শনিবার, ১৮ই নভেম্বর, ২০১৭ ইং, ৪ঠা অগ্রহায়ণ, ১৪২৪ বঙ্গাব্দ, দুপুর ২:২০
শিরোনাম
  • ঘৃণাকে বিজয়ী হতে দেয়া যাবে না, ট্রাম্পকে ইঙ্গিত করে জর্জ ক্লুনি
  • আমার একটাই চিন্তা দেশের মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন করা: প্রধানমন্ত্রী
  • ‘কেন্দ্রীয় সরকারের আগ্রাসী নীতির কারণে কাশ্মীরকে হারাতে হবে’
  • সাড়ে চারমাস পর মুখোমুখি, খাদিজাকে উদ্দেশ্য করে যা বলল বদরুল
  • খালেদার ‘সাজা’ বিরোধী নেতাকর্মীদের মনোবল ভাঙ্গার কৌশল!
  • বিএনপির কর্মসূচি ‘যথাসময়ে’ জানানো হবে: রিজভী
  • দলের জন্য বোলিং করতেও রাজি মুশফিক
  • শিশু জিহাদের মৃত্যু: চার জনের ১০ বছর করে কারাদণ্ড
  • অবশেষে বাড়ি অবরুদ্ধ করে রাখা সেই দেয়াল ভেঙ্গে ফেলা হচ্ছে
  • সাক্ষ্য দিলেন খাদিজা, চাইলেন বদরুলের সর্বোচ্চ শাস্তি
  • বদরুলের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিতে আদালতে খাদিজা
  • আজ বগুড়ায় যেসব প্রকল্প উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী
  • রোহিঙ্গা স্থানান্তরের সরকারি পরিকল্পনার সঙ্গে দ্বিমত মানবাধিকার কমিশনের
  • মহেশখালীতে ইয়াবা ব্যবসায়ীদের সঙ্গে পুলিশের ‘বন্দুকযুদ্ধ’
  • হোয়াইট হাউসে কাজ করার দীর্ঘ অভিজ্ঞতার কথা জানালেন এই বাংলাদেশি সাংবাদিক
Wednesday, August 30, 2017 12:20 pm
A- A A+ Print

মূলধন খেয়ে ফেলেছে রাষ্ট্রায়ত্ত ৫ ব্যাংক শীর্ষে রাষ্ট্রায়ত্ত কৃষি, সোনালী ও বেসিক ব্যাংক-বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ প্রতিবেদন; * ৬ ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি ১৫ হাজার কোটি টাকা * ভর্তুকি পেয়েও সংকট কাটছে না * সরকারি ব্যাংকে পরিচালনা পর্ষদই মূল সমস্যা -ড. মইনুল ইসলাম * রাজনীতির ছত্রচ্ছায়ায় প্রভাবশালী মহল ব্যাংকে দুর্নীতি করছে, দায় অর্থ মন্ত্রণালয়ের-খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ

6

রাষ্ট্রায়ত্ত পাঁচটি ব্যাংক এবং একটি বেসরকারি ব্যাংকের আর্থিক ভিত্তির দুর্বলতা ক্রমেই প্রকট আকার ধারণ করেছে। এসব ব্যাংক ঋণের মান অনুযায়ী নিরাপত্তা সঞ্চিতি রাখতে গিয়ে আর্থিক ব্যবস্থাপনায় পুরো হোঁচট খেয়েছে। এর ফলে ব্যাংকগুলো নিজের মূলধন তো হারিয়েছেই, উপরন্তু ১৫ হাজার কোটি টাকার ঘাটতিতে পড়েছে। খাত সংশ্লিষ্ট বিশিষ্টজনরা বলছেন, ব্যাংকিং খাতের করুণ পরিণতি শুরু হয় ২০০৯ সালে। রাজনৈতিক বিবেচনায় ব্যাংকের এমডি-চেয়ারম্যান নিয়োগ দেয়ার পর থেকে এমন দশা সৃষ্টি হয়েছে। এর আগে ব্যাংকিং খাতে মূলধন ঘাটতি এতটা প্রকট ছিল না। জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ যুগান্তরকে বলেন, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক থেকে ঋণের নামে সব টাকা বের করে নিয়ে গেছে। এসব টাকা ফেরত আসার সম্ভাবনা নেই। কারণ রাজনীতির ছত্রছায়ায় একটি প্রভাবশালী মহল ব্যাংকে দুর্নীতি করছে। এর জন্য পুরোপুরি অর্থ মন্ত্রণালয় দায়ী। কারণ অর্থমন্ত্রী নিজেই সরকারি ব্যাংকে এমডি-চেয়ারম্যান এবং পরিচালক নিয়োগ দেন। তিনি বলেন, দুর্নীতি আড়াল করতে সম্প্রতি সরকারি ব্যাংকগুলো নিয়ে একটি সেমিনারের আয়োজন করেছে অর্থ মন্ত্রণালয়। সেখানে ব্যাংকারদের দায়ী করা হয়েছে। এটা ঠিক নয়। কারণ সব দুর্নীতির মূল হল রাজনৈতিক বিবেচনায় নিয়োগ পাওয়া পরিচালনা পর্ষদ। ব্যাংকাররা কেউ জড়িত থাকলেও উপরের ইশারা বা চাপে করেছে। তিনি আরও বলেন, সেমিনারে কোনো লাভ হয়নি বরং টাকার অপচয় হয়েছে। তারমতে, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ বাংলাদেশ ব্যাংকের হাতে থাকা দরকার। তা না হলে সংকট থেকে বের হওয়া সম্ভব নয়। এ প্রসঙ্গে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. মইনুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, সরকারি ব্যাংকের পরিচালনায় মৌলিক কোনো পরিবর্তন না এলে মূলধন ঘাটতি বাড়তেই থাকবে। মূলত খেলাপি ঋণ ব্যাংকিং খাতের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে। তাই মূলধন ঘাটতি বাড়ছে। সূত্র জানায়, ব্যবসার পরিবর্তে এসব ব্যাংক এখন মূলধন জোগান নিয়েই চিন্তিত। চলতি বছরের শুরুতে মূলধন ঘাটতি মেটাতে সরকারের কাছে সাড়ে ১৪ হাজার কোটি টাকা চেয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো। কারণ ঘাটতিতে থাকায় এসব ব্যাংক দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বাজারে ব্যবসা পরিচালনার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হচ্ছে। ব্যাংক ৫টি হল- বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক, সোনালী, বেসিক, রূপালী ও রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক। এছাড়া মূলধন ঘাটতির তালিকায় বেসরকারি খাতের আইসিবি ইসলামিক ব্যাংকের নামও রয়েছে। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, অনিয়ম-দুর্নীতির কারণে খেলাপি ঋণ বাড়ছে। আর খেলাপি বাড়লে মান অনুযায়ী প্রভিশন রাখতে হয়। সে কারণে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলো মূলধন ঘাটতিতে পড়েছে। আর বাস্তবতা হল, এভাবে একদিকে জনগণের জমানো টাকা ব্যাংক থেকে দুর্নীতির মাধ্যমে ঋণ হিসেবে দেয়া হচ্ছে একশ্রেণীর মাফিয়ার হাতে, যা আদায়ও করতে পারছে না। বিপরীতে সরকারের তহবিল থেকে টাকা নিয়ে মূলধন ঘাটতি মেটাচ্ছে সংশ্লিষ্ট সরকারি ব্যাংকগুলো। এ টাকাও জনগণের ট্যাক্সের টাকা। অথচ জড়িতদের কারও কিছুই হচ্ছে না। মাঝখানে কৌশলে জনগণের পকেট কাটা হচ্ছে। তাই যতদিন ব্যাংকিং সেক্টরের এসব ভয়াবহ অনিয়ম-দুর্নীতির সঙ্গে জড়িতদের বিচার না হবে, ততদিন খেলাপি ঋণের পরিমাণ ও ঋণ অবলোপন বাড়তেই থাকবে। অভিযোগ আছে, সরকারি দলের প্রভাবশালীরা এসব ঋণ অনিয়ম ও দুর্নীতির সঙ্গে প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে জড়িত। সে কারণে সহজে পার পেয়ে যাচ্ছে। প্রাপ্ত তথ্যমতে, চলতি বছরের জুন শেষে সরকারি বিশেষায়িত খাতের বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৭ হাজার ৩১৮ কোটি টাকা। এছাড়া সোনালী ব্যাংকের ঘাটতি ২ হাজার ৬১৯ কোটি টাকা, বেসিক ব্যাংকের ঘাটতি ২ হাজার ২১০ কোটি টাকা, রূপালী ব্যাংকের ৭৪১ কোটি টাকা এবং রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকের ঘাটতি ৭১০ কোটি টাকা। এর বাইরে বেসরকারি খাতের আইসিবি ইসলামিক ব্যাংকের ঘাটতি রয়েছে ১ হাজার ৪৭৫ কোটি টাকা। সব মিলিয়ে ৬ ব্যাংকের ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ১৫ হাজার ৭৪ কোটি টাকা। জানতে চাইলে রূপালী ব্যাংকের বর্তমান এমডি আতাউর রহমান প্রধান যুগান্তরকে বলেন, জুনে খেলাপি বেড়ে যাওয়ায় প্রভিশন বেশি রাখতে হয়েছে। সে কারণে মূলধন ঘাটতি বেড়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সরকারি ব্যাংকগুলোকে ২০১১-১২ অর্থবছরে বাজেট থেকে ৩৪১ কোটি টাকা, ২০১২-১৩ অর্থবছরে ৫৪১ কোটি, ২০১৩-১৪ অর্থবছরে ৫ হাজার কোটি, ২০১৪-১৫ অর্থবছরে ৫ হাজার ৬৮ কোটি টাকার মূলধন জোগান দেয় সরকার। এছাড়া ২০১৫-১৬ অর্থবছরে এক হাজার ৬০০ কোটি টাকা এবং ২০১৬-১৭ অর্থবছরে মূলধন জোগান দিয়েছে প্রায় ২ হাজার কোটি টাকা। তবে ব্যাংকগুলো চেয়েছিল সাড়ে ১৪ হাজার কোটি টাকা। আবার চলতি ২০১৭-১৮ অর্থবছরের বাজেটেও রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর জন্য ২ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এর মূল কারণ হিসেবে জানা যায়, গত কয়েক বছরে সরকারি ব্যাংকগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি লুটপাট হয়েছে চার ব্যাংকে। এগুলো হল- সোনালী, বেসিক, রূপালী এবং বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক। সূত্র জানায়, আওয়ামী লীগ বর্তমানে টানা ৯ বছর দেশ পরিচালনা করছে। শুরুটা হয়েছিল ২০০৯-এ। কিন্তু অভিযোগ আছে, ওই সময় সরকার গঠনের পরপরই কিছু দলবাজ লোক ব্যক্তিস্বার্থে প্রথমে সরকারি ব্যাংকগুলোর ওপর রীতিমতো হামলে পড়ে। দেখা যায়, রাজনৈতিক বিবেচনায় চেয়ারম্যান, পরিচালক এবং এমডি নিয়োগ দেয়া হয়। এ সময় সেক্টরটিতে ব্যাপকভাবে দুর্নীতি-লুটপাট করা হয়। সূত্রগুলো বলছে, ২০০৯ থেকে ২০১৩ সাল ছিল ব্যাংকিং খাতের ‘অন্ধকার যুগ’ বা দুর্দশাগ্রস্ত সময়। এ সময়ে হলমার্ক কেলেঙ্কারি, বিসমিল্লাহ গ্রুপের ঋণ জালিয়াতি, বেসিক ব্যাংকে ব্যাপক হারে লুটপাট করা হয়। এছাড়া বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে ঋণ অনিয়ম ও রূপালী ব্যাংকেও ঘটে ঋণ জালিয়াতির ঘটনা। সূত্র জানায়, ২০০৮ সাল পর্যন্ত রাষ্ট্রায়ত্ত বেসিক ব্যাংক ভালো ছিল। এরপর থেকে নজিরবিহীন লুটপাটের শিকার হয় ব্যাংকটি। শেখ আবদুল হাই বাচ্চু বেসিক ব্যাংকের চেয়ারম্যান থাকাকালে ২০০৯ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত সাড়ে ৪ হাজার কোটি টাকার ঋণ কেলেঙ্কারির ঘটনা ঘটে। এরপরই ব্যাংকটি ২ হাজার ২১০ কোটি টাকা মূলধন ঘাটতিতে পড়ে। যদিও আর্থিক বিপর্যয় কাটিয়ে উঠতে গত ৩ বছরে বেসিক ব্যাংককে ২ হাজার ৩৯০ কোটি টাকার মূলধন জোগান দিয়েছে সরকার। বিপর্যয় কাটিয়ে উঠতে সরকারের কাছে নতুন করে আরও ২ হাজার ৬০০ কোটি টাকার বন্ড চেয়েছে ব্যাংকটি। মূলধন ঘাটতির পাশাপাশি ব্যাংকটিতে বেড়েছে খেলাপি ও প্রভিশন ঘাটতি। এছাড়া সীমাহীন দুর্নীতি ও লুটপাটের কারণে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক ৭ হাজার কোটি টাকার মূলধন ঘাটতিতে পড়েছে। সোনালী ব্যাংকে হুমায়ূন কবির এমডি থাকাকালীন প্রায় সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকার হলমার্ক কেলেঙ্কারির ঘটনা ঘটে। যে ক্ষত আজও শুকায়নি। রূপালী ব্যাংকে এম ফরিদ উদ্দিন এমডি থাকা অবস্থায় ব্যাপক অনিয়ম করা হয়েছে। সে কারণে সরকারি এ ব্যাংকটিও বেহাল অবস্থায় রয়েছে।

Comments

Comments!

 মূলধন খেয়ে ফেলেছে রাষ্ট্রায়ত্ত ৫ ব্যাংক শীর্ষে রাষ্ট্রায়ত্ত কৃষি, সোনালী ও বেসিক ব্যাংক-বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ প্রতিবেদন; * ৬ ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি ১৫ হাজার কোটি টাকা * ভর্তুকি পেয়েও সংকট কাটছে না * সরকারি ব্যাংকে পরিচালনা পর্ষদই মূল সমস্যা -ড. মইনুল ইসলাম * রাজনীতির ছত্রচ্ছায়ায় প্রভাবশালী মহল ব্যাংকে দুর্নীতি করছে, দায় অর্থ মন্ত্রণালয়ের-খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদAmarbangladeshonlineAmarbangladeshonline | Amarbangladeshonline

মূলধন খেয়ে ফেলেছে রাষ্ট্রায়ত্ত ৫ ব্যাংক শীর্ষে রাষ্ট্রায়ত্ত কৃষি, সোনালী ও বেসিক ব্যাংক-বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ প্রতিবেদন; * ৬ ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি ১৫ হাজার কোটি টাকা * ভর্তুকি পেয়েও সংকট কাটছে না * সরকারি ব্যাংকে পরিচালনা পর্ষদই মূল সমস্যা -ড. মইনুল ইসলাম * রাজনীতির ছত্রচ্ছায়ায় প্রভাবশালী মহল ব্যাংকে দুর্নীতি করছে, দায় অর্থ মন্ত্রণালয়ের-খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ

Wednesday, August 30, 2017 12:20 pm
6

রাষ্ট্রায়ত্ত পাঁচটি ব্যাংক এবং একটি বেসরকারি ব্যাংকের আর্থিক ভিত্তির দুর্বলতা ক্রমেই প্রকট আকার ধারণ করেছে। এসব ব্যাংক ঋণের মান অনুযায়ী নিরাপত্তা সঞ্চিতি রাখতে গিয়ে আর্থিক ব্যবস্থাপনায় পুরো হোঁচট খেয়েছে।

এর ফলে ব্যাংকগুলো নিজের মূলধন তো হারিয়েছেই, উপরন্তু ১৫ হাজার কোটি টাকার ঘাটতিতে পড়েছে। খাত সংশ্লিষ্ট বিশিষ্টজনরা বলছেন, ব্যাংকিং খাতের করুণ পরিণতি শুরু হয় ২০০৯ সালে।

রাজনৈতিক বিবেচনায় ব্যাংকের এমডি-চেয়ারম্যান নিয়োগ দেয়ার পর থেকে এমন দশা সৃষ্টি হয়েছে। এর আগে ব্যাংকিং খাতে মূলধন ঘাটতি এতটা প্রকট ছিল না।

জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ যুগান্তরকে বলেন, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক থেকে ঋণের নামে সব টাকা বের করে নিয়ে গেছে। এসব টাকা ফেরত আসার সম্ভাবনা নেই।

কারণ রাজনীতির ছত্রছায়ায় একটি প্রভাবশালী মহল ব্যাংকে দুর্নীতি করছে। এর জন্য পুরোপুরি অর্থ মন্ত্রণালয় দায়ী। কারণ অর্থমন্ত্রী নিজেই সরকারি ব্যাংকে এমডি-চেয়ারম্যান এবং পরিচালক নিয়োগ দেন।

তিনি বলেন, দুর্নীতি আড়াল করতে সম্প্রতি সরকারি ব্যাংকগুলো নিয়ে একটি সেমিনারের আয়োজন করেছে অর্থ মন্ত্রণালয়। সেখানে ব্যাংকারদের দায়ী করা হয়েছে। এটা ঠিক নয়।

কারণ সব দুর্নীতির মূল হল রাজনৈতিক বিবেচনায় নিয়োগ পাওয়া পরিচালনা পর্ষদ। ব্যাংকাররা কেউ জড়িত থাকলেও উপরের ইশারা বা চাপে করেছে। তিনি আরও বলেন, সেমিনারে কোনো লাভ হয়নি বরং টাকার অপচয় হয়েছে। তারমতে, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ বাংলাদেশ ব্যাংকের হাতে থাকা দরকার। তা না হলে সংকট থেকে বের হওয়া সম্ভব নয়। এ প্রসঙ্গে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. মইনুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, সরকারি ব্যাংকের পরিচালনায় মৌলিক কোনো পরিবর্তন না এলে মূলধন ঘাটতি বাড়তেই থাকবে। মূলত খেলাপি ঋণ ব্যাংকিং খাতের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে। তাই মূলধন ঘাটতি বাড়ছে।

সূত্র জানায়, ব্যবসার পরিবর্তে এসব ব্যাংক এখন মূলধন জোগান নিয়েই চিন্তিত। চলতি বছরের শুরুতে মূলধন ঘাটতি মেটাতে সরকারের কাছে সাড়ে ১৪ হাজার কোটি টাকা চেয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো। কারণ ঘাটতিতে থাকায় এসব ব্যাংক দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বাজারে ব্যবসা পরিচালনার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হচ্ছে। ব্যাংক ৫টি হল- বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক, সোনালী, বেসিক, রূপালী ও রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক। এছাড়া মূলধন ঘাটতির তালিকায় বেসরকারি খাতের আইসিবি ইসলামিক ব্যাংকের নামও রয়েছে।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, অনিয়ম-দুর্নীতির কারণে খেলাপি ঋণ বাড়ছে। আর খেলাপি বাড়লে মান অনুযায়ী প্রভিশন রাখতে হয়। সে কারণে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলো মূলধন ঘাটতিতে পড়েছে। আর বাস্তবতা হল, এভাবে একদিকে জনগণের জমানো টাকা ব্যাংক থেকে দুর্নীতির মাধ্যমে ঋণ হিসেবে দেয়া হচ্ছে একশ্রেণীর মাফিয়ার হাতে, যা আদায়ও করতে পারছে না।

বিপরীতে সরকারের তহবিল থেকে টাকা নিয়ে মূলধন ঘাটতি মেটাচ্ছে সংশ্লিষ্ট সরকারি ব্যাংকগুলো। এ টাকাও জনগণের ট্যাক্সের টাকা। অথচ জড়িতদের কারও কিছুই হচ্ছে না। মাঝখানে কৌশলে জনগণের পকেট কাটা হচ্ছে।

তাই যতদিন ব্যাংকিং সেক্টরের এসব ভয়াবহ অনিয়ম-দুর্নীতির সঙ্গে জড়িতদের বিচার না হবে, ততদিন খেলাপি ঋণের পরিমাণ ও ঋণ অবলোপন বাড়তেই থাকবে। অভিযোগ আছে, সরকারি দলের প্রভাবশালীরা এসব ঋণ অনিয়ম ও দুর্নীতির সঙ্গে প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে জড়িত। সে কারণে সহজে পার পেয়ে যাচ্ছে।

প্রাপ্ত তথ্যমতে, চলতি বছরের জুন শেষে সরকারি বিশেষায়িত খাতের বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৭ হাজার ৩১৮ কোটি টাকা। এছাড়া সোনালী ব্যাংকের ঘাটতি ২ হাজার ৬১৯ কোটি টাকা, বেসিক ব্যাংকের ঘাটতি ২ হাজার ২১০ কোটি টাকা, রূপালী ব্যাংকের ৭৪১ কোটি টাকা এবং রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকের ঘাটতি ৭১০ কোটি টাকা। এর বাইরে বেসরকারি খাতের আইসিবি ইসলামিক ব্যাংকের ঘাটতি রয়েছে ১ হাজার ৪৭৫ কোটি টাকা। সব মিলিয়ে ৬ ব্যাংকের ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ১৫ হাজার ৭৪ কোটি টাকা।

জানতে চাইলে রূপালী ব্যাংকের বর্তমান এমডি আতাউর রহমান প্রধান যুগান্তরকে বলেন, জুনে খেলাপি বেড়ে যাওয়ায় প্রভিশন বেশি রাখতে হয়েছে। সে কারণে মূলধন ঘাটতি বেড়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সরকারি ব্যাংকগুলোকে ২০১১-১২ অর্থবছরে বাজেট থেকে ৩৪১ কোটি টাকা, ২০১২-১৩ অর্থবছরে ৫৪১ কোটি, ২০১৩-১৪ অর্থবছরে ৫ হাজার কোটি, ২০১৪-১৫ অর্থবছরে ৫ হাজার ৬৮ কোটি টাকার মূলধন জোগান দেয় সরকার।

এছাড়া ২০১৫-১৬ অর্থবছরে এক হাজার ৬০০ কোটি টাকা এবং ২০১৬-১৭ অর্থবছরে মূলধন জোগান দিয়েছে প্রায় ২ হাজার কোটি টাকা। তবে ব্যাংকগুলো চেয়েছিল সাড়ে ১৪ হাজার কোটি টাকা। আবার চলতি ২০১৭-১৮ অর্থবছরের বাজেটেও রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর জন্য ২ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে।

এর মূল কারণ হিসেবে জানা যায়, গত কয়েক বছরে সরকারি ব্যাংকগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি লুটপাট হয়েছে চার ব্যাংকে। এগুলো হল- সোনালী, বেসিক, রূপালী এবং বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক।

সূত্র জানায়, আওয়ামী লীগ বর্তমানে টানা ৯ বছর দেশ পরিচালনা করছে। শুরুটা হয়েছিল ২০০৯-এ। কিন্তু অভিযোগ আছে, ওই সময় সরকার গঠনের পরপরই কিছু দলবাজ লোক ব্যক্তিস্বার্থে প্রথমে সরকারি ব্যাংকগুলোর ওপর রীতিমতো হামলে পড়ে।

দেখা যায়, রাজনৈতিক বিবেচনায় চেয়ারম্যান, পরিচালক এবং এমডি নিয়োগ দেয়া হয়। এ সময় সেক্টরটিতে ব্যাপকভাবে দুর্নীতি-লুটপাট করা হয়। সূত্রগুলো বলছে, ২০০৯ থেকে ২০১৩ সাল ছিল ব্যাংকিং খাতের ‘অন্ধকার যুগ’ বা দুর্দশাগ্রস্ত সময়। এ সময়ে হলমার্ক কেলেঙ্কারি, বিসমিল্লাহ গ্রুপের ঋণ জালিয়াতি, বেসিক ব্যাংকে ব্যাপক হারে লুটপাট করা হয়।

এছাড়া বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে ঋণ অনিয়ম ও রূপালী ব্যাংকেও ঘটে ঋণ জালিয়াতির ঘটনা। সূত্র জানায়, ২০০৮ সাল পর্যন্ত রাষ্ট্রায়ত্ত বেসিক ব্যাংক ভালো ছিল। এরপর থেকে নজিরবিহীন লুটপাটের শিকার হয় ব্যাংকটি।

শেখ আবদুল হাই বাচ্চু বেসিক ব্যাংকের চেয়ারম্যান থাকাকালে ২০০৯ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত সাড়ে ৪ হাজার কোটি টাকার ঋণ কেলেঙ্কারির ঘটনা ঘটে। এরপরই ব্যাংকটি ২ হাজার ২১০ কোটি টাকা মূলধন ঘাটতিতে পড়ে।

যদিও আর্থিক বিপর্যয় কাটিয়ে উঠতে গত ৩ বছরে বেসিক ব্যাংককে ২ হাজার ৩৯০ কোটি টাকার মূলধন জোগান দিয়েছে সরকার। বিপর্যয় কাটিয়ে উঠতে সরকারের কাছে নতুন করে আরও ২ হাজার ৬০০ কোটি টাকার বন্ড চেয়েছে ব্যাংকটি।

মূলধন ঘাটতির পাশাপাশি ব্যাংকটিতে বেড়েছে খেলাপি ও প্রভিশন ঘাটতি। এছাড়া সীমাহীন দুর্নীতি ও লুটপাটের কারণে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক ৭ হাজার কোটি টাকার মূলধন ঘাটতিতে পড়েছে।

সোনালী ব্যাংকে হুমায়ূন কবির এমডি থাকাকালীন প্রায় সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকার হলমার্ক কেলেঙ্কারির ঘটনা ঘটে। যে ক্ষত আজও শুকায়নি। রূপালী ব্যাংকে এম ফরিদ উদ্দিন এমডি থাকা অবস্থায় ব্যাপক অনিয়ম করা হয়েছে। সে কারণে সরকারি এ ব্যাংকটিও বেহাল অবস্থায় রয়েছে।

Comments

comments

সম্পাদক : মোহাম্মদ আবদুল বাছির
প্রকাশক: মোহাম্মদ জহিরুল ইসলাম
ফোন : ‎০১৭১৩৪০৯০৯০
৩৪৫/১, দিলু রোড, নিউ ইস্কাটন, ঢাকা-১০০০
X
 
নিয়মিত খবর পড়তে আমাদের ফেসবুক পেজে লাইক দিয়ে যুক্ত থাকুন
X