয়তো বা হাঁস কোনো-কিশোরীর-ঘুঙুর রহিবে লাল পায় সারা দিন কেটে যাবে কলমির গন্ধভরা জলে ভেসে ভেসে।

Comments

comments

সম্পাদক : মোহাম্মদ আবদুল বাছির
প্রকাশক: মোহাম্মদ জহিরুল ইসলাম
ফোন : ‎০১৭১৩৪০৯০৯০
৩৪৫/১, দিলু রোড, নিউ ইস্কাটন, ঢাকা-১০০০
X
 
নিয়মিত খবর পড়তে আমাদের ফেসবুক পেজে লাইক দিয়ে যুক্ত থাকুন
X