বৃহস্পতিবার, ২২শে ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ ইং, ১০ই ফাল্গুন, ১৪২৪ বঙ্গাব্দ, রাত ৮:২২
শিরোনাম
  • ঘৃণাকে বিজয়ী হতে দেয়া যাবে না, ট্রাম্পকে ইঙ্গিত করে জর্জ ক্লুনি
  • আমার একটাই চিন্তা দেশের মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন করা: প্রধানমন্ত্রী
  • ‘কেন্দ্রীয় সরকারের আগ্রাসী নীতির কারণে কাশ্মীরকে হারাতে হবে’
  • সাড়ে চারমাস পর মুখোমুখি, খাদিজাকে উদ্দেশ্য করে যা বলল বদরুল
  • খালেদার ‘সাজা’ বিরোধী নেতাকর্মীদের মনোবল ভাঙ্গার কৌশল!
  • বিএনপির কর্মসূচি ‘যথাসময়ে’ জানানো হবে: রিজভী
  • দলের জন্য বোলিং করতেও রাজি মুশফিক
  • শিশু জিহাদের মৃত্যু: চার জনের ১০ বছর করে কারাদণ্ড
  • অবশেষে বাড়ি অবরুদ্ধ করে রাখা সেই দেয়াল ভেঙ্গে ফেলা হচ্ছে
  • সাক্ষ্য দিলেন খাদিজা, চাইলেন বদরুলের সর্বোচ্চ শাস্তি
  • বদরুলের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিতে আদালতে খাদিজা
  • আজ বগুড়ায় যেসব প্রকল্প উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী
  • রোহিঙ্গা স্থানান্তরের সরকারি পরিকল্পনার সঙ্গে দ্বিমত মানবাধিকার কমিশনের
  • মহেশখালীতে ইয়াবা ব্যবসায়ীদের সঙ্গে পুলিশের ‘বন্দুকযুদ্ধ’
  • হোয়াইট হাউসে কাজ করার দীর্ঘ অভিজ্ঞতার কথা জানালেন এই বাংলাদেশি সাংবাদিক
Friday, September 23, 2016 9:17 pm
A- A A+ Print

সিসি ভীত সন্ত্রস্ত্র বিপর্যস্ত!

245498_1

‘আপনার সাথে কি ক্যামেরা লাগানো মোবাইল আছে?’ মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরির কাছে জানতে চাইলেন মিসরের প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসির এক দেহরক্ষী। চলতি মাসের শুরুতে সিসি আর কেরি উভয়েই রাষ্ট্রীয় সফরে ভারত গিয়েছিলেন। এর এক ফাঁকে মিসরের প্রেসিডেন্টের কক্ষে সাক্ষাতের জন্য যাওয়ার সময় কেরিকে প্রশ্নটি করেন ওই দেহরক্ষী। ‘কী?’ বিস্মিত কেরি জবাব দিয়েছিলেন। আনুষ্ঠানিক বৈঠকে কেরির কাছে ক্যামেরা সংযুক্ত মোবাইল ফোন থাকতে পারেÑ এ নিয়ে সিসি কেন উদ্বিগ্ন ছিলেন? ‘আপনার কাছে কি ক্যামেরা লাগানো মোবাইল আছে?’ নিরাপত্তারক্ষী প্রশ্নটি আবার করলেন। ‘না’ জবাব দিলেন কেরি। এরপর নিরাপত্তারক্ষীটি তাকে যাওয়ার সুযোগ দিলো। এই ঘটনার ভিডিওটি সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে। বেশ কয়েকজন অ্যাক্টিভিস্ট (আপনার কাছে কি ক্যামেরা লাগানো মোবাইল আছে) হ্যাশট্যাগে নিরাপত্তারক্ষীটির অদ্ভুত কথাগুলো ছড়িয়ে দেন। একটি টুইটে বলা হয়, ‘দেহরক্ষী জানতেন না, তার সামনে থাকা লোকটি মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী। এ ঘটনা দেখিয়ে দিচ্ছে, নিরাপত্তারক্ষীট কত অযোগ্য। তবে এর কারণ, শাসক নিজেই পশ্চাৎপদ।’ অবশ্য কৌতুকটি ছাড়াও এই ঘটনা আরেকটি মারাত্মক প্রশ্ন সৃষ্টি করেছে : সিসির মনে কেন চিন্তার সৃষ্টি হলো যে অফিসিয়াল মিটিংয়ে কেরির কাছে কেন ক্যামেরা লাগানো মোবাইল থাকবে? আসলে, তার ওপর নজরদারি চালানো হচ্ছে বলে যে ভয় সিসির মধ্যে প্রবলভাবে ঢুকে গেছে, এ ঘটনায় সেটাই প্রতিফলিত হয়েছে। এই ভয় তার প্রায় প্রতিটি বক্তৃতাতেও ফুটে ওঠে। তিনি প্রায়ই ‘চতুর্থ প্রজন্মের যুদ্ধের’ অভ্যুত্থান ও ষড়যন্ত্র তত্ত্ব আউড়ে থাকেন, যেখানে মিডিয়া, মনোস্তত্ত্ব ও গুপ্তচরবৃত্তিকে ব্যবহার করে মার্কিন নেতৃত্বাধীন বিশ্বশক্তিগুলো মিসর এবং পুরো অঞ্চলে ভয়ঙ্কর পরিস্থিতি সৃষ্টি করছে। সিসির মতে, তার শাসনের বিরুদ্ধে যেকোনো ধরনের ভিন্ন মত হলো বিদেশী শক্তির এজেন্টদের পরিকল্পিত বা অপরিকল্পিত বিশৃঙ্খলা ও নৈরাজ্য। এ ছাড়া দীর্ঘ দিন ধরে তিনি মুসলিম ব্রাদারহুডকে বোঝাতে যে পরিভাষা তিনি ব্যবহার করে আসছেন তা হলো ‘বিদেশী এজেন্ট’, ‘দুষ্টলোকেরা’ মিসরকে ধ্বংস করতে ‘নারকীয় পরিকল্পনা’ করতে ‘গোপন শক্তিতে’। জি২০-এ পরিত্যক্ত নয়াদিল্লির ঘটনার মাত্র কয়েক দিন পর ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়া একটি ফুটেজে মিসরের প্রেসিডেন্টকে দেখা যায় চীনে অনুষ্ঠিত জি২০ শীর্ষ সম্মেলনে। তিনি অপেক্ষায় ছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার সাথে শুভেচ্ছা বিনিময় করতে। কিন্তু দেখা গেল, মার্কিন প্রেসিডেন্ট তাকে তেমন গুরুত্ব দিচ্ছেন না, আশপাশের কর্মকর্তাদের সাথে যেভাবে কোনোমতে হ্যান্ডশেক করেছেন, সিসির সাথে ততটুকুই করেছেন। এই দৃশ্যের পর সিসিপন্থী টিভি উপস্থাপক আহমদ মুসা তার অনুষ্ঠানটি ওবামাকে অপমান ও অপদস্থ করার কাজে ব্যয় করেন। তিনি বলেন, ‘দুই প্রেসিডেন্ট ছিলেন সবচেয়ে পর্যুদস্ত : এরদোগান ও ওবামা।’ গত মে মাসে মিসরীয় কর্তৃপক্ষ কেরির সাথে আসা সাংবাদিকদের মিসরে প্রবেশ করতে বাধা দেয়। বাধাপ্রাপ্ত এক সাংবাদিক ছিলেন নিউ ইয়র্ক টাইমসে ডেভিড স্যাঙ্গার। তিনি লিখেছেন, মিসরীয় কর্তৃপক্ষ হয়তো এই ভয় পেয়েছিল, সাংবাদিকেরা হয়তো ‘মিসরীয় প্রেসিডেন্টকে তার জেলে ঢোকানো ভিন্ন মতালম্বীদের নিয়ে দুই একটি প্রশ্ন করবেন। কেরি ও সিসির মধ্যকার আনুষ্ঠানিক হ্যান্ডশেক করার দৃশ্য ধারণ করার জন্যই কেবল ফটোগ্রাফার ও ভিডিওগ্রাফারদের প্রেসিডেন্ট প্রাসাদে প্রবেশ করতে দেয়া হয়েছিল।’ স্যাঙ্গার বলেন, প্রায় দুই যুগ ধরে তিনি এমনকি সবচেয়ে নিপীড়নকারী দেশেও মার্কিন কর্মকর্তাদের সঙ্গী হয়েছেন। ‘আমি নেতাদের রুদ্ধদ্বার ঘরে অদৃশ্য হতে দেখতে অভ্যস্ত। তবে দরজা বন্ধ করাটাও দেখতে না দেয়ার মতো কিছু আগে কখনো ঘটেনি।’ এমনকি ২০১৪ সালের জুলাই মাসেও সিসির সাথে সাক্ষাৎ করার জন্য প্রেসিডেন্ট প্রাসাদে প্রবেশের আগে কেরির পুরো দেহ তন্ন তন্ন করে তল্লাশি চলানো হয়েছিল। নজিরবিহীন ঘটনাটি নিয়ে ব্যাপক বিদ্রƒপের সৃষ্টি হয়েছিল। মস্তিষ্কবিকৃতি বারবার এ ধরনের ঘটনা ঘটা এটাই প্রমাণ করে, কেরি বা মার্কিন কর্মকর্তাদের তার সংলাপে নজরদারি করার ভয়টা আসলে তার বৈধতা স্বীকৃতি দিতে ওবামা প্রশাসনের দ্বিধারই প্রতিফলন। ২০০৯ সালের পর মিসর সফর করেননি ওবামা। মজার ব্যাপার হলো, মার্কিন কর্মকর্তারা তার ওপর নজরদারি চালাচ্ছেন বলে ভয়ে যে সতর্কতা তাদের বিরুদ্ধে নেয়া হয়, তেমনটা কিন্তু সফররত অন্য দেশের কর্মকর্তাদের ব্যাপারে নেয়া হয় না। সিসি একসময় ছিলেন সামরিক গোয়েন্দা বিভাগের পরিচালক। সে কারণেই হয়তো মার্কিন কর্মকর্তাদের টেলিফোনে আড়িপাতার বিষয়টি নিয়ে বেশি চিন্তিত। তার ভয়ের আরেকটা কারণ হলো দেশটির প্রধান দু’টি টেলিকমিউনিকেশন্স কোম্পানিÑ এটি অ্যান্ড টি ইনকরপোরেশন ও ভারিজোন-যুক্তরাষ্ট্রের এবং উভয়টিই এফবিআইয়ের সাথে সম্পর্কিত। মিলানভিত্তিক হ্যাকিং টিমসহ বেশ কিছু পাশ্চাত্য প্রতিষ্ঠান সংযুক্ত আরব আমিরাত ও মিসরসহ মধ্যপ্রাচ্যে নিপীড়নমূলক দেশগুলোতে নজরদারি প্রযুক্তি বিক্রি করে থাকে। এসব প্রযুক্তি ব্যবহার করেই সিসির সরকার ভিন্নমতালম্বী এবং ইসলামপন্থী সবাইকে তার নজরদারির আওতায় রাখে। অবশ্য সিসির ভয় হলোÑ তিনি যে পদ্ধতি ব্যবহার করে থাকেন, যুক্তরাষ্ট্র তাকেই নজরদারিতে রাখতে সেটা প্রয়োগ করতে পারে। চতুর্থ প্রজন্মের ভয় সিসির বিশেষ ভয় হলো, কেরির সাথে তার বৈঠকে অব দি রেকর্ড যেসব কথা তিনি বলে ফেলতে পারেন, সেগুলো মার্কিন কর্মকর্তারা রেকর্ড করে ফেলতে পারেন। যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাপারে সিসির ক্রমবর্ধমান ভয়টি ঢুকছে দেশটির ১.৫ বিলিয়ন সামরিক সাহায্য সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেয়ায়। এর ফলে রাশিয়া, জার্মানি ও ফ্রান্সের দিকে মুখ ফেরাতে হয়েছে মিসরকে। অবশ্য গত বছর সিনাইয়ে আইএসের অস্তিত্ব দেখা যাওয়ার পর ওবামা প্রশাসন ঘোষণা করে, তারা মিসরে সামরিক সহায়তা আবার চালু করবে। কিন্তু এর মানে এই নয়, মোবারকের আমলে দুই দেশের মধ্যে যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল, আবার সে রকম হয়ে গেল। মার্কিন কর্মকর্তাদের প্রতি সিরি সন্দেহের মধ্যে উদ্বেগ বিশেষ করে আরব অঞ্চলে মার্কিন নেতৃত্বে ‘চতুর্থ প্রজন্মের যুদ্ধ’ নিয়ে তার ষড়যন্ত্র তত্ত্ব, আরব বসন্তের বিশৃঙ্খলা ছড়িয়ে দেয়া সামাজিক মাধ্যমের প্রতি ঘৃণার মিশ্রণ রয়েছে। সামাজিক মাধ্যমের প্রতি তার বিদ্বেষের অন্যতম কারণ হলো, বেশ কয়েকবার তার আসল অভিলাষ উন্মোচন করে দিয়ে সামাজিক মিডিয়া তাকে বিবৃতকর অবস্থায় ফেলে দিয়েছে। কেরির সাথে সাম্প্রতিক ঘটনাটির পর সরকারের মুখপাত্র আহমদ মুসা বলেন, আমেরিকানরা সব কিছুর ওপর গুপ্তচরবৃত্তি করছে, তারা রেকর্ড করা, আড়িপাতায় অত্যন্ত দক্ষ। অন্য একটি টিভি অনুষ্ঠানে মুসা সিরিয়ায় সরাসরি আঘাত হানা রুশ বিমান হামলার বিতর্কিত ভিডিও গেম প্রদর্শন করেন। তিনি বলেন, এটা হলো সন্ত্রাসাবদকে অর্থায়ন ও সমর্থনকারী দেশের (যুক্তরাষ্ট্রের দিকে ইঙ্গিত করে) সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে লড়াই করা শক্তির (রাশিয়ার দিকে ইঙ্গিত করে) মধ্যে পার্থক্য। একই যুক্তি দেয়া হয়েছিল ২০১১ সালের মিসর বিপ্লবের ব্যাপারেও। বলা হয়ে থাকে, সেটা উসকে দিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র, তুরস্ক, কাতার, হামাস ও ইরানি এজেন্টরা। সত্যিকার অর্থে সিরি নিজেও ষড়যন্ত্র তত্ত্বের একটি সৃষ্টি। তার শাসনে ব্যাপকভিত্তিক যে অর্থনৈতিক সঙ্কট সৃষ্টি হয়েছে, সেটা ঢেকে রাখার জন্য তিনি প্রায়ই এই পরিভাষাটা ব্যবহার করেন। তার শাসনের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য যেকোনো ধরনের গণবিদ্রোহ রুখে দেয়ার জন্য তিনি এটাকে ব্যবহার করছেন। তিনি বিশ্বাস করে থাকেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র পুরো অঞ্চলে নিয়ন্ত্রণ বিস্তার করার জন্য ষড়যন্ত্র চলছে। তার এই বক্তব্য মিসরে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়ে থাকে। সিসিপন্থী ও সিসিবিরোধী উভয় শিবিরই ‘নতুন মধ্যপ্রাচ্য’ নিয়ে কথা বলে। মজার ব্যাপার হলো, এটা কিন্তু তাদের আবিষ্কার নয়। এটা বলেছিলেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী কন্ডোলিৎসা রাইস, ২০০৬ সালে। এখন মিসরের সবাই বিশ্বাস করে, যুক্তরাষ্ট্র পুরো অঞ্চলের মানচিত্র নতুন করে তৈরি করছে। স্বপ্ন না দুঃস্বপ্ন? গত বছর তুর্কিভিত্তিক মিসরীয় স্যাটেলাইট টিভি চ্যানেল মেকামেলিন (মিসরের ইসলামপন্থী প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ মুরসির সমর্থক হিসেবে পরিচিত) একটি অডিও রেকর্ডিং প্রচার করে। এতে ২০১৪ সালে ওই সময়ের প্রতিরক্ষামন্ত্রী সিসিকে তার সহকর্মীদের উদ্দেশে উপসাগরীয় দেশগুলো সম্পর্কে আক্রমণাত্মক মন্তব্য করতে দেখা যায়। ধারণা করা হয়, মিসরে নিঃশর্তভাবে সাহায্য অব্যাহত রাখতে উপসাগরীয় দেশগুলোর উৎসাহ করে যাওয়ার অন্যতম কারণ এই অডিও সম্প্রচার। সিসির শাসনের শুরুর দিকে মিসরীয় সংবাদপত্র আল-মাসরি আল-ইয়োমকে তিনি সাক্ষাৎকার দেয়ার সময় অব দি রেকর্ড যেসব কথা বলেছিলেন, সেগুলোও ফাঁস হয়ে যায়, যদিও নিরাপত্তাব্যবস্থা মেনেও সেটি করা হয়েছিল। তিনি বলেছিলেন, ‘৩৫ বছর আগে আমি স্বপ্ন দেখেছিলাম, আমি তরবারি ধরে আছি। তাতে লাল রঙে লেখা ছিল ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’। আরেকটি স্বপ্নে সিসি কথা বলেছিলেন সাবেক প্রেসিডেন্ট আনোয়ার সাদতের সাথে। তখন সাদত ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন, সিসি প্রেসিডেন্ট হবে। তখন সিসি জবাব দিয়েছিলেন, ‘হ্যাঁ, আমি জানি’। স্বপ্ন কিংবা শেক্সপিয়রের ম্যাকবেথের দুঃস্বপ্ন সত্ত্বেও সিসির সম্ভব সব জায়গা থেকে ষড়যন্ত্রের আশঙ্কা করছেন। তার মনে ভয়, তার নির্যাতনমূলক শাসন তাকেই তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে। লেখক : মিসরের বিখ্যাত সাংবাদিক। আরব বসন্ত নিয়ে ব্যাপকভাবে কাজ করেছেন। মিসর পরিস্থিতি নিয়ে অনেক লেখালেখি করছেন। মোহাম্মদ মনসুর

Comments

Comments!

 সিসি ভীত সন্ত্রস্ত্র বিপর্যস্ত!AmarbangladeshonlineAmarbangladeshonline | Amarbangladeshonline

সিসি ভীত সন্ত্রস্ত্র বিপর্যস্ত!

Friday, September 23, 2016 9:17 pm
245498_1

‘আপনার সাথে কি ক্যামেরা লাগানো মোবাইল আছে?’ মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরির কাছে জানতে চাইলেন মিসরের প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসির এক দেহরক্ষী। চলতি মাসের শুরুতে সিসি আর কেরি উভয়েই রাষ্ট্রীয় সফরে ভারত গিয়েছিলেন। এর এক ফাঁকে মিসরের প্রেসিডেন্টের কক্ষে সাক্ষাতের জন্য যাওয়ার সময় কেরিকে প্রশ্নটি করেন ওই দেহরক্ষী।

‘কী?’ বিস্মিত কেরি জবাব দিয়েছিলেন।

আনুষ্ঠানিক বৈঠকে কেরির কাছে ক্যামেরা সংযুক্ত মোবাইল ফোন থাকতে পারেÑ এ নিয়ে সিসি কেন উদ্বিগ্ন ছিলেন?

‘আপনার কাছে কি ক্যামেরা লাগানো মোবাইল আছে?’ নিরাপত্তারক্ষী প্রশ্নটি আবার করলেন। ‘না’ জবাব দিলেন কেরি। এরপর নিরাপত্তারক্ষীটি তাকে যাওয়ার সুযোগ দিলো।

এই ঘটনার ভিডিওটি সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে। বেশ কয়েকজন অ্যাক্টিভিস্ট (আপনার কাছে কি ক্যামেরা লাগানো মোবাইল আছে) হ্যাশট্যাগে নিরাপত্তারক্ষীটির অদ্ভুত কথাগুলো ছড়িয়ে দেন। একটি টুইটে বলা হয়, ‘দেহরক্ষী জানতেন না, তার সামনে থাকা লোকটি মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী। এ ঘটনা দেখিয়ে দিচ্ছে, নিরাপত্তারক্ষীট কত অযোগ্য। তবে এর কারণ, শাসক নিজেই পশ্চাৎপদ।’

অবশ্য কৌতুকটি ছাড়াও এই ঘটনা আরেকটি মারাত্মক প্রশ্ন সৃষ্টি করেছে : সিসির মনে কেন চিন্তার সৃষ্টি হলো যে অফিসিয়াল মিটিংয়ে কেরির কাছে কেন ক্যামেরা লাগানো মোবাইল থাকবে?

আসলে, তার ওপর নজরদারি চালানো হচ্ছে বলে যে ভয় সিসির মধ্যে প্রবলভাবে ঢুকে গেছে, এ ঘটনায় সেটাই প্রতিফলিত হয়েছে। এই ভয় তার প্রায় প্রতিটি বক্তৃতাতেও ফুটে ওঠে। তিনি প্রায়ই ‘চতুর্থ প্রজন্মের যুদ্ধের’ অভ্যুত্থান ও ষড়যন্ত্র তত্ত্ব আউড়ে থাকেন, যেখানে মিডিয়া, মনোস্তত্ত্ব ও গুপ্তচরবৃত্তিকে ব্যবহার করে মার্কিন নেতৃত্বাধীন বিশ্বশক্তিগুলো মিসর এবং পুরো অঞ্চলে ভয়ঙ্কর পরিস্থিতি সৃষ্টি করছে।

সিসির মতে, তার শাসনের বিরুদ্ধে যেকোনো ধরনের ভিন্ন মত হলো বিদেশী শক্তির এজেন্টদের পরিকল্পিত বা অপরিকল্পিত বিশৃঙ্খলা ও নৈরাজ্য।

এ ছাড়া দীর্ঘ দিন ধরে তিনি মুসলিম ব্রাদারহুডকে বোঝাতে যে পরিভাষা তিনি ব্যবহার করে আসছেন তা হলো ‘বিদেশী এজেন্ট’, ‘দুষ্টলোকেরা’ মিসরকে ধ্বংস করতে ‘নারকীয় পরিকল্পনা’ করতে ‘গোপন শক্তিতে’।

জি২০-এ পরিত্যক্ত

নয়াদিল্লির ঘটনার মাত্র কয়েক দিন পর ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়া একটি ফুটেজে মিসরের প্রেসিডেন্টকে দেখা যায় চীনে অনুষ্ঠিত জি২০ শীর্ষ সম্মেলনে। তিনি অপেক্ষায় ছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার সাথে শুভেচ্ছা বিনিময় করতে। কিন্তু দেখা গেল, মার্কিন প্রেসিডেন্ট তাকে তেমন গুরুত্ব দিচ্ছেন না, আশপাশের কর্মকর্তাদের সাথে যেভাবে কোনোমতে হ্যান্ডশেক করেছেন, সিসির সাথে ততটুকুই করেছেন।

এই দৃশ্যের পর সিসিপন্থী টিভি উপস্থাপক আহমদ মুসা তার অনুষ্ঠানটি ওবামাকে অপমান ও অপদস্থ করার কাজে ব্যয় করেন। তিনি বলেন, ‘দুই প্রেসিডেন্ট ছিলেন সবচেয়ে পর্যুদস্ত : এরদোগান ও ওবামা।’

গত মে মাসে মিসরীয় কর্তৃপক্ষ কেরির সাথে আসা সাংবাদিকদের মিসরে প্রবেশ করতে বাধা দেয়। বাধাপ্রাপ্ত এক সাংবাদিক ছিলেন নিউ ইয়র্ক টাইমসে ডেভিড স্যাঙ্গার। তিনি লিখেছেন, মিসরীয় কর্তৃপক্ষ হয়তো এই ভয় পেয়েছিল, সাংবাদিকেরা হয়তো ‘মিসরীয় প্রেসিডেন্টকে তার জেলে ঢোকানো ভিন্ন মতালম্বীদের নিয়ে দুই একটি প্রশ্ন করবেন। কেরি ও সিসির মধ্যকার আনুষ্ঠানিক হ্যান্ডশেক করার দৃশ্য ধারণ করার জন্যই কেবল ফটোগ্রাফার ও ভিডিওগ্রাফারদের প্রেসিডেন্ট প্রাসাদে প্রবেশ করতে দেয়া হয়েছিল।’

স্যাঙ্গার বলেন, প্রায় দুই যুগ ধরে তিনি এমনকি সবচেয়ে নিপীড়নকারী দেশেও মার্কিন কর্মকর্তাদের সঙ্গী হয়েছেন। ‘আমি নেতাদের রুদ্ধদ্বার ঘরে অদৃশ্য হতে দেখতে অভ্যস্ত। তবে দরজা বন্ধ করাটাও দেখতে না দেয়ার মতো কিছু আগে কখনো ঘটেনি।’

এমনকি ২০১৪ সালের জুলাই মাসেও সিসির সাথে সাক্ষাৎ করার জন্য প্রেসিডেন্ট প্রাসাদে প্রবেশের আগে কেরির পুরো দেহ তন্ন তন্ন করে তল্লাশি চলানো হয়েছিল। নজিরবিহীন ঘটনাটি নিয়ে ব্যাপক বিদ্রƒপের সৃষ্টি হয়েছিল।

মস্তিষ্কবিকৃতি

বারবার এ ধরনের ঘটনা ঘটা এটাই প্রমাণ করে, কেরি বা মার্কিন কর্মকর্তাদের তার সংলাপে নজরদারি করার ভয়টা আসলে তার বৈধতা স্বীকৃতি দিতে ওবামা প্রশাসনের দ্বিধারই প্রতিফলন। ২০০৯ সালের পর মিসর সফর করেননি ওবামা।

মজার ব্যাপার হলো, মার্কিন কর্মকর্তারা তার ওপর নজরদারি চালাচ্ছেন বলে ভয়ে যে সতর্কতা তাদের বিরুদ্ধে নেয়া হয়, তেমনটা কিন্তু সফররত অন্য দেশের কর্মকর্তাদের ব্যাপারে নেয়া হয় না।

সিসি একসময় ছিলেন সামরিক গোয়েন্দা বিভাগের পরিচালক। সে কারণেই হয়তো মার্কিন কর্মকর্তাদের টেলিফোনে আড়িপাতার বিষয়টি নিয়ে বেশি চিন্তিত। তার ভয়ের আরেকটা কারণ হলো দেশটির প্রধান দু’টি টেলিকমিউনিকেশন্স কোম্পানিÑ এটি অ্যান্ড টি ইনকরপোরেশন ও ভারিজোন-যুক্তরাষ্ট্রের এবং উভয়টিই এফবিআইয়ের সাথে সম্পর্কিত।

মিলানভিত্তিক হ্যাকিং টিমসহ বেশ কিছু পাশ্চাত্য প্রতিষ্ঠান সংযুক্ত আরব আমিরাত ও মিসরসহ মধ্যপ্রাচ্যে নিপীড়নমূলক দেশগুলোতে নজরদারি প্রযুক্তি বিক্রি করে থাকে। এসব প্রযুক্তি ব্যবহার করেই সিসির সরকার ভিন্নমতালম্বী এবং ইসলামপন্থী সবাইকে তার নজরদারির আওতায় রাখে।

অবশ্য সিসির ভয় হলোÑ তিনি যে পদ্ধতি ব্যবহার করে থাকেন, যুক্তরাষ্ট্র তাকেই নজরদারিতে রাখতে সেটা প্রয়োগ করতে পারে।

চতুর্থ প্রজন্মের ভয়

সিসির বিশেষ ভয় হলো, কেরির সাথে তার বৈঠকে অব দি রেকর্ড যেসব কথা তিনি বলে ফেলতে পারেন, সেগুলো মার্কিন কর্মকর্তারা রেকর্ড করে ফেলতে পারেন। যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাপারে সিসির ক্রমবর্ধমান ভয়টি ঢুকছে দেশটির ১.৫ বিলিয়ন সামরিক সাহায্য সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেয়ায়। এর ফলে রাশিয়া, জার্মানি ও ফ্রান্সের দিকে মুখ ফেরাতে হয়েছে মিসরকে।

অবশ্য গত বছর সিনাইয়ে আইএসের অস্তিত্ব দেখা যাওয়ার পর ওবামা প্রশাসন ঘোষণা করে, তারা মিসরে সামরিক সহায়তা আবার চালু করবে। কিন্তু এর মানে এই নয়, মোবারকের আমলে দুই দেশের মধ্যে যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল, আবার সে রকম হয়ে গেল।

মার্কিন কর্মকর্তাদের প্রতি সিরি সন্দেহের মধ্যে উদ্বেগ বিশেষ করে আরব অঞ্চলে মার্কিন নেতৃত্বে ‘চতুর্থ প্রজন্মের যুদ্ধ’ নিয়ে তার ষড়যন্ত্র তত্ত্ব, আরব বসন্তের বিশৃঙ্খলা ছড়িয়ে দেয়া সামাজিক মাধ্যমের প্রতি ঘৃণার মিশ্রণ রয়েছে। সামাজিক মাধ্যমের প্রতি তার বিদ্বেষের অন্যতম কারণ হলো, বেশ কয়েকবার তার আসল অভিলাষ উন্মোচন করে দিয়ে সামাজিক মিডিয়া তাকে বিবৃতকর অবস্থায় ফেলে দিয়েছে।

কেরির সাথে সাম্প্রতিক ঘটনাটির পর সরকারের মুখপাত্র আহমদ মুসা বলেন, আমেরিকানরা সব কিছুর ওপর গুপ্তচরবৃত্তি করছে, তারা রেকর্ড করা, আড়িপাতায় অত্যন্ত দক্ষ। অন্য একটি টিভি অনুষ্ঠানে মুসা সিরিয়ায় সরাসরি আঘাত হানা রুশ বিমান হামলার বিতর্কিত ভিডিও গেম প্রদর্শন করেন। তিনি বলেন, এটা হলো সন্ত্রাসাবদকে অর্থায়ন ও সমর্থনকারী দেশের (যুক্তরাষ্ট্রের দিকে ইঙ্গিত করে) সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে লড়াই করা শক্তির (রাশিয়ার দিকে ইঙ্গিত করে) মধ্যে পার্থক্য।

একই যুক্তি দেয়া হয়েছিল ২০১১ সালের মিসর বিপ্লবের ব্যাপারেও। বলা হয়ে থাকে, সেটা উসকে দিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র, তুরস্ক, কাতার, হামাস ও ইরানি এজেন্টরা।

সত্যিকার অর্থে সিরি নিজেও ষড়যন্ত্র তত্ত্বের একটি সৃষ্টি। তার শাসনে ব্যাপকভিত্তিক যে অর্থনৈতিক সঙ্কট সৃষ্টি হয়েছে, সেটা ঢেকে রাখার জন্য তিনি প্রায়ই এই পরিভাষাটা ব্যবহার করেন। তার শাসনের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য যেকোনো ধরনের গণবিদ্রোহ রুখে দেয়ার জন্য তিনি এটাকে ব্যবহার করছেন।

তিনি বিশ্বাস করে থাকেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র পুরো অঞ্চলে নিয়ন্ত্রণ বিস্তার করার জন্য ষড়যন্ত্র চলছে। তার এই বক্তব্য মিসরে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়ে থাকে। সিসিপন্থী ও সিসিবিরোধী উভয় শিবিরই ‘নতুন মধ্যপ্রাচ্য’ নিয়ে কথা বলে। মজার ব্যাপার হলো, এটা কিন্তু তাদের আবিষ্কার নয়। এটা বলেছিলেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী কন্ডোলিৎসা রাইস, ২০০৬ সালে। এখন মিসরের সবাই বিশ্বাস করে, যুক্তরাষ্ট্র পুরো অঞ্চলের মানচিত্র নতুন করে তৈরি করছে।

স্বপ্ন না দুঃস্বপ্ন?

গত বছর তুর্কিভিত্তিক মিসরীয় স্যাটেলাইট টিভি চ্যানেল মেকামেলিন (মিসরের ইসলামপন্থী প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ মুরসির সমর্থক হিসেবে পরিচিত) একটি অডিও রেকর্ডিং প্রচার করে। এতে ২০১৪ সালে ওই সময়ের প্রতিরক্ষামন্ত্রী সিসিকে তার সহকর্মীদের উদ্দেশে উপসাগরীয় দেশগুলো সম্পর্কে আক্রমণাত্মক মন্তব্য করতে দেখা যায়। ধারণা করা হয়, মিসরে নিঃশর্তভাবে সাহায্য অব্যাহত রাখতে উপসাগরীয় দেশগুলোর উৎসাহ করে যাওয়ার অন্যতম কারণ এই অডিও সম্প্রচার।

সিসির শাসনের শুরুর দিকে মিসরীয় সংবাদপত্র আল-মাসরি আল-ইয়োমকে তিনি সাক্ষাৎকার দেয়ার সময় অব দি রেকর্ড যেসব কথা বলেছিলেন, সেগুলোও ফাঁস হয়ে যায়, যদিও নিরাপত্তাব্যবস্থা মেনেও সেটি করা হয়েছিল। তিনি বলেছিলেন, ‘৩৫ বছর আগে আমি স্বপ্ন দেখেছিলাম, আমি তরবারি ধরে আছি। তাতে লাল রঙে লেখা ছিল ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’। আরেকটি স্বপ্নে সিসি কথা বলেছিলেন সাবেক প্রেসিডেন্ট আনোয়ার সাদতের সাথে। তখন সাদত ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন, সিসি প্রেসিডেন্ট হবে। তখন সিসি জবাব দিয়েছিলেন, ‘হ্যাঁ, আমি জানি’।

স্বপ্ন কিংবা শেক্সপিয়রের ম্যাকবেথের দুঃস্বপ্ন সত্ত্বেও সিসির সম্ভব সব জায়গা থেকে ষড়যন্ত্রের আশঙ্কা করছেন। তার মনে ভয়, তার নির্যাতনমূলক শাসন তাকেই তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে।

লেখক : মিসরের বিখ্যাত সাংবাদিক। আরব বসন্ত নিয়ে ব্যাপকভাবে কাজ করেছেন। মিসর পরিস্থিতি নিয়ে অনেক লেখালেখি করছেন।

মোহাম্মদ মনসুর

Comments

comments

সম্পাদক : মোহাম্মদ আবদুল বাছির
প্রকাশক: মোহাম্মদ জহিরুল ইসলাম
ফোন : ‎০১৭১৩৪০৯০৯০
৩৪৫/১, দিলু রোড, নিউ ইস্কাটন, ঢাকা-১০০০
X
 
নিয়মিত খবর পড়তে আমাদের ফেসবুক পেজে লাইক দিয়ে যুক্ত থাকুন
X