সোমবার, ১৯শে ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ ইং, ৭ই ফাল্গুন, ১৪২৪ বঙ্গাব্দ, বিকাল ৫:৪৪
শিরোনাম
  • ঘৃণাকে বিজয়ী হতে দেয়া যাবে না, ট্রাম্পকে ইঙ্গিত করে জর্জ ক্লুনি
  • আমার একটাই চিন্তা দেশের মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন করা: প্রধানমন্ত্রী
  • ‘কেন্দ্রীয় সরকারের আগ্রাসী নীতির কারণে কাশ্মীরকে হারাতে হবে’
  • সাড়ে চারমাস পর মুখোমুখি, খাদিজাকে উদ্দেশ্য করে যা বলল বদরুল
  • খালেদার ‘সাজা’ বিরোধী নেতাকর্মীদের মনোবল ভাঙ্গার কৌশল!
  • বিএনপির কর্মসূচি ‘যথাসময়ে’ জানানো হবে: রিজভী
  • দলের জন্য বোলিং করতেও রাজি মুশফিক
  • শিশু জিহাদের মৃত্যু: চার জনের ১০ বছর করে কারাদণ্ড
  • অবশেষে বাড়ি অবরুদ্ধ করে রাখা সেই দেয়াল ভেঙ্গে ফেলা হচ্ছে
  • সাক্ষ্য দিলেন খাদিজা, চাইলেন বদরুলের সর্বোচ্চ শাস্তি
  • বদরুলের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিতে আদালতে খাদিজা
  • আজ বগুড়ায় যেসব প্রকল্প উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী
  • রোহিঙ্গা স্থানান্তরের সরকারি পরিকল্পনার সঙ্গে দ্বিমত মানবাধিকার কমিশনের
  • মহেশখালীতে ইয়াবা ব্যবসায়ীদের সঙ্গে পুলিশের ‘বন্দুকযুদ্ধ’
  • হোয়াইট হাউসে কাজ করার দীর্ঘ অভিজ্ঞতার কথা জানালেন এই বাংলাদেশি সাংবাদিক
Saturday, July 22, 2017 10:55 pm
A- A A+ Print

হাজার লাশ কাটার গল্প

50c7e3cf26cf642a808a7c878e5f93eb-5973699eb5258

আর দশজনের মতো তিনিও ফরেনসিক চিকিৎসক। লাশ কাটেন। বের করেন মৃত্যুর কারণ। দেন ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন। কিন্তু লাশ কাটা ঘরে শুয়ে থাকা মৃত মানুষগুলো তাঁকে ভীষণ ভাবায়। তাঁকে আবেগতাড়িত করে। লাশ কাটতে কাটতে মনের অজান্তে তাঁর চোখ দিয়ে পানি ঝরে। আত্মহত্যা বলে পাঠানো লাশের শরীর খুঁটে বের করে আনেন নৃশংস খুনের গল্প। চিকিৎসা-সংক্রান্ত বইয়ের পাশাপাশি তাঁর কাছে থাকে কবি জীবনানন্দ দাশের কবিতার বই। অবচেতন মনে আওড়াতে থাকেন জীবনানন্দের ‘আট বছর আগের একদিন’। আবৃত্তির ঢঙে পড়েন ‘লাশকাটা ঘরে, চিৎ হ’য়ে শুয়ে আছে টেবিলের ’পরে...। নিজেও লেখেন কবিতা। তিনি হারুন অর রশীদ। স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগের চিকিৎসক। তাঁর ভাষ্য, তিনি এক হাজার মানুষের লাশের ময়নাতদন্ত করেছেন। প্রথম প্রথম লাশ কাটা ঘরে যখন ঢুকতেন, তখন অন্য আর দশটা মানুষের মতো লাশ দেখতে তাঁর খারাপ লাগত। কিন্তু ধীরে ধীরে বিষয়টিকে স্বাভাবিকভাবে নেওয়ার চেষ্টা করেন। পড়তে শুরু করেন অপরাধবিজ্ঞান ও ফরেনসিকের বইপত্র। এভাবেই তিনি নিজেকে সমৃদ্ধ করে তোলা শুরু করেন। এখনো প্রতিদিন পড়েন। তবে দেশ-বিদেশের কবিতা, গল্প, উপন্যাস অর্থাৎ সাহিত্যের বই তাঁকে বেশি টানে। তাঁর বাবা মুজিবর রহমানও ছিলেন চিকিৎসক। বগুড়ার গ্রামে তিনি কাটিয়েছেন তাঁর চিকিৎসকজীবন। চিকিৎসক বাবাই তাঁকে চিকিৎসক হতে অনুপ্রাণিত করেন। কিন্তু তাঁর মন পড়ে থাকত সাহিত্যের বইয়ের প্রতি। অন্য চিকিৎসকেরা দ্রুততম সময়ে যেভাবে পদোন্নতি পান, কিন্তু তিনি তা পাননি। ৩০ বছরের আগে প্রভাষক পদে ঢুকেছিলেন, আজও তিনি তা-ই আছেন। আর হয়তো দুই বছর পরেই ইতি টানবেন পেশাগত এই জীবন। এক হাজার লাশের ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসক হারুন অর রশীদ। ছবি: আসাদুজ্জামান চিকিৎসক হারুনের ভাষায়, ফরেনসিক বিভাগে আসার পর তাঁর কিছু মর্মবেদনা সৃষ্টি হয়। কারণ, টেবিলের ওপর যে মানুষগুলোকে ময়নাতদন্ত করার জন্য প্রতিদিন দেখেন, মানুষগুলো একদিন তো জীবিত ছিল। কেন জীবন থেকে এভাবে ঝরে গেল? অথবা স্বাভাবিক মৃত্যুর মুখোমুখি না হয়ে কেন অস্বাভাবিক মৃত্যুর সারিতে এসে দাঁড়াল? যখন ভাবেন, তখন মনটা ভীষণ বেদনায় ভরে ওঠে। প্রত্যেক মানুষের স্বপ্ন থাকে, বেঁচে থাকার স্বাদ থাকে। স্বাভাবিক মৃত্যুর কল্পনাও থাকে। কিন্তু ভাগ্য হয়তো এখানে তাকে নিয়ে আসে। এখানে তার জীবনের পরিসমাপ্তির সঙ্গে তার চিন্তা ও চেতনার কোনো মিল থাকে না। আত্মহত্যা করেছে, পুলিশের পাঠানো এমন লাশ ময়নাতদন্ত করে হারুন অর রশিদ দেখিয়েছেন, সেটি আত্মহত্যা ছিল না, ছিল হত্যা। পেশাগত দায়িত্বের বাইরে গিয়েও তিনি প্রত্যেক লাশের মৃত্যুর কারণ বের করার চেষ্টায় থাকেন। তদন্তে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করেন। সাম্প্রতিক সময়ের কয়েকটি মৃত্যুর রহস্য বের করার গল্প শোনালেন চিকিৎসক হারুন। তিনি বলেন, ‘সব সময় চিন্তা করি, এটা হত্যা না আত্মহত্যা? অথবা আত্মহত্যাকে হত্যা বলে চালিয়ে দেওয়া হচ্ছে কি না। মৃত্যু স্বাভাবিক না অস্বাভাবিক। আর অস্বাভাবিক হলোই বা কেন? কারণ অপরাধী যখন অপরাধ করে, তখন অপরাধকে লুকানোর চেষ্টায় সর্বদা তৎপর থাকে। সুতরাং আমার চেষ্টাই থাকে যে এই আড়াল করা বিষয়গুলো একজন ভিকটিমের শরীরে অপরাধী অজান্তে রেখে গেছে কি না। যে চিহ্ন তার অপরাধকে প্রমাণ করতে সহযোগিতা করবে। এটাই থাকে আমার উদ্দেশ্য।’ তাঁর ভাষ্য, ‘বছর দুই আগে ১০ বছর বয়সী এক শিশুর লাশ আনে পুলিশ। বলা হয় সে গলায় রশি পেঁচিয়ে আত্মহত্যা করেছে। অথচ সে ছিল একজন প্রতিবন্ধী। তার ডান হাত অকেজো ছিল। সে ওই হাত দিয়ে কিছু করতে পারত না। পুলিশ বলেছে, মেয়েটি আত্মহত্যা করেছে। একটা মানুষ শ্বাসরুদ্ধ হয়ে মারা গেলে যতগুলো লক্ষণ থাকার কথা, সব কটি শিশুটির লাশে ছিল। ময়নাতদন্ত করার সময় আমার মনে হলো, পুলিশ বলেছে, পাঁচ-ছয় ফুট উঁচুতে মেয়েটি গলায় রশি পেঁচিয়ে আত্মহত্যা করেছে। স্কুল থেকে ফেরার পর আত্মহত্যা করেছে। আমি জানতে পারি, মেয়েটা এতিম। তার বাবা নেই। তার মামা তাকে প্রতিপালন করেন। পড়াশোনা করান। তখন আমার মনে হয়েছে, একটা প্রতিবন্ধী বাচ্চা এ রকম একটা উঁচু জায়গায় এক হাত দিয়ে নিজের গলায় রশি পেঁচিয়ে আত্মহত্যা করবে, এটা একেবারেই অসম্ভব। বিষয়টা আমি পরবর্তী সময়ে তদন্ত কর্মকর্তাকে বলি। বিষয়টা তাঁরা গুরুত্বের সঙ্গে নেন। পরে বেরিয়ে আসে, শিশুটি যেখানে থাকত, তার সামনের ঘরে দুজন মেয়ে থাকত। একজনের সঙ্গে পাশের ঘরের এক যুবকের অবৈধ সম্পর্ক গড়ে ওঠে। তাদের অস্বাভাবিক পরিস্থিতিতে দেখে ফেলে মেয়েটি। যখন সে হইচই করার চেষ্টা করে, তখন মেয়েটিকে বালিশচাপা দিয়ে হত্যা করে রশিতে ঝুলিয়ে দেওয়া হয়।’ বছরখানেক আগে যাত্রাবাড়ী থেকে এক নারীর লাশের ময়নাতদন্তের জন্য আনা হয়। তাঁর গলায় ছিল ধারালো অস্ত্রের আঘাত। কিন্তু কে বা কারা তাঁকে হত্যা করেছে, তা বের করতে পারছিলেন না। হারুন অর রশীদ ওই নারীর ময়নাতদন্ত করেন। দেখেন, নারীকে বাঁহাতি কোনো লোক ব্লেড অথবা ক্ষুর দিয়ে হত্যা করেছে। পুলিশকে তিনি এমন তথ্য জানানোর পর সেই বাঁহাতি খুনিকে খুঁজে বের করে পুলিশ। যিনি মুঠোফোন চুরি করতে ঘরে ঢুকেছিলেন, ওই নারী টের পেয়ে তাঁকে জাপটে ধরলে তিনি ক্ষুর দিয়ে হত্যা করেন। কয়েক বছর আগে হাজারীবাগ থেকে এক কিশোরীর লাশ আসে। বলা হয়, মেয়েটি রোগে ভুগে মারা গেছে। তার বাড়ি বরিশালে। সে হাজারীবাগের একটি বাসায় গৃহকর্মী ছিল। মেয়েটি অবিবাহিত ছিল। চিকিৎসক হারুন তাঁর ময়নাতদন্ত করে দেখেন, মেয়েটির জরায়ুতে ক্ষত। গর্ভপাত করার কারণে এমন হয়। পুলিশকে তিনি এ ঘটনা জানান। অবিবাহিত হওয়ার পরও কীভাবে সে অন্তঃসত্ত্বা হয়েছিল? পরে পুলিশের তদন্তে বেরিয়ে আসে, সে যে বাসার গৃহকর্মী হিসেবে কাজ করত, ওই বাসার গৃহকর্তা ও তাঁর ছেলে তাকে একাধিকবার ধর্ষণ করেন। অন্তঃসত্ত্বা হওয়ার পর তাঁরা গর্ভপাত করান। তখন জরায়ুতে ক্ষত হয়। এরপর রোগে আক্রান্ত হয়ে মেয়েটি মারা যায়। এ ঘটনায় হত্যা মামলা হয়। পুলিশ ওই দুজনকে গ্রেপ্তার করে বিচারের মুখোমুখি করে। হারুন অর রশীদ বলেন, ‘লাশ কাটার সময় কেঁদে ফেলেছি—এমন অনেক ঘটনা আছে। একবার এক বাচ্চার ময়নাতদন্ত করছিলাম, তার চেহারা আমার সন্তানের মতো। মনে হচ্ছিল আমার সন্তান যেন লাশ কাটা ঘরে শুয়ে আছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘লাশ কাটা ঘরের এমন নির্মম অনুভূতিগুলো সব সময় নির্মম হয়ে নয়, ভীষণরকম স্পর্শকাতর হয়ে এসেছে বিভিন্ন ঘটনায়, যা আমার জীবনকে পাল্টে দিয়েছে। লাশ কাটা ঘরে থাকতে থাকতে জীবনকে একেবারে ক্ষণস্থায়ী ভাবতে শিখেছি। মানুষের জীবনের গভীরতম যে বিষয়, মানুষের সুখ-দুঃখ–বেদনা থাকে, হয়তো সেগুলোর সঙ্গে নিজের জীবনকে তুলনা করতে চেয়েছি।’ এক হাজার মৃত মানুষ তাঁর মনোজগৎ দখলে নিয়েছে, যাদের শরীর তাঁকে কাটাছেঁড়া করতে হয়েছে। মৃত ব্যক্তিরা যেন তাঁর সঙ্গে কথা বলে। হারুন প্রথম আলোকে বলেন, ‘মেডিকেলে ভর্তি হওয়ার আগে আমার সাহিত্যের প্রতি কিছুটা দুর্বলতা ছিল। সাহিত্য নিয়ে পড়াশোনা করতাম, এখনো করি। আমি সাহিত্যের স্পর্শে থাকা একজন মানুষ। প্রথম আমি কলেজপড়ুয়া তরুণীর ময়নাতদন্ত করি। যখন লাশ কাটা ঘরে প্রথম তাকে দেখি, আমার কাছে মনে হচ্ছিল, মেয়েটি স্বাচ্ছন্দ্য নিয়ে যেন ঘুমিয়ে আছে। তখন মনে প্রশ্ন আসে, কেন মেয়েটা আত্মহত্যা করল? মানুষ কেন আত্মহত্যা করে? ৩০ থেকে ৩৫ বছরের পেশাগত জীবনে এ প্রশ্নটির উত্তর আজও খুঁজছি’, নির্লিপ্তভাবে বললেন হারুন অর রশীদ।

Comments

Comments!

 হাজার লাশ কাটার গল্পAmarbangladeshonlineAmarbangladeshonline | Amarbangladeshonline

হাজার লাশ কাটার গল্প

Saturday, July 22, 2017 10:55 pm
50c7e3cf26cf642a808a7c878e5f93eb-5973699eb5258

আর দশজনের মতো তিনিও ফরেনসিক চিকিৎসক। লাশ কাটেন। বের করেন মৃত্যুর কারণ। দেন ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন। কিন্তু লাশ কাটা ঘরে শুয়ে থাকা মৃত মানুষগুলো তাঁকে ভীষণ ভাবায়। তাঁকে আবেগতাড়িত করে। লাশ কাটতে কাটতে মনের অজান্তে তাঁর চোখ দিয়ে পানি ঝরে। আত্মহত্যা বলে পাঠানো লাশের শরীর খুঁটে বের করে আনেন নৃশংস খুনের গল্প।

চিকিৎসা-সংক্রান্ত বইয়ের পাশাপাশি তাঁর কাছে থাকে কবি জীবনানন্দ দাশের কবিতার বই। অবচেতন মনে আওড়াতে থাকেন জীবনানন্দের ‘আট বছর আগের একদিন’। আবৃত্তির ঢঙে পড়েন ‘লাশকাটা ঘরে, চিৎ হ’য়ে শুয়ে আছে টেবিলের ’পরে…। নিজেও লেখেন কবিতা। তিনি হারুন অর রশীদ। স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগের চিকিৎসক। তাঁর ভাষ্য, তিনি এক হাজার মানুষের লাশের ময়নাতদন্ত করেছেন।
প্রথম প্রথম লাশ কাটা ঘরে যখন ঢুকতেন, তখন অন্য আর দশটা মানুষের মতো লাশ দেখতে তাঁর খারাপ লাগত। কিন্তু ধীরে ধীরে বিষয়টিকে স্বাভাবিকভাবে নেওয়ার চেষ্টা করেন। পড়তে শুরু করেন অপরাধবিজ্ঞান ও ফরেনসিকের বইপত্র। এভাবেই তিনি নিজেকে সমৃদ্ধ করে তোলা শুরু করেন। এখনো প্রতিদিন পড়েন। তবে দেশ-বিদেশের কবিতা, গল্প, উপন্যাস অর্থাৎ সাহিত্যের বই তাঁকে বেশি টানে। তাঁর বাবা মুজিবর রহমানও ছিলেন চিকিৎসক। বগুড়ার গ্রামে তিনি কাটিয়েছেন তাঁর চিকিৎসকজীবন। চিকিৎসক বাবাই তাঁকে চিকিৎসক হতে অনুপ্রাণিত করেন। কিন্তু তাঁর মন পড়ে থাকত সাহিত্যের বইয়ের প্রতি। অন্য চিকিৎসকেরা দ্রুততম সময়ে যেভাবে পদোন্নতি পান, কিন্তু তিনি তা পাননি। ৩০ বছরের আগে প্রভাষক পদে ঢুকেছিলেন, আজও তিনি তা-ই আছেন। আর হয়তো দুই বছর পরেই ইতি টানবেন পেশাগত এই জীবন।

এক হাজার লাশের ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসক হারুন অর রশীদ। ছবি: আসাদুজ্জামান

চিকিৎসক হারুনের ভাষায়, ফরেনসিক বিভাগে আসার পর তাঁর কিছু মর্মবেদনা সৃষ্টি হয়। কারণ, টেবিলের ওপর যে মানুষগুলোকে ময়নাতদন্ত করার জন্য প্রতিদিন দেখেন, মানুষগুলো একদিন তো জীবিত ছিল। কেন জীবন থেকে এভাবে ঝরে গেল? অথবা স্বাভাবিক মৃত্যুর মুখোমুখি না হয়ে কেন অস্বাভাবিক মৃত্যুর সারিতে এসে দাঁড়াল? যখন ভাবেন, তখন মনটা ভীষণ বেদনায় ভরে ওঠে। প্রত্যেক মানুষের স্বপ্ন থাকে, বেঁচে থাকার স্বাদ থাকে। স্বাভাবিক মৃত্যুর কল্পনাও থাকে। কিন্তু ভাগ্য হয়তো এখানে তাকে নিয়ে আসে। এখানে তার জীবনের পরিসমাপ্তির সঙ্গে তার চিন্তা ও চেতনার কোনো মিল থাকে না।

আত্মহত্যা করেছে, পুলিশের পাঠানো এমন লাশ ময়নাতদন্ত করে হারুন অর রশিদ দেখিয়েছেন, সেটি আত্মহত্যা ছিল না, ছিল হত্যা। পেশাগত দায়িত্বের বাইরে গিয়েও তিনি প্রত্যেক লাশের মৃত্যুর কারণ বের করার চেষ্টায় থাকেন। তদন্তে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করেন। সাম্প্রতিক সময়ের কয়েকটি মৃত্যুর রহস্য বের করার গল্প শোনালেন চিকিৎসক হারুন। তিনি বলেন, ‘সব সময় চিন্তা করি, এটা হত্যা না আত্মহত্যা? অথবা আত্মহত্যাকে হত্যা বলে চালিয়ে দেওয়া হচ্ছে কি না। মৃত্যু স্বাভাবিক না অস্বাভাবিক। আর অস্বাভাবিক হলোই বা কেন? কারণ অপরাধী যখন অপরাধ করে, তখন অপরাধকে লুকানোর চেষ্টায় সর্বদা তৎপর থাকে। সুতরাং আমার চেষ্টাই থাকে যে এই আড়াল করা বিষয়গুলো একজন ভিকটিমের শরীরে অপরাধী অজান্তে রেখে গেছে কি না। যে চিহ্ন তার অপরাধকে প্রমাণ করতে সহযোগিতা করবে। এটাই থাকে আমার উদ্দেশ্য।’

তাঁর ভাষ্য, ‘বছর দুই আগে ১০ বছর বয়সী এক শিশুর লাশ আনে পুলিশ। বলা হয় সে গলায় রশি পেঁচিয়ে আত্মহত্যা করেছে। অথচ সে ছিল একজন প্রতিবন্ধী। তার ডান হাত অকেজো ছিল। সে ওই হাত দিয়ে কিছু করতে পারত না। পুলিশ বলেছে, মেয়েটি আত্মহত্যা করেছে। একটা মানুষ শ্বাসরুদ্ধ হয়ে মারা গেলে যতগুলো লক্ষণ থাকার কথা, সব কটি শিশুটির লাশে ছিল। ময়নাতদন্ত করার সময় আমার মনে হলো, পুলিশ বলেছে, পাঁচ-ছয় ফুট উঁচুতে মেয়েটি গলায় রশি পেঁচিয়ে আত্মহত্যা করেছে। স্কুল থেকে ফেরার পর আত্মহত্যা করেছে। আমি জানতে পারি, মেয়েটা এতিম। তার বাবা নেই। তার মামা তাকে প্রতিপালন করেন। পড়াশোনা করান। তখন আমার মনে হয়েছে, একটা প্রতিবন্ধী বাচ্চা এ রকম একটা উঁচু জায়গায় এক হাত দিয়ে নিজের গলায় রশি পেঁচিয়ে আত্মহত্যা করবে, এটা একেবারেই অসম্ভব। বিষয়টা আমি পরবর্তী সময়ে তদন্ত কর্মকর্তাকে বলি। বিষয়টা তাঁরা গুরুত্বের সঙ্গে নেন। পরে বেরিয়ে আসে, শিশুটি যেখানে থাকত, তার সামনের ঘরে দুজন মেয়ে থাকত। একজনের সঙ্গে পাশের ঘরের এক যুবকের অবৈধ সম্পর্ক গড়ে ওঠে। তাদের অস্বাভাবিক পরিস্থিতিতে দেখে ফেলে মেয়েটি। যখন সে হইচই করার চেষ্টা করে, তখন মেয়েটিকে বালিশচাপা দিয়ে হত্যা করে রশিতে ঝুলিয়ে দেওয়া হয়।’

বছরখানেক আগে যাত্রাবাড়ী থেকে এক নারীর লাশের ময়নাতদন্তের জন্য আনা হয়। তাঁর গলায় ছিল ধারালো অস্ত্রের আঘাত। কিন্তু কে বা কারা তাঁকে হত্যা করেছে, তা বের করতে পারছিলেন না। হারুন অর রশীদ ওই নারীর ময়নাতদন্ত করেন। দেখেন, নারীকে বাঁহাতি কোনো লোক ব্লেড অথবা ক্ষুর দিয়ে হত্যা করেছে। পুলিশকে তিনি এমন তথ্য জানানোর পর সেই বাঁহাতি খুনিকে খুঁজে বের করে পুলিশ। যিনি মুঠোফোন চুরি করতে ঘরে ঢুকেছিলেন, ওই নারী টের পেয়ে তাঁকে জাপটে ধরলে তিনি ক্ষুর দিয়ে হত্যা করেন।

কয়েক বছর আগে হাজারীবাগ থেকে এক কিশোরীর লাশ আসে। বলা হয়, মেয়েটি রোগে ভুগে মারা গেছে। তার বাড়ি বরিশালে। সে হাজারীবাগের একটি বাসায় গৃহকর্মী ছিল। মেয়েটি অবিবাহিত ছিল। চিকিৎসক হারুন তাঁর ময়নাতদন্ত করে দেখেন, মেয়েটির জরায়ুতে ক্ষত। গর্ভপাত করার কারণে এমন হয়। পুলিশকে তিনি এ ঘটনা জানান। অবিবাহিত হওয়ার পরও কীভাবে সে অন্তঃসত্ত্বা হয়েছিল? পরে পুলিশের তদন্তে বেরিয়ে আসে, সে যে বাসার গৃহকর্মী হিসেবে কাজ করত, ওই বাসার গৃহকর্তা ও তাঁর ছেলে তাকে একাধিকবার ধর্ষণ করেন। অন্তঃসত্ত্বা হওয়ার পর তাঁরা গর্ভপাত করান। তখন জরায়ুতে ক্ষত হয়। এরপর রোগে আক্রান্ত হয়ে মেয়েটি মারা যায়। এ ঘটনায় হত্যা মামলা হয়। পুলিশ ওই দুজনকে গ্রেপ্তার করে বিচারের মুখোমুখি করে।

হারুন অর রশীদ বলেন, ‘লাশ কাটার সময় কেঁদে ফেলেছি—এমন অনেক ঘটনা আছে। একবার এক বাচ্চার ময়নাতদন্ত করছিলাম, তার চেহারা আমার সন্তানের মতো। মনে হচ্ছিল আমার সন্তান যেন লাশ কাটা ঘরে শুয়ে আছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘লাশ কাটা ঘরের এমন নির্মম অনুভূতিগুলো সব সময় নির্মম হয়ে নয়, ভীষণরকম স্পর্শকাতর হয়ে এসেছে বিভিন্ন ঘটনায়, যা আমার জীবনকে পাল্টে দিয়েছে। লাশ কাটা ঘরে থাকতে থাকতে জীবনকে একেবারে ক্ষণস্থায়ী ভাবতে শিখেছি। মানুষের জীবনের গভীরতম যে বিষয়, মানুষের সুখ-দুঃখ–বেদনা থাকে, হয়তো সেগুলোর সঙ্গে নিজের জীবনকে তুলনা করতে চেয়েছি।’

এক হাজার মৃত মানুষ তাঁর মনোজগৎ দখলে নিয়েছে, যাদের শরীর তাঁকে কাটাছেঁড়া করতে হয়েছে। মৃত ব্যক্তিরা যেন তাঁর সঙ্গে কথা বলে। হারুন প্রথম আলোকে বলেন, ‘মেডিকেলে ভর্তি হওয়ার আগে আমার সাহিত্যের প্রতি কিছুটা দুর্বলতা ছিল। সাহিত্য নিয়ে পড়াশোনা করতাম, এখনো করি। আমি সাহিত্যের স্পর্শে থাকা একজন মানুষ। প্রথম আমি কলেজপড়ুয়া তরুণীর ময়নাতদন্ত করি। যখন লাশ কাটা ঘরে প্রথম তাকে দেখি, আমার কাছে মনে হচ্ছিল, মেয়েটি স্বাচ্ছন্দ্য নিয়ে যেন ঘুমিয়ে আছে। তখন মনে প্রশ্ন আসে, কেন মেয়েটা আত্মহত্যা করল? মানুষ কেন আত্মহত্যা করে?
৩০ থেকে ৩৫ বছরের পেশাগত জীবনে এ প্রশ্নটির উত্তর আজও খুঁজছি’, নির্লিপ্তভাবে বললেন হারুন অর রশীদ।

Comments

comments

সম্পাদক : মোহাম্মদ আবদুল বাছির
প্রকাশক: মোহাম্মদ জহিরুল ইসলাম
ফোন : ‎০১৭১৩৪০৯০৯০
৩৪৫/১, দিলু রোড, নিউ ইস্কাটন, ঢাকা-১০০০
X
 
নিয়মিত খবর পড়তে আমাদের ফেসবুক পেজে লাইক দিয়ে যুক্ত থাকুন
X