রবিবার, ১৮ই ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ ইং, ৬ই ফাল্গুন, ১৪২৪ বঙ্গাব্দ, বিকাল ৪:৫৫
শিরোনাম
  • ঘৃণাকে বিজয়ী হতে দেয়া যাবে না, ট্রাম্পকে ইঙ্গিত করে জর্জ ক্লুনি
  • আমার একটাই চিন্তা দেশের মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন করা: প্রধানমন্ত্রী
  • ‘কেন্দ্রীয় সরকারের আগ্রাসী নীতির কারণে কাশ্মীরকে হারাতে হবে’
  • সাড়ে চারমাস পর মুখোমুখি, খাদিজাকে উদ্দেশ্য করে যা বলল বদরুল
  • খালেদার ‘সাজা’ বিরোধী নেতাকর্মীদের মনোবল ভাঙ্গার কৌশল!
  • বিএনপির কর্মসূচি ‘যথাসময়ে’ জানানো হবে: রিজভী
  • দলের জন্য বোলিং করতেও রাজি মুশফিক
  • শিশু জিহাদের মৃত্যু: চার জনের ১০ বছর করে কারাদণ্ড
  • অবশেষে বাড়ি অবরুদ্ধ করে রাখা সেই দেয়াল ভেঙ্গে ফেলা হচ্ছে
  • সাক্ষ্য দিলেন খাদিজা, চাইলেন বদরুলের সর্বোচ্চ শাস্তি
  • বদরুলের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিতে আদালতে খাদিজা
  • আজ বগুড়ায় যেসব প্রকল্প উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী
  • রোহিঙ্গা স্থানান্তরের সরকারি পরিকল্পনার সঙ্গে দ্বিমত মানবাধিকার কমিশনের
  • মহেশখালীতে ইয়াবা ব্যবসায়ীদের সঙ্গে পুলিশের ‘বন্দুকযুদ্ধ’
  • হোয়াইট হাউসে কাজ করার দীর্ঘ অভিজ্ঞতার কথা জানালেন এই বাংলাদেশি সাংবাদিক
Friday, September 2, 2016 10:44 am
A- A A+ Print

স্বামী মানেই ‘লাইফপার্টনার’ মনে করেন না রোকেয়া প্রাচী

240230_1

রোকেয়া প্রাচী, একনামেই তাকে চেনেন দেশের মানুষ। অভিনয়ে-নির্মাণে-লড়াইয়ে, সবখানেই সচল ও সফল। ঢাকার মিরপুরে বড় হয়ে ওঠা এই কৃষ্ণকলির শিল্প-জমিনে পথচলা শুরু থিয়েটার দিয়ে। প্রথম চলচ্চিত্র ‘দুখাই’ তাকে এনে দেয় জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার। অভিনয়ে মুন্সিয়ানায় জন্য দেশের বাইরেও একাধিকবার পুরস্কৃত হয়েছেন। হাত পাকিয়েছেন টিভিনাটক ও ডকুমেন্টারি নির্মাণে। প্রস্তুতি নিচ্ছেন চলচ্চিত্র নির্মাণের। শিল্পী জীবনের বাইরেও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে তার পদচারণা আছে। নাগরিক অধিকার আদায় কিংবা শ্রমিকের ন্যায়সঙ্গত দাবির লড়াইয়ে তাকে দেখা যায় মিছিলের প্রথম সারিতে। রোকেয়া প্রাচীর ব্যক্তিজীবনও বেশ সংগ্রামমুখর। রক্ষণশীল পরিবারের মেয়ে হয়ে স্বজনদের চোখরাঙানি উপেক্ষা করে নাট্যচর্চা করেছেন। ভালোবেসে বিয়ে করেছিলেন পুলিশ সার্জেন্ট আহাদ পারভেজকে। ২০০০ সালে কর্তব্যরত অবস্থায় ছিনতাইকারীর ছুরিকাঘাতে নিহত হন সার্জেন্ট আহাদ। চার বছর পর ঘর বাঁধেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনের শিক্ষক টকশো’র আলোচক আসিফ নজরুলকে।৮ বছরের সেই সংসার ভেঙে যায় ২০১২। দুই কন্যাসন্তান নিয়ে এরপর একাই আছেন। সম্প্রতি রোকেয়া প্রাচী এসেছিলেন পূর্বপশ্চিম অফিসে। মন খুলে বলেছেন নিজের জীবনসংগ্রাম আর চিন্তাচেতনা নিয়ে। ব্যক্তিজীবনের প্রসঙ্গও এসেছে কথোপকথনে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন- বিপুল হাসান প্রশ্ন: অনেকদিন ধরেই শোনা যাচ্ছে, চলচ্চিত্র নির্মাণের কাজ শুরু করতে চলেছেন। শুরুতেই এ বিষয়ে জানতে চাই। রোকেয়া প্রাচী: কাজ শুরু করেছি। এখন চলছে চিত্রনাট্যের কাজ, গল্প আমার নিজের লেখা। আশা করছি, আনুষাঙ্গিক কাজগুলো এবছর নভেম্বর-ডিসেম্বরের মধ্যে শেষ করতে পারবো। আগামী বছর মার্চ-এপ্রিল নাগাদ শুটিংয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। আসলে চলচ্চিত্র একটা বড় জায়গা। কাজেই পরিকল্পনার জন্য যথেষ্ট সময় নিয়েছি। আর কাজটা আমি যথেষ্ট সময় নিয়ে করতে চাই। তারেক মাসুদ, মোরশেদুল ইসলাম, গৌতম ঘোষের মতো গুণি পরিচালকের সঙ্গে কাজ করার সৌভাগ্য আমার হয়েছে। তাদের সঙ্গে কাজ করতে গিয়ে শিখেছিও অনেক। আমার চলচ্চিত্রে আমি সেগুলোর প্রতিফলন ঘটাতে চাই। প্রশ্ন: চলচ্চিত্রের কাহিনী আর বিষয় সম্পর্কে বলবেন? রোকেয়া প্রাচী: আপাতত সেটা বলতে চাচ্ছি না। অবশ্যই মানবিক আবেদন নিয়ে চলচ্চিত্রটি নির্মিত হবে। নিজের প্রথম চলচ্চিত্র, কাজেই এতে নতুনত্ব আর বৈচিত্র্য আনার প্রচেষ্টা আমার থাকবে। সব বয়সী সব শ্রেণীর দর্শকের জন্যই ছবিটি বানাবো। প্রশ্ন: : গতবছর কলকাতা ইন্টারন্যাশনাল ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে আশরাফ শিশির পরিচালিত ‘গাড়িওয়ালা’ চলচ্চিত্রে অভিনয়ের জন্য সেরা অভিনেত্রীর (পার্শ্ব) পুরস্কার পান আপনি। এরপর থেকে কলকাতার নামী বেশ কজন নির্মাতা নাকি আপনাকে তাদের ছবিতে পেতে আগ্রহী হয়ে ওঠেন। কলকাতার কোনো ছবিতে কী অভিনয় করছেন? রোকেয়া প্রাচী: এই গ্লোবালাইজেশনের যুগে একদেশের শিল্পীর আরেকদেশের অভিনয় নতুন কিছু নয়। আর কলকাতা তো একেবারে বাড়ির পাশের শহর। ওখান থেকে যেমন আমাদের এখানে এসে অনেক শিল্পী অভিনয় করছেন, তেমনি আমাদের অভিনেতা-অভিনেত্রীরাও কলকাতায় কাজ করছেন। যৌথ প্রযোজনায় গৌতম ঘোষের চলচ্চিত্রে অভিনয়ের অভিজ্ঞতাও আমার হয়েছে। আর কলকাতার ছবিতে কাজ করার প্রস্তাব পেয়েছি অনেক আগেই। সেই ‘মাটির ময়না’ ছবিটি করার পর থেকেই। কিন্তু সবকিছু ঠিকঠাক মেলাতে না পারায় কাজ করা হয়নি। এবারের কলকাতা ফেস্টিভ্যালের পর সেখানকার একাধিক নির্মাতা আমার সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন। কয়েকটা স্ক্রিপ্টও আমার কাছে এসেছে। দু’একজনের সঙ্গে কথাবার্তা প্রায় চুড়ান্ত হয়েছে। এথনো যেহেতু সই করিনি, তাই এখনই নাম উল্লেখ করাটা ঠিক হবে না। প্রশ্ন: আশির দশকেও কলকাতার ছবির চেয়ে আমাদের ছবি এগিয়ে ছিল। আজকে পুরো চিত্রটাই পাল্টে গেছে। ঢালিউডকে পেছনে ফেলে টালিউড বহুদূর এগিয়ে গেছে, কিছু ছবি তো বলিউডের সঙ্গে পাল্লা দিচ্ছে। বাংলাদেশের ছবি ক্রমশই পিছিয়ে পড়ার কারণ কী? রোকেয়া প্রাচী: পুরো বিষয়টির সঙ্গে ইনভেস্টমেন্ট জড়িত। কলকাতার একেকটি ছবি এখন যে বাজেটে নির্মাণ করা হচ্ছে, সেই বাজেট দিয়ে আমাদের এখানে একডজন ছবি নির্মাণ করতে হয়। কলকাতার ফিল্ম ইন্ডাষ্ট্রিতে বিনিয়োগে এগিয়ে এসেছেন প্রতিষ্ঠিত অর্থলগ্নীকারীরা। আমাদের এখানে চলচ্চিত্রে বিনিয়োগকারী কই? হাতেগোনা কয়েকটি ছবি সীমিত অংকের সরকারী অনুদানে নির্মিত হচ্ছে। একমাত্র ইমপ্রেস ছাড়া অন্য কোনো প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠান চলচ্চিত্রে বিনিয়োগে এগিয়ে আসেনি। কলকাতার ছবির বাজারটাও দেখতে হবে, পুরো ভারত জুড়েই ওদের বাজার। আমাদের চলচ্চিত্রের পিছিয়ে পড়ার আরো একটি কারণ হলো, নকল-অনুকরণ এবং চৌর্যবৃত্তি। আমাদের দেশে গল্পের অভাব নেই। প্রতিটি অঞ্চলে প্রতিটি জনপদে ছড়িয়ে আছে অসংখ্য গল্প। কিন্তু আমরা গল্প চুরি করছি মুম্বাই বা তামিল ছবি থেকে। চলচ্চিত্র তো একটা শিল্প। শিল্পের ক্ষেত্রে কম্প্রোমাইজ চলে না। কিন্তু একটা চলচ্চিত্র নির্মাণ করতে গিয়ে আমাদের নির্মাতাদের এতো বেশি কম্প্রোমাইজ করতে হয় যে, সেখান থেকে শিল্প জিনিষটাই হারিয়ে যাচ্ছে। প্রশ্ন:  আমাদের টিভি দর্শকদের সিংহভাগই এখন ভারতীয় বাংলা চ্যানেল নিয়ে মজে আছে। দেশীয় টিভি চ্যানেলের নাটক-ধারাবাহিক দর্শকদের টানতে পারছে না কেন? রোকেয়া প্রাচী: সমস্যা ওই একটাই, বাজেট। আমাদের টিভিনাটকগুলো খুব স্বল্প বাজেটে নির্মিত হয়। একটি নাটকে যখন বাজেট কম থাকে স্বাভাবিকভাবেই সেটার গল্প ভালো হয় না, নির্মাণশৈলীতে নতুনত্ব থাকে না। অন্যদিকে স্বল্প বাজেটের এ নাটকগুলো প্রচারের সময় অনেক বেশি বিজ্ঞাপন প্রচার হয়। আর মূলত এই কারণেই দর্শক দেশীয় নাটক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। হাতের কাছেই আছে মোটা অংকের বাজেটে তৈরি রঙচঙে ভারতীয় সিলিয়িাল-মেগাসিরিয়াল। রিমোর্ট টিপে তারা চলে যাচ্ছেন জি-বাংলা কিংবা স্টার জলসার পর্দায়। প্রশ্ন:  বাজেট কেন বাড়ছে না? রোকেয়া প্রাচী: আসলে এ জন্য আমরা নির্মাতা-কলাকুশলী আর শিল্পীরই দায়ী। আমরা যারা টিভি মিডিয়ায় কাজ করাকে পেশা হিসেবে নিয়েছি, তাদের মধ্যে এক অস্থীর প্রতিযোগিতা আছে। আর এর সুযোগটা নিচ্ছে টিভি চ্যানেল আর বিজ্ঞাপনদাতারা। যেমন: বিশেষ দিনের জন্য একটা নাটক ভালো বাজেটে তৈরি করে চ্যানেলে নিয়ে গেলাম। চ্যানেল কর্তৃপক্ষ স্পনসরদের কথা তুলে জানিয়ে দেবে, এতো টাকা দিয়ে তারা নাটকটা নেবে না। ধরেন নিজের লসের কথা ভেবে কম টাকায় নাটক বিক্রি না করে চলে এলাম। সঙ্গে সঙ্গে ওই বিশেষ দিনের জন্য আরেকজন নির্মাতা তার স্বল্প বাজেটে নির্মিত নাটক নিয়ে হাজির হবে। এরপর কিভাবে আমি মোটা বাজেটে মানসম্পন্ন নাটক তৈরিতে উৎসাহ পাবো। কোনোরকমে জোড়াতালি কাজ করে প্রডাকশন শেষ করবো। এভাবেই আমাদের টিভি নাটকের মান দিন দিন কমে গেছে। আমাদের মধ্যে ইউনিটি নাই, যার কারণে প্রেশার ক্রিয়েট করাও সম্ভব হচ্ছে না। প্রশ্ন: শিল্পী-কলাকুশলী-নির্মাতাদের তো বেশ কয়েকটি সংগঠন রয়েছে, এসব সংগঠন কী করছে? রোকেয়া প্রাচী: টেলিভিশন প্রযোজক সমিতি বা ডিরেক্টর গিল্ডসের মতো সংগঠনগুলো যে একেবারেই কাজ করছে না, তা বলা যাবে না। টিভি মিডিয়ার সমস্যাগুলো আমরা জানি। এসব সমস্যা বিচ্ছিন্নভাবে সমাধান করা যাবে না। এজন্য চাই সবগুলো সংগঠনের সম্মিলিত উদ্যোগ। নির্মাতা, নাট্যকার, অভিনেতা-অভিনেত্রী, টিভি চ্যানেল, এজেন্সি, বিজ্ঞাপনদাতা সবার সমন্বয়েই এই নীতিমালা তৈরি করলে কিছুটা সমাধান হবে। এজন্য সবগুলো সংগঠনের সমন্বয়ে একটা ফেডারেশন গড়ে তোলা দরকার। প্রশ্ন: টিভি মিডিয়ায় যারা কাজ করছেন, তাদের মধ্যে পেশাদারিত্ব কেমন? রোকেয়া প্রাচী: দেশে এখন টিভি চ্যানেলের সংখ্যা বেড়েছে। নাটক-অনুষ্ঠান নির্মাণের সংখ্যাও বেড়েছে। এই মাধ্যমে কাজ করা শিল্পীকলাকুশলীদের সংখ্যাও কম নয়। কিন্তু অপ্রিয় হলেও সত্য, এই সেক্টরে এখনো পেশাদারিত্ব গড়ে ওঠেনি। আমরা যার যার মতো কাজ করছি। কাজে আন্তকিরতা আছে, পেশাদারিত্ব নেই। একটা বায়বীয় পর্যায়ে কাজ করছি। কোনো চুক্তি ছাড়াই কাজ করছি। মৌখিক কথাবার্তার ভিত্তিতে এখানে কাজ হচ্ছে। যার কারণে প্রায়ই অনাকাঙ্খিত ঘটনা ঘটছে। কখনো শিল্পীরা শিডিউল ফাঁসাচ্ছে, নির্মাতাকে আর্থিক ক্ষতি গুনতে হচ্ছে। আবার দেখা যায়, নির্মাতা একজন শিল্পীর কাছ থেকে একদিনের শিডিউল নিয়েছে, কিন্তু কাজ করাচ্ছে তিনদিন। শিল্পীকে তার প্রাপ্য পারিশ্রমিক বা সম্মানী দেয়া হচ্ছে না। প্রফেশনালিজম থাকলে এমন হতো না। আমি মনে করি প্রফেশনালিজমের একটা নীতিমালা খুবই জরুরী। এতে নাটকের শুটিংয়ের আগে পরিচালক ও শিল্পীদের মধ্যে চুক্তি সইয়ের বাধ্যবাধকতা থাকবে। ওই চুক্তি অনুযায়ী শিল্পী ও নির্মাতারা কাজ করবেন। অতিরিক্ত সময়ের জন্য শিল্পীদের ভাতা দিতে হবে। কোনো শিল্পী শিডিউল ফাঁসালে তাকে ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। এরকম আরো কিছু শর্ত। প্রশ্ন: বিভিন্ন ইস্যুতে গড়ে ওঠা নাগরিক আন্দোলনে আপনাকে রাজপথে দেখতে পাই। গণজাগরণ মঞ্চের শুরুর দিকের কার্যক্রমেও আপনাকে সক্রিয় ভূমিকায় দেখা গেছে। কিন্তু বেশ কিছুদিন হলো আপনি সেখানে অনুপস্থিত। কারণটা কী? রোকেয়া প্রাচী: দেশের প্রতি, দেশের মানুষের প্রতি এবং মুক্তিযুদ্ধের প্রতি দায়বদ্ধতা থেকেই গণজাগরণ মঞ্চের আন্দোলনে একাত্ম হয়েছিলাম। কিন্তু এখন এই প্লাটফর্মটি হয়ে ওঠেছে স্বার্থকেন্দ্রিক ও ব্যক্তিকেন্দ্রিক। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ছড়িয়ে দেওয়ার যে উদ্দেশ্য নিয়ে গণজাগরণ মঞ্চ গড়ে ওঠেছিল, সেটার সঙ্গে এখনও আমি একাত্ম। কিন্তু ইমরান এইচ সরকারের নের্তৃত্বের গণজাগরণ মঞ্চের সঙ্গে আমি নেই। কারণ মহৎ উদ্দেশ্য নিয়ে গড়ে ওঠে জাগরণ মঞ্চকে তার নের্তৃত্ব একটা বিতর্কিত জায়গায় নিয়ে গেছে। একারণেই ইমরান সরকারের আন্দোলন থেকে আমি সরে দাঁড়িয়েছি। প্রশ্ন: ইদানিং আপনাকে শ্রমজীবীদের বিভিন্ন আন্দোলনে খুঁজে পাওয়া যায়। এ প্রসঙ্গে আপনার বক্তব্য জানতে চাই। রোকেয়া প্রাচী: আমি নিজে কী একজন শ্রমজীবী নই? আমি শ্রম দিচ্ছি অভিনয়ে। সারাদিন কষ্ট করে অভিনয় করি। অভিনয় থেকে পাওয়া উপার্জন দিয়েই আমি সংসার চালাই। কাজেই আমিও একজন শ্রমজীবী মানুষ। সত্যি বলতে কী, শ্রমিক বলে শ্রমজীবীরা আমাদের সুশীল সমাজের সহানুভূতি হয়তো পায়, কিন্তু মানুষের মর্যাদা পায় না। পাশে বসার সুযোগ পায় না, কথা বলার সুযোগ পায় না। শ্রমিকরা দেশের উৎপাদন প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িত, উৎপাদনই একটি দেশের চালিকাশক্তি। কিন্তু যাদের শ্রম-ঘামে দেশের অর্থনীতি এগিয়ে যাচ্ছে, দেশ পরিচালনায় কোথাও তাদের প্রতিনিধিত্ব নেই। এখনও শ্রমিকরা আগের মতোই উপেক্ষিত অবহেলিত। নিজেদের দাবি-দাওয়া নিয়ে তাদের একমাত্র কথা বলার জায়গা হলো রাজপথ। রাজপথের আন্দোলনের মাধ্যমেই শ্রমিকদের অধিকার আদায় করতে হয়। অধিকার আদায়ের এই লড়াইয়ে নিজের কমিটমেন্ট থেকেই তাদের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করি। আমার বাবাও একসময় শ্রমিক রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন। তিনি শ্রমিক লীগের মিরপুর এলাকার সভাপতি ছিলেন। শোষিত-বঞ্চিত শ্রমিকদের অধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে তিনি নিজের জীবনের দীর্ঘসময় ব্যয় করেছেন। বাবার কাছ থেকেই হয়তো শ্রমিকদের প্রতি, তাদের অধিকার আদায়ের প্রতি আমার দায়বদ্ধতাটা এসেছে। প্রশ্ন: আগামীতে জাতীয় রাজনীতিতে কী যুক্ত হওয়ার ইচ্ছে আছে? রোকেয়া প্রাচী: আমরা কেউই রাজনীতির বাইরে নই। বর্তমানে আমি জঙ্গিবাদ আর সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে গণ সচেতনতা গড়ে তোলার উদ্দেশে, নতুন প্রজন্মে সংকট উত্তরণে কাজ করছি। এটাও রাজনৈতিক কাজ। রাজনীতির সঙ্গে আগে ছিলাম. এখনও আছি এবং আগামীতেও থাকবো। কারণ রাজনীতিবিদদের ছাড়া দেশ চলতে পারে না। রাজনীতিকরাই আমাদের স্বাধীনতা এনে দিয়েছে। তারাই দেশকে ‘তলাহীন ঝুড়ি’ থেকে আজকে ‘ইমেজিং টাইগার’ হিসেবে উন্নীত করেছে। দেশের যা কিছু অর্জন তার সবই এসেছে রাজনীতিকদের মাধ্যমে। আর রাজনীতির মধ্য দিয়েই দেশ ও দেশের মানুষের সেবা বা কল্যাণ করা সম্ভব। প্রশ্ন: এবার আপনার ব্যক্তিজীবন সম্পর্কে কিছু বলুন। রোকেয়া প্রাচী: ব্যক্তিগত জীবনে আমি ভালো আছি। জীবনকে উপভোগ করছি। দুই মেয়ে আর আমি, আমাদের তিন সদস্যের সংসার। আমার বড় মেয়ে রিমঝিম, মালয়েশিয়ার একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করছে। তারেক মাসুদের ‘মাটির ময়না’ ছবিতে অভিনয় করেছিল সে। কিন্তু পরে আর অভিনয়ে আসেনি। আমার ছোট মেয়ের নাম আস্থা। সানিডেলে ক্লাস থ্রি-তে পড়ছে। অভিনয়ের প্রতি ওর ঝোঁক আছে। কয়েকটা নাটকে এরই মধ্যে অভিনয় করেছে। আমার অভিনয়ের বড় সমালোচক সে। মেয়েদের সঙ্গে আমার সম্পর্কটা বন্ধুর মতো। সবকিছুই তারা আমার সঙ্গে শেয়ার করে, আমিও যেকোনো কথা তাদের সঙ্গে শেয়ার করি। ওদের ওপর কোনো কিছু চাপিয়ে দেইনি বা দিতে চাই না। সব বিষয়েই ওদের ইচ্ছেটাকে অগ্রাধিকার দিয়ে থাকি। কাজ নিয়ে আমাকে ব্যস্ত থাকতে হয়, তবুও সারাক্ষণ তাদের সঙ্গে থাকতে চাই। যেমন, রিমঝিম মালয়েশিয়ায় পড়াশোনা করলেও দিনের মধ্যে অন্তত: ১০ বার তার সঙ্গে আমার কথা হয়। আজকে কী কী ঘটলো, এগুলো আমাকে না জানালে তার নাকি অস্থীর লাগে। আমিও দিনটা কেমন কাটালাম তা ওকে না-জানালে ভালো লাগে না। প্রশ্ন: জীবনে ‘লাইফপার্টনার’ থাক কতোটা জরুরী বলে মনে করেন? রোকেয়া প্রাচী: কোনো মানুষের পক্ষেই একা একা জীবন কাটানো সম্ভব নয়। প্রতিটা মানুষের লাইফপার্টনার থাকা জরুরী। লাইফপার্টনার হলো মানুষের ভরসার জায়গা, নিজেকে বিলিয়ে দেয়ার জায়গা, বিশ্বাস আর আস্থার জায়গা। লাইফপার্টনার ছাড়া আসলে জীবন চলে না। তবে লাইফপার্টনার মানেই যে ‘স্বামী’, আমি তা মনে করি না। স্বামী বা প্রেমিককেই যে কেবল লাইফপার্টনার বলা যাবে, এমন কোনো কথা নেই। যার সঙ্গে আমার সম্পর্কটা সহজ, সাবলীল আরে প্রেমময়; যে আমাকে বুঝতে পারবে, আমার চাওয়া-পাওয়াকে যে সম্মানের চোখে দেখবে সেরকম যে কাউকে লাইফপার্টনার মনে করতে পারি। একই ছাদের নিচে বছরের পর বছর বসবাস করেও অনেক স্বামী-স্ত্রী একে অন্যকে বুঝতে পারে না। একজনের প্রতি অন্যজনের ভালোবাসা বা সম্মানবোধ কোনোটাই নেই। খালি সামাজিক পরিচয়টা ঠিক রাখার জন্য তাদের মধ্যে স্বামী-স্ত্রী বা লাইফপার্টনার পরিচয়টা সাইনবোর্ড হিসেবে ঝুলিয়ে রাখার পক্ষপাতি আমি নই। প্রশ্ন: আপনি তো অনেকদিন ধরেই একা আছেন, সেরকম কোনো লাইফপার্টনার কী খুঁজে পাচ্ছেন না? রোকেয়া প্রাচী: মোটেও আমি একা নই। কাজ নিয়েই ব্যস্ততার মধ্যে দিন কাটে। বাকিটা সময় কাটাই দু্ই মেয়ের সঙ্গে। আগেই বলেছি, ওদের সঙ্গে সম্পর্কটা আমার খুবই সাবলীল ও বন্ধুত্বপূর্ণ। সবকিছুই ওদের সঙ্গে শেয়ার করতে পারি, ওরা আমাকে খুব ভালো বুঝতে পারে। ওরাই আমার লাইফপার্টনার। ‘স্বামী’ বা ‘প্রেমিক’, এমন কোনো লাইফপার্টনারের প্রয়োজন আমার নেই। প্রশ্ন: নিজেকে কি কখনো কখনো অপূর্ণ মনে হয় না? রোকেয়া প্রাচী: আমার কোনো অপূর্ণতা নেই। জীবনের আজকের পর্যায়ে পৌছাতে আমাকে অনেক চড়াই-উৎরাই পথ পাড়ি দিতে হয়েছে। অনেক সংকট অনেক বিপর্যয় পেরিয়ে অামি এখানে এসেছি। খড়কুটোর মতো জীবনটাকে স্রোতে ভেসে যেতে দেইনি, বিপরীত স্রোতের বিরুদ্ধে লড়াই করেছি। নিজের মর্যাদাবোধ বিকিয়ে দিয়ে কোথাও কোনো আপস করিনি। লড়াই করে এগিয়ে চলার নামই তো জীবন। যে জীবনে আত্মসম্মান নেই, যে জীবনের সর্বত্রই আপসের ছড়াছড়ি সেটা তো মৃত জীবন। যে দুর্গম পথ আমাকে পাড়ি দিতে হয়েছে, যেভাবে লড়াই করতে হয়েছে; সেটা দেখে যদি কোনো মেয়ে যদি অনুপ্রাণিত হয়, মনে শক্তি পায় সেখানেই আমার একজীবনের স্বার্থকতা।

Comments

Comments!

 স্বামী মানেই ‘লাইফপার্টনার’ মনে করেন না রোকেয়া প্রাচীAmarbangladeshonlineAmarbangladeshonline | Amarbangladeshonline

স্বামী মানেই ‘লাইফপার্টনার’ মনে করেন না রোকেয়া প্রাচী

Friday, September 2, 2016 10:44 am
240230_1

রোকেয়া প্রাচী, একনামেই তাকে চেনেন দেশের মানুষ। অভিনয়ে-নির্মাণে-লড়াইয়ে, সবখানেই সচল ও সফল। ঢাকার মিরপুরে বড় হয়ে ওঠা এই কৃষ্ণকলির শিল্প-জমিনে পথচলা শুরু থিয়েটার দিয়ে। প্রথম চলচ্চিত্র ‘দুখাই’ তাকে এনে দেয় জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার। অভিনয়ে মুন্সিয়ানায় জন্য দেশের বাইরেও একাধিকবার পুরস্কৃত হয়েছেন। হাত পাকিয়েছেন টিভিনাটক ও ডকুমেন্টারি নির্মাণে। প্রস্তুতি নিচ্ছেন চলচ্চিত্র নির্মাণের। শিল্পী জীবনের বাইরেও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে তার পদচারণা আছে। নাগরিক অধিকার আদায় কিংবা শ্রমিকের ন্যায়সঙ্গত দাবির লড়াইয়ে তাকে দেখা যায় মিছিলের প্রথম সারিতে।

রোকেয়া প্রাচীর ব্যক্তিজীবনও বেশ সংগ্রামমুখর। রক্ষণশীল পরিবারের মেয়ে হয়ে স্বজনদের চোখরাঙানি উপেক্ষা করে নাট্যচর্চা করেছেন। ভালোবেসে বিয়ে করেছিলেন পুলিশ সার্জেন্ট আহাদ পারভেজকে। ২০০০ সালে কর্তব্যরত অবস্থায় ছিনতাইকারীর ছুরিকাঘাতে নিহত হন সার্জেন্ট আহাদ। চার বছর পর ঘর বাঁধেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনের শিক্ষক টকশো’র আলোচক আসিফ নজরুলকে।৮ বছরের সেই সংসার ভেঙে যায় ২০১২। দুই কন্যাসন্তান নিয়ে এরপর একাই আছেন।

সম্প্রতি রোকেয়া প্রাচী এসেছিলেন পূর্বপশ্চিম অফিসে। মন খুলে বলেছেন নিজের জীবনসংগ্রাম আর চিন্তাচেতনা নিয়ে। ব্যক্তিজীবনের প্রসঙ্গও এসেছে কথোপকথনে।

সাক্ষাৎকার নিয়েছেন- বিপুল হাসান

প্রশ্ন: অনেকদিন ধরেই শোনা যাচ্ছে, চলচ্চিত্র নির্মাণের কাজ শুরু করতে চলেছেন। শুরুতেই এ বিষয়ে জানতে চাই।

রোকেয়া প্রাচী: কাজ শুরু করেছি। এখন চলছে চিত্রনাট্যের কাজ, গল্প আমার নিজের লেখা। আশা করছি, আনুষাঙ্গিক কাজগুলো এবছর নভেম্বর-ডিসেম্বরের মধ্যে শেষ করতে পারবো। আগামী বছর মার্চ-এপ্রিল নাগাদ শুটিংয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। আসলে চলচ্চিত্র একটা বড় জায়গা। কাজেই পরিকল্পনার জন্য যথেষ্ট সময় নিয়েছি। আর কাজটা আমি যথেষ্ট সময় নিয়ে করতে চাই। তারেক মাসুদ, মোরশেদুল ইসলাম, গৌতম ঘোষের মতো গুণি পরিচালকের সঙ্গে কাজ করার সৌভাগ্য আমার হয়েছে। তাদের সঙ্গে কাজ করতে গিয়ে শিখেছিও অনেক। আমার চলচ্চিত্রে আমি সেগুলোর প্রতিফলন ঘটাতে চাই।

প্রশ্ন: চলচ্চিত্রের কাহিনী আর বিষয় সম্পর্কে বলবেন?

রোকেয়া প্রাচী: আপাতত সেটা বলতে চাচ্ছি না। অবশ্যই মানবিক আবেদন নিয়ে চলচ্চিত্রটি নির্মিত হবে। নিজের প্রথম চলচ্চিত্র, কাজেই এতে নতুনত্ব আর বৈচিত্র্য আনার প্রচেষ্টা আমার থাকবে। সব বয়সী সব শ্রেণীর দর্শকের জন্যই ছবিটি বানাবো।

প্রশ্ন: : গতবছর কলকাতা ইন্টারন্যাশনাল ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে আশরাফ শিশির পরিচালিত ‘গাড়িওয়ালা’ চলচ্চিত্রে অভিনয়ের জন্য সেরা অভিনেত্রীর (পার্শ্ব) পুরস্কার পান আপনি। এরপর থেকে কলকাতার নামী বেশ কজন নির্মাতা নাকি আপনাকে তাদের ছবিতে পেতে আগ্রহী হয়ে ওঠেন। কলকাতার কোনো ছবিতে কী অভিনয় করছেন?

রোকেয়া প্রাচী: এই গ্লোবালাইজেশনের যুগে একদেশের শিল্পীর আরেকদেশের অভিনয় নতুন কিছু নয়। আর কলকাতা তো একেবারে বাড়ির পাশের শহর। ওখান থেকে যেমন আমাদের এখানে এসে অনেক শিল্পী অভিনয় করছেন, তেমনি আমাদের অভিনেতা-অভিনেত্রীরাও কলকাতায় কাজ করছেন। যৌথ প্রযোজনায় গৌতম ঘোষের চলচ্চিত্রে অভিনয়ের অভিজ্ঞতাও আমার হয়েছে। আর কলকাতার ছবিতে কাজ করার প্রস্তাব পেয়েছি অনেক আগেই। সেই ‘মাটির ময়না’ ছবিটি করার পর থেকেই। কিন্তু সবকিছু ঠিকঠাক মেলাতে না পারায় কাজ করা হয়নি। এবারের কলকাতা ফেস্টিভ্যালের পর সেখানকার একাধিক নির্মাতা আমার সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন। কয়েকটা স্ক্রিপ্টও আমার কাছে এসেছে। দু’একজনের সঙ্গে কথাবার্তা প্রায় চুড়ান্ত হয়েছে। এথনো যেহেতু সই করিনি, তাই এখনই নাম উল্লেখ করাটা ঠিক হবে না।

প্রশ্ন: আশির দশকেও কলকাতার ছবির চেয়ে আমাদের ছবি এগিয়ে ছিল। আজকে পুরো চিত্রটাই পাল্টে গেছে। ঢালিউডকে পেছনে ফেলে টালিউড বহুদূর এগিয়ে গেছে, কিছু ছবি তো বলিউডের সঙ্গে পাল্লা দিচ্ছে। বাংলাদেশের ছবি ক্রমশই পিছিয়ে পড়ার কারণ কী?

রোকেয়া প্রাচী: পুরো বিষয়টির সঙ্গে ইনভেস্টমেন্ট জড়িত। কলকাতার একেকটি ছবি এখন যে বাজেটে নির্মাণ করা হচ্ছে, সেই বাজেট দিয়ে আমাদের এখানে একডজন ছবি নির্মাণ করতে হয়। কলকাতার ফিল্ম ইন্ডাষ্ট্রিতে বিনিয়োগে এগিয়ে এসেছেন প্রতিষ্ঠিত অর্থলগ্নীকারীরা। আমাদের এখানে চলচ্চিত্রে বিনিয়োগকারী কই? হাতেগোনা কয়েকটি ছবি সীমিত অংকের সরকারী অনুদানে নির্মিত হচ্ছে। একমাত্র ইমপ্রেস ছাড়া অন্য কোনো প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠান চলচ্চিত্রে বিনিয়োগে এগিয়ে আসেনি। কলকাতার ছবির বাজারটাও দেখতে হবে, পুরো ভারত জুড়েই ওদের বাজার। আমাদের চলচ্চিত্রের পিছিয়ে পড়ার আরো একটি কারণ হলো, নকল-অনুকরণ এবং চৌর্যবৃত্তি। আমাদের দেশে গল্পের অভাব নেই। প্রতিটি অঞ্চলে প্রতিটি জনপদে ছড়িয়ে আছে অসংখ্য গল্প। কিন্তু আমরা গল্প চুরি করছি মুম্বাই বা তামিল ছবি থেকে। চলচ্চিত্র তো একটা শিল্প। শিল্পের ক্ষেত্রে কম্প্রোমাইজ চলে না। কিন্তু একটা চলচ্চিত্র নির্মাণ করতে গিয়ে আমাদের নির্মাতাদের এতো বেশি কম্প্রোমাইজ করতে হয় যে, সেখান থেকে শিল্প জিনিষটাই হারিয়ে যাচ্ছে।

প্রশ্ন:  আমাদের টিভি দর্শকদের সিংহভাগই এখন ভারতীয় বাংলা চ্যানেল নিয়ে মজে আছে। দেশীয় টিভি চ্যানেলের নাটক-ধারাবাহিক দর্শকদের টানতে পারছে না কেন?

রোকেয়া প্রাচী: সমস্যা ওই একটাই, বাজেট। আমাদের টিভিনাটকগুলো খুব স্বল্প বাজেটে নির্মিত হয়। একটি নাটকে যখন বাজেট কম থাকে স্বাভাবিকভাবেই সেটার গল্প ভালো হয় না, নির্মাণশৈলীতে নতুনত্ব থাকে না। অন্যদিকে স্বল্প বাজেটের এ নাটকগুলো প্রচারের সময় অনেক বেশি বিজ্ঞাপন প্রচার হয়। আর মূলত এই কারণেই দর্শক দেশীয় নাটক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। হাতের কাছেই আছে মোটা অংকের বাজেটে তৈরি রঙচঙে ভারতীয় সিলিয়িাল-মেগাসিরিয়াল। রিমোর্ট টিপে

তারা চলে যাচ্ছেন জি-বাংলা কিংবা স্টার জলসার পর্দায়।

প্রশ্ন:  বাজেট কেন বাড়ছে না?

রোকেয়া প্রাচী: আসলে এ জন্য আমরা নির্মাতা-কলাকুশলী আর শিল্পীরই দায়ী। আমরা যারা টিভি মিডিয়ায় কাজ করাকে পেশা হিসেবে নিয়েছি, তাদের মধ্যে এক অস্থীর প্রতিযোগিতা আছে। আর এর সুযোগটা নিচ্ছে টিভি চ্যানেল আর বিজ্ঞাপনদাতারা। যেমন: বিশেষ দিনের জন্য একটা নাটক ভালো বাজেটে তৈরি করে চ্যানেলে নিয়ে গেলাম। চ্যানেল কর্তৃপক্ষ স্পনসরদের কথা তুলে জানিয়ে দেবে, এতো টাকা দিয়ে তারা নাটকটা নেবে না। ধরেন নিজের লসের কথা ভেবে কম টাকায় নাটক বিক্রি না করে চলে এলাম। সঙ্গে সঙ্গে ওই বিশেষ দিনের জন্য আরেকজন নির্মাতা তার স্বল্প বাজেটে নির্মিত নাটক নিয়ে হাজির হবে। এরপর কিভাবে আমি মোটা বাজেটে মানসম্পন্ন নাটক তৈরিতে উৎসাহ পাবো। কোনোরকমে জোড়াতালি কাজ করে প্রডাকশন শেষ করবো। এভাবেই আমাদের টিভি নাটকের মান দিন দিন কমে গেছে। আমাদের মধ্যে ইউনিটি নাই, যার কারণে প্রেশার ক্রিয়েট করাও সম্ভব হচ্ছে না।

প্রশ্ন: শিল্পী-কলাকুশলী-নির্মাতাদের তো বেশ কয়েকটি সংগঠন রয়েছে, এসব সংগঠন কী করছে?

রোকেয়া প্রাচী: টেলিভিশন প্রযোজক সমিতি বা ডিরেক্টর গিল্ডসের মতো সংগঠনগুলো যে একেবারেই কাজ করছে না, তা বলা যাবে না। টিভি মিডিয়ার সমস্যাগুলো আমরা জানি। এসব সমস্যা বিচ্ছিন্নভাবে সমাধান করা যাবে না। এজন্য চাই সবগুলো সংগঠনের সম্মিলিত উদ্যোগ। নির্মাতা, নাট্যকার, অভিনেতা-অভিনেত্রী, টিভি চ্যানেল, এজেন্সি, বিজ্ঞাপনদাতা সবার সমন্বয়েই এই নীতিমালা তৈরি করলে কিছুটা সমাধান হবে। এজন্য সবগুলো সংগঠনের সমন্বয়ে একটা ফেডারেশন গড়ে তোলা দরকার।

প্রশ্ন: টিভি মিডিয়ায় যারা কাজ করছেন, তাদের মধ্যে পেশাদারিত্ব কেমন?

রোকেয়া প্রাচী: দেশে এখন টিভি চ্যানেলের সংখ্যা বেড়েছে। নাটক-অনুষ্ঠান নির্মাণের সংখ্যাও বেড়েছে। এই মাধ্যমে কাজ করা শিল্পীকলাকুশলীদের সংখ্যাও কম নয়। কিন্তু অপ্রিয় হলেও সত্য, এই সেক্টরে এখনো পেশাদারিত্ব গড়ে ওঠেনি। আমরা যার যার মতো কাজ করছি। কাজে আন্তকিরতা আছে, পেশাদারিত্ব নেই। একটা বায়বীয় পর্যায়ে কাজ করছি। কোনো চুক্তি ছাড়াই কাজ করছি। মৌখিক কথাবার্তার ভিত্তিতে এখানে কাজ হচ্ছে। যার কারণে প্রায়ই অনাকাঙ্খিত ঘটনা ঘটছে। কখনো শিল্পীরা শিডিউল ফাঁসাচ্ছে, নির্মাতাকে আর্থিক ক্ষতি গুনতে হচ্ছে। আবার দেখা যায়, নির্মাতা একজন শিল্পীর কাছ থেকে একদিনের শিডিউল নিয়েছে, কিন্তু কাজ করাচ্ছে তিনদিন। শিল্পীকে তার প্রাপ্য পারিশ্রমিক বা সম্মানী দেয়া হচ্ছে না। প্রফেশনালিজম থাকলে এমন হতো না। আমি মনে করি প্রফেশনালিজমের একটা নীতিমালা খুবই জরুরী। এতে নাটকের শুটিংয়ের আগে পরিচালক ও শিল্পীদের মধ্যে চুক্তি সইয়ের বাধ্যবাধকতা থাকবে। ওই চুক্তি অনুযায়ী শিল্পী ও নির্মাতারা কাজ করবেন। অতিরিক্ত সময়ের জন্য শিল্পীদের ভাতা দিতে হবে। কোনো শিল্পী শিডিউল ফাঁসালে তাকে ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। এরকম আরো কিছু শর্ত।

প্রশ্ন: বিভিন্ন ইস্যুতে গড়ে ওঠা নাগরিক আন্দোলনে আপনাকে রাজপথে দেখতে পাই। গণজাগরণ মঞ্চের শুরুর দিকের কার্যক্রমেও আপনাকে সক্রিয় ভূমিকায় দেখা গেছে। কিন্তু বেশ কিছুদিন হলো আপনি সেখানে অনুপস্থিত। কারণটা কী?

রোকেয়া প্রাচী: দেশের প্রতি, দেশের মানুষের প্রতি এবং মুক্তিযুদ্ধের প্রতি দায়বদ্ধতা থেকেই গণজাগরণ মঞ্চের আন্দোলনে একাত্ম হয়েছিলাম। কিন্তু এখন এই প্লাটফর্মটি হয়ে ওঠেছে স্বার্থকেন্দ্রিক ও ব্যক্তিকেন্দ্রিক। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ছড়িয়ে দেওয়ার যে উদ্দেশ্য নিয়ে গণজাগরণ মঞ্চ গড়ে ওঠেছিল, সেটার সঙ্গে এখনও আমি একাত্ম। কিন্তু ইমরান এইচ সরকারের নের্তৃত্বের গণজাগরণ মঞ্চের সঙ্গে আমি নেই। কারণ মহৎ উদ্দেশ্য নিয়ে গড়ে ওঠে জাগরণ মঞ্চকে তার নের্তৃত্ব একটা বিতর্কিত জায়গায় নিয়ে গেছে। একারণেই ইমরান সরকারের আন্দোলন থেকে আমি সরে দাঁড়িয়েছি।

প্রশ্ন: ইদানিং আপনাকে শ্রমজীবীদের বিভিন্ন আন্দোলনে খুঁজে পাওয়া যায়। এ প্রসঙ্গে আপনার বক্তব্য জানতে চাই।

রোকেয়া প্রাচী: আমি নিজে কী একজন শ্রমজীবী নই? আমি শ্রম দিচ্ছি অভিনয়ে। সারাদিন কষ্ট করে অভিনয় করি। অভিনয় থেকে পাওয়া উপার্জন দিয়েই আমি সংসার চালাই। কাজেই আমিও একজন শ্রমজীবী মানুষ। সত্যি বলতে কী, শ্রমিক বলে শ্রমজীবীরা আমাদের সুশীল সমাজের সহানুভূতি হয়তো পায়, কিন্তু মানুষের মর্যাদা পায় না। পাশে বসার সুযোগ পায় না, কথা বলার সুযোগ পায় না। শ্রমিকরা দেশের উৎপাদন প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িত, উৎপাদনই একটি দেশের চালিকাশক্তি। কিন্তু যাদের শ্রম-ঘামে দেশের অর্থনীতি এগিয়ে যাচ্ছে, দেশ পরিচালনায় কোথাও তাদের প্রতিনিধিত্ব নেই। এখনও শ্রমিকরা আগের মতোই উপেক্ষিত অবহেলিত। নিজেদের দাবি-দাওয়া নিয়ে তাদের একমাত্র কথা বলার জায়গা হলো রাজপথ। রাজপথের আন্দোলনের মাধ্যমেই শ্রমিকদের অধিকার আদায় করতে হয়। অধিকার আদায়ের এই লড়াইয়ে নিজের কমিটমেন্ট থেকেই তাদের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করি। আমার বাবাও একসময় শ্রমিক রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন। তিনি শ্রমিক লীগের মিরপুর এলাকার সভাপতি ছিলেন। শোষিত-বঞ্চিত শ্রমিকদের অধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে তিনি নিজের জীবনের দীর্ঘসময় ব্যয় করেছেন। বাবার কাছ থেকেই হয়তো শ্রমিকদের প্রতি, তাদের অধিকার আদায়ের প্রতি আমার দায়বদ্ধতাটা এসেছে।

প্রশ্ন: আগামীতে জাতীয় রাজনীতিতে কী যুক্ত হওয়ার ইচ্ছে আছে?

রোকেয়া প্রাচী: আমরা কেউই রাজনীতির বাইরে নই। বর্তমানে আমি জঙ্গিবাদ আর সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে গণ সচেতনতা গড়ে তোলার উদ্দেশে, নতুন প্রজন্মে সংকট উত্তরণে কাজ করছি। এটাও রাজনৈতিক কাজ। রাজনীতির সঙ্গে আগে ছিলাম. এখনও আছি এবং আগামীতেও থাকবো। কারণ রাজনীতিবিদদের ছাড়া দেশ চলতে পারে না। রাজনীতিকরাই আমাদের স্বাধীনতা এনে দিয়েছে। তারাই দেশকে ‘তলাহীন ঝুড়ি’ থেকে আজকে ‘ইমেজিং টাইগার’ হিসেবে উন্নীত করেছে। দেশের যা কিছু অর্জন তার সবই এসেছে রাজনীতিকদের মাধ্যমে। আর রাজনীতির মধ্য দিয়েই দেশ ও দেশের মানুষের সেবা বা কল্যাণ করা সম্ভব।

প্রশ্ন: এবার আপনার ব্যক্তিজীবন সম্পর্কে কিছু বলুন।

রোকেয়া প্রাচী: ব্যক্তিগত জীবনে আমি ভালো আছি। জীবনকে উপভোগ করছি। দুই মেয়ে আর আমি, আমাদের তিন সদস্যের সংসার। আমার বড় মেয়ে রিমঝিম, মালয়েশিয়ার একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করছে। তারেক মাসুদের ‘মাটির ময়না’ ছবিতে অভিনয় করেছিল সে। কিন্তু পরে আর অভিনয়ে আসেনি। আমার ছোট মেয়ের নাম আস্থা। সানিডেলে ক্লাস থ্রি-তে পড়ছে। অভিনয়ের প্রতি ওর ঝোঁক আছে। কয়েকটা নাটকে এরই মধ্যে অভিনয় করেছে। আমার অভিনয়ের বড় সমালোচক সে। মেয়েদের সঙ্গে আমার সম্পর্কটা বন্ধুর মতো। সবকিছুই তারা আমার সঙ্গে শেয়ার করে, আমিও যেকোনো কথা তাদের সঙ্গে শেয়ার করি। ওদের ওপর কোনো কিছু চাপিয়ে দেইনি বা দিতে চাই না। সব বিষয়েই ওদের ইচ্ছেটাকে অগ্রাধিকার দিয়ে থাকি। কাজ নিয়ে আমাকে ব্যস্ত থাকতে হয়, তবুও সারাক্ষণ তাদের সঙ্গে থাকতে চাই। যেমন, রিমঝিম মালয়েশিয়ায় পড়াশোনা করলেও দিনের মধ্যে অন্তত: ১০ বার তার সঙ্গে আমার কথা হয়। আজকে কী কী ঘটলো, এগুলো আমাকে না জানালে তার নাকি অস্থীর লাগে। আমিও দিনটা কেমন কাটালাম তা ওকে না-জানালে ভালো লাগে না।

প্রশ্ন: জীবনে ‘লাইফপার্টনার’ থাক কতোটা জরুরী বলে মনে করেন?

রোকেয়া প্রাচী: কোনো মানুষের পক্ষেই একা একা জীবন কাটানো সম্ভব নয়। প্রতিটা মানুষের লাইফপার্টনার থাকা জরুরী। লাইফপার্টনার হলো মানুষের ভরসার জায়গা, নিজেকে বিলিয়ে দেয়ার জায়গা, বিশ্বাস আর আস্থার জায়গা। লাইফপার্টনার ছাড়া আসলে জীবন চলে না। তবে লাইফপার্টনার মানেই যে ‘স্বামী’, আমি তা মনে করি না। স্বামী বা প্রেমিককেই যে কেবল লাইফপার্টনার বলা যাবে, এমন কোনো কথা নেই। যার সঙ্গে আমার সম্পর্কটা সহজ, সাবলীল আরে প্রেমময়; যে আমাকে বুঝতে পারবে, আমার চাওয়া-পাওয়াকে যে সম্মানের চোখে দেখবে সেরকম যে কাউকে লাইফপার্টনার মনে করতে পারি। একই ছাদের নিচে বছরের পর বছর বসবাস করেও অনেক স্বামী-স্ত্রী একে অন্যকে বুঝতে পারে না। একজনের প্রতি অন্যজনের ভালোবাসা বা সম্মানবোধ কোনোটাই নেই। খালি সামাজিক পরিচয়টা ঠিক রাখার জন্য তাদের মধ্যে স্বামী-স্ত্রী বা লাইফপার্টনার পরিচয়টা সাইনবোর্ড হিসেবে ঝুলিয়ে রাখার পক্ষপাতি আমি নই।

প্রশ্ন: আপনি তো অনেকদিন ধরেই একা আছেন, সেরকম কোনো লাইফপার্টনার কী খুঁজে পাচ্ছেন না?

রোকেয়া প্রাচী: মোটেও আমি একা নই। কাজ নিয়েই ব্যস্ততার মধ্যে দিন কাটে। বাকিটা সময় কাটাই দু্ই মেয়ের সঙ্গে। আগেই বলেছি, ওদের সঙ্গে সম্পর্কটা আমার খুবই সাবলীল ও বন্ধুত্বপূর্ণ। সবকিছুই ওদের সঙ্গে শেয়ার করতে পারি, ওরা আমাকে খুব ভালো বুঝতে পারে। ওরাই আমার লাইফপার্টনার। ‘স্বামী’ বা ‘প্রেমিক’, এমন কোনো লাইফপার্টনারের প্রয়োজন আমার নেই।

প্রশ্ন: নিজেকে কি কখনো কখনো অপূর্ণ মনে হয় না?

রোকেয়া প্রাচী: আমার কোনো অপূর্ণতা নেই। জীবনের আজকের পর্যায়ে পৌছাতে আমাকে অনেক চড়াই-উৎরাই পথ পাড়ি দিতে হয়েছে। অনেক সংকট অনেক বিপর্যয় পেরিয়ে অামি এখানে এসেছি। খড়কুটোর মতো জীবনটাকে স্রোতে ভেসে যেতে দেইনি, বিপরীত স্রোতের বিরুদ্ধে লড়াই করেছি। নিজের মর্যাদাবোধ বিকিয়ে দিয়ে কোথাও কোনো আপস করিনি। লড়াই করে এগিয়ে চলার নামই তো জীবন। যে জীবনে আত্মসম্মান নেই, যে জীবনের সর্বত্রই আপসের ছড়াছড়ি সেটা তো মৃত জীবন। যে দুর্গম পথ আমাকে পাড়ি দিতে হয়েছে, যেভাবে লড়াই করতে হয়েছে; সেটা দেখে যদি কোনো মেয়ে যদি অনুপ্রাণিত হয়, মনে শক্তি পায় সেখানেই আমার একজীবনের স্বার্থকতা।

Comments

comments

সম্পাদক : মোহাম্মদ আবদুল বাছির
প্রকাশক: মোহাম্মদ জহিরুল ইসলাম
ফোন : ‎০১৭১৩৪০৯০৯০
৩৪৫/১, দিলু রোড, নিউ ইস্কাটন, ঢাকা-১০০০
X
 
নিয়মিত খবর পড়তে আমাদের ফেসবুক পেজে লাইক দিয়ে যুক্ত থাকুন
X