শুক্রবার, ২৩শে ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ ইং, ১১ই ফাল্গুন, ১৪২৪ বঙ্গাব্দ, রাত ৮:৫০
শিরোনাম
  • ঘৃণাকে বিজয়ী হতে দেয়া যাবে না, ট্রাম্পকে ইঙ্গিত করে জর্জ ক্লুনি
  • আমার একটাই চিন্তা দেশের মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন করা: প্রধানমন্ত্রী
  • ‘কেন্দ্রীয় সরকারের আগ্রাসী নীতির কারণে কাশ্মীরকে হারাতে হবে’
  • সাড়ে চারমাস পর মুখোমুখি, খাদিজাকে উদ্দেশ্য করে যা বলল বদরুল
  • খালেদার ‘সাজা’ বিরোধী নেতাকর্মীদের মনোবল ভাঙ্গার কৌশল!
  • বিএনপির কর্মসূচি ‘যথাসময়ে’ জানানো হবে: রিজভী
  • দলের জন্য বোলিং করতেও রাজি মুশফিক
  • শিশু জিহাদের মৃত্যু: চার জনের ১০ বছর করে কারাদণ্ড
  • অবশেষে বাড়ি অবরুদ্ধ করে রাখা সেই দেয়াল ভেঙ্গে ফেলা হচ্ছে
  • সাক্ষ্য দিলেন খাদিজা, চাইলেন বদরুলের সর্বোচ্চ শাস্তি
  • বদরুলের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিতে আদালতে খাদিজা
  • আজ বগুড়ায় যেসব প্রকল্প উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী
  • রোহিঙ্গা স্থানান্তরের সরকারি পরিকল্পনার সঙ্গে দ্বিমত মানবাধিকার কমিশনের
  • মহেশখালীতে ইয়াবা ব্যবসায়ীদের সঙ্গে পুলিশের ‘বন্দুকযুদ্ধ’
  • হোয়াইট হাউসে কাজ করার দীর্ঘ অভিজ্ঞতার কথা জানালেন এই বাংলাদেশি সাংবাদিক
Wednesday, September 7, 2016 9:52 am | আপডেটঃ September 07, 2016 9:56 AM
A- A A+ Print

সাদা মানুষেরা খেপে উঠেছে কেন?

০

হাসান ফেরদৌস ১৯১৬ সালে দ্বিতীয়বারের মতো আমেরিকায় বেড়াতে এসে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর জাতীয়তাবাদের বিপদ সম্পর্কে সাবধান করে দিয়েছিলেন। ঘরভর্তি সাদা মানুষের চোখে চোখ রেখে বলেছিলেন, ন্যাশনালিজম ইজ এ গ্রেট মেনেস। জাতীয়তাবাদ এক ভয়ংকর জিনিস; এই চেতনা মানুষে মানুষে দেশে দেশে বিভেদের দেয়াল তুলে দেয়। তিনি সাবধান করে বলেছিলেন, দেশপ্রেমের নামে যারা নৈতিকতার আইন বিস্মৃত হয়, একসময় তারা সহিংসতার আগুনে নিজেরাই জ্বলেপুড়ে মরবে। আমেরিকানদের ব্যাপারে রবীন্দ্রনাথের আস্থা ছিল; অন্য দেশের মানুষ এখানে এসে আশ্রয় পায়, সে কথা তিনি জানতেন। তাঁর ভয় ছিল ইউরোপকে নিয়ে। তাদের কথা মনে করেই তিনি বলেছিলেন, পশ্চিমা বিশ্বে যেখানে জাতীয়তাবাদ মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে, সেখানেই দেখি মিথ্যা অথবা অর্ধসত্য ব্যবহার করে অন্য জাতি ও সংস্কৃতির ব্যাপারে কাল্পনিক ও মিথ্যার মালা সাজিয়ে ঘৃণার বারুদ ছড়ানো হচ্ছে। এর ফলে মানবতার শুভবোধ কালিমাযুক্ত হচ্ছে। স্বার্থপরতা হয়ে উঠছে নতুন জাতীয় ধর্ম।

তাঁর সে ভাষণের প্রায় ১০০ বছর পর, নতুন সহস্রাব্দে এসে ভারত উপমহাদেশেরই আরেক বুদ্ধিজীবী একবাল আহমদ জাতীয়তাবাদের বিপদ সম্বন্ধে আমাদের সতর্ক করে দিয়েছিলেন আরও তীব্র ও প্রত্যক্ষ ভাষায় তাঁরটেররিজম, দেয়ারস অ্যান্ড আওয়ার্স গ্রন্থে। জাতীয়তাবাদের লক্ষ্যই হলো একদিকে নিজেকে মহান হিসেবে উপস্থাপন, অন্যদিকে ‘অপরকে’ ক্ষুদ্র করা, তাকে শত্রু হিসেবে প্রমাণ করা। একবাল আহমদ বলেছিলেন, জাতীয়তাবাদ তাই একই সঙ্গে দুই ধরনের মিথ্যা—নিজের ব্যাপারে ও অন্যের ব্যাপারে।

জাতীয়তাবাদ কেন বিপজ্জনক, আজকের আমেরিকার দিকে তাকালেই তা বোঝা যায়। রবীন্দ্রনাথের দেখা আমেরিকা আর ২০১৬ সালের আমেরিকা এক নয়। ডোনাল্ড ট্রাম্প নতুন যে আমেরিকার ছবি আঁকতে চাইছেন, তাতে ‘সবার আগে আমেরিকা’, ‘সবকিছুর আগে আমেরিকা’। এই জাতীয়তাবাদী আমেরিকায় শুধু তারা, অর্থাৎ এ দেশের খ্রিষ্টধর্মী সাদা মানুষেরা সৎ, কর্মঠ ও মহৎ। অন্য সবাই, বিশেষত অ-শ্বেতকায় বহিরাগত—তারা মেক্সিকো থেকে আসা বাদামি মানুষ অথবা মধ্যপ্রাচ্য, দক্ষিণ এশিয়া ও আফ্রিকা থেকে আসা ভিন্নধর্মী যা-ই হোক, এ দেশের মানুষের জন্য বিপদ ডেকে আনছে। তাদের ঠেকাতে হবে, সে জন্য দরকার পড়লে দক্ষিণের সঙ্গে শক্ত প্রাচীর তুলে দাও। মধ্যপ্রাচ্য থেকে মুসলিমদের আগমন নিষিদ্ধ করো; যারা ইতিমধ্যে এসে পড়েছে, তাদের ঘাড় ধরে বের করে দাও।

শুধু আমেরিকায় নয়, ‘অন্যের’ প্রতি এই ঘৃণা ও প্রত্যাখ্যান, এখন ইউরোপের অনেক দেশেই মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। বহিরাগতদের প্রবেশ ঠেকানোর নামে যুক্তরাজ্য ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে বেরিয়ে গেছে। পূর্ব ইউরোপীয় বিভিন্ন দেশে, যেমন হাঙ্গেরি, পোল্যান্ড ও বুলগেরিয়ায় নিজেদের বাইরে অন্য সব জাতি-ধর্ম-বর্ণের বিরুদ্ধে প্রবল জাত্যভিমান গড়ে উঠেছে। ফ্রান্স, যে একসময় নিজের উদারনৈতিক রাজনীতির জন্য সবার প্রশংসা কুড়িয়েছিল, সে এখন যেকোনো মূল্যে ‘ফরাসি মূল্যবোধ’ রক্ষার জন্য আইন তৈরি করছে। এমনকি জার্মানি, হিটলারের ক্লেদচিহ্ন মুছতে যে দেশ উদ্বাস্তুদের জন্য নিজের দরজা খুলে দিয়েছে, সেখানেও ‘বিদেশি খেদাও’ অভিযান শুরু হয়েছে ওই প্রবল জাত্যভিমান থেকেই। গত সপ্তাহেই চ্যান্সেলর ম্যার্কেলের দল জার্মানির পূর্বাঞ্চলে স্থানীয় নির্বাচনে দক্ষিণপন্থী ও জাতীয়তাবাদী দলের কাছে বেধড়ক মার খেয়েছে।

সর্বত্রই এই আন্দোলনের কেন্দ্রে রয়েছে অপেক্ষাকৃত কম শিক্ষিত ও নিম্নবিত্ত শ্রমিক এবং কর্মজীবীরা, যারা একসময় আওয়াজ তুলেছিল ‘দুনিয়ার শ্রমিক এক হও।’ আজ তারাই বলেছে বিদেশি খেদাও, নিজের ঘর আগে সামাল দাও।

আসলে হচ্ছেটা কী?

এই জাতীয়তাবাদী উন্মাদনার পেছনে রয়েছে বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক মন্দা। গত দুই দশকে তথাকথিত বিশ্বায়নের ফলে একদিকে একদল লোক আঙুল ফুলে কলাগাছ হয়েছে, অন্যদিকে সাধারণ মানুষ, যারা দু-দশ বছর আগেও ভদ্রগোছের জীবনযাপনে অভ্যস্ত ছিল—তারা ক্রমশ পিছিয়ে পড়ছে। একদিকে ১ শতাংশ ধনিক গোষ্ঠী, অন্যদিকে পিছিয়ে পড়া ৯৯ শতাংশ। এই দৃশ্য শুধু আমেরিকায় নয়, অধিকাংশ শিল্পোন্নত দেশে। যেখানে একসময় অর্থনীতির প্রাণশক্তি ছিল উৎপাদন খাত, এখন তার স্থান দখল করেছে নতুন ‘আর্থিক’ বা ফিন্যান্স খাত। কোনো কিছু না বানিয়ে, গায়ে-গতরে কাজ না করে অন্যের পয়সা এদিক-সেদিক করে মুনাফার বিশাল পাহাড় গড়ে তুলেছে একদল লোক।

এই ১ শতাংশই অধিক মুনাফার লোভে নিজ দেশের কলকারখানা তুলে নিয়ে বসাচ্ছে সস্তা শ্রমিক পাওয়া যায় এমন সব দেশে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, আমেরিকায় শিল্পশ্রমিকের জায়গায় গত আড়াই দশকে ৯৮ শতাংশ নতুন কর্ম সৃষ্টি হয়েছে এমন সব খাতে, যেখানে চাকরির জন্য কোনো বিশেষ দক্ষতার প্রয়োজন নেই। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বেতন মেলে সরকারের বেঁধে দেওয়া ঘণ্টাপ্রতি ন্যূনতম হারে। এই সময়ে এক চীনে তৈরি সামগ্রীর ওপর নির্ভরতার কারণে আমেরিকায় খোয়া গেছে প্রায় ৩২ লাখ চাকরি। এর জন্য কাউকে দোষ দিতে হবে, ফলে তর্জনী উঠেছে বিদেশিদের বিরুদ্ধে। তারাই হয়ে উঠেছে আসল শত্রু।

আমেরিকায় ডোনাল্ড ট্রাম্প, যুক্তরাজ্যে ইউকিপ পার্টির নাইজেল ফারাজ, হাঙ্গেরিতে ‘মুভমেন্ট ফর বেটার হাঙ্গেরি’র আতিলা মেস্তেরহাজি অথবা জার্মানির অল্টারনেটিভ ফর জার্মানি পার্টির ফ্রাউক পেট্রি এই সব সাদা মানুষের​ ক্ষোভকে কাজে লাগিয়ে নিজেদের জন্য আরামকেদারা বাগানোর তালে আছেন। তাঁরা সবাই যুক্তি দেখিয়েছেন, অন্যদের পালতে গিয়ে এখন আমরা নিজেরাই তলানিতে এসে ঠেকেছি। যুক্তরাজ্য থেকে জার্মানি, হাঙ্গেরি থেকে যুক্তরাষ্ট্র, সর্বত্রই এখন স্লোগান তুলেছে, ‘গেট আওয়ার কান্ট্রি ব্যাক।’

শুধু পশ্চিমের দেশ কেন, জাতীয়তাবাদের স্লোগান রাশিয়া ও চীনেও। পুতিনের ইউক্রেন আক্রমণ ও ক্রিমিয়া দখল অথবা চীনের দক্ষিণ চীন সাগরে সামরিক আগ্রাসন, উভয় ক্ষেত্রেই দেশের মানুষের সমর্থন পেয়েছে ওই জাতীয় স্বার্থের অজুহাতেই। চীনারা তো নতুন এক স্লোগান পর্যন্ত বেছে নিয়েছে: ‘চীনা জাতির মহান পুনরুত্থান।’

আমেরিকায় সে রকম জাত্যভিমানের পুনরুত্থান ঘটাতে ডোনাল্ড ট্রাম্প শুধু সাদা মানুষদের শাসন কায়েম করতে চাইছেন। আমরা বনাম ওরা। যে প্রতিদ্বন্দ্বিতার অশনিসংকেত ১০০ বছর আগে রবীন্দ্রনাথ দিয়ে গিয়েছিলেন, ডোনাল্ড ট্রাম্প তাকে অক্ষরে অক্ষরে সত্য প্রমাণ করছেন। ট্রাম্পের কথায়, আমরা এখন এমন এক অবস্থায় এসে পৌঁছেছি, যখন কেউ আমাদের সম্মান করে না, আমরা যেন সব দেশের—এমনকি তৃতীয় বিশ্বের খুদে দেশগুলোর চাবকানি খাওয়া বালকে পরিণত হয়েছি। যাঁরা জুলাই মাসে রিপাবলিকান পার্টির জাতীয় কনভেনশনের চিত্র টিভির পর্দায় দেখেছেন, তাঁদের মনে থাকার কথা, ট্রাম্পের কথায় সুর মিলিয়ে কীভাবে হাজার হাজার মানুষ তারস্বরে চেঁচাচ্ছে, ‘ইউএসএ! ইউএসএ!’ বলে।

এই জাতীয়তাবাদী নৌকায় শুধু একা ট্রাম্প নন, হিলারি ক্লিনটনও আছেন। ডেমোক্রেটিক পার্টির জাতীয় সম্মেলনেও ‘ইউএসএ’ চিৎকার কম শোনা যায়নি। হিলারি অবশ্য উল্টো ট্রাম্পকে এই বলে দুষেছেন যে তিনি আমেরিকান ‘শ্রেষ্ঠত্ববাদ’ বা আমেরিকান এক্সেপশনালিজমে বিশ্বাস করেন না। আমেরিকা সবার চেয়ে সেরা, কারণ সে যা করে তা শুধু নিজের স্বার্থে নয়, বিশ্বের সবার স্বার্থে। অথচ ট্রাম্প বলেছিলেন, ‘আপনি যদি রাশিয়া হন, তাহলে “আমেরিকা শ্রেষ্ঠ” কথাটা আপনার কানে ভালো লাগবে না।’ সে কথা উল্লেখ করে গত মাসে হিলারি অভিযোগ করেছেন, ‘আমার প্রতিপক্ষ (অর্থাৎ ট্রাম্প) আমেরিকার শ্রেষ্ঠত্ববাদ বিষয়টি ঠিক বুঝতে পারেননি। আমরা বলি আমেরিকা ব্যতিক্রমী; সে অন্য সবার চেয়ে শ্রেষ্ঠ, তার মানে এই নয় অন্য দেশ বা জাতির আত্মগর্ব নেই। এ কথার অর্থ হলো, আমেরিকা বিশ্বে শান্তি ও অগ্রগতি অর্জনে এক অনন্য ও অপরিহার্য শক্তি।’

এই অনন্যতা ও অপরিহার্যতার দোহাই দিয়ে বুশ গং ইরাক আক্রমণ করে পুরো মধ্যপ্রাচ্য লন্ডভন্ড করেছে। ট্রাম্পের উত্থানের পেছনে সেই অপরিহার্যতার ভূমিকা কম নয়। সাদা মানুষদের ক্ষোভের কারণে যে নয়া জাতীয়তাবাদ এখন পশ্চিমা বিশ্বজুড়ে, রাজনীতিকদের কূটচালে তার প্রকাশ ঘটছে কালো বা বাদামি মানুষদের প্রতি ঘৃণা ও বিদ্বেষ ছড়িয়ে। কিন্তু বিশ্বায়নের শিকার তো শুধু সাদা মানুষ নয়, কালো ও বাদামি মানুষেরাও। তা সত্ত্বেও সাদারা এখন নিজেদের আক্রান্ত ভাবছে, কারণ নিজেদের অন্য সবার চেয়ে শ্রেষ্ঠ ভাবতেই তারা অভ্যস্ত। পরিহাসের বিষয় হলো, যারা এই দুর্দশার জন্য দায়ী, তারাও সাদা মানুষ, যাদের একজন ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজে।

রবীন্দ্রনাথ পরিণত বয়সে এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছিলেন: মানবসভ্যতার রয়েছে এক অভিন্ন ইতিহাস, বিভিন্ন দেশের বা জাতির ইতিহাস সেই সভ্যতার ভিন্ন ভিন্ন অধ্যায় মাত্র। তিনি বলেছিলেন, আমাদের মধ্যে যারা মানব গোত্রসমূহকে একত্র করতে সক্ষম, তারাই আমাদের নেতা হওয়ার যোগ্য। তিনি অপেক্ষায় ছিলেন সেই ধীমান নেতার আগমনের, যিনি ‘অপরকে’ হীন করবেন না, ঘৃণার বিষে তাকে দহন করবেন না। চরম সংকটের সময়েও মানুষে বিশ্বাস হারানো পাপ, শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত এই কথা বলে গেছেন তিনি।

হায়, আজকের বিশ্বে কবিগুরুর সে কথা কি শুধুই কষ্টকল্পনা?

Comments

Comments!

 সাদা মানুষেরা খেপে উঠেছে কেন?AmarbangladeshonlineAmarbangladeshonline | Amarbangladeshonline

সাদা মানুষেরা খেপে উঠেছে কেন?

Wednesday, September 7, 2016 9:52 am | আপডেটঃ September 07, 2016 9:56 AM
০

হাসান ফেরদৌস ১৯১৬ সালে দ্বিতীয়বারের মতো আমেরিকায় বেড়াতে এসে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর জাতীয়তাবাদের বিপদ সম্পর্কে সাবধান করে দিয়েছিলেন। ঘরভর্তি সাদা মানুষের চোখে চোখ রেখে বলেছিলেন, ন্যাশনালিজম ইজ এ গ্রেট মেনেস। জাতীয়তাবাদ এক ভয়ংকর জিনিস; এই চেতনা মানুষে মানুষে দেশে দেশে বিভেদের দেয়াল তুলে দেয়। তিনি সাবধান করে বলেছিলেন, দেশপ্রেমের নামে যারা নৈতিকতার আইন বিস্মৃত হয়, একসময় তারা সহিংসতার আগুনে নিজেরাই জ্বলেপুড়ে মরবে। আমেরিকানদের ব্যাপারে রবীন্দ্রনাথের আস্থা ছিল; অন্য দেশের মানুষ এখানে এসে আশ্রয় পায়, সে কথা তিনি জানতেন। তাঁর ভয় ছিল ইউরোপকে নিয়ে। তাদের কথা মনে করেই তিনি বলেছিলেন, পশ্চিমা বিশ্বে যেখানে জাতীয়তাবাদ মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে, সেখানেই দেখি মিথ্যা অথবা অর্ধসত্য ব্যবহার করে অন্য জাতি ও সংস্কৃতির ব্যাপারে কাল্পনিক ও মিথ্যার মালা সাজিয়ে ঘৃণার বারুদ ছড়ানো হচ্ছে। এর ফলে মানবতার শুভবোধ কালিমাযুক্ত হচ্ছে। স্বার্থপরতা হয়ে উঠছে নতুন জাতীয় ধর্ম।

তাঁর সে ভাষণের প্রায় ১০০ বছর পর, নতুন সহস্রাব্দে এসে ভারত উপমহাদেশেরই আরেক বুদ্ধিজীবী একবাল আহমদ জাতীয়তাবাদের বিপদ সম্বন্ধে আমাদের সতর্ক করে দিয়েছিলেন আরও তীব্র ও প্রত্যক্ষ ভাষায় তাঁরটেররিজম, দেয়ারস অ্যান্ড আওয়ার্স গ্রন্থে। জাতীয়তাবাদের লক্ষ্যই হলো একদিকে নিজেকে মহান হিসেবে উপস্থাপন, অন্যদিকে ‘অপরকে’ ক্ষুদ্র করা, তাকে শত্রু হিসেবে প্রমাণ করা। একবাল আহমদ বলেছিলেন, জাতীয়তাবাদ তাই একই সঙ্গে দুই ধরনের মিথ্যা—নিজের ব্যাপারে ও অন্যের ব্যাপারে।

জাতীয়তাবাদ কেন বিপজ্জনক, আজকের আমেরিকার দিকে তাকালেই তা বোঝা যায়। রবীন্দ্রনাথের দেখা আমেরিকা আর ২০১৬ সালের আমেরিকা এক নয়। ডোনাল্ড ট্রাম্প নতুন যে আমেরিকার ছবি আঁকতে চাইছেন, তাতে ‘সবার আগে আমেরিকা’, ‘সবকিছুর আগে আমেরিকা’। এই জাতীয়তাবাদী আমেরিকায় শুধু তারা, অর্থাৎ এ দেশের খ্রিষ্টধর্মী সাদা মানুষেরা সৎ, কর্মঠ ও মহৎ। অন্য সবাই, বিশেষত অ-শ্বেতকায় বহিরাগত—তারা মেক্সিকো থেকে আসা বাদামি মানুষ অথবা মধ্যপ্রাচ্য, দক্ষিণ এশিয়া ও আফ্রিকা থেকে আসা ভিন্নধর্মী যা-ই হোক, এ দেশের মানুষের জন্য বিপদ ডেকে আনছে। তাদের ঠেকাতে হবে, সে জন্য দরকার পড়লে দক্ষিণের সঙ্গে শক্ত প্রাচীর তুলে দাও। মধ্যপ্রাচ্য থেকে মুসলিমদের আগমন নিষিদ্ধ করো; যারা ইতিমধ্যে এসে পড়েছে, তাদের ঘাড় ধরে বের করে দাও।

শুধু আমেরিকায় নয়, ‘অন্যের’ প্রতি এই ঘৃণা ও প্রত্যাখ্যান, এখন ইউরোপের অনেক দেশেই মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। বহিরাগতদের প্রবেশ ঠেকানোর নামে যুক্তরাজ্য ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে বেরিয়ে গেছে। পূর্ব ইউরোপীয় বিভিন্ন দেশে, যেমন হাঙ্গেরি, পোল্যান্ড ও বুলগেরিয়ায় নিজেদের বাইরে অন্য সব জাতি-ধর্ম-বর্ণের বিরুদ্ধে প্রবল জাত্যভিমান গড়ে উঠেছে। ফ্রান্স, যে একসময় নিজের উদারনৈতিক রাজনীতির জন্য সবার প্রশংসা কুড়িয়েছিল, সে এখন যেকোনো মূল্যে ‘ফরাসি মূল্যবোধ’ রক্ষার জন্য আইন তৈরি করছে। এমনকি জার্মানি, হিটলারের ক্লেদচিহ্ন মুছতে যে দেশ উদ্বাস্তুদের জন্য নিজের দরজা খুলে দিয়েছে, সেখানেও ‘বিদেশি খেদাও’ অভিযান শুরু হয়েছে ওই প্রবল জাত্যভিমান থেকেই। গত সপ্তাহেই চ্যান্সেলর ম্যার্কেলের দল জার্মানির পূর্বাঞ্চলে স্থানীয় নির্বাচনে দক্ষিণপন্থী ও জাতীয়তাবাদী দলের কাছে বেধড়ক মার খেয়েছে।

সর্বত্রই এই আন্দোলনের কেন্দ্রে রয়েছে অপেক্ষাকৃত কম শিক্ষিত ও নিম্নবিত্ত শ্রমিক এবং কর্মজীবীরা, যারা একসময় আওয়াজ তুলেছিল ‘দুনিয়ার শ্রমিক এক হও।’ আজ তারাই বলেছে বিদেশি খেদাও, নিজের ঘর আগে সামাল দাও।

আসলে হচ্ছেটা কী?

এই জাতীয়তাবাদী উন্মাদনার পেছনে রয়েছে বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক মন্দা। গত দুই দশকে তথাকথিত বিশ্বায়নের ফলে একদিকে একদল লোক আঙুল ফুলে কলাগাছ হয়েছে, অন্যদিকে সাধারণ মানুষ, যারা দু-দশ বছর আগেও ভদ্রগোছের জীবনযাপনে অভ্যস্ত ছিল—তারা ক্রমশ পিছিয়ে পড়ছে। একদিকে ১ শতাংশ ধনিক গোষ্ঠী, অন্যদিকে পিছিয়ে পড়া ৯৯ শতাংশ। এই দৃশ্য শুধু আমেরিকায় নয়, অধিকাংশ শিল্পোন্নত দেশে। যেখানে একসময় অর্থনীতির প্রাণশক্তি ছিল উৎপাদন খাত, এখন তার স্থান দখল করেছে নতুন ‘আর্থিক’ বা ফিন্যান্স খাত। কোনো কিছু না বানিয়ে, গায়ে-গতরে কাজ না করে অন্যের পয়সা এদিক-সেদিক করে মুনাফার বিশাল পাহাড় গড়ে তুলেছে একদল লোক।

এই ১ শতাংশই অধিক মুনাফার লোভে নিজ দেশের কলকারখানা তুলে নিয়ে বসাচ্ছে সস্তা শ্রমিক পাওয়া যায় এমন সব দেশে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, আমেরিকায় শিল্পশ্রমিকের জায়গায় গত আড়াই দশকে ৯৮ শতাংশ নতুন কর্ম সৃষ্টি হয়েছে এমন সব খাতে, যেখানে চাকরির জন্য কোনো বিশেষ দক্ষতার প্রয়োজন নেই। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বেতন মেলে সরকারের বেঁধে দেওয়া ঘণ্টাপ্রতি ন্যূনতম হারে। এই সময়ে এক চীনে তৈরি সামগ্রীর ওপর নির্ভরতার কারণে আমেরিকায় খোয়া গেছে প্রায় ৩২ লাখ চাকরি। এর জন্য কাউকে দোষ দিতে হবে, ফলে তর্জনী উঠেছে বিদেশিদের বিরুদ্ধে। তারাই হয়ে উঠেছে আসল শত্রু।

আমেরিকায় ডোনাল্ড ট্রাম্প, যুক্তরাজ্যে ইউকিপ পার্টির নাইজেল ফারাজ, হাঙ্গেরিতে ‘মুভমেন্ট ফর বেটার হাঙ্গেরি’র আতিলা মেস্তেরহাজি অথবা জার্মানির অল্টারনেটিভ ফর জার্মানি পার্টির ফ্রাউক পেট্রি এই সব সাদা মানুষের​ ক্ষোভকে কাজে লাগিয়ে নিজেদের জন্য আরামকেদারা বাগানোর তালে আছেন। তাঁরা সবাই যুক্তি দেখিয়েছেন, অন্যদের পালতে গিয়ে এখন আমরা নিজেরাই তলানিতে এসে ঠেকেছি। যুক্তরাজ্য থেকে জার্মানি, হাঙ্গেরি থেকে যুক্তরাষ্ট্র, সর্বত্রই এখন স্লোগান তুলেছে, ‘গেট আওয়ার কান্ট্রি ব্যাক।’

শুধু পশ্চিমের দেশ কেন, জাতীয়তাবাদের স্লোগান রাশিয়া ও চীনেও। পুতিনের ইউক্রেন আক্রমণ ও ক্রিমিয়া দখল অথবা চীনের দক্ষিণ চীন সাগরে সামরিক আগ্রাসন, উভয় ক্ষেত্রেই দেশের মানুষের সমর্থন পেয়েছে ওই জাতীয় স্বার্থের অজুহাতেই। চীনারা তো নতুন এক স্লোগান পর্যন্ত বেছে নিয়েছে: ‘চীনা জাতির মহান পুনরুত্থান।’

আমেরিকায় সে রকম জাত্যভিমানের পুনরুত্থান ঘটাতে ডোনাল্ড ট্রাম্প শুধু সাদা মানুষদের শাসন কায়েম করতে চাইছেন। আমরা বনাম ওরা। যে প্রতিদ্বন্দ্বিতার অশনিসংকেত ১০০ বছর আগে রবীন্দ্রনাথ দিয়ে গিয়েছিলেন, ডোনাল্ড ট্রাম্প তাকে অক্ষরে অক্ষরে সত্য প্রমাণ করছেন। ট্রাম্পের কথায়, আমরা এখন এমন এক অবস্থায় এসে পৌঁছেছি, যখন কেউ আমাদের সম্মান করে না, আমরা যেন সব দেশের—এমনকি তৃতীয় বিশ্বের খুদে দেশগুলোর চাবকানি খাওয়া বালকে পরিণত হয়েছি। যাঁরা জুলাই মাসে রিপাবলিকান পার্টির জাতীয় কনভেনশনের চিত্র টিভির পর্দায় দেখেছেন, তাঁদের মনে থাকার কথা, ট্রাম্পের কথায় সুর মিলিয়ে কীভাবে হাজার হাজার মানুষ তারস্বরে চেঁচাচ্ছে, ‘ইউএসএ! ইউএসএ!’ বলে।

এই জাতীয়তাবাদী নৌকায় শুধু একা ট্রাম্প নন, হিলারি ক্লিনটনও আছেন। ডেমোক্রেটিক পার্টির জাতীয় সম্মেলনেও ‘ইউএসএ’ চিৎকার কম শোনা যায়নি। হিলারি অবশ্য উল্টো ট্রাম্পকে এই বলে দুষেছেন যে তিনি আমেরিকান ‘শ্রেষ্ঠত্ববাদ’ বা আমেরিকান এক্সেপশনালিজমে বিশ্বাস করেন না। আমেরিকা সবার চেয়ে সেরা, কারণ সে যা করে তা শুধু নিজের স্বার্থে নয়, বিশ্বের সবার স্বার্থে। অথচ ট্রাম্প বলেছিলেন, ‘আপনি যদি রাশিয়া হন, তাহলে “আমেরিকা শ্রেষ্ঠ” কথাটা আপনার কানে ভালো লাগবে না।’ সে কথা উল্লেখ করে গত মাসে হিলারি অভিযোগ করেছেন, ‘আমার প্রতিপক্ষ (অর্থাৎ ট্রাম্প) আমেরিকার শ্রেষ্ঠত্ববাদ বিষয়টি ঠিক বুঝতে পারেননি। আমরা বলি আমেরিকা ব্যতিক্রমী; সে অন্য সবার চেয়ে শ্রেষ্ঠ, তার মানে এই নয় অন্য দেশ বা জাতির আত্মগর্ব নেই। এ কথার অর্থ হলো, আমেরিকা বিশ্বে শান্তি ও অগ্রগতি অর্জনে এক অনন্য ও অপরিহার্য শক্তি।’

এই অনন্যতা ও অপরিহার্যতার দোহাই দিয়ে বুশ গং ইরাক আক্রমণ করে পুরো মধ্যপ্রাচ্য লন্ডভন্ড করেছে। ট্রাম্পের উত্থানের পেছনে সেই অপরিহার্যতার ভূমিকা কম নয়। সাদা মানুষদের ক্ষোভের কারণে যে নয়া জাতীয়তাবাদ এখন পশ্চিমা বিশ্বজুড়ে, রাজনীতিকদের কূটচালে তার প্রকাশ ঘটছে কালো বা বাদামি মানুষদের প্রতি ঘৃণা ও বিদ্বেষ ছড়িয়ে। কিন্তু বিশ্বায়নের শিকার তো শুধু সাদা মানুষ নয়, কালো ও বাদামি মানুষেরাও। তা সত্ত্বেও সাদারা এখন নিজেদের আক্রান্ত ভাবছে, কারণ নিজেদের অন্য সবার চেয়ে শ্রেষ্ঠ ভাবতেই তারা অভ্যস্ত। পরিহাসের বিষয় হলো, যারা এই দুর্দশার জন্য দায়ী, তারাও সাদা মানুষ, যাদের একজন ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজে।

রবীন্দ্রনাথ পরিণত বয়সে এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছিলেন: মানবসভ্যতার রয়েছে এক অভিন্ন ইতিহাস, বিভিন্ন দেশের বা জাতির ইতিহাস সেই সভ্যতার ভিন্ন ভিন্ন অধ্যায় মাত্র। তিনি বলেছিলেন, আমাদের মধ্যে যারা মানব গোত্রসমূহকে একত্র করতে সক্ষম, তারাই আমাদের নেতা হওয়ার যোগ্য। তিনি অপেক্ষায় ছিলেন সেই ধীমান নেতার আগমনের, যিনি ‘অপরকে’ হীন করবেন না, ঘৃণার বিষে তাকে দহন করবেন না। চরম সংকটের সময়েও মানুষে বিশ্বাস হারানো পাপ, শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত এই কথা বলে গেছেন তিনি।

হায়, আজকের বিশ্বে কবিগুরুর সে কথা কি শুধুই কষ্টকল্পনা?

Comments

comments

সম্পাদক : মোহাম্মদ আবদুল বাছির
প্রকাশক: মোহাম্মদ জহিরুল ইসলাম
ফোন : ‎০১৭১৩৪০৯০৯০
৩৪৫/১, দিলু রোড, নিউ ইস্কাটন, ঢাকা-১০০০
X
 
নিয়মিত খবর পড়তে আমাদের ফেসবুক পেজে লাইক দিয়ে যুক্ত থাকুন
X