মঙ্গলবার, ২০শে ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ ইং, ৮ই ফাল্গুন, ১৪২৪ বঙ্গাব্দ, রাত ৪:০৬
শিরোনাম
  • ঘৃণাকে বিজয়ী হতে দেয়া যাবে না, ট্রাম্পকে ইঙ্গিত করে জর্জ ক্লুনি
  • আমার একটাই চিন্তা দেশের মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন করা: প্রধানমন্ত্রী
  • ‘কেন্দ্রীয় সরকারের আগ্রাসী নীতির কারণে কাশ্মীরকে হারাতে হবে’
  • সাড়ে চারমাস পর মুখোমুখি, খাদিজাকে উদ্দেশ্য করে যা বলল বদরুল
  • খালেদার ‘সাজা’ বিরোধী নেতাকর্মীদের মনোবল ভাঙ্গার কৌশল!
  • বিএনপির কর্মসূচি ‘যথাসময়ে’ জানানো হবে: রিজভী
  • দলের জন্য বোলিং করতেও রাজি মুশফিক
  • শিশু জিহাদের মৃত্যু: চার জনের ১০ বছর করে কারাদণ্ড
  • অবশেষে বাড়ি অবরুদ্ধ করে রাখা সেই দেয়াল ভেঙ্গে ফেলা হচ্ছে
  • সাক্ষ্য দিলেন খাদিজা, চাইলেন বদরুলের সর্বোচ্চ শাস্তি
  • বদরুলের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিতে আদালতে খাদিজা
  • আজ বগুড়ায় যেসব প্রকল্প উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী
  • রোহিঙ্গা স্থানান্তরের সরকারি পরিকল্পনার সঙ্গে দ্বিমত মানবাধিকার কমিশনের
  • মহেশখালীতে ইয়াবা ব্যবসায়ীদের সঙ্গে পুলিশের ‘বন্দুকযুদ্ধ’
  • হোয়াইট হাউসে কাজ করার দীর্ঘ অভিজ্ঞতার কথা জানালেন এই বাংলাদেশি সাংবাদিক
Saturday, November 12, 2016 9:14 am
A- A A+ Print

হ‌ুমায়ূনের আলোয় কয়েকজন যুবক

7

আচমকা তাঁদের দেখে মনে হবে যেন উঠে এসেছেন হ‌ুমায়ূন আহমেদের বইয়ের পাতা থেকে। একঝাঁক হিমু-রূপা। ছেলেরা গায়ে চড়িয়েছেন হলুদ রঙের টি-শার্ট কিংবা পাঞ্জাবি আর মেয়েদের পরনে নীল শাড়ি। হলুদ ও নীল পোশাকই যেন এই তরুণদের ‘ট্রেডমার্ক’। তাঁরা হ‌ুমায়ূন আহমেদের তরুণ ভক্ত। লেখককে, লেখকের লেখা ভালোবেসে গড়ে তুলেছেন সংগঠন। শুধু পোশাকে নয়, বইপড়া থেকে সামাজিক নানা কাজেও স্বেচ্ছায় তাঁদের সমান অংশগ্রহণ। কেউ কেউ চান হ‌ুমায়ূন আহমেদের স্বপ্নের ক্যানসার হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করতে। এমনই চারটি সংগঠন হিমু পরিবহন ও হিমু পরিবার এবং কেন্দুয়ার চর্চা সাহিত্য আড্ডা ও হ‌ুমায়ূন আহমেদ স্মৃতি সংসদ। কাল ১৩ নভেম্বর জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক হ‌ুমায়ূন আহমেদের ৬৮তম জন্মদিন এই সংগঠনগুলো উদ্‌যাপন করবে। হ‌ুমায়ূনভক্ত তরুণদের কর্মকাণ্ড নিয়ে এবারের প্রচ্ছদ প্রতিবেদন।  

এই তরুণদের অনুপ্রেরণা হ‌ুমায়ূন আহমেদ। ছবি: সংগৃহীতপ্রতি শুক্রবার বিকেল হতেই একদল তরুণের দেখা মেলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হলের খোলা মাঠে। বেশভূষা দেখে তাঁদের সহজেই আলাদা করা যায় জনারণ্য থেকে। দলটির বেশির ভাগ সদস্যের গায়ে থাকে হলুদ টি-শার্ট, নীল শাড়ি। প্রতি শুক্রবার বিকেলে তাঁরা বসেন সাপ্তাহিক আড্ডায়। ঢাকার এই দলের মতো সারা দেশের বিভিন্ন জেলাতেও এমন আড্ডার আয়োজন হয়। আয়োজক হিমু পরিবহনের সদস্যরা। হ‌ুমায়ূন আহমেদের তরুণ ভক্তদের এই সংগঠনের যাত্রা শুরু হয়েছিল ২০১৩ সালের ১৯ জুলাই। প্রতিষ্ঠাতাদের অন্যতম জুবায়ের কবির বলেন, ‘হ‌ুমায়ূন আহমেদের সৃষ্টিকর্মকে সবার মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়ার কাজটি আমরা করি। হ‌ুমায়ূন আহমেদের জন্মদিন, প্রয়াণ দিবসে বিভিন্ন অনুষ্ঠান আয়োজনের পাশাপাশি পাঠচক্র, ক্যানসার-সচেতনতাসহ সমাজসেবামূলক কাজেও আমাদের সদস্যরা জড়িত।’

পাবনার শীতার্ত মানুষের হাতে শীতবস্ত্র তুলে ​দেন হিমু পরিবারের সদস্যরা। ছবি: হিমু পরিবারনামে ও কাজে মিল রয়েছে হ‌ুমায়ূন আহমেদের ভক্তদের এমন আরেকটি সংগঠন হিমু পরিবার। এই পরিবারে সবাই কি হিমু? প্রশ্নটি করেছিলাম হিমু পরিবারের দুই সদস্য মুস্তাফিজুর রহমান ও হাবিবা সুলতানাকে। হাবিবার উত্তর, ‘আমরা আসলে হিমুর মানবিক রূপকে ধারণ করি।’ এই কথাকেই একটু ঘুরিয়ে মুস্তাফিজুর বললেন, ‘অসহায় ও দুস্থ মানুষের পাশে দাঁড়ানো, তাদের উপকার করাকে আমরা দায়িত্ব বলে মনে করি।’ সংগঠনের প্রায় সব কাজেই বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া এই দুই সদস্যকে পাওয়া যায়। তাঁরাই জানালেন, সারা দেশে প্রায় পাঁচ হাজার সদস্য বিভিন্নভাবে হিমু পরিবারের সঙ্গে যুক্ত। হিমু পরিবারের সমন্বয়ক আসাদুজ্জামান বলেন, ‘হিমু পরিবারের যাত্রা শুরু ২০১৩ সালের শেষ দিক থেকে। দেশের মানুষের মধ্যে হ‌ুমায়ূন আহমেদের সাহিত্য ও সৃষ্টিকর্ম পৌঁছে দিতে আমরা নিয়মিত সেমিনার, পাঠচক্র, নাটক ও চলচ্চিত্র প্রদর্শনীর পাশাপাশি নানাবিধ সাহিত্য-সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করি। আমাদের উপদেষ্টা হিসেবে রয়েছেন হ‌ুমায়ূন আহমেদের স্ত্রী অভিনেত্রী মেহের আফরোজ শাওন এবং প্রকাশনা সংস্থা অন্যপ্রকাশের প্রধান মাজহারুল ইসলাম।’

হৃদয়ে হ‌ুমায়ূন আহমেদ

বছরব্যাপী নানা আয়োজন থাকলেও সংগঠন দুটির বড় আয়োজন থাকে লেখকের জন্ম ও প্রয়াণ দিবসে। প্রতিবছর লেখকের জন্মদিনে স্মরণিকা ও ম্যাগাজিন প্রকাশ করে থাকে হিমু পরিবহন।

২০১৫ সালে হিমু পরিবার স্মরণে‌ুমায়ূন আহমেদ নামে একটি বই প্রকাশ করেছে। হিমু পরিবহনের রয়েছে নক্ষত্র, হিমু পরিবহন এবং নানা সময়ে প্রকাশিত এমন কিছু স্মরণিকা।

এই প্রকাশনাগুলোতে দেশের সেরা লেখকদের পাশাপাশি সংগঠনের সদস্যরাও লিখেছেন প্রিয় লেখককে নিয়ে।

বিশ্ব ক্যানসার দিবসে সারা দেশ সচেতনতামূলক আয়োজন থাকে হিমু পরিবহনেরসবাই যেখানে ‘হেলপার’!

হিমু পরিবারের সাংগঠনিক কাঠামো থাকলেও হিমু পরিবহনের আনুষ্ঠানিক কোনো কমিটি নেই। যদিও সংগঠন দুটিতে সব সদস্যের অংশগ্রহণ সমানভাবে বিবেচনা করা হয়। হিমু পরিবহনের প্রতিষ্ঠাতা সদস্যদের নিয়ে ঢাকায় একটি কার্যনির্বাহী দল রয়েছে। দলটি নতুন কোনো আয়োজন বা সাংগঠনিক নীতিনির্ধারণ করে থাকে। আঞ্চলিক শাখাগুলোকে ‘কাউন্টার’ বলা হয়। সংগঠনটির সমন্বয়কদের একজন আহসান হাবিব বলেন, ‘আমরা হিমু পরিবহনের সবাইকে হেলপার বলি। আমরা নিজেদের শুধু হিমু পরিবহনের নয়, মনে করি দেশের হেলপার।’ দেশের সব জেলায় হিমু পরিবহনের সদস্য থাকলেও কাউন্টার রয়েছে ৫৪ জেলায়। কাউন্টারগুলোর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে প্রায় ১০ হাজার তরুণ।

সচেতনতায় সাইকেল শোভাযাত্রাসঙ্গী বই

তরুণদের হ‌ুমায়ূন আহমেদের বই পড়ার আহ্বান জানিয়েই হিমু পরিবহনের পথচলার শুরু। নিয়মিত পাঠচক্র এবং অনলাইনে বই পর্যালোচনার আয়োজন করে থাকেন সংগঠনের সদস্যরা।

বই পড়ার এ আন্দোলনকে এগিয়ে নিতে সারা দেশে পাঠাগার গড়ে তোলার উদ্যোগ নিয়েছে হিমু পরিবহন। আলোকিত মানুষ গড়ার এই আন্দোলনে তারা সফলতাও পেয়েছে। গত বছর ১৯ জুলাই লেখকের প্রয়াণ দিবসে তাঁদের এই কার্যক্রমের আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়। আসলাম হোসেন জানালেন, তাঁদের পাঠাগার রয়েছে ১৫টি জেলায়। সব কটি পাঠাগার মিলে বইয়ের সংখ্যা প্রায় ১০ হাজার। পাঠাগারের অধিকাংশ বই সংগ্রহ করা হয়েছে সদস্যদের অনুদান নিয়ে। এ ছাড়া ফেসবুকে ইভেন্টের মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহ করেও বই কেনা হয়। এই পাঠাগারগুলোয় হিমু পরিবহনের সদস্য ছাড়াও যেকোনো পাঠক বই নিতে পারেন।

হিমু পরিবারও উদ্যোগ নিচ্ছে সব জেলায় পাঠাগার তৈরির। আসাদুজ্জামান বলেন, ‘আমরা সারা দেশে হ‌ুমায়ূন আহমেদ লাইব্রেরি ও সংগ্রহশালা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে তাঁর সৃষ্টিকর্ম সংরক্ষণ করতে চাই। এ ছাড়া প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের গ্রন্থাগারে একটি “হ‌ুমায়ূন আহমেদ র‍্যাক” রাখার উদ্যোগ নিচ্ছি।’

এবারের জন্মদিনে ‘নক্ষত্র’ নামে ক্রোড়পত্র প্রকাশ করছে  হিমু পরিবহনহেরে যাবে ক্যানসার হিমু পরিবহনের সদস্যদের স্বপ্ন দেশে একটি বিশ্বমানের ক্যানসার হাসপাতাল গড়ার। এই কঠিন কাজটি তাঁরা সবার অংশগ্রহণে করতে চান। তবে ক্যানসার-সচেতনতা নিয়ে বছরব্যাপী কাজ করেন সংগঠনের সদস্যরা। অন্যতম সমন্বয়ক হুর এ জান্নাত বলেন, ‘ক্যানসার একটি অসংক্রামক রোগ। আমরা চাইলেই নিজেরা এটি অনেকাংশে প্রতিরোধ করতে পারি। দরকার শুধু সচেতনতা ও দৈনন্দিন কিছু অভ্যাস পরিবর্তন।’ এই জনসচেতনতার কাজটিই নিয়েছে দলটি। স্তন ক্যানসারসহ বিভিন্ন ধরনের ক্যানসার সম্পর্কে সচেতনতা বাড়াতে জোরেশোরে কাজ করছে তারা। প্রতিবছর বিশ্ব ক্যানসার দিবসে দেশের সব কটি জেলা শহর ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আয়োজন করে থাকে সচেতনতামূলক অনুষ্ঠান। প্রচারপত্র বিতরণ, শোভাযাত্রা ও মানববন্ধন করেও তারা সচেতনতার কাজ করে। হিমু পরিবহনের সদস্য ইশতিয়াক আহমেদ বলেন, ‘এই কাজের পেছনে আমাদের প্রেরণা হ‌ুমায়ূন আহমেদ স্যার। তিনি ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে রোগভোগ করেছেন। আমরা চাই পোলিও রোগের মতো একদিন ক্যানসারমুক্ত হবে বাংলাদেশ। সেই লক্ষ্যে আমরা কাজ করে যাচ্ছি।’ পাশেদাঁড়াই দুর্যোগে, দুঃসময়ে হাসপাতালে ভর্তি কোনো রোগীর জরুরি রক্ত প্রয়োজন? সেখানেও হাজির হন হিমু পরিবহনের সদস্যরা। স্বেচ্ছাসেবী এই কাজের ছোট একটি পরিসংখ্যান বলেন আসলাম হোসেন, ‘সারা দেশে বিভিন্ন সময় এখন পর্যন্ত প্রায় দুই হাজার মানুষকে রক্ত দিয়েছেন আমাদের সদস্যরা। এ ছাড়া পরিচিতজনদের কাছ থেকে রক্ত সংগ্রহ করে দিয়েছি আরও প্রায় দুই হাজার মানুষকে।’ শুধু রক্তদান কার্যক্রম নয়, হিমু পরিবহনের সদস্যরা ছুটে যান বন্যাদুর্গত ও শীতার্ত মানুষের পাশে। এ বছরই গাইবান্ধার বন্যাদুর্গত প্রায় দুই হাজার মানুষকে প্রাথমিক চিকিৎসাসেবার ব্যবস্থা করেছেন এই তরুণেরা। যশোরের ভবদহে বন্যাদুর্গত মানুষের পাশেও চিকিৎসাসেবা নিয়ে হাজির হয়েছেন তাঁরা। তীব্র শীতের সময় তাঁরা শীতবস্ত্র বিতরণ করেছেন রংপুরের পায়রাবন্দ, চট্টগ্রাম ও সিলেটের কয়েকটি এলাকার শীতার্ত মানুষের মধ্যে। আহসান হাবিব বলেন, ‘এই অনুষ্ঠান আয়োজনে আমাদের অর্থায়ন হয় মূলত সদস্যদের কাছ থেকে চাঁদা নিয়ে। তবে বড় অনুষ্ঠান আয়োজনের সময় আমরা বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের পৃষ্ঠপোষকতা নিয়ে থাকি।’ হিমু পরিবারের সদস্যরা গত বছর পাবনায় প্রায় ৫০০ শীতার্ত মানুষের হাতে শীতবস্ত্র তুলে দিয়েছেন। এ ছাড়া রক্তদান কর্মসূচি, পথশিশুদের খাবার ও ঈদের পোশাক বিতরণ করেন হিমু পরিবারের সদস্যরা।

Comments

Comments!

 হ‌ুমায়ূনের আলোয় কয়েকজন যুবকAmarbangladeshonlineAmarbangladeshonline | Amarbangladeshonline

হ‌ুমায়ূনের আলোয় কয়েকজন যুবক

Saturday, November 12, 2016 9:14 am
7

আচমকা তাঁদের দেখে মনে হবে যেন উঠে এসেছেন হ‌ুমায়ূন আহমেদের বইয়ের পাতা থেকে। একঝাঁক হিমু-রূপা। ছেলেরা গায়ে চড়িয়েছেন হলুদ রঙের টি-শার্ট কিংবা পাঞ্জাবি আর মেয়েদের পরনে নীল শাড়ি। হলুদ ও নীল পোশাকই যেন এই তরুণদের ‘ট্রেডমার্ক’। তাঁরা হ‌ুমায়ূন আহমেদের তরুণ ভক্ত। লেখককে, লেখকের লেখা ভালোবেসে গড়ে তুলেছেন সংগঠন। শুধু পোশাকে নয়, বইপড়া থেকে সামাজিক নানা কাজেও স্বেচ্ছায় তাঁদের সমান অংশগ্রহণ। কেউ কেউ চান হ‌ুমায়ূন আহমেদের স্বপ্নের ক্যানসার হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করতে। এমনই চারটি সংগঠন হিমু পরিবহন ও হিমু পরিবার এবং কেন্দুয়ার চর্চা সাহিত্য আড্ডা ও হ‌ুমায়ূন আহমেদ স্মৃতি সংসদ। কাল ১৩ নভেম্বর জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক হ‌ুমায়ূন আহমেদের ৬৮তম জন্মদিন এই সংগঠনগুলো উদ্‌যাপন করবে। হ‌ুমায়ূনভক্ত তরুণদের কর্মকাণ্ড নিয়ে এবারের প্রচ্ছদ প্রতিবেদন।  

এই তরুণদের অনুপ্রেরণা হ‌ুমায়ূন আহমেদ। ছবি: সংগৃহীতপ্রতি শুক্রবার বিকেল হতেই একদল তরুণের দেখা মেলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হলের খোলা মাঠে। বেশভূষা দেখে তাঁদের সহজেই আলাদা করা যায় জনারণ্য থেকে। দলটির বেশির ভাগ সদস্যের গায়ে থাকে হলুদ টি-শার্ট, নীল শাড়ি। প্রতি শুক্রবার বিকেলে তাঁরা বসেন সাপ্তাহিক আড্ডায়। ঢাকার এই দলের মতো সারা দেশের বিভিন্ন জেলাতেও এমন আড্ডার আয়োজন হয়। আয়োজক হিমু পরিবহনের সদস্যরা। হ‌ুমায়ূন আহমেদের তরুণ ভক্তদের এই সংগঠনের যাত্রা শুরু হয়েছিল ২০১৩ সালের ১৯ জুলাই। প্রতিষ্ঠাতাদের অন্যতম জুবায়ের কবির বলেন, ‘হ‌ুমায়ূন আহমেদের সৃষ্টিকর্মকে সবার মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়ার কাজটি আমরা করি। হ‌ুমায়ূন আহমেদের জন্মদিন, প্রয়াণ দিবসে বিভিন্ন অনুষ্ঠান আয়োজনের পাশাপাশি পাঠচক্র, ক্যানসার-সচেতনতাসহ সমাজসেবামূলক কাজেও আমাদের সদস্যরা জড়িত।’

পাবনার শীতার্ত মানুষের হাতে শীতবস্ত্র তুলে ​দেন হিমু পরিবারের সদস্যরা। ছবি: হিমু পরিবারনামে ও কাজে মিল রয়েছে হ‌ুমায়ূন আহমেদের ভক্তদের এমন আরেকটি সংগঠন হিমু পরিবার। এই পরিবারে সবাই কি হিমু? প্রশ্নটি করেছিলাম হিমু পরিবারের দুই সদস্য মুস্তাফিজুর রহমান ও হাবিবা সুলতানাকে। হাবিবার উত্তর, ‘আমরা আসলে হিমুর মানবিক রূপকে ধারণ করি।’ এই কথাকেই একটু ঘুরিয়ে মুস্তাফিজুর বললেন, ‘অসহায় ও দুস্থ মানুষের পাশে দাঁড়ানো, তাদের উপকার করাকে আমরা দায়িত্ব বলে মনে করি।’ সংগঠনের প্রায় সব কাজেই বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া এই দুই সদস্যকে পাওয়া যায়। তাঁরাই জানালেন, সারা দেশে প্রায় পাঁচ হাজার সদস্য বিভিন্নভাবে হিমু পরিবারের সঙ্গে যুক্ত। হিমু পরিবারের সমন্বয়ক আসাদুজ্জামান বলেন, ‘হিমু পরিবারের যাত্রা শুরু ২০১৩ সালের শেষ দিক থেকে। দেশের মানুষের মধ্যে হ‌ুমায়ূন আহমেদের সাহিত্য ও সৃষ্টিকর্ম পৌঁছে দিতে আমরা নিয়মিত সেমিনার, পাঠচক্র, নাটক ও চলচ্চিত্র প্রদর্শনীর পাশাপাশি নানাবিধ সাহিত্য-সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করি। আমাদের উপদেষ্টা হিসেবে রয়েছেন হ‌ুমায়ূন আহমেদের স্ত্রী অভিনেত্রী মেহের আফরোজ শাওন এবং প্রকাশনা সংস্থা অন্যপ্রকাশের প্রধান মাজহারুল ইসলাম।’

হৃদয়ে হ‌ুমায়ূন আহমেদ

বছরব্যাপী নানা আয়োজন থাকলেও সংগঠন দুটির বড় আয়োজন থাকে লেখকের জন্ম ও প্রয়াণ দিবসে। প্রতিবছর লেখকের জন্মদিনে স্মরণিকা ও ম্যাগাজিন প্রকাশ করে থাকে হিমু পরিবহন।

২০১৫ সালে হিমু পরিবার স্মরণে‌ুমায়ূন আহমেদ নামে একটি বই প্রকাশ করেছে। হিমু পরিবহনের রয়েছে নক্ষত্র, হিমু পরিবহন এবং নানা সময়ে প্রকাশিত এমন কিছু স্মরণিকা।

এই প্রকাশনাগুলোতে দেশের সেরা লেখকদের পাশাপাশি সংগঠনের সদস্যরাও লিখেছেন প্রিয় লেখককে নিয়ে।

বিশ্ব ক্যানসার দিবসে সারা দেশ সচেতনতামূলক আয়োজন থাকে হিমু পরিবহনেরসবাই যেখানে ‘হেলপার’!

হিমু পরিবারের সাংগঠনিক কাঠামো থাকলেও হিমু পরিবহনের আনুষ্ঠানিক কোনো কমিটি নেই। যদিও সংগঠন দুটিতে সব সদস্যের অংশগ্রহণ সমানভাবে বিবেচনা করা হয়। হিমু পরিবহনের প্রতিষ্ঠাতা সদস্যদের নিয়ে ঢাকায় একটি কার্যনির্বাহী দল রয়েছে। দলটি নতুন কোনো আয়োজন বা সাংগঠনিক নীতিনির্ধারণ করে থাকে। আঞ্চলিক শাখাগুলোকে ‘কাউন্টার’ বলা হয়। সংগঠনটির সমন্বয়কদের একজন আহসান হাবিব বলেন, ‘আমরা হিমু পরিবহনের সবাইকে হেলপার বলি। আমরা নিজেদের শুধু হিমু পরিবহনের নয়, মনে করি দেশের হেলপার।’ দেশের সব জেলায় হিমু পরিবহনের সদস্য থাকলেও কাউন্টার রয়েছে ৫৪ জেলায়। কাউন্টারগুলোর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে প্রায় ১০ হাজার তরুণ।

সচেতনতায় সাইকেল শোভাযাত্রাসঙ্গী বই

তরুণদের হ‌ুমায়ূন আহমেদের বই পড়ার আহ্বান জানিয়েই হিমু পরিবহনের পথচলার শুরু। নিয়মিত পাঠচক্র এবং অনলাইনে বই পর্যালোচনার আয়োজন করে থাকেন সংগঠনের সদস্যরা।

বই পড়ার এ আন্দোলনকে এগিয়ে নিতে সারা দেশে পাঠাগার গড়ে তোলার উদ্যোগ নিয়েছে হিমু পরিবহন। আলোকিত মানুষ গড়ার এই আন্দোলনে তারা সফলতাও পেয়েছে। গত বছর ১৯ জুলাই লেখকের প্রয়াণ দিবসে তাঁদের এই কার্যক্রমের আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়। আসলাম হোসেন জানালেন, তাঁদের পাঠাগার রয়েছে ১৫টি জেলায়। সব কটি পাঠাগার মিলে বইয়ের সংখ্যা প্রায় ১০ হাজার। পাঠাগারের অধিকাংশ বই সংগ্রহ করা হয়েছে সদস্যদের অনুদান নিয়ে। এ ছাড়া ফেসবুকে ইভেন্টের মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহ করেও বই কেনা হয়। এই পাঠাগারগুলোয় হিমু পরিবহনের সদস্য ছাড়াও যেকোনো পাঠক বই নিতে পারেন।

হিমু পরিবারও উদ্যোগ নিচ্ছে সব জেলায় পাঠাগার তৈরির। আসাদুজ্জামান বলেন, ‘আমরা সারা দেশে হ‌ুমায়ূন আহমেদ লাইব্রেরি ও সংগ্রহশালা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে তাঁর সৃষ্টিকর্ম সংরক্ষণ করতে চাই। এ ছাড়া প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের গ্রন্থাগারে একটি “হ‌ুমায়ূন আহমেদ র‍্যাক” রাখার উদ্যোগ নিচ্ছি।’

এবারের জন্মদিনে ‘নক্ষত্র’ নামে ক্রোড়পত্র প্রকাশ করছে  হিমু পরিবহনহেরে যাবে ক্যানসার
হিমু পরিবহনের সদস্যদের স্বপ্ন দেশে একটি বিশ্বমানের ক্যানসার হাসপাতাল গড়ার। এই কঠিন কাজটি তাঁরা সবার অংশগ্রহণে করতে চান। তবে ক্যানসার-সচেতনতা নিয়ে বছরব্যাপী কাজ করেন সংগঠনের সদস্যরা। অন্যতম সমন্বয়ক হুর এ জান্নাত বলেন, ‘ক্যানসার একটি অসংক্রামক রোগ। আমরা চাইলেই নিজেরা এটি অনেকাংশে প্রতিরোধ করতে পারি। দরকার শুধু সচেতনতা ও দৈনন্দিন কিছু অভ্যাস পরিবর্তন।’ এই জনসচেতনতার কাজটিই নিয়েছে দলটি। স্তন ক্যানসারসহ বিভিন্ন ধরনের ক্যানসার সম্পর্কে সচেতনতা বাড়াতে জোরেশোরে কাজ করছে তারা। প্রতিবছর বিশ্ব ক্যানসার দিবসে দেশের সব কটি জেলা শহর ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আয়োজন করে থাকে সচেতনতামূলক অনুষ্ঠান। প্রচারপত্র বিতরণ, শোভাযাত্রা ও মানববন্ধন করেও তারা সচেতনতার কাজ করে।
হিমু পরিবহনের সদস্য ইশতিয়াক আহমেদ বলেন, ‘এই কাজের পেছনে আমাদের প্রেরণা হ‌ুমায়ূন আহমেদ স্যার। তিনি ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে রোগভোগ করেছেন। আমরা চাই পোলিও রোগের মতো একদিন ক্যানসারমুক্ত হবে বাংলাদেশ। সেই লক্ষ্যে আমরা কাজ করে যাচ্ছি।’
পাশেদাঁড়াই দুর্যোগে, দুঃসময়ে
হাসপাতালে ভর্তি কোনো রোগীর জরুরি রক্ত প্রয়োজন? সেখানেও হাজির হন হিমু পরিবহনের সদস্যরা। স্বেচ্ছাসেবী এই কাজের ছোট একটি পরিসংখ্যান বলেন আসলাম হোসেন, ‘সারা দেশে বিভিন্ন সময় এখন পর্যন্ত প্রায় দুই হাজার মানুষকে রক্ত দিয়েছেন আমাদের সদস্যরা। এ ছাড়া পরিচিতজনদের কাছ থেকে রক্ত সংগ্রহ করে দিয়েছি আরও প্রায় দুই হাজার মানুষকে।’
শুধু রক্তদান কার্যক্রম নয়, হিমু পরিবহনের সদস্যরা ছুটে যান বন্যাদুর্গত ও শীতার্ত মানুষের পাশে। এ বছরই গাইবান্ধার বন্যাদুর্গত প্রায় দুই হাজার মানুষকে প্রাথমিক চিকিৎসাসেবার ব্যবস্থা করেছেন এই তরুণেরা। যশোরের ভবদহে বন্যাদুর্গত মানুষের পাশেও চিকিৎসাসেবা নিয়ে হাজির হয়েছেন তাঁরা। তীব্র শীতের সময় তাঁরা শীতবস্ত্র বিতরণ করেছেন রংপুরের পায়রাবন্দ, চট্টগ্রাম ও সিলেটের কয়েকটি এলাকার শীতার্ত মানুষের মধ্যে। আহসান হাবিব বলেন, ‘এই অনুষ্ঠান আয়োজনে আমাদের অর্থায়ন হয় মূলত সদস্যদের কাছ থেকে চাঁদা নিয়ে। তবে বড় অনুষ্ঠান আয়োজনের সময় আমরা বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের পৃষ্ঠপোষকতা নিয়ে থাকি।’
হিমু পরিবারের সদস্যরা গত বছর পাবনায় প্রায় ৫০০ শীতার্ত মানুষের হাতে শীতবস্ত্র তুলে দিয়েছেন। এ ছাড়া রক্তদান কর্মসূচি, পথশিশুদের খাবার ও ঈদের পোশাক বিতরণ করেন হিমু পরিবারের সদস্যরা।

Comments

comments

সম্পাদক : মোহাম্মদ আবদুল বাছির
প্রকাশক: মোহাম্মদ জহিরুল ইসলাম
ফোন : ‎০১৭১৩৪০৯০৯০
৩৪৫/১, দিলু রোড, নিউ ইস্কাটন, ঢাকা-১০০০
X
 
নিয়মিত খবর পড়তে আমাদের ফেসবুক পেজে লাইক দিয়ে যুক্ত থাকুন
X