শুক্রবার, ২৩শে ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ ইং, ১১ই ফাল্গুন, ১৪২৪ বঙ্গাব্দ, সকাল ৬:১৮
শিরোনাম
  • ঘৃণাকে বিজয়ী হতে দেয়া যাবে না, ট্রাম্পকে ইঙ্গিত করে জর্জ ক্লুনি
  • আমার একটাই চিন্তা দেশের মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন করা: প্রধানমন্ত্রী
  • ‘কেন্দ্রীয় সরকারের আগ্রাসী নীতির কারণে কাশ্মীরকে হারাতে হবে’
  • সাড়ে চারমাস পর মুখোমুখি, খাদিজাকে উদ্দেশ্য করে যা বলল বদরুল
  • খালেদার ‘সাজা’ বিরোধী নেতাকর্মীদের মনোবল ভাঙ্গার কৌশল!
  • বিএনপির কর্মসূচি ‘যথাসময়ে’ জানানো হবে: রিজভী
  • দলের জন্য বোলিং করতেও রাজি মুশফিক
  • শিশু জিহাদের মৃত্যু: চার জনের ১০ বছর করে কারাদণ্ড
  • অবশেষে বাড়ি অবরুদ্ধ করে রাখা সেই দেয়াল ভেঙ্গে ফেলা হচ্ছে
  • সাক্ষ্য দিলেন খাদিজা, চাইলেন বদরুলের সর্বোচ্চ শাস্তি
  • বদরুলের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিতে আদালতে খাদিজা
  • আজ বগুড়ায় যেসব প্রকল্প উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী
  • রোহিঙ্গা স্থানান্তরের সরকারি পরিকল্পনার সঙ্গে দ্বিমত মানবাধিকার কমিশনের
  • মহেশখালীতে ইয়াবা ব্যবসায়ীদের সঙ্গে পুলিশের ‘বন্দুকযুদ্ধ’
  • হোয়াইট হাউসে কাজ করার দীর্ঘ অভিজ্ঞতার কথা জানালেন এই বাংলাদেশি সাংবাদিক
Sunday, September 10, 2017 9:11 am
A- A A+ Print

রোহিঙ্গা সংকট : বাংলাদেশকে নৈতিক অবস্থান নিতে হবে

8

গত ২৫ আগস্ট থেকে যে ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয় ঘটে চলেছে, তাতে আমরা উদ্বিগ্ন, আতঙ্কিত। সীমান্তের ওপারে ঠিক নাফ নদীর এপাশ থেকে দেখা যাচ্ছে আগুন। রোহিঙ্গা পল্লিতে আগুন। মিয়ানমার সরকারের নেতৃত্বে রয়েছেন শান্তিতে নোবেল পুরস্কার পাওয়া অং সান সু চি। অথচ তাঁর রাজত্বকালে এমন সহিংসতা!

গণতন্ত্রের জন্য সংগ্রামের কারণে গৃহবন্দী থাকা অবস্থায় তিনি যুক্তরাষ্ট্র ও পাশ্চাত্যের অনুগ্রহের কারণে শান্তির জন্য নোবেল পুরস্কার পেয়েছিলেন। গত জানুয়ারি মাসে বিবিসির কাছে সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন যে আরাকানে বৌদ্ধ জনগোষ্ঠী নাকি সংকুচিত হয়ে পড়ছে। সে জন্যই কি রোহিঙ্গাদের বিতাড়ন, যারা ধর্মের দিক দিয়ে মুসলমান? অথচ রোহিঙ্গারা বা ধর্মীয় মুসলমান সম্প্রদায় আরাকান প্রদেশের (যার অপর নাম রাখাইন) সংখ্যালঘু। ১৪ লাখ রোহিঙ্গার বাস সেখানে। ইতিমধ্যে অনেককে বিতাড়িত করে বাংলাদেশে পাঠানো হয়েছে।

এই বিতাড়নের প্রক্রিয়ায় গত বছরের অক্টোবর মাসে এসেছিল প্রায় ৮০ হাজার। গত ২৫ আগস্ট থেকে ফের শরণার্থীদের ঢল। রোহিঙ্গা অধ্যুষিত গ্রামগুলোতে কী হচ্ছে, তা ঠিক বোঝা যাচ্ছে না। কারণ সেখানে সাংবাদিকদের যাওয়া নিষেধ। এমনকি ত্রাণকর্মীরাও যেতে পারেন না। কিন্তু সীমান্তের এপার থেকে দেখছি, নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য ছুটে আসছে মানুষ। এবার যারা আসছে, তার মধ্যে অধিকাংশই নারী, শিশু ও বৃদ্ধ। এর কারণ, যুবক পুরুষদের মিয়ানমারের সেনাবাহিনী ইতিপূর্বেই হত্যা করেছে। এ খবর লন্ডনের সাপ্তাহিক অবজারভার–এর।

প্রাণ বাঁচানোর জন্য পাশের দেশ থেকে যে মানুষ আসবে, তাকে আশ্রয় দেওয়া আমাদের নৈতিক ও মানবিক কর্তব্য। রোহিঙ্গারা আগেও এসেছে। আমরাও একসময় বর্বর পাকিস্তানিদের নৃশংসতা থেকে নিজেদের রক্ষা করতে একদিকে যেমন অস্ত্র হাতে তুলে নিয়েছিলাম, তেমনি আমাদের দেশের ২ কোটি মানুষ পাশের দেশ ভারতে আশ্রয় নিয়েছিল। আশ্রয় চেয়ে রোহিঙ্গারা যখন বাংলাদেশে প্রবেশ করে, তখন আমাদের পক্ষে অতীতটা ভুলে যাওয়া কঠিন। সেদিন যদি ভারত সীমান্ত খুলে না দিত, তাহলে কী হতো? হ্যাঁ, বাংলাদেশে এবার বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দেওয়া হয়েছে, এটি সত্য। আবার আশ্রয়প্রার্থী বিপুলসংখ্যককে নাফ নদীর এপারে ভিড়তে না দেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে।

আমি আরও অবাক হয়েছি, যখন জানতে পারলাম যে বাংলাদেশ আর মিয়ানমার যৌথভাবে সীমান্তে সামরিক অভিযান পরিচালনা করবে উগ্র ইসলামি জঙ্গিদের বিরুদ্ধে। মিয়ানমার সরকার যে গণহত্যা চালাচ্ছে, তার কারণ হিসেবে তারা বলছে, তারা নাকি ইসলামি জঙ্গি বিদ্রোহীদের দমন করছে। তাহলে তো বাংলাদেশ ও মিয়ানমার উভয়ের একই উদ্দেশ্য। গত ৩১ আগস্ট ঢাকায় সিপিবি-বাসদের এক সভায় যথার্থই বলা হয়েছে, ‘আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ও শরণার্থী সংকট মোকাবিলার জন্য বাংলাদেশ সরকারের উচিত ছিল কূটনৈতিক পদক্ষেপ জোরদার করা। তা না করে সরকার মিয়ানমারের সঙ্গে যৌথ সামরিক অভিযানের প্রস্তাব দিয়েছে। সরকারের এই প্রস্তাব নিন্দনীয়। এই পদক্ষেপ চলমান জাতিগত নিপীড়ন ও গণহত্যায় প্রচ্ছন্ন মদদ জোগাবে।’

হায়দার আকবর খান রনো : আমি আরও দুঃখিত ও বিস্মিত হয়েছি, যখন দেখি, প্রগতিশীল মহলের কেউ কেউ কোনো কোনো খবরের কাগজে কলাম লিখে রোহিঙ্গাভীতি তৈরি করছেন। রোহিঙ্গা সমস্যা বাংলাদেশের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। কিন্তু তার চেয়েও বড় বিপদ নাকি রোহিঙ্গারা ইসলামি জঙ্গিবাদের শক্তি জোগাবে। সু চিও কিন্তু একই কথা বলছেন। ওরা মুসলমান। ওরা ইসলামি জঙ্গিবাদী। ওরা রাখাইন প্রদেশে বৌদ্ধদের তুলনায় সংখ্যায় বেশি হয়ে পড়তে পারে ইত্যাদি। লক্ষণীয় যে কফি আনান কমিশনেও কিন্তু রোহিঙ্গাদের রোহিঙ্গা বা বাঙালি বলে অভিহিত না করে ‘মুসলমান’ বলে চিহ্নিত করা হয়েছে। শান্তির জন্য নোবেল বিজয়ী অং সান সু চি সাম্প্রদায়িক কার্ড খেলছেন। অন্যদিকে প্রগতির নামে আমরা যদি রোহিঙ্গাদের ইসলামি জঙ্গিবাদী বলে চিহ্নিত করি, তবে তা হবে তথাকথিত প্রগতির নামে চরম প্রতিক্রিয়াশীলতা।

এ কথা ঠিক যে একসময় জিয়াউর রহমান ও পরে জামায়াত রোহিঙ্গাদের ব্যবহার করেছিল। কিন্তু এখন তাদের ব্যবহার করছেন সরকারদলীয় প্রভাবশালী ব্যক্তিরা। সম্প্রতি প্রথম আলোর পাতায় সাংবাদিক কামাল আহমেদ রোহিঙ্গা ইস্যু প্রসঙ্গে পরপর দুটি প্রতিবেদন লিখেছেন। ৫ সেপ্টেম্বরের সংখ্যায় তিনি লিখেছেন, ‘রাজনৈতিক অঙ্গনে অভিযোগ আছে যে এই আরাকান সলিডারিটি অর্গানাইজেশনের সঙ্গে ইসলামপন্থী রাজনৈতিক দল জামায়াতে ইসলামীর যোগসূত্র রয়েছে। তবে বিস্ময়করভাবে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের স্বীকৃত ও অঘোষিত আশ্রয়শিবিরগুলোর প্রাধান্য রয়েছে যে কক্সবাজার জেলায়, সেখানে স্থানীয় আওয়ামী লীগের সাংসদের বিরুদ্ধে রোহিঙ্গাদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দেওয়ার অভিযোগ সুবিদিত। এমনকি স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের বিরুদ্ধে অবৈধভাবে বসবাসরত রোহিঙ্গাদের ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্তি ও পাসপোর্ট পাওয়ায় সহায়তা করার অভিযোগও অনেক দিনের পুরোনো।’

অভিযোগ আরও আছে। রোহিঙ্গাদের মাধ্যমে নাকি ইয়াবা ব্যবসা চলে। আশ্রয়হীন অসহায় মানুষ নানা দুষ্টচক্রের খপ্পরে পড়তে পারে। কিন্তু ইয়াবা ব্যবসার জন্য শরণার্থীরা দায়ী নয়। দায়ী আমার দেশের প্রভাবশালী ব্যক্তিরা। দলে দলে রোহিঙ্গারা এলে সমস্যা তো কিছু হবেই। আমরা যখন ভারতে গিয়েছিলাম, তখন ভারতেও সমস্যা তৈরি হয়েছিল। শুধু অর্থনৈতিক চাপই নয়, নানা ধরনের ঝুঁকিও ছিল।

অতীতে বাংলাদেশ সরকার মিয়ানমারের সঙ্গে অস্ত্র ও মাদক পাচার রোধে কাজ করবে বলে কথা উঠেছিল। কিন্তু এবারই প্রথম দেখা গেল, ইসলামি জঙ্গিসহ উগ্রপন্থীদের বিরুদ্ধে যৌথভাবে অভিযান পরিচালনার প্রস্তাব দিয়েছে বাংলাদেশ সরকার। কবে এসেছে এই প্রস্তাব? গত ২৮ আগস্ট। কিন্তু তার মাত্র দুই দিন আগেই ২৫ আগস্ট মিয়ানমারের সৈন্যবাহিনী রোহিঙ্গাদের ওপর নতুন করে হত্যাযজ্ঞ শুরু করে। বাংলাদেশ সরকারের এই প্রস্তাবের তাৎপর্য কী? এটা কি এককভাবে মিয়ানমার সরকারের রোহঙ্গা পীড়নকে উৎসাহিত করবে না?

রোহিঙ্গারা মুসলমান বলে বিতাড়িত হচ্ছে। বিভিন্ন মুসলিম দেশের ভূমিকা কী? তারা কেন শরণার্থীদের আশ্রয় দিচ্ছে না? এ এক বিরাট প্রশ্ন বটে। আমরা দেখেছি, সিরিয়া থেকে আসা শরণার্থীদের ইউরোপের বিভিন্ন দেশ আশ্রয় দিয়েছে। ইউরোপীয় সরকারগুলো প্রথমে আশ্রয় দিতে চায়নি। পথ রুদ্ধ করে রেখেছিল। পরে জনমতের চাপে তারা বাধ্য হয় শরণার্থী গ্রহণ করতে। রোহিঙ্গা প্রশ্নে সেই আন্তর্জাতিক তৎপরতা কোথায়? বাংলাদেশই বা তেমন জোরের সঙ্গে রোহিঙ্গা নিধনের বিরুদ্ধে বিশ্ব জনমত তৈরি করছে না কেন?

এর একটা কারণ হতে পারে এই যে পৃথিবীর বড় শক্তিগুলো কেউই মিয়ানমারকে চটাতে চায় না। মার্কিন প্রশাসনের সমর্থন ছিল বলেই অং সান সু চি নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন বলে অনেকে মনে করেন। তা ছাড়া চীনের সঙ্গে মিয়ানমারের দীর্ঘদিনের সুসম্পর্ক। ভারতও প্রতিযোগিতায় নেমেছে, কতটা ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তৈরি করতে পারে। ভারত-চীন উভয়েরই নজর রয়েছে প্রকৃতিক ও খনিজ সম্পদে সমৃদ্ধ মিয়ানমারের দিকে। ভূরাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থই কি মানবিকতার ঊর্ধ্বে স্থান পাচ্ছে?

হ্যাঁ, বর্তমান বিশ্বে এটাই হয়ে আসছে। তবে ক্ষমতাসীনদের স্বার্থসিদ্ধির বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে লড়াই করে সাধারণ মানুষ, পাশ্চাত্যের ধনী দেশ অথবা উন্নয়নশীল দেশ—সব দেশেরই সাধারণ মানুষ। আমরা এখনো ভরসা করব পৃথিবীর সংবেদনশীল মানুষের ওপর। কিন্তু সেই মানুষের কাছে সঠিক বার্তাটা পৌঁছানো দরকার। সে দায়িত্ব প্রধানত বাংলাদেশ সরকারের। সরকার যদি ইসলামি জঙ্গি দমনের নামে যৌথ অভিযান চালায় অথবা কোনো কোনো বিভ্রান্ত প্রগতিশীল ব্যক্তি রোহিঙ্গাদের সঙ্গে ইসলামি জঙ্গি সংযোগ আছে বলে ভীতির সঞ্চার করেন, তবে বিশ্ববাসীর কাছে ভুল বার্তা যাবে।

রোহিঙ্গা গণহত্যা বন্ধে সরকারকে নৈতিক অবস্থান নিতে হবে। বিশ্ব জনমত তৈরি করতে হবে এবং তা খুব দ্রুত জরুরি ভিত্তিতে করা আবশ্যক।

হায়দার আকবর খান রনোরাজনৈতিক বিশ্লেষক সভাপতিমণ্ডলীর সদস্যবাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি

Comments

Comments!

 রোহিঙ্গা সংকট : বাংলাদেশকে নৈতিক অবস্থান নিতে হবেAmarbangladeshonlineAmarbangladeshonline | Amarbangladeshonline

রোহিঙ্গা সংকট : বাংলাদেশকে নৈতিক অবস্থান নিতে হবে

Sunday, September 10, 2017 9:11 am
8

গত ২৫ আগস্ট থেকে যে ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয় ঘটে চলেছে, তাতে আমরা উদ্বিগ্ন, আতঙ্কিত। সীমান্তের ওপারে ঠিক নাফ নদীর এপাশ থেকে দেখা যাচ্ছে আগুন। রোহিঙ্গা পল্লিতে আগুন। মিয়ানমার সরকারের নেতৃত্বে রয়েছেন শান্তিতে নোবেল পুরস্কার পাওয়া অং সান সু চি। অথচ তাঁর রাজত্বকালে এমন সহিংসতা!

গণতন্ত্রের জন্য সংগ্রামের কারণে গৃহবন্দী থাকা অবস্থায় তিনি যুক্তরাষ্ট্র ও পাশ্চাত্যের অনুগ্রহের কারণে শান্তির জন্য নোবেল পুরস্কার পেয়েছিলেন। গত জানুয়ারি মাসে বিবিসির কাছে সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন যে আরাকানে বৌদ্ধ জনগোষ্ঠী নাকি সংকুচিত হয়ে পড়ছে। সে জন্যই কি রোহিঙ্গাদের বিতাড়ন, যারা ধর্মের দিক দিয়ে মুসলমান? অথচ রোহিঙ্গারা বা ধর্মীয় মুসলমান সম্প্রদায় আরাকান প্রদেশের (যার অপর নাম রাখাইন) সংখ্যালঘু। ১৪ লাখ রোহিঙ্গার বাস সেখানে। ইতিমধ্যে অনেককে বিতাড়িত করে বাংলাদেশে পাঠানো হয়েছে।

এই বিতাড়নের প্রক্রিয়ায় গত বছরের অক্টোবর মাসে এসেছিল প্রায় ৮০ হাজার। গত ২৫ আগস্ট থেকে ফের শরণার্থীদের ঢল। রোহিঙ্গা অধ্যুষিত গ্রামগুলোতে কী হচ্ছে, তা ঠিক বোঝা যাচ্ছে না। কারণ সেখানে সাংবাদিকদের যাওয়া নিষেধ। এমনকি ত্রাণকর্মীরাও যেতে পারেন না। কিন্তু সীমান্তের এপার থেকে দেখছি, নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য ছুটে আসছে মানুষ। এবার যারা আসছে, তার মধ্যে অধিকাংশই নারী, শিশু ও বৃদ্ধ। এর কারণ, যুবক পুরুষদের মিয়ানমারের সেনাবাহিনী ইতিপূর্বেই হত্যা করেছে। এ খবর লন্ডনের সাপ্তাহিক অবজারভার–এর।

প্রাণ বাঁচানোর জন্য পাশের দেশ থেকে যে মানুষ আসবে, তাকে আশ্রয় দেওয়া আমাদের নৈতিক ও মানবিক কর্তব্য। রোহিঙ্গারা আগেও এসেছে। আমরাও একসময় বর্বর পাকিস্তানিদের নৃশংসতা থেকে নিজেদের রক্ষা করতে একদিকে যেমন অস্ত্র হাতে তুলে নিয়েছিলাম, তেমনি আমাদের দেশের ২ কোটি মানুষ পাশের দেশ ভারতে আশ্রয় নিয়েছিল। আশ্রয় চেয়ে রোহিঙ্গারা যখন বাংলাদেশে প্রবেশ করে, তখন আমাদের পক্ষে অতীতটা ভুলে যাওয়া কঠিন। সেদিন যদি ভারত সীমান্ত খুলে না দিত, তাহলে কী হতো? হ্যাঁ, বাংলাদেশে এবার বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দেওয়া হয়েছে, এটি সত্য। আবার আশ্রয়প্রার্থী বিপুলসংখ্যককে নাফ নদীর এপারে ভিড়তে না দেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে।

আমি আরও অবাক হয়েছি, যখন জানতে পারলাম যে বাংলাদেশ আর মিয়ানমার যৌথভাবে সীমান্তে সামরিক অভিযান পরিচালনা করবে উগ্র ইসলামি জঙ্গিদের বিরুদ্ধে। মিয়ানমার সরকার যে গণহত্যা চালাচ্ছে, তার কারণ হিসেবে তারা বলছে, তারা নাকি ইসলামি জঙ্গি বিদ্রোহীদের দমন করছে। তাহলে তো বাংলাদেশ ও মিয়ানমার উভয়ের একই উদ্দেশ্য। গত ৩১ আগস্ট ঢাকায় সিপিবি-বাসদের এক সভায় যথার্থই বলা হয়েছে, ‘আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ও শরণার্থী সংকট মোকাবিলার জন্য বাংলাদেশ সরকারের উচিত ছিল কূটনৈতিক পদক্ষেপ জোরদার করা। তা না করে সরকার মিয়ানমারের সঙ্গে যৌথ সামরিক অভিযানের প্রস্তাব দিয়েছে। সরকারের এই প্রস্তাব নিন্দনীয়।
এই পদক্ষেপ চলমান জাতিগত নিপীড়ন ও গণহত্যায় প্রচ্ছন্ন মদদ জোগাবে।’

হায়দার আকবর খান রনো : আমি আরও দুঃখিত ও বিস্মিত হয়েছি, যখন দেখি, প্রগতিশীল মহলের কেউ কেউ কোনো কোনো খবরের কাগজে কলাম লিখে রোহিঙ্গাভীতি তৈরি করছেন। রোহিঙ্গা সমস্যা বাংলাদেশের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। কিন্তু তার চেয়েও বড় বিপদ নাকি রোহিঙ্গারা ইসলামি জঙ্গিবাদের শক্তি জোগাবে। সু চিও কিন্তু একই কথা বলছেন। ওরা মুসলমান। ওরা ইসলামি জঙ্গিবাদী। ওরা রাখাইন প্রদেশে বৌদ্ধদের তুলনায় সংখ্যায় বেশি হয়ে পড়তে পারে ইত্যাদি। লক্ষণীয় যে কফি আনান কমিশনেও কিন্তু রোহিঙ্গাদের রোহিঙ্গা বা বাঙালি বলে অভিহিত না করে ‘মুসলমান’ বলে চিহ্নিত করা হয়েছে। শান্তির জন্য নোবেল বিজয়ী অং সান সু চি সাম্প্রদায়িক কার্ড খেলছেন। অন্যদিকে প্রগতির নামে আমরা যদি রোহিঙ্গাদের ইসলামি জঙ্গিবাদী বলে চিহ্নিত করি, তবে তা হবে তথাকথিত প্রগতির নামে চরম প্রতিক্রিয়াশীলতা।

এ কথা ঠিক যে একসময় জিয়াউর রহমান ও পরে জামায়াত রোহিঙ্গাদের ব্যবহার করেছিল। কিন্তু এখন তাদের ব্যবহার করছেন সরকারদলীয় প্রভাবশালী ব্যক্তিরা। সম্প্রতি প্রথম আলোর পাতায় সাংবাদিক কামাল আহমেদ রোহিঙ্গা ইস্যু প্রসঙ্গে পরপর দুটি প্রতিবেদন লিখেছেন। ৫ সেপ্টেম্বরের সংখ্যায় তিনি লিখেছেন, ‘রাজনৈতিক অঙ্গনে অভিযোগ আছে যে এই আরাকান সলিডারিটি অর্গানাইজেশনের সঙ্গে ইসলামপন্থী রাজনৈতিক দল জামায়াতে ইসলামীর যোগসূত্র রয়েছে। তবে বিস্ময়করভাবে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের স্বীকৃত ও অঘোষিত আশ্রয়শিবিরগুলোর প্রাধান্য রয়েছে যে কক্সবাজার জেলায়, সেখানে স্থানীয় আওয়ামী লীগের সাংসদের বিরুদ্ধে রোহিঙ্গাদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দেওয়ার অভিযোগ সুবিদিত। এমনকি স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের বিরুদ্ধে অবৈধভাবে বসবাসরত রোহিঙ্গাদের ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্তি ও পাসপোর্ট পাওয়ায় সহায়তা করার অভিযোগও অনেক দিনের পুরোনো।’

অভিযোগ আরও আছে। রোহিঙ্গাদের মাধ্যমে নাকি ইয়াবা ব্যবসা চলে। আশ্রয়হীন অসহায় মানুষ নানা দুষ্টচক্রের খপ্পরে পড়তে পারে। কিন্তু ইয়াবা ব্যবসার জন্য শরণার্থীরা দায়ী নয়। দায়ী আমার দেশের প্রভাবশালী ব্যক্তিরা। দলে দলে রোহিঙ্গারা এলে সমস্যা তো কিছু হবেই। আমরা যখন ভারতে গিয়েছিলাম, তখন ভারতেও সমস্যা তৈরি হয়েছিল। শুধু অর্থনৈতিক চাপই নয়, নানা ধরনের ঝুঁকিও ছিল।

অতীতে বাংলাদেশ সরকার মিয়ানমারের সঙ্গে অস্ত্র ও মাদক পাচার রোধে কাজ করবে বলে কথা উঠেছিল। কিন্তু এবারই প্রথম দেখা গেল, ইসলামি জঙ্গিসহ উগ্রপন্থীদের বিরুদ্ধে যৌথভাবে অভিযান পরিচালনার প্রস্তাব দিয়েছে বাংলাদেশ সরকার। কবে এসেছে এই প্রস্তাব? গত ২৮ আগস্ট। কিন্তু তার মাত্র দুই দিন আগেই ২৫ আগস্ট মিয়ানমারের সৈন্যবাহিনী রোহিঙ্গাদের ওপর নতুন করে হত্যাযজ্ঞ শুরু করে। বাংলাদেশ সরকারের এই প্রস্তাবের তাৎপর্য কী? এটা কি এককভাবে মিয়ানমার সরকারের রোহঙ্গা পীড়নকে উৎসাহিত করবে না?

রোহিঙ্গারা মুসলমান বলে বিতাড়িত হচ্ছে। বিভিন্ন মুসলিম দেশের ভূমিকা কী? তারা কেন শরণার্থীদের আশ্রয় দিচ্ছে না? এ এক বিরাট প্রশ্ন বটে। আমরা দেখেছি, সিরিয়া থেকে আসা শরণার্থীদের ইউরোপের বিভিন্ন দেশ আশ্রয় দিয়েছে। ইউরোপীয় সরকারগুলো প্রথমে আশ্রয় দিতে চায়নি। পথ রুদ্ধ করে রেখেছিল। পরে জনমতের চাপে তারা বাধ্য হয় শরণার্থী গ্রহণ করতে। রোহিঙ্গা প্রশ্নে সেই আন্তর্জাতিক তৎপরতা কোথায়? বাংলাদেশই বা তেমন জোরের সঙ্গে রোহিঙ্গা নিধনের বিরুদ্ধে বিশ্ব জনমত তৈরি করছে না কেন?

এর একটা কারণ হতে পারে এই যে পৃথিবীর বড় শক্তিগুলো কেউই মিয়ানমারকে চটাতে চায় না। মার্কিন প্রশাসনের সমর্থন ছিল বলেই অং সান সু চি নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন বলে অনেকে মনে করেন। তা ছাড়া চীনের সঙ্গে মিয়ানমারের দীর্ঘদিনের সুসম্পর্ক। ভারতও প্রতিযোগিতায় নেমেছে, কতটা ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তৈরি করতে পারে। ভারত-চীন উভয়েরই নজর রয়েছে প্রকৃতিক ও খনিজ সম্পদে সমৃদ্ধ মিয়ানমারের দিকে। ভূরাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থই কি মানবিকতার ঊর্ধ্বে স্থান পাচ্ছে?

হ্যাঁ, বর্তমান বিশ্বে এটাই হয়ে আসছে। তবে ক্ষমতাসীনদের স্বার্থসিদ্ধির বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে লড়াই করে সাধারণ মানুষ, পাশ্চাত্যের ধনী দেশ অথবা উন্নয়নশীল দেশ—সব দেশেরই সাধারণ মানুষ। আমরা এখনো ভরসা করব পৃথিবীর সংবেদনশীল মানুষের ওপর। কিন্তু সেই মানুষের কাছে সঠিক বার্তাটা পৌঁছানো দরকার। সে দায়িত্ব প্রধানত বাংলাদেশ সরকারের। সরকার যদি ইসলামি জঙ্গি দমনের নামে যৌথ অভিযান চালায় অথবা কোনো কোনো বিভ্রান্ত প্রগতিশীল ব্যক্তি রোহিঙ্গাদের সঙ্গে ইসলামি জঙ্গি সংযোগ আছে বলে ভীতির সঞ্চার করেন, তবে বিশ্ববাসীর কাছে ভুল বার্তা যাবে।

রোহিঙ্গা গণহত্যা বন্ধে সরকারকে নৈতিক অবস্থান নিতে হবে। বিশ্ব জনমত তৈরি করতে হবে এবং তা খুব দ্রুত জরুরি ভিত্তিতে করা আবশ্যক।

হায়দার আকবর খান রনোরাজনৈতিক বিশ্লেষক সভাপতিমণ্ডলীর সদস্যবাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি

Comments

comments

সম্পাদক : মোহাম্মদ আবদুল বাছির
প্রকাশক: মোহাম্মদ জহিরুল ইসলাম
ফোন : ‎০১৭১৩৪০৯০৯০
৩৪৫/১, দিলু রোড, নিউ ইস্কাটন, ঢাকা-১০০০
X
 
নিয়মিত খবর পড়তে আমাদের ফেসবুক পেজে লাইক দিয়ে যুক্ত থাকুন
X