বুধবার, ২১শে ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ ইং, ৯ই ফাল্গুন, ১৪২৪ বঙ্গাব্দ, ভোর ৫:২৭
শিরোনাম
  • ঘৃণাকে বিজয়ী হতে দেয়া যাবে না, ট্রাম্পকে ইঙ্গিত করে জর্জ ক্লুনি
  • আমার একটাই চিন্তা দেশের মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন করা: প্রধানমন্ত্রী
  • ‘কেন্দ্রীয় সরকারের আগ্রাসী নীতির কারণে কাশ্মীরকে হারাতে হবে’
  • সাড়ে চারমাস পর মুখোমুখি, খাদিজাকে উদ্দেশ্য করে যা বলল বদরুল
  • খালেদার ‘সাজা’ বিরোধী নেতাকর্মীদের মনোবল ভাঙ্গার কৌশল!
  • বিএনপির কর্মসূচি ‘যথাসময়ে’ জানানো হবে: রিজভী
  • দলের জন্য বোলিং করতেও রাজি মুশফিক
  • শিশু জিহাদের মৃত্যু: চার জনের ১০ বছর করে কারাদণ্ড
  • অবশেষে বাড়ি অবরুদ্ধ করে রাখা সেই দেয়াল ভেঙ্গে ফেলা হচ্ছে
  • সাক্ষ্য দিলেন খাদিজা, চাইলেন বদরুলের সর্বোচ্চ শাস্তি
  • বদরুলের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিতে আদালতে খাদিজা
  • আজ বগুড়ায় যেসব প্রকল্প উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী
  • রোহিঙ্গা স্থানান্তরের সরকারি পরিকল্পনার সঙ্গে দ্বিমত মানবাধিকার কমিশনের
  • মহেশখালীতে ইয়াবা ব্যবসায়ীদের সঙ্গে পুলিশের ‘বন্দুকযুদ্ধ’
  • হোয়াইট হাউসে কাজ করার দীর্ঘ অভিজ্ঞতার কথা জানালেন এই বাংলাদেশি সাংবাদিক
Friday, November 25, 2016 7:49 am
A- A A+ Print

সিঙ্গাপুরের চিঠি: যৌনপল্লীতে বাঙালি স্বামী-স্ত্রীর সন্ধ্যা যাপন

singapore-4

দেশে থাকতে একবার একটি প্রতিবেদন তৈরির জন্য ফরিদপুরের একটি যৌনপল্লীতে যেতে চেয়েছিলাম। অফিস আমাকে যেতে দিলো না।তারা ভাবলেন, যৌনপল্লীতে প্রতিবেদন করতে গেলে আমার বিপদ হতে পারে। আমার আর প্রতিবেদন করা হলো না ঠিকই, তবে এ বিষয়ে লেখার আগ্রহ সবসময় ছিল। সিঙ্গাপুরে আসার পর এখানকার পত্রিকা পড়ে ও মানুষের সাথে আলাপ করে অনেক কিছু জানতে পারলাম। জানতে পারলাম সিঙ্গাপুরের রেডলাইট এলাকা বা যৌনপল্লী গেলাং-এর কথাও। আমার পুরনো ইচ্ছেটা আবার নতুন করে চাঙা হয়ে উঠলো। নিজের চোখে দেখে আসতে চাই সেই জায়গাটি, জানতে চাই সেখানকার মানুষের কথা। গত সপ্তাহে ছুটির দিনে গেলাং-এ যাওয়ার পরিকল্পনা করেও যাওয়া হলো না। আমার বর ধ্রুব সারাদিন বাসায় থাকলো। নিজে রান্না করে, খাওয়া-দাওয়া করে, বেশ ঘুম দিলো। সারা বিকেল টানা-হ্যাঁচড়া করেও তাকে ঘুম থেকে ওঠাতে পারলাম না। এ সপ্তাহে সে তিন দিন ছুটি কাটিয়েছে। দু'দিন ঘ্যানঘ্যান করেও তার মন গলাতে পারলাম না। একটা না একটা অজুহাত তার আছে। বুঝতে পারলাম, সে আমাকে গেলাং-এ নিয়ে যেতে চাইছে না। তৃতীয় দিনে ঘুম থকে উঠে বায়না ধরলাম, আজ সেখানে যাবোই যাব। সন্ধা ছয়টার দিকে আমরা বাসা থেকে বের হলাম। ধ্রুব আমার কানে কানে ফিসফিস করে বলছিল, রাস্তায় কিন্তু বেশি ‘গেলাং-গেলাং’ বলো না। ওর কথা শুনে আমি ভাবলাম, না জানি কি এক নিষিদ্ধ জায়গায় যাচ্ছি! ওইখানে কি কোনও জনবসতি নেই? মানুষজন আর কোনো কাজে যেতে পারে না? আমি আর কথা বাড়ালাম না। আমরা জুরং পয়েন্ট থেকে ট্রেনে উঠে চললাম গেলাং-এর দিকে। এক ট্রেনে আধ ঘণ্টার মধ্যে পৌঁছে গেলাম আলজুনাইদ এমআরটি স্টেশনে। স্টেশন থেকে বের হয়ে চোখে পড়লো হকার্স মার্কেটের ফুড কোর্ট। প্রায় প্রত্যেক টেবিলে থরে থরে সাজানো বিয়ারের বোতল। সচরাচর হকার্স মার্কেটের খাবারের দোকানগুলোতে সন্ধ্যাবেলায় এমন আয়োজন দেখা যায়।
একটি বিশেষ পোশাক পরা নারীরা প্রতি টেবিলে বিয়ার পরিবেশন করেন। একটু পর পর তারা এসে দেখে যান নতুন বিয়ারের বোতল লাগবে কিনা বা গ্লাসে বিয়ার ঢেলে দিতে হবে কি না! এটা নতুন কিছু নয়, এই দৃশ্য হর-হামেশা দেখা যায় সিঙ্গাপুরের অন্যান্য এলাকায়। মূলত বিকেল থেকে শুরু হয় বিয়ার খাওয়া এবং পরিবেশনের এই আয়োজন।ভাবলাম, এই এলাকার লোকজন হয়তো এই হকার্স মার্কেটে এসে খাওয়া-দাওয়া করে। আমরা সামনের দিকে হাঁটতে শুরু করলাম। আমার ধারণা ভুল প্রমাণিত হলো। কিছুদূর হাঁটতে সামনে পেয়ে গেলাম আরও খাওয়ার জায়গা। শুধু তাই নয়, আশপাশে প্রচুর বাসাবাড়ি। রয়েছে বেশ কিছু অভিজাত কনডোমিনিয়াম (আধুনিক বহুতল ভবন)। খাবার দোকানগুলোতে খেয়াল করলাম; নারী-পুরুষ, শিশু-বৃদ্ধ সবাই খাওয়া-দাওয়া করছে। দেখে মনে হয়েছে পুরো পরিবার মিলে খেতে এসেছে। এই চিত্র সিঙ্গাপুরের অন্যান্য এলাকাতেও দেখা যায়। সিঙ্গাপোরিয়ানরা রান্না করে কম। প্রায় ছুটির দিনগুলোতে হকার্স মার্কেটে গেলে দেখা যায় সপরিবারে খেতে এসেছে একেকটি পরিবার। এখানেও তেমন দেখছি। তবে এই এলাকায় হকার্স মার্কেট আর খাবার দোকানের আধিক্য রয়েছে। একটু পরপর রয়েছে খাবারের দোকান। একের পর এক হকার্স মার্কেটের খাবারের দোকানগুলো পার করে আমরা ফুটপাথ ধরে হাঁটতে লাগলাম। হাঁটতে হাঁটতে একটি বিশেষ বিষয় আমার নজরে পড়লো। সিঙ্গাপুরের অন্যান্য এলাকার তুলনায় এখানে উপাসনালয় অনেক বেশি। এর মধ্যে বেশ কয়েকটি বৌদ্ধ মন্দির ও গির্জা পার করে এসেছি।
আরও একটু সামনে এগিয়ে যেতে চোখে পড়লো একটি মসজিদ। সেখানে বেশ কিছু মানুষ বাংলায় কথা বলছে, মনে হলো তারা বাংলাদেশি। সামনে একটা বাংলাদেশি রেঁস্তোরা চোখে পড়লো। রেঁস্তোরার দরজায় বাংলাদেশের মানচিত্র আঁকা।হাঁটতে হাঁটতে কিছুটা ক্লান্ত হয়ে পড়লাম। অথচ রেডলাইট এলাকা হিসেবে পরিচিত এই গেলাং-এ তেমন কিছুই চোখে পড়লো না। আমার কাছে উপাসনালয় আর খাবারের দোকানের আধিক্য ছাড়া আর কিছু ব্যতিক্রম বা অন্যরকম মনে হলো না। আমরা রাস্তার পাশে একটি হকার্স মার্কেটের খাবারের দোকানে বসলাম। আমার পছন্দের আইস লেমন টি আর ধ্রুবর চা এসে গেলো। চা খেতে খেতে ধ্রব আমাকে খোঁচা দিয়ে বললো, "কি, তোমার গেলাং দেখা হইছে? বলছিলাম না, এখানে তেমন কিছুই দেখার নাই।" আমি তখন বললাম, "তাহলে এটাও তো একটা দেখার জিনিস। রেড লাইট এলাকায় আসলাম, কিন্তু অশোভন কোনো কিছু নেই।" অমনি সে কথা ঘুরিয়ে বললো, "এমনও তো হতে পারে, এখানেই হয়তো তেমন কিছু আছে। কিন্তু আমরা জানি না, ঠিক কোন জায়গাটায়!" তার যুক্তি আমার পছন্দ হলো। তাই আমি চাইলাম, কাউকে জিজ্ঞেস করি। ধ্রুবর ঘোর আপত্তি, কাকে জিজ্ঞেস করবো, কী করবো তা নিয়ে।
আমরা চা খাওয়া শেষ করে মসজিদটার সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় খেয়াল করলাম দু'জন বাংলাদেশি নিজেদের মধ্যে কথা বলছে। ধ্রুবই আমাকে বলল, ওদের সাথে কথা বলতে।আমি এগিয়ে গেলাম ওদের সাথে কথা বলতে। ওদের একজনের বাড়ি বাংলাদেশের কুষ্টিয়ায়। সিঙ্গাপুরে কোন এক প্রতিষ্ঠানে ইলেক্ট্রিক্যাল সুপারভাইজার হিসেবে কাজ করছেন তিনি। জানতে চাইলাম, এই এলাকাটি কেমন? তিনি সামনের কয়েকটি লরং (গলি) এর নম্বর উল্লেখ করে বললেন, "ওই লরংগুলোতে না যাওয়াই ভালো, বাকি পুরো এলাকা ভালো।" ইন্দোনেশিয়ান বা মালয়েশিয়ান ভাষায় সরু রাস্তা বা গলিকে ‘লরং’ বলা হয়। অর্থাৎ তিনি কয়েকটি গলিতে যেতে নিরুৎসাহিত করছেন। আমি জানতে চাইলাম কেন? লোকটি একটু আমতা আমতা করে বললো, "না মানে, ওই গলিগুলোতে বাজে কাজ হয়, ওখানকার পরিবেশ ভালো নয়।" ভদ্রলোকের সাথে আরও কিছু আলাপচারিতার পর জানতে চাইলাম, উনি এই এলাকাতেই থাকেন কি না! তিনি বললেন, এই এলাকায় থাকেন না তিনি। আমি তৎক্ষণাৎ জানতে চাইলাম, এখানে তিনি কি করছেন তাহলে? যদিও এটি তার একান্ত ব্যক্তিগত ব্যাপার, কিন্তু তিনিও তো আমাদের ওই লরংগুলোর দিকে যেতে না করেছিলেন। তাহলে তিনি এখানে কি করছেন? আমার স্বভাবসুলভ কৌতুহল।
তার উত্তর শুনে আমি অবাক না হয়ে পারলাম না। ভদ্রলোক পাশের মসজিদে নিয়মিত আসেন, বন্ধুদের সাথে সময় কাটান, এখানকার মাদ্রাসায় পড়েন, এরপর খাওয়া-দাওয়া করে ঘরে ফিরে যান।এখানে কোনো মাদ্রাসা আছে, সেটা শুনে আমি যারপর নাই অবাক হলাম! শুধু তাই নয়, এই মাদ্রাসা থেকে প্রায় তিন হাজার বাংলাদেশি নাকি কোরআন শিখে বাংলাদেশে ফিরে গেছেন। তিনি জানালেন, বর্তমানে এই মাদ্রাসায় প্রায় ৪০ জনের মতো কোরআন শিখছেন। ভদ্রলোক আরও বললেন, তার জানা মতে এই এলাকায় কমপক্ষে চারটি মসজিদ আছে। আমি সত্যি অবাক হলাম এসব কথা শুনে! যাবার আগে তিনি বলে গেলেন, "এই জায়গাটি যত খারাপ, ঠিক তত আবার ভালো। ভালো-মন্দ নিজের কাছে, যে যেভাবে নিজেকে গড়ে তোলে।" ওনাকে বিদায় জানিয়ে আমরা সামনে এগিয়ে যেতে লাগলাম। এবার তো সঠিক জায়গাটির সন্ধান মিলে গেছে। আমি ওই জায়গাটি একবার দেখে আসতে চাই, কাছ থেকে দেখতে চাই সেখানকার জীবন। ধ্রুব আবার আপত্তি জানালো। সে বললো, "আমি যাবো না, তুমি গিয়ে ঘুরে আসো।" যেই না আমি একা হাঁটা দিলাম, অমনি সে আমার পিছু পিছু হাঁটতে লাগলো। আমি মিটমিট করে হাসছিলাম। কারণ আমি জানি, সে আমাকে একা ছাড়বে না।
একটি লরং-এর সামনে যেতে চোখে পড়লো আর দশটি আবাসিক এলাকার মতই এই এলাকা। রাস্তার দু'পাশে বেশ কিছু দ্বিতল-বহুতল ভবন। ভবনগুলোর সামনে প্রচুর পুরুষ দাঁড়িয়ে আছে। বেশভূষায় তারা যত না অযত্মবান, তার চেয়ে অন্যরকম তাদের চাহনি। তাদের চাহনি দেখে মনে হচ্ছিলো, সামনে গেলেই গিলে ফেলবে তারা।ঠিক বুঝতে পারছিলাম না, এই পুরুষগুলো খদ্দের নাকি দালাল? নাকি তারা নিজেরাই জিগোলো? তবে আর একটু সামনে গিয়ে খেয়াল করলাম, ফুটপাতের ওপর বেশ কিছু মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে। নাহ, তাদের পোশাক বা চাহনি আমার কাছে বিশেষ কিছু অশোভন মনে হলো না। সিঙ্গাপুরের অন্যান্য এলাকার মেয়েরাও এমন পোশাক পড়ে। তবে ওই পুরুষগুলোর সামনে দিয়ে ওই রাস্তা ধরে যেতে আমার খারাপ লাগছিল। মেয়েগুলো ওদের পাশে কীভাবে দাঁড়িয়ে আছে ভেবে খুব খারাপ লাগলো আমার। আরও কিছুটা পথ এগোতে চোখে পড়লো, একজন শাড়িপরা নারী সামনে দিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন। রাস্তার ওপর দাঁড়িয়ে থাকা ওই পুরুষগুলোর খুব কাছাকাছি চলে এসেছি। নাহ্, সামনে আর যেতে মন চাইলো না। আমি ধ্রুবকে বললাম, "চলো এবার বাসায় যাই।" আমরা আলজুনাইদ এমআরটি স্টেশনের দিকে হাঁটা শুরু করলাম। ফেরার পথে বারবার কুষ্টিয়ার ওই ভদ্রলোকের কথাটা মনে পড়লো। এই জায়গাটি যত খারাপ, ঠিক তত আবার ভালো। ভালো-মন্দ নিজের কাছে, যে যেভাবে নিজেকে গড়ে তোলে।   রোকেয়া লিটা: সাংবাদিক, rokeya.lita@hotmail.com
 

Comments

Comments!

 সিঙ্গাপুরের চিঠি: যৌনপল্লীতে বাঙালি স্বামী-স্ত্রীর সন্ধ্যা যাপনAmarbangladeshonlineAmarbangladeshonline | Amarbangladeshonline

সিঙ্গাপুরের চিঠি: যৌনপল্লীতে বাঙালি স্বামী-স্ত্রীর সন্ধ্যা যাপন

Friday, November 25, 2016 7:49 am
singapore-4
দেশে থাকতে একবার একটি প্রতিবেদন তৈরির জন্য ফরিদপুরের একটি যৌনপল্লীতে যেতে চেয়েছিলাম। অফিস আমাকে যেতে দিলো না।তারা ভাবলেন, যৌনপল্লীতে প্রতিবেদন করতে গেলে আমার বিপদ হতে পারে। আমার আর প্রতিবেদন করা হলো না ঠিকই, তবে এ বিষয়ে লেখার আগ্রহ সবসময় ছিল।

সিঙ্গাপুরে আসার পর এখানকার পত্রিকা পড়ে ও মানুষের সাথে আলাপ করে অনেক কিছু জানতে পারলাম। জানতে পারলাম সিঙ্গাপুরের রেডলাইট এলাকা বা যৌনপল্লী গেলাং-এর কথাও।

আমার পুরনো ইচ্ছেটা আবার নতুন করে চাঙা হয়ে উঠলো। নিজের চোখে দেখে আসতে চাই সেই জায়গাটি, জানতে চাই সেখানকার মানুষের কথা।

গত সপ্তাহে ছুটির দিনে গেলাং-এ যাওয়ার পরিকল্পনা করেও যাওয়া হলো না। আমার বর ধ্রুব সারাদিন বাসায় থাকলো। নিজে রান্না করে, খাওয়া-দাওয়া করে, বেশ ঘুম দিলো। সারা বিকেল টানা-হ্যাঁচড়া করেও তাকে ঘুম থেকে ওঠাতে পারলাম না।

এ সপ্তাহে সে তিন দিন ছুটি কাটিয়েছে। দু’দিন ঘ্যানঘ্যান করেও তার মন গলাতে পারলাম না। একটা না একটা অজুহাত তার আছে। বুঝতে পারলাম, সে আমাকে গেলাং-এ নিয়ে যেতে চাইছে না। তৃতীয় দিনে ঘুম থকে উঠে বায়না ধরলাম, আজ সেখানে যাবোই যাব।

সন্ধা ছয়টার দিকে আমরা বাসা থেকে বের হলাম। ধ্রুব আমার কানে কানে ফিসফিস করে বলছিল, রাস্তায় কিন্তু বেশি ‘গেলাং-গেলাং’ বলো না।

ওর কথা শুনে আমি ভাবলাম, না জানি কি এক নিষিদ্ধ জায়গায় যাচ্ছি! ওইখানে কি কোনও জনবসতি নেই? মানুষজন আর কোনো কাজে যেতে পারে না? আমি আর কথা বাড়ালাম না।

আমরা জুরং পয়েন্ট থেকে ট্রেনে উঠে চললাম গেলাং-এর দিকে। এক ট্রেনে আধ ঘণ্টার মধ্যে পৌঁছে গেলাম আলজুনাইদ এমআরটি স্টেশনে। স্টেশন থেকে বের হয়ে চোখে পড়লো হকার্স মার্কেটের ফুড কোর্ট। প্রায় প্রত্যেক টেবিলে থরে থরে সাজানো বিয়ারের বোতল। সচরাচর হকার্স মার্কেটের খাবারের দোকানগুলোতে সন্ধ্যাবেলায় এমন আয়োজন দেখা যায়।

একটি বিশেষ পোশাক পরা নারীরা প্রতি টেবিলে বিয়ার পরিবেশন করেন। একটু পর পর তারা এসে দেখে যান নতুন বিয়ারের বোতল লাগবে কিনা বা গ্লাসে বিয়ার ঢেলে দিতে হবে কি না! এটা নতুন কিছু নয়, এই দৃশ্য হর-হামেশা দেখা যায় সিঙ্গাপুরের অন্যান্য এলাকায়। মূলত বিকেল থেকে শুরু হয় বিয়ার খাওয়া এবং পরিবেশনের এই আয়োজন।ভাবলাম, এই এলাকার লোকজন হয়তো এই হকার্স মার্কেটে এসে খাওয়া-দাওয়া করে। আমরা সামনের দিকে হাঁটতে শুরু করলাম। আমার ধারণা ভুল প্রমাণিত হলো। কিছুদূর হাঁটতে সামনে পেয়ে গেলাম আরও খাওয়ার জায়গা। শুধু তাই নয়, আশপাশে প্রচুর বাসাবাড়ি। রয়েছে বেশ কিছু অভিজাত কনডোমিনিয়াম (আধুনিক বহুতল ভবন)।

খাবার দোকানগুলোতে খেয়াল করলাম; নারী-পুরুষ, শিশু-বৃদ্ধ সবাই খাওয়া-দাওয়া করছে। দেখে মনে হয়েছে পুরো পরিবার মিলে খেতে এসেছে। এই চিত্র সিঙ্গাপুরের অন্যান্য এলাকাতেও দেখা যায়।

সিঙ্গাপোরিয়ানরা রান্না করে কম। প্রায় ছুটির দিনগুলোতে হকার্স মার্কেটে গেলে দেখা যায় সপরিবারে খেতে এসেছে একেকটি পরিবার। এখানেও তেমন দেখছি। তবে এই এলাকায় হকার্স মার্কেট আর খাবার দোকানের আধিক্য রয়েছে। একটু পরপর রয়েছে খাবারের দোকান।

একের পর এক হকার্স মার্কেটের খাবারের দোকানগুলো পার করে আমরা ফুটপাথ ধরে হাঁটতে লাগলাম। হাঁটতে হাঁটতে একটি বিশেষ বিষয় আমার নজরে পড়লো। সিঙ্গাপুরের অন্যান্য এলাকার তুলনায় এখানে উপাসনালয় অনেক বেশি। এর মধ্যে বেশ কয়েকটি বৌদ্ধ মন্দির ও গির্জা পার করে এসেছি।

আরও একটু সামনে এগিয়ে যেতে চোখে পড়লো একটি মসজিদ। সেখানে বেশ কিছু মানুষ বাংলায় কথা বলছে, মনে হলো তারা বাংলাদেশি। সামনে একটা বাংলাদেশি রেঁস্তোরা চোখে পড়লো। রেঁস্তোরার দরজায় বাংলাদেশের মানচিত্র আঁকা।হাঁটতে হাঁটতে কিছুটা ক্লান্ত হয়ে পড়লাম। অথচ রেডলাইট এলাকা হিসেবে পরিচিত এই গেলাং-এ তেমন কিছুই চোখে পড়লো না। আমার কাছে উপাসনালয় আর খাবারের দোকানের আধিক্য ছাড়া আর কিছু ব্যতিক্রম বা অন্যরকম মনে হলো না।

আমরা রাস্তার পাশে একটি হকার্স মার্কেটের খাবারের দোকানে বসলাম। আমার পছন্দের আইস লেমন টি আর ধ্রুবর চা এসে গেলো।

চা খেতে খেতে ধ্রব আমাকে খোঁচা দিয়ে বললো, “কি, তোমার গেলাং দেখা হইছে? বলছিলাম না, এখানে তেমন কিছুই দেখার নাই।”

আমি তখন বললাম, “তাহলে এটাও তো একটা দেখার জিনিস। রেড লাইট এলাকায় আসলাম, কিন্তু অশোভন কোনো কিছু নেই।”

অমনি সে কথা ঘুরিয়ে বললো, “এমনও তো হতে পারে, এখানেই হয়তো তেমন কিছু আছে। কিন্তু আমরা জানি না, ঠিক কোন জায়গাটায়!”

তার যুক্তি আমার পছন্দ হলো। তাই আমি চাইলাম, কাউকে জিজ্ঞেস করি।

ধ্রুবর ঘোর আপত্তি, কাকে জিজ্ঞেস করবো, কী করবো তা নিয়ে।

আমরা চা খাওয়া শেষ করে মসজিদটার সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় খেয়াল করলাম দু’জন বাংলাদেশি নিজেদের মধ্যে কথা বলছে। ধ্রুবই আমাকে বলল, ওদের সাথে কথা বলতে।আমি এগিয়ে গেলাম ওদের সাথে কথা বলতে। ওদের একজনের বাড়ি বাংলাদেশের কুষ্টিয়ায়। সিঙ্গাপুরে কোন এক প্রতিষ্ঠানে ইলেক্ট্রিক্যাল সুপারভাইজার হিসেবে কাজ করছেন তিনি।

জানতে চাইলাম, এই এলাকাটি কেমন?

তিনি সামনের কয়েকটি লরং (গলি) এর নম্বর উল্লেখ করে বললেন, “ওই লরংগুলোতে না যাওয়াই ভালো, বাকি পুরো এলাকা ভালো।”

ইন্দোনেশিয়ান বা মালয়েশিয়ান ভাষায় সরু রাস্তা বা গলিকে ‘লরং’ বলা হয়। অর্থাৎ তিনি কয়েকটি গলিতে যেতে নিরুৎসাহিত করছেন। আমি জানতে চাইলাম কেন?

লোকটি একটু আমতা আমতা করে বললো, “না মানে, ওই গলিগুলোতে বাজে কাজ হয়, ওখানকার পরিবেশ ভালো নয়।”

ভদ্রলোকের সাথে আরও কিছু আলাপচারিতার পর জানতে চাইলাম, উনি এই এলাকাতেই থাকেন কি না!

তিনি বললেন, এই এলাকায় থাকেন না তিনি।

আমি তৎক্ষণাৎ জানতে চাইলাম, এখানে তিনি কি করছেন তাহলে? যদিও এটি তার একান্ত ব্যক্তিগত ব্যাপার, কিন্তু তিনিও তো আমাদের ওই লরংগুলোর দিকে যেতে না করেছিলেন। তাহলে তিনি এখানে কি করছেন? আমার স্বভাবসুলভ কৌতুহল।

তার উত্তর শুনে আমি অবাক না হয়ে পারলাম না। ভদ্রলোক পাশের মসজিদে নিয়মিত আসেন, বন্ধুদের সাথে সময় কাটান, এখানকার মাদ্রাসায় পড়েন, এরপর খাওয়া-দাওয়া করে ঘরে ফিরে যান।এখানে কোনো মাদ্রাসা আছে, সেটা শুনে আমি যারপর নাই অবাক হলাম! শুধু তাই নয়, এই মাদ্রাসা থেকে প্রায় তিন হাজার বাংলাদেশি নাকি কোরআন শিখে বাংলাদেশে ফিরে গেছেন।

তিনি জানালেন, বর্তমানে এই মাদ্রাসায় প্রায় ৪০ জনের মতো কোরআন শিখছেন। ভদ্রলোক আরও বললেন, তার জানা মতে এই এলাকায় কমপক্ষে চারটি মসজিদ আছে। আমি সত্যি অবাক হলাম এসব কথা শুনে!

যাবার আগে তিনি বলে গেলেন, “এই জায়গাটি যত খারাপ, ঠিক তত আবার ভালো। ভালো-মন্দ নিজের কাছে, যে যেভাবে নিজেকে গড়ে তোলে।”

ওনাকে বিদায় জানিয়ে আমরা সামনে এগিয়ে যেতে লাগলাম। এবার তো সঠিক জায়গাটির সন্ধান মিলে গেছে। আমি ওই জায়গাটি একবার দেখে আসতে চাই, কাছ থেকে দেখতে চাই সেখানকার জীবন।

ধ্রুব আবার আপত্তি জানালো। সে বললো, “আমি যাবো না, তুমি গিয়ে ঘুরে আসো।”

যেই না আমি একা হাঁটা দিলাম, অমনি সে আমার পিছু পিছু হাঁটতে লাগলো। আমি মিটমিট করে হাসছিলাম। কারণ আমি জানি, সে আমাকে একা ছাড়বে না।

একটি লরং-এর সামনে যেতে চোখে পড়লো আর দশটি আবাসিক এলাকার মতই এই এলাকা। রাস্তার দু’পাশে বেশ কিছু দ্বিতল-বহুতল ভবন। ভবনগুলোর সামনে প্রচুর পুরুষ দাঁড়িয়ে আছে। বেশভূষায় তারা যত না অযত্মবান, তার চেয়ে অন্যরকম তাদের চাহনি। তাদের চাহনি দেখে মনে হচ্ছিলো, সামনে গেলেই গিলে ফেলবে তারা।ঠিক বুঝতে পারছিলাম না, এই পুরুষগুলো খদ্দের নাকি দালাল? নাকি তারা নিজেরাই জিগোলো?

তবে আর একটু সামনে গিয়ে খেয়াল করলাম, ফুটপাতের ওপর বেশ কিছু মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে। নাহ, তাদের পোশাক বা চাহনি আমার কাছে বিশেষ কিছু অশোভন মনে হলো না। সিঙ্গাপুরের অন্যান্য এলাকার মেয়েরাও এমন পোশাক পড়ে।

তবে ওই পুরুষগুলোর সামনে দিয়ে ওই রাস্তা ধরে যেতে আমার খারাপ লাগছিল। মেয়েগুলো ওদের পাশে কীভাবে দাঁড়িয়ে আছে ভেবে খুব খারাপ লাগলো আমার। আরও কিছুটা পথ এগোতে চোখে পড়লো, একজন শাড়িপরা নারী সামনে দিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন।

রাস্তার ওপর দাঁড়িয়ে থাকা ওই পুরুষগুলোর খুব কাছাকাছি চলে এসেছি। নাহ্, সামনে আর যেতে মন চাইলো না।

আমি ধ্রুবকে বললাম, “চলো এবার বাসায় যাই।”

আমরা আলজুনাইদ এমআরটি স্টেশনের দিকে হাঁটা শুরু করলাম। ফেরার পথে বারবার কুষ্টিয়ার ওই ভদ্রলোকের কথাটা মনে পড়লো। এই জায়গাটি যত খারাপ, ঠিক তত আবার ভালো। ভালো-মন্দ নিজের কাছে, যে যেভাবে নিজেকে গড়ে তোলে।

 

রোকেয়া লিটা: সাংবাদিক, rokeya.lita@hotmail.com

 

Comments

comments

সম্পাদক : মোহাম্মদ আবদুল বাছির
প্রকাশক: মোহাম্মদ জহিরুল ইসলাম
ফোন : ‎০১৭১৩৪০৯০৯০
৩৪৫/১, দিলু রোড, নিউ ইস্কাটন, ঢাকা-১০০০
X
 
নিয়মিত খবর পড়তে আমাদের ফেসবুক পেজে লাইক দিয়ে যুক্ত থাকুন
X