শনিবার, ২৪শে ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ ইং, ১২ই ফাল্গুন, ১৪২৪ বঙ্গাব্দ, রাত ৩:৫৭
শিরোনাম
  • ঘৃণাকে বিজয়ী হতে দেয়া যাবে না, ট্রাম্পকে ইঙ্গিত করে জর্জ ক্লুনি
  • আমার একটাই চিন্তা দেশের মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন করা: প্রধানমন্ত্রী
  • ‘কেন্দ্রীয় সরকারের আগ্রাসী নীতির কারণে কাশ্মীরকে হারাতে হবে’
  • সাড়ে চারমাস পর মুখোমুখি, খাদিজাকে উদ্দেশ্য করে যা বলল বদরুল
  • খালেদার ‘সাজা’ বিরোধী নেতাকর্মীদের মনোবল ভাঙ্গার কৌশল!
  • বিএনপির কর্মসূচি ‘যথাসময়ে’ জানানো হবে: রিজভী
  • দলের জন্য বোলিং করতেও রাজি মুশফিক
  • শিশু জিহাদের মৃত্যু: চার জনের ১০ বছর করে কারাদণ্ড
  • অবশেষে বাড়ি অবরুদ্ধ করে রাখা সেই দেয়াল ভেঙ্গে ফেলা হচ্ছে
  • সাক্ষ্য দিলেন খাদিজা, চাইলেন বদরুলের সর্বোচ্চ শাস্তি
  • বদরুলের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিতে আদালতে খাদিজা
  • আজ বগুড়ায় যেসব প্রকল্প উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী
  • রোহিঙ্গা স্থানান্তরের সরকারি পরিকল্পনার সঙ্গে দ্বিমত মানবাধিকার কমিশনের
  • মহেশখালীতে ইয়াবা ব্যবসায়ীদের সঙ্গে পুলিশের ‘বন্দুকযুদ্ধ’
  • হোয়াইট হাউসে কাজ করার দীর্ঘ অভিজ্ঞতার কথা জানালেন এই বাংলাদেশি সাংবাদিক
Friday, May 5, 2017 11:30 am
A- A A+ Print

সাক্ষীর অভাবে বিচার হয় না :আসামি, ভুক্তভোগীর শুধুই অপেক্ষা

13

দেশের ৬৮টি কারাগারে বিচারাধীন মামলার ৬৩০ জন আসামি ৫ থেকে ১৪ বছর ধরে বন্দী আছেন। তাঁদের বিরুদ্ধে ৯১৮টি মামলা বিচারাধীন। দিনের পর দিন তাঁরা আদালতে হাজিরা দিচ্ছেন, কিন্তু মামলার বিচার আর শেষ হচ্ছে না। ভুক্তভোগী ব্যক্তি ও আইনজীবীরা বলছেন, সময়মতো সাক্ষী না আসায় এসব মামলার বিচার আটকে যাচ্ছে। ফলে বিচারের দীর্ঘসূত্রতার শিকার হয়ে বিনা বিচারে বন্দিজীবন কাটাতে হচ্ছে এসব অভিযুক্ত ব্যক্তিকে। পাশাপাশি অপরাধের শিকার পরিবারগুলোও বিচার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। ৯ বছর আগে রাজধানীর খিলগাঁওয়ে নিজ বাসায় খুন হন মেহেরুন্নেসা গার্লস স্কুল অ্যান্ড কলেজের প্রধান শিক্ষক মাহবুবা বেগম। ঢাকার বিশেষ জজ-৩ আদালতে বিচারাধীন এই হত্যা মামলার সাক্ষীদের আদালতে হাজির না করায় বিচার থমকে আছে। মাহবুবা বেগমের ভাই ও বাদী শেখ আবদুর রহিম প্রথম আলোকে বলেন, কয়েক বছর আগে তিনি আদালতে সাক্ষ্য দিয়ে এসেছেন। অথচ অন্য সাক্ষীদের আদালতে হাজির করা হচ্ছে না। যে কারণে খুনের এত বছর পরও বিচার পাচ্ছেন না তিনি। প্রথম আলোর অনুসন্ধানে দেখা গেছে, যেসব মামলার সাক্ষী আসছে না, সেগুলোর বেশির ভাগই খুন, ডাকাতি, ধর্ষণ, ধর্ষণসহ হত্যা, অস্ত্র ও ছিনতাইয়ের মামলা। মারাত্মক অপরাধের এসব মামলায় সহজে কেউ সাক্ষ্য দিতে চান না। আইন অনুসারে আদালতের আদেশের পর সাক্ষী হাজির করার দায়িত্ব পুলিশের। আর সাক্ষীর বিষয়টি নিশ্চিত করবে প্রসিকিউশন। কিন্তু এ দুই পক্ষের কাজের কোনো সমন্বয় নেই। জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল প্রথম আলোকে বলেন, ‘দীর্ঘদিনের পুরোনো মামলা ঢাকার আদালতে বিচারাধীন, তা আমাদের জানা আছে। যেসব সাক্ষী সাক্ষ্য দিচ্ছেন না, তাঁদের তালিকা তৈরি হচ্ছে। এ ব্যাপারে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।’

অনেক খুনের মামলায় বাদীপক্ষে থাকা জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মাহফুজ মিয়া প্রথম আলোকে বলেন, খুনের মামলায় পুলিশ সাক্ষী হাজির না করায় বছরের পর বছর এসব মামলার বিচার থমকে আছে। সাক্ষী না আসায় বিচারও শেষ হচ্ছে না। এতে নিহতের পরিবারের সদস্যদের মধ্যে চরম হতাশা তৈরি হচ্ছে।

সাবেক আইনমন্ত্রী ও সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী শফিক আহমেদ প্রথম আলোকে বলেন, এই অবস্থার পরিবর্তন করতে হলে ফৌজদারি কার্যবিধির সংশোধনী আনা জরুরি। সাক্ষী হাজির করা যাঁদের দায়িত্ব, তাঁরা যদি আদালতে সাক্ষী হাজির করতে না পারেন, তাহলে তাঁদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের বিধান ফৌজদারি কার্যবিধিতে সংযোজন করতে হবে। সাবেক এই আইনমন্ত্রী মনে করেন, সাক্ষী হাজির করার জন্য আলাদা সংস্থা গঠন করলে এ সমস্যা আর থাকবে না। কারণ, যাঁরা তদন্ত করেন, তাঁরাই আবার সাক্ষী হাজিরের দায়িত্বে থাকবেন, তা গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।

আদালতের নথিপত্রে দেখা গেছে, ১৪ বছর আগে মোহাম্মদপুরে একটি খুনের মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে আছেন হাছান নামের এক আসামি। ঢাকার চতুর্থ অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ আদালতে বিচারাধীন এ মামলার ১৮ জনের মধ্যে মাত্র ৫ জন সাক্ষীকে আদালতে হাজির করেছে রাষ্ট্রপক্ষ। এরপর আর সাক্ষী আসেননি। আট বছর আগে একটি অস্ত্র মামলায় গ্রেপ্তার আবদুর রাজ্জাককে কাশিমপুর কারাগার থেকে গত ১২ এপ্রিল ঢাকার ৭ নম্বর মহানগর বিশেষ ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়। শুনানির একপর্যায়ে আসামি রাজ্জাক আসামির কাঠগড়া থেকে বিচারকের উদ্দেশে বলেন, তাঁর কোনো আইনজীবী নেই। তাঁকে বছরের পর বছর কারাগার থেকে আদালতে হাজির করা হচ্ছে, কিন্তু বিচার শেষ হচ্ছে না। নথিতে দেখা গেছে, সাত বছর আগে বিচার শুরুর পর ১২ জনের মধ্যে মাত্র ১ জন সাক্ষীকে হাজির করা হয়েছে। রাজ্জাক পরে বলেন, তিনি যখন গ্রেপ্তার হন, তখন তাঁর মা-বাবা বেঁচে ছিলেন। এখন তাঁরা বেঁচে আছেন কি না, তা-ও জানেন না।

রাজ্জাকের মতো অস্ত্র মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে ১৬ বছর কারাগারে আছেন তপন ও মোবারক। ঢাকার ১ নম্বর অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ আদালতে বিচারাধীন মামলায় ১১ জনের মধ্যে মাত্র ২ জন সাক্ষ্য দিয়েছেন। সর্বশেষ সাক্ষ্য হয়েছে ২০১২ সালের ৩০ মে। গত ২১ মার্চ তাঁদের আদালতে হাজির করা হয়। একইভাবে ১৪ বছর ধরে বিস্ফোরক আইনের মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে আছেন আবুল কাশেম নামের এক আসামি। তাঁর মামলায় ১৩ বছরে মাত্র দুজন আদালতে সাক্ষ্য দিয়েছেন। ঢাকার ১ নম্বর অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ আদালতে বিচারাধীন আছে করিমের মামলা। তিনি বিস্ফোরক মামলার আসামি। ২০০১ সালে তিনি রাজধানীর কাফরুল এলাকা থেকে গ্রেপ্তার হন। ১৩ বছর আগে তাঁর মামলার বিচার শুরু হয়। এত বছরে মামলার ১০ জনের মধ্যে মাত্র ৪ জন আদালতে সাক্ষ্য দেন। একই আদালতে খোকন সাহার অস্ত্র মামলা বিচারাধীন। তিনিও ১৬ বছর আগে গ্রেপ্তার হন। তাঁর মামলাতেও মাত্র ৩ জন আদালতে সাক্ষ্য দিয়েছেন। ২০০৩ সালের আগের একটি খুনের মামলায় ১৩ বছর আগে গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে আছেন আলমগীর হোসেন। তাঁর মামলাতেও ২৯ জন সাক্ষীর মধ্যে মাত্র ২ জনের সাক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। একটি খুনের মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে ছয় বছর ধরে কারাগারে আছেন সজীব, বাবু ও মামুন। ১৯ জনের মধ্যে ৩ জনের সাক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। খুনের মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে সাত বছর ধরে কারাগারে থাকা সোহেলের মামলারও একই অবস্থা। ঢাকার ১ নম্বর দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে বিচারাধীন মামলার ৩২ জন সাক্ষীর ১ জনকেও আদালতে হাজির করতে পারেনি রাষ্ট্রপক্ষ।

সাক্ষীর বিষয়টি নিশ্চিত না করার কারণ সম্পর্কে জানতে চাইলে ঢাকার মহানগর দায়রা জজ আদালতের প্রধান সরকারি কৌঁসুলি আবদুল্লাহ আবু প্রথম আলোকে বলেন, পুরোনো মামলায় যেসব আসামি গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে আছেন, তাঁদের মামলার অধিকাংশ সাক্ষী আদালতে আসেন না। সাক্ষীদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা দেওয়া হলেও সাক্ষী হাজির করানো হচ্ছে না। এ কারণে বিচারে বিলম্ব হচ্ছে।

জানতে চাইলে ঢাকা মহানগর পুলিশের গণমাধ্যম ও জনসংযোগ বিভাগের উপকমিশনার মাসুদুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, সাক্ষীর সমন পাওয়ার পর পুলিশ যথাসময়ে তা তামিল করে আদালতে সাক্ষী হাজির করছে। যেসব ক্ষেত্রে সাক্ষীদের তাঁদের ঠিকানায় পাওয়া যায় না, সেটা জানিয়ে প্রতিবেদন জমা দেওয়া হচ্ছে আদালতে।

কারা অধিদপ্তর থেকে পাওয়া তথ্যে দেখা গেছে, দীর্ঘসূত্রতার শিকার ৬৩০ জন বন্দীর মধ্যে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে আছেন ১৪ জন, কাশিমপুরের চারটি কারাগারে আছেন ১৩০ জন এবং চট্টগ্রামের কারাগারে আছেন ১০৯ জন। অন্য বন্দীরা দেশের কেন্দ্রীয় ও জেলা কারাগারে আছেন। এই বন্দীদের মধ্যে ৪০১ জন খুনের মামলার আসামি। অন্যরা অস্ত্র, ডাকাতি, বিস্ফোরক, ধর্ষণসহ নারী ও শিশু নির্যাতন মামলার আসামি। বন্দীদের মধ্যে ১২ বছরের বেশি সময় কারাগারে আছেন ৪৬ জন। এর বাইরে ৩ থেকে ৫ বছরের বন্দী আছেন ১ হাজার ৫৭২ জন, যাঁদের মামলার সাক্ষ্যও সময়মতো হচ্ছে না।

ঢাকা মহানগর ও ঢাকা জেলার মামলার মধ্যে বিচারাধীন মামলার ১৭৪ জন আসামি ৫ থেকে ১৮ বছর ধরে কারাগারে আছেন। পুরোনো মামলার তালিকার মধ্যে ৪০ বছরের ৩টি, ৩০ বছরের ১০টি, ১৮ বছরের ১৩১টি এবং ১২ বছরের বেশি ৩৫১টি খুনের মামলা বিচারাধীন আছে। এসব মামলার আসামির সংখ্যা জানা যায়নি।

জানতে চাইলে সহকারী কারা মহাপরিদর্শক আবদুল্লাহ আল মামুন প্রথম আলোকে বলেন, নিয়মিত সাক্ষী না আসায় অনেক বন্দীর মামলা বছরের পর বছর ঝুলে থাকে। এতে করে বন্দীরা মানসিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়েন। অনেকে মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেন।

ঢাকার আদালতে গিয়ে দেখা গেছে, পুরোনো মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে যেসব বন্দী বছরের পর বছর কারাগারে আটক আছেন, তাঁদের অধিকাংশেরই কোনো আইনজীবী নেই, তাই তাঁদের জামিনও হয় না। আবার অনেক বন্দী আছেন, যাঁরা পরিবার থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছেন। তাঁদের পরিবারের লোকজন তাঁদের খোঁজ নেন না। আদালত সূত্র জানায়, পুরোনো মামলায় আদালত থেকে সাক্ষীদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করার পরও পুলিশ অধিকাংশ সাক্ষীকে হাজির করতে পারছে না।

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী শাহদীন মালিক এ প্রসঙ্গে বলেন, যে বিচারব্যবস্থায় দোষী সাব্যস্ত না হয়েও আসামিদের দীর্ঘকাল কারাদণ্ড ভোগ করতে হচ্ছে, সেই বিচারব্যবস্থাকে কোনোভাবেই সভ্য দেশের বিচারব্যবস্থা বলা যায় না। আইন ও বিচারব্যবস্থায় মন্ত্রীসহ যাঁরা দায়িত্বে আছেন, এটা তাঁদের চরম ব্যর্থতা। তিনি আরও বলেন, জাতীয় আইনি সহায়তা কার্যক্রমের আওতায় এনে তাঁদের জন্য উপযুক্ত আইনজীবী নিয়োগ করে প্রয়োজনীয় আইনি সহায়তার ব্যবস্থা নেওয়া খুব জরুরি।

Comments

Comments!

 সাক্ষীর অভাবে বিচার হয় না :আসামি, ভুক্তভোগীর শুধুই অপেক্ষাAmarbangladeshonlineAmarbangladeshonline | Amarbangladeshonline

সাক্ষীর অভাবে বিচার হয় না :আসামি, ভুক্তভোগীর শুধুই অপেক্ষা

Friday, May 5, 2017 11:30 am
13

দেশের ৬৮টি কারাগারে বিচারাধীন মামলার ৬৩০ জন আসামি ৫ থেকে ১৪ বছর ধরে বন্দী আছেন। তাঁদের বিরুদ্ধে ৯১৮টি মামলা বিচারাধীন। দিনের পর দিন তাঁরা আদালতে হাজিরা দিচ্ছেন, কিন্তু মামলার বিচার আর শেষ হচ্ছে না। ভুক্তভোগী ব্যক্তি ও আইনজীবীরা বলছেন, সময়মতো সাক্ষী না আসায় এসব মামলার বিচার আটকে যাচ্ছে। ফলে বিচারের দীর্ঘসূত্রতার শিকার হয়ে বিনা বিচারে বন্দিজীবন কাটাতে হচ্ছে এসব অভিযুক্ত ব্যক্তিকে। পাশাপাশি অপরাধের শিকার পরিবারগুলোও বিচার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
৯ বছর আগে রাজধানীর খিলগাঁওয়ে নিজ বাসায় খুন হন মেহেরুন্নেসা গার্লস স্কুল অ্যান্ড কলেজের প্রধান শিক্ষক মাহবুবা বেগম। ঢাকার বিশেষ জজ-৩ আদালতে বিচারাধীন এই হত্যা মামলার সাক্ষীদের আদালতে হাজির না করায় বিচার থমকে আছে। মাহবুবা বেগমের ভাই ও বাদী শেখ আবদুর রহিম প্রথম আলোকে বলেন, কয়েক বছর আগে তিনি আদালতে সাক্ষ্য দিয়ে এসেছেন। অথচ অন্য সাক্ষীদের আদালতে হাজির করা হচ্ছে না। যে কারণে খুনের এত বছর পরও বিচার পাচ্ছেন না তিনি।

প্রথম আলোর অনুসন্ধানে দেখা গেছে, যেসব মামলার সাক্ষী আসছে না, সেগুলোর বেশির ভাগই খুন, ডাকাতি, ধর্ষণ, ধর্ষণসহ হত্যা, অস্ত্র ও ছিনতাইয়ের মামলা। মারাত্মক অপরাধের এসব মামলায় সহজে কেউ সাক্ষ্য দিতে চান না। আইন অনুসারে আদালতের আদেশের পর সাক্ষী হাজির করার দায়িত্ব পুলিশের। আর সাক্ষীর বিষয়টি নিশ্চিত করবে প্রসিকিউশন। কিন্তু এ দুই পক্ষের কাজের কোনো সমন্বয় নেই।
জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল প্রথম আলোকে বলেন, ‘দীর্ঘদিনের পুরোনো মামলা ঢাকার আদালতে বিচারাধীন, তা আমাদের জানা আছে। যেসব সাক্ষী সাক্ষ্য দিচ্ছেন না, তাঁদের তালিকা তৈরি হচ্ছে। এ ব্যাপারে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।’

অনেক খুনের মামলায় বাদীপক্ষে থাকা জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মাহফুজ মিয়া প্রথম আলোকে বলেন, খুনের মামলায় পুলিশ সাক্ষী হাজির না করায় বছরের পর বছর এসব মামলার বিচার থমকে আছে। সাক্ষী না আসায় বিচারও শেষ হচ্ছে না। এতে নিহতের পরিবারের সদস্যদের মধ্যে চরম হতাশা তৈরি হচ্ছে।

সাবেক আইনমন্ত্রী ও সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী শফিক আহমেদ প্রথম আলোকে বলেন, এই অবস্থার পরিবর্তন করতে হলে ফৌজদারি কার্যবিধির সংশোধনী আনা জরুরি। সাক্ষী হাজির করা যাঁদের দায়িত্ব, তাঁরা যদি আদালতে সাক্ষী হাজির করতে না পারেন, তাহলে তাঁদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের বিধান ফৌজদারি কার্যবিধিতে সংযোজন করতে হবে। সাবেক এই আইনমন্ত্রী মনে করেন, সাক্ষী হাজির করার জন্য আলাদা সংস্থা গঠন করলে এ সমস্যা আর থাকবে না। কারণ, যাঁরা তদন্ত করেন, তাঁরাই আবার সাক্ষী হাজিরের দায়িত্বে থাকবেন, তা গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।

আদালতের নথিপত্রে দেখা গেছে, ১৪ বছর আগে মোহাম্মদপুরে একটি খুনের মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে আছেন হাছান নামের এক আসামি। ঢাকার চতুর্থ অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ আদালতে বিচারাধীন এ মামলার ১৮ জনের মধ্যে মাত্র ৫ জন সাক্ষীকে আদালতে হাজির করেছে রাষ্ট্রপক্ষ। এরপর আর সাক্ষী আসেননি। আট বছর আগে একটি অস্ত্র মামলায় গ্রেপ্তার আবদুর রাজ্জাককে কাশিমপুর কারাগার থেকে গত ১২ এপ্রিল ঢাকার ৭ নম্বর মহানগর বিশেষ ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়। শুনানির একপর্যায়ে আসামি রাজ্জাক আসামির কাঠগড়া থেকে বিচারকের উদ্দেশে বলেন, তাঁর কোনো আইনজীবী নেই। তাঁকে বছরের পর বছর কারাগার থেকে আদালতে হাজির করা হচ্ছে, কিন্তু বিচার শেষ হচ্ছে না। নথিতে দেখা গেছে, সাত বছর আগে বিচার শুরুর পর ১২ জনের মধ্যে মাত্র ১ জন সাক্ষীকে হাজির করা হয়েছে। রাজ্জাক পরে বলেন, তিনি যখন গ্রেপ্তার হন, তখন তাঁর মা-বাবা বেঁচে ছিলেন। এখন তাঁরা বেঁচে আছেন কি না, তা-ও জানেন না।

রাজ্জাকের মতো অস্ত্র মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে ১৬ বছর কারাগারে আছেন তপন ও মোবারক। ঢাকার ১ নম্বর অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ আদালতে বিচারাধীন মামলায় ১১ জনের মধ্যে মাত্র ২ জন সাক্ষ্য দিয়েছেন। সর্বশেষ সাক্ষ্য হয়েছে ২০১২ সালের ৩০ মে। গত ২১ মার্চ তাঁদের আদালতে হাজির করা হয়। একইভাবে ১৪ বছর ধরে বিস্ফোরক আইনের মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে আছেন আবুল কাশেম নামের এক আসামি। তাঁর মামলায়
১৩ বছরে মাত্র দুজন আদালতে সাক্ষ্য দিয়েছেন। ঢাকার ১ নম্বর অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ আদালতে বিচারাধীন আছে করিমের মামলা। তিনি বিস্ফোরক মামলার আসামি। ২০০১ সালে তিনি রাজধানীর কাফরুল এলাকা থেকে গ্রেপ্তার হন। ১৩ বছর আগে তাঁর মামলার বিচার শুরু হয়। এত বছরে মামলার ১০ জনের মধ্যে মাত্র ৪ জন আদালতে সাক্ষ্য দেন। একই আদালতে খোকন সাহার অস্ত্র মামলা বিচারাধীন। তিনিও ১৬ বছর আগে গ্রেপ্তার হন। তাঁর মামলাতেও মাত্র ৩ জন আদালতে সাক্ষ্য দিয়েছেন। ২০০৩ সালের আগের একটি খুনের মামলায় ১৩ বছর আগে গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে আছেন আলমগীর হোসেন। তাঁর মামলাতেও ২৯ জন সাক্ষীর মধ্যে মাত্র ২ জনের সাক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। একটি খুনের মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে ছয় বছর ধরে কারাগারে আছেন সজীব, বাবু ও মামুন। ১৯ জনের মধ্যে ৩ জনের সাক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। খুনের মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে সাত বছর ধরে কারাগারে থাকা সোহেলের মামলারও একই অবস্থা। ঢাকার ১ নম্বর দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে বিচারাধীন মামলার ৩২ জন সাক্ষীর ১ জনকেও আদালতে হাজির করতে পারেনি রাষ্ট্রপক্ষ।

সাক্ষীর বিষয়টি নিশ্চিত না করার কারণ সম্পর্কে জানতে চাইলে ঢাকার মহানগর দায়রা জজ আদালতের প্রধান সরকারি কৌঁসুলি আবদুল্লাহ আবু প্রথম আলোকে বলেন, পুরোনো মামলায় যেসব আসামি গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে আছেন, তাঁদের মামলার অধিকাংশ সাক্ষী আদালতে আসেন না। সাক্ষীদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা দেওয়া হলেও সাক্ষী হাজির করানো হচ্ছে না। এ কারণে বিচারে বিলম্ব হচ্ছে।

জানতে চাইলে ঢাকা মহানগর পুলিশের গণমাধ্যম ও জনসংযোগ বিভাগের উপকমিশনার মাসুদুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, সাক্ষীর সমন পাওয়ার পর পুলিশ যথাসময়ে তা তামিল করে আদালতে সাক্ষী হাজির করছে। যেসব ক্ষেত্রে সাক্ষীদের তাঁদের ঠিকানায় পাওয়া যায় না, সেটা জানিয়ে প্রতিবেদন জমা দেওয়া হচ্ছে আদালতে।

কারা অধিদপ্তর থেকে পাওয়া তথ্যে দেখা গেছে, দীর্ঘসূত্রতার শিকার ৬৩০ জন বন্দীর মধ্যে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে আছেন ১৪ জন, কাশিমপুরের চারটি কারাগারে আছেন ১৩০ জন এবং চট্টগ্রামের কারাগারে আছেন ১০৯ জন। অন্য বন্দীরা দেশের কেন্দ্রীয় ও জেলা কারাগারে আছেন। এই বন্দীদের মধ্যে ৪০১ জন খুনের মামলার আসামি। অন্যরা অস্ত্র, ডাকাতি, বিস্ফোরক, ধর্ষণসহ নারী ও শিশু নির্যাতন মামলার আসামি। বন্দীদের মধ্যে ১২ বছরের বেশি সময় কারাগারে আছেন ৪৬ জন। এর বাইরে ৩ থেকে ৫ বছরের বন্দী আছেন ১ হাজার ৫৭২ জন, যাঁদের মামলার সাক্ষ্যও সময়মতো হচ্ছে না।

ঢাকা মহানগর ও ঢাকা জেলার মামলার মধ্যে বিচারাধীন মামলার ১৭৪ জন আসামি ৫ থেকে ১৮ বছর ধরে কারাগারে আছেন। পুরোনো মামলার তালিকার মধ্যে ৪০ বছরের ৩টি, ৩০ বছরের ১০টি, ১৮ বছরের ১৩১টি এবং ১২ বছরের বেশি ৩৫১টি খুনের মামলা বিচারাধীন আছে। এসব মামলার আসামির সংখ্যা জানা যায়নি।

জানতে চাইলে সহকারী কারা মহাপরিদর্শক আবদুল্লাহ আল মামুন প্রথম আলোকে বলেন, নিয়মিত সাক্ষী না আসায় অনেক বন্দীর মামলা বছরের পর বছর ঝুলে থাকে। এতে করে বন্দীরা মানসিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়েন। অনেকে মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেন।

ঢাকার আদালতে গিয়ে দেখা গেছে, পুরোনো মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে যেসব বন্দী বছরের পর বছর কারাগারে আটক আছেন, তাঁদের অধিকাংশেরই কোনো আইনজীবী নেই, তাই তাঁদের জামিনও হয় না। আবার অনেক বন্দী আছেন, যাঁরা পরিবার থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছেন। তাঁদের পরিবারের লোকজন তাঁদের খোঁজ নেন না। আদালত সূত্র জানায়, পুরোনো মামলায় আদালত থেকে সাক্ষীদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করার পরও পুলিশ অধিকাংশ সাক্ষীকে হাজির করতে পারছে না।

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী শাহদীন মালিক এ প্রসঙ্গে বলেন, যে বিচারব্যবস্থায় দোষী সাব্যস্ত না হয়েও আসামিদের দীর্ঘকাল কারাদণ্ড ভোগ করতে হচ্ছে, সেই বিচারব্যবস্থাকে কোনোভাবেই সভ্য দেশের বিচারব্যবস্থা বলা যায় না। আইন ও বিচারব্যবস্থায় মন্ত্রীসহ যাঁরা দায়িত্বে আছেন, এটা তাঁদের চরম ব্যর্থতা। তিনি আরও বলেন, জাতীয় আইনি সহায়তা কার্যক্রমের আওতায় এনে তাঁদের জন্য উপযুক্ত আইনজীবী নিয়োগ করে প্রয়োজনীয় আইনি সহায়তার ব্যবস্থা নেওয়া খুব জরুরি।

Comments

comments

সম্পাদক : মোহাম্মদ আবদুল বাছির
প্রকাশক: মোহাম্মদ জহিরুল ইসলাম
ফোন : ‎০১৭১৩৪০৯০৯০
৩৪৫/১, দিলু রোড, নিউ ইস্কাটন, ঢাকা-১০০০
X
 
নিয়মিত খবর পড়তে আমাদের ফেসবুক পেজে লাইক দিয়ে যুক্ত থাকুন
X