রবিবার, ২৫শে ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ ইং, ১৩ই ফাল্গুন, ১৪২৪ বঙ্গাব্দ, বিকাল ৩:৪৫
শিরোনাম
  • ঘৃণাকে বিজয়ী হতে দেয়া যাবে না, ট্রাম্পকে ইঙ্গিত করে জর্জ ক্লুনি
  • আমার একটাই চিন্তা দেশের মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন করা: প্রধানমন্ত্রী
  • ‘কেন্দ্রীয় সরকারের আগ্রাসী নীতির কারণে কাশ্মীরকে হারাতে হবে’
  • সাড়ে চারমাস পর মুখোমুখি, খাদিজাকে উদ্দেশ্য করে যা বলল বদরুল
  • খালেদার ‘সাজা’ বিরোধী নেতাকর্মীদের মনোবল ভাঙ্গার কৌশল!
  • বিএনপির কর্মসূচি ‘যথাসময়ে’ জানানো হবে: রিজভী
  • দলের জন্য বোলিং করতেও রাজি মুশফিক
  • শিশু জিহাদের মৃত্যু: চার জনের ১০ বছর করে কারাদণ্ড
  • অবশেষে বাড়ি অবরুদ্ধ করে রাখা সেই দেয়াল ভেঙ্গে ফেলা হচ্ছে
  • সাক্ষ্য দিলেন খাদিজা, চাইলেন বদরুলের সর্বোচ্চ শাস্তি
  • বদরুলের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিতে আদালতে খাদিজা
  • আজ বগুড়ায় যেসব প্রকল্প উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী
  • রোহিঙ্গা স্থানান্তরের সরকারি পরিকল্পনার সঙ্গে দ্বিমত মানবাধিকার কমিশনের
  • মহেশখালীতে ইয়াবা ব্যবসায়ীদের সঙ্গে পুলিশের ‘বন্দুকযুদ্ধ’
  • হোয়াইট হাউসে কাজ করার দীর্ঘ অভিজ্ঞতার কথা জানালেন এই বাংলাদেশি সাংবাদিক
Saturday, December 3, 2016 1:05 pm
A- A A+ Print

হার্ডলাইনে যাওয়ার সিদ্ধান্ত হয় গোপন বৈঠকে : ফুলবাড়িয়া আন্দোলন

18

ময়মনসিংহের ঐতিহ্যবাহী ফুলবাড়িয়া ডিগ্রি কলেজ জাতীয়করণের দাবিতে আন্দোলনকারীদের ওপর পুলিশের হামলার দু’দিন আগে একটি গোপন বৈঠক হয়। বৈঠকটি হয় স্থানীয় আওয়ামী লীগের একজন গুরুত্বপূর্ণ নেতার বাসায়। সেখানে স্থানীয় আওয়ামী লীগের কয়েকজন নেতা এবং জেলা পুলিশের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা উপস্থিত ছিলেন। ওই বৈঠকে ফুলবাড়িয়ার স্থানীয় সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট মোসলেম উদ্দিন উপস্থিত সবার উদ্দেশে বলেন, ‘আমি গ্যাড়াকলে পড়ছি। আমাকে বাঁচান।’
এরপর সিদ্ধান্ত হয় যে কোনো উপায়ে কলেজ জাতীয়করণের আন্দোলন বন্ধ করতে হবে। প্রয়োজনে পুলিশকে হার্ডলাইনে যেতে হবে। দু’দিন পর যথারীতি আন্দোলনকারীদের ওপর হামলা করে পুলিশ। শিক্ষকদের গায়ে হাত তোলেন আইনশৃংখলা বাহিনীর সদস্যরা। শিক্ষার্থী ছাড়াও কলেজের ভেতরে ঢুকে শিক্ষকদের বেধড়ক লাঠিপেটা করা হয়। অ্যাকশন প্ল্যানের অগ্রভাগে ছিলেন এমপি মোসলেম উদ্দিনের ছেলে ইমদাদুল হক সেলিমের ঘনিষ্ঠ বলে পরিচিত ফুলবাড়িয়া থানার এসআই রফিকুল ইসলাম। একপর্যায়ে পুলিশি হামলায় কলেজশিক্ষক আবুল কালাম আজাদসহ দু’জনের মৃত্যু হয়। সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে। এ বিষয়ে আওয়ামী লীগের একাধিক নেতা ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্যের রেকর্ডও যুগান্তরের হাতে রয়েছে। এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট করেন। প্রথমে তিনি জানান, ২৫ নভেম্বর রাতের ওই বৈঠকে তিনি ছিলেন না। তবে বৈঠকে কিছু বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয়েছে বলে তিনি জানান। তিনি বলেন, আন্দোলনকারীদের দমানো নয়, সৃষ্ট সংকট কীভাবে সমাধান করা যায় সে বিষয়ে কিছু ইতিবাচক পদক্ষেপ নেয়ার বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয় বৈঠকে। ফুলবাড়িয়া কলেজ সরকারিকরণে কী কী পদক্ষেপ নেয়া যায় এ বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। আন্দোলন ঠেকাতে কঠোর পদক্ষেপ নেয়ার বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত হয়েছে বলে কিছু তথ্য-উপাত্ত তুলে ধরা হলে পরক্ষণে তিনি বেমালুম বৈঠক হয়নি বলে মন্তব্য করেন। একই সুরে কথা বলেন জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও জেলা পরিষদের প্রশাসক অ্যাডভোকেট জহিরুল হক খোকা। যুগান্তরকে তিনি বলেন, এ ধরনের কোনো বৈঠকের কথা তিনি জানেন না। এ বিষয়ে ময়মনসিংহ জেলা পুলিশ সুপার সৈয়দ নুরুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, ‘ফুলবাড়িয়ার অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার আগে জেলা আওয়ামী লীগ বৈঠক করেছিল বলে শুনেছি। তবে পুলিশের কেউ ওই বৈঠকে ছিলেন না।’ এদিকে স্থানীয় পর্যায়ের একাধিক দায়িত্বশীল আওয়ামী লীগ নেতা ঘটনার পূর্বাপর তুলে ধরে প্রতিবেদককে জানান, আন্দোলনকে কেন্দ্র করে স্থানীয় এমপি মোসলেম উদ্দিন ও তার ছেলে ইমদাদুল হক সেলিম স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় ফুলবাড়িয়া ঢুকতে পারছিলেন না। টানা ৪০ দিনেরও বেশি সময় ধরে চলা জনদাবির এ আন্দোলনে স্থানীয় পর্যায়ের আওয়ামী লীগ নেতারাও যুক্ত হয়ে পড়েন। পুলিশও আন্দোলনকারীদের সঙ্গে সহনশীল আচরণ করে আসছিল। কিন্তু এমপি এবং তাদের লোকজন এভাবে আর আন্দোলন চলতে দিতে চান না। একপর্যায়ে এমপি, এমপিপুত্র সেলিম ও ফুলবাড়িয়া পৌর মেয়র গোলাম কিবরিয়া আন্দোলনকারীদের দমাতে পুলিশের ওপর চাপ প্রয়োগ শুরু করেন। এমনকি তারা ফুলবাড়িয়া থানার ওসি রিফাত খানকে একাধিকবার অকথ্য ভাষায় গালাগালও করেন। আন্দোলন দমাতে না পেরে ২৫ নভেম্বর সন্ধ্যার পর স্থানীয় এমপির আস্থাভাজন নেতাদের নিয়ে ঊর্ধ্বতন এক পুলিশ কর্মকর্তার সঙ্গে গোপন বৈঠক হয়। একজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির বাসায় আয়োজিত দেড় ঘণ্টার ওই বৈঠকে আন্দোলন বন্ধ করার নানা কৌশল নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। সিদ্ধান্ত নিতে গিয়ে একপর্যায়ে বলা হয়- প্রয়োজনে আন্দোলনে যুক্ত স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাদেরও মিথ্যা মামলায় ফাঁসিয়ে দিতে হবে। যুগান্তরের অনুসন্ধানে জানা গেছে, গত ২৪ নভেম্বর ফুলবাড়িয়ার আখালিয়ায় একটি ব্রিজ উদ্বোধনের জন্য এমপি মোসলেম উদ্দিন এলাকায় যাবেন- এমন সংবাদ পেয়ে আন্দোলনকারীরা অবরোধ কর্মসূচি দেন। বিষয়টি জানার পর এমপি ওই কর্মসূচিতে যোগ দেবেন না বলে জানিয়ে দেন। কিন্তু এমপিপুত্র সেলিম বাবার এমন নতজানু অবস্থা দেখতে নারাজ। তার সাফ কথা, উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে যেতে হবে। তিনি বলেন, ‘আপনি এলাকায় যাবেন। এটা আমাদের অস্তিত্বের প্রশ্ন।’ তবে জনতার ঢল দেখে এমপি এবং তার ছেলে বিকাল পর্যন্ত ফুলবাড়িয়ায় প্রবেশ করতে পারেননি। সন্ধ্যায় অবরোধ কর্মসূচি প্রত্যাহার করা হলে এমপি ও তার ছেলে সেলিম অস্ত্রধারী ক্যাডারদের নিয়ে এলাকায় প্রবেশ করেন। এ সময় গাড়িবহরে অন্তত ৭০টি মোটরসাইকেল ছিল। এ সময় বেশ কয়েকটি মোটরসাইকেলে থাকা ক্যাডারদের অস্ত্র উঁচিয়ে উল্লাস করতে দেখা যায়। এভাবে আখালিয়া ব্রিজ উদ্বোধন করতে যান তারা। তাদের সঙ্গে পুলিশও ছিল। এর আগে ফুলবাড়িয়ার আখালিয়াসহ বিভিন্ন স্থানে হামলার ঘটনা ঘটে। ব্রিজ উদ্বোধনকালে মোসলেম উদ্দিন ঘটনাস্থলে উপস্থিত ফুলবাড়িয়ার ওসি রিফাত খানকে উদ্দেশ করে বলেন, মুহুরির কাজ মুহুরি করবে, উকিলের কাজ করবে উকিল; ইউএনও’র কাজ করবে ইউএনও। আর ওসি যদি ইউএনও’র কাজ করে তাহলে কী হবে? তাকে তার কাজটাই করতে হবে। এ সময় ফুলবাড়িয়ার পৌর মেয়র গোলাম কিবরিয়া ওসিকে উদ্দেশ করে বলেন, ‘আন্দোলনকারীরা ভাংচুর করছে আপনারা তাদের দমাতে পারছেন না কেন? আপনারা কি আঙুল চোষেন?’ এ ঘটনার পর রাতেই পৌর মেয়র তার কার্যালয়ের সামনে আবারও ওসিকে তিরস্কার করেন। অবশ্য আন্দোলনে স্থানীয় পর্যায়ের কয়েকজন আওয়ামী লীগ নেতা সম্পৃক্ত হওয়ায় তা ক্রমেই বেগবান হচ্ছিল। এ অবস্থায় দ্রুত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পরদিন ২৫ নভেম্বর ময়মনসিংহ শহরে উল্লিখিত গোপন বৈঠকের আয়োজন করা হয়। বৈঠকে গৃহীত সিদ্ধান্তের পর পুলিশ হার্ডলাইনে চলে যায়। পরদিন ২৬ নভেম্বর আন্দোলনকারীদের কোনো ধরনের কর্মসূচি পালন করতে দেয়নি পুলিশ। ২৭ নভেম্বর বিনা উসকানিতেই কলেজের ভেতর ঢুকে আন্দোলনকারীদের ওপর হামলা চালানো হয়। এদিকে সার্বিক বিষয় সম্পর্কে জানতে চাওয়া হলে এমপি মোসলেম উদ্দিন যুগান্তরকে বলেন, ‘পাঁচ মাস আগে শিক্ষামন্ত্রী একটি চিঠিতে তাকে জানিয়েছেন- আপনার উপজেলার একটি কলেজ জাতীয়করণ করা হবে। আপনি তালিকা পাঠান। আমি তিনটি কলেজের তালিকা পাঠিয়েছি। এর মধ্যে একটি কলেজকে জাতীয়করণ করা হয়েছে। এখন যারা বিভিন্ন কারণে আমার ওপর ক্ষুব্ধ তারাই বিষয়টিকে নিয়ে মিথ্যা গল্প বলছেন।’ এমপিপুত্র ইমদাদুল হক সেলিম বলেন, ‘কোনো প্রশাসনিক কাজে আমি কখনও হস্তক্ষেপ করি না। রাজনৈতিক প্রতিহিংসা এবং আমার জনপ্রিয়তায় ঈর্ষান্বিত হয়ে অনেকেই এ ধরনের অভিযোগ করছেন। তাছাড়া কোনো অনুষ্ঠান ছাড়া থানার ওসি বা ইউএনও’র সঙ্গে আমার কখনোই যোগাযোগ হয় না।’ ফুলবাড়িয়া পৌর মেয়র গোলাম কিবরিয়ার সঙ্গে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করলে তিনি গাড়িতে রয়েছেন বলে ফোন রেখে দেন। এ বিষয়ে ফুলবাড়িয়া থানার ওসি রিফাত খান যুগান্তরকে বলেন, ‘রাজনীতিবিদরা অনেক কথাই বলতে পারেন। আমরা আমাদের কাজ করি। আন্দোলনকারীদের সঙ্গে শুরু থেকেই পুলিশ সহনশীল আচরণ করছিল।’ ঘটনার দিন তারা মাইকে হামলার ঘোষণা দেয়। অবরোধ ডেকে ভাংচুর এবং পুলিশকে লক্ষ্য করে ইট-পাটকেল নিক্ষেপ করে। বাধ্য হয়েই পুলিশ লাঠিচার্জ করেছে। সেই এসআই রফিকুল ইসলাম : প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, ঘটনার দিন রোববার বেলা ১১টার দিকে কলেজের গেটেই আন্দোলনকারী বিক্ষোভ করছিল। তখন সেখানে ফুলবাড়িয়া থানার ওসি রিফাত খানও ছিল। কোনো ধরনের উসকানি ছাড়া হেলমেট পরে এসআই রফিকুল ইসলাম অতি উৎসাহী হয়ে আন্দোলনকারীদের ওপর লাঠিচার্জ শুরু করেন। তার সঙ্গে আরও পুলিশ সদস্য কলেজের ভেতরে ঢুকে নির্বিচারে শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও কর্মচারীদের পেটাতে থাকেন। নিহত শিক্ষকের বুকের ওপর উঠে তাকে নির্বিচারে পেটান এসআই রফিকুল ইসলাম। এ বিষয়ে ফুলবাড়িয়া ডিগ্রি কলেজের কর্মচারী ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক আবদুল হক যুগান্তরকে বলেন, এসআই রফিকুল ইসলাম শুধু পুরুষ শিক্ষকদের নয়, নারী শিক্ষকদের ওপরও হামলা করেছেন। কলেজ ভবনে ঢুকে তিনি নারী শিক্ষকদের বলেন, ‘তোদের দমাতে নারী পুলিশের দরকার নেই। আমি একাই দমাতে পারব।’ একাধিক প্রত্যক্ষদর্শীও এসব তথ্য জানিয়েছেন। এ বিষয়ে এসআই রফিকুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, ‘ভাংচুরের মামলায় কয়েকজন আসামি ধরার কারণে আন্দোলনকারীরা আমার ওপর ক্ষুব্ধ ছিল। এ কারণে তারা বিভিন্ন ধরনের অভিযোগ করছে। আর এমপির ছেলের সঙ্গে আমার কোনো সখ্য নেই।’

Comments

Comments!

 হার্ডলাইনে যাওয়ার সিদ্ধান্ত হয় গোপন বৈঠকে : ফুলবাড়িয়া আন্দোলনAmarbangladeshonlineAmarbangladeshonline | Amarbangladeshonline

হার্ডলাইনে যাওয়ার সিদ্ধান্ত হয় গোপন বৈঠকে : ফুলবাড়িয়া আন্দোলন

Saturday, December 3, 2016 1:05 pm
18

ময়মনসিংহের ঐতিহ্যবাহী ফুলবাড়িয়া ডিগ্রি কলেজ জাতীয়করণের দাবিতে আন্দোলনকারীদের ওপর পুলিশের হামলার দু’দিন আগে একটি গোপন বৈঠক হয়। বৈঠকটি হয় স্থানীয় আওয়ামী লীগের একজন গুরুত্বপূর্ণ নেতার বাসায়। সেখানে স্থানীয় আওয়ামী লীগের কয়েকজন নেতা এবং জেলা পুলিশের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা উপস্থিত ছিলেন। ওই বৈঠকে ফুলবাড়িয়ার স্থানীয় সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট মোসলেম উদ্দিন উপস্থিত সবার উদ্দেশে বলেন, ‘আমি গ্যাড়াকলে পড়ছি। আমাকে বাঁচান।’

এরপর সিদ্ধান্ত হয় যে কোনো উপায়ে কলেজ জাতীয়করণের আন্দোলন বন্ধ করতে হবে। প্রয়োজনে পুলিশকে হার্ডলাইনে যেতে হবে। দু’দিন পর যথারীতি আন্দোলনকারীদের ওপর হামলা করে পুলিশ। শিক্ষকদের গায়ে হাত তোলেন আইনশৃংখলা বাহিনীর সদস্যরা। শিক্ষার্থী ছাড়াও কলেজের ভেতরে ঢুকে শিক্ষকদের বেধড়ক লাঠিপেটা করা হয়। অ্যাকশন প্ল্যানের অগ্রভাগে ছিলেন এমপি মোসলেম উদ্দিনের ছেলে ইমদাদুল হক সেলিমের ঘনিষ্ঠ বলে পরিচিত ফুলবাড়িয়া থানার এসআই রফিকুল ইসলাম। একপর্যায়ে পুলিশি হামলায় কলেজশিক্ষক আবুল কালাম আজাদসহ দু’জনের মৃত্যু হয়।
সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে। এ বিষয়ে আওয়ামী লীগের একাধিক নেতা ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্যের রেকর্ডও যুগান্তরের হাতে রয়েছে।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট করেন। প্রথমে তিনি জানান, ২৫ নভেম্বর রাতের ওই বৈঠকে তিনি ছিলেন না। তবে বৈঠকে কিছু বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয়েছে বলে তিনি জানান। তিনি বলেন, আন্দোলনকারীদের দমানো নয়, সৃষ্ট সংকট কীভাবে সমাধান করা যায় সে বিষয়ে কিছু ইতিবাচক পদক্ষেপ নেয়ার বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয় বৈঠকে। ফুলবাড়িয়া কলেজ সরকারিকরণে কী কী পদক্ষেপ নেয়া যায় এ বিষয়ে আলোচনা হয়েছে।
আন্দোলন ঠেকাতে কঠোর পদক্ষেপ নেয়ার বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত হয়েছে বলে কিছু তথ্য-উপাত্ত তুলে ধরা হলে পরক্ষণে তিনি বেমালুম বৈঠক হয়নি বলে মন্তব্য করেন।
একই সুরে কথা বলেন জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও জেলা পরিষদের প্রশাসক অ্যাডভোকেট জহিরুল হক খোকা। যুগান্তরকে তিনি বলেন, এ ধরনের কোনো বৈঠকের কথা তিনি জানেন না।
এ বিষয়ে ময়মনসিংহ জেলা পুলিশ সুপার সৈয়দ নুরুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, ‘ফুলবাড়িয়ার অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার আগে জেলা আওয়ামী লীগ বৈঠক করেছিল বলে শুনেছি। তবে পুলিশের কেউ ওই বৈঠকে ছিলেন না।’

এদিকে স্থানীয় পর্যায়ের একাধিক দায়িত্বশীল আওয়ামী লীগ নেতা ঘটনার পূর্বাপর তুলে ধরে প্রতিবেদককে জানান, আন্দোলনকে কেন্দ্র করে স্থানীয় এমপি মোসলেম উদ্দিন ও তার ছেলে ইমদাদুল হক সেলিম স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় ফুলবাড়িয়া ঢুকতে পারছিলেন না। টানা ৪০ দিনেরও বেশি সময় ধরে চলা জনদাবির এ আন্দোলনে স্থানীয় পর্যায়ের আওয়ামী লীগ নেতারাও যুক্ত হয়ে পড়েন। পুলিশও আন্দোলনকারীদের সঙ্গে সহনশীল আচরণ করে আসছিল। কিন্তু এমপি এবং তাদের লোকজন এভাবে আর আন্দোলন চলতে দিতে চান না। একপর্যায়ে এমপি, এমপিপুত্র সেলিম ও ফুলবাড়িয়া পৌর মেয়র গোলাম কিবরিয়া আন্দোলনকারীদের দমাতে পুলিশের ওপর চাপ প্রয়োগ শুরু করেন। এমনকি তারা ফুলবাড়িয়া থানার ওসি রিফাত খানকে একাধিকবার অকথ্য ভাষায় গালাগালও করেন। আন্দোলন দমাতে না পেরে ২৫ নভেম্বর সন্ধ্যার পর স্থানীয় এমপির আস্থাভাজন নেতাদের নিয়ে ঊর্ধ্বতন এক পুলিশ কর্মকর্তার সঙ্গে গোপন বৈঠক হয়। একজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির বাসায় আয়োজিত দেড় ঘণ্টার ওই বৈঠকে আন্দোলন বন্ধ করার নানা কৌশল নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। সিদ্ধান্ত নিতে গিয়ে একপর্যায়ে বলা হয়- প্রয়োজনে আন্দোলনে যুক্ত স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাদেরও মিথ্যা মামলায় ফাঁসিয়ে দিতে হবে।

যুগান্তরের অনুসন্ধানে জানা গেছে, গত ২৪ নভেম্বর ফুলবাড়িয়ার আখালিয়ায় একটি ব্রিজ উদ্বোধনের জন্য এমপি মোসলেম উদ্দিন এলাকায় যাবেন- এমন সংবাদ পেয়ে আন্দোলনকারীরা অবরোধ কর্মসূচি দেন। বিষয়টি জানার পর এমপি ওই কর্মসূচিতে যোগ দেবেন না বলে জানিয়ে দেন। কিন্তু এমপিপুত্র সেলিম বাবার এমন নতজানু অবস্থা দেখতে নারাজ। তার সাফ কথা, উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে যেতে হবে। তিনি বলেন, ‘আপনি এলাকায় যাবেন। এটা আমাদের অস্তিত্বের প্রশ্ন।’ তবে জনতার ঢল দেখে এমপি এবং তার ছেলে বিকাল পর্যন্ত ফুলবাড়িয়ায় প্রবেশ করতে পারেননি। সন্ধ্যায় অবরোধ কর্মসূচি প্রত্যাহার করা হলে এমপি ও তার ছেলে সেলিম অস্ত্রধারী ক্যাডারদের নিয়ে এলাকায় প্রবেশ করেন। এ সময় গাড়িবহরে অন্তত ৭০টি মোটরসাইকেল ছিল। এ সময় বেশ কয়েকটি মোটরসাইকেলে থাকা ক্যাডারদের অস্ত্র উঁচিয়ে উল্লাস করতে দেখা যায়। এভাবে আখালিয়া ব্রিজ উদ্বোধন করতে যান তারা। তাদের সঙ্গে পুলিশও ছিল। এর আগে ফুলবাড়িয়ার আখালিয়াসহ বিভিন্ন স্থানে হামলার ঘটনা ঘটে।

ব্রিজ উদ্বোধনকালে মোসলেম উদ্দিন ঘটনাস্থলে উপস্থিত ফুলবাড়িয়ার ওসি রিফাত খানকে উদ্দেশ করে বলেন, মুহুরির কাজ মুহুরি করবে, উকিলের কাজ করবে উকিল; ইউএনও’র কাজ করবে ইউএনও। আর ওসি যদি ইউএনও’র কাজ করে তাহলে কী হবে? তাকে তার কাজটাই করতে হবে।

এ সময় ফুলবাড়িয়ার পৌর মেয়র গোলাম কিবরিয়া ওসিকে উদ্দেশ করে বলেন, ‘আন্দোলনকারীরা ভাংচুর করছে আপনারা তাদের দমাতে পারছেন না কেন? আপনারা কি আঙুল চোষেন?’ এ ঘটনার পর রাতেই পৌর মেয়র তার কার্যালয়ের সামনে আবারও ওসিকে তিরস্কার করেন। অবশ্য আন্দোলনে স্থানীয় পর্যায়ের কয়েকজন আওয়ামী লীগ নেতা সম্পৃক্ত হওয়ায় তা ক্রমেই বেগবান হচ্ছিল।

এ অবস্থায় দ্রুত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পরদিন ২৫ নভেম্বর ময়মনসিংহ শহরে উল্লিখিত গোপন বৈঠকের আয়োজন করা হয়। বৈঠকে গৃহীত সিদ্ধান্তের পর পুলিশ হার্ডলাইনে চলে যায়। পরদিন ২৬ নভেম্বর আন্দোলনকারীদের কোনো ধরনের কর্মসূচি পালন করতে দেয়নি পুলিশ। ২৭ নভেম্বর বিনা উসকানিতেই কলেজের ভেতর ঢুকে আন্দোলনকারীদের ওপর হামলা চালানো হয়।

এদিকে সার্বিক বিষয় সম্পর্কে জানতে চাওয়া হলে এমপি মোসলেম উদ্দিন যুগান্তরকে বলেন, ‘পাঁচ মাস আগে শিক্ষামন্ত্রী একটি চিঠিতে তাকে জানিয়েছেন- আপনার উপজেলার একটি কলেজ জাতীয়করণ করা হবে। আপনি তালিকা পাঠান। আমি তিনটি কলেজের তালিকা পাঠিয়েছি। এর মধ্যে একটি কলেজকে জাতীয়করণ করা হয়েছে। এখন যারা বিভিন্ন কারণে আমার ওপর ক্ষুব্ধ তারাই বিষয়টিকে নিয়ে মিথ্যা গল্প বলছেন।’

এমপিপুত্র ইমদাদুল হক সেলিম বলেন, ‘কোনো প্রশাসনিক কাজে আমি কখনও হস্তক্ষেপ করি না। রাজনৈতিক প্রতিহিংসা এবং আমার জনপ্রিয়তায় ঈর্ষান্বিত হয়ে অনেকেই এ ধরনের অভিযোগ করছেন। তাছাড়া কোনো অনুষ্ঠান ছাড়া থানার ওসি বা ইউএনও’র সঙ্গে আমার কখনোই যোগাযোগ হয় না।’
ফুলবাড়িয়া পৌর মেয়র গোলাম কিবরিয়ার সঙ্গে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করলে তিনি গাড়িতে রয়েছেন বলে ফোন রেখে দেন।

এ বিষয়ে ফুলবাড়িয়া থানার ওসি রিফাত খান যুগান্তরকে বলেন, ‘রাজনীতিবিদরা অনেক কথাই বলতে পারেন। আমরা আমাদের কাজ করি। আন্দোলনকারীদের সঙ্গে শুরু থেকেই পুলিশ সহনশীল আচরণ করছিল।’ ঘটনার দিন তারা মাইকে হামলার ঘোষণা দেয়। অবরোধ ডেকে ভাংচুর এবং পুলিশকে লক্ষ্য করে ইট-পাটকেল নিক্ষেপ করে। বাধ্য হয়েই পুলিশ লাঠিচার্জ করেছে।
সেই এসআই রফিকুল ইসলাম : প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, ঘটনার দিন রোববার বেলা ১১টার দিকে কলেজের গেটেই আন্দোলনকারী বিক্ষোভ করছিল। তখন সেখানে ফুলবাড়িয়া থানার ওসি রিফাত খানও ছিল। কোনো ধরনের উসকানি ছাড়া হেলমেট পরে এসআই রফিকুল ইসলাম অতি উৎসাহী হয়ে আন্দোলনকারীদের ওপর লাঠিচার্জ শুরু করেন। তার সঙ্গে আরও পুলিশ সদস্য কলেজের ভেতরে ঢুকে নির্বিচারে শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও কর্মচারীদের পেটাতে থাকেন। নিহত শিক্ষকের বুকের ওপর উঠে তাকে নির্বিচারে পেটান এসআই রফিকুল ইসলাম। এ বিষয়ে ফুলবাড়িয়া ডিগ্রি কলেজের কর্মচারী ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক আবদুল হক যুগান্তরকে বলেন, এসআই রফিকুল ইসলাম শুধু পুরুষ শিক্ষকদের নয়, নারী শিক্ষকদের ওপরও হামলা করেছেন। কলেজ ভবনে ঢুকে তিনি নারী শিক্ষকদের বলেন, ‘তোদের দমাতে নারী পুলিশের দরকার নেই। আমি একাই দমাতে পারব।’ একাধিক প্রত্যক্ষদর্শীও এসব তথ্য জানিয়েছেন।
এ বিষয়ে এসআই রফিকুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, ‘ভাংচুরের মামলায় কয়েকজন আসামি ধরার কারণে আন্দোলনকারীরা আমার ওপর ক্ষুব্ধ ছিল। এ কারণে তারা বিভিন্ন ধরনের অভিযোগ করছে। আর এমপির ছেলের সঙ্গে আমার কোনো সখ্য নেই।’

Comments

comments

সম্পাদক : মোহাম্মদ আবদুল বাছির
প্রকাশক: মোহাম্মদ জহিরুল ইসলাম
ফোন : ‎০১৭১৩৪০৯০৯০
৩৪৫/১, দিলু রোড, নিউ ইস্কাটন, ঢাকা-১০০০
X
 
নিয়মিত খবর পড়তে আমাদের ফেসবুক পেজে লাইক দিয়ে যুক্ত থাকুন
X