রবিবার, ২৫শে ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ ইং, ১৩ই ফাল্গুন, ১৪২৪ বঙ্গাব্দ, রাত ২:১৪
শিরোনাম
  • ঘৃণাকে বিজয়ী হতে দেয়া যাবে না, ট্রাম্পকে ইঙ্গিত করে জর্জ ক্লুনি
  • আমার একটাই চিন্তা দেশের মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন করা: প্রধানমন্ত্রী
  • ‘কেন্দ্রীয় সরকারের আগ্রাসী নীতির কারণে কাশ্মীরকে হারাতে হবে’
  • সাড়ে চারমাস পর মুখোমুখি, খাদিজাকে উদ্দেশ্য করে যা বলল বদরুল
  • খালেদার ‘সাজা’ বিরোধী নেতাকর্মীদের মনোবল ভাঙ্গার কৌশল!
  • বিএনপির কর্মসূচি ‘যথাসময়ে’ জানানো হবে: রিজভী
  • দলের জন্য বোলিং করতেও রাজি মুশফিক
  • শিশু জিহাদের মৃত্যু: চার জনের ১০ বছর করে কারাদণ্ড
  • অবশেষে বাড়ি অবরুদ্ধ করে রাখা সেই দেয়াল ভেঙ্গে ফেলা হচ্ছে
  • সাক্ষ্য দিলেন খাদিজা, চাইলেন বদরুলের সর্বোচ্চ শাস্তি
  • বদরুলের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিতে আদালতে খাদিজা
  • আজ বগুড়ায় যেসব প্রকল্প উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী
  • রোহিঙ্গা স্থানান্তরের সরকারি পরিকল্পনার সঙ্গে দ্বিমত মানবাধিকার কমিশনের
  • মহেশখালীতে ইয়াবা ব্যবসায়ীদের সঙ্গে পুলিশের ‘বন্দুকযুদ্ধ’
  • হোয়াইট হাউসে কাজ করার দীর্ঘ অভিজ্ঞতার কথা জানালেন এই বাংলাদেশি সাংবাদিক
Thursday, June 29, 2017 9:22 am
A- A A+ Print

ভোটের পরেই ভ্যাট

PM_320170628214235

অবশেষে নতুন মূল্য সংযোজন কর (মূসক বা ভ্যাট) আইন থেকে পিছিয়ে গেলেন অর্থমন্ত্রী। নতুন ভ্যাট আইন দুই বছরের জন্য স্থগিত করা হয়েছে। অর্থাৎ ২০১৯ সালের নির্বাচনের পর নতুন আইনটি বাস্তবায়িত হবে। অর্থাৎ ভোটের পরে হবে ভ্যাট আইন। এ সময় পর্যন্ত পুরোনো ভ্যাট আইন বহাল থাকবে। অর্থাৎ এত দিন ধরে যেভাবে চলছিল, সেভাবেই চলবে।

পরিবর্তন আনা হয়েছে ব্যাংক আমানতের ওপর আবগারি শুল্ক হারেও। এক লাখ টাকা পর্যন্ত আমানতে আবগারি শুল্ক ছাড় বহাল রাখা হয়েছে। তবে এর চেয়ে বেশি আমানতের জন্য আবগারি শুল্কের পাঁচটি স্তর রাখা হয়েছে। এ ছাড়া আরও কিছু পণ্যে ভ্যাট ছাড়সহ বেশ কিছু পরিবর্তন এনেছেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত।

গতকাল বুধবার জাতীয় সংসদে অর্থমন্ত্রী এসব পরিবর্তনের ঘোষণা দেন। এর আগে জাতীয় বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনার সমাপনী বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেত্রী শেখ হাসিনা এসব পরিবর্তনের পরামর্শ দেন।

প্রধানমন্ত্রী এ সময় বলেন, অর্থমন্ত্রী বলেছেন, আইনটা খুব ভালো। এটা নিয়ে যেহেতু নানা কথা উঠেছে, ব্যবসায়ীরা তেমন একটা সাড়া দিচ্ছেন না। এটা নিয়ে যেহেতু নানা ধরনের কথা হচ্ছে, তাই এটা আগের পর্যায়ে অর্থাৎ যেভাবে ছিল সেভাবেই থাকবে। আগামী দুই বছর এ ভ্যাট আইন পুরোপুরি কার্যকর না করে যেভাবে আছে, সেভাবে যাতে ভ্যাট আদায় হয় সেটাই বজায় রাখবেন—সবার পক্ষ থেকে অর্থমন্ত্রীকে অনুরোধ জানাচ্ছি।

এরপরই অর্থমন্ত্রী নতুন ভ্যাট আইন স্থগিত রাখাসহ অন্যান্য সংশোধনের কথা জানান। জাতীয় সংসদে ও সংসদের বাইরে ভ্যাট আইন ও আবগারি শুল্ক নিয়ে ব্যাপক সমালোচনার পর পরিবর্তনগুলো আনা হলো। মূলত ভ্যাট আর ভোটের টানাপোড়েনে শেষ পর্যন্ত ভোটই জিতল।

পাসের ঠিক আগে বাজেট প্রস্তাবের ছোটখাটো কিছু পরিবর্তন আনা নতুন কিছু নয়। কিন্তু নতুন ভ্যাট আইন স্থগিত করার মতো এত বড় পরিবর্তন বাজেট ইতিহাসে আর কখনো হয়নি। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) সূত্রে জানা গেছে, নতুন ভ্যাট আইনের মাধ্যমে ১৫ থেকে ২০ হাজার কোটি টাকা বাড়তি রাজস্ব আদায়ের পরিকল্পনা ছিল। এখন রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রার ক্ষেত্রেও বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে হবে। অর্থমন্ত্রী অবশ্য এ নিয়ে গতকাল কোনো কিছু বলেননি। তবে এর ফলে এখন বাজেট কাঠামো ওলটপালট হয়ে যাবে বলে অর্থনীতিবিদেরা মনে করছেন। কারণ, রাজস্ব আদায় কম হবে বলে উন্নয়ন বাজেটেও বড় পরিবর্তন আনতে হবে।

অর্থমন্ত্রী ২০১৬ সালে নতুন ভ্যাট আইন বাস্তবায়নের ঘোষণা দিয়েও তা বাস্তবায়ন করতে পারেননি। ২০১৬-১৭ অর্থবছরের বাজেটে এই আইন ২০১৭ সালের ১ জুলাই থেকে বাস্তবায়নের ঘোষণা দেওয়া ছিল। কিন্তু বছরজুড়েই ব্যবসায়ীরা প্রবলভাবে এর বিরোধিতা করে আসছিলেন। এমনকি বাজেটের আগে পরামর্শক কমিটির বৈঠকে অর্থমন্ত্রীর উপস্থিতিতে এ নিয়ে ব্যবসায়ী ও এনবিআর কর্মকর্তাদের মধ্যে পাল্টাপাল্টি হুমকির ঘটনাও ঘটে। তারপরও নতুন ভ্যাট আইন বাস্তবায়নের ঘোষণা দিয়েই বাজেট উপস্থাপন করেন অর্থমন্ত্রী। কিন্তু শেষ পর্যন্ত স্থগিতই রাখতে হলো নতুন ভ্যাট আইন।

নতুন ভ্যাট আইন বাস্তবায়ন পিছিয়ে দেওয়া সম্পর্কে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর প্রথম আলোকে বলেন, ব্যবসায়ী সম্প্রদায়ের কাছে নতি স্বীকার করল সরকার। যে বড় সংস্কারের লক্ষ্য ছিল, তা সাহসের সঙ্গে এগিয়ে নিতে পারল না। এটা সরকারের ব্যর্থতা। মূলত রাজনৈতিক কারণেই সরকার নতুন ভ্যাট আইন বাস্তবায়নে একেবারেই পিছিয়ে গেল। এতে আগামী দুই বছরে কোনো ছোট সংস্কার কার্যক্রমেও সরকার হাত দিতে সাহস পাবে না। তাঁর মতে, বাজেটের একেবারে শেষ দিনে এসে পিছিয়ে যাওয়া; পুরো বাজেটকে ওলট–পালট করে ফেলার ঘটনা বাংলাদেশের ইতিহাসে আর কখনো ঘটেনি। এটি রাজনৈতিকভাবে বিশৃঙ্খল অবস্থানের নিদর্শন।

আবগারি শুল্কে পরিবর্তন

ব্যাংক আমানতের আবগারি শুল্কের নাম পরিবর্তন করবেন বলে এর আগে অর্থমন্ত্রী বলেছিলেন। কিন্তু গতকাল এ নিয়ে নতুন কোনো প্রস্তাব ছিল না। তবে আবগারি শুল্কের নতুন স্তরের ঘোষণা দিয়েছেন তিনি। যেমন ১ লাখ টাকা পর্যন্ত আমানত থাকলে কোনো আবগারি শুল্ক দিতে হবে না। ১ লাখ ১ টাকা থেকে ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত আমানতে দিতে হবে ১৫০ টাকা, ৫ লাখ থেকে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত আমানত থাকলে দিতে হবে ৫০০ টাকা, ১০ লাখ থেকে ১ কোটি টাকা পর্যন্ত আমানতে আড়াই হাজার টাকা, ১ কোটি থেকে ৫ কোটি টাকা পর্যন্ত দিতে হবে ১২ হাজার টাকা এবং ৫ কোটি টাকার বেশি আমানত থাকলে আবগারি শুল্ক দিতে হবে ২৫ হাজার টাকা।

ভ্যাট ও আবগারি শুল্ক ছাড়াও বাজেটে বেশ কিছু পরিবর্তন আনা হয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে ভ্যাট অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে, আবার কিছু পণ্য ও সেবায় নতুন করে শুল্ক কর বসানো হয়েছে। কিছু খাতের উদ্যোক্তাদের আশ্বাসও দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী।

ভ্যাট

ধ্যান বা যোগের (মেডিটেশন) ওপর আগামী দুই বছর কোনো ভ্যাট নেই। অর্থমন্ত্রী গতকাল তাঁর বক্তব্যে বলেছেন, ‘কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশনকে একটি সমাজকল্যাণমূলক কার্যক্রম হিসেবে বিবেচনা করব। এ ছাড়া কম্পিউটার, মুঠোফোন এবং এর যন্ত্রাংশ দেশে তৈরি হলে তা ভ্যাটমুক্ত থাকবে। স্থানীয়ভাবে মোটরসাইকেল উৎপাদিত হলে তাতেও ভ্যাট বসবে না।’ অন্যদিকে মাইক্রোসফট বাংলাদেশ লিমিটেড যেসব পণ্য বিনা আমদানি শুল্কে আমদানি করে; সেসব পণ্যের ওপর ভ্যাট থাকবে না। এই প্রতিষ্ঠানটি বিভিন্ন ধরনের সফটওয়্যার আমদানি করে এবং বিভিন্ন ক্ষেত্রে ২৫ শতাংশ হারে আমদানি শুল্ক প্রদান করে থাকে। এলপিজির ব্যবহার বাড়াতে অর্থমন্ত্রী প্লাস্টিক ও গ্লাস ফাইবারে তৈরি এলপিজি কনটেইনারের আমদানি পর্যায়ে কোনো ভ্যাট রাখেননি। তবে লোহার তৈরি এলপিজি কনটেইনার আমদানি পর্যায়ে ভ্যাট অব্যাহত থাকবে। অন্যদিকে গুঁড়া মসলা যেমন মরিচ, হলুদ, ধনে—এগুলোর ওপর ট্যারিফ মূল্য বহাল রেখে ভ্যাট বসবে। নতুন ভ্যাট আইনে এসব পণ্যে ১৫ শতাংশ হারে ভ্যাট বসার কথা ছিল।

শুল্ক কর

সোলার প্যানেলের ওপর ১০ শতাংশ হারে আমদানি শুল্ক বসানোর প্রস্তাব করেছিলেন অর্থমন্ত্রী। অর্থমন্ত্রী সেই প্রস্তাব গতকাল তুলে নিয়েছেন। এর ফলে সোলার প্যানেল আমদানিতে কোনো আমদানি শুল্ক দিতে হবে না। রেফ্রিজারেটর সংযোজনকারীরা নতুন করে সুবিধা পাবেন। তাঁদের ওপর আরোপিত ৩০ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক কমিয়ে ২০ শতাংশ করা হয়েছে। এ দেশে মোটরসাইকেলের যন্ত্রপাতি উৎপাদনে উৎসাহিত করার জন্য কিছু শুল্ক কর রেয়াত দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু কাঙ্ক্ষিত উন্নতি না হওয়ায় প্রস্তাবিত বাজেটে তা বাতিল করা হয়েছিল। এ খাতের ব্যবসায়ীরা শিগগিরই উৎপাদনে যাবেন—এমন আশ্বাস দেওয়ায় অর্থমন্ত্রী শুল্ক কর সুবিধাগুলো আগের মতোই বহাল রেখেছেন। জাপানের হোন্ডার মতো প্রতিষ্ঠান মোটরসাইকেল ও গাড়ি উৎপাদন করতে চাইলে প্রয়োজনীয় উপকরণের আমদানি পর্যায়ে শুল্ক কর কম দিতে হবে। অর্থমন্ত্রী গতকালের বক্তৃতায় বলেছেন, জাপান দূতাবাস ও নিটল–নিলয় কোম্পানি জানিয়েছে, ভবিষ্যতে হোন্ডা ও অন্যান্য কোম্পানি মোটরসাইকেল ও গাড়ি উৎপাদন প্রক্রিয়া শুরু করবে।

আয়কর

তৈরি পোশাক তৈরি পোশাক খাতে উৎসে কর ১ শতাংশ বহাল থাকবে। তবে করপোরেট করের ক্ষেত্রে পরিবর্তন আনা হয়েছে। সবুজ কারখানা হলে ১০ শতাংশ এবং অন্যদের ক্ষেত্রে ১২ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রস্তাবিত বাজেটে সবুজ কারখানার জন্য ১৪ শতাংশ এবং অন্যদের ক্ষেত্রে ১৫ শতাংশ করপোরেট করের প্রস্তাব করা হয়েছিল। চলতি অর্থবছর পর্যন্ত উৎসে কর দশমিক ৭ শতাংশ এবং করপোরেট কর ২০ শতাংশ আছে।

এ ছাড়া অভ্যন্তরীণ নৌপথে যাত্রী ও মালামাল পরিবহনের নৌযান, বার্জ, ট্যাংকার ইত্যাদির আয়করবিষয়ক প্রজ্ঞাপন সংশোধন করার কথা বলেছেন অর্থমন্ত্রী।

আশ্বাস

অর্থমন্ত্রী তাঁর বাজেট বক্তৃতায় বলেছিলেন, দেশের কেব্‌ল টিভি নেটওয়ার্ক ডিজিটাল অ্যাড্রেসেবল টিভি সিস্টেমের আওতায় আসবে। এ জন্য দামি অ্যাড্রেসেবল সেট টপ বক্স আমদানি করতে হবে। অর্থমন্ত্রীর গতকাল বলেছেন, এ ধরনের সিস্টেমের ওপর কত হারে শুল্ক কর বসবে, তা নিয়ে পরে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। এ ছাড়া বাংলাদেশ ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো কোম্পানি তামাক ও সিগারেট–বিষয়ক তাদের করব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বলে জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী। বাজেট পাস হওয়ার পর একটি প্রজ্ঞাপন জারি করে নিষ্পত্তি করার প্রস্তাব করেছেন অর্থমন্ত্রী। এর আগ পর্যন্ত ১ জুন ঘোষিত মূল্য ও কর হার বহাল থাকবে। অর্থমন্ত্রী আরও বলেছেন, গ্লাস ওয়্যার পণ্যের ওপর দেশীয় শিল্পসহায়ক শুল্ক কাঠামোর জন্য আবেদন করা হয়েছে। বিষয়টি পর্যালোচনা করে ভবিষ্যতে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

সামগ্রিক বিষয়ে ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের সাবেক সভাপতি মীর নাসির হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, নতুন ভ্যাট আইনে নানা ধরনের অসংগতি ছিল। এখন যেহেতু দুই বছর পিছিয়ে দেওয়া হলো, এই সময়ে এনবিআর ও বেসরকারি খাতের উদ্যোক্তা মিলে আলাপ–আলোচনা করে এই অসংগতিগুলো দূর করা উচিত। ভ্যাট আইনটি এমন হওয়া উচিত, যাতে সরকারের রাজস্ব বাড়ে; আবার ভোক্তার ওপরও চাপ না বাড়ে। আগামী দুই বছরে এই নিয়ে প্রস্তুতিমূলক কাজ করা দরকার।

Comments

Comments!

 ভোটের পরেই ভ্যাটAmarbangladeshonlineAmarbangladeshonline | Amarbangladeshonline

ভোটের পরেই ভ্যাট

Thursday, June 29, 2017 9:22 am
PM_320170628214235

অবশেষে নতুন মূল্য সংযোজন কর (মূসক বা ভ্যাট) আইন থেকে পিছিয়ে গেলেন অর্থমন্ত্রী। নতুন ভ্যাট আইন দুই বছরের জন্য স্থগিত করা হয়েছে। অর্থাৎ ২০১৯ সালের নির্বাচনের পর নতুন আইনটি বাস্তবায়িত হবে। অর্থাৎ ভোটের পরে হবে ভ্যাট আইন। এ সময় পর্যন্ত পুরোনো ভ্যাট আইন বহাল থাকবে। অর্থাৎ এত দিন ধরে যেভাবে চলছিল, সেভাবেই চলবে।

পরিবর্তন আনা হয়েছে ব্যাংক আমানতের ওপর আবগারি শুল্ক হারেও। এক লাখ টাকা পর্যন্ত আমানতে আবগারি শুল্ক ছাড় বহাল রাখা হয়েছে। তবে এর চেয়ে বেশি আমানতের জন্য আবগারি শুল্কের পাঁচটি স্তর রাখা হয়েছে। এ ছাড়া আরও কিছু পণ্যে ভ্যাট ছাড়সহ বেশ কিছু পরিবর্তন এনেছেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত।

গতকাল বুধবার জাতীয় সংসদে অর্থমন্ত্রী এসব পরিবর্তনের ঘোষণা দেন। এর আগে জাতীয় বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনার সমাপনী বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেত্রী শেখ হাসিনা এসব পরিবর্তনের পরামর্শ দেন।

প্রধানমন্ত্রী এ সময় বলেন, অর্থমন্ত্রী বলেছেন, আইনটা খুব ভালো। এটা নিয়ে যেহেতু নানা কথা উঠেছে, ব্যবসায়ীরা তেমন একটা সাড়া দিচ্ছেন না। এটা নিয়ে যেহেতু নানা ধরনের কথা হচ্ছে, তাই এটা আগের পর্যায়ে অর্থাৎ যেভাবে ছিল সেভাবেই থাকবে। আগামী দুই বছর এ ভ্যাট আইন পুরোপুরি কার্যকর না করে যেভাবে আছে, সেভাবে যাতে ভ্যাট আদায় হয় সেটাই বজায় রাখবেন—সবার পক্ষ থেকে অর্থমন্ত্রীকে অনুরোধ জানাচ্ছি।

এরপরই অর্থমন্ত্রী নতুন ভ্যাট আইন স্থগিত রাখাসহ অন্যান্য সংশোধনের কথা জানান। জাতীয় সংসদে ও সংসদের বাইরে ভ্যাট আইন ও আবগারি শুল্ক নিয়ে ব্যাপক সমালোচনার পর পরিবর্তনগুলো আনা হলো। মূলত ভ্যাট আর ভোটের টানাপোড়েনে শেষ পর্যন্ত ভোটই জিতল।

পাসের ঠিক আগে বাজেট প্রস্তাবের ছোটখাটো কিছু পরিবর্তন আনা নতুন কিছু নয়। কিন্তু নতুন ভ্যাট আইন স্থগিত করার মতো এত বড় পরিবর্তন বাজেট ইতিহাসে আর কখনো হয়নি। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) সূত্রে জানা গেছে, নতুন ভ্যাট আইনের মাধ্যমে ১৫ থেকে ২০ হাজার কোটি টাকা বাড়তি রাজস্ব আদায়ের পরিকল্পনা ছিল। এখন রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রার ক্ষেত্রেও বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে হবে। অর্থমন্ত্রী অবশ্য এ নিয়ে গতকাল কোনো কিছু বলেননি। তবে এর ফলে এখন বাজেট কাঠামো ওলটপালট হয়ে যাবে বলে অর্থনীতিবিদেরা মনে করছেন। কারণ, রাজস্ব আদায় কম হবে বলে উন্নয়ন বাজেটেও বড় পরিবর্তন আনতে হবে।

অর্থমন্ত্রী ২০১৬ সালে নতুন ভ্যাট আইন বাস্তবায়নের ঘোষণা দিয়েও তা বাস্তবায়ন করতে পারেননি। ২০১৬-১৭ অর্থবছরের বাজেটে এই আইন ২০১৭ সালের ১ জুলাই থেকে বাস্তবায়নের ঘোষণা দেওয়া ছিল। কিন্তু বছরজুড়েই ব্যবসায়ীরা প্রবলভাবে এর বিরোধিতা করে আসছিলেন। এমনকি বাজেটের আগে পরামর্শক কমিটির বৈঠকে অর্থমন্ত্রীর উপস্থিতিতে এ নিয়ে ব্যবসায়ী ও এনবিআর কর্মকর্তাদের মধ্যে পাল্টাপাল্টি হুমকির ঘটনাও ঘটে। তারপরও নতুন ভ্যাট আইন বাস্তবায়নের ঘোষণা দিয়েই বাজেট উপস্থাপন করেন অর্থমন্ত্রী। কিন্তু শেষ পর্যন্ত স্থগিতই রাখতে হলো নতুন ভ্যাট আইন।

নতুন ভ্যাট আইন বাস্তবায়ন পিছিয়ে দেওয়া সম্পর্কে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর প্রথম আলোকে বলেন, ব্যবসায়ী সম্প্রদায়ের কাছে নতি স্বীকার করল সরকার। যে বড় সংস্কারের লক্ষ্য ছিল,
তা সাহসের সঙ্গে এগিয়ে নিতে পারল না। এটা সরকারের ব্যর্থতা। মূলত রাজনৈতিক কারণেই সরকার নতুন ভ্যাট আইন বাস্তবায়নে একেবারেই পিছিয়ে গেল। এতে আগামী দুই বছরে কোনো ছোট সংস্কার কার্যক্রমেও সরকার হাত দিতে সাহস পাবে না। তাঁর মতে, বাজেটের একেবারে শেষ দিনে এসে পিছিয়ে যাওয়া; পুরো বাজেটকে ওলট–পালট করে ফেলার ঘটনা বাংলাদেশের ইতিহাসে আর কখনো ঘটেনি। এটি রাজনৈতিকভাবে বিশৃঙ্খল অবস্থানের নিদর্শন।

আবগারি শুল্কে পরিবর্তন

ব্যাংক আমানতের আবগারি শুল্কের নাম পরিবর্তন করবেন বলে এর আগে অর্থমন্ত্রী বলেছিলেন। কিন্তু গতকাল এ নিয়ে নতুন কোনো প্রস্তাব ছিল না। তবে আবগারি শুল্কের নতুন স্তরের ঘোষণা দিয়েছেন তিনি। যেমন ১ লাখ টাকা পর্যন্ত আমানত থাকলে কোনো আবগারি শুল্ক দিতে হবে না। ১ লাখ ১ টাকা থেকে ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত আমানতে দিতে হবে ১৫০ টাকা, ৫ লাখ থেকে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত আমানত থাকলে দিতে হবে ৫০০ টাকা, ১০ লাখ থেকে ১ কোটি টাকা পর্যন্ত আমানতে আড়াই হাজার টাকা, ১ কোটি থেকে ৫ কোটি টাকা পর্যন্ত দিতে হবে ১২ হাজার টাকা এবং ৫ কোটি টাকার বেশি আমানত থাকলে আবগারি শুল্ক দিতে হবে ২৫ হাজার টাকা।

ভ্যাট ও আবগারি শুল্ক ছাড়াও বাজেটে বেশ কিছু পরিবর্তন আনা হয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে ভ্যাট অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে, আবার কিছু পণ্য ও সেবায় নতুন করে শুল্ক কর বসানো হয়েছে। কিছু খাতের উদ্যোক্তাদের আশ্বাসও দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী।

ভ্যাট

ধ্যান বা যোগের (মেডিটেশন) ওপর আগামী দুই বছর কোনো ভ্যাট নেই। অর্থমন্ত্রী গতকাল তাঁর বক্তব্যে বলেছেন, ‘কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশনকে একটি সমাজকল্যাণমূলক কার্যক্রম হিসেবে বিবেচনা করব। এ ছাড়া কম্পিউটার, মুঠোফোন এবং এর যন্ত্রাংশ দেশে তৈরি হলে তা ভ্যাটমুক্ত থাকবে। স্থানীয়ভাবে মোটরসাইকেল উৎপাদিত হলে তাতেও ভ্যাট বসবে না।’ অন্যদিকে মাইক্রোসফট বাংলাদেশ লিমিটেড যেসব পণ্য বিনা আমদানি শুল্কে আমদানি করে; সেসব পণ্যের ওপর ভ্যাট থাকবে না। এই প্রতিষ্ঠানটি বিভিন্ন ধরনের সফটওয়্যার আমদানি করে এবং বিভিন্ন ক্ষেত্রে ২৫ শতাংশ হারে আমদানি শুল্ক প্রদান করে থাকে। এলপিজির ব্যবহার বাড়াতে অর্থমন্ত্রী প্লাস্টিক ও গ্লাস ফাইবারে তৈরি এলপিজি কনটেইনারের আমদানি পর্যায়ে কোনো ভ্যাট রাখেননি। তবে লোহার তৈরি এলপিজি কনটেইনার আমদানি পর্যায়ে ভ্যাট অব্যাহত থাকবে। অন্যদিকে গুঁড়া মসলা যেমন মরিচ, হলুদ, ধনে—এগুলোর ওপর ট্যারিফ মূল্য বহাল রেখে ভ্যাট বসবে। নতুন ভ্যাট আইনে এসব পণ্যে ১৫ শতাংশ হারে ভ্যাট বসার কথা ছিল।

শুল্ক কর

সোলার প্যানেলের ওপর ১০ শতাংশ হারে আমদানি শুল্ক বসানোর প্রস্তাব করেছিলেন অর্থমন্ত্রী। অর্থমন্ত্রী সেই প্রস্তাব গতকাল তুলে নিয়েছেন। এর ফলে সোলার প্যানেল আমদানিতে কোনো আমদানি শুল্ক দিতে হবে না। রেফ্রিজারেটর সংযোজনকারীরা নতুন করে সুবিধা পাবেন। তাঁদের ওপর আরোপিত ৩০ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক কমিয়ে ২০ শতাংশ করা হয়েছে। এ দেশে মোটরসাইকেলের যন্ত্রপাতি উৎপাদনে উৎসাহিত করার জন্য কিছু শুল্ক কর রেয়াত দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু কাঙ্ক্ষিত উন্নতি না হওয়ায় প্রস্তাবিত বাজেটে তা বাতিল করা হয়েছিল। এ খাতের ব্যবসায়ীরা শিগগিরই উৎপাদনে যাবেন—এমন আশ্বাস দেওয়ায় অর্থমন্ত্রী শুল্ক কর সুবিধাগুলো আগের মতোই বহাল রেখেছেন। জাপানের হোন্ডার মতো প্রতিষ্ঠান মোটরসাইকেল ও গাড়ি উৎপাদন করতে চাইলে প্রয়োজনীয় উপকরণের আমদানি পর্যায়ে শুল্ক কর কম দিতে হবে। অর্থমন্ত্রী গতকালের বক্তৃতায় বলেছেন, জাপান দূতাবাস ও নিটল–নিলয় কোম্পানি জানিয়েছে, ভবিষ্যতে হোন্ডা ও অন্যান্য কোম্পানি মোটরসাইকেল ও গাড়ি উৎপাদন প্রক্রিয়া শুরু করবে।

আয়কর

তৈরি পোশাক তৈরি পোশাক খাতে উৎসে কর ১ শতাংশ বহাল থাকবে। তবে করপোরেট করের ক্ষেত্রে পরিবর্তন আনা হয়েছে। সবুজ কারখানা হলে ১০ শতাংশ এবং অন্যদের ক্ষেত্রে ১২ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রস্তাবিত বাজেটে সবুজ কারখানার জন্য ১৪ শতাংশ এবং অন্যদের ক্ষেত্রে ১৫ শতাংশ করপোরেট করের প্রস্তাব করা হয়েছিল। চলতি অর্থবছর পর্যন্ত উৎসে কর দশমিক ৭ শতাংশ এবং করপোরেট কর ২০ শতাংশ আছে।

এ ছাড়া অভ্যন্তরীণ নৌপথে যাত্রী ও মালামাল পরিবহনের নৌযান, বার্জ, ট্যাংকার ইত্যাদির আয়করবিষয়ক প্রজ্ঞাপন সংশোধন করার কথা বলেছেন অর্থমন্ত্রী।

আশ্বাস

অর্থমন্ত্রী তাঁর বাজেট বক্তৃতায় বলেছিলেন, দেশের কেব্‌ল টিভি নেটওয়ার্ক ডিজিটাল অ্যাড্রেসেবল টিভি সিস্টেমের আওতায় আসবে। এ জন্য দামি অ্যাড্রেসেবল সেট টপ বক্স আমদানি করতে হবে। অর্থমন্ত্রীর গতকাল বলেছেন, এ ধরনের সিস্টেমের ওপর কত হারে শুল্ক কর বসবে, তা নিয়ে পরে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। এ ছাড়া বাংলাদেশ ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো কোম্পানি তামাক ও সিগারেট–বিষয়ক তাদের করব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বলে জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী। বাজেট পাস হওয়ার পর একটি প্রজ্ঞাপন জারি করে নিষ্পত্তি করার প্রস্তাব করেছেন অর্থমন্ত্রী। এর আগ পর্যন্ত ১ জুন ঘোষিত মূল্য ও কর হার বহাল থাকবে। অর্থমন্ত্রী আরও বলেছেন, গ্লাস ওয়্যার পণ্যের ওপর দেশীয় শিল্পসহায়ক শুল্ক কাঠামোর জন্য আবেদন করা হয়েছে। বিষয়টি পর্যালোচনা করে ভবিষ্যতে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

সামগ্রিক বিষয়ে ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের সাবেক সভাপতি মীর নাসির হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, নতুন ভ্যাট আইনে নানা ধরনের অসংগতি ছিল। এখন যেহেতু দুই বছর পিছিয়ে দেওয়া হলো, এই সময়ে এনবিআর ও বেসরকারি খাতের উদ্যোক্তা মিলে আলাপ–আলোচনা করে এই অসংগতিগুলো দূর করা উচিত। ভ্যাট আইনটি এমন হওয়া উচিত, যাতে সরকারের রাজস্ব বাড়ে; আবার ভোক্তার ওপরও চাপ না বাড়ে। আগামী দুই বছরে এই নিয়ে প্রস্তুতিমূলক কাজ করা দরকার।

Comments

comments

সম্পাদক : মোহাম্মদ আবদুল বাছির
প্রকাশক: মোহাম্মদ জহিরুল ইসলাম
ফোন : ‎০১৭১৩৪০৯০৯০
৩৪৫/১, দিলু রোড, নিউ ইস্কাটন, ঢাকা-১০০০
X
 
নিয়মিত খবর পড়তে আমাদের ফেসবুক পেজে লাইক দিয়ে যুক্ত থাকুন
X