মঙ্গলবার, ২০শে ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ ইং, ৮ই ফাল্গুন, ১৪২৪ বঙ্গাব্দ, রাত ২:০০
শিরোনাম
  • ঘৃণাকে বিজয়ী হতে দেয়া যাবে না, ট্রাম্পকে ইঙ্গিত করে জর্জ ক্লুনি
  • আমার একটাই চিন্তা দেশের মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন করা: প্রধানমন্ত্রী
  • ‘কেন্দ্রীয় সরকারের আগ্রাসী নীতির কারণে কাশ্মীরকে হারাতে হবে’
  • সাড়ে চারমাস পর মুখোমুখি, খাদিজাকে উদ্দেশ্য করে যা বলল বদরুল
  • খালেদার ‘সাজা’ বিরোধী নেতাকর্মীদের মনোবল ভাঙ্গার কৌশল!
  • বিএনপির কর্মসূচি ‘যথাসময়ে’ জানানো হবে: রিজভী
  • দলের জন্য বোলিং করতেও রাজি মুশফিক
  • শিশু জিহাদের মৃত্যু: চার জনের ১০ বছর করে কারাদণ্ড
  • অবশেষে বাড়ি অবরুদ্ধ করে রাখা সেই দেয়াল ভেঙ্গে ফেলা হচ্ছে
  • সাক্ষ্য দিলেন খাদিজা, চাইলেন বদরুলের সর্বোচ্চ শাস্তি
  • বদরুলের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিতে আদালতে খাদিজা
  • আজ বগুড়ায় যেসব প্রকল্প উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী
  • রোহিঙ্গা স্থানান্তরের সরকারি পরিকল্পনার সঙ্গে দ্বিমত মানবাধিকার কমিশনের
  • মহেশখালীতে ইয়াবা ব্যবসায়ীদের সঙ্গে পুলিশের ‘বন্দুকযুদ্ধ’
  • হোয়াইট হাউসে কাজ করার দীর্ঘ অভিজ্ঞতার কথা জানালেন এই বাংলাদেশি সাংবাদিক
Friday, January 13, 2017 9:36 am
A- A A+ Print

হলি আর্টিজানের শেফ শিশির সরকারের বর্ণনা : সুরা পড়ে বেঁচে ফিরেছিলাম

10

শুক্রবার, রাত প্রায় পৌনে নয়টা বাজে। রমজান মাস, ঈদের বাকি আর কয়েকটা দিন। ঢাকার অন্যতম অভিজাত এলাকার হলি আর্টিজান রেস্তোরাঁয় লোকজনের আনাগোনা বাড়ছিল। খেতে আসা লোকদের অধিকাংশই ছিলেন ইতালি ও জাপানের নাগরিক। রেস্তোরাঁর শেফ শিশির সরকার পাস্তা নিয়ে বেরোচ্ছিলেন পরিবেশন করার জন্য। এই সময় হঠাৎ করে পাঁচজন জঙ্গি অস্ত্র নিয়ে ঢুকে পড়ল রেস্তোরাঁয়। নেমে এল আতঙ্ক। শুরু হলো গুলি ও ধারালো অস্ত্রের আঘাত। পাস্তা নিয়ে বেরোনোর সময় চিৎকার-চেঁচামেচি শুনে থমকে গেলেন শিশির। তাঁর এখনো স্পষ্ট মনে পড়ে, ‘একজন হামলাকারীকে দেখতে পেলাম আমি। তার এক হাতে তলোয়ার বা চাপাতি ছিল। বুকে ঝোলানো ছিল বন্দুক।’ হিন্দু সম্প্রদায়ের একজন হিসেবে তাঁর শঙ্কিত হওয়ার যথেষ্ট কারণ ছিল, যদি জঙ্গিরা তাঁর ধর্মীয় পরিচয় জানতে পারে, তাহলে বাঁচার কোনো উপায় নেই। মৃত্যু অবধারিত। শিশির সরকার বলেন, ‘এ সময় একজন জাপানি নাগরিক আমাকে দেখে চিৎকার করে বললেন, “আমাকে সাহায্য করুন।” আমি তাঁর দিকে এগিয়ে গেলাম এবং সাহায্য করলাম।’ তাঁরা দুজন একটি হিমঘরে (চিলার) আশ্রয় নিলেন, সেটি ভেতর থেকে খিল দেওয়া যায় না। শিশির ও জাপানি নাগরিক দরজা টেনে ধরে চুপ করে বসে রইলেন। শিশির বলেন, ‘তখন ওই জাপানি নাগরিক আমার কাছে আক্রমণকারীদের পরিচয় জানতে চাইলেন। বললাম, জানি না। তবে আতঙ্কিত হবেন না। পুলিশ এল বলে।’ প্রায় দুই ঘণ্টা ধরে চুপ করে বসে ছিলেন দুজন। শিশির বললেন, ‘জায়গাটি ছিল অতিরিক্ত ঠান্ডা। আমরা জমে যাচ্ছিলাম। তাই হাত-পা নেড়ে শরীর গরম রাখার চেষ্টা করছিলাম। এরপরই এল সেই আতঙ্কজনক মুহূর্ত। এক হামলাকারী দরজা খোলার চেষ্টা করল। আমরা দরজা শক্ত করে আঁকড়ে ধরেছিলাম। খুলতে না পেরে হামলাকারী চলে গেল। কিন্তু আমাদের আতঙ্ক কমেনি। কারণ হামলাকারীরা জেনে গেছে, এর ভেতরে কেউ লুকিয়ে আছে।’ ১০-১৫ মিনিট পর আবার ফিরে এল ওই জঙ্গি। চিৎকার করে আমাদের বেরিয়ে আসতে বলছিল সে। একপর্যায়ে দরজা ভেঙে ফেলল। ঠান্ডায় জমে গিয়ে আমরা ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলাম। মাটিতে পড়ে গেলাম। আমার কেবল মনে হচ্ছিল এই বুঝি নেমে আসছে চাপাতির কোপ। আমি বারবার অনুনয় করছিলাম, আল্লাহর দোহাই, আমাকে মেরো না।’ মুসলিম মনে করে তাঁকে ছেড়ে দিল হামলাকারী। নির্দেশ দিল রেস্তোরাঁর অন্য প্রান্তে জড়ো হওয়া সহকর্মীদের কাছে চলে যেতে। শিশির বলেন, ‘আমি লাশ ও রক্তের ওপর দিয়ে হামাগুড়ি দিয়ে আগাতে লাগলাম। হঠাৎ করে দুটি গুলির শব্দ। তাকিয়ে দেখি আমার সঙ্গে লুকিয়ে থাকা জাপানি নাগরিক মরে পড়ে আছেন।’ এরপর সহকর্মীদের সঙ্গে একটি টেবিলে মাথা নিচু করে বসে ছিলেন। রাত দুইটার পর এক জঙ্গি এসে জানতে চাইল রেস্তোরাঁর শেফ কে? সহকর্মীরা শিশিরের দিকে ইঙ্গিত করল। তাঁকে রান্নাঘরে নিয়ে যাওয়া হলো। শিশিরের ভাষ্য, ‘জঙ্গিরা আমার কাছে জানতে চাইল কী রান্না করা আছে। চিংড়ি কিংবা সামুদ্রিক মাছ আছে কি না? আমি জবাব দিলাম, আছে। তারা বলল রান্না করতে এবং সুন্দর করে থালায় সাজাতে।’ শিশির যখন রান্না করছিলেন, তখন এক জঙ্গি রান্নাঘরে ঢুকে পড়ে। শিশির বলেন, ‘সে আমার নাম জানতে চাইল। বললাম, শিশির। পুরো নাম বললাম না। তাহলে হয়তো তারা জেনে যাবে আমি হিন্দু।’ খুব সম্ভবত জঙ্গিদের সন্দেহ হয়েছিল। তাই তারা শিশিরকে পবিত্র কোরআন শরিফ থেকে তিলাওয়াত করতে বলল। শিশির ধীরস্থিরভাবে মাছ ভেজে যেতে লাগলেন। এর মধ্যেই পবিত্র কোরআনের কয়েকটি আয়াত তিলাওয়াত করে শোনালেন। শিশির বললেন, ‘আমার অনেক মুসলিম বন্ধু আছে। কোরআন শরিফের কিছু সুরা আমার জানা ছিল। সেখান থেকেই তিলাওয়াত করলাম। অবশ্য ভয় হচ্ছিল, সন্তুষ্ট করতে পারব তো?’ ইসলামিক রীতি মেনেই সাহরির সময় আটকে রাখা মুসলমান ও রেস্তোরাঁর কর্মীদের খাবার পরিবেশন করা হয়। ‘আমি এতটাই আতঙ্কিত ছিলাম যে, গলা দিয়ে খাবার নামছিল না। কিন্তু আবার ভাবলাম, যদি এখন না খাই, তাহলে তারা ভাববে আমি হয়তো রোজা রাখব না। আমি হয়তো মুসলিম না’, বললেন শিশির। সূর্যোদয়ের পরেই শুরু হলো অপারেশন থান্ডার বোল্ট। কমান্ডো অভিযানে অবসান হলো জিম্মি ঘটনার। পাঁচ জঙ্গি মারা পড়ল। শিশির এবং তাঁর সহকর্মীদের উদ্ধার করা হলো। আবার চাকরিতে ফিরেছেন শিশির। কিন্তু ওই ঘটনার রেশ এখনো কাটিয়ে উঠতে পারেননি তিনি। এখনো ট্রমায় আক্রান্ত তিনি। এই তরুণ শেফ বললেন, ‘আমি কোনো ভবিষ্যৎ দেখি না। ঠিকমতো ঘুমাতে পারি না। যখনই আমি একা থাকি, ওই রাতের ঘটনা মনে পড়ে যায়। আমি আতঙ্কগ্রস্ত। কিছুই করতে পারছি না।’   ফারাজ আইয়াজ হোসেনযে ছাত্র তাঁর বন্ধুদের ছেড়ে যেতে রাজি হননি যুক্তরাষ্ট্রের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ছিলেন ২০ বছরের ফারাজ আইয়াজ হোসেন। ছুটিতে ঢাকায় নিজের বাড়ি বেড়াতে এসেছিলেন তিনি। ওই রাতে স্কুলের পুরোনো দুই বন্ধুর সঙ্গে হলি আর্টিজানে গিয়েছিলেন ফারাজ। দুই বন্ধুর একজন অবিন্তা কবীর। তিনি বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত মার্কিন নাগরিক, ফারাজের সঙ্গে একই বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তেন। আরেক বন্ধু তারিশি জৈন ছিলেন ভারতীয়। যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ায় পড়াশোনা করতেন তিনি। ফারাজ বন্ধুদের নিয়ে রেস্তোরাঁয় বসার সঙ্গে সঙ্গেই হামলা শুরু হয়। ফারাজের পরিবারের একজন গাড়িচালক ফোন করে তাঁর মাকে এ ঘটনা জানান। ফারাজের বড় ভাই যারেফ আয়াত হোসেন বলেন, ‘যখনই মা খবরটা শুনলেন, তিনি হন্তদন্ত হয়ে আমার ঘরে ঢুকে শুধু বললেন, “আমি যাচ্ছি”। তিনি একটি চাদর জড়িয়ে মোবাইল ফোনটি হাতে নিয়েই দৌড় দিলেন। আমিও তাঁর পিছু পিছু ছুটলাম।’ হলি আর্টিজানে পৌঁছার পর সেখানকার পরিস্থিতি নিয়ে যারেফ বলছিলেন, ‘সেখানে গিয়ে শুনি মানুষ বলাবলি করছে যে হামলাকারীদের ‘‘আল্লাহু আকবার’’ বলে চিৎকার করতে শুনেছেন তাঁরা। তা শুনেই আমরা বুঝতে পারি, এটি কোনো সশস্ত্র ডাকাতি নয়, তারচেয়ে বেশি গুরুতর কিছু।’ হামলা শুরুর প্রায় ৪৫ মিনিট পর রাত সাড়ে নয়টার দিকে হলি আর্টিজানের বেশ কয়েকজন কর্মী কৌশলে ছাদ বেয়ে বেরিয়ে আসতে সক্ষম হন। তাঁরা রাস্তায় চলে আসেন এবং তাঁদের একজনের কাছে ছুটে যান যারেফ ও তাঁর মা। যারেফ বলেন, ‘আমরা তাঁকে জিজ্ঞেস করলাম, একটি ছেলে ও দুটি মেয়েকে তিনি দেখেছেন কি না। ফোনে ফারাজের ছবিও তাঁকে দেখালাম। জবাবে তিনি বললেন, “আমি তাদের দেখেছি। তারা একটি টেবিলের নিচে লুকাচ্ছিল।”’ ওই রেস্তোরাঁর কর্মী বলেন, বিদেশি নাগরিকদের একটি নির্দিষ্ট জায়গায় আলাদা করে রাখা হচ্ছে। আর যাঁদের বাংলাদেশি ও মুসলিম বলে মনে করছে, তাঁদের আরেক জায়গায় রাখা হয়েছে। যারেফ বলেন, ‘ওই মুহূর্তে মা আমার দিকে চেয়ে বলেন, “তারিশি ও অবিন্তাকে ও ওভাবে ছেড়ে দেবে না। আমি আমার ছেলেকে চিনি। আমি ফারাজকে চিনি। সে তার বন্ধুদের ছেড়ে যাবে না।”’ নিরাপত্তা বাহিনীর অভিযান শেষে জিম্মি পরিস্থিতির অবসান হয়। দেখা যায় ফারাজ ও তাঁর বন্ধুদের হত্যা করেছে জঙ্গিরা। ফারাজের জীবনের শেষ মুহূর্তগুলোর কথা জানার পর বোঝা যায় তাঁর মায়ের আশঙ্কাই সত্যি হয়েছে। ফারাজের ভাই বলছিলেন, ‘আমরা যতটুকু জানতে পেরেছি তা হলো, ফারাজ যেহেতু বাংলাদেশি ও মুসলিম; কাজেই হামলাকারীরা তাঁকে ছেড়ে দিত। কিন্তু যখন তাঁকে চলে যাওয়ার কথা বলা হয়, তখন ফারাজ জানতে চায়, “আমার বন্ধুদের কী হবে?” সন্ত্রাসীরা তাঁদের ছাড়তে অস্বীকার করলে ফারাজ বলেছিলেন, “আমি তাদের ছেড়ে যাব না।”’ ফারাজের এই নিঃস্বার্থ আত্মত্যাগের ঘটনা এরই মধ্যে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেয়েছে। সামাজিক ন্যায়বিচারের জন্য মরণোত্তর মাদার তেরেসা মেমোরিয়াল ইন্টারন্যাশনাল অ্যাওয়ার্ড দেওয়া হয়েছে তাঁকে। বাংলাদেশেও তাঁর আত্মত্যাগ ব্যাপক আলোচিত হয়েছে। ফারাজের নানা শিল্পপতি লতিফুর রহমান বলেন, ‘প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষের মুখে মুখেও শোনা গেছে একই কথা। তাঁরা বলেছেন, “ফারাজই বাংলাদেশ। আমরা ফারাজের মতো। কোনো সন্ত্রাসীর মতো নই।” তিনি আরও বলেন, ‘বাঁশখালীতে ফারাজের নামে একটি চত্বরের নামকরণ করা হয়েছে। বাংলাদেশের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের এক অধ্যাপক তাঁর সন্তানের নাম রেখেছেন ফারাজ। কারণ তিনি বলেছেন, তিনি চান তাঁর সন্তান যেন ফারাজের আদর্শেই বড় হয়ে ওঠে।’ এ ঘটনাগুলো ফারাজের পরিবারকে আলোড়িত করে, কিন্তু তা ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের একজন পাঁড় ভক্তের অভাব পূরণ করতে পারে না। তাঁর নানার মতে, এই তরুণের গন্তব্য ছিল নেতৃত্ব ও সফলতার দিকে। লতিফুর রহমান বলছিলেন, ‘আমি প্রতিটা দিন এসব নিয়েই লড়ছি। আমি বুঝতে পারি যে সে কী করেছে। আমি তার এ কাজের অকুণ্ঠ প্রশংসাও করি। কিন্তু একজন কীভাবে এ কাজটি করতে পারল, তা বুঝে উঠতে আমার কষ্ট হয়। আমার কষ্ট হয়, কারণ আমার সেই সাহস নেই, যা ফারাজের ছিল। এই তরুণটি যা করেছে, তা করার শক্তি আমার নেই। আমি শুধু ভাবি, যদি আজ সে এখানে আমার সঙ্গে থাকত!’   বাবুর্চিকে ঘিরে রহস্য রাজধানীর দক্ষিণের উপকণ্ঠেই জাকির হোসেন শাওনের (১৮) পরিবারের বাস। সেখানে ছোট্ট একটি ঘরে তাঁর মা-বাবা, বোন আর ভাইয়েরা কোনোরকমে থাকেন। শাওন হলি আর্টিজানে কাজ করেছেন এক বছরের মতো সময়। বাবা আবদুস সাত্তার জানান, বাবুর্চির এই চাকরিটার সঙ্গে শাওন খুব সহজেই খাপ খাইয়ে নিয়েছিলেন। মা মাকসুদা বেগম বলেন, ‘সহকর্মীদের মধ্যে শাওন বয়সে সবার ছোট হওয়ায় সবাই তাঁকে খুব ভালোবাসতেন।’ ১ জুলাই সন্ধ্যায় শাওন কর্মস্থলেই ছিলেন। তিনি তাঁর মাকে মুঠোফোনে বলেছিলেন, ঈদ বোনাস পেয়ে গেছেন এবং পরদিন বা তার পরদিন তিনি বাড়ি যাবেন। রোজার মাস হওয়ায় সেদিন টেলিভিশন দেখছিলেন না শাওনের পরিবারের সদস্যরা। কাজেই জঙ্গি হামলা সম্পর্কে তাৎক্ষণিক তাঁরা কিছু জানতে পারেননি। পরদিন, ২ জুলাই সকালে প্রতিবেশীর কাছে হামলার কথা শুনে শাওনের ছবি নিয়ে তাঁরা রাজধানীর গুলশানে যান। নিজের সন্তানের ছবি নিয়ে এক পুলিশ কর্মকর্তার কাছ থেকে অন্য পুলিশ কর্মকর্তার কাছে যান। সড়কে থাকা অসংখ্য মানুষের সঙ্গেও কথা বলেন তাঁরা। কিন্তু কেউই কিছু বলতে পারেননি। ওই দিন রাত ১০টার দিকে শাওনের বাবা সাত্তার গুলশানে পুলিশ স্টেশনে যান। তিনি বলেন, সেখানে এক পুলিশ কর্মকর্তা তাঁকে বলেছিলেন, তাঁর ছেলে বেঁচে আছেন। কিন্তু শাওন কোথায় আছেন, সে সম্পর্কে ওই কর্মকর্তা কিছু জানাতে পারেননি। এদিকে, টেলিভিশনে শাওনের ছবি দেখানো হচ্ছিল। ছবিগুলো ১ জুলাই রাত তিনটার কিছু আগে তোলা। তখনো হলি আর্টিজানের নিয়ন্ত্রণ জঙ্গিদের হাতে। ছবিগুলোয় দেখা যায়, শাওন পুলিশের একটি গাড়ির পেছনে বসে আছেন এবং পুলিশ কর্মকর্তারা তাঁর হাত ধরে আছেন। তাঁর বুক থেকে রক্ত ঝরছিল, তবে তাঁর চেতনা ছিল। যেকোনোভাবেই হোক, জঙ্গিদের হাত থেকে ছুটতে পেরেছিলেন তিনি। কিন্তু প্রশ্ন উঠেছে, এরপর শাওন কোথায় ছিলেন? ৩ জুলাই সকালে শাওনের মা-বাবা একটি ফোন পান। ফোনটি করেছিলেন হলি আর্টিজানে জঙ্গি হামলায় বেঁচে যাওয়া এক কর্মী। তিনি শাওনের মা-বাবাকে জানান, তাঁদের ছেলে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আছেন। শাওনের পরিবারের সদস্যরা ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ছুটে যান। কিন্তু সেখানে ছেলের চেহারা দেখা তাঁদের জন্য ছিল অত্যন্ত পীড়াদায়ক। তাঁর পায়ে আঘাতের চিহ্ন ছিল এবং এক চোখ কালো হয়ে গিয়েছিল, যা টেলিভিশনে প্রচারিত ছবিতে দেখা যায়নি। কখনো চেতনা ফিরে পাচ্ছিলেন তিনি, আবার তারপরেই অচেতন হয়ে পড়ছিলেন। শাওনের মা মাকসুদা বেগম বলেন, ‘যতবার তার জ্ঞান ফিরছিল, ততবার শুধু বলছিল, “আমাকে মারবেন না, আমাকে আর মারবেন না। আমাকে যেতে দেন”।’ মাকসুদা বেগম অভিযোগ করেন, ‘পুলিশ তাকে (শাওন) ধরে নিয়ে গিয়ে নির্যাতন করেছে। তার মাথায় আঘাত করেছে। লাথি মেরেছে। নির্দয়ভাবে পিটিয়েছে।’ তবে অভিযোগ অস্বীকার করে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) সন্ত্রাস দমন ইউনিটের প্রধান মনিরুল ইসলাম বলেন, শাওন পুলিশের হেফাজতে ছিলেন না। তিনি বলেন, ‘তিনি (রেস্তোরাঁ থেকে) পালানোর সময় আহত হন। হলি আর্টিজানে হামলার পর মধ্যরাতে তাঁকে হাসপাতালে নেওয়া হয় বলে আমার ধারণা। তবে কে বা কারা তাঁকে হাসপাতালে নিয়ে যায়, সে ব্যাপারে আমরা নিশ্চিত নই।’ এদিকে, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষও শাওনের ভর্তির ব্যাপারে কোনো তথ্য তাদের নথিতে খুঁজে পায়নি। কাজেই তাঁকে কখন হাসপাতালে নেওয়া হয়, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। শাওনের বাবা পুলিশের কাছে অভিযোগ দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। তিনি বলেন, ‘তারা (পুলিশ) বিষয়টি গুরুত্ব দেয়নি।’ হলি আর্টিজানে জঙ্গি হামলার এক সপ্তাহ পর গত বছরের ৮ জুলাই শাওন মারা যান। কিন্তু এখনো প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজে পায়নি তাঁর পরিবার। গত ১১ জানুয়ারি হলি আর্টিজান আবার ভিন্ন ঠিকানায় নতুন করে যাত্রা শুরু করেছে। পুলিশ বলেছে, এই রেস্তোরাঁয় হামলার মূল পরিকল্পনাকারী গত শুক্রবার পুলিশের সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হয়েছেন।

Comments

Comments!

 হলি আর্টিজানের শেফ শিশির সরকারের বর্ণনা : সুরা পড়ে বেঁচে ফিরেছিলামAmarbangladeshonlineAmarbangladeshonline | Amarbangladeshonline

হলি আর্টিজানের শেফ শিশির সরকারের বর্ণনা : সুরা পড়ে বেঁচে ফিরেছিলাম

Friday, January 13, 2017 9:36 am
10

শুক্রবার, রাত প্রায় পৌনে নয়টা বাজে। রমজান মাস, ঈদের বাকি আর কয়েকটা দিন। ঢাকার অন্যতম অভিজাত এলাকার হলি আর্টিজান রেস্তোরাঁয় লোকজনের আনাগোনা বাড়ছিল। খেতে আসা লোকদের অধিকাংশই ছিলেন ইতালি ও জাপানের নাগরিক।
রেস্তোরাঁর শেফ শিশির সরকার পাস্তা নিয়ে বেরোচ্ছিলেন পরিবেশন করার জন্য। এই সময় হঠাৎ করে পাঁচজন জঙ্গি অস্ত্র নিয়ে ঢুকে পড়ল রেস্তোরাঁয়। নেমে এল আতঙ্ক। শুরু হলো গুলি ও ধারালো অস্ত্রের আঘাত।
পাস্তা নিয়ে বেরোনোর সময় চিৎকার-চেঁচামেচি শুনে থমকে গেলেন শিশির। তাঁর এখনো স্পষ্ট মনে পড়ে, ‘একজন হামলাকারীকে দেখতে পেলাম আমি। তার এক হাতে তলোয়ার বা চাপাতি ছিল। বুকে ঝোলানো ছিল বন্দুক।’
হিন্দু সম্প্রদায়ের একজন হিসেবে তাঁর শঙ্কিত হওয়ার যথেষ্ট কারণ ছিল, যদি জঙ্গিরা তাঁর ধর্মীয় পরিচয় জানতে পারে, তাহলে বাঁচার কোনো উপায় নেই। মৃত্যু অবধারিত।
শিশির সরকার বলেন, ‘এ সময় একজন জাপানি নাগরিক আমাকে দেখে চিৎকার করে বললেন, “আমাকে সাহায্য করুন।” আমি তাঁর দিকে এগিয়ে গেলাম এবং সাহায্য করলাম।’
তাঁরা দুজন একটি হিমঘরে (চিলার) আশ্রয় নিলেন, সেটি ভেতর থেকে খিল দেওয়া যায় না। শিশির ও জাপানি নাগরিক দরজা টেনে ধরে চুপ করে বসে রইলেন।
শিশির বলেন, ‘তখন ওই জাপানি নাগরিক আমার কাছে আক্রমণকারীদের পরিচয় জানতে চাইলেন। বললাম, জানি না। তবে আতঙ্কিত হবেন না। পুলিশ এল বলে।’
প্রায় দুই ঘণ্টা ধরে চুপ করে বসে ছিলেন দুজন। শিশির বললেন, ‘জায়গাটি ছিল অতিরিক্ত ঠান্ডা। আমরা জমে যাচ্ছিলাম। তাই হাত-পা নেড়ে শরীর গরম রাখার চেষ্টা করছিলাম। এরপরই এল সেই আতঙ্কজনক মুহূর্ত। এক হামলাকারী দরজা খোলার চেষ্টা করল। আমরা দরজা শক্ত করে আঁকড়ে ধরেছিলাম। খুলতে না পেরে হামলাকারী চলে গেল। কিন্তু আমাদের আতঙ্ক কমেনি। কারণ হামলাকারীরা জেনে গেছে, এর ভেতরে কেউ লুকিয়ে আছে।’
১০-১৫ মিনিট পর আবার ফিরে এল ওই জঙ্গি। চিৎকার করে আমাদের বেরিয়ে আসতে বলছিল সে। একপর্যায়ে দরজা ভেঙে ফেলল। ঠান্ডায় জমে গিয়ে আমরা ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলাম। মাটিতে পড়ে গেলাম। আমার কেবল মনে হচ্ছিল এই বুঝি নেমে আসছে চাপাতির কোপ। আমি বারবার অনুনয় করছিলাম, আল্লাহর দোহাই, আমাকে মেরো না।’
মুসলিম মনে করে তাঁকে ছেড়ে দিল হামলাকারী। নির্দেশ দিল রেস্তোরাঁর অন্য প্রান্তে জড়ো হওয়া সহকর্মীদের কাছে চলে যেতে।
শিশির বলেন, ‘আমি লাশ ও রক্তের ওপর দিয়ে হামাগুড়ি দিয়ে আগাতে লাগলাম। হঠাৎ করে দুটি গুলির শব্দ। তাকিয়ে দেখি আমার সঙ্গে লুকিয়ে থাকা জাপানি নাগরিক মরে পড়ে আছেন।’
এরপর সহকর্মীদের সঙ্গে একটি টেবিলে মাথা নিচু করে বসে ছিলেন। রাত দুইটার পর এক জঙ্গি এসে জানতে চাইল রেস্তোরাঁর শেফ কে? সহকর্মীরা শিশিরের দিকে ইঙ্গিত করল। তাঁকে রান্নাঘরে নিয়ে যাওয়া হলো।
শিশিরের ভাষ্য, ‘জঙ্গিরা আমার কাছে জানতে চাইল কী রান্না করা আছে। চিংড়ি কিংবা সামুদ্রিক মাছ আছে কি না? আমি জবাব দিলাম, আছে। তারা বলল রান্না করতে এবং সুন্দর করে থালায় সাজাতে।’
শিশির যখন রান্না করছিলেন, তখন এক জঙ্গি রান্নাঘরে ঢুকে পড়ে। শিশির বলেন, ‘সে আমার নাম জানতে চাইল। বললাম, শিশির। পুরো নাম বললাম না। তাহলে হয়তো তারা জেনে যাবে আমি হিন্দু।’
খুব সম্ভবত জঙ্গিদের সন্দেহ হয়েছিল। তাই তারা শিশিরকে পবিত্র কোরআন শরিফ থেকে তিলাওয়াত করতে বলল। শিশির ধীরস্থিরভাবে মাছ ভেজে যেতে লাগলেন। এর মধ্যেই পবিত্র কোরআনের কয়েকটি আয়াত তিলাওয়াত করে শোনালেন।
শিশির বললেন, ‘আমার অনেক মুসলিম বন্ধু আছে। কোরআন শরিফের কিছু সুরা আমার জানা ছিল। সেখান থেকেই তিলাওয়াত করলাম। অবশ্য ভয় হচ্ছিল, সন্তুষ্ট করতে পারব তো?’
ইসলামিক রীতি মেনেই সাহরির সময় আটকে রাখা মুসলমান ও রেস্তোরাঁর কর্মীদের খাবার পরিবেশন করা হয়। ‘আমি এতটাই আতঙ্কিত ছিলাম যে, গলা দিয়ে খাবার নামছিল না। কিন্তু আবার ভাবলাম, যদি এখন না খাই, তাহলে তারা ভাববে আমি হয়তো রোজা রাখব না। আমি হয়তো মুসলিম না’, বললেন শিশির।
সূর্যোদয়ের পরেই শুরু হলো অপারেশন থান্ডার বোল্ট। কমান্ডো অভিযানে অবসান হলো জিম্মি ঘটনার। পাঁচ জঙ্গি মারা পড়ল। শিশির এবং তাঁর সহকর্মীদের উদ্ধার করা হলো।
আবার চাকরিতে ফিরেছেন শিশির। কিন্তু ওই ঘটনার রেশ এখনো কাটিয়ে উঠতে পারেননি তিনি। এখনো ট্রমায় আক্রান্ত তিনি। এই তরুণ শেফ বললেন, ‘আমি কোনো ভবিষ্যৎ দেখি না। ঠিকমতো ঘুমাতে পারি না। যখনই আমি একা থাকি, ওই রাতের ঘটনা মনে পড়ে যায়। আমি আতঙ্কগ্রস্ত। কিছুই করতে পারছি না।’

 

ফারাজ আইয়াজ হোসেনযে ছাত্র তাঁর বন্ধুদের ছেড়ে যেতে রাজি হননি
যুক্তরাষ্ট্রের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ছিলেন ২০ বছরের ফারাজ আইয়াজ হোসেন। ছুটিতে ঢাকায় নিজের বাড়ি বেড়াতে এসেছিলেন তিনি। ওই রাতে স্কুলের পুরোনো দুই বন্ধুর সঙ্গে হলি আর্টিজানে গিয়েছিলেন ফারাজ। দুই বন্ধুর একজন অবিন্তা কবীর। তিনি বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত মার্কিন নাগরিক, ফারাজের সঙ্গে একই বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তেন। আরেক বন্ধু তারিশি জৈন ছিলেন ভারতীয়। যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ায় পড়াশোনা করতেন তিনি।
ফারাজ বন্ধুদের নিয়ে রেস্তোরাঁয় বসার সঙ্গে সঙ্গেই হামলা শুরু হয়। ফারাজের পরিবারের একজন গাড়িচালক ফোন করে তাঁর মাকে এ ঘটনা জানান। ফারাজের বড় ভাই যারেফ আয়াত হোসেন বলেন, ‘যখনই মা খবরটা শুনলেন, তিনি হন্তদন্ত হয়ে আমার ঘরে ঢুকে শুধু বললেন, “আমি যাচ্ছি”। তিনি একটি চাদর জড়িয়ে মোবাইল ফোনটি হাতে নিয়েই দৌড় দিলেন। আমিও তাঁর পিছু পিছু ছুটলাম।’
হলি আর্টিজানে পৌঁছার পর সেখানকার পরিস্থিতি নিয়ে যারেফ বলছিলেন, ‘সেখানে গিয়ে শুনি মানুষ বলাবলি করছে যে হামলাকারীদের ‘‘আল্লাহু আকবার’’ বলে চিৎকার করতে শুনেছেন তাঁরা। তা শুনেই আমরা বুঝতে পারি, এটি কোনো সশস্ত্র ডাকাতি নয়, তারচেয়ে বেশি গুরুতর কিছু।’
হামলা শুরুর প্রায় ৪৫ মিনিট পর রাত সাড়ে নয়টার দিকে হলি আর্টিজানের বেশ কয়েকজন কর্মী কৌশলে ছাদ বেয়ে বেরিয়ে আসতে সক্ষম হন। তাঁরা রাস্তায় চলে আসেন এবং তাঁদের একজনের কাছে ছুটে যান যারেফ ও তাঁর মা। যারেফ বলেন, ‘আমরা তাঁকে জিজ্ঞেস করলাম, একটি ছেলে ও দুটি মেয়েকে তিনি দেখেছেন কি না। ফোনে ফারাজের ছবিও তাঁকে দেখালাম। জবাবে তিনি বললেন, “আমি তাদের দেখেছি। তারা একটি টেবিলের নিচে লুকাচ্ছিল।”’
ওই রেস্তোরাঁর কর্মী বলেন, বিদেশি নাগরিকদের একটি নির্দিষ্ট জায়গায় আলাদা করে রাখা হচ্ছে। আর যাঁদের বাংলাদেশি ও মুসলিম বলে মনে করছে, তাঁদের আরেক জায়গায় রাখা হয়েছে।
যারেফ বলেন, ‘ওই মুহূর্তে মা আমার দিকে চেয়ে বলেন, “তারিশি ও অবিন্তাকে ও ওভাবে ছেড়ে দেবে না। আমি আমার ছেলেকে চিনি। আমি ফারাজকে চিনি। সে তার বন্ধুদের ছেড়ে যাবে না।”’
নিরাপত্তা বাহিনীর অভিযান শেষে জিম্মি পরিস্থিতির অবসান হয়। দেখা যায় ফারাজ ও তাঁর বন্ধুদের হত্যা করেছে জঙ্গিরা। ফারাজের জীবনের শেষ মুহূর্তগুলোর কথা জানার পর বোঝা যায় তাঁর মায়ের আশঙ্কাই সত্যি হয়েছে।
ফারাজের ভাই বলছিলেন, ‘আমরা যতটুকু জানতে পেরেছি তা হলো, ফারাজ যেহেতু বাংলাদেশি ও মুসলিম; কাজেই হামলাকারীরা তাঁকে ছেড়ে দিত। কিন্তু যখন তাঁকে চলে যাওয়ার কথা বলা হয়, তখন ফারাজ জানতে চায়, “আমার বন্ধুদের কী হবে?” সন্ত্রাসীরা তাঁদের ছাড়তে অস্বীকার করলে ফারাজ বলেছিলেন, “আমি তাদের ছেড়ে যাব না।”’
ফারাজের এই নিঃস্বার্থ আত্মত্যাগের ঘটনা এরই মধ্যে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেয়েছে। সামাজিক ন্যায়বিচারের জন্য মরণোত্তর মাদার তেরেসা মেমোরিয়াল ইন্টারন্যাশনাল অ্যাওয়ার্ড দেওয়া হয়েছে তাঁকে। বাংলাদেশেও তাঁর আত্মত্যাগ ব্যাপক আলোচিত হয়েছে।
ফারাজের নানা শিল্পপতি লতিফুর রহমান বলেন, ‘প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষের মুখে মুখেও শোনা গেছে একই কথা। তাঁরা বলেছেন, “ফারাজই বাংলাদেশ। আমরা ফারাজের মতো। কোনো সন্ত্রাসীর মতো নই।” তিনি আরও বলেন, ‘বাঁশখালীতে ফারাজের নামে একটি চত্বরের নামকরণ করা হয়েছে। বাংলাদেশের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের এক অধ্যাপক তাঁর সন্তানের নাম রেখেছেন ফারাজ। কারণ তিনি বলেছেন, তিনি চান তাঁর সন্তান যেন ফারাজের আদর্শেই বড় হয়ে ওঠে।’
এ ঘটনাগুলো ফারাজের পরিবারকে আলোড়িত করে, কিন্তু তা ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের একজন পাঁড় ভক্তের অভাব পূরণ করতে পারে না। তাঁর নানার মতে, এই তরুণের গন্তব্য ছিল নেতৃত্ব ও সফলতার দিকে।
লতিফুর রহমান বলছিলেন, ‘আমি প্রতিটা দিন এসব নিয়েই লড়ছি। আমি বুঝতে পারি যে সে কী করেছে। আমি তার এ কাজের অকুণ্ঠ প্রশংসাও করি। কিন্তু একজন কীভাবে এ কাজটি করতে পারল, তা বুঝে উঠতে আমার কষ্ট হয়। আমার কষ্ট হয়, কারণ আমার সেই সাহস নেই, যা ফারাজের ছিল। এই তরুণটি যা করেছে, তা করার শক্তি আমার নেই। আমি শুধু ভাবি, যদি আজ সে এখানে আমার সঙ্গে থাকত!’

 

বাবুর্চিকে ঘিরে রহস্য
রাজধানীর দক্ষিণের উপকণ্ঠেই জাকির হোসেন শাওনের (১৮) পরিবারের বাস। সেখানে ছোট্ট একটি ঘরে তাঁর মা-বাবা, বোন আর ভাইয়েরা কোনোরকমে থাকেন। শাওন হলি আর্টিজানে কাজ করেছেন এক বছরের মতো সময়। বাবা আবদুস সাত্তার জানান, বাবুর্চির এই চাকরিটার সঙ্গে শাওন খুব সহজেই খাপ খাইয়ে নিয়েছিলেন।
মা মাকসুদা বেগম বলেন, ‘সহকর্মীদের মধ্যে শাওন বয়সে সবার ছোট হওয়ায় সবাই তাঁকে খুব ভালোবাসতেন।’
১ জুলাই সন্ধ্যায় শাওন কর্মস্থলেই ছিলেন। তিনি তাঁর মাকে মুঠোফোনে বলেছিলেন, ঈদ বোনাস পেয়ে গেছেন এবং পরদিন বা তার পরদিন তিনি বাড়ি যাবেন। রোজার মাস হওয়ায় সেদিন টেলিভিশন দেখছিলেন না শাওনের পরিবারের সদস্যরা। কাজেই জঙ্গি হামলা সম্পর্কে তাৎক্ষণিক তাঁরা কিছু জানতে পারেননি। পরদিন, ২ জুলাই সকালে প্রতিবেশীর কাছে হামলার কথা শুনে শাওনের ছবি নিয়ে তাঁরা রাজধানীর গুলশানে যান। নিজের সন্তানের ছবি নিয়ে এক পুলিশ কর্মকর্তার কাছ থেকে অন্য পুলিশ কর্মকর্তার কাছে যান। সড়কে থাকা অসংখ্য মানুষের সঙ্গেও কথা বলেন তাঁরা। কিন্তু কেউই কিছু বলতে পারেননি।
ওই দিন রাত ১০টার দিকে শাওনের বাবা সাত্তার গুলশানে পুলিশ স্টেশনে যান। তিনি বলেন, সেখানে এক পুলিশ কর্মকর্তা তাঁকে বলেছিলেন, তাঁর ছেলে বেঁচে আছেন। কিন্তু শাওন কোথায় আছেন, সে সম্পর্কে ওই কর্মকর্তা কিছু জানাতে পারেননি।
এদিকে, টেলিভিশনে শাওনের ছবি দেখানো হচ্ছিল। ছবিগুলো ১ জুলাই রাত তিনটার কিছু আগে তোলা। তখনো হলি আর্টিজানের নিয়ন্ত্রণ জঙ্গিদের হাতে। ছবিগুলোয় দেখা যায়, শাওন পুলিশের একটি গাড়ির পেছনে বসে আছেন এবং পুলিশ কর্মকর্তারা তাঁর হাত ধরে আছেন। তাঁর বুক থেকে রক্ত ঝরছিল, তবে তাঁর চেতনা ছিল। যেকোনোভাবেই হোক, জঙ্গিদের হাত থেকে ছুটতে পেরেছিলেন তিনি। কিন্তু প্রশ্ন উঠেছে, এরপর শাওন কোথায় ছিলেন?
৩ জুলাই সকালে শাওনের মা-বাবা একটি ফোন পান। ফোনটি করেছিলেন হলি আর্টিজানে জঙ্গি হামলায় বেঁচে যাওয়া এক কর্মী। তিনি শাওনের মা-বাবাকে জানান, তাঁদের ছেলে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আছেন।
শাওনের পরিবারের সদস্যরা ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ছুটে যান। কিন্তু সেখানে ছেলের চেহারা দেখা তাঁদের জন্য ছিল অত্যন্ত পীড়াদায়ক। তাঁর পায়ে আঘাতের চিহ্ন ছিল এবং এক চোখ কালো হয়ে গিয়েছিল, যা টেলিভিশনে প্রচারিত ছবিতে দেখা যায়নি। কখনো চেতনা ফিরে পাচ্ছিলেন তিনি, আবার তারপরেই অচেতন হয়ে পড়ছিলেন।
শাওনের মা মাকসুদা বেগম বলেন, ‘যতবার তার জ্ঞান ফিরছিল, ততবার শুধু বলছিল, “আমাকে মারবেন না, আমাকে আর মারবেন না। আমাকে যেতে দেন”।’ মাকসুদা বেগম অভিযোগ করেন, ‘পুলিশ তাকে (শাওন) ধরে নিয়ে গিয়ে নির্যাতন করেছে। তার মাথায় আঘাত করেছে। লাথি মেরেছে। নির্দয়ভাবে পিটিয়েছে।’
তবে অভিযোগ অস্বীকার করে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) সন্ত্রাস দমন ইউনিটের প্রধান মনিরুল ইসলাম বলেন, শাওন পুলিশের হেফাজতে ছিলেন না। তিনি বলেন, ‘তিনি (রেস্তোরাঁ থেকে) পালানোর সময় আহত হন। হলি আর্টিজানে হামলার পর মধ্যরাতে তাঁকে হাসপাতালে নেওয়া হয় বলে আমার ধারণা। তবে কে বা কারা তাঁকে হাসপাতালে নিয়ে যায়, সে ব্যাপারে আমরা নিশ্চিত নই।’
এদিকে, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষও শাওনের ভর্তির ব্যাপারে কোনো তথ্য তাদের নথিতে খুঁজে পায়নি। কাজেই তাঁকে কখন হাসপাতালে নেওয়া হয়, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
শাওনের বাবা পুলিশের কাছে অভিযোগ দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। তিনি বলেন, ‘তারা (পুলিশ) বিষয়টি গুরুত্ব দেয়নি।’
হলি আর্টিজানে জঙ্গি হামলার এক সপ্তাহ পর গত বছরের ৮ জুলাই শাওন মারা যান। কিন্তু এখনো প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজে পায়নি তাঁর পরিবার।
গত ১১ জানুয়ারি হলি আর্টিজান আবার ভিন্ন ঠিকানায় নতুন করে যাত্রা শুরু করেছে। পুলিশ বলেছে, এই রেস্তোরাঁয় হামলার মূল পরিকল্পনাকারী গত শুক্রবার পুলিশের সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হয়েছেন।

Comments

comments

সম্পাদক : মোহাম্মদ আবদুল বাছির
প্রকাশক: মোহাম্মদ জহিরুল ইসলাম
ফোন : ‎০১৭১৩৪০৯০৯০
৩৪৫/১, দিলু রোড, নিউ ইস্কাটন, ঢাকা-১০০০
X
 
নিয়মিত খবর পড়তে আমাদের ফেসবুক পেজে লাইক দিয়ে যুক্ত থাকুন
X