রবিবার, ২৫শে ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ ইং, ১৩ই ফাল্গুন, ১৪২৪ বঙ্গাব্দ, সকাল ১০:০০
শিরোনাম
  • ঘৃণাকে বিজয়ী হতে দেয়া যাবে না, ট্রাম্পকে ইঙ্গিত করে জর্জ ক্লুনি
  • আমার একটাই চিন্তা দেশের মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন করা: প্রধানমন্ত্রী
  • ‘কেন্দ্রীয় সরকারের আগ্রাসী নীতির কারণে কাশ্মীরকে হারাতে হবে’
  • সাড়ে চারমাস পর মুখোমুখি, খাদিজাকে উদ্দেশ্য করে যা বলল বদরুল
  • খালেদার ‘সাজা’ বিরোধী নেতাকর্মীদের মনোবল ভাঙ্গার কৌশল!
  • বিএনপির কর্মসূচি ‘যথাসময়ে’ জানানো হবে: রিজভী
  • দলের জন্য বোলিং করতেও রাজি মুশফিক
  • শিশু জিহাদের মৃত্যু: চার জনের ১০ বছর করে কারাদণ্ড
  • অবশেষে বাড়ি অবরুদ্ধ করে রাখা সেই দেয়াল ভেঙ্গে ফেলা হচ্ছে
  • সাক্ষ্য দিলেন খাদিজা, চাইলেন বদরুলের সর্বোচ্চ শাস্তি
  • বদরুলের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিতে আদালতে খাদিজা
  • আজ বগুড়ায় যেসব প্রকল্প উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী
  • রোহিঙ্গা স্থানান্তরের সরকারি পরিকল্পনার সঙ্গে দ্বিমত মানবাধিকার কমিশনের
  • মহেশখালীতে ইয়াবা ব্যবসায়ীদের সঙ্গে পুলিশের ‘বন্দুকযুদ্ধ’
  • হোয়াইট হাউসে কাজ করার দীর্ঘ অভিজ্ঞতার কথা জানালেন এই বাংলাদেশি সাংবাদিক
Sunday, September 4, 2016 8:18 am
A- A A+ Print

মানবতাবিরোধী অপরাধে ঝুলল ৬ জন

photo-1472924058

স্বাধীন বাংলাদেশের জন্মলগ্নে এর বিরোধিতা করেও এই দেশে প্রতিপালিত হয়েছিলেন তাঁরা। এঁদের অনেকেই আবার মন্ত্রী হয়ে গাড়িতে উড়িয়েছেন বাংলাদেশের পতাকা। মুক্তিযুদ্ধের প্রতি, মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের প্রতি বৃদ্ধাঙ্গুলী দেখিয়ে ছিলেন বাংলাদেশের ক্ষমতার কেন্দ্রেবিন্দুতে। ২০০৮ সালে নির্বাচনে জিতে ক্ষমতায় যায় আওয়ামী লীগ। ওই নির্বাচনে তাদের অন্যতম নির্বাচনী অঙ্গীকার ছিল যুদ্ধাপরাধের বিচার। আওয়ামী লীগ সরকার জনগণের প্রত্যাশা পূরণ করতেই বাংলাদেশের স্বাধীনতা লাভের ৩৯ বছর পর যুদ্ধাপরাধের দায়ে অভিযুক্তদের বিচারের জন্য আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হয়। ২০১০ সালের ২৫ মার্চ ট্রাইব্যুনাল, আইনজীবী প্যানেল এবং তদন্ত সংস্থা গঠন করা হয়। এরপর শুরু হয় ইতিহাসের দায় শোধের পালা। ২০১৩ সালের ১২ ডিসেম্বর বাংলাদেশের মানুষ চার দশকের বিচারহীনতা থেকে মুক্তির দিন হিসেবে মনে রাখবে। সেই সঙ্গে ইতিহাসের পাতায় দিনটির সঙ্গে জড়িয়ে থাকবে বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্মের নাম। একাত্তরে নৃশংসতার জন্য কসাই কাদের নামে পরিচিতি পাওয়া কাদের মোল্লাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হলে তরুণ প্রজন্ম বিক্ষোভে ফেটে পড়েছিল। তাদের আন্দোলনের চাপে দুই পক্ষকে আপিলের সমান সুযোগ দিয়ে আইন সংশোধন করা হয়, তারপর সর্বোচ্চ আদালতে আপিল এবং সেখানে ফাঁসির রায়। এরপর একে একে মানবতাবিরোধী অপরাধে ছয়জনকে ফাঁসিতে ঝোলানো হয়। কাদের মোল্লার মৃত্যুদণ্ড ২০১০ সালের ১৩ জুলাই কাদের মোল্লাকে গ্রেপ্তার করা হয়। তদন্ত শুরু হয় ওই বছরের ২১ জুলাই। ২০১২ সালের ২৮ মে তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করা হয়। ৩ জুলাই থেকে সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হয়। যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষে ২০১৩ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি কাদের মোল্লাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের রায় দেন ট্রাইব্যুনাল-২। এই যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের আদেশে সাধারণ মানুষ ও তরুণদের মধ্যে প্রচণ্ড প্রতিক্রিয়া হয়। ক্ষুব্ধ মানুষ সেদিন বিকেল থেকে জড়ো হতে থাকে রাজধানীর শাহবাগ চত্বরে। প্রতিবাদী এই মানুষগুলো স্বতঃস্ফূর্তভাবে গড়ে তোলে শাহবাগ প্রতিবাদ-গণজাগরণ মঞ্চ। গণদাবির একপর্যায়ে সরকার আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিটি) আইন সংশোধন করে। ১৭ ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল সংশোধন বিল, ২০১৩ জাতীয় সংসদে পাস হয়। সংশোধনের ফলে আসামিপক্ষের মতো রাষ্ট্রপক্ষও রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করার সমান সুযোগ পায়। আগে আইনে দণ্ডাদেশের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষের আপিল করার সুযোগ ছিল না। আইন সংশোধনের পর গত ৩ মার্চ কাদের মোল্লার সর্বোচ্চ শাস্তি  মৃত্যুদণ্ড  চেয়ে আবেদন করে রাষ্ট্রপক্ষ। আর সাজা থেকে অব্যাহতি চেয়ে পরদিন ৪ মার্চ আপিল করেন কাদের মোল্লা। এরপর ১ এপ্রিল আপিলের শুনানি শুরুর  ৫৫ দিন পর ১৭ সেপ্টেম্বর প্রধান বিচারপতি মো. মোজাম্মেল হোসেনের নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের বেঞ্চ সংখ্যাগরিষ্ঠ মতামতে কাদের মোল্লাকে মৃত্যুদণ্ডাদেশ দেন। ৪৩তম বিজয় দিবসের প্রাক্কালে ২০১৩ সালের ১৫ ডিসেম্বর রাত ১০টা এক মিনিটে আবদুল কাদের মোল্লার ফাঁসি কার্যকর করা হয়। মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার-প্রক্রিয়ায় এটি প্রথম কার্যকর হওয়া দণ্ড। কামারুজ্জামানের মৃত্যুদণ্ড একাত্তরে শেরপুরের সোহাগপুর গ্রামে ১৪৪ জনকে হত্যা ও নারী নির্যাতনের দায়ে ২০১৩ সালের ৯ মে মো. কামারুজ্জামানকে ফাঁসির আদেশ দেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২। এই রায়ের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টে আপিল করে আসামিপক্ষ। সর্বেশেষ গত বছরের ৩ নভেম্বর সোহাগপুর হত্যাকাণ্ডের দায়ে সংখ্যাগরিষ্ঠ মতে কামারুজ্জামানের ফাঁসির আদেশ বহাল রাখেন আপিল বিভাগ। এরপর ২০১৫ সালের ১১ এপ্রিল কামারুজ্জামানের ফাঁসির দণ্ড কার্যকর করা হয়। সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী ও আলী আহসান মোহাম্মাদ মুজাহিদের ফাঁসি মুক্তিযুদ্ধের সময় মানবতাবিরোধী অপরাধে বিএনপির নেতা সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী ও জামায়াত নেতা আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদকে পাশাপাশি দুটি মঞ্চে ফাঁসি কার্যকর করা হয়। গত ২২ নভেম্বর ২০১৫, শনিবার রাত ১২টা ৫৫ মিনিটে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে একাত্তরের এই দুই যুদ্ধাপরাধীর ফাঁসি কার্যকর করা হয়। এর আগে ২০১৩ সালের ১৭ জুলাই মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মোহাম্মাদ মুজাহিদকে মৃত্যুদণ্ড দেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। তাঁর বিরুদ্ধে আনা বুদ্ধিজীবী হত্যা, গণহত্যা, ধর্ষণসহ সাতটি অভিযোগের মধ্যে পাঁচটি অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে। এ বছর ১৬ জুন আলী আহসান মোহাম্মাদ মুজাহিদের মৃত্যুদণ্ডের রায় বহাল রাখেন আপিল বিভাগ। অন্যদিকে এ বছরের ২৯ জুলাই, সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর বিরুদ্ধে দেওয়া মৃত্যুদণ্ডের রায় বহাল রাখেন আপিল বিভাগ। তাঁর বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের আনা অভিযোগগুলো হলো ১৯৭১ সালের ৪ ও ৫ এপ্রিল সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দু সম্প্রদায়ের সাতজনকে অপহরণ ও এর মধ্যে ছয়জনকে হত্যা, ১৯৭১ সালের ১৩ এপ্রিল রাউজানের মধ্য গহিরা হিন্দুপাড়ায় পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সঙ্গে গণহত্যা। এরপর ১৩ এপ্রিল কুণ্ডেশ্বরী ঔষধালয়ের মালিক নূতন চন্দ্র সিংহকে হত্যা এবং একই দিনে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সহযোগিতায় ৩২ জনকে হত্যা, বাড়িতে আগুন দেওয়া ও ধর্ষণের অভিযোগ।  ১৪ এপ্রিল সতীশ চন্দ্র পালিত হত্যা, তাঁর বাড়িতে আগুন ও পরিবারের সদস্যদের ধর্মান্তরে বাধ্য করা। আরো এক অভিযোগ ছিল, পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সঙ্গে বোয়ালখালীর শাখাপুর হিন্দু অধ্যুষিত অঞ্চলে হামলা ও ৭৬ জনকে হত্যা। মতিউর রহমান নিজামীর মৃত্যুদণ্ড মুক্তিযুদ্ধকালীন মানবতাবিরোধী অপরাধে জামায়াতের আমির ও একাত্তরের বদর বাহিনীর প্রধান মতিউর রহমান নিজামীর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয় ১১ মে, ২০১৬। রাত ১২টা এক মিনিটে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে এ দণ্ড কার্যকর করা হয়। আপিল বিভাগ ও আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের রায়ে নিজামীকে বলা হয়েছে একাত্তরে বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডের নকশাকার। ২০০০ সালে সেই নিজামীই হন মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতাকারী দল জামায়াতের প্রধান বা আমির। এমনকি বিএনপির নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকারের আমলে (২০০১-০৬) তিনি প্রথমে কৃষি ও পরে শিল্পমন্ত্রী হন। ওই সময়ে তাঁর গাড়িতে উড়ত জাতীয় পতাকা। এ নিয়ে ট্রাইব্যুনাল রায়ে বলেন, নিজামীকে এ দেশের মন্ত্রী করার মধ্য দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের ৩০ লাখ শহীদ ও সম্ভ্রমহারা দুই লাখ নারীকে অসম্মান করা হয়েছে। এটা জাতির জন্য লজ্জা, অবমাননা। এর আগে চট্টগ্রামে ১০ ট্রাক অস্ত্র মামলায়ও নিজামীর মৃত্যুদণ্ডাদেশ হয়েছে। ২০১৪ সালের ৩০ জানুয়ারি চট্টগ্রামের মহানগর দায়রা জজ আদালত এই রায় দেন। মামলাটি হাইকোর্টে বিচারাধীন। ২০১৪ সালের ২৯ অক্টোবর ট্রাইব্যুনাল নিজামীর বিরুদ্ধে মামলায় ফাঁসির রায় দেন। ওই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করেন নিজামী। চলতি বছরের ৬ জানুয়ারি আপিল বিভাগেও নিজামীর ফাঁসির রায় বহাল থাকে। এরপর ফাঁসির রায় পুনর্বিবেচনা চেয়ে আবেদন করেন নিজামী। সর্বশেষ গত ৫ মে প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার নেতৃত্বাধীন আপিল বিভাগের চার সদস্যের বেঞ্চ নিজামীর আবেদন খারিজ করে দেন। প্রধান বিচারপতি মাত্র এক শব্দের আদেশে বলেন, ‘ডিসমিসড।’ মীর কাসেম আলীর মৃত্যুদণ্ড সর্বশেষ আজ ৩ সেপ্টেম্বর শনিবার রাতে কার্যকর হলো ‘চট্টগ্রামের জল্লাদ’ বলে কুখ্যাত মীর কাসেম আলীর ফাঁসি।  জামায়াতের প্রধান অর্থ জোগানদাতা মীর কাসেম আলীর বিরুদ্ধে মুক্তিযুদ্ধের সময় হত্যা, অপহরণ, নির্যাতনের মতো মানবতাবিরোধী অপরাধের ১৪টি ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগ আনা হয়। এর মধ্যে ট্রাইব্যুনালের দেওয়া রায়ে ১০টি অভিযোগ প্রমাণিত হয়। মীর কাসেমের মৃত্যুদণ্ড হয়েছে দুটি অভিযোগে। প্রথম অভিযোগ, ১৯৭১ সালে মুক্তিযোদ্ধা জসিমকে অপহরণ করে আলবদর সদস্যরা। মীর কাসেমের নির্দেশে তাঁকে চট্টগ্রামের ডালিম হোটেলের নির্যাতনকেন্দ্রে নিয়ে হত্যা করা হয়। পরে সেখানে নির্যাতনের শিকার আরো পাঁচজনের মরদেহের সঙ্গে জসিমের মরদেহ কর্ণফুলী নদীতে ফেলে দেওয়া হয়। দ্বিতীয় অভিযোগ, মীর কাসেমের নির্দেশে আলবদররা চট্টগ্রামের হাজারী গলির ১৩৯ নম্বর বাড়ি থেকে রঞ্জিত দাস ও টুন্টু সেনকে অপহরণ করে ডালিম হোটেলে নিয়ে যায়। পরে তাঁদের হত্যা করে লাশ গুম করা হয়।

Comments

Comments!

 মানবতাবিরোধী অপরাধে ঝুলল ৬ জনAmarbangladeshonlineAmarbangladeshonline | Amarbangladeshonline

মানবতাবিরোধী অপরাধে ঝুলল ৬ জন

Sunday, September 4, 2016 8:18 am
photo-1472924058

স্বাধীন বাংলাদেশের জন্মলগ্নে এর বিরোধিতা করেও এই দেশে প্রতিপালিত হয়েছিলেন তাঁরা। এঁদের অনেকেই আবার মন্ত্রী হয়ে গাড়িতে উড়িয়েছেন বাংলাদেশের পতাকা। মুক্তিযুদ্ধের প্রতি, মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের প্রতি বৃদ্ধাঙ্গুলী দেখিয়ে ছিলেন বাংলাদেশের ক্ষমতার কেন্দ্রেবিন্দুতে।

২০০৮ সালে নির্বাচনে জিতে ক্ষমতায় যায় আওয়ামী লীগ। ওই নির্বাচনে তাদের অন্যতম নির্বাচনী অঙ্গীকার ছিল যুদ্ধাপরাধের বিচার। আওয়ামী লীগ সরকার জনগণের প্রত্যাশা পূরণ করতেই বাংলাদেশের স্বাধীনতা লাভের ৩৯ বছর পর যুদ্ধাপরাধের দায়ে অভিযুক্তদের বিচারের জন্য আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হয়। ২০১০ সালের ২৫ মার্চ ট্রাইব্যুনাল, আইনজীবী প্যানেল এবং তদন্ত সংস্থা গঠন করা হয়। এরপর শুরু হয় ইতিহাসের দায় শোধের পালা।

২০১৩ সালের ১২ ডিসেম্বর বাংলাদেশের মানুষ চার দশকের বিচারহীনতা থেকে মুক্তির দিন হিসেবে মনে রাখবে। সেই সঙ্গে ইতিহাসের পাতায় দিনটির সঙ্গে জড়িয়ে থাকবে বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্মের নাম। একাত্তরে নৃশংসতার জন্য কসাই কাদের নামে পরিচিতি পাওয়া কাদের মোল্লাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হলে তরুণ প্রজন্ম বিক্ষোভে ফেটে পড়েছিল। তাদের আন্দোলনের চাপে দুই পক্ষকে আপিলের সমান সুযোগ দিয়ে আইন সংশোধন করা হয়, তারপর সর্বোচ্চ আদালতে আপিল এবং সেখানে ফাঁসির রায়। এরপর একে একে মানবতাবিরোধী অপরাধে ছয়জনকে ফাঁসিতে ঝোলানো হয়।

কাদের মোল্লার মৃত্যুদণ্ড

২০১০ সালের ১৩ জুলাই কাদের মোল্লাকে গ্রেপ্তার করা হয়। তদন্ত শুরু হয় ওই বছরের ২১ জুলাই। ২০১২ সালের ২৮ মে তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করা হয়। ৩ জুলাই থেকে সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হয়। যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষে ২০১৩ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি কাদের মোল্লাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের রায় দেন ট্রাইব্যুনাল-২।

এই যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের আদেশে সাধারণ মানুষ ও তরুণদের মধ্যে প্রচণ্ড প্রতিক্রিয়া হয়। ক্ষুব্ধ মানুষ সেদিন বিকেল থেকে জড়ো হতে থাকে রাজধানীর শাহবাগ চত্বরে। প্রতিবাদী এই মানুষগুলো স্বতঃস্ফূর্তভাবে গড়ে তোলে শাহবাগ প্রতিবাদ-গণজাগরণ মঞ্চ।

গণদাবির একপর্যায়ে সরকার আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিটি) আইন সংশোধন করে। ১৭ ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল সংশোধন বিল, ২০১৩ জাতীয় সংসদে পাস হয়। সংশোধনের ফলে আসামিপক্ষের মতো রাষ্ট্রপক্ষও রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করার সমান সুযোগ পায়। আগে আইনে দণ্ডাদেশের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষের আপিল করার সুযোগ ছিল না।

আইন সংশোধনের পর গত ৩ মার্চ কাদের মোল্লার সর্বোচ্চ শাস্তি  মৃত্যুদণ্ড  চেয়ে আবেদন করে রাষ্ট্রপক্ষ। আর সাজা থেকে অব্যাহতি চেয়ে পরদিন ৪ মার্চ আপিল করেন কাদের মোল্লা।

এরপর ১ এপ্রিল আপিলের শুনানি শুরুর  ৫৫ দিন পর ১৭ সেপ্টেম্বর প্রধান বিচারপতি মো. মোজাম্মেল হোসেনের নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের বেঞ্চ সংখ্যাগরিষ্ঠ মতামতে কাদের মোল্লাকে মৃত্যুদণ্ডাদেশ দেন।

৪৩তম বিজয় দিবসের প্রাক্কালে ২০১৩ সালের ১৫ ডিসেম্বর রাত ১০টা এক মিনিটে আবদুল কাদের মোল্লার ফাঁসি কার্যকর করা হয়। মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার-প্রক্রিয়ায় এটি প্রথম কার্যকর হওয়া দণ্ড।

কামারুজ্জামানের মৃত্যুদণ্ড

একাত্তরে শেরপুরের সোহাগপুর গ্রামে ১৪৪ জনকে হত্যা ও নারী নির্যাতনের দায়ে ২০১৩ সালের ৯ মে মো. কামারুজ্জামানকে ফাঁসির আদেশ দেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২। এই রায়ের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টে আপিল করে আসামিপক্ষ। সর্বেশেষ গত বছরের ৩ নভেম্বর সোহাগপুর হত্যাকাণ্ডের দায়ে সংখ্যাগরিষ্ঠ মতে কামারুজ্জামানের ফাঁসির আদেশ বহাল রাখেন আপিল বিভাগ। এরপর ২০১৫ সালের ১১ এপ্রিল কামারুজ্জামানের ফাঁসির দণ্ড কার্যকর করা হয়।

সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী ও আলী আহসান মোহাম্মাদ মুজাহিদের ফাঁসি

মুক্তিযুদ্ধের সময় মানবতাবিরোধী অপরাধে বিএনপির নেতা সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী ও জামায়াত নেতা আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদকে পাশাপাশি দুটি মঞ্চে ফাঁসি কার্যকর করা হয়। গত ২২ নভেম্বর ২০১৫, শনিবার রাত ১২টা ৫৫ মিনিটে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে একাত্তরের এই দুই যুদ্ধাপরাধীর ফাঁসি কার্যকর করা হয়।

এর আগে ২০১৩ সালের ১৭ জুলাই মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মোহাম্মাদ মুজাহিদকে মৃত্যুদণ্ড দেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। তাঁর বিরুদ্ধে আনা বুদ্ধিজীবী হত্যা, গণহত্যা, ধর্ষণসহ সাতটি অভিযোগের মধ্যে পাঁচটি অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে। এ বছর ১৬ জুন আলী আহসান মোহাম্মাদ মুজাহিদের মৃত্যুদণ্ডের রায় বহাল রাখেন আপিল বিভাগ।

অন্যদিকে এ বছরের ২৯ জুলাই, সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর বিরুদ্ধে দেওয়া মৃত্যুদণ্ডের রায় বহাল রাখেন আপিল বিভাগ। তাঁর বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের আনা অভিযোগগুলো হলো ১৯৭১ সালের ৪ ও ৫ এপ্রিল সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দু সম্প্রদায়ের সাতজনকে অপহরণ ও এর মধ্যে ছয়জনকে হত্যা, ১৯৭১ সালের ১৩ এপ্রিল রাউজানের মধ্য গহিরা হিন্দুপাড়ায় পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সঙ্গে গণহত্যা। এরপর ১৩ এপ্রিল কুণ্ডেশ্বরী ঔষধালয়ের মালিক নূতন চন্দ্র সিংহকে হত্যা এবং একই দিনে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সহযোগিতায় ৩২ জনকে হত্যা, বাড়িতে আগুন দেওয়া ও ধর্ষণের অভিযোগ।  ১৪ এপ্রিল সতীশ চন্দ্র পালিত হত্যা, তাঁর বাড়িতে আগুন ও পরিবারের সদস্যদের ধর্মান্তরে বাধ্য করা। আরো এক অভিযোগ ছিল, পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সঙ্গে বোয়ালখালীর শাখাপুর হিন্দু অধ্যুষিত অঞ্চলে হামলা ও ৭৬ জনকে হত্যা।

মতিউর রহমান নিজামীর মৃত্যুদণ্ড

মুক্তিযুদ্ধকালীন মানবতাবিরোধী অপরাধে জামায়াতের আমির ও একাত্তরের বদর বাহিনীর প্রধান মতিউর রহমান নিজামীর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয় ১১ মে, ২০১৬। রাত ১২টা এক মিনিটে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে এ দণ্ড কার্যকর করা হয়।

আপিল বিভাগ ও আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের রায়ে নিজামীকে বলা হয়েছে একাত্তরে বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডের নকশাকার। ২০০০ সালে সেই নিজামীই হন মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতাকারী দল জামায়াতের প্রধান বা আমির। এমনকি বিএনপির নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকারের আমলে (২০০১-০৬) তিনি প্রথমে কৃষি ও পরে শিল্পমন্ত্রী হন। ওই সময়ে তাঁর গাড়িতে উড়ত জাতীয় পতাকা।

এ নিয়ে ট্রাইব্যুনাল রায়ে বলেন, নিজামীকে এ দেশের মন্ত্রী করার মধ্য দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের ৩০ লাখ শহীদ ও সম্ভ্রমহারা দুই লাখ নারীকে অসম্মান করা হয়েছে। এটা জাতির জন্য লজ্জা, অবমাননা।

এর আগে চট্টগ্রামে ১০ ট্রাক অস্ত্র মামলায়ও নিজামীর মৃত্যুদণ্ডাদেশ হয়েছে। ২০১৪ সালের ৩০ জানুয়ারি চট্টগ্রামের মহানগর দায়রা জজ আদালত এই রায় দেন। মামলাটি হাইকোর্টে বিচারাধীন।

২০১৪ সালের ২৯ অক্টোবর ট্রাইব্যুনাল নিজামীর বিরুদ্ধে মামলায় ফাঁসির রায় দেন। ওই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করেন নিজামী। চলতি বছরের ৬ জানুয়ারি আপিল বিভাগেও নিজামীর ফাঁসির রায় বহাল থাকে। এরপর ফাঁসির রায় পুনর্বিবেচনা চেয়ে আবেদন করেন নিজামী।

সর্বশেষ গত ৫ মে প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার নেতৃত্বাধীন আপিল বিভাগের চার সদস্যের বেঞ্চ নিজামীর আবেদন খারিজ করে দেন। প্রধান বিচারপতি মাত্র এক শব্দের আদেশে বলেন, ‘ডিসমিসড।’

মীর কাসেম আলীর মৃত্যুদণ্ড

সর্বশেষ আজ ৩ সেপ্টেম্বর শনিবার রাতে কার্যকর হলো ‘চট্টগ্রামের জল্লাদ’ বলে কুখ্যাত মীর কাসেম আলীর ফাঁসি।  জামায়াতের প্রধান অর্থ জোগানদাতা মীর কাসেম আলীর বিরুদ্ধে মুক্তিযুদ্ধের সময় হত্যা, অপহরণ, নির্যাতনের মতো মানবতাবিরোধী অপরাধের ১৪টি ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগ আনা হয়। এর মধ্যে ট্রাইব্যুনালের দেওয়া রায়ে ১০টি অভিযোগ প্রমাণিত হয়।

মীর কাসেমের মৃত্যুদণ্ড হয়েছে দুটি অভিযোগে। প্রথম অভিযোগ, ১৯৭১ সালে মুক্তিযোদ্ধা জসিমকে অপহরণ করে আলবদর সদস্যরা। মীর কাসেমের নির্দেশে তাঁকে চট্টগ্রামের ডালিম হোটেলের নির্যাতনকেন্দ্রে নিয়ে হত্যা করা হয়। পরে সেখানে নির্যাতনের শিকার আরো পাঁচজনের মরদেহের সঙ্গে জসিমের মরদেহ কর্ণফুলী নদীতে ফেলে দেওয়া হয়।

দ্বিতীয় অভিযোগ, মীর কাসেমের নির্দেশে আলবদররা চট্টগ্রামের হাজারী গলির ১৩৯ নম্বর বাড়ি থেকে রঞ্জিত দাস ও টুন্টু সেনকে অপহরণ করে ডালিম হোটেলে নিয়ে যায়। পরে তাঁদের হত্যা করে লাশ গুম করা হয়।

Comments

comments

সম্পাদক : মোহাম্মদ আবদুল বাছির
প্রকাশক: মোহাম্মদ জহিরুল ইসলাম
ফোন : ‎০১৭১৩৪০৯০৯০
৩৪৫/১, দিলু রোড, নিউ ইস্কাটন, ঢাকা-১০০০
X
 
নিয়মিত খবর পড়তে আমাদের ফেসবুক পেজে লাইক দিয়ে যুক্ত থাকুন
X