বৃহস্পতিবার, ২২শে ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ ইং, ১০ই ফাল্গুন, ১৪২৪ বঙ্গাব্দ, সকাল ৭:১৫
শিরোনাম
  • ঘৃণাকে বিজয়ী হতে দেয়া যাবে না, ট্রাম্পকে ইঙ্গিত করে জর্জ ক্লুনি
  • আমার একটাই চিন্তা দেশের মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন করা: প্রধানমন্ত্রী
  • ‘কেন্দ্রীয় সরকারের আগ্রাসী নীতির কারণে কাশ্মীরকে হারাতে হবে’
  • সাড়ে চারমাস পর মুখোমুখি, খাদিজাকে উদ্দেশ্য করে যা বলল বদরুল
  • খালেদার ‘সাজা’ বিরোধী নেতাকর্মীদের মনোবল ভাঙ্গার কৌশল!
  • বিএনপির কর্মসূচি ‘যথাসময়ে’ জানানো হবে: রিজভী
  • দলের জন্য বোলিং করতেও রাজি মুশফিক
  • শিশু জিহাদের মৃত্যু: চার জনের ১০ বছর করে কারাদণ্ড
  • অবশেষে বাড়ি অবরুদ্ধ করে রাখা সেই দেয়াল ভেঙ্গে ফেলা হচ্ছে
  • সাক্ষ্য দিলেন খাদিজা, চাইলেন বদরুলের সর্বোচ্চ শাস্তি
  • বদরুলের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিতে আদালতে খাদিজা
  • আজ বগুড়ায় যেসব প্রকল্প উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী
  • রোহিঙ্গা স্থানান্তরের সরকারি পরিকল্পনার সঙ্গে দ্বিমত মানবাধিকার কমিশনের
  • মহেশখালীতে ইয়াবা ব্যবসায়ীদের সঙ্গে পুলিশের ‘বন্দুকযুদ্ধ’
  • হোয়াইট হাউসে কাজ করার দীর্ঘ অভিজ্ঞতার কথা জানালেন এই বাংলাদেশি সাংবাদিক
Friday, November 11, 2016 11:37 am
A- A A+ Print

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যে কারণে দুঃসংবাদ

5

ভারতের একজন সুপরিচিত সম্পাদক, শেখর গুপ্ত সতীর্থ সাংবাদিকদের উদ্দেশে তাঁর টুইটে লিখেছেন, শোকার্ত হওয়ার কোনো কারণ নেই। পুতিন, সি, এরদোয়ান ও মোদির সঙ্গে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যুক্ত হয়ে দুনিয়া চালাবেন। সুতরাং, খবরের আর কোনো অভাব হবে না। শেখর গুপ্ত ঠিকই বলেছেন, তাঁরা প্রচুর খবরের জন্ম দেন এবং ভবিষ্যতেও তাতে ভাটা পড়ার সম্ভাবনা কম। কিন্তু আমার আশঙ্কা অন্য খানে। তাঁরা খবর তৈরি করলেই সেটা যে ছাপতে দেবেন, তার কোনো নিশ্চয়তা আছে কি? আসুন, কয়েকটি উদাহরণ দেখে নিই। ভারত তার জনসংখ্যার কারণে বিশ্বের সবচেয়ে বড় গণতন্ত্র বলে পরিচিত। কিন্তু বড় হলেই যে শ্রেষ্ঠ হবে, এমন কোনো কথা নেই। মাত্র সপ্তাহ খানেক আগে দেশটির তথ্য মন্ত্রণালয় সেখানকার সবচেয়ে জনপ্রিয় টিভি চ্যানেল এনডিটিভির সম্প্রচার এক দিনের জন্য বন্ধ রাখার নির্দেশ জারি করে। এনডিটিভির একটি সম্প্রচারে জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি তৈরি হওয়ার অভিযোগে ওই নিষেধাজ্ঞা জারি হয়। পরে আসামের একটি চ্যানেল আসাম টাইমের সম্প্রচারও এক দিনের জন্য বন্ধ রাখার নির্দেশ জারি হয়। ভারতের সম্পাদক ও সাংবাদিকদের ঐক্যবদ্ধ প্রতিবাদ এবং আইনি লড়াইয়ের কারণে নিষেধাজ্ঞাগুলো আপাতত স্থগিত আছে। সম্পাদকদের সংগঠন এডিটরস গিল্ড এসব নিষেধাজ্ঞাকে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার ওপর সরাসরি আঘাত বলে অভিহিত করেছে। সম্পাদকেরা বলেছেন, জরুরি অবস্থাকালে সরকার যে ধরনের সেন্সরশিপ আরোপ করত, এই নিষেধাজ্ঞা তার সমতুল্য। সরকার যখন কোনো সংবাদপ্রচারের সঙ্গে একমত হতে পারছে না, তখন তার ওপর হস্তক্ষেপের ক্ষমতা নিজের হাতে তুলে নিয়েছে বলেও এতে প্রতীয়মান হচ্ছে। বিরোধপূর্ণ কাশ্মীর নিয়ে প্রতিবেশী ও আজন্ম প্রতিদ্বন্দ্বী পাকিস্তানের সঙ্গে তার রাজনৈতিক এবং রেষারেষির ইতিহাসটা আমরা সবাই কমবেশি জানি। এর মধ্যে ভারতে হিন্দু জাতীয়তাবাদের পুনর্জাগরণ ঘটানো রাজনীতিক নরেন্দ্র মোদি তাঁর রাষ্ট্রনীতিতে নতুন এক কৌশল আমদানি করেছেন এবং তাঁরা এর নাম দিয়েছেন সার্জিক্যাল স্ট্রাইক। এই সার্জিক্যাল স্ট্রাইক প্রথমে তাঁরা প্রয়োগ করেন গত বছর মিয়ানমারে কথিত ভারতীয় বিচ্ছিন্নতাবাদীদের বিরুদ্ধে। আর এবার সেটা প্রয়োগ করলেন কাশ্মীরের পাকিস্তান-নিয়ন্ত্রিত অংশে। পাকিস্তানের নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকায় সার্জিক্যাল স্ট্রাইকের আগে ভারতশাসিত জম্মু-কাশ্মীরের উরিতে ঘটে এক সন্ত্রাসী হামলা। এই সর্বসাম্প্রতিক নিষেধাজ্ঞা জারির আগে নানা ধরনের চাপের কারণে এনডিটিভি এই সন্ত্রাস এবং নিরাপত্তা বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী চিদাম্বরমের সাক্ষাৎকার প্রচার না করে বিতর্কের জন্ম দেয়। ওই বিতর্কের মুখে প্রতিষ্ঠানটি নিরাপত্তা বাহিনীর কোনো সমালোচনা প্রচার করবে না জানিয়ে তার সংশোধিত সম্পাদকীয় নীতি প্রকাশ করে। ভারতে সংবাদপত্রের স্বাধীনতা এখন যে কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে, তার দায় নিশ্চয়ই সরকার ছাড়া অন্য কারও নয়? সুলতান এরদোয়ানের তুরস্ক এদিক থেকে আরও অনেক এগিয়ে। সেখানে মাত্র অক্টোবরের শেষ সোমবার পুলিশ শত বছরের পুরোনো ধর্মনিরপেক্ষতায় বিশ্বাসী পত্রিকা চামহুরিয়াত-এর প্রধান সম্পাদকসহ ১৩ জন সাংবাদিককে গ্রেপ্তার করে। তাঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তাঁরা ১৫ জুলাই যে ব্যর্থ অভ্যুত্থানের চেষ্টা হয়েছিল, তাকে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করছেন। সরকার পত্রিকাটিকে রাষ্ট্রের শত্রু বলেও অভিহিত করে। ওই একই মাসে পুলিশ ইস্তাম্বুলভিত্তিক টিভি চ্যানেল আইএমসি বন্ধ করে দেয়। গত জুলাইয়ের ব্যর্থ অভ্যুত্থানচেষ্টার পর দেশটিতে বিরোধী রাজনীতিক, সেনা কর্মকর্তা, সরকারি-বেসরকারি কর্মচারী, শিক্ষকসহ হাজার হাজার ভিন্নমতাবলম্বীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। জরুরি অবস্থা ঘোষণা করে এই যে দমন অভিযান চলছে, তাতে ইতিমধ্যে শতাধিক সংবাদমাধ্যমের ওপর খড়্গ নেমে এসেছে। এই হিসাব সাংবাদিকদের অধিকাররক্ষা আন্দোলনের বৈশ্বিক সংগঠন, কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্টসের (সিপিজে)। তারা বলছে, দেশটিতে বর্তমানে আটক আছেন শতাধিক সাংবাদিক। সিপিজে বলছে যে তুরস্ক সরকারের কার্যক্রমে প্রমাণিত হয় যে তারা সরকারি ভাষ্যের বাইরে অন্য কোনো ভাষ্য এবং মতামত প্রকাশের সব পথ বন্ধ করে দিতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। সিপিজের মূল্যায়ন নিয়েই যখন কথা বলছি, তখন তাদের আরেকটি আগাম সতর্কবাণীর কথা পাঠকদের মনে করিয়ে দিই। গত ১৭ অক্টোবর সংগঠনটি এক নজিরবিহীন পদক্ষেপ হিসেবে একটি বিবৃতি দেয়। সিপিজের পরিচালনা পরিষদের প্রধান স্যান্ড্রা মিমস রোয়ি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, ‘ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট পদে জয়ী হলে তা হবে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার জন্য হুমকি।’ তিনি বিবৃতিতে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের ফার্স্ট অ্যামেন্ডমেন্টের (যা মতপ্রকাশের স্বাধীনতার গ্যারান্টি হিসেবে বিবেচিত হয়) মূল্যবোধের সঙ্গে অব্যাহতভাবে বিশ্বাসঘাতকতা করে চলেছেন। বিবৃতিতে তিনি জানান, সিপিজের পরিচালনা পরিষদ চলতি মাসে (অক্টোবর) অনুষ্ঠিত একটি সভায় গৃহীত প্রস্তাবে ‘সাংবাদিকদের স্বাধীনতা এবং বিশ্বব্যাপী সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার পক্ষে কাজ করার জন্য সিপিজের সামর্থ্যের প্রতি’ মি. ট্রাম্পকে হুমকি হিসেবে ঘোষণা করেছে। প্রার্থিতা ঘোষণার পর থেকেই ট্রাম্প সংবাদমাধ্যমকে অপদস্থ করেছেন এবং এটিকেই তাঁর প্রচারণার কেন্দ্রীয় বিষয়ে রূপান্তরিত করেছেন। তিনি আলাদাভাবে সংবাদমাধ্যম এবং ব্যক্তিগতভাবে সাংবাদিকদের অসৎ ও আবর্জনা বলে অভিহিত করে এসেছেন। তিনি সাংবাদিকদের ওপর তাঁর সমর্থকদের হামলার নিন্দা করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন এবং যাঁরা তাঁর সমালোচনা করেন, তাঁদের তাঁর প্রচারাভিযানের খবর সংগ্রহের জন্য প্রবেশাধিকার দেননি। যুক্তরাষ্ট্রের এবারের নির্বাচনে সংবাদমাধ্যমের উদারপন্থী অংশ মি ট্রাম্পের প্রতিদ্বন্দ্বী হিলারি ক্লিনটনকে নিয়ে একটু বেশি উচ্ছ্বসিত ছিল বলে সেটা অনেকের চোখে লেগেছে। সাংবাদিক বন্ধুদের অনেকে এবং আমাদের টিভি চ্যানেলগুলোর কল্যাণে বিশ্লেষক বনে যাওয়া কেউ কেউ যুক্তরাষ্ট্রের সংবাদমাধ্যমের এ ধরনের পক্ষপাতে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন। হিলারিকে নিয়ে উদারপন্থী সংবাদমাধ্যমের কিছুটা উচ্ছ্বাস যে ছিল তা যেমন ঠিক, তেমনি এটাও ঠিক যে কট্টর ডানপন্থী গণমাধ্যমও তাদের ট্রাম্পের প্রতি আনুগত্য ও পক্ষপাতে কোনো রাখঢাক করেনি। তবে সেটা বাংলাদেশে অধিকাংশেরই চোখে পড়েনি। কেননা, ফক্স নিউজ এখানে হয় পাওয়া যায় না, নয়তো তা বাজার পায়নি (ট্রাম্প তাঁর বিজয়োত্তর প্রথম বক্তৃতায় যাঁদের ধন্যবাদ দিয়েছেন, তাঁদের মধ্যে মাইক হাকাবির নাম আপনাদের অনেকেরই মনে পড়বে। মাইক হাকাবি এই ফক্স নিউজের একজন টক শো উপস্থাপক)। যুক্তরাষ্ট্রের সংবাদপত্রগুলো যে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের মধ্যে একজনকে বেছে নিয়ে তাঁর প্রতি সমর্থন ঘোষণা করে, এটা নতুন কোনো ঘটনা নয়। এই চলটি অনেক দিন ধরেই চালু। এবার ২০০টির বেশি সংবাদপত্র হিলারিকে প্রেসিডেন্ট পদে যোগ্য বলে মতামত দিয়েছিল। বিপরীতে ট্রাম্পের প্রার্থিতাকে সমর্থন দিয়েছে মাত্র সাতটি পত্রিকা, যার মধ্যে কোনোটিই প্রথম সারির নয়। তবে সে জন্য তারা কোনো প্রার্থীর খবর বিকৃত করে বা বর্জন করে, ব্যাপারটি এমন নয়। ফলে পাঠক পত্রিকাটি কাকে সমর্থন করছে, সেটা মনে রেখেই তাতে প্রকাশিত খবর-নিবন্ধ-মতামত পড়ে থাকে। যুক্তরাষ্ট্রের মূলধারার গণমাধ্যম, যেগুলোর কথা আমরা জানি, তার বাইরে একটি অজানা অধ্যায়ও আছে। দেশটিতে খুব শক্তিশালী একটি ধর্মীয় রেডিও নেটওয়ার্ক আছে—ইভানজেলিকাল খ্রিষ্টানদের। প্যাট রবার্টসন নামের একজন ইভানজেলিকাল খ্রিষ্টান ধর্মগুরু ১৯৬১ সালে এটি শুরু করেন। কয়েক শ রেডিও স্টেশনের এই নেটওয়ার্ক প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশের নির্বাচনী প্রচারণায় কী ধরনের ভূমিকা রেখেছিল, তার ওপর একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন করেছিল বিবিসি টেলিভিশনের নিউজনাইট অনুষ্ঠান। বিবিসির ওই তথ্যচিত্র থেকেই প্রথম আমি জানতে পারি যে যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনে ধর্মীয় গোষ্ঠী এবং সংবাদমাধ্যমের প্রভাব কতটা ব্যাপক। মি ট্রাম্পের বিজয় নিয়ে রাজনৈতিক পণ্ডিতেরা যখন নানা ধরনের বিশ্লেষণ তুলে ধরছেন, তখন ধর্মীয় পরিচয়ের একটি পরিসংখ্যানের দিকে তাকানো যেতে পারে। ক্রিশ্চিয়ানিটিটুডে ডট–কম নামের একটি পোর্টালে কেট শেলনাট লিখেছেন, ইভানজেলিকাল খ্রিষ্টান গোষ্ঠীর প্রতি পাঁচটি ভোটের চারটি পেয়েছেন মি ট্রাম্প। তাঁদের মাত্র ১৬ শতাংশ ভোট দিয়েছেন হিলারিকে। কেট আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছেন, যাতে বলা হয়েছে, ২০১৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ভোটারদের এক-চতুর্থাংশই হচ্ছেন ইভানজেলিকাল খ্রিষ্টান। আমার এই নিবন্ধের বিষয় ভোটের বিশ্লেষণ নয়। ভোটারদের অর্থনৈতিক হতাশা, অভিবাসন-বিরোধিতা, বাণিজ্য উদারীকরণের কারণে বেকারত্ব, নারীবিদ্বেষী সংকীর্ণতা, এফবিআইয়ের ভূমিকা কিংবা বিশ্ব রাজনীতির প্রসঙ্গগুলো নিয়ে বিচার-বিশ্লেষণ ভবিষ্যতে অনেকবার করা যাবে। কিন্তু সাংবাদিকের স্বাধীনতা ও সংবাদমাধ্যমের দায়িত্ববোধের বিষয় নিয়ে আলোচনা ঝুলিয়ে রাখা যায় না। বিশেষত, সাংবাদিকতার স্বাধীনতাই যখন হুমকির মুখে। ৮ নভেম্বরের নির্বাচন যুক্তরাষ্ট্রকে বদলে দিতে পারে, এমন আশঙ্কা প্রবল। সুতরাং, খবরের উৎস হবেন এমন নেতার আবির্ভাবে উৎফুল্ল হওয়ার সুযোগ কই? যুক্তরাষ্ট্রের নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্টই যেখানে ‘সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার জন্য হুমকি’ হিসেবে বিবেচিত হন, সেখানে তৃতীয় বিশ্বের কোন দেশে তাঁর প্রতিনিধি, কোন দূত কোন মুখে স্বাধীন সাংবাদিকতার পক্ষে দাঁড়াবেন? কামাল আহমেদ: সাংবাদিক।

Comments

Comments!

 প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যে কারণে দুঃসংবাদAmarbangladeshonlineAmarbangladeshonline | Amarbangladeshonline

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যে কারণে দুঃসংবাদ

Friday, November 11, 2016 11:37 am
5

ভারতের একজন সুপরিচিত সম্পাদক, শেখর গুপ্ত সতীর্থ সাংবাদিকদের উদ্দেশে তাঁর টুইটে লিখেছেন, শোকার্ত হওয়ার কোনো কারণ নেই। পুতিন, সি, এরদোয়ান ও মোদির সঙ্গে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যুক্ত হয়ে দুনিয়া চালাবেন। সুতরাং, খবরের আর কোনো অভাব হবে না। শেখর গুপ্ত ঠিকই বলেছেন, তাঁরা প্রচুর খবরের জন্ম দেন এবং ভবিষ্যতেও তাতে ভাটা পড়ার সম্ভাবনা কম। কিন্তু আমার আশঙ্কা অন্য খানে। তাঁরা খবর তৈরি করলেই সেটা যে ছাপতে দেবেন, তার কোনো নিশ্চয়তা আছে কি? আসুন, কয়েকটি উদাহরণ দেখে নিই।
ভারত তার জনসংখ্যার কারণে বিশ্বের সবচেয়ে বড় গণতন্ত্র বলে পরিচিত। কিন্তু বড় হলেই যে শ্রেষ্ঠ হবে, এমন কোনো কথা নেই। মাত্র সপ্তাহ খানেক আগে দেশটির তথ্য মন্ত্রণালয় সেখানকার সবচেয়ে জনপ্রিয় টিভি চ্যানেল এনডিটিভির সম্প্রচার এক দিনের জন্য বন্ধ রাখার নির্দেশ জারি করে। এনডিটিভির একটি সম্প্রচারে জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি তৈরি হওয়ার অভিযোগে ওই নিষেধাজ্ঞা জারি হয়। পরে আসামের একটি চ্যানেল আসাম টাইমের সম্প্রচারও এক দিনের জন্য বন্ধ রাখার নির্দেশ জারি হয়। ভারতের সম্পাদক ও সাংবাদিকদের ঐক্যবদ্ধ প্রতিবাদ এবং আইনি লড়াইয়ের কারণে নিষেধাজ্ঞাগুলো আপাতত স্থগিত আছে। সম্পাদকদের সংগঠন এডিটরস গিল্ড এসব নিষেধাজ্ঞাকে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার ওপর সরাসরি আঘাত বলে অভিহিত করেছে। সম্পাদকেরা বলেছেন, জরুরি অবস্থাকালে সরকার যে ধরনের সেন্সরশিপ আরোপ করত, এই নিষেধাজ্ঞা তার সমতুল্য। সরকার যখন কোনো সংবাদপ্রচারের সঙ্গে একমত হতে পারছে না, তখন তার ওপর হস্তক্ষেপের ক্ষমতা নিজের হাতে তুলে নিয়েছে বলেও এতে প্রতীয়মান হচ্ছে।
বিরোধপূর্ণ কাশ্মীর নিয়ে প্রতিবেশী ও আজন্ম প্রতিদ্বন্দ্বী পাকিস্তানের সঙ্গে তার রাজনৈতিক এবং রেষারেষির ইতিহাসটা আমরা সবাই কমবেশি জানি। এর মধ্যে ভারতে হিন্দু জাতীয়তাবাদের পুনর্জাগরণ ঘটানো রাজনীতিক নরেন্দ্র মোদি তাঁর রাষ্ট্রনীতিতে নতুন এক কৌশল আমদানি করেছেন এবং তাঁরা এর নাম দিয়েছেন সার্জিক্যাল স্ট্রাইক। এই সার্জিক্যাল স্ট্রাইক প্রথমে তাঁরা প্রয়োগ করেন গত বছর মিয়ানমারে কথিত ভারতীয় বিচ্ছিন্নতাবাদীদের বিরুদ্ধে। আর এবার সেটা প্রয়োগ করলেন কাশ্মীরের পাকিস্তান-নিয়ন্ত্রিত অংশে। পাকিস্তানের নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকায় সার্জিক্যাল স্ট্রাইকের আগে ভারতশাসিত জম্মু-কাশ্মীরের উরিতে ঘটে এক সন্ত্রাসী হামলা। এই সর্বসাম্প্রতিক নিষেধাজ্ঞা জারির আগে নানা ধরনের চাপের কারণে এনডিটিভি এই সন্ত্রাস এবং নিরাপত্তা বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী চিদাম্বরমের সাক্ষাৎকার প্রচার না করে বিতর্কের জন্ম দেয়। ওই বিতর্কের মুখে প্রতিষ্ঠানটি নিরাপত্তা বাহিনীর কোনো সমালোচনা প্রচার করবে না জানিয়ে তার সংশোধিত সম্পাদকীয় নীতি প্রকাশ করে। ভারতে সংবাদপত্রের স্বাধীনতা এখন যে কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে, তার দায় নিশ্চয়ই সরকার ছাড়া অন্য কারও নয়?
সুলতান এরদোয়ানের তুরস্ক এদিক থেকে আরও অনেক এগিয়ে। সেখানে মাত্র অক্টোবরের শেষ সোমবার পুলিশ শত বছরের পুরোনো ধর্মনিরপেক্ষতায় বিশ্বাসী পত্রিকা চামহুরিয়াত-এর প্রধান সম্পাদকসহ ১৩ জন সাংবাদিককে গ্রেপ্তার করে। তাঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তাঁরা ১৫ জুলাই যে ব্যর্থ অভ্যুত্থানের চেষ্টা হয়েছিল, তাকে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করছেন। সরকার পত্রিকাটিকে রাষ্ট্রের শত্রু বলেও অভিহিত করে। ওই একই মাসে পুলিশ ইস্তাম্বুলভিত্তিক টিভি চ্যানেল আইএমসি বন্ধ করে দেয়। গত জুলাইয়ের ব্যর্থ অভ্যুত্থানচেষ্টার পর দেশটিতে বিরোধী রাজনীতিক, সেনা কর্মকর্তা, সরকারি-বেসরকারি কর্মচারী, শিক্ষকসহ হাজার হাজার ভিন্নমতাবলম্বীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। জরুরি অবস্থা ঘোষণা করে এই যে দমন অভিযান চলছে, তাতে ইতিমধ্যে শতাধিক সংবাদমাধ্যমের ওপর খড়্গ নেমে এসেছে। এই হিসাব সাংবাদিকদের অধিকাররক্ষা আন্দোলনের বৈশ্বিক সংগঠন, কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্টসের (সিপিজে)। তারা বলছে, দেশটিতে বর্তমানে আটক আছেন শতাধিক সাংবাদিক। সিপিজে বলছে যে তুরস্ক সরকারের কার্যক্রমে প্রমাণিত হয় যে তারা সরকারি ভাষ্যের বাইরে অন্য কোনো ভাষ্য এবং মতামত প্রকাশের সব পথ বন্ধ করে দিতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।
সিপিজের মূল্যায়ন নিয়েই যখন কথা বলছি, তখন তাদের আরেকটি আগাম সতর্কবাণীর কথা পাঠকদের মনে করিয়ে দিই। গত ১৭ অক্টোবর সংগঠনটি এক নজিরবিহীন পদক্ষেপ হিসেবে একটি বিবৃতি দেয়। সিপিজের পরিচালনা পরিষদের প্রধান স্যান্ড্রা মিমস রোয়ি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, ‘ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট পদে জয়ী হলে তা হবে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার জন্য হুমকি।’ তিনি বিবৃতিতে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের ফার্স্ট অ্যামেন্ডমেন্টের (যা মতপ্রকাশের স্বাধীনতার গ্যারান্টি হিসেবে বিবেচিত হয়) মূল্যবোধের সঙ্গে অব্যাহতভাবে বিশ্বাসঘাতকতা করে চলেছেন। বিবৃতিতে তিনি জানান, সিপিজের পরিচালনা পরিষদ চলতি মাসে (অক্টোবর) অনুষ্ঠিত একটি সভায় গৃহীত প্রস্তাবে ‘সাংবাদিকদের স্বাধীনতা এবং বিশ্বব্যাপী সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার পক্ষে কাজ করার জন্য সিপিজের সামর্থ্যের প্রতি’ মি. ট্রাম্পকে হুমকি হিসেবে ঘোষণা করেছে। প্রার্থিতা ঘোষণার পর থেকেই ট্রাম্প সংবাদমাধ্যমকে অপদস্থ করেছেন এবং এটিকেই তাঁর প্রচারণার কেন্দ্রীয় বিষয়ে রূপান্তরিত করেছেন। তিনি আলাদাভাবে সংবাদমাধ্যম এবং ব্যক্তিগতভাবে সাংবাদিকদের অসৎ ও আবর্জনা বলে অভিহিত করে এসেছেন। তিনি সাংবাদিকদের ওপর তাঁর সমর্থকদের হামলার নিন্দা করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন এবং যাঁরা তাঁর সমালোচনা করেন, তাঁদের তাঁর প্রচারাভিযানের খবর সংগ্রহের জন্য প্রবেশাধিকার দেননি।
যুক্তরাষ্ট্রের এবারের নির্বাচনে সংবাদমাধ্যমের উদারপন্থী অংশ মি ট্রাম্পের প্রতিদ্বন্দ্বী হিলারি ক্লিনটনকে নিয়ে একটু বেশি উচ্ছ্বসিত ছিল বলে সেটা অনেকের চোখে লেগেছে। সাংবাদিক বন্ধুদের অনেকে এবং আমাদের টিভি চ্যানেলগুলোর কল্যাণে বিশ্লেষক বনে যাওয়া কেউ কেউ যুক্তরাষ্ট্রের সংবাদমাধ্যমের এ ধরনের পক্ষপাতে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন। হিলারিকে নিয়ে উদারপন্থী সংবাদমাধ্যমের কিছুটা উচ্ছ্বাস যে ছিল তা যেমন ঠিক, তেমনি এটাও ঠিক যে কট্টর ডানপন্থী গণমাধ্যমও তাদের ট্রাম্পের প্রতি আনুগত্য ও পক্ষপাতে কোনো রাখঢাক করেনি। তবে সেটা বাংলাদেশে অধিকাংশেরই চোখে পড়েনি। কেননা, ফক্স নিউজ এখানে হয় পাওয়া যায় না, নয়তো তা বাজার পায়নি (ট্রাম্প তাঁর বিজয়োত্তর প্রথম বক্তৃতায় যাঁদের ধন্যবাদ দিয়েছেন, তাঁদের মধ্যে মাইক হাকাবির নাম আপনাদের অনেকেরই মনে পড়বে। মাইক হাকাবি এই ফক্স নিউজের একজন টক শো উপস্থাপক)। যুক্তরাষ্ট্রের সংবাদপত্রগুলো যে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের মধ্যে একজনকে বেছে নিয়ে তাঁর প্রতি সমর্থন ঘোষণা করে, এটা নতুন কোনো ঘটনা নয়। এই চলটি অনেক দিন ধরেই চালু। এবার ২০০টির বেশি সংবাদপত্র হিলারিকে প্রেসিডেন্ট পদে যোগ্য বলে মতামত দিয়েছিল। বিপরীতে ট্রাম্পের প্রার্থিতাকে সমর্থন দিয়েছে মাত্র সাতটি পত্রিকা, যার মধ্যে কোনোটিই প্রথম সারির নয়। তবে সে জন্য তারা কোনো প্রার্থীর খবর বিকৃত করে বা বর্জন করে, ব্যাপারটি এমন নয়। ফলে পাঠক পত্রিকাটি কাকে সমর্থন করছে, সেটা মনে রেখেই তাতে প্রকাশিত খবর-নিবন্ধ-মতামত পড়ে থাকে।
যুক্তরাষ্ট্রের মূলধারার গণমাধ্যম, যেগুলোর কথা আমরা জানি, তার বাইরে একটি অজানা অধ্যায়ও আছে। দেশটিতে খুব শক্তিশালী একটি ধর্মীয় রেডিও নেটওয়ার্ক আছে—ইভানজেলিকাল খ্রিষ্টানদের। প্যাট রবার্টসন নামের একজন ইভানজেলিকাল খ্রিষ্টান ধর্মগুরু ১৯৬১ সালে এটি শুরু করেন। কয়েক শ রেডিও স্টেশনের এই নেটওয়ার্ক প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশের নির্বাচনী প্রচারণায়
কী ধরনের ভূমিকা রেখেছিল, তার ওপর একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন করেছিল বিবিসি টেলিভিশনের নিউজনাইট অনুষ্ঠান। বিবিসির ওই তথ্যচিত্র থেকেই প্রথম আমি জানতে পারি যে যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনে ধর্মীয় গোষ্ঠী এবং সংবাদমাধ্যমের প্রভাব কতটা ব্যাপক। মি ট্রাম্পের বিজয় নিয়ে রাজনৈতিক পণ্ডিতেরা যখন নানা ধরনের বিশ্লেষণ তুলে ধরছেন, তখন ধর্মীয় পরিচয়ের একটি পরিসংখ্যানের দিকে তাকানো যেতে পারে। ক্রিশ্চিয়ানিটিটুডে ডট–কম নামের একটি পোর্টালে কেট শেলনাট লিখেছেন, ইভানজেলিকাল খ্রিষ্টান গোষ্ঠীর প্রতি পাঁচটি ভোটের চারটি পেয়েছেন মি ট্রাম্প। তাঁদের মাত্র ১৬ শতাংশ ভোট দিয়েছেন হিলারিকে। কেট আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছেন, যাতে বলা হয়েছে, ২০১৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ভোটারদের এক-চতুর্থাংশই হচ্ছেন ইভানজেলিকাল খ্রিষ্টান।
আমার এই নিবন্ধের বিষয় ভোটের বিশ্লেষণ নয়। ভোটারদের অর্থনৈতিক হতাশা, অভিবাসন-বিরোধিতা, বাণিজ্য উদারীকরণের কারণে বেকারত্ব, নারীবিদ্বেষী সংকীর্ণতা, এফবিআইয়ের ভূমিকা কিংবা বিশ্ব রাজনীতির প্রসঙ্গগুলো নিয়ে বিচার-বিশ্লেষণ ভবিষ্যতে অনেকবার করা যাবে। কিন্তু সাংবাদিকের স্বাধীনতা ও সংবাদমাধ্যমের দায়িত্ববোধের বিষয় নিয়ে আলোচনা ঝুলিয়ে রাখা যায় না। বিশেষত, সাংবাদিকতার স্বাধীনতাই যখন হুমকির মুখে। ৮ নভেম্বরের নির্বাচন যুক্তরাষ্ট্রকে বদলে দিতে পারে, এমন আশঙ্কা প্রবল। সুতরাং, খবরের উৎস হবেন এমন নেতার আবির্ভাবে উৎফুল্ল হওয়ার সুযোগ কই? যুক্তরাষ্ট্রের নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্টই যেখানে ‘সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার জন্য হুমকি’ হিসেবে বিবেচিত হন, সেখানে তৃতীয় বিশ্বের কোন দেশে তাঁর প্রতিনিধি, কোন দূত কোন মুখে স্বাধীন সাংবাদিকতার পক্ষে দাঁড়াবেন?
কামাল আহমেদ: সাংবাদিক।

Comments

comments

সম্পাদক : মোহাম্মদ আবদুল বাছির
প্রকাশক: মোহাম্মদ জহিরুল ইসলাম
ফোন : ‎০১৭১৩৪০৯০৯০
৩৪৫/১, দিলু রোড, নিউ ইস্কাটন, ঢাকা-১০০০
X
 
নিয়মিত খবর পড়তে আমাদের ফেসবুক পেজে লাইক দিয়ে যুক্ত থাকুন
X