শুক্রবার, ২৩শে ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ ইং, ১১ই ফাল্গুন, ১৪২৪ বঙ্গাব্দ, সকাল ১০:৫২
শিরোনাম
  • ঘৃণাকে বিজয়ী হতে দেয়া যাবে না, ট্রাম্পকে ইঙ্গিত করে জর্জ ক্লুনি
  • আমার একটাই চিন্তা দেশের মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন করা: প্রধানমন্ত্রী
  • ‘কেন্দ্রীয় সরকারের আগ্রাসী নীতির কারণে কাশ্মীরকে হারাতে হবে’
  • সাড়ে চারমাস পর মুখোমুখি, খাদিজাকে উদ্দেশ্য করে যা বলল বদরুল
  • খালেদার ‘সাজা’ বিরোধী নেতাকর্মীদের মনোবল ভাঙ্গার কৌশল!
  • বিএনপির কর্মসূচি ‘যথাসময়ে’ জানানো হবে: রিজভী
  • দলের জন্য বোলিং করতেও রাজি মুশফিক
  • শিশু জিহাদের মৃত্যু: চার জনের ১০ বছর করে কারাদণ্ড
  • অবশেষে বাড়ি অবরুদ্ধ করে রাখা সেই দেয়াল ভেঙ্গে ফেলা হচ্ছে
  • সাক্ষ্য দিলেন খাদিজা, চাইলেন বদরুলের সর্বোচ্চ শাস্তি
  • বদরুলের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিতে আদালতে খাদিজা
  • আজ বগুড়ায় যেসব প্রকল্প উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী
  • রোহিঙ্গা স্থানান্তরের সরকারি পরিকল্পনার সঙ্গে দ্বিমত মানবাধিকার কমিশনের
  • মহেশখালীতে ইয়াবা ব্যবসায়ীদের সঙ্গে পুলিশের ‘বন্দুকযুদ্ধ’
  • হোয়াইট হাউসে কাজ করার দীর্ঘ অভিজ্ঞতার কথা জানালেন এই বাংলাদেশি সাংবাদিক
Monday, November 6, 2017 1:41 pm
A- A A+ Print

আকিলা-নূর ফাউন্ডেশন মরহুম আবদুন নূর চৌধুরী ও মরহুমা আকিলা খানম চৌধুরীর স্মৃতি রক্ষার্থে তাদের সন্তানদের উদ্যোগে ২০০৮ সালের সেপ্টেম্বর মাসে আকিলা নূর ফাউন্ডেশন গঠিত হয়। এই ফাউন্ডেশনের অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য হলো মেধাবী শিক্ষার্থীদের শিক্ষালাভে উদ্বুদ্ধ এবং বিভিন্ন সমাজসেবামূলক কাজ করা। স্কুলপড়–য়া শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় উদ্বুদ্ধ করার লক্ষ্যে ২০০৯ সালের ১২ মার্চ মরহুমা আকিলা খানম চৌধুরীর বাল্যশিক্ষা প্রতিষ্ঠান সিলেটের বিয়ানীবাজার উপজেলার জমসেদ আহমদ উচ্চ বিদ্যালয়ে সপ্তম থেকে দশম শ্রেণীতে যারা প্রথম থেকে তৃতীয় স্থান অধিকার করে তাদের বৃত্তি প্রদান করা হয়। এবার বৃত্তি দেয়া হচ্ছে শায়েস্তাগঞ্জ উচ্চ বিদ্যালয়ে। এ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ১৯৪৮ থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত শিক্ষকতায় সম্পৃক্ত ছিলেন মরহুম আবদুন নূর চৌধুরী। এই ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে এখন থেকে প্রতি বছর এ দুটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে মেধাবী ছাত্রছাত্রীদের বৃত্তি প্রদানের পাশাপাশি অন্যান্য সমাজসেবামূলক কাজ চালানোর প্রত্যাশা রয়েছে। সম্পাদনা : জাহেদ চৌধুরী, সাজেদা চৌধুরী সাজু, তৌহিদ চৌধুরী প্রচ্ছদ ও অলঙ্করণ : মুকুল রেজা কৃতজ্ঞতা স্বীকার : শায়েস্তাগঞ্জ উচ্চ বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ, শায়েস্তাগঞ্জ পৌরসভা, শায়েস্তাগঞ্জ প্রেসক্লাব, দেশ নাট্যগোষ্ঠী প্রকাশকাল : ১১ জুন ২০০৯ইং দ্রষ্টব্য : যেকোনো তথ্যগত সংশোধনী সাদরে গ্রহণ করা হবে। বাণী ও কিছু স্মৃতি বিচারপতি সৈয়দ জে আর মোদাচ্ছির হোসেন আমার শ্রদ্ধাভাজন শিক্ষক ও আব্বার বন্ধু-সহকর্মী, যাকে আমরা আমাদের পরিবারেরই একজন মনে করতাম, মরহুম আবদুন নূর চৌধুরী ও তার স্ত্রী মিসেস আকিলা খানম চৌধুরী স্মরণে গঠিত আকিলা-নূর স্মৃতি ফাউন্ডেশনের উদ্যোগকে শুরুতেই আমি স্বাগত জানাই। এই ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে শায়েস্তাগঞ্জ উচ্চ বিদ্যালয়ের মেধাবী ছাত্রছাত্রীদের বৃত্তি প্রদান করা হচ্ছে। নিঃসন্দেহে এটি একটি মহতি উদ্যোগ। ’৪৮ সালে আমরা যখন শায়েস্তাগঞ্জ স্কুলে ভর্তি হই তখন স্কুলে তৃতীয় থেকে দশম শ্রেণী পর্যন্ত ছিল। ’৪৮ সালে ভর্তি হয়ে ম্যাট্রিক পরীক্ষা দেই ’৫৬ সালে। আমরা যখন ভর্তি হই তখন মরহুম আবদুন নূর চৌধুরী বিজ্ঞান বিষয়ের শিক্ষকছিলেন। যে বছর বের হলাম সে বছরই তিনি প্রধান শিক্ষক নিযুক্ত হন। শায়েস্তাগঞ্জ স্কুলের অনতিদূরে লস্করপুরে আমাদের বাড়ি। স্কুলের প্রতিষ্ঠাতাদের অন্যতম একজন ছিলেন আমার দাদা সৈয়দ আবদুল মোতাকাব্বির আবুল হাসান। তিনি আমৃত্যু স্কুলের গভর্নিং বডির সেক্রেটারি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এলাকার তখন প্রতাপশালী জমিদার নবীন বাবু স্কুলে বেশ জায়গা-জমি দান করেছিলেন। জমিদার ছেলে সুরেশ বাবু স্কুলের শিক্ষক ও আমারও শিক্ষক ছিলেন। আমার পিতা সৈয়দ মুমিদুল হোসেনও শায়েস্তাগঞ্জ স্কুলে শিক্ষকতার পাশাপাশি নানাভাবে এর উন্নয়নে ব্যাপক ভূমিকা রেখেছেন। আমার চাচা সাবেক প্রধান বিচারপতি সৈয়দত এবি মাহমুদ হোসেনও শায়েস্তাগঞ্জ বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেছেন। মরহুম আবদুন নূর চৌধুরী ছিলেন একজন সৎ, যোগ্য, দক্ষ, কর্মনিষ্ঠ মানুষ। শায়েস্তাগঞ্জ স্কুল প্রতিষ্ঠা লাভ করেছে মূলত তার হাত দিয়ে। তিনি আমার আব্বার সঙ্গে সব সময় বুদ্ধি পরামর্শ করতেন কীভাবে স্কুলের উন্নতি করা যায়, তা নিয়ে। আমরা প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর আমাদের সঙ্গে ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্ক কখনো এতটুকুও নষ্ট হয়নি। উভয় পরিবারের সামাজিক অনুষ্ঠানাদিতে সব সময় আমাদের যাতায়াত ছিল। তিনি যখনই স্কুল, কলেজ কিংবা শিক্ষক সমিতির কাজে ঢাকায় আসতেন আমার বাসায় একবার হলেও আসার চেষ্টা করতেন। একবার শায়েস্তাগঞ্জ কলেজের অধ্যক্ষ জনাব ফজলুল হককে সঙ্গে নিয়ে আব্বার একটি চিঠিসহ আমার বাসায় এসে হাজির। কলেজ তখন কেবল নতুন হয়েছে। প্রায় ২ বছর বয়স। স্যার আমাকে বললেন, সরকারের তৎকালীন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি উপদেষ্টা, বুয়েটের সাবেক ভিসি (হবিগঞ্জের চুনারুঘাটে বাড়ি) ড. এমএ রশিদের কাছে আব্বার চিঠি নিয়ে যেতে হবে। সঙ্গে কলেজের সরকারি অনুমোদনের আবেদন। তিনজন মিলে গেলাম। আমি তখন সহকারী এটর্নি জেনারেল। ড. রশিদ চিঠি পড়ে আমাদের বললেন, আমি তো শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে নেই। বললাম, শিক্ষা উপদেষ্টাকে বলে দেন। শিক্ষা উপদেষ্টা আবুল ফজলকে ফোন করলে তিনি বললেন, পরদিন তিনি পাকিস্তান যাচ্ছেন। আমরা বললাম, পাকিস্তান রওনা হওয়ার আগেই সাক্ষাত করতে চাই। কলেজের অনুমোদনের দরখাস্তে ড. রশিদের জোর সুপারিশসহ পর দিন ভোরবেলা বেবিট্যাক্সি করে শিক্ষা উপদেষ্টার বাড়িতে গিয়ে তিনজন হাজির। আবুল ফজল সাহেব অনুমোদন দেয়ার কথা লিখে দিলেন। সুপারিশসহ দরখাস্ত নিয়ে ছুটে গেলাম শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা নুরুল সাফা সাহেবের কাছে। তিনি দু’দিন আগেও অবহেলায় দরখাস্তটি ফিরিয়ে দিয়েছিলেন। দু’দিন পর শিক্ষা উপদেষ্টা ‘আদেশ’ সংবলিত দরখাস্ত ফিরিয়ে দিতে পারলেন না। অনুমোদনের প্রস্তাব আনুষ্ঠানিকভাবে পরে পর্যায়ক্রমে হয়েছে। এভাবে শায়েস্তাগঞ্জ কলেজ প্রতিষ্ঠায় মরহুম আবদুন নূর চৌধুরীকে নিবেদিত হয়ে কাজ করতে দেখেছি। তার ভালোমন্দে আমি যেমন আনন্দিত হতাম, তেমনি তিনিও উৎফুল্ল হতেন আমার যে কোনো প্রমোমন বা সুখবরে। আমার ডাকনাম শাহজাহান। সে নামেই ডাকতেন তিনি। আমি যখন সুপ্রিমকোর্টের হাইকোর্ট বিভাগে বিচারক হিসেবে নিয়োগ পেলাম তখন আমাকে লেটার অব ফেলিসিটেশন পাঠিয়েছিলেন তিনি। আমি যখন প্রধান বিচারপতি হই, তখন স্যার পুরো ‘কনসাস’ ছিলেন না; থাকলে হয়তো তখনো পাঠাতেন। স্যারের স্ত্রী মিসেস আকিলা খানম চৌধুরী যাকে চাচী ডাকতাম, আমাদের খুবই ¯েœহ করতেন। ২০০৬ সালের কথা, আমি তখন প্রধান বিচারপতি। আমার স্যারের স্ত্রীর মৃত্যুর খবর পেয়ে তার ছেলে জাহেদের ঢাকার বাসায় ছুটে গিয়েছিলাম, স্যারও ছিলেন সেখানে। দেখা হলো স্যারের সঙ্গে। কিন্তু তখন তার স্মরণশক্তি অনেকটাই লোপ পেয়ে গেছে। স্যারের সঙ্গে আমার সেটাই ছিল শেষ দেখা। আজকের এই বিশেষ মুহূর্তে তাদের দুজনের আত্মার মাগফিরাত কামনা করছি। আল্লাহ তাদের বেহেশত নছিব করুন। তাদের সন্তানরা স্মৃতিরক্ষার্থে যে উদ্যোগ নিয়েছে সর্বাঙ্গে তা সফলতা লাভ করুক। একই সঙ্গে আমি শাস্তেয়াগঞ্জ বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ের সকল শিক্ষক, ছাত্রছাত্রী ও অভিভাবকদের সুস্থ ও সুন্দর জীবন কামনা করছি। আল্লাহ সকলের সহায় হোন। শুভেচ্ছা কথা আমি জেনে অত্যন্ত আনন্দিত যে, অনেক পরে হলেও একজন সমাজপিতা, মানুষ গড়ার কারিগর, শায়েস্তাগঞ্জ উচ্চ বিদ্যালয়ের সাবেক প্রধান শিক্ষক মরহুম আবদুন নূর চৌধুরীর নামে একটি ট্রাস্ট গঠন করা হয়েছে এবং ওই ট্রাস্টের শুভযাত্রা শুরু হতে যাচ্ছে তারই প্রাণপ্রিয় প্রতিষ্ঠান, যেখানে থেকে তার শিক্ষকতা জীবন শুরু থেকে শেষও করেছিলেন, সেই শায়েস্তাগঞ্জ উচ্চ বিদ্যালয়ের মেধাবী ছাত্রছাত্রীদের বৃত্তি প্রদানের মাধ্যমে। এটা খুবই স্বাভাবিক, কোনো ভালো কথা, ভালো বাণী কিংবা একজন সুযোগ্য পিতা, একজন সুযোগ্য সমাজ সংস্কারকের স্মৃতি কখনো বিলীন হতে পারে না। কেউ না কেউ তাকে লালন বা রক্ষা করতে ইগয়ে আসবেনই। আকিলা নূর ফাউন্ডেশনের এ উদ্যোগ ও তাদর বৃত্তি প্রদানের মতো কর্মকাÐ নিঃসন্দেহে কালজয়ী এ মহান মানুষ মরহুম আবদুন নূর চৌধুরীকে নিয়ে যাবে কাল থেকে কালান্তর অভিমুখে। পরিশেষে এ মহান শিক্ষাগুরু ও তার পতœী আত্মাদ্বয়ের মাগফেরাত কামনা করছি। সৈয়দ আহমদুল হক উপজেলা চেয়ারম্যান হবিগঞ্জ, সদর। শুভেচ্ছা কথা আমি এটা জেনে অত্যন্ত আনন্দিত যে আমাদের অত্যন্ত প্রিয় ও শ্রদ্ধাভাজন শিক্ষক, শায়েস্তাগঞ্জ উচ্চ বিদ্যালয়ের সাবেক প্রধান শিক্ষক মরহুম জনাব আবদুন নূর চৌধুরী ও তার স্ত্রী শ্রদ্ধেয়া মরহুমা আকিলা খানম চৌধুরীর নামে একটি ফাউন্ডেশন গঠিত হয়েছে। এই ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে শায়েস্তাগঞ্জ উচ্চ বিদ্যালয়ের মেধাবী ছাত্রছাত্রীদের বৃত্তি প্রদানের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। এ মহান শিক্ষক আমাদের ছেড়ে চলে গেলেও তার স্মৃতি আমাদের মধ্যে সব সময় অমলিন হয়ে থাকবে। আমাদের বর্তমান ও ভবিষ্যত প্রজন্ম, যারা এই প্রিয় শিক্ষকের সান্নিধ্য পায়নি তাদেরকে শিক্ষাদীক্ষায় উৎসাহিত করতে এই ফাউন্ডেশন ব্যাপক ভূমিকা রাখবে বলে আমি মনে করি। আমরা শায়েস্তাগঞ্জবাসী কখনো এ মহান শিক্ষকের অবদান ভুলতে পারব না। আমি এ মহতী উদ্যোগের সাফল্য কামনা করছি এবং এর সাথে সংশ্লিষ্ট সকলকে ধন্যবাদ জানাচ্ছি। এমএফ রহমান (ওলি) মেয়র, শায়েস্তাগঞ্জ পৌরসভা হবিগঞ্জ। স্মৃতিতে আবদুন নূর চৌধুরী ও আকিলা খানম চৌধুরী মরহুম আবদুন নূর চৌধুরী ছিলেন শায়েস্তাগঞ্জ হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষক। তিনি এক মহান ব্যক্তিত্ব। তাকে যদি শুধু প্রধান শিক্ষক বলি ভুল হবে। তিনি ছিলেন অনেক হাইস্কুলের শিক্ষক ও প্রধান শিক্ষকের শিক্ষক। বিশেষ করে হবিগঞ্জ এলাকার এমন কোনো স্কুল নেই যে স্কুলে তার ছাত্র প্রধান শিক্ষক বা শিক্ষক হিসেবে নিয়োজিত নেই। বিভিন্ন স্কুলের প্রধান শিক্ষকরা নানাবিধ সমস্যা নিয়ে তার কাছে ছুটে আসতেন যা তিনি অভিভাবক হিসেবে দায়িত্ব মনে করে সুষ্ঠু সমাধান দিতেন। এসব আমি নিজ চোখে দেখেছি। তিনি ১৯২৬ সালের ১ মার্চ সিলেট জেলার জকিগঞ্জ উপজেলার নূরনগর গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম মরহুম মোদাচ্ছির আলী চৌধুরী এবং মাতার নাম জোবেদা খাতুন চৌধুরী। তিনি স্থানীয় নূরনগর প্রাথমিক বিদ্যালয়ে এবং পরবর্তীতে কানাইঘাট এমই স্কুল থেকে প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণ করেন। পরে তিনি সিলেট সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে ভর্তি হন। খুবই মেধাবী ছাত্র ছিলেন তিনি। পুলিশের সাবেক আইজি ও পূবালী ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান মরহুম ই এ চৌধুরী, বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক মরহুম ড. আখলাকুর রহমান প্রমখ তার ক্লাসমেট ছিলেন। তাদের এই তিনজনের মধ্যে ক্লাসে প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতয়ি অবস্থান থাকতো। ১৯৪৩ সালে এন্ট্রান্স (ম্যাট্রিক) পরীক্ষায় তিনি তিনটি লেটার নিয়ে প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হন এবং ১৯৪৫ সালে সিলেটের ঐতিহ্যবাহী সরকারি এমসি কলেজ থেকে প্রথম বিভাগে ইন্টারমিডিয়েট পাস করেন। একই কলেজে পদার্থ বিজ্ঞানে অনার্সে ভর্তি হলেও ছাত্র আন্দোলনে জড়িয়ে পড়া ও নানা কারণে সেটা বাধাগ্রস্ত হয়। ছাত্র জীবনে তিনি অল আসাম মুসলিম স্টুডেন্ট ফেডারেশনের সেক্রেটারি ছিলেন। এই সংগঠনের সভাপতি ছিলেন সাবেক প্রধান নির্বাচন কমিশনার বিচারপতি এটিএম মসউদ। সিলেটকে ভারতের পরিবর্তে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের সঙ্গে রাখা এবং দেশ বিভাগ আন্দোলনে সক্রিয় ছিলেন বিধায় আবদুন নূর চৌধুরীকে হুলিয়া মাথায় নিয়ে বিভিন্ন এলাকায় আত্মগোপন করতে হয়। প্রথম দিকে তিনি বারহাল ইয়াহিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ে কিছুদিন বিজ্ঞান শিক্ষক হিসেবে কাজ করেন। পরে গ্রেফতার এড়িয়ে তিনি শায়েস্তাগঞ্জ হাইস্কুলে ১৯৪৬ সালে বিজ্ঞান বিষয়ের শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন। স্কুলে থাকাবস্থায়ই তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে বিএসসি ডিগ্রি লাভ করেন। আবদুন নূর চৌধুরী যখন শায়েস্তাগঞ্জ স্কুলে যোগদান করেন তখন স্কুলের প্রধান শিক্ষক ছিলেন মহেশ চক্রবর্তী। পরবর্তীতে এক পর্যায়ে স্কুলের তদানীন্তন প্রধান শিক্ষক মরহুম আবদু হেকিম ঠাকুরের বিভিন্ন কর্মকাÐের প্রতিবাদে স্কুল ত্যাগ করে আইনশাস্ত্রে ঢাকা সেন্ট্রাল ‘ল কলেজে লেখাপড়া শুরু করেন আবদুন নূর চৌধুরী। এলএলবি প্রথম পর্ব পরীক্ষা দিলেও সমাপনী পরীক্ষা না দিয়েই এক পর্যায়ে এলাকার ছাত্র-শিক্ষক ও অভিভাবকদের চাপে ১৯৫৪ সালে আবার তিনি শায়েস্তাগঞ্জ স্কুলে ফিরে যান এবং ১৯৫৬ সালে প্রধান শিক্ষকের দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। পরবর্তীতে ¯œাতক ডিগ্রি লাভ করেন। তিনি ১৯৫৭ সালে বিএন এবং ১৯৫৯ সালে এমএড ডিগ্রি লাভ করেন। আমি আবদুন নূর চৌধুরীর ছাত্র এবং তিনি আমার ভগ্নিপতি। তিনি ১৯৬০ সালের ৪ এপ্রিল আমার বোন আকিলা খানম চৌধুরীর সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। তখন আমি ৫ম শ্রেণীর ছাত্র। দুলাভাই তারা ৪ ভাই, তিন বোন ছিলেন। সবার বড় ভাই মোহাম্মদ আলী চৌধুরী পুলিশ বাহিনীতে, দ্বিতীয় নিজে, তৃতীয় ভাই আবদুস শুকুর চৌধুরী নৌবাহিনীতে এবং সবার ছোট ভাই ডাক্তার এ মালিক চৌধুরী আর্মির ডাক্তার ছিলেন। বিয়ের পর আমার বোনই আমাকে ছোটবেলায় লালন পালন করেছেন এবং অত্যন্ত ¯েœহ করতেন। আমার বোনের জন্ম ১৯৪০ সালে সিলেটের বিয়ানীবাজার উপজেলার চারখাই ইউনিয়নের নাটেশ্বর গ্রামে। পিতার নাম মরহুম ছওয়াব আলী চৌধুরী ও মাতা জেবুন্নেসা চৌধুরী। তখনকার স্থানীয় বিষ্ণুপ্রিয়া এমই স্কুল ও বর্তমান জমসেদ আহমদ হাইস্কুলে আমার বোনের পড়ালেখার হাতেখড়ি। দুলাভাইয়ের সঙ্গে বিয়ের পর শায়েস্তাগঞ্জে চলে আসেন। মমতাময়ী বোনের শুরু হয় নতুন এক জীবন। শায়েস্তাগঞ্জ স্কুলের কোয়ার্টারে একাকী বসবাস। দুলাভাই ব্যস্ত তার স্কুল আর অন্যান্য কার্যক্রম নিয়ে। আর সংসার আগলে রাখেন আমার বোন। দুলাভাই সব সময় ব্যস্ত থাকলেও আমার বোন তার সন্তানদের সে অভাব বুঝতে দেননি। একাই সামলে নিয়েছেন তার বড় সংসার। তিনি যেমনি ছিলেন পরিশ্রমী, তেমনি উদার। তার উদারতার জন্য সব সময় তিনি অনেকের সহযোগিতা পেয়েছেন। পর্দানশীল মহিলা হিসাবে জনসমক্ষে বের না হলেও অন্দরে থেকেই তিনি ভাল করেই খোজ খবর রাখতেন। বিশেষ করে শায়েস্তাগঞ্জ এলাকার মহিলারা সব সময় তার কাছে আসতেন। আমার বোনও তার সাধ্যমত সবাইকে সহায়তা করতেন। অত্যন্ত ধার্মিক ও অমায়িক গুণের অধিকারী আকিলা খানম চৌধুরীর মতো নারীর সংখ্যা আমাদের সমাজে সত্যই নগন্য। আমি ১৯৬২ সালে শায়েস্তাগঞ্জ স্কুলে ভর্তি হই এবং আমার বোন ও দুলাভাইয়ের সঙ্গে তাদের বাসায় থেকে স্কুলে পড়াশোনা। তখন থেকেই আমি মরহুম আবদুন নূর চৌধুরীকে অত্যন্ত কাজ থেকে দেখেছি। সকাল-সন্ধ্যা রাত-দুপুর তিনি শুধু স্কুল নিয়েই ব্যস্ত থাকতেন, আর আমার বোন তাকে সর্বাত্মক সহযোগিতা করতেন। মাঝখানে প্রায় দু’বছর বিরতিসহ ১৯৪৬ সাল থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত প্রায় ৪৪ বছর মো. আবদুন নূর চৌধুরী শায়েস্তাগঞ্জ উচ্চ বিদ্যালয়ে শিক্ষকতার সঙ্গে জড়িত ছিলেন। এর মধ্যে প্রায় ৩৫ বছর তিনি প্রধান শিক্ষক ছিলেন। বেসরকারী স্কুল শিক্ষকদের সংগঠন বাংলাদেশ শিক্ষক সমিতি (বাশিস)-এর সিলেট জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক ও সভাপতি হিসাবে প্রায় ২০ বছর দায়িত্ব পালন করেন। এরপর কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি ও শেষ পর্যায়ে ভারপ্রাপ্ত সভাপতি হিসাবে বেসরকারি শিক্ষকদের দাবি-দাওয়া আদায়ে, বিশেষ করে সরকারি অনুদান আদায়ে তিনি খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। দাবি আদায় করতে গিয়ে ’৮৬ সালে এরশাদ সরকারের আমলে তাকে কারাবরণও করতে হয়। তিনি প্রায় ২০ বছর কুমিল্লা শিক্ষাবোর্ডে পদার্থ বিজ্ঞানের প্রধান পরীক্ষক হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন। রাষ্ট্রপতি কর্তৃক গঠিত কুমিল্লা শিক্ষা বোর্ডের ১১ সদস্য বিশিষ্ট আর্বিটেশন কমিটিতেও দীর্ঘদিন তিনি শিক্ষক প্রতিনিধি ছিলেন। শায়েস্তাগঞ্জ ডিগ্রি কলেজের প্রতিষ্ঠাতাদের অন্যতম ছিলেন আবদুন নূর চৌধুরী। কলেজের প্রতিষ্ঠাতা প্রিন্সিপাল ফজলুর রহমানকে সঙ্গে নিয়ে রাতদিন পরিশ্রম করেছেন তিনি। দীর্ঘদিন শায়েস্তাগঞ্জ কলেজের গভর্নিং বডির সদস্য ও খÐকালীন শিক্ষকেরও দায়িত্ব পালন করেন। শায়েস্তাগঞ্জ কামিল মাদ্রাসার গভর্নিং বডির সদস্য হিসাবে মাদ্রাসার উন্নয়নেও অবদান রাখেন। শায়েস্তাগঞ্জ পুরান বাজার মসজিদ কমিটির চেয়ারম্যান হিসাবেও দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালন করেন তিনি। খুবই ধার্মিক ও অমায়িক ছিলেন। যতদিন জ্ঞান ছিল নিয়মিত ৫ বেলা নামাজদ আদায় করেছেন। অবসরে যাওয়ার পর গ্র্যাচুয়িটির টাকার সঙ্গে আরো কিছু যুক্ত করে তিনি হজব্রত পালন করেছেন। আমার বোনেরও হজে যাওয়ার ইচ্ছে ছিল। কিন্তু অকাল মৃত্যুতে তার সেই ইচ্ছা পূরণ হয়নি। আবদুন নূর চৌধুরী প্রধান শিক্ষক হলেও নিয়মিত ক্লাস নিতেন তিনি। পদার্থ বিজ্ঞান, গণিত, ঐচ্ছিক গণিত পড়াতেন। ইংরেজিতে তার খুব ভালো দখল ছিল। শিক্ষকতা জীবনের প্রথম দিকে পড়াতেন বিজ্ঞান। এদিকে স্থানীয় বিচারের দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি এলাকার বিভিন্ন মামলা-মোকদ্দমার অর্বিটেশন বা স্থানীয়ভাবে নিষ্পত্তির দায়িত্ব আদালতের মাধ্যমে পড়ত তার ওপর। মরহুম আবদুন নূর চৌধুরী অসীম সাহসী ছিলেন। যেকোনো বিরূপ পরিস্থিতি মোকাবেলায় তিনি একাই ছিলেন একশ। বাসয় একাই একাধিকবার ডাকাতদের মোকাবেলা করা এবং অন্যান্য বৈরী পরিস্থিতিতে তাকে অনেক সময় একাই অনেকজনকে মোকাবেলা করতে দেখা গেছে। শারীরিক গড়ন, আল্লাহর ওপর অগাধ বিশ্বাস, মনোবল এগুলো তাকে যেকোনো বিপদ মোকাবেলায় সাহস যুগিয়েছে। আবদুন নূর চৌধুরীর আদর্শে ও আমার বোনের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় তাদের সাত ছেলে ও এক মেয়ে সমাজের উচ্চ পর্যায়ে প্রতিষ্ঠা লাভ করেছেন। তাদের প্রথম ছেলে ডক্টর শোয়েব চৌধুরী জাপান থেকে পিএইচডি লাভ করে বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে জন হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করছেন। দ্বিতীয় ছেলে ডক্টর শাহেদ চৌধুরী যুক্তরাজ্য থেকে পিএইচডি অর্জন করেন এবং বর্তমানে কানাডায় স্থায়ীভাবে বসবাস করছেন। তৃতীয় ছেলে জাহেদ চৌধুরী রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ব্যবস্থাপনায় ¯œাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন। বর্তমানে তিনি আমার দেশ পত্রিকায় নিউজ এডিটর হিসেবে কর্মরত রয়েছেন। চতুর্থ ছেলে খালেদ চৌধুরী বর্তমানে সিলেটে ব্যবসায় নিয়োজিত। পঞ্চম ছেলে ব্যারিস্টার তারেক চৌধুরী যুক্তরাজ্য থেকে বার-এট ল করে বর্তমানে যুক্তরাজ্যে আইন পেশায় নিয়োজিত আছেন। ষষ্ঠ ছেলে তৌহিদ চৌধুরী যুক্তরাজ্যে পিএইচডি অধ্যয়নরত। কনিষ্ঠ ছেলে মুর্শেদ চৌধুরী সিলেট শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক, বর্তমানে কানাডায় পিএইচডি অধ্যায়নরত। তাদের একমাত্র মেয়ে সাজেদা চৌধুরী লালমাটিয়া মহিলা কলেজে সহযোগী অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত আছেন। তিনি এমফিল সম্পন্ন করেন। আবদুন নূর চৌধুরী ও আকিলা খানম চৌধুরীর প্রতিভাবান সন্তানদের নিয়ে আমরাও গর্ববোধ করি। আবদুন নূর চৌধুরী যেমন ছিলেন আদর্শ শিক্ষক তেমন ছিলেন আদর্শ অভিভাবক, আদর্শ পিতা। তিনি ছাত্র সন্তানের কাছে ছিলেন অত্যন্ত ¯েœহশীল, কিন্তু নিয়ম শৃংখলায় ছিলেন অত্যন্ত কঠোর। স্কুল প্রশাসনে তিনি কখনো আপস করতেন না, ছাত্র হোক বা শিক্ষক হোক। আমরা যখন নবম শ্রেণীতে উত্তীর্ণ হই তখন আমার সহপাঠী মওদুদ (প্রাক্তন চেয়ারম্যান, টিএন্ডটি বোর্ড), ইসহাক (প্রাক্তন ডিজিএম, বাংলাদেশ ব্যাংক), মঞ্জুর (প্রাক্তন জিএম বাংলাদেশ চা বোর্ড) তাদের সঙ্গে আমি ও আরও কয়েকজন সহপাঠীর আগ্রহ েেক বিজ্ঞান বিভাগ খোলার জন্য উৎসাহিত হন। কিন্তু বিজ্ঞান শিক্ষকের অভাবে প্রথম দিকে মানবিক গ্রæপের সঙ্গে ইলেকটিভ ম্যাথ যোগ করেন। তখন স্কুলে উচ্চতর গণিত পড়ানোর কোনো শিক্ষক ছিলেন না। তাই তিনি শতব্যস্ততার মধ্যেও আমাদের উচ্চতর গণিতের ক্লাস নিতেন। পরে স্কুলে যথারীতি মানবিক, বিজ্ঞান ও বাণিজ্য বিভাগ খোলা হয়। শায়েস্তাগঞ্জ উচ্চ বিদ্যালয় হয়ে ওঠে বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়। রেজাল্টের দিক দিয়ে বরাবরই হবিগঞ্জ সরকারি স্কুলের পরই থাকত শায়েস্তাগঞ্জ স্কুলের নাম। এই স্কুলের ছাত্রছাত্রীরা পড়াশোনায় যেমন এগিয়ে ছিল তেমন এগিয়ে ছিল খেলাধূলায়। স্কাউট ও রেডক্রিসেন্ট আন্দোলনেও নেতৃত্ব দিয়েছেন তিনি। স্কুলে প্রতিদিন সকালে অ্যাসেম্বলী ও জাতীয় সঙ্গীতের পর প্রধান শিক্ষক হিসেবে তিনি উপদেশ ও নির্দেশনামূলক বক্তব্য দিতেন। তারপরই আনুষ্ঠানিকভাবে ক্লাস শুরু হতো। বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতা ছাড়াও আন্তঃস্কুল ফুটবল প্রতিযোগিতাহতো সেখানে। শায়েস্তাগঞ্জ হাইস্কুল ছিল সবার সেরা। এসব আয়োজনে সর্বাগ্রে ছিলেন আবদুর নূর চৌধুরী। তিনি সংস্কৃতিমনাও ছিলেন। তাই স্কুলে একটি অডিটোরিয়াম স্থাপনের কাজ শুরু করেছিলেন, যা সম্পন্ন্যের আগেই তিনি অবসরে চলে যান। আমার বিশ্বাস, বর্তমান স্কুল কর্তৃপক্ষ অডিটোরিয়ামের অসমাপ্ত কাজ সম্পন্ করে আবদুন নূর চৌধুরী স্বপ্ন বাস্তবায়ন করবেন। আমার বোন আকিলা খানম চৌধুরী ২০০৬ সালের ১২ মার্চ ঢাকার পিজি হাসপাতালে অনেকটা অকালেই মৃত্যুবরণ করেন। আর দুলাভাই মো. আবদুন নূর চৌধুরী মৃত্যুবরণ করেন ২০০৮ সালের ২১ সেপ্টেম্বর। ঢাকার অ্যাপোলো হাসপাতালে তিন দিন অবস্থান করে বাসায় ফেরার একদিন পরই তিনি বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় তার ছেলের বাসায় মৃত্যুবরণ করেন। আশা করি তাদের সন্তান ও শুভাকাঙ্খীরা তাদের স্মৃতিকে ধরে রাখবেন এবং তাদের স্বপ্ন বাস্তবায়ন করবেন। লেখক : উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক (ডিএমডি) মার্কেন্টাইল ব্যাংক লিমিটেড। আমার স্মৃতিতে আবদুন নূর চৌধুরী ও শায়েস্তাগঞ্জ হাইস্কুল ছায়াঘেরা শান্ত নিবিড় প্রাকৃতিক পরিবেশে শায়েস্তাগঞ্জ উচ্চ বিদ্যালয়টি দক্ষিণ হবিগঞ্জের শায়েস্তাগঞ্জ পৌরসভার অধীনে খোয়াই নদীর পশ্চিম তীরে পূর্ব লেঞ্জাপাড়া গ্রামে অবস্থিত। বিদ্যালয়টি ১৯১৮ ইংরেজী সালে প্রতিষ্ঠিত তৎকালীন সময়েল একমাত্র বিদ্যালয় হিসাবে অত্র এলাকা তথা সমগ্র দক্ষিণ হবিগঞ্জের একমাত্র বিদ্যানিকেতন হিসাবে পরিচিত ছিল। এই বিদ্যালয়টি বাংলাদেশের দুজন প্রধান বিচারপতি সৈয়দ এবি মাহমুদ হোসেন ও সৈয়দ জে আর মোদাচ্ছির হোসেন সাবেহসহ অনেক জ্ঞানী গুণীর জন্ম দিয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থ বিজ্ঞানের কৃতী অধ্যাপক মরহুম জনাব ড. আলী জাফর সাহেব, সাবেক যুগ্ম সচিব মুজিব চৌধুরীও এ বিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলেন। শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান উপাচার্য ড. সালেহউদ্দিন আহমেদও স্কুলের একজন কৃতী ছাত্র। এ বিদ্যালয়ের ছাত্র ড. শোয়েব চৌধুরী বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের জন হফকিন্স ইউনিভার্সিটিতে গবেষক হিসাবে কর্মরত রয়েছেন। তাছাড়া বাংলাদেশ সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভিন্ন দফতরে গুরুত্বপূর্ণ অনেক পদে এ বিদ্যালয়ের প্রাক্তন অনেক শিক্ষার্থী কর্মরত ছিলেন ও আছেন। এই বিদ্যালয়ের শিক্ষা কর্মকর্তাদের সঙ্গে যারা জড়িত ছিলেন তাদের মধ্যে জনাব মরহুম আবদুন নূর চৌধুরী সাহেবের নাম ওতোপ্রোতভাবে জড়িত। তিনি সুদীর্ঘ ৪৪ বছরের শিক্ষকতা জীবনের প্রায় ৩৩ বছর প্রধান শিক্ষক হিসাবে শায়েস্তাগঞ্জ উচ্চ বিদ্যালয়ে কর্মরত ছিলেন। আমার দেখা ও জানা মতে, উনার মতো একজন আদর্শবান দক্ষ ও নীতিবান প্রধান শিক্ষক বিরল। আমি ১৯৫৯ ইং সাল থেকে ১৯৬৪ ইং সাল পর্যন্ত এই বিজ্ঞ প্রধান শিক্ষক মহোদয়ের ছাত্র হওয়ার সুযোগ পেয়েছিলাম। আমার ছাত্রজীবন ও শিক্ষকতা জীবনে উনার কাছ থেকে যে আদর্শ ও প্রজ্ঞার পরিচয় পেয়েছি তা আমার বাস্তব জীবনের উৎসাহ ও উদ্দীপনা হিসাবে কাজ করেছে। আমি ১৯৬৯ ইং সাল থেকে এই বিদ্যালয়ে মরহুম জনাব আবদুন নূর চৌধুরী সাহেবের অধীনে শিক্ষকতা করার সুযোগ পেয়েছি। ব্যক্তি হিসাবে তিনি ছিলেন আার পথপ্রদর্শক, পরামর্শক এবং হিতৈষী। শায়েস্তাগঞ্জ ও আশপাশে এমন কিছু পরিবার রয়েছে যেখানে দাদা, ছেলে, নাতীÑ তিন জেনারেশনই স্যারের ছাত্র। আমি শুনেছি বাল্যকাল থেকেই তিনি ছিলেন মেধাবী এবং তুখোড় ছাত্র। তিনি ১৯৪৩ ইং সালে তিনটি লেটারসহ প্রথম বিভাগে ম্যাট্রিক পাস করেন। পরবর্তীতে সিলেট এমসি কলেজ থেকে প্রথম বিভাগে আইএসসি পাস করেন। তিনি তৎকালীন ছাত্র রাজনীতির সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন। ব্রিটিশ পিরিয়ডে অবিভক্ত সিলেট অল আসার মুসলিম স্টুডেন্ট ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। এই কমিটির তৎকালীন সভাপতি ছিলেন সাবেক প্রধান নির্বাচন কমিশনার বিচারপতি এটিএম মাসউদ। জনাব আবদুন নূর চৌধুরী ১৯৪৬ ইং সনে শায়েস্তাগঞ্জ উচ্চ বিদ্যালয়ে বিএসসি শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন এবং ১৯৫৬ ইং সাল থেকে ১৯৯০ ইং সাল পর্যন্ত এই বিদ্যালয়ে সম্মান, গৌরব ও কৃতিত্বের সঙ্গে প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করেন। উনার শিক্ষকতার সময়ে এই বিদ্যালয়টি উন্নতির চরম শিখরে আরোহণ করে এবং বিদ্যালয়ের যাবতীয় উন্নয়ন কর্মকাÐও সম্পাদিত হয়। সাধারণ শিক্ষক সমাজের স্বার্থে বেসরকারি শিক্ষকদের সংগঠন বাংলাদেশ শিক্ষক সমিতিতেও তাঁর অবদান অনস্বীকার্য। তিনি বাংলাদেশ শিক্ষক সমিতির সিলেট জেলা শাখার সভাপতি, কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি ও কেন্দ্রীয় সভাপতি হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন। সাধারণ শিক্ষকদের দাবি-দাওয়া ও স্বার্থ আদায় করতে গিয়ে তিনি ১৯৮৬ সালে কারাবরণ করেন। তিনি নীতি ও ন্যায়ের প্রশ্নে ছিলেন আপোসহীন। কোন স্বার্থ বা প্রলোভনে তিনি তার আদর্শ থেকে সরে দাড়াননি। এই মহান ব্যক্তিত্বের গুণের কথা বলে শেষ করা যাবে না। আদর্শ শিক্ষকদের পাশাপাশি তিনি ছিলেন একজন আদর্শ পিতা। ব্যক্তি জীবনে তিনি ছিলেন সাত ছেলে ও এক মেয়ের গর্বিত জনক। তাঁর প্রতিটি সন্তান উচ্চ শিক্ষিত ও পিতার আদর্শে আদর্শবান। তাদের মধ্যে ৫ জন বর্তমানে বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা, উচ্চতর অধ্যয়নে রয়েছেন। আবদুন নূর চৌধুরী সাহেবের কর্মজীবন ও সন্তানদের লেখাপড়ার কাজে যার অবদান বেশি তিনি হলেন ম্যাডাম মিসেস আকিলা খানম চৌধুরী। তিনিও দুনিয়াতেই নেই। আজ উনাদের অবর্তমানে দেশে বিদেশে অবস্থানরত সুযোগ্য সন্তানেরা উনাদের মহান কীর্তিকে অক্ষয় করে রাখার জন্য যে ফাউন্ডেশন গঠনের উদ্যোগ নিয়েছেন তা অত্যন্ত প্রশংসার দাবি রাখে। বর্তমান প্রজন্ম হয়তো উনাদের জানতো না, চিনতো না যতি না আজ উনাদের নামে যে ফাউন্ডেশন গঠন করে সাধারণ ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্য থেকে মেধা অনুসারে প্রতিটি শ্রেণীর প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্থান অধিকারীদের মধ্যে আকিলা-নূর স্মৃতি বৃত্তির ব্যবস্থা না করতেন। আমি এই মহৎ উদ্যোগের সার্বিক প্রশংসা করি ও সফলতা কামনা করি। আমি কায়মনোবাক্যে দোয়া করি খোদা যেন এই ফাউন্ডেশনের উদ্যোক্তাদের দীর্ঘ হায়াত ও সুখময় জীবন দান করেন। একজন শিক্ষক নেতাকে যেভাবে দেখেছি আমার শ্রদ্ধার নির্ঘণ্টে যে কটি নাম এর মধ্যে শীর্ষে যিনি তিনি হচ্ছেন আমার প্রিয়তম শিক্ষক নেতা মরহুম মো. আবদুন নূর চৌধুরী। একজন আদর্শ শিক্ষক ও নেতার গুণাবলীর কোনোটাই তার মধ্যে কম ছিল না। শিক্ষকতা পেশায় তিনি একজন আদর্শ শিক্ষক। তার তুলনা তিনি নিজেই। দীর্ঘদিন তার সঙ্গে থেকে এটা শিক্ষালাভ করেছি, কাল ও পাত্রভেদে এমন কর্তৃব্যদীপ্ত পুরুষ কিভাবে হওয়া যায়। শিক্ষক নেতাদের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের যুগ আজ কেন যেন বিলীন হয়ে হতে যাচ্ছে। মহান এ শিক্ষক নেতার নামে ফাউন্ডেশন কর্তৃক প্রকাশিতব্য স্মরণিকায় স্মৃতিচারণের আহবানে উদ্দীপিত হলাম। হৃদয়ের গভীরতম স্থানে জমে থাকা তার প্রতি শ্রদ্ধার জানানোর এ সামান্য সুযোগটি কাজে লাগানোর বাসনা প্রকাশ করলাম। আবেগে আপ্লুত হলাম এবং একই সঙ্গে বলতেও দ্বিধাবোধ করিনি, শ্রদ্ধেয় শিক্ষক নেতার জন্য যা যা করার তা করতে আমি প্রস্তুত। ১৯৮২ সালে এই শিক্ষক নেতার সভাপতিত্বে বৃহত্তর সিলেট জেলার শিক্ষকদের সমাবেশ তৎকালীন মৌলভীবাজার মহাকুমার ভগ্ন শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব আমার ওপর অর্পিত হয়। আমার চেয়ে অনেক উচ্চ শিক্ষিত, জ্ঞানী ও গুণী শিক্ষক থাকা সত্তে¡ও কেন যে আমার ওপর এই দায়িত্ব দিলেন তা একমাত্র মরহুম শিক্ষক নেতাই জানেন। তার পরামর্শে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করতে মৌলভীবাজার শিক্ষক সমিতির ভূমিকার কোনো অংশে ঘাটতি ছিল না। ১৯৬৯-এ আইয়ুব খানের স্বৈরাচারী শাসনের বিরুদ্ধে গণঅভ্যুত্থানের শেষ পর্যায়ে যখন সারাদেশে সব পেশাজীবী আন্দোলনমুখর, তখন পূর্ব পাকিস্তান শিক্ষক সমিতির একজন নেতা হিসেবে প্রাক্তন সিলেট জেলার নেতৃত্বদানকারী এই শিক্ষক নেতার আহবানে পূর্ব পাকিস্তানের অন্যান্য জেলার ন্যায্য শিক্ষকরাও ধর্মঘট শুরু করেন। ঠিক একই ধারায় ১৯৭০ সালে শিক্ষক আন্দোলন করে ধর্মঘটের শেষ পর্যায়ে সরকারের সঙ্গে আলোচনাক্রমে যে অর্থনৈতিক সুবিধা আদায় করা সম্ভব হয়েছিল তা হচ্ছে, শিক্ষকদের জন্য ৫০, ৪০, ৩০ টাকা হারে কল্যাণ ভাতা প্রবর্তন। সেদিনকার এই সাফল্যের শরিক নেতা মরহুম আবদুন নূর চৌধুরী। ১৯৭১ সালের ফেব্রæয়ারিতে যশোরে যে শিক্ষক সম্মেলন হয়েছিল, ‘ঐক্যবদ্ধ’ সমিতি হিসেবে এটা ছিল সংগঠনের শেষ সম্মেলন। এই সম্মেলনে দুটি প্যানেলের মধ্যে মূলত প্রতিদ্ব›িদ্বতা হয়। একটি প্যানেলের সভাপতি পদে পরবর্তীতে আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য বর্তমানে মরহুম কামরুজ্জামান ও মহাসচিব পদে অপর প্যানেলের মরহুম জয়নুল আবেদীন চৌধুরী নির্বাচিত হন। এই পরিস্থিতির পটভূমিতে ’৭৩-এ বাংলাদেশ শিক্ষক সমিতির নেতৃত্ব বৈষম্য দূর করে এক অভিন্ন বেতন স্কেলের দাবিতে শিক্ষকরা সোচ্চার হয়ে ওঠেন। এই ধর্মঘটের কারণে সরকারকে একবার এসএসসি পরীক্ষার তারিখ পিছিয়ে দিতে হয়। এই ধর্মঘটের ভিত্তি ছিল ৬টি জরুরি দাবি। এই দাবিগুলো আদায়ের পাশাপাশি সভা, সমাবেশ, পথসভা, বিক্ষোভ মিছিল, ঘেরাও প্রভৃতি কর্মসূচি সাফল্যের সঙ্গে পালিত হয় বৃহত্তর সিলেটে মরহুম আবদুন নূর চৌধুরীর দিকনির্দেশনায়। ওই ধর্মঘট বানচাল করার অপচেষ্টায় ছিল স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি। তখনই বৃহত্তর সিলেটে ধর্মঘট চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত হয় মরহুম আবদুন নূর চৌধুরীর সভাপতিত্বে কার্যনির্বাহী কমিটির অধিকাশ সদস্যদের মতামতের ভিত্তিতে। এক পর্যায়ে জাতীয়ভাবে বাংলাদেশ শিক্ষক সমিতি দুটি ভাগে বিভক্ত হয়েছিল। একটি ছিল কামরুজ্জামান হেনা দাশ গ্রæপ, অপরটি জয়নুল আবেদীন-মান্নান গ্রæপ। তখন ‘ঐক্যবদ্ধ’ সমিতি রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করেও তিনি বিফল হয়েছিলেন। সিলেট জেলার ৪টি প্রাক্তন মহকুমার শিক্ষকদের মতামতের ভিত্তিতে জয়নুল আবেদীন গ্রæপের সঙ্গে থেকে বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনার সিদ্ধান্ত হয়। শিক্ষকদের মধ্যে ভীতি বিভ্রান্তি অনৈক্য সত্তে¡ও বিভিন্ন সংগঠন ’৭৮, ’৭৯-তে যে আন্দোলনের বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করে, প্রত্যেকটি কর্মসূচি মরহুম আবদুন নূর চৌধুরীর নেতৃত্বে পালন করা হয়। এরশাদ সরকার ক্ষমতায় আসার পর ’৮৪ সালের ৮ নভেম্বর ঢাকায় এক বিশাল জাতীয় শিক্ষক সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। সেদিন জয়নুল গ্রæপ ও কামরুজ্জামান গ্রæপ শিক্ষকদের ন্যায্য দাবি আদায়ের লক্ষ্যে যৌথ কর্মসূচি পালনের উদ্যোগ নিলে জয়নুল গ্রæপের একজন প্রভাবশালী শিক্ষক নেতা হিসেবে যৌথ কর্মসূচি প্রণয়নে সদস্য হিসেবে আবদুন নূর চৌধুরীকে সমন্বয় পরিষদের সদস্য নির্বাচিত করা হয়। তখন থেকে তিনি একজন আপসহীন শিক্ষক হিসেবে পরিচিত লাভ করেন। ১৯৮৬ সালে যখন যৌথভাবে শিক্ষশকদের দাবি আদায়ের লক্ষ্যে উভয় গ্রæপ বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করে আসছিল তখন থেকে আবদুন নূর চৌধুরীকে জয়নুল গ্রæপের ভারপ্রাপ্ত সভাপতির দায়িত্ব পালনের ক্ষমতা জাতীয় কমিটি তার ওপর ক্ষমতা অর্পণ করে। এই সময় আমি আমার শ্রদ্ধেয় শিক্ষক নেতার একজন ঘনিষ্ঠ সহকর্মী হিসেবে কাজ করেছি এবং আন্দোলন পরিচালনার জন্য বিবিন্ন কর্মসূচি প্রণয়নের দায়িত্ব পালন করেছি। ১৯৮৬ সালের মার্চ মাসের প্রথম দিকে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে শিক্ষকদের সমাবেশ শেষে আন্দোলন পরিচালনা কর্মসূচি প্রণয়ন করে যখন তার এক নিকট আত্মীয়ের বাসায় যাওয়ার উদ্দেশে একত্রে রনু হই তখনই তাকে গ্রেফতার করা হয়। দীর্ঘ ১৫ দিন তিনি কারাবরণ করেছিলেন। শিক্ষকদের ন্যায্য দাবি আদায়ের জন্য তিনি তৎকালীন সরকারের সঙ্গে আপস করেননি। তাই তখনই তিনি একজন আপসহীন শিক্ষক নেতা হিসেবে শিক্ষক সমাজের কাছে পরিচিতি লাভ করেন। এক সময় আন্দোলনের কর্মসূচি হিসেবে এসএসসি পরীক্ষা প্রতিহত করার কর্মসূচি পালনের সিদ্ধান্ত থাকায় মৌলভীবাজার জেলায় কর্মসূচি পালনের সময় কমলগঞ্জ উপজেলার এসএসসি পরীক্ষা কেন্দ্রে আন্দোলনকারী শিক্ষক ও পুলিশ বাহিনীর মধ্যে সংঘর্ষে শমসেরনগর এএটিএম হাইস্কুলের ছাত্র মো. সামছু পুলিশের গুলিতে নিহত হয়। এ ব্যাপারে জনাব আবদুন নূর চৌধুরী সাহেব নানা প্রকার বুদ্ধি সাহস ও মামলাগুলো পরিচালনার জন্য একজন শিক্ষক নেতা হিসেবে সাহায্য ও সহযোগিতা করে আমাকে কৃতজ্ঞতার সূত্রে আবদ্ধ করেছেণ। এই ঋণ পরিশোধ করতে পারব না। শিক্ষক-শিক্ষিকাদের বেতন বৃদ্ধির আন্দোলন, বেসরকারি শিক্ষকদের অবসর সুবিধা বোর্ড প্রবর্তনে ১৯৯৪ সালে মৌলভীবাজারে যে শিক্ষক মহাসমাবেশে হয়েছিল তা সমর্থন করে দাবি বাস্তবায়নে যথাযথ কর্তৃপক্ষকে বোঝাতে সক্ষম হয়েছিলেন এই শিক্ষক নেতা আবদুন নূর চৌধুরী। শিক্ষককুলের আদর্শ এ মহান শিক্ষক নেতার জীবনাবসানে আমরা ব্যথিত। দেশ হারিয়েছে তার এক দেশপ্রেমিক সুসন্তানকে। আমরা হারিয়েছি আমাদের প্রিয় শিক্ষক নেতাকে। শিক্ষক ও সহকর্মীকে ঘিরে কিছু স্মৃতি ১৯৫৭ সাল। জানুয়ারি মাসের শেষ দিক। স্যারের সঙ্গে আমার প্রথম দেখা। ৭ম শ্রেণীতে ভর্তি হওয়ার সময়। সে সময় মৌখিক ভর্তি পরীক্ষা হতো। স্যার ক্লাস সিক্সের ইংরেজির ওপর অনেক প্রশ্ন করলেন। মাত্র ৪/৫টির সঠিক উত্তর দিলাম। সহ-পরীক্ষক মালেক স্যার (ক্রীড়া শিক্ষক), বেজায় খুশি। ভর্তি ফরমে মন্তব্য দিলেন অফসরঃ ঃযব নড়ু রহ ঃযব পষধংং ঠওওঅ. ভর্তি হয়ে গেলাম। ছাত্রজীবনে ও শিক্ষক জীবনে তার অফিসের বারান্দা অতিক্রম করিনি। এখনো চোখের সামনে ভাসে তিনি যেন অফিসে বসা। শিক্ষক জীবনে কোনো প্রয়োজনে কল দিলে অফিসে বসার সুযোগ লাভ করেছি। ১৯৫৮ সাল। তখন আমি সপ্তম শ্রেণীতে। স্যার এমএড করার জন্য দীর্ঘদিনের ছুটি নিয়ে সহ-প্রধান শিক্ষক বাবু অশ্বিনসী কুমার দেবের কাঁধে দায়িত্ব দিয়ে চলে যান। ১৯৫৯ সাল। জেনারেল আইয়ুব খান তখন পাকিস্তানের সিংহাসনে। স্যার এমএড সমাপ্ত করে স্কুলের কাজে যোগদান করেন। শুরু হলো উন্নয়নের পালা। এমএড থেকে এসেই বিদ্যালয়ে স্টুডেন্টস ইউনিয়ন সংগঠন করেন। পুকুরের উত্তর পাড়ে ৯ আসন বিশিষ্ট একটি হোস্টেল নির্মাণ করেন। বিদ্যালয় গঁষঃরষধঃবৎধষ স্কিমে ঢোকানোর চেষ্টা অব্যাহত রাখেন। ১৯৬০ সাল। আমি দশম শ্রেণীর ছাত্র। ৪ এপ্রিল তিনি বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। ওই সালের জুন-জুলাই মাসে ঊধংঃ চধশরংঃধহ ঊফঁপধঃরড়হ গঁষঃরষধঃবৎধষ স্কিমে বিদ্যালয় অন্তর্ভুক্ত হয়। ঞবহ ঈষধংং শেষ হলে মার্চ মাসে ম্যাট্রিক পরীক্ষা দিয়ে আমরা চলে আসি। এদিকে বিল্ডিং উন্নয়নের কাজ সবেমাত্র শুরু। প্রত্যেকটি বিল্ডিং স্যারের নিজস্ব পরিকল্পনায় নির্মিত। কেবলমাত্র উত্তরের ধানক্ষেতের ওপর বিল্ডিংটি ইঞ্জিনিয়ারিং নকশা অনুসারে নির্মিত। চারমুখী বিভাগ নিয়ে বিদ্যালয় যাত্রা শুরু করে-আর্টস, সায়েন্স, কমার্স ও এগ্রিকালচার। হবিগঞ্জে কোনো বিদ্যালয়ে অডিটোরিয়াম ছিল না। ১০০ আসন বিশিষ্ট অত্যাধুনিক অডিটোরিয়াম নির্মাণ করেন তিনি। এটা এখনো অত্যাধুনিক। এতে আছে গ্রিন রুম, বাথরুম, গেস্ট রুম, ড্রেসিং রুম, প্রমপ্ট রুম ও আধুনিক জিমন্যাস্টিক রুম। প্রত্যেক বিভাগের জন্য পৃথক পৃথক প্র্যাকটিক্যাল রুম। বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক নিয়োগ দেন তিনি। ছাত্রছাত্রী সংখ্যা ৮০০-তে উন্নীত হলো। ১৯৬০ সালে তিনি বৃক্ষরোপণ অভিযানকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন প্রজাতির বৃক্ষ দ্বারা স্কুলকে শোভিত করেন। তিনি একটি এগ্রিকালচারাল গার্ডেন তৈরি করেন ডেমোনেস্ট্রশনের জন্য। ১৯৬৫ সালে আমি গ্র্যাজুয়েশন নেই। সঙ্গে সঙ্গে মিরপুর হাইস্কুলে জয়েন করি। বিজ্ঞাপনে সাড়া দিয়ে ১৯৬৮ সালের আগস্ট মাসে শায়েস্তাগঞ্জ উচ্চ বিদ্যালয়ে স্যারের আহবানে যোগদান করি। স্যার বিদ্যালয়ের সার্বিক উন্নতির জন্য প্রতিদিন ছুটির পর সব স্টাফকে নিয়ে আলোচনায় বসতেন। বিদ্যালয়ের সমস্যা, ছাত্রছাত্রীদের সমস্যা, শিক্ষক সমস্যা নিয়ে আলাপ-আলোচনা হতো। যদি একজন কোনো সমাধানে ভিন্নমত পোষণ করতেন, তিনি সমাধানটি বাদ দিয়ে ভিন্নপথে সমাধান খুজতেন। সর্বসম্মতিতে সমাধান করতেন। এজন্য তিনি একচ্ছত্র অধিপতিদ হিসেবে আজীবন কাজ করে গেছেন। তা একটা বিশেষ বৈশিষ্ট্য ছিল, কারো সঙ্গে মতবিরোধ থাকলেও যদি ওই ব্যক্তি স্কুলে হোক কিংবা বাইরে হোক বিপাকে পড়তেন, তার সমূহ বিপদ স্যার আপন মাথায় তুলে নিতেন। ফলে বিপদগ্রস্ত লোকটি আজীবনের জন্য ভক্ত হয়ে যেত। এজন্যই তিনি অপরাজেয় জীবনভর। স্যার ছিলেন দক্ষিণ হবিগঞ্জের জন্য আদর্শ কোর্ট। দেওয়ানী ও ফৌজদারী যত মামলা-মোকদ্দমা হতো, সেগুলো আদালত স্যারের কাছে নিষ্পত্তির জন্য প্রেরণ করতেন। স্যার যথাবিহীত ট্রায়াল দিয়ে ওই সব মামলা-মোকদ্দমা নিষ্পত্তি করতেন। এ জন্য একটা আলাদা রেজিস্টার মেনটেন করতেন। করণীক জ্যোর্তিময় বাবু ছিলেন তার বিশ্বস্ত সহযোগী। তিনি গ্রামের সালিশ বিচারও করেছেন। এ জন্য গ্রাম্য মাতব্বর মুরুব্বিরাও স্যারের ভক্ত ছিলেন। ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ। সেদিন বেতনের তারিখ ছিল। সব শিক্ষক-কর্মচারী বিদ্যালয়ে হাজির। বেলা ৩/৪টার দিকে শোনা গেল পাঞ্জাবি নামে পরিচিত পাকিস্তান আর্মি স্টেশনে এসেছে। ইতোমধ্যে বেতন নেয়ার কাজ প্রায় শেষ। যার যার সুবিধা মতো সবাই স্কুল ত্যাগ করল। স্যারকে বললাম পরিবার নিয়ে সরে পড়–ন। তিনি রাজি হলেন না। আমি বাড়ি ফিরেই শায়েস্তাগঞ্জে গুলির শব্দ শুনলাম। অন্তত ২৫/২৬টি শব্দ হবে। পরে শুনলাম শায়েস্তাগঞ্জের ব্যবসায়ীদের রেলের পুলের (ব্রিজ) ওপর গুলি করেছে পাঞ্জাবিরা। ৪/৫ দিন আর বাড়ি থেকে বের হইনি। ১ মে শুনলাম, স্যার আমাদের চরহামুয়া গ্রামে তার ছাত্র আমার প্রতিবেশী হাবিবের বাড়িতে সপরিবারে আসছেন। খবর পেয়েই এক দৌড়ে স্যারের কাছে গেলাম। দেখলাম, ম্যাডাম এবং তার ছোট জা কালো বোরকা পড়ে একটা আমগাছের ছায়ায় বসা। স্যার তখন তার দুই ছেলে শোয়েব আর শাহেদকে নিয়ে পায়চারী করছেন। আমাকে দেখেই বললেন, ‘ওরা কিছু সঙ্গে আনেনি। ৩ টাকার বালুসাঁই সঙ্গে সাথী।’ হাবিবকে বললাম, অসূর্যস্পর্শা একজন মহিলা তোমার আমতলায়। খোদার কি মহিমা। সে জবাব দিল, কোনো চিন্তা করবেন না। এরা আমার ধর্ম পিতা-মাতা। আমি জীবিত থাকতে তাদের কোনো অমর্যাদা হবে না। হাবিবের বাংলা ঝেড়ে মুছে পরিষ্কার করে প্রথমত বসার জায়গা করা হলো। পরে ভেতর বাড়ির একটি ঘর স্যারের জন্য ছেড়ে দেয়া হয়। স্যার ডিসেম্বর পর্যন্ত সেখানে অবস্থান করেন। নিরস্ত্র গ্রামবাসীকে সামনে থেকে তিনি ব্যারিকেড সৃষ্টি করতে বারণ করেন। অন্যথায় গ্রামকে গ্রাম অগ্নিসংযোগ করে পুড়ে ছারখার করে দিতো পাকসেনারা। তিনি গ্রামের মুরুব্বিদের সঙ্গে যোগাযোগ করে গ্রাম্য বাজারগুলো দিনে দিনে শেষ করতে বলেন। জুন মাসে পাকসেনারা বলল, ‘স্কুল চালাও, সবকো পাত্তা লাগাউ।’ বাধ্য হয়ে শিক্ষকদের গোপনে সংবাদ দিলেন। আমরা যারা ছিলাম তারা লুঙ্গি পরে স্কুল যোগদান করি। ২/৩ ঘণ্টা পরিস্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজ করে যার যার বাগিঘরে চলে আসি। আমি আর স্যার একই পথে নিজ নিজ গন্তব্যস্থলে পৌছি। মাঝে মাঝে ইউসুফ হাবিলদার এসে বলতো, ‘উস্তাদজি তালিবান কা পাত্তা লাগাউ।’ স্যার বাধ্য হয়ে হ্যান্ডনোটের মাধ্যমে ছাত্রছাত্রীদের খবর দিলেন। আগস্ট মাসের গোড়ার দিকে কিছু কিছু ছাত্রছাত্রী স্কুলে আসতে শুরু করলো। এর আগে ২৭/২৮ এপ্রিল বিদ্যালয়ে ঢুকেই অফিস, আলমিরা, সব প্র্যাকটিক্যাল রুম, ল্যাবরেটরি রুম ভেঙ্গে চুরমার করে পেলে তারা। স্যারের গাভী তারা জবাই করে ফেলে। পর পর তিনটি গরু নিধন করে পাকসেনারা মৌজ করে। নভেম্বর মাসের শেষদিকে আমার সহ-শিক্ষক আফিল ভাই কাগজের ােড়ক আমার হাতে দিয়ে বলেন, কাল বিকালে বাড়ি যাওয়ার পথে খেলার মাঠে এটা পেয়েছি। দেখতো কোনো রেকর্ড কিনা। মোড়ক খুলে দেখি আমারই ডিগ্রি সার্টিফিকেট তিন টুকরো করে মুড়িয়ে ফেলা। আমি টুকরো তিনটি সযতেœ সংরক্ষণ করেছি। আগস্ট মাসে কমিটির সিদ্ধান্তে ৩০% বেতনের অংশ কাটা হয়। অবশ্য ১৯৭২ সালের মার্চ মাসে এককালীন সব রিকভার হয়। ১৯৮০-এর বগুড়া সম্মেলন : বগুড়ায় বাংলাদেশ শিক্ষক সমিতির (বাশিস) ত্রিবার্ষিক জাতীয় সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। মোট ৩৫ জন সিলেট থেকে সিলেকশন পাই। স্যার সম্মেলনের দুদিন আগে আমাদের সহকর্মী শিক্ষক নেতা নৃপেন্দ্র বাবুকে নিয়ে ঢাকায় চেেল গেলেন কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দের সঙ্গে যোগাযোগ করার জন্য। বলে গেলেন, বিদ্যালয় থেকে সিলেকশন নিয়ে একজন আসতে পারে। স্টাফ েেক সেই সিলেকশনটি লাভ করি। সম্মেলনের একদিন আগে রাত ৮টায় পাবনা-দৌলতদিয়াগামী লঞ্চের একটি টিকেট দিতে। সে বহুক্ষণ খাতা উলট-পালট করে অবশেষে বলল, বাশিসের সব নেতাদের মাঝখানে একটি সিট খালি আছে, সেটা আপনি নেবেন? আমি বললাম, ‘আলবত নেব।’ টিকেট সংগ্রহ করে হোটেলে ছুটলাম। সেখানে দোতলায় একটি ওয়ান সিটেড রুম ভাড়া করলাম। ফ্রেশ হয়ে বিছানায় দেহ রাখতেই স্যারের কণ্ঠ শুনতে পেলাম। এক দৌড়ে স্যারের রুমে ঢুকলাম। স্যার আমাকে দেখেই হাসতে হাসতে চিৎকার করে সিলেটের আঞ্চলিক ভাষায় বললেন, ‘তুমি আইলা কিলা।’ আমি বললাম, ইচ্ছা থাকলে উপায় হয়। তুমি টিকেট করেছো? সঙ্গে সঙ্গে টিকেটটি স্যারের হাতে দিলাম। উল্লাসে তিনি বলেন, তাহের আলী কেন্দ্রীয় নেতা হয়ে গেছে। সব নেতাদের মাঝখানে তার টিকেট। ‘ও নৃপেন্দ্র, তুমি কিলা করলায়।’ নৃপেন্দ্র বাবু জবাব দিলেন, আমি তো সর্বশেষ দুটি টিকেট নিয়েছি। এরপর তো টিকেট থাকার কথা নয়। আমি বললাম, ‘ও বেটারা আমার লাগি এক সিট আগে থেকেই রিজার্ভ রাখছে। আমি হোটেল বয়কে চা দেয়ার কথা বললাম। এ সময়ের আনন্দ আমার এখনো মনে পড়ে এবং একা একা হাসি। যাই হোক, আমার টিকেট এবং বেড স্যারকে দিয়ে স্যারের বেডে শুয়ে পড়লাম। সকাল ৬টায় লঞ্চে উঠে বসলাম। লঞ্চ পাবনা-দৌলতদিয়া ঘাটে পৌছল বিকাল ৫টায়। আমরা একটি ট্যাক্সি ভাড়া করে সম্মেলন কেন্দ্র সংলগ্ন হোটেল ছালেহীনাতে অবস্থান নিলাম। তখন রাত ৮টা। বগুড়ায় আমরা ১১ দিন থাকলাম। প্রথম মিটিংয়ে স্যারের নাম বাশিসের সভাপতি পদে প্রস্তাব আসল। প্রস্তাবটা প্রায় চূড়ান্ত। এমন সময় স্যার উঠে বক্তব্য দিলেন, সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক পদে ঢাকার কোনো লোক থাকা ভালো। মফস্বলের কোনো লোক দিয়ে বাশিস নিয়ন্ত্রণ ঠিক হবে না। অনেক তর্ক-বিতর্কের পর ঢাকার নবকুমার ইনস্টিটিউটের আবদুল মান্নান সাহেব সভাপতি ও বাড্ডা আলাতুন্নেসা স্কুলের আবদুল খালেক সাহেব সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। যাক রক্ষা পেল ধরা। অন্যথায় বাশিস খÐ-বিখÐ হয়ে যেত সে সময়েই। স্যারের এ উদ্যোগটা সর্বমহলে প্রশংসিত হলো। কারণ দু’জন দুই গ্রæপের হওয়ায় ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষা পেল। পরের দিন সহ-সভাপতি নির্বাচনের পালা। সিলেটের সবার মুখে শুনলাম, স্যার বিনা প্রতিদ্ব›িদ্বতায় বাশিসের সহ-সভাপতি হবেন। পরদিন ভোরে ব্রেকফাস্টের জন্য নিকটবর্তী হোটেলে ঢুকলাম। এমন সময় মৌলভীবাজারের খুরশেদ সাহেব ৮/১০ জনের টিম নিয়ে নাশতা করতে ঢুকলেন। নাশতা খেতে খেতে সহ-সভাপতি পদের জন্য নিজেকে দাঁড় করালেন। ৩/৪ জন সমর্থন দিল। বাকিরা সব নীরব। আমার অবস্থা আঁচ করতে আর বাকি রইল না। সঙ্গে সঙ্গে হোটোলে ফিরলাম। দেখি নৃপন্দ্রে বাবু এখনো ঘুমায়। স্যারকে ঘটনার বিবরণ দিলাম। কিছুক্ষণ নীরবে চিন্তা করলেন। তারপর উঠে চলে গেলেন। সিলেটের জায়গীরদার সাহেবকে দিয়ে সিলেটের সব শিক্ষকের একটা মিটিং ডাকলেন। স্যার আর নৃপেন্দ্র বাবা মিটিংয়ে অনুপস্থিত থাকলেন। জায়গীরদারের মিটিংয়ে অনেক বাদানুবাদের পর এক পর্যায়ে হাতাহাতি শুরু হলো। আমি তৎক্ষণাৎ স্যারের কাছে আসি এবং ঘটনা জানাই। সঙ্গে সঙ্গে স্যার অকুস্থলে পৌছান। স্যারের উপস্থিতিতে সবাই নীরব। তিনি বিষয়টি সুরাহা করেন। জায়গীরদার ও খুরশেদ সাহেবকে বুকে জড়িয়ে ধরেন। ঘটনার মীমাংসা করেন। বিকাল ৩টায় নির্বাচন হলো। সিলেটের কেউ স্যারের সঙ্গে প্রতিদ্ব›িদ্বতা করল না। স্যার সর্বসম্মতিতে বাশিসের কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতির পদ পেলেন। পরের দিন ভোরে সিলেটের সবাইকে রুটি-মাংসে আপ্যায়ন করলেন তিনি। স্যারের এক্সটেনশন : চাকরির মেয়াদান্তে স্যার এক্সটেনশনের জন্য আবেদন করলেন। ৮ জন সদস্য ভিন্নমত পোষণ করলেন। কমিটির চেয়ারম্যান সৈয়দ আহমদুল হক বললেন, আমি চেয়ারম্যান, স্কুল চালাই না। আপনারা সদস্যরাও স্কুল চালান না। স্টাফ রিপ্রেজেন্টেটিভ থাকতে আমরা এ রিস্ক কেন নেব? সবার দৃষ্টি দেখি আমার দিকে। আমি বক্তব্য দিলাম, এক কিলোমিটারব্যাপী এই স্কুলে স্যারের পরিশ্রমের ফসল। শায়েস্তাগঞ্জ হাইস্কুল বহমুখী, সমস্যাও বহুমুখী। ১ হাজার ২শ ছাত্রছাত্রী, শিক্ষক সংখ্যা ২২, মুখ (বিভাগ) ৪টা, ১৩টি সেকশনÑএকটা বিশাল স্কুল, বিরাট সমস্যা। সমস্যাসঙ্কুল স্কুলে স্যারই ফিট। তাকে এক্সটেনশন না দেয়ার কোনো প্রশ্নই আসতে পারে না। এছাড়া দক্ষিণ হবিগঞ্জের মাননীয় আদালতও তিনি। তাকে অসংকোচে এক্সটেনশন দেয়া হোক। উপজেলা চেয়ারম্যান এক্সটেনশন সিদ্ধান্তে সই করলেন। স্যার দুই বছরের এক্সটেনশন পেলেন। উপজেলাপ চেয়ারম্যান আমাকে বললেনÑগাড়িতে উঠুন। গাড়ি গেট পার হলে বলেন, আপনি আমাকে বিপদ থেকে উদ্ধার করেছেন। আপনাকে একা ফেলে যাই কোথায়। মিরপুর ঘুরে বাড়ি পৌছায়ে দেন তিনি। তখন রাত ১২টা। শিক্ষক জীবনে সর্বদাই বলতাম, ‘অং ও ধস হবরঃযবৎ ধ মড়ড়ফ ঃবধপযবৎ হড়ৎ ধ মড়ড়ফ ভধঃযবৎ’ স্যার শুনে শুধু হাসতেন। স্যারের বেলায় এ উক্তিটি ভিন্নভাবে প্রযোজ্য। ‘ঐব রং ধ মড়ড়ফ ধফসরহরংঃৎধঃড়ৎ ধং বিষষ ধং ধ মড়ড়ফ ঃবধপযবৎ ধষংড়’. স্যার তো পরের ছেলেমেয়েকে কোনো দিন ফাকি দেননি। এ জন্য তার প্রত্যেকটি সন্তান সুপ্রতিষ্ঠিত। ম্যাডাম সম্পর্কে কিছু বলতেই হয়। ১৯৬০ সালে আকিলা ম্যাডাম শায়েস্তাগঞ্জে আসেন। আমি ৫০ বছর যাবত স্যারের সঙ্গে জড়িত। প্রথমে ছাত্র, পরে শিক্ষকÑ অবসর জীবনে শুধু আমাকেই চিনতেন। এই দীর্ঘ সময়ে ম্যাডামকে কোনোদিন স্কুলের আঙ্গিনায়, পুকুরে, বাসায় চোখে পড়েনি। এমনকি ২২ জন শিক্ষক, ১২শ ছাত্রছাত্রী, অগণিত শিক্ষক স্যারের কাছে আসা-যাওয়া করত সমিতির কারণে। কেউ কখনো বলতে পারবে না তাকে দেখেছেন বলে। স্যারকে জিজ্ঞাসা করলাম ব্যাপারটা কি? স্যার বললেন, তোমার ম্যাডাম ফজরের নামাজের পর বিদ্যালয়ে যখন কেউ থাকে না, সে সময় বের হোন। একবার মজার ব্যাপার হলো। ২০০০ সালের দিকের ঘটনা। স্যারের পরামর্শেই আমার মেয়ে ডা. লাভলীর বিয়ে ঠিক করলাম। দাওয়াত নিয়ে বাসায় গেলাম। দরজা বন্ধ। কেউ নেই। কোনো কাজের লোকও নেই। অথচ বাইরে ভেজা কাপড় রোদে টানানো। ইতস্তত করে স্যারকে ডাকলাম। ভিতর থেকে জবাব এলো, স্যার সিলেটে। তুমি বস, আমি দরজা খুলছি। ধাক্কা দিতেই দরজা খুলে গেল। আমি সোফায় বসলাম। তুমি কি লাভলীর আব্বা? লাভলী নাকি বরিশালে থাকে, সে বাড়ি এলে আমাকে দেখে না কেন? আমি বিয়ের দাওয়াতনামাটি পর্দার ফাকে ম্যাডামের হাতে দিলাম। মুখে সব ঘটনা খুলে বললাম। তিনি বললেন, তুমি বসো, আমি চা করছি। অনীহা প্রকাশ করায় তিনি বললেন, তুমি কিছু না খেয়ে গেলে স্যার তোমার মেয়ের বিয়েতে যাবেন না। বাধ্য হয়ে বসলাম, চা নাশতা করলাম। এ সময়ও ম্যাডাম সামনে আসেননি। যা করেছেন পর্দার আড়াল থেকেই। বাড়ি পৌছে লাভলীকে পাঠালাম ম্যাডামকে সালাম করার জন্য। তিনি সত্যিকারের পর্দানশীল মহিলা। মহীয়সী নারী। তিনি ছিলেন বীর মাতা। আল্লাহ তার বেহেশত নসিব করুক। আর ডেডবডি যখন শায়েস্তাগঞ্জে পৌছল, দেখি লেনজাপাড়া, সুদিয়াখলা, দাউদনগর, বিরামচর, পুরান বাজার, উাহাটা, লস্করপুরের হাজারও মহিলা ম্যাডামকে শেষ শ্রদ্ধা জানাতে আসেন। এটা কি করে সম্ভব হলো? মানুষের শ্রদ্ধাবোধে যদি কোনো ফাঁকফোকর না থাকে তার বেলায় প্রযোজ্য এ বিরল ঘটনা। বাংলাদেশের আধুনিক মহিলারা যদি এই গুণের অধিকারিণী হতেন তবে সোনার বাংলা গড়তে সহজ হতো। সৎ সন্তানে সংসার ভর যেতো। স্যার এবং শায়েস্তাগঞ্জ : স্যার সম্ভবত ১৯৪৬ সালে শায়েস্তগঞ্জ হাইস্কুলে যোগদান করেন সায়েন্স টিচার হিসেবে। তখভন তিনি বিএসসি পাস করেননি। ১৯৪৯ সালে বিএসসি পাস করেন। সম্ভবত ১৯৫১ সালে স্ক্রিন অফ হলো। বিরোধের শিকার হন স্যার এবং শৈলেশ বাবু। ১৯৫৪ সালে আদালত কর্তৃক রি-ইনস্টিটিউট হয়। তখনকার প্রধান শিক্ষক বাবু মহেশ চক্রবর্তী ইন্ডিয়ায় চলে যান। স্কুলের প্রধান শিক্ষকের অভাব দেখা দিল। এক অরাজক পরিস্থিতি সৃষ্টি হলো স্কুল অ্যাডমিনিস্ট্রেশনে। ১৯৫৬ সালে সহ-প্রধান শিক্ষক ববু অশ্বিনী কুমার দেবকে ডিঙিয়ে স্কুল কমিটি স্যারকে প্রধান শিক্ষকের পদে উন্নীত করেন। শায়েস্তাগঞ্জের সঙ্গে নিবিড় সম্পর্ক শুরু হলো তার। স্যার না থাকলে শায়েস্তাগঞ্জ হাইস্কুলের উন্নয়ন হতো, তবে বর্তমান আঙ্গিকে নয়। ১৯৬১-৬৫ পর্যন্ত এ স্কুলের প্রভূত উন্নয়ন হয়। এক কিলোমিটারব্যাপী স্কুল পরিকল্পনা, আন্তর্জাতিক মানের খেলার মাঠ, মসজিদ পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন, হেড মাস্টার কোয়ার্টার নির্মাণ, পুকুর সংস্কার; প্রতিটি ইট পাথরের সঙ্গে স্যারের শ্রম জড়িত। এক কথায় শায়েস্তাগঞ্জের জন্য তেজোদীপ্ত সূর্যের ন্যায় কাজ করে গেছেন তিনি। প্রায় ৩৫ বছর প্রধান শিক্ষক ছিলেন। এই ৩৫ বছরে কত ওলট পালট হয়েছে; স্যার কিন্তু অপরাজেয় থেকেছেন। অবসর জীবনে বার্ধক্যজনিত কারণে বাকশক্তি ও স্মৃতিশক্তি কমে যায় স্যারের। তিনি স্কুলের মায়া ছাড়তে পারেননি। তাই স্কুলের পাশে বাড়ি করেছিলেন। ছুটির পর আমরা দলবেধে স্যারকে দেখার জন্য যেতাম। সবাই বলত, স্যার আমাকে চিনেছেন; কোনো শব্দ নেই। আমি বললে স্যার বলতেন, ‘তোমাকে চিনেছি, তুমি তাহের আলী।’ এ তো গভীর মমতারই প্রকাশ। স্যারের ডেডবডি আসার খবর পেয়ে ২০০৮ সালের ২১ সেপ্টেম্বর রমজান মাসে অগণিত লোক দিনভর রোদে অপেক্ষা করতে থাকেন স্যারকে শেষ শ্রদ্ধা জানানোর জন্য। ৫/৬ হাজার নারী-পুরুষ, অধিকাংশপ্রাক্তন ছাত্রছাত্রী। গ্রাম্য মাতবর, দিনমজুর, প্রশাসনিক আমলা, কত মানুষ স্যারকে শেষ শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করলেন তার ইয়ত্তা নাই। স্যার ছিলেন আদর্শ হেডমাস্টার, মানুষ গড়ার কারিগর। শায়েস্তাগঞ্জ উচ্চ বিদ্যালয় তারই স্মৃতি। তার আদর্শকে যতদিন শায়েস্তাগঞ্জ ধরে রাখবে ততদিনই মঙ্গল। তার আদর্শ চিরজাগরুক থাকুকÑএ কামনা করি। লেখক : সাবেক শিক্ষক ও ছাত্র শায়েস্তাগঞ্জ উচ্চ বিদ্যালয়। অ এৎবধঃ ঞবধপযবৎ রিঃয ারংরড়হ ধহফ সরংংরড়হ ওঃ’ং ঢ়ৎবারষরমব ঃড় বীঢ়ৎবংং সু ফববঢ় ৎবংঢ়বপঃ ধহফ মৎধঃরঃঁফব ঃড় সু নবষড়াবফ, ৎবংঢ়বপঃবফ ঃবধপযবৎ খধঃব গৎ. অনফঁহ ঘঁৎ ঈযড়ফিযঁৎু. ওঃ রং ধ সধঃঃবৎ ড়ভ ঢ়ৎরফব ধহফ মষড়ৎু ঃড় নব ধ ংঃঁফবহঃ ড়ভ ংঁপয ধ মৎবধঃ ঃবধপযবৎ. ঐধফ ঃযবৎব নববহ ড়হ অনফঁহ ঘঁৎ ঈযড়ফিযঁৎু, ও সরমযঃ হড়ঃ যধাব নববহ রহ ঃযরং ঢ়ড়ংরঃরড়হ যিবৎব ও ধস হড়.ি ও ধস বীঃৎবসবষু মষধফ ঃড় শহড়ি ঃযধঃ ধ ংযপড়ষধৎংযরঢ় রং মড়রহম ঃড় নব রহঃৎড়ফঁপবফ রহ যরং হধসব ধহফ ড়হ ঃযরং ড়পপধংরড়হ ধ ংাঁবহরৎ রং মড়রহম ঃড় নব ঢ়ঁনষরংযবফ. ও ধস ৎবধষষু ঢ়ৎড়ঁফ ড়ভ ঃযরং বভভড়ৎঃ. গৎ. অনফঁহ ঘঁৎ ঈযড়ফিযঁৎু, ধ ফবফরপধঃবফ ঃবধপযবৎ লড়রহবফ ঝযধরংঃধমধহল ঐরময ঝপযড়ড়ষ ধং ধ ংপরবহপব ঃবধপযবৎ রহ ১৯৪৬ ধহফ ংঢ়বহঃ ঃযব যিড়ষব ড়ভ যরং ষরভব ঃযবৎব, ঐব নবপধসব ঐবধফ গধংঃবৎ রহ ১৯৫৬ ধহফ ৎবঃরৎবফ ভৎড়স ঃযরং রহংঃরঃঁঃরড়হ রহ ১৯৯০. ও যধফ নববহ ধ ংঃঁফবহঃ ড়ভ ঝযধরংঃধমড়হম ঐরময ঝপযড়ড়ষ ভৎড়স ১৯৬৪-১৯৬৭. ও ঢ়ধংংবফ ঝ. ঝ. ঈ রহ ১৯৬৭ ধহফ ংঃড়ড়ফ ১২ঃয রহ ঈড়সরষষধ ইড়ধৎফ রহ ঐঁসধহরঃরবং. ওঃ রং ষধঃব গৎ. অনফঁহ ঘঁৎ ঈযড়ফিযঁৎু ধষড়হম রিঃয ড়ঃযবৎ ঃবধপযবৎং যিড় রং ঃড় নব মরাবহ পৎবফরঃ ভড়ৎ সু ংঁপপবংং. খধঃব গৎ. অনফঁহ ঘঁৎ ঈযড়ফিযঁৎু, ধ সধহ ড়ভ ংঃৎড়হম ঢ়বৎংড়হধষরঃু ধহফ রহঃবমৎরঃু ধিং ধ াবৎু মড়ড়ফ ধফসরহরংঃৎধঃড়ৎ. ঠবৎু ড়ভঃবহ যব ড়িঁষফ ধিষশ ধৎড়ঁহফ ঃযব ংপযড়ড়ষ পধসঢ়ঁং. ওঃ ংববসবফ ঃড় সব ঃযধঃ ঃযব ংঃঁফবহঃং, ঃযব ঃবধপযবৎং বাবহ ঃযব ঃৎববং ড়িঁষফ নড়ি ঃযবরৎ যবধফং রহ ৎবংঢ়বপঃ ঃড় যরস. ঊাবৎুঃযরহম ধিং রহ ড়ৎফবৎ ডব ঃযব ংঃঁফবহঃ ভবধৎবফ যরস নবপধঁংব ধঃ ঃযধঃ ঃরসব বি ফরফ হড়ঃ যধাব ঃযব ধনরষরঃু ঃড় ংরফপড়াবৎ ঃযব ংঃৎবধস ড়ভ ধভভবপঃরড়হ ভষড়রিহম রহ যরং যবধৎঃ ঁহফবৎ যরং মৎধহরঃব ষরশব পযধৎধপঃবৎ. গৎ. অনফঁহ ঘঁৎ ঈযড়ফিযঁৎু ড়িঁষফ ধষধিুং ংঢ়বধশ রহ ঃযব ফরষবপঃ ড়ভ ঝুষযবঃ. ঙহব ফধু যিবহ ও ধিং ধ ংঃঁফবহঃ ড়ভ পষধংং ওঢ যব যরসংবষভ পধষষবফ সব রহ যরং ড়ভভরপব. ওঃ ধিং য়ঁরঃব ঁহঁংধষ. ও ধিং ধভৎধরফ ধহফ রিঃয ভবধৎ ও বিহঃ ঃড় যরং ড়ভভরপব. ও ধিং ঃৎবসনষরহম. ঐব মধাব সব ধ ভড়ৎস, লঁংঃ ঃড় ভরষষ রঃ রহ ধহফ রঃ ধিং ধহ ধঢ়ঢ়ষরপধঃরড়হ ভৎড়স ভড়ৎ ংপযড়ষধৎংযরঢ়. অভঃবৎ ঃযব ঃবংঃ বীধস, গৎ. অনফঁহ ঘঁৎ ঈযড়ফিযঁৎু ড়িঁষফ ঃধশব ংড়বপরধষ পষধংং ড়ভ গধঃযবসধঃরপং ধহফ ঊহমষরংয ভড়ৎ ঃযব ঢ়ৎড়ংঢ়বপঃরাব ংঃঁফবহঃং যিড় বীঢ়বপঃবফ মড়ড়ফ ৎবধংঁষঃং. ডব ঢ়ধরফ হড়ঃযরহম বীঃৎধ. ঐব ফরফ রঃ ড়ভ যরং ড়হি ধপপড়ৎফ ভড়ৎ ঃযব ংধশব ড়ভ ঃযব রহঃবৎবংঃ ড়ভ ঃযব ংঃঁফবহঃং ধহফ ংপযড়ড়ষ. খধঃব গৎ. অনফঁহ ঘঁৎ ঈযড়ফিযঁৎু হড়ঁৎরংযবফ ঝযধরংঃধমড়হল ঐরময ঝপযড়ড়ষ ধং যরং ড়হি পযরষফ, ওঃ ধিং যরং ফৎবধস, ারংরড়হ ধহফ সরংংরড়হ. ও ধস ৎবধষু ঢ়ৎড়ঁফ ড়ভ নবরহম ধ ংঃঁফবহঃ ড়ভ ংঁপয, মৎবধঃ ঃবধপযবৎ, ধ মৎবধঃ সধহ. গধু অষষধয নষবংং যরস রিঃয বঃবৎহধষ ঢ়বধপব ধহফ ংধষাধঃরড়হ. ডৎরঃবৎ : চৎরহপরঢ়ধষ তধযঁৎ ঈযধহ ইরনর গড়যরষধ ঈড়ষষবমব ঠরপব-ঈযধরৎসধহ, ঐধনরমধহল ংধফধৎ টঢ়ধুরষধ চধৎরংযধফ ঋড়ৎসবৎ খবপঃঁৎবৎ ওহ ঊহমষরংয, ঘড়ঃৎব উধসব ঈড়ষষবমব, উযধশধ. আমাদের স্যার আমার কৈশোর জীবনের উত্তাপমাখা সময়ে তখনো নিজেকে শনাক্ত করতে পারিনি। ঠিক সে সময়ে একজন মানুষকে দেখছি একটি প্রতিষ্ঠানের মতো বিস্তৃত, স্বমহিমায় সমুজ্জ্বল। আমি আমার প্রয়াত শিক্ষক ‘হেড মাস্টার স্যার’, অর্থাৎ আবদুন নূর চৌধুরী সাহেবের কথা বলছি। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের তাল গাছ কবিতাখানি যখন পড়ি তখন খুব স্বতঃস্ফূর্তভাবে বলতে ইচ্ছা করে, আমার এ প্রিয় শ্রদ্ধেয় স্যারই ‘এক পায়ে দাঁড়িয়ে সব গাছ ছাড়িয়ে’ এখনো আমার মননে আমার বোধের সৃজনশীল অন্বেষণে বসবাস করছেন। আমরা যারা জীবনের মধ্যবয়সে দাঁড়িয়ে, ‘স্যার’ শিক্ষক বলতে যা অনুভব করি, এমন একজন সমুজ্জ্বল ব্যক্তিত্ব হিসেবে আমরা আমাদের স্যার আবদুন নূর চৌধুরী সাহেবকে পেয়েছিলাম। একজন মানুষ ক্রমশ বিকশিত হতে থাকেন তাঁর নীতিবোধ, তাঁর সততা, তার কর্মোদ্দীপনা, তার সৃষ্টিশীলতা দিয়ে, জীবনের সুস্থ সিদ্ধান্তে অটল থাকার কঠিন পরীক্ষার মধ্যদিয়ে। আমাদের হেড মাস্টার স্যার জীবনের চড়াই-উৎড়াইয়ের কঠিনতম পরীক্ষায় অবশ্যই উত্তীর্ণ হতে সক্ষম হয়েছিলেন। আজকের সমাজ বাস্তবতায় নির্লোভ জীবন যাপন করে লেখাপড়ার মাধ্যমে জীবনকে পরিপূর্ণ করে তুলতে মূল শিক্ষাট্ াতার কাছ থেকে আমি পেয়েছিলাম। আমার সারাটা জীবন তাই তাঁর কাছে ঋণী। এ ঋণ শোধ করার শক্তি, যোগ্যতা কোনোটাই আমার নেই। সুশৃংখল স্কুল প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা, শিক্ষকমন্ডলীকে নিয়মিত শিক্ষাদানে ব্যস্ত রাখা, ছাত্রদের নিয়মানুবর্তিতার কঠোর অনুশীলন এবং হৃদয়ভরা নিঃসীম ভালোবাস দিয়ে একটি পরিবারের মতো শায়েস্তাগঞ্জ হাইস্কুলকে তিনি গড়ে তুলেছিলেন। তার মৌন প্রশান্ত ব্যক্তিত্বের অনবদ্য স্পর্শে স্কুল প্রাঙ্গণ শিক্ষার্থীদের পদভারে কেমন যেন শান্ত মুখরতায় ভরে উঠতো। এ বিশাল ঈর্ষণীয় ব্যক্তিত্বকে নিয়ে লেখা যেমন কঠিন, তেমনি নিঃশব্দ আবেগ আমাকে প্রচÐভাবে তাড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে। কেবলই মনে পড়ে, এই তো সেদিন দীর্ঘদেহী আদর্শ মানুষটি স্কুলের লম্বা বারান্দা ধরে সামনের দিকে ঝুঁকে গভীর পদক্ষেপে এগিয়ে যাচ্ছেন ক্লাসরুম অথবা মাঠের দিকে। কখনো কখনো পায়চারী করছেন স্কুল প্রাঙ্গণে। আবার নিজের মৌনতা নিয়ে কি যেন খুঁজে বেড়িয়েছেন তন্ময় হয়ে। মানুষ আসে, মানুষ চলে যায়। কিন্তু তার কর্মের রূপময় অপরূপ চিহ্ন আমাদের নিয়ে যেতে থাকে অতীতের নস্টালজিয়ার বিস্তীর্ণ উপকূলে। যেখান থেকে নিজেকে উপলব্ধি করার শক্তি সঞ্চারিত হয়। এমনি একজন মানুষ আমাদের প্রিয় হেডমাস্টার স্যার। তার অমলিন কর্মযজ্ঞের স্মৃতি চিহৃ দ্বারা আমরা মুগ্ধ হই। আমরা হই উজ্জীবিত এবং খুঁজে পাই জীবনের অনাগত দিনের নির্দেশনা। লেখক : এসএসসি ১৯৭৬ (মানবিক) শায়েস্তাগঞ্জ বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয় আমার প্রিয় প্রাঙ্গন শায়েস্তাগঞ্জ বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ের একজন প্রাক্তন ছাত্রী আমি। আজ থেকে ৩৪ বছর আগে ১৯৭৫ সালে এ স্কুল থেকে এসএসসি পাস করে স্কুল ছেড়ে এমনকি শায়েস্তাগঞ্জ ছেড়ে চলে এসেছি। ৩৪ বছর পরেও এ স্কুল, এর শত সহ¯্র স্মৃতি আমার মনকে নাড়া দেয়, প্রবলভাবে অস্তিত্বে জানান দেয়। স্মৃতিকাতর, শোককাতর এ আমি আজ স্মরণ করছি বিনীত শ্রদ্ধায় আমার প্রিয় শিক্ষক, এ স্কুলের দীর্ঘদিনের প্রধান শিক্ষক মরহুম আবদুন নূর চৌধুরী স্যারকে। একদিন প্রথম আলো পত্রিকায় স্যারের মৃত্যু সংবাদটি পড়ি। আমি বেদনাহত হই। পত্রিকার রিপোর্টেই জানতে পারি স্যারের ছেলে জাহেদ চৌধুরী ‘আমার দেশ’ পত্রিকার রিপোর্টার। ঢাকায় থাকার সুবাদে তাকে খুঁজে পাই। জানতে পাই স্যারের শেষ ক’বছরের যাপিত জীবনের কথা। দুঃখ হয় ৩০ বছর ধরে ঢাকায় বসবাস করেও স্যারের সংবাদ নিতে না পারায়। তাই অপরাধবোধ আমাকে তাড়িয়ে নিয়ে বেড়ায় প্রতিনিয়ত। শায়েস্তাগঞ্জ বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয় আমর হৃদয়ে ছবির মতো গেঁথে রয়েছে। স্কুল এর সুপরিসর ক্লাস রুম, মাঠ যেন আমায় আজও ডাকে। ভাবি সেই সোনাঝরা দিনগুলোর মতো আজও যদি মাঠের ধুলোবালি অঙ্গে জড়িয়ে নিতে পারতাম। সেই সব প্রাচীন বয়সী বৃক্ষগুলো আজও হয়তো তেমনি করে স্কুলটিকে পরম মমতায় আগলে রেখেছে। আমার দূরন্ত শৈশবের কৈশোরের মধুরতম ৬টি বছর কেটেছে এ স্কুলে। স্মৃতিভরে তাই আমি বেদনাবিহŸল, আবার আনন্দে উদ্বেলও। মরহুম আবদুন নূর স্যারকে ১৯৭১ সাল থেকে ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত দেখেছি। তিনি ছিলেন অনুপম ব্যক্তিত্বের অধিকারী, স্বল্পভাষী কিন্তু স্পষ্টবাদী এক গম্ভীর প্রকৃতির লোক। টেস্ট পরীক্ষার পর যখন তিনি আমাদেরকে উচ্চতর গণিতের ক্লাস নিতে শুরু করেন তখন আমাদের প্রতি তার যে আন্তরিকতা ও মমত্ববোধের প্রকাশ দেখেছি তা তুলনাহীন। স্বল্পবাক, কঠিন, গম্ভীর, অপরিমেয় ব্যক্তিত্ববান এক শিক্ষকের ভেতরেও যে এক কোমল ¯েœহপরায়ণ মন বামস করে তার নিদর্শন তার মধ্যে আমরা তখন পেয়েছিলাম। কী মমতায়ই না তিনি কঠিন বিষয়টিকেও সহজবোধ্য করে দিতেন। বস্তুত আদর্শ শিক্ষকের এক অভ্যুজ্বল উদাহরণ তিনি। ভালো লাগছে জেনে স্যারেরই সুযোগ্য উত্তরাধিকারী তার সন্তানেরা স্যারের নামে এ স্কুলের ছাত্রছাত্রীদের মেধার স্বীকৃতি দানে এগিয়ে এসেছে। এ জন্য আমি এ স্কুলের প্রাক্তন ছাত্রছাত্রীদের পক্ষ থেকে তাদের অভিনন্দন জানাই, কৃতজ্ঞতা জানাই। স্যারের বিদেহী আত্মার চিরায়ত পারলৌীকক শান্তি কামনা করি। প্রসঙ্গত আমাদের প্রত্যাশা থাকবে, তাদেরই মতো অন্যরাও এমনি উদ্যোগ নিয়ে এগিয়ে আসবেন, শায়েস্তাগঞ্জ হাইস্কুলের সুনাম বৃদ্ধি করবেন। আজও আমার স্মরণের বীনায় ঝংকার তুলে এ স্কুলের আমার স্যারদের কথা। মনে পড়ে খালেক স্যার, ওমর আলী স্যার, সাইফুল ইসলাম স্যার, নৃপেন্দ্র স্যার, সফিউর রহমান স্যার, রঞ্জিত স্যারসহ আরও অনেক স্যারের কথা। আমার প্রিয় স্যারদের সবাইকে আজ এ সুযোগে শ্রদ্ধা জানাই। আর যারা মৃত্যুবরণ করেছেন তাদের প্রতি আমি আমার শ্রদ্ধা নিবেদন করছি, বিনয়াবনত চিত্তে স্মরণ করছি তাদের, তাদের বিদেহী আত্মার চিরায়ত শান্তি কামনা করছি। সকালের সোনাঝরা নরম রোদে, দুপুরের দাবদাহে পড়ন্ত বিকেলের মিঠে আর ফিকে আলোয়, ঘনঘোর বরিষায়, ষড়ঋতুর বৈচিত্র্য আমি আমার এ স্কুলকে অতি কাছে থেকে দেখেছি, আর এর বিচিত্র রূপে মুগ্ধ হয়েছি। সেই মুগ্ধতার আবেশ এখনো আমার কাটেনি। তাই শ্রদ্ধা জানাই এ স্কুল আর এর শিক্ষকদের প্রতি। সেদিনের সেই আমাদেরই বয়সী আজকের কিশোর-কিশোরীদের পদচারণায় এ স্কুল প্রাঙ্গন এখন মুখরিত। মহাকারে অমোঘ বিধানে এ ধারা চলমান থাকবে আবহমান কাল। এ স্কুলের বর্তমান ও ভবিষ্যতের ছাত্রছাত্রীদের ইতিহাস গড়বে-এ প্রত্যাশা অন্য সবার মতো আমারও। লেখিকা : ১৯৭৫ ব্যাচের ছাত্রী। আবদুন নূর চৌধুরী : একজন আদর্শ শিক্ষকের প্রতিকৃতি আলহাজ্ব আবদুন নূর চৌধুরী। বাংলাদেশের মাধ্যমিক পর্যায়ে শিক্ষাঙ্গনের পরিচিত নাম। ১৯৪৬ সালে শায়েস্তাগঞ্জ উচ্চ বিদ্যালয়ে যোগদানের মাধ্যমে তিনি শিক্ষকতার মহান পেশায় আত্মনিয়োগ করেন। ১৯৫৬ সালে তিনি প্রধান শিক্ষক হিসেবে পদোন্নতি লাভ করেন। সুদীর্ঘ ৩৫ বছর প্রধান শিক্ষক পদে অত্যন্ত সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেন। আলহাজ্ব আবদুন নূর চৌধুরী একাধারে ১৭ বছর বৃহত্তর সিলেট জেলার শিক্ষক সমিতির সভাপতি এবং ১৫ বছর বাংলাদেশ শিক্ষক সমিতির কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-সভাপতি ছিলেন। প্রায় ৫ বছর বাংলাদেশ শিক্ষক সমিতির কেন্দ্রীয় সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। একজন আদর্শ শিক্ষকের পথিকৃৎ আলহাজ্ব আবদুন নূর চৌধুরী। তিনি যখন শায়েস্তাগঞ্জ উচ্চ বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষকের দয়িত্ব পালন করেন তখন স্কুলের সার্বিক উন্নতি ও অগ্রগতি সাধিত হয়। স্কুলের পড়ালেখার সুষ্ঠু পরিবেশ সৃষ্টি করতে পেরেছিলেন তিনি। তার আমলে স্কুলের পরীক্ষার রেজাল্ট কুমিল্লা বোর্ডে ভালো অবস্থানে থাকতো। আবদুন নূর চৌধুরী আমার প্রিয় শিক্ষক। তিনি আমার শ্রদ্ধেয় মায়েরও শিক্ষক। যদিও আমি তার সরাসরি ছাত্র নই, তবে আমার পিতার সঙ্গে তার খুবই ভালো সম্পর্ক ছিল। সেই সুবাদে তার বাসায় আমার আসা-যাওয়া হতো। আবদুন নূর চৌধুরী আমাকে খুবই ¯েœহ করতেন। আমি তাকে কাছ থেকে দেখেছি। অবসর জীবনে প্রায় প্রতিদিনই বিকাল বেলা স্যারের বাসায় গিয়ে স্যারের সঙ্গে কথা হতো। আমি তাকে দেখেছি একজন আদর্শ, সত্যনিষ্ঠ, অমায়িক, ধার্মিক ব্যক্তি হিসেবে। তিনি স্কুলের ছাত্রছাত্রীদের যেমন প্রিয় শিক্ষক ছিলেন, তেমনি শাসন করার ক্ষেত্রে ছিলেন আপসহীন। আবদুন নূর চৌধুরীর হাতে গড়া ছাত্রছাত্রী বাংলাদেশ জাতীয় সংসদ থেকে শুরু করে ইউনিয়ন পর্যন্ত প্রতিটি স্তরেই রয়েছে। বাংলাদেশ সুপ্রিমকোর্টের সাবেক প্রধান বিচারপতি সৈয়দ জে আর মোদাচ্ছির হোসেনও আবদুন নূর চৌধুরীর ছাত্র। আলহাজ্ব আবদুন নূর চৌধুরী যখন বাংলাদেশ শিক্ষক সমিতির সভাপতি ছিলেন তখন শিক্ষক সাজের ন্যায্য অধিকার আদায়ে তিনি অনবদ্য ভূমিকা পালন করেন। তাই বাংলাদেশ শিক্ষক সমিতি আজীবন তাকে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করবে। ১৯৮৬ সালে শিক্ষকদের ন্যায্য দাবি আদায় করার জন্য কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে সমাবেশ করে ফেরার পথে সরকার ওনাকে গ্রেফতার করে। আলহাজ্ব আবদুন নূর চৌধুরী সেন্টজন্স এম্বুলেন্সের প্রাথমিক চিকিৎসা বিধানে সিভিল ডিফেন্স লোকেল ইন্সট্রাক্টর হিসেবে এবং জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। তিনি বিভিন্নভাবে প্রায় এক যুগ বাংলাদেশ স্কাউট আন্দোলনের সাথে সংশ্লিষ্ট ছিলেন। বিভাগীয় ও কেন্দ্রীয় কাউন্সিলের সদস্য ছিলেন এবং স্কাউট আন্দোলনে অবদানের জন্য ১৯৮৮ সালে তিনি বাংলাদেশ স্কাউট থেকে সম্মানসূচক প্রশংসাপত্র লাভ করেন। আবদুন নূর চৌধুরী মাধ্যমিক শিক্ষা সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে বিশেষ অবদানের জন্য ১৯৭৮ সালে শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে সম্মাননাপত্র লাভ করেন। ১৯৮৬ সালে হবিগঞ্জ সদর উপজেলার শ্রেষ্ঠ শিক্ষানুরাগী নির্বাচিত হন। এছাড়া প্রবাসী বাংলাদেশীদের সংগঠন বাংলাদেশ ন্যাশনাল স্টুডেন্টস অ্যাওয়ার্ডের পক্ষ থেকে পল্লী অঞ্চলে শিক্ষা উন্নয়নে বাস্তবমুখী পদক্ষেপ নেয়ার জন্য ১৯৯০ সালে তিনি ‘পল্লী রতœ’ উপাধি পান। ২০০৩ সালে শায়েস্তাগঞ্জ সাহিত্য ও সংস্কৃতি পরিষদ থেকে শিক্ষা ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদানের জন্য তিনি গুণীজন পদকে ভূষিত হন। আদর্শ শিক্ষক আলহাজ্ব আবদুন নূর চৌধুরী শিক্ষকতার পাশাপাশি শায়েস্তাগঞ্জে বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তিনি শায়েস্তাগঞ্জ ডিগ্রি কলেজ প্রতিষ্ঠা কমিটির অন্যতম সদস্য এবং ৫ বছর এর প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি এক যুগ কলেজের গভর্নিং বডির সদস্য ছিলেন। তিনি শায়েস্তাগঞ্জ সিনিয়র মাদ্রাসার উন্নয়ন কমিটির সদস্য এবং গভর্নিং বোর্ডের সহ-সভাপতি হিসেবে সুদীর্ঘ ২২ বছর কাজ করেছেন। শায়েস্তাগঞ্জ পুরান াজার জামে মসজিদের কার্যকরি কমিটি এবং শায়েস্তাগঞ্জ সমাজ কল্যাণ সোসাইটির সভাপতি এবং শায়েস্তাগঞ্জ সাহ্যি ও সংস্কৃতি পরিষদের উপদেষ্টা ছিলেন। আলহাজ্ব আবদুন নূর চৌধুরী ১৯২৬ সালে সিলেটের জকিগঞ্জের নূরনগর গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা মোদাচ্ছির আলী চৌধুরী এবং মা জোবেদা খাতুন চৌধুরী। তিনি জকিগঞ্জের নূরনগরে প্রাথমিক শিক্ষা সমাপ্ত এবং প্রথমে কানাইঘাট উচ্চ বিদ্যালয় এবং পরে সরকারি পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেন। ১৯৪৩ সালে তিনি প্রথম বিভাগে ম্যাট্রিক পাস করেন। ১৯৪৫ সালে সিলেট এমসি কলেজ থেকে প্রথম শ্রেণীতে উচ্চ মাধ্যমিক পাস এবং ১৯৪৭ সালে একই কলেজ থেকে ডিগ্রি পাস করেন। ১৯৬৩ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব এডুকেশন রিসার্চ সেন্টার থেকে কৃতিত্বের সঙ্গে এমএড পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। আলহাজ্ব আবদুন নূর চৌধুরী ব্যক্তিগত জীবনে খুবই ধার্মিক এবং একজন আলোকিত মানুষ। ২০০৮ সালের ২১ সেপ্টেম্বর তিনি পরলোক গমন করেন। তার সন্তানরা স্ব স্ব ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত। তারা কর্মজীবনে পিতার আদর্শ অনুসরণ করছেন। লেখক : সাধারণ সম্পাদক, হবিগঞ্জ নাগরিক কমিটি আকিলা নূর ফাউন্ডেশনের বৃত্তিপ্রাপ্ত বিভিন্ন ক্লাসের ছাত্রছাত্রীদের নাম-পরিচয় ৭ম শ্রেণী প্রথম স্থান : মাহমুদুল হাসান রিফাত, পিতা মো. সিরাজুল ইসলাম, মাতা, কুহিনূর বেগম, গ্রাম দ. লেজাপাড়া, পো. শায়েস্তাগঞ্জ, জেলা, হবিগঞ্জ। দ্বিতীয় স্থান : মো. মশিউর রহমান, পিতা এখলাছুর রহমান, মাতা, ডা. মমতাজ বেগম, গ্রাম. কুটিরগাঁও, পো. রামশ্রী, জেলা, হবিগঞ্জ। তৃতীয় স্থান : সোহাগ হোসাইন, পিতা. আ: আজিজ, মাতা, রুনু আক্তার, গ্রাম উবাহাটা, পো. শায়েস্তাগঞ্জ, জেলা, হবিগঞ্জ। ৮ম শ্রেণী প্রথম স্থান : সুলতানা আক্তার, পিতা, মো. আবদুল গনি, মাতা-রূপচাঁন বিবি, গ্রাম-উবাহাটা, পো. শায়েস্তাগঞ্জ, জেলা, হবিগঞ্জ। দ্বিতীয় স্থান : সুনন্দা রানী দাস, পিতা, বিজয় আনন্দ দাস, মাতা, দুর্গা রানী দাস, গ্রাম, সাবাসপুর, পো. শায়েস্তাগঞ্জ, জেলা, হবিগঞ্জ। তৃতীয় স্থান : আয়েশা সিদ্দিকা, পিতা, আবদুল গফফার, মাতা, জেসমিন নাহার,গ্রাম, লেনজাপাড়া, পো. শায়েস্তাগঞ্জ, জেলা, হবিগঞ্জ। নবম শ্রেণী প্রথম স্থান : রওশন আরা তৃপ্তি, পিতা-ফজলুল হক, মাতা-গোলশান আরা, গ্রাম-লেনজাপাড়া, ওয়ার্ড নং ৬, শায়েস্তাগঞ্জ পৌরসভা, পো. শায়েস্তাগঞ্জ, জেলা, হবিগঞ্জ। দ্বিতীয় স্থান : মো, তামীম আহমেদ, পিতা আকরাম গাজী, মাতা, সীমা বেগ, গ্রাম দক্ষিণ লেনজাপাড়া, পো. শায়েস্তাগঞ্জ, জেলা, হবিগঞ্জ। তৃতীয় স্থান : সুজন রায়, পিতা শংকর রায়, মাতা অঞ্জলী রায়, গ্রাম পূর্ব লেনজাপাড়া, পো. শায়েস্তাগঞ্জ, জেলা, হবিগঞ্জ। দশম শ্রেণী : বিজ্ঞান বিভাগে প্রথম স্থান : জাহিদ হাসান টিপু, পিতা-মো. হোসেন ভূইয়া, মাতা-সালমা বেগম, গ্রাম-পীর কাশিমপুর, পো. পীর কাশিমপুর, জেলা-কুমিল্লা। ব্যবসায় শাখায় প্রথম স্থান : মো. আজিজুল ইসলাম নাসির, পিতা-আলাই মিয়া, মাতা-রওশন আরা বেগম, গ্রাম-দক্ষিণ লেনজাপাড়া, পো. শায়েস্তাগঞ্জ, জেলা, হবিগঞ্জ। মানবিক বিভাগে প্রথম স্থান : মো. পারভেজ আলী, পিতা-মোহাম্মদ আলী, মাতা-রোকেয়া বেগম, গ্রাম-প্রতাবী, পো. কুলাউড়া, জেলা-মৌলভীবাজার। কালের আহাজারি ১০ মে সকাল পৌনে দশটায় পলিনের ফোন। ফোন রিসিভ করার ইচ্ছা এবং সামর্থ্য আমার কোনোটাই ছিল না। শরীর তখনো জ্বরে কাঁপছে। সারারাতের জ্বরে নিজের নামশুদ্ধ সব ভুলে গেছি। কিন্তু পলিনের ফোন সাথে সাথে রিসিভ না করলে এর কঠিন কৈফিয়ত দিতে হবে। ওর বাজে বাজে মন্তব্য গাধার ভালো শরীরেও জ্বর এসে যায় এ অবস্থা। তাই প্রথমে ওকে আমার জ্বরের কথা বললা। তারপর জানতে পারলাম চৌধুরী আসছে। তৌহিদ চৌধুরী। যার সাথে ’৯৮-এর পর মাত্র একবার দেখা হয়েছিল। দীর্ঘদিনের বিলেতি জীবনে সে আমার ডাকে সাড়া দিয়ে সুদূর বিলেত থেকে এসেছিল। বিলেতে যাওয়ার আগে যেস বাংলাদেশ পাবলিক সার্ভিস কমিশনের পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে গিয়েছিল। আর এতে তার চাকরি হয়েীছল সহকারী পুলিশ সুপারের। বন্ধুরা সবাই কি দারুণ খুশি। আমাদের মধ্যে সবচেয়ে লিকলিকে ও ছোটখাটো গড়নের বন্ধুটাই কিনা পেল বাংলাদেশের মানুষের রাজা পুলিশের চাকরি। কিন্তু সে এই চাকরি করবে কিনা ঠিক নেই। সালেহীনের নেতৃত্বে আমরা সবাই মিলে একই চিঠিতে মতামত লিখললাম প্রায় কুড়িজনে। তখনই আমাদের ডাকে তার বাংলাদেশে আসা এবং দেখা। এরপর থেকে াঝে মধ্যে ফোনে কথাবার্তা হয় পিএইচডি শেষ করে কোনো কিছু করার জন্যও স্থায়ীভাবে দেশে চলে আসবে শুনে কখনো ভালো লাগে, আবার কখনো খুব খারাপ লাগে। মন কিছুতেই মানছিল না, তাই জ্বর নিয়েও গেলাম প্লাটফর্মে। সেখানে আরো অপেক্ষা করছিল মামুন, মালেক, হারুন, পলিন, আহাদসহ আরো অনেকে। পলিনের কাছ থেকে চৌধুরীর দেশে ফেরা এবং শায়েস্তাগঞ্জে আসার কারণ জানলাম। একই সঙ্গে তার পিতা ও শিক্ষক শায়েস্তাগঞ্জ উচ্চ বিদ্যালরে সাবেক প্রধান শিক্ষক তথা একদঞ্চলের শিক্ষক প্রাণপুরুষ ও সমাজপিতা জনাব মরহুম আবদুন নূর চৌধুরী ও মাতা আকিলা খানম চৌধুরীর সুযোগ্য উত্তরসূরি দ্বারা গঠিত আকিলা-নূর ফাউন্ডেশনের শুভযাত্রা ঘোষণা ও বৃত্তি প্রদানের জন্য তার এই আসা। নিভে যাওয়া প্রদীপ আর কে জ্বালাবে সন্তান ছাড়া। হ্যাঁ, হাজার হাজার সন্তান যার রয়েছে তার প্রদীপ তো একবার না একবার জ্বলবেই। কেউ না কেউ সলতে, তেল, আর আলোর উৎস নিয়ে এসে সমন্বয়ের হাত বাড়াবেই। স্মৃতির কালোমেঘ মুহূর্তের মধ্যে নের পুরো আকাশ ছেয়ে গেল। বৈশাখের রোদে পোড়া চারদিক, তবও তাকালাম দূর দিগন্তে। চোখ কতদূর দেখতে পারে? দৃষ্টি কত দূর গিয়ে আবার ফিরে আসে? মনের তুলনায় খুবই কম। একজন আবদুন নূর চৌধুরী শায়েস্তাগঞ্জের এই বিশাল জনপদের বিপুল জনগোষ্ঠীর সমাজপিতার পাশাপাশি শিক্ষক ১৯৪৬ থেকে ১৯৫০ এবং ১৯৫৬ সাল থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করেন দীর্ঘ ৩৪ বছর। ক্ষণজন্মা ও কালজয়ী এ সমাজপিতা, যার হাত দিয়ে প্রতিষ্ঠা পেয়েছেন। বিচারপতি থেকে ডাক্তার প্রকৌশলীসহ শত সহ¯্র সমাজ ধারক, শিক্ষক, তিনি কেন কালের তোড়ে ভেসে যাবেন। তার সৃষ্টির প্রায় অর্ধশতাব্দী সময় কি এতোই নগন্য? কখনো না। এখানে ছিল শুধু একটা শুভ সময় ও সূচনার অভাব মাত্র। আমার জানামতে ইতোপূর্বে শায়েস্তাগঞ্জ সুশীল সমাজে আবদুন নূর চৌধুরীর নামে একটা ট্রাস্ট গঠনের কথা আলোচনা হয়েছে। আলোচনায় এসেছে শায়েস্তাগঞ্জ উচ্চ বিদ্যালয়ে প্রবেশের মূল রাস্তাটি স্যারের নামে নামকরণের। এই ঋণ যে অর্ধশতাব্দীর, শায়েস্তাগঞ্জের পুরো জনগোষ্ঠীর তাহলে এর কিঞ্চিৎ হলেও কেউ না কেউ শোধরাবেই। ট্রেন প্রায় দেড় ঘন্টা দেরিতে এসে পৌছলো প্লাটফর্মে। এদিক-ওদিক আমরা সবাই তাকালাম চৌধুরীকে খুজতে। হঠাৎ পশ্চিম দিক তাকাতেই দেখতে পেলাম কাদে ল্যাপটপের ভারি ব্যাগসহ ল্যান্সঅলা চশমা পরা একজন পরিপুষ্ট ভদ্রলোককে। ভালোভাবে তাকিয়ে নিশ্চিত হলাম। হ্যাঁ, চৌধুরীই তো। হায় সময়! কত দ্রæত বদলায়। কত কি যে কেড়ে নিয়ে যায়, আবার অনেক কিছুই ফেলে রেখেও চলে যায়। সবাই এগুলাম তার দিকে। কাছে যেতে যেতেই আমার জ্বরে তাপিত শরীর শিউরে উঠলো। ভেতরে ভেতরে স্যারের দানদীক্ষার স্মৃতি আর বাইরে এ কোন চিত্র। তৌহিদের চোখের চশমা ঠিক যেখানে থাকার সেখানে নেই। চোখ থেকে একটু ফাঁক হয়ে চশমা নিচের দিকে ঝুলে আছে। এ দৃশ্যটা অনেক ক্ষেত্রেই বেশ রোমান্টিক হয়ে থাকে। কিন্তু আমার কাছে কেন যেন খুব পুরনে কোনো স্মৃতি আর কঠিন কোনো ভয়ের মিশ্র অনুভূতিতে মিশে গিয়ে তালগোল পাক খাচ্ছিল। তৌহিদের সাথে সবার তো আমারও করমর্দন হলো, ভাব ও কুশল বিনিময় হল। সিএনজি চেপে সবাই আমাদের গন্তব্য রওনা হলাম। কিন্তু আমার এই অনুভূতির যেন শেষ হলো না। সিএনজি এসে শায়েস্তাগঞ্জ উচ্চ বিদ্যালয়ের মূল গেটে থামল। তৌহিদের স্কুলে আসার বিষয়টা যেহেতু পূর্বপরিকল্পিত সেহেতু স্কুলের হেড স্যারসহ আরো অনেকেই রাস্তা পর্যন্ত এগিয়ে এলেন। সবাই গিয়ে বসলাম অফিসে। তৌহিদের এই অর্ধব্যবৃহত চশমা ফাঁকের ঘোর তখনও কাটছিল না। আমি পুরো স্কুলটা দেখলাম। এই সেই পুরনো কারখানা যেখানে আবদুন নূর চৌধুরী নামের একজন দক্ষ কারিগর অত্যন্ত কৌশল ও সফলতার সঙ্গে, বিশেষ করে মধ্যবিত্ত, নি¤œ মধ্যবিত্ত ও নি¤œমধ্যবিত্ত পরিবারের শতসহ¯্র উপাদান ও উপাখ্যানের জন্ম দিয়েছিলেন। বিদ্যালয়, মাঠ, ছাত্রছাত্রী, শিক্ষক সব কিছুই ঠিকই আছে কিন্তু কোথায় যেন এর প্রাণচাঞ্চল্যতার স্ফলন ঘটে গেছে। আবদুন নূর চৌধুরীর শায়েস্তাগঞ্জ উচ্চ বিদ্যালয় আর আজকের শায়েস্তাগঞ্জ উচ্চ বিদ্যালয় এই দুইয়ের মাঝে যেন বিস্তর ফারাক বিরাজ করছে। ছাত্র এবং ছাত্রীরা আলাদা ক্লাস করছে। আমি মনে মনে ভাবলাম ঘরের ভেতরে দয়াল। কই তখন তো এই দেয়ালের প্রয়োজন ছিল না। মুহূর্তের মধ্যে আমার শরীর শিউরে উঠল। তৌহিদের চশমার ফাক করে পরার দৃশ্যের সাদৃশ্য আমার কাছে স্পষ্ট হয়ে উঠতে লাগল। তখন ১৯৮৮ ইংরেজি সাল। (এখানে একটা কথা বলা দরকার, আমি শায়েস্তাগঞ্জ উচ্চ বিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলাম না। আমি সুকরিপাড়া উচ্চ বিদ্যালয়ের ছাত্র হলেও বরাবরই প্রথম হওয়ার সুবাদে, সাজেশন্স, নোট ও প্রাইভেট পড়াজনিত কারণে সেখানকার অনেক ছাত্রের সঙ্গে তখন থেকেই ভাব ও বন্ধুত্ব ছিল)। আমি মাত্র ক্লাস নাইনের ছাত্র তখন। এলাকায় তখন শায়েস্তাগঞ্জ হাইস্কুল ও স্কুলের হেড মাস্টারের সুনাম তুঙ্গে। তাই শায়েস্তাগঞ্জ স্কুল ও স্কুলের হেড মাস্টারকে দেখার কৌতুহল াামার অনেকদিনের। সময় ও সুযোগে একদিন চলে গেলাম সেখানে। ক্লাস তখনো শুরু হয়নি। কেবল এসেম্বলি শেষ হয়েছে। কি জাকজমক অবস্থা। পূর্ব পরিচিত আমার এক সহপাঠী হাত উচিয়ে সুন্দরমত চশমাঅলা লোককে দেখিয়ে বললো, ওি দেখ আবদুন নূর চৌধুরী। তিনিই হেডমাস্টার। ততক্ষণে আমার মনে হয়েছিল তিনি আমার দিকেই রওনা করে দিয়েছিলেন। হাতে একটা বেত আর চোখে ঝুলানোমতো চশমা। এক ভয়াবহ অবস্থা। ঠিক আকেই অবস্থায় ামি তাকে আরো অনেকবার দেখেছি। আমার তখনো মনে হতো তিনি যেন চশমা দিয়ে না দেখে চশমার ফাক দিয়ে পুরে স্কুলটি এবং স্কুলের প্রত্যেকটি ছাত্রছাত্রীকে দৃষ্টির নিয়ন্ত্রণে রাখছেন। এ দৃষ্টি এড়ায় সাধ্য কার। মনের ভেতরে এতোক্ষণ ধরে যে একটা বোধ আমাকে অবচেতনভাবে নিয়ে গিয়েছিল ১৯৮৮ কিংবা এরই ধারে কাছে, আমার কাছে তার জট খুলে গেল মুহূর্তের মধ্যে। আমি প্লাটফর্মে বন্ধুবর তৌহিদের চোখ ও চশমার যে অবস্থা দেখেছিলাম সেই অবস্থা আমাকে ফিরিয়ে নিয়ে গিয়েছিল অন্য এটি কালের গহŸরে। যে কালে একজন আবদুন নূর চৌধুরীর ফাঁক করে চশমা পরার ভয়াবহ দৃশ্য সর্বদা সচেষ্ট থাকতো কেবল একজনকে গড়ার জন্যই। তখন ছাত্রছাত্রীদের দীক্ষা নেয়ার একটা প্রবল ঝোক থাকতো। আজকাল যেন কেমন হয়ে গেছে ছাত্র, শিক্ষক অভিভাবক সবাই। না, আমি কেন বেত ব্যবহার করতে যাবো? বেত দিয়েকি আর শেখানো যায়? কিংবা কখনো আমার সন্তানের গায়ে বেত দেবেন না, বেত দেখলে তার মনে ভীতি প্রবেশ করে ফেলবে। তখন আর কোনোদিন আমার বাচ্চা স্কুলের নামও মুখে নেবে না। মানুষ সৃষ্টির শুরু থেকেই শৃংখলা নিয়ন্ত্রণ প্রিয়। প্রত্যেক ধর্মেও নিয়ন্ত্রণ এবং শৃংখলা সম্পর্কে নির্দেশ দেয়া আছে। অর আজকাল সর্বত্র স্বাধীনতা, স্বাধীনতা একটা অতিরিক্ত ভাব ও ভণিতার আশ্রয়। বিশেষ করে ছাত্রছাত্রীদের বেলায় অভিভাবক, ছাত্র, শিক্ষকের এ মনোবৃত্তিই আমার মনে হজয় একজন আবদুন নূর চৌধুরীর সময় এবকং কাল থেকে আমরা বিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছি। (সরি! আমি কাউকে, কোনো প্রতিষ্ঠানকে দোষারাপ করছি না। এমনকি আমার প্রাণের বিদ্যাপীঠ এবং আমার অতীব প্রিয় হেডমাস্টার স্যারকে আমার পিতার আসনের একপাশে আজও ভক্তি করি) আমি শুধু মরহুম সমাজপতি আবদুন নূর চৌধুরীর সময়কাল এবং আমাদের এখানকার সময়কালের ঘাটতি এবং এর কারণ নিয়ে আক্ষেপ করছি। আমরা কি সামনে চলতে চলতে আমাদের অভিষ্ট লক্ষ্য থেকে আরো পেছনে সরে যাচ্ছি? তা না হলে...? বিশেষ করে শায়েস্তাগঞ্জ উচ্চ বিদ্যালয় ও আমাদের এতদঞ্চলের সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, শিক্ষক ও অভিভাবকবৃন্দের কানে বাজছে আজ সময়ের আহাজারি, আজ খুবই প্রয়োজন আর একজন আবদুন নূর চৌধুরী। পরিশেষে আকিলা-নূর ফাউন্ডেশনের যাত্রা শুরুর শুভক্ষণে আজ নূর দম্পতির আত্মার মাগফেরাত কামনা করছি। ঘুমাও পিতা শান্তিতে, কেবল জেগে থাকুক তোমার আদর্শ ও কীর্তি। লেখক : প্রিন্সিপাল, স্কুল হলি দেশ মা মাগো অনেক কিছুই তো শেখা হলো না তোমার কাছ থেকে। সময় পড়ে আছে ভেবে শুনিনি তোমার কথা কিছুই। মনে ছিল না সময়ের নিয়ন্তা তো আমি নই। নীতি নৈতিকতা আর সাহস, সে তো তোমার কাছ থেকেই পাওয়া। নিতে চাইনি কিছুই, তাও তো তুমি দিয়ে গেছ অনেক কিছুই। তাহলে তুমি কি জানতে চলে যাবে এ তো দ্রæত। ২৪ ফেব্রæয়ারি ২০০৬, সেদিনও তোমার হাতে খাবার তুলে দিয়ে বলেছিলাম নাও আব্বার জন্য। কখনো মনে হয়নি বলি ‘মা এটি তোমার জন্য’ বা একটিবার বলি মা তোমাকে অনেক ভালোবাসি। তুমি তো আছই বা তুমি তো করেই যাবে আমাদের জন্য। আাদের করা না করার তোমার কি আসে যায়। মাঝে মাঝে মনে হয় তুমি হয়তো ছিলে কোনো বিশেষ প্রকৃতির মানুষ বা অতিমানব। না হলে কীভাবে সম্ভব ছিল এতো কিছু এক হাতে সামাল দেয়া। তাহাজ্জদের নামাজ থেকে শুরু করে ইসরাক, চাশতÑকত নামাজই না তুমি পড়তে, সব কিছু সেরে ঘড়ি কাটা ১২টায় গেলে ডায়রিতে আব্বার অসুস্থতা, ওষুধ, ডাক্তার ছেলেমেয়ে, নাতি-নাতনির ফোন, সুস্থতা সব হিসাব মিলিয়েই তুমি ঘুমাতে যেতে। তাহলে তুমি কি ঘুমিয়ে সময় নষ্ট করতে না? তোমার মন কত জায়গায় চলে যায়। (সব ছেলেমেয়ের কথা মনে পড়ে)। তুমি শুনলে খুশি হবে তোমার ছেলেমেয়েরা কেউ অন্যর সম্পদে লোভ করে নাÑ অবৈধ সম্পদ অর্জন করে না। আরো জেনে খুশি হবে, আব্বার প্রতি আমরা কোনো অবহেলা করিনিÑতোমার সন্তান না আমরা। মাগো একটিবার চুপি চুপি এসে বলে যাও, তুমি কোথায় আছ? তুমি ছেলেমেয়ের গায়ে হাত তুলতে না, তুমি বা আব্বা কখনো আমা গায়ে স্পর্শ পর্যন্ত করনি কখনো। কেন মা কেন? অথবা লিখিয়ে দিয়ে যাও তোমার সন্তান আর আত্মীয়স্বজনের সাথে সম্পর্কের এই কৌশল। খুব মনে পড়ে ছোটবেলায় অসুস্থ হলে, জ্বর হলে রাত জেগে মাথায় পানি ঢালার কথাÑক্লান্তিহীন, নিদ্রাহীন তুমি। আত্মীয়স্বজন বেড়াতে এলে হয়ে যেত উৎসব। ২ দিনের জন্য এলেও নানা ধরনের পিঠা আর মাছ ধরা সে তো ছিল কমন। সঙ্গে ভোর বেলা উঠে রেললাইন ধরে হাটা, নদীর পাড়ে হাটতে যাওয়া, শীতের সকালে কুয়াশায় হেটে হেটে আখ মাড়াই দেখতে যাওয়াÑএগুলো ছিল সকলের জন্য করণীয়। আরেকটা কথা মা, তোমার রান্না তো আমাকে একদম লিখে দিয়ে যাওনি-ভুল বললাম, আমি লিখিনি, ভেবেছি এতো যতœ, এতো সময় এতে শুধু কষ্টই বাড়ে-আর তুমি তো আছই। কোথাও খুজে পাই না তোমার রান্নার স্বাদ। তুমি কাদেরকে লেখাপড়ার জন্য সাহায্য করতে, কিছুই তো আমাদের বলে যাওনি-তোমার সবই কি ছিল নীরবে? হজরত মোহাম্মদ (সা.) বাণী উদ্ধৃত করে তুমি বলতে ডান হাত দান করলে, যেন বাম হাত টের না পায়। মা গো মনে পড়ে অবৈধ উপার্জন যারা করে তাদের বাড়ি গেলে তুমি নাস্তা খেতে না। বাসায় এসে আমরা তোমাকে নিয়ে কি হাসাহাসিই না করতাম। এখন বুঝতে পারি কত বড় মেসেজ তুমি আমাদেরকে দিয়ে গেছ মা। আব্বাকে দেখেছি সারা জীবন তোমাকে সম্মান করতে। যে আব্বাকে তুমি খাইয়ে দিতেÑ সেই আব্বাকে দেখলাম তোমার অনুপস্থিতিতে অনেক শক্ত। নিজের হাতেই খাচ্ছেন। বলেছেন তুমি কোথায় আছ। ধৈর্য, সাহসিকতা, সততা, ন্যায়পরায়ণতা, ধর্মভীরু, উদার, দানশীলতা, অসম্ভব ¯েœহপরায়ণ, কর্মঠ, দায়িত্ববান, নিষ্ঠাবান, অন্যায়ের বিরুদ্ধে কঠোর ও আপসহীন এক অসম্ভব গুণি মায়ের সন্তান আমরা। আমরা তোমার গঠিত সন্তান। তোমার চিরবিদায়ের ঠিক ১৩ দিন আগের কথা বলছি মা। ২৭ মে ফেব্রæয়ারি ২০০৬ সকাল বেলা ফজরের নামাজের পর তুমি প্রচÐ পেট ব্যথায় কাতরাচ্ছ। তোমাকে দেখে আমি রুমে আসতেই আমারও প্রচÐ ব্যথা। প্রথমে আমি তোমাকে বলিনি পরে খুব খারাপ লাগছে বলে তোমার কাছে যেতেই তুমি লাফ দিয়ে বিছানা থেকে আমার পেট ম্যাসাজ করে দিলে। তোমার ব্যথার কথা তুমি একদম ভুলে গেলে। আমি অবাক হয়ে দেখলাম নিমিষেই আমর ব্যথা কমে গেছে। এ কোন জাদু মা। আমাকে কি একটু শিখিয়ে দেবে না? পত্রিকার খবরের কোনো ফলোআপ পড়া না হলেও জানতাম সমস্যা হবে না, আম্মার কাছ থেকে জেনে নেব। বাসার বাইরে গিয়ে দেরি হলেই এসে শুনতাম তুমি ফোন করেছিলে? ১২ মার্চ ২০০৬-এর পর তুমি আর কোনোদিন খোজ করনিÑকরবে না জানি। অন্তত একদিন একটিবার এসে বলে যাও। তুমি কোথায় আছ? কেমন আছ মা? লেখিকা : মরহুম আবদুন নূর চৌধুরী ও মরহুম আকিলা খান চৌধুরীর একমাত্র কন্যা এবং সহযোগী অধ্যাপিকা, লালমাটিয়া কলেজ, ঢাকা।

Comments

Comments!

 AmarbangladeshonlineAmarbangladeshonline | Amarbangladeshonline

Monday, November 6, 2017 1:41 pm

আকিলা-নূর ফাউন্ডেশন
মরহুম আবদুন নূর চৌধুরী ও মরহুমা আকিলা খানম চৌধুরীর স্মৃতি রক্ষার্থে তাদের সন্তানদের উদ্যোগে ২০০৮ সালের সেপ্টেম্বর মাসে আকিলা নূর ফাউন্ডেশন গঠিত হয়। এই ফাউন্ডেশনের অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য হলো মেধাবী শিক্ষার্থীদের শিক্ষালাভে উদ্বুদ্ধ এবং বিভিন্ন সমাজসেবামূলক কাজ করা। স্কুলপড়–য়া শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় উদ্বুদ্ধ করার লক্ষ্যে ২০০৯ সালের ১২ মার্চ মরহুমা আকিলা খানম চৌধুরীর বাল্যশিক্ষা প্রতিষ্ঠান সিলেটের বিয়ানীবাজার উপজেলার জমসেদ আহমদ উচ্চ বিদ্যালয়ে সপ্তম থেকে দশম শ্রেণীতে যারা প্রথম থেকে তৃতীয় স্থান অধিকার করে তাদের বৃত্তি প্রদান করা হয়। এবার বৃত্তি দেয়া হচ্ছে শায়েস্তাগঞ্জ উচ্চ বিদ্যালয়ে। এ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ১৯৪৮ থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত শিক্ষকতায় সম্পৃক্ত ছিলেন মরহুম আবদুন নূর চৌধুরী। এই ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে এখন থেকে প্রতি বছর এ দুটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে মেধাবী ছাত্রছাত্রীদের বৃত্তি প্রদানের পাশাপাশি অন্যান্য সমাজসেবামূলক কাজ চালানোর প্রত্যাশা রয়েছে।
সম্পাদনা : জাহেদ চৌধুরী, সাজেদা চৌধুরী সাজু, তৌহিদ চৌধুরী
প্রচ্ছদ ও অলঙ্করণ : মুকুল রেজা
কৃতজ্ঞতা স্বীকার : শায়েস্তাগঞ্জ উচ্চ বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ, শায়েস্তাগঞ্জ পৌরসভা, শায়েস্তাগঞ্জ প্রেসক্লাব, দেশ নাট্যগোষ্ঠী
প্রকাশকাল : ১১ জুন ২০০৯ইং
দ্রষ্টব্য : যেকোনো তথ্যগত সংশোধনী সাদরে গ্রহণ করা হবে।

বাণী ও কিছু স্মৃতি
বিচারপতি সৈয়দ জে আর মোদাচ্ছির হোসেন
আমার শ্রদ্ধাভাজন শিক্ষক ও আব্বার বন্ধু-সহকর্মী, যাকে আমরা আমাদের পরিবারেরই একজন মনে করতাম, মরহুম আবদুন নূর চৌধুরী ও তার স্ত্রী মিসেস আকিলা খানম চৌধুরী স্মরণে গঠিত আকিলা-নূর স্মৃতি ফাউন্ডেশনের উদ্যোগকে শুরুতেই আমি স্বাগত জানাই। এই ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে শায়েস্তাগঞ্জ উচ্চ বিদ্যালয়ের মেধাবী ছাত্রছাত্রীদের বৃত্তি প্রদান করা হচ্ছে। নিঃসন্দেহে এটি একটি মহতি উদ্যোগ। ’৪৮ সালে আমরা যখন শায়েস্তাগঞ্জ স্কুলে ভর্তি হই তখন স্কুলে তৃতীয় থেকে দশম শ্রেণী পর্যন্ত ছিল। ’৪৮ সালে ভর্তি হয়ে ম্যাট্রিক পরীক্ষা দেই ’৫৬ সালে। আমরা যখন ভর্তি হই তখন মরহুম আবদুন নূর চৌধুরী বিজ্ঞান বিষয়ের শিক্ষকছিলেন। যে বছর বের হলাম সে বছরই তিনি প্রধান শিক্ষক নিযুক্ত হন।
শায়েস্তাগঞ্জ স্কুলের অনতিদূরে লস্করপুরে আমাদের বাড়ি। স্কুলের প্রতিষ্ঠাতাদের অন্যতম একজন ছিলেন আমার দাদা সৈয়দ আবদুল মোতাকাব্বির আবুল হাসান। তিনি আমৃত্যু স্কুলের গভর্নিং বডির সেক্রেটারি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এলাকার তখন প্রতাপশালী জমিদার নবীন বাবু স্কুলে বেশ জায়গা-জমি দান করেছিলেন। জমিদার ছেলে সুরেশ বাবু স্কুলের শিক্ষক ও আমারও শিক্ষক ছিলেন। আমার পিতা সৈয়দ মুমিদুল হোসেনও শায়েস্তাগঞ্জ স্কুলে শিক্ষকতার পাশাপাশি নানাভাবে এর উন্নয়নে ব্যাপক ভূমিকা রেখেছেন। আমার চাচা সাবেক প্রধান বিচারপতি সৈয়দত এবি মাহমুদ হোসেনও শায়েস্তাগঞ্জ বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেছেন।
মরহুম আবদুন নূর চৌধুরী ছিলেন একজন সৎ, যোগ্য, দক্ষ, কর্মনিষ্ঠ মানুষ। শায়েস্তাগঞ্জ স্কুল প্রতিষ্ঠা লাভ করেছে মূলত তার হাত দিয়ে। তিনি আমার আব্বার সঙ্গে সব সময় বুদ্ধি পরামর্শ করতেন কীভাবে স্কুলের উন্নতি করা যায়, তা নিয়ে। আমরা প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর আমাদের সঙ্গে ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্ক কখনো এতটুকুও নষ্ট হয়নি। উভয় পরিবারের সামাজিক অনুষ্ঠানাদিতে সব সময় আমাদের যাতায়াত ছিল। তিনি যখনই স্কুল, কলেজ কিংবা শিক্ষক সমিতির কাজে ঢাকায় আসতেন আমার বাসায় একবার হলেও আসার চেষ্টা করতেন। একবার শায়েস্তাগঞ্জ কলেজের অধ্যক্ষ জনাব ফজলুল হককে সঙ্গে নিয়ে আব্বার একটি চিঠিসহ আমার বাসায় এসে হাজির। কলেজ তখন কেবল নতুন হয়েছে। প্রায় ২ বছর বয়স। স্যার আমাকে বললেন, সরকারের তৎকালীন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি উপদেষ্টা, বুয়েটের সাবেক ভিসি (হবিগঞ্জের চুনারুঘাটে বাড়ি) ড. এমএ রশিদের কাছে আব্বার চিঠি নিয়ে যেতে হবে। সঙ্গে কলেজের সরকারি অনুমোদনের আবেদন। তিনজন মিলে গেলাম। আমি তখন সহকারী এটর্নি জেনারেল। ড. রশিদ চিঠি পড়ে আমাদের বললেন, আমি তো শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে নেই। বললাম, শিক্ষা উপদেষ্টাকে বলে দেন। শিক্ষা উপদেষ্টা আবুল ফজলকে ফোন করলে তিনি বললেন, পরদিন তিনি পাকিস্তান যাচ্ছেন। আমরা বললাম, পাকিস্তান রওনা হওয়ার আগেই সাক্ষাত করতে চাই। কলেজের অনুমোদনের দরখাস্তে ড. রশিদের জোর সুপারিশসহ পর দিন ভোরবেলা বেবিট্যাক্সি করে শিক্ষা উপদেষ্টার বাড়িতে গিয়ে তিনজন হাজির। আবুল ফজল সাহেব অনুমোদন দেয়ার কথা লিখে দিলেন। সুপারিশসহ দরখাস্ত নিয়ে ছুটে গেলাম শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা নুরুল সাফা সাহেবের কাছে। তিনি দু’দিন আগেও অবহেলায় দরখাস্তটি ফিরিয়ে দিয়েছিলেন। দু’দিন পর শিক্ষা উপদেষ্টা ‘আদেশ’ সংবলিত দরখাস্ত ফিরিয়ে দিতে পারলেন না। অনুমোদনের প্রস্তাব আনুষ্ঠানিকভাবে পরে পর্যায়ক্রমে হয়েছে।
এভাবে শায়েস্তাগঞ্জ কলেজ প্রতিষ্ঠায় মরহুম আবদুন নূর চৌধুরীকে নিবেদিত হয়ে কাজ করতে দেখেছি। তার ভালোমন্দে আমি যেমন আনন্দিত হতাম, তেমনি তিনিও উৎফুল্ল হতেন আমার যে কোনো প্রমোমন বা সুখবরে। আমার ডাকনাম শাহজাহান। সে নামেই ডাকতেন তিনি। আমি যখন সুপ্রিমকোর্টের হাইকোর্ট বিভাগে বিচারক হিসেবে নিয়োগ পেলাম তখন আমাকে লেটার অব ফেলিসিটেশন পাঠিয়েছিলেন তিনি। আমি যখন প্রধান বিচারপতি হই, তখন স্যার পুরো ‘কনসাস’ ছিলেন না; থাকলে হয়তো তখনো পাঠাতেন। স্যারের স্ত্রী মিসেস আকিলা খানম চৌধুরী যাকে চাচী ডাকতাম, আমাদের খুবই ¯েœহ করতেন। ২০০৬ সালের কথা, আমি তখন প্রধান বিচারপতি। আমার স্যারের স্ত্রীর মৃত্যুর খবর পেয়ে তার ছেলে জাহেদের ঢাকার বাসায় ছুটে গিয়েছিলাম, স্যারও ছিলেন সেখানে। দেখা হলো স্যারের সঙ্গে। কিন্তু তখন তার স্মরণশক্তি অনেকটাই লোপ পেয়ে গেছে। স্যারের সঙ্গে আমার সেটাই ছিল শেষ দেখা।
আজকের এই বিশেষ মুহূর্তে তাদের দুজনের আত্মার মাগফিরাত কামনা করছি। আল্লাহ তাদের বেহেশত নছিব করুন। তাদের সন্তানরা স্মৃতিরক্ষার্থে যে উদ্যোগ নিয়েছে সর্বাঙ্গে তা সফলতা লাভ করুক। একই সঙ্গে আমি শাস্তেয়াগঞ্জ বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ের সকল শিক্ষক, ছাত্রছাত্রী ও অভিভাবকদের সুস্থ ও সুন্দর জীবন কামনা করছি।
আল্লাহ সকলের সহায় হোন।

শুভেচ্ছা কথা
আমি জেনে অত্যন্ত আনন্দিত যে, অনেক পরে হলেও একজন সমাজপিতা, মানুষ গড়ার কারিগর, শায়েস্তাগঞ্জ উচ্চ বিদ্যালয়ের সাবেক প্রধান শিক্ষক মরহুম আবদুন নূর চৌধুরীর নামে একটি ট্রাস্ট গঠন করা হয়েছে এবং ওই ট্রাস্টের শুভযাত্রা শুরু হতে যাচ্ছে তারই প্রাণপ্রিয় প্রতিষ্ঠান, যেখানে থেকে তার শিক্ষকতা জীবন শুরু থেকে শেষও করেছিলেন, সেই শায়েস্তাগঞ্জ উচ্চ বিদ্যালয়ের মেধাবী ছাত্রছাত্রীদের বৃত্তি প্রদানের মাধ্যমে। এটা খুবই স্বাভাবিক, কোনো ভালো কথা, ভালো বাণী কিংবা একজন সুযোগ্য পিতা, একজন সুযোগ্য সমাজ সংস্কারকের স্মৃতি কখনো বিলীন হতে পারে না। কেউ না কেউ তাকে লালন বা রক্ষা করতে ইগয়ে আসবেনই। আকিলা নূর ফাউন্ডেশনের এ উদ্যোগ ও তাদর বৃত্তি প্রদানের মতো কর্মকাÐ নিঃসন্দেহে কালজয়ী এ মহান মানুষ মরহুম আবদুন নূর চৌধুরীকে নিয়ে যাবে কাল থেকে কালান্তর অভিমুখে। পরিশেষে এ মহান শিক্ষাগুরু ও তার পতœী আত্মাদ্বয়ের মাগফেরাত কামনা করছি।
সৈয়দ আহমদুল হক
উপজেলা চেয়ারম্যান
হবিগঞ্জ, সদর।

শুভেচ্ছা কথা
আমি এটা জেনে অত্যন্ত আনন্দিত যে আমাদের অত্যন্ত প্রিয় ও শ্রদ্ধাভাজন শিক্ষক, শায়েস্তাগঞ্জ উচ্চ বিদ্যালয়ের সাবেক প্রধান শিক্ষক মরহুম জনাব আবদুন নূর চৌধুরী ও তার স্ত্রী শ্রদ্ধেয়া মরহুমা আকিলা খানম চৌধুরীর নামে একটি ফাউন্ডেশন গঠিত হয়েছে। এই ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে শায়েস্তাগঞ্জ উচ্চ বিদ্যালয়ের মেধাবী ছাত্রছাত্রীদের বৃত্তি প্রদানের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে।
এ মহান শিক্ষক আমাদের ছেড়ে চলে গেলেও তার স্মৃতি আমাদের মধ্যে সব সময় অমলিন হয়ে থাকবে। আমাদের বর্তমান ও ভবিষ্যত প্রজন্ম, যারা এই প্রিয় শিক্ষকের সান্নিধ্য পায়নি তাদেরকে শিক্ষাদীক্ষায় উৎসাহিত করতে এই ফাউন্ডেশন ব্যাপক ভূমিকা রাখবে বলে আমি মনে করি।
আমরা শায়েস্তাগঞ্জবাসী কখনো এ মহান শিক্ষকের অবদান ভুলতে পারব না।
আমি এ মহতী উদ্যোগের সাফল্য কামনা করছি এবং এর সাথে সংশ্লিষ্ট সকলকে ধন্যবাদ জানাচ্ছি।
এমএফ রহমান (ওলি)
মেয়র, শায়েস্তাগঞ্জ পৌরসভা
হবিগঞ্জ।

স্মৃতিতে আবদুন নূর চৌধুরী

আকিলা খানম চৌধুরী
মরহুম আবদুন নূর চৌধুরী ছিলেন শায়েস্তাগঞ্জ হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষক। তিনি এক মহান ব্যক্তিত্ব। তাকে যদি শুধু প্রধান শিক্ষক বলি ভুল হবে। তিনি ছিলেন অনেক হাইস্কুলের শিক্ষক ও প্রধান শিক্ষকের শিক্ষক। বিশেষ করে হবিগঞ্জ এলাকার এমন কোনো স্কুল নেই যে স্কুলে তার ছাত্র প্রধান শিক্ষক বা শিক্ষক হিসেবে নিয়োজিত নেই। বিভিন্ন স্কুলের প্রধান শিক্ষকরা নানাবিধ সমস্যা নিয়ে তার কাছে ছুটে আসতেন যা তিনি অভিভাবক হিসেবে দায়িত্ব মনে করে সুষ্ঠু সমাধান দিতেন। এসব আমি নিজ চোখে দেখেছি।
তিনি ১৯২৬ সালের ১ মার্চ সিলেট জেলার জকিগঞ্জ উপজেলার নূরনগর গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম মরহুম মোদাচ্ছির আলী চৌধুরী এবং মাতার নাম জোবেদা খাতুন চৌধুরী। তিনি স্থানীয় নূরনগর প্রাথমিক বিদ্যালয়ে এবং পরবর্তীতে কানাইঘাট এমই স্কুল থেকে প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণ করেন। পরে তিনি সিলেট সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে ভর্তি হন। খুবই মেধাবী ছাত্র ছিলেন তিনি। পুলিশের সাবেক আইজি ও পূবালী ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান মরহুম ই এ চৌধুরী, বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক মরহুম ড. আখলাকুর রহমান প্রমখ তার ক্লাসমেট ছিলেন। তাদের এই তিনজনের মধ্যে ক্লাসে প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতয়ি অবস্থান থাকতো। ১৯৪৩ সালে এন্ট্রান্স (ম্যাট্রিক) পরীক্ষায় তিনি তিনটি লেটার নিয়ে প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হন এবং ১৯৪৫ সালে সিলেটের ঐতিহ্যবাহী সরকারি এমসি কলেজ থেকে প্রথম বিভাগে ইন্টারমিডিয়েট পাস করেন। একই কলেজে পদার্থ বিজ্ঞানে অনার্সে ভর্তি হলেও ছাত্র আন্দোলনে জড়িয়ে পড়া ও নানা কারণে সেটা বাধাগ্রস্ত হয়। ছাত্র জীবনে তিনি অল আসাম মুসলিম স্টুডেন্ট ফেডারেশনের সেক্রেটারি ছিলেন। এই সংগঠনের সভাপতি ছিলেন সাবেক প্রধান নির্বাচন কমিশনার বিচারপতি এটিএম মসউদ। সিলেটকে ভারতের পরিবর্তে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের সঙ্গে রাখা এবং দেশ বিভাগ আন্দোলনে সক্রিয় ছিলেন বিধায় আবদুন নূর চৌধুরীকে হুলিয়া মাথায় নিয়ে বিভিন্ন এলাকায় আত্মগোপন করতে হয়। প্রথম দিকে তিনি বারহাল ইয়াহিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ে কিছুদিন বিজ্ঞান শিক্ষক হিসেবে কাজ করেন। পরে গ্রেফতার এড়িয়ে তিনি শায়েস্তাগঞ্জ হাইস্কুলে ১৯৪৬ সালে বিজ্ঞান বিষয়ের শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন। স্কুলে থাকাবস্থায়ই তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে বিএসসি ডিগ্রি লাভ করেন। আবদুন নূর চৌধুরী যখন শায়েস্তাগঞ্জ স্কুলে যোগদান করেন তখন স্কুলের প্রধান শিক্ষক ছিলেন মহেশ চক্রবর্তী। পরবর্তীতে এক পর্যায়ে স্কুলের তদানীন্তন প্রধান শিক্ষক মরহুম আবদু হেকিম ঠাকুরের বিভিন্ন কর্মকাÐের প্রতিবাদে স্কুল ত্যাগ করে আইনশাস্ত্রে ঢাকা সেন্ট্রাল ‘ল কলেজে লেখাপড়া শুরু করেন আবদুন নূর চৌধুরী। এলএলবি প্রথম পর্ব পরীক্ষা দিলেও সমাপনী পরীক্ষা না দিয়েই এক পর্যায়ে এলাকার ছাত্র-শিক্ষক ও অভিভাবকদের চাপে ১৯৫৪ সালে আবার তিনি শায়েস্তাগঞ্জ স্কুলে ফিরে যান এবং ১৯৫৬ সালে প্রধান শিক্ষকের দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। পরবর্তীতে ¯œাতক ডিগ্রি লাভ করেন। তিনি ১৯৫৭ সালে বিএন এবং ১৯৫৯ সালে এমএড ডিগ্রি লাভ করেন।
আমি আবদুন নূর চৌধুরীর ছাত্র এবং তিনি আমার ভগ্নিপতি। তিনি ১৯৬০ সালের ৪ এপ্রিল আমার বোন আকিলা খানম চৌধুরীর সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। তখন আমি ৫ম শ্রেণীর ছাত্র। দুলাভাই তারা ৪ ভাই, তিন বোন ছিলেন। সবার বড় ভাই মোহাম্মদ আলী চৌধুরী পুলিশ বাহিনীতে, দ্বিতীয় নিজে, তৃতীয় ভাই আবদুস শুকুর চৌধুরী নৌবাহিনীতে এবং সবার ছোট ভাই ডাক্তার এ মালিক চৌধুরী আর্মির ডাক্তার ছিলেন।
বিয়ের পর আমার বোনই আমাকে ছোটবেলায় লালন পালন করেছেন এবং অত্যন্ত ¯েœহ করতেন। আমার বোনের জন্ম ১৯৪০ সালে সিলেটের বিয়ানীবাজার উপজেলার চারখাই ইউনিয়নের নাটেশ্বর গ্রামে। পিতার নাম মরহুম ছওয়াব আলী চৌধুরী ও মাতা জেবুন্নেসা চৌধুরী। তখনকার স্থানীয় বিষ্ণুপ্রিয়া এমই স্কুল ও বর্তমান জমসেদ আহমদ হাইস্কুলে আমার বোনের পড়ালেখার হাতেখড়ি। দুলাভাইয়ের সঙ্গে বিয়ের পর শায়েস্তাগঞ্জে চলে আসেন। মমতাময়ী বোনের শুরু হয় নতুন এক জীবন। শায়েস্তাগঞ্জ স্কুলের কোয়ার্টারে একাকী বসবাস। দুলাভাই ব্যস্ত তার স্কুল আর অন্যান্য কার্যক্রম নিয়ে। আর সংসার আগলে রাখেন আমার বোন।
দুলাভাই সব সময় ব্যস্ত থাকলেও আমার বোন তার সন্তানদের সে অভাব বুঝতে দেননি। একাই সামলে নিয়েছেন তার বড় সংসার। তিনি যেমনি ছিলেন পরিশ্রমী, তেমনি উদার। তার উদারতার জন্য সব সময় তিনি অনেকের সহযোগিতা পেয়েছেন। পর্দানশীল মহিলা হিসাবে জনসমক্ষে বের না হলেও অন্দরে থেকেই তিনি ভাল করেই খোজ খবর রাখতেন। বিশেষ করে শায়েস্তাগঞ্জ এলাকার মহিলারা সব সময় তার কাছে আসতেন। আমার বোনও তার সাধ্যমত সবাইকে সহায়তা করতেন। অত্যন্ত ধার্মিক ও অমায়িক গুণের অধিকারী আকিলা খানম চৌধুরীর মতো নারীর সংখ্যা আমাদের সমাজে সত্যই নগন্য।
আমি ১৯৬২ সালে শায়েস্তাগঞ্জ স্কুলে ভর্তি হই এবং আমার বোন ও দুলাভাইয়ের সঙ্গে তাদের বাসায় থেকে স্কুলে পড়াশোনা। তখন থেকেই আমি মরহুম আবদুন নূর চৌধুরীকে অত্যন্ত কাজ থেকে দেখেছি। সকাল-সন্ধ্যা রাত-দুপুর তিনি শুধু স্কুল নিয়েই ব্যস্ত থাকতেন, আর আমার বোন তাকে সর্বাত্মক সহযোগিতা করতেন।
মাঝখানে প্রায় দু’বছর বিরতিসহ ১৯৪৬ সাল থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত প্রায় ৪৪ বছর মো. আবদুন নূর চৌধুরী শায়েস্তাগঞ্জ উচ্চ বিদ্যালয়ে শিক্ষকতার সঙ্গে জড়িত ছিলেন। এর মধ্যে প্রায় ৩৫ বছর তিনি প্রধান শিক্ষক ছিলেন। বেসরকারী স্কুল শিক্ষকদের সংগঠন বাংলাদেশ শিক্ষক সমিতি (বাশিস)-এর সিলেট জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক ও সভাপতি হিসাবে প্রায় ২০ বছর দায়িত্ব পালন করেন। এরপর কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি ও শেষ পর্যায়ে ভারপ্রাপ্ত সভাপতি হিসাবে বেসরকারি শিক্ষকদের দাবি-দাওয়া আদায়ে, বিশেষ করে সরকারি অনুদান আদায়ে তিনি খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। দাবি আদায় করতে গিয়ে ’৮৬ সালে এরশাদ সরকারের আমলে তাকে কারাবরণও করতে হয়। তিনি প্রায় ২০ বছর কুমিল্লা শিক্ষাবোর্ডে পদার্থ বিজ্ঞানের প্রধান পরীক্ষক হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন। রাষ্ট্রপতি কর্তৃক গঠিত কুমিল্লা শিক্ষা বোর্ডের ১১ সদস্য বিশিষ্ট আর্বিটেশন কমিটিতেও দীর্ঘদিন তিনি শিক্ষক প্রতিনিধি ছিলেন। শায়েস্তাগঞ্জ ডিগ্রি কলেজের প্রতিষ্ঠাতাদের অন্যতম ছিলেন আবদুন নূর চৌধুরী। কলেজের প্রতিষ্ঠাতা প্রিন্সিপাল ফজলুর রহমানকে সঙ্গে নিয়ে রাতদিন পরিশ্রম করেছেন তিনি। দীর্ঘদিন শায়েস্তাগঞ্জ কলেজের গভর্নিং বডির সদস্য ও খÐকালীন শিক্ষকেরও দায়িত্ব পালন করেন। শায়েস্তাগঞ্জ কামিল মাদ্রাসার গভর্নিং বডির সদস্য হিসাবে মাদ্রাসার উন্নয়নেও অবদান রাখেন। শায়েস্তাগঞ্জ পুরান বাজার মসজিদ কমিটির চেয়ারম্যান হিসাবেও দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালন করেন তিনি। খুবই ধার্মিক ও অমায়িক ছিলেন। যতদিন জ্ঞান ছিল নিয়মিত ৫ বেলা নামাজদ আদায় করেছেন। অবসরে যাওয়ার পর গ্র্যাচুয়িটির টাকার সঙ্গে আরো কিছু যুক্ত করে তিনি হজব্রত পালন করেছেন। আমার বোনেরও হজে যাওয়ার ইচ্ছে ছিল। কিন্তু অকাল মৃত্যুতে তার সেই ইচ্ছা পূরণ হয়নি।
আবদুন নূর চৌধুরী প্রধান শিক্ষক হলেও নিয়মিত ক্লাস নিতেন তিনি। পদার্থ বিজ্ঞান, গণিত, ঐচ্ছিক গণিত পড়াতেন। ইংরেজিতে তার খুব ভালো দখল ছিল। শিক্ষকতা জীবনের প্রথম দিকে পড়াতেন বিজ্ঞান। এদিকে স্থানীয় বিচারের দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি এলাকার বিভিন্ন মামলা-মোকদ্দমার অর্বিটেশন বা স্থানীয়ভাবে নিষ্পত্তির দায়িত্ব আদালতের মাধ্যমে পড়ত তার ওপর।
মরহুম আবদুন নূর চৌধুরী অসীম সাহসী ছিলেন। যেকোনো বিরূপ পরিস্থিতি মোকাবেলায় তিনি একাই ছিলেন একশ। বাসয় একাই একাধিকবার ডাকাতদের মোকাবেলা করা এবং অন্যান্য বৈরী পরিস্থিতিতে তাকে অনেক সময় একাই অনেকজনকে মোকাবেলা করতে দেখা গেছে। শারীরিক গড়ন, আল্লাহর ওপর অগাধ বিশ্বাস, মনোবল এগুলো তাকে যেকোনো বিপদ মোকাবেলায় সাহস যুগিয়েছে।
আবদুন নূর চৌধুরীর আদর্শে ও আমার বোনের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় তাদের সাত ছেলে ও এক মেয়ে সমাজের উচ্চ পর্যায়ে প্রতিষ্ঠা লাভ করেছেন। তাদের প্রথম ছেলে ডক্টর শোয়েব চৌধুরী জাপান থেকে পিএইচডি লাভ করে বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে জন হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করছেন। দ্বিতীয় ছেলে ডক্টর শাহেদ চৌধুরী যুক্তরাজ্য থেকে পিএইচডি অর্জন করেন এবং বর্তমানে কানাডায় স্থায়ীভাবে বসবাস করছেন। তৃতীয় ছেলে জাহেদ চৌধুরী রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ব্যবস্থাপনায় ¯œাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন। বর্তমানে তিনি আমার দেশ পত্রিকায় নিউজ এডিটর হিসেবে কর্মরত রয়েছেন। চতুর্থ ছেলে খালেদ চৌধুরী বর্তমানে সিলেটে ব্যবসায় নিয়োজিত। পঞ্চম ছেলে ব্যারিস্টার তারেক চৌধুরী যুক্তরাজ্য থেকে বার-এট ল করে বর্তমানে যুক্তরাজ্যে আইন পেশায় নিয়োজিত আছেন। ষষ্ঠ ছেলে তৌহিদ চৌধুরী যুক্তরাজ্যে পিএইচডি অধ্যয়নরত। কনিষ্ঠ ছেলে মুর্শেদ চৌধুরী সিলেট শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক, বর্তমানে কানাডায় পিএইচডি অধ্যায়নরত। তাদের একমাত্র মেয়ে সাজেদা চৌধুরী লালমাটিয়া মহিলা কলেজে সহযোগী অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত আছেন। তিনি এমফিল সম্পন্ন করেন। আবদুন নূর চৌধুরী ও আকিলা খানম চৌধুরীর প্রতিভাবান সন্তানদের নিয়ে আমরাও গর্ববোধ করি।
আবদুন নূর চৌধুরী যেমন ছিলেন আদর্শ শিক্ষক তেমন ছিলেন আদর্শ অভিভাবক, আদর্শ পিতা। তিনি ছাত্র সন্তানের কাছে ছিলেন অত্যন্ত ¯েœহশীল, কিন্তু নিয়ম শৃংখলায় ছিলেন অত্যন্ত কঠোর। স্কুল প্রশাসনে তিনি কখনো আপস করতেন না, ছাত্র হোক বা শিক্ষক হোক। আমরা যখন নবম শ্রেণীতে উত্তীর্ণ হই তখন আমার সহপাঠী মওদুদ (প্রাক্তন চেয়ারম্যান, টিএন্ডটি বোর্ড), ইসহাক (প্রাক্তন ডিজিএম, বাংলাদেশ ব্যাংক), মঞ্জুর (প্রাক্তন জিএম বাংলাদেশ চা বোর্ড) তাদের সঙ্গে আমি ও আরও কয়েকজন সহপাঠীর আগ্রহ েেক বিজ্ঞান বিভাগ খোলার জন্য উৎসাহিত হন। কিন্তু বিজ্ঞান শিক্ষকের অভাবে প্রথম দিকে মানবিক গ্রæপের সঙ্গে ইলেকটিভ ম্যাথ যোগ করেন। তখন স্কুলে উচ্চতর গণিত পড়ানোর কোনো শিক্ষক ছিলেন না। তাই তিনি শতব্যস্ততার মধ্যেও আমাদের উচ্চতর গণিতের ক্লাস নিতেন। পরে স্কুলে যথারীতি মানবিক, বিজ্ঞান ও বাণিজ্য বিভাগ খোলা হয়। শায়েস্তাগঞ্জ উচ্চ বিদ্যালয় হয়ে ওঠে বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়। রেজাল্টের দিক দিয়ে বরাবরই হবিগঞ্জ সরকারি স্কুলের পরই থাকত শায়েস্তাগঞ্জ স্কুলের নাম। এই স্কুলের ছাত্রছাত্রীরা পড়াশোনায় যেমন এগিয়ে ছিল তেমন এগিয়ে ছিল খেলাধূলায়। স্কাউট ও রেডক্রিসেন্ট আন্দোলনেও নেতৃত্ব দিয়েছেন তিনি। স্কুলে প্রতিদিন সকালে অ্যাসেম্বলী ও জাতীয় সঙ্গীতের পর প্রধান শিক্ষক হিসেবে তিনি উপদেশ ও নির্দেশনামূলক বক্তব্য দিতেন। তারপরই আনুষ্ঠানিকভাবে ক্লাস শুরু হতো। বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতা ছাড়াও আন্তঃস্কুল ফুটবল প্রতিযোগিতাহতো সেখানে। শায়েস্তাগঞ্জ হাইস্কুল ছিল সবার সেরা। এসব আয়োজনে সর্বাগ্রে ছিলেন আবদুর নূর চৌধুরী। তিনি সংস্কৃতিমনাও ছিলেন। তাই স্কুলে একটি অডিটোরিয়াম স্থাপনের কাজ শুরু করেছিলেন, যা সম্পন্ন্যের আগেই তিনি অবসরে চলে যান। আমার বিশ্বাস, বর্তমান স্কুল কর্তৃপক্ষ অডিটোরিয়ামের অসমাপ্ত কাজ সম্পন্ করে আবদুন নূর চৌধুরী স্বপ্ন বাস্তবায়ন করবেন।
আমার বোন আকিলা খানম চৌধুরী ২০০৬ সালের ১২ মার্চ ঢাকার পিজি হাসপাতালে অনেকটা অকালেই মৃত্যুবরণ করেন। আর দুলাভাই মো. আবদুন নূর চৌধুরী মৃত্যুবরণ করেন ২০০৮ সালের ২১ সেপ্টেম্বর। ঢাকার অ্যাপোলো হাসপাতালে তিন দিন অবস্থান করে বাসায় ফেরার একদিন পরই তিনি বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় তার ছেলের বাসায় মৃত্যুবরণ করেন। আশা করি তাদের সন্তান ও শুভাকাঙ্খীরা তাদের স্মৃতিকে ধরে রাখবেন এবং তাদের স্বপ্ন বাস্তবায়ন করবেন।
লেখক : উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক (ডিএমডি)
মার্কেন্টাইল ব্যাংক লিমিটেড।

আমার স্মৃতিতে আবদুন নূর চৌধুরী ও শায়েস্তাগঞ্জ হাইস্কুল
ছায়াঘেরা শান্ত নিবিড় প্রাকৃতিক পরিবেশে শায়েস্তাগঞ্জ উচ্চ বিদ্যালয়টি দক্ষিণ হবিগঞ্জের শায়েস্তাগঞ্জ পৌরসভার অধীনে খোয়াই নদীর পশ্চিম তীরে পূর্ব লেঞ্জাপাড়া গ্রামে অবস্থিত। বিদ্যালয়টি ১৯১৮ ইংরেজী সালে প্রতিষ্ঠিত তৎকালীন সময়েল একমাত্র বিদ্যালয় হিসাবে অত্র এলাকা তথা সমগ্র দক্ষিণ হবিগঞ্জের একমাত্র বিদ্যানিকেতন হিসাবে পরিচিত ছিল। এই বিদ্যালয়টি বাংলাদেশের দুজন প্রধান বিচারপতি সৈয়দ এবি মাহমুদ হোসেন ও সৈয়দ জে আর মোদাচ্ছির হোসেন সাবেহসহ অনেক জ্ঞানী গুণীর জন্ম দিয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থ বিজ্ঞানের কৃতী অধ্যাপক মরহুম জনাব ড. আলী জাফর সাহেব, সাবেক যুগ্ম সচিব মুজিব চৌধুরীও এ বিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলেন। শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান উপাচার্য ড. সালেহউদ্দিন আহমেদও স্কুলের একজন কৃতী ছাত্র। এ বিদ্যালয়ের ছাত্র ড. শোয়েব চৌধুরী বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের জন হফকিন্স ইউনিভার্সিটিতে গবেষক হিসাবে কর্মরত রয়েছেন। তাছাড়া বাংলাদেশ সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভিন্ন দফতরে গুরুত্বপূর্ণ অনেক পদে এ বিদ্যালয়ের প্রাক্তন অনেক শিক্ষার্থী কর্মরত ছিলেন ও আছেন।
এই বিদ্যালয়ের শিক্ষা কর্মকর্তাদের সঙ্গে যারা জড়িত ছিলেন তাদের মধ্যে জনাব মরহুম আবদুন নূর চৌধুরী সাহেবের নাম ওতোপ্রোতভাবে জড়িত। তিনি সুদীর্ঘ ৪৪ বছরের শিক্ষকতা জীবনের প্রায় ৩৩ বছর প্রধান শিক্ষক হিসাবে শায়েস্তাগঞ্জ উচ্চ বিদ্যালয়ে কর্মরত ছিলেন। আমার দেখা ও জানা মতে, উনার মতো একজন আদর্শবান দক্ষ ও নীতিবান প্রধান শিক্ষক বিরল।
আমি ১৯৫৯ ইং সাল থেকে ১৯৬৪ ইং সাল পর্যন্ত এই বিজ্ঞ প্রধান শিক্ষক মহোদয়ের ছাত্র হওয়ার সুযোগ পেয়েছিলাম। আমার ছাত্রজীবন ও শিক্ষকতা জীবনে উনার কাছ থেকে যে আদর্শ ও প্রজ্ঞার পরিচয় পেয়েছি তা আমার বাস্তব জীবনের উৎসাহ ও উদ্দীপনা হিসাবে কাজ করেছে। আমি ১৯৬৯ ইং সাল থেকে এই বিদ্যালয়ে মরহুম জনাব আবদুন নূর চৌধুরী সাহেবের অধীনে শিক্ষকতা করার সুযোগ পেয়েছি। ব্যক্তি হিসাবে তিনি ছিলেন আার পথপ্রদর্শক, পরামর্শক এবং হিতৈষী। শায়েস্তাগঞ্জ ও আশপাশে এমন কিছু পরিবার রয়েছে যেখানে দাদা, ছেলে, নাতীÑ তিন জেনারেশনই স্যারের ছাত্র।
আমি শুনেছি বাল্যকাল থেকেই তিনি ছিলেন মেধাবী এবং তুখোড় ছাত্র। তিনি ১৯৪৩ ইং সালে তিনটি লেটারসহ প্রথম বিভাগে ম্যাট্রিক পাস করেন। পরবর্তীতে সিলেট এমসি কলেজ থেকে প্রথম বিভাগে আইএসসি পাস করেন। তিনি তৎকালীন ছাত্র রাজনীতির সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন। ব্রিটিশ পিরিয়ডে অবিভক্ত সিলেট অল আসার মুসলিম স্টুডেন্ট ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। এই কমিটির তৎকালীন সভাপতি ছিলেন সাবেক প্রধান নির্বাচন কমিশনার বিচারপতি এটিএম মাসউদ।
জনাব আবদুন নূর চৌধুরী ১৯৪৬ ইং সনে শায়েস্তাগঞ্জ উচ্চ বিদ্যালয়ে বিএসসি শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন এবং ১৯৫৬ ইং সাল থেকে ১৯৯০ ইং সাল পর্যন্ত এই বিদ্যালয়ে সম্মান, গৌরব ও কৃতিত্বের সঙ্গে প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করেন। উনার শিক্ষকতার সময়ে এই বিদ্যালয়টি উন্নতির চরম শিখরে আরোহণ করে এবং বিদ্যালয়ের যাবতীয় উন্নয়ন কর্মকাÐও সম্পাদিত হয়।
সাধারণ শিক্ষক সমাজের স্বার্থে বেসরকারি শিক্ষকদের সংগঠন বাংলাদেশ শিক্ষক সমিতিতেও তাঁর অবদান অনস্বীকার্য। তিনি বাংলাদেশ শিক্ষক সমিতির সিলেট জেলা শাখার সভাপতি, কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি ও কেন্দ্রীয় সভাপতি হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন। সাধারণ শিক্ষকদের দাবি-দাওয়া ও স্বার্থ আদায় করতে গিয়ে তিনি ১৯৮৬ সালে কারাবরণ করেন। তিনি নীতি ও ন্যায়ের প্রশ্নে ছিলেন আপোসহীন। কোন স্বার্থ বা প্রলোভনে তিনি তার আদর্শ থেকে সরে দাড়াননি।
এই মহান ব্যক্তিত্বের গুণের কথা বলে শেষ করা যাবে না। আদর্শ শিক্ষকদের পাশাপাশি তিনি ছিলেন একজন আদর্শ পিতা। ব্যক্তি জীবনে তিনি ছিলেন সাত ছেলে ও এক মেয়ের গর্বিত জনক। তাঁর প্রতিটি সন্তান উচ্চ শিক্ষিত ও পিতার আদর্শে আদর্শবান। তাদের মধ্যে ৫ জন বর্তমানে বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা, উচ্চতর অধ্যয়নে রয়েছেন। আবদুন নূর চৌধুরী সাহেবের কর্মজীবন ও সন্তানদের লেখাপড়ার কাজে যার অবদান বেশি তিনি হলেন ম্যাডাম মিসেস আকিলা খানম চৌধুরী। তিনিও দুনিয়াতেই নেই।
আজ উনাদের অবর্তমানে দেশে বিদেশে অবস্থানরত সুযোগ্য সন্তানেরা উনাদের মহান কীর্তিকে অক্ষয় করে রাখার জন্য যে ফাউন্ডেশন গঠনের উদ্যোগ নিয়েছেন তা অত্যন্ত প্রশংসার দাবি রাখে। বর্তমান প্রজন্ম হয়তো উনাদের জানতো না, চিনতো না যতি না আজ উনাদের নামে যে ফাউন্ডেশন গঠন করে সাধারণ ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্য থেকে মেধা অনুসারে প্রতিটি শ্রেণীর প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্থান অধিকারীদের মধ্যে আকিলা-নূর স্মৃতি বৃত্তির ব্যবস্থা না করতেন। আমি এই মহৎ উদ্যোগের সার্বিক প্রশংসা করি ও সফলতা কামনা করি। আমি কায়মনোবাক্যে দোয়া করি খোদা যেন এই ফাউন্ডেশনের উদ্যোক্তাদের দীর্ঘ হায়াত ও সুখময় জীবন দান করেন।

একজন শিক্ষক নেতাকে যেভাবে দেখেছি
আমার শ্রদ্ধার নির্ঘণ্টে যে কটি নাম এর মধ্যে শীর্ষে যিনি তিনি হচ্ছেন আমার প্রিয়তম শিক্ষক নেতা মরহুম মো. আবদুন নূর চৌধুরী। একজন আদর্শ শিক্ষক ও নেতার গুণাবলীর কোনোটাই তার মধ্যে কম ছিল না। শিক্ষকতা পেশায় তিনি একজন আদর্শ শিক্ষক। তার তুলনা তিনি নিজেই। দীর্ঘদিন তার সঙ্গে থেকে এটা শিক্ষালাভ করেছি, কাল ও পাত্রভেদে এমন কর্তৃব্যদীপ্ত পুরুষ কিভাবে হওয়া যায়। শিক্ষক নেতাদের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের যুগ আজ কেন যেন বিলীন হয়ে হতে যাচ্ছে।
মহান এ শিক্ষক নেতার নামে ফাউন্ডেশন কর্তৃক প্রকাশিতব্য স্মরণিকায় স্মৃতিচারণের আহবানে উদ্দীপিত হলাম। হৃদয়ের গভীরতম স্থানে জমে থাকা তার প্রতি শ্রদ্ধার জানানোর এ সামান্য সুযোগটি কাজে লাগানোর বাসনা প্রকাশ করলাম। আবেগে আপ্লুত হলাম এবং একই সঙ্গে বলতেও দ্বিধাবোধ করিনি, শ্রদ্ধেয় শিক্ষক নেতার জন্য যা যা করার তা করতে আমি প্রস্তুত।
১৯৮২ সালে এই শিক্ষক নেতার সভাপতিত্বে বৃহত্তর সিলেট জেলার শিক্ষকদের সমাবেশ তৎকালীন মৌলভীবাজার মহাকুমার ভগ্ন শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব আমার ওপর অর্পিত হয়। আমার চেয়ে অনেক উচ্চ শিক্ষিত, জ্ঞানী ও গুণী শিক্ষক থাকা সত্তে¡ও কেন যে আমার ওপর এই দায়িত্ব দিলেন তা একমাত্র মরহুম শিক্ষক নেতাই জানেন। তার পরামর্শে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করতে মৌলভীবাজার শিক্ষক সমিতির ভূমিকার কোনো অংশে ঘাটতি ছিল না।
১৯৬৯-এ আইয়ুব খানের স্বৈরাচারী শাসনের বিরুদ্ধে গণঅভ্যুত্থানের শেষ পর্যায়ে যখন সারাদেশে সব পেশাজীবী আন্দোলনমুখর, তখন পূর্ব পাকিস্তান শিক্ষক সমিতির একজন নেতা হিসেবে প্রাক্তন সিলেট জেলার নেতৃত্বদানকারী এই শিক্ষক নেতার আহবানে পূর্ব পাকিস্তানের অন্যান্য জেলার ন্যায্য শিক্ষকরাও ধর্মঘট শুরু করেন। ঠিক একই ধারায় ১৯৭০ সালে শিক্ষক আন্দোলন করে ধর্মঘটের শেষ পর্যায়ে সরকারের সঙ্গে আলোচনাক্রমে যে অর্থনৈতিক সুবিধা আদায় করা সম্ভব হয়েছিল তা হচ্ছে, শিক্ষকদের জন্য ৫০, ৪০, ৩০ টাকা হারে কল্যাণ ভাতা প্রবর্তন। সেদিনকার এই সাফল্যের শরিক নেতা মরহুম আবদুন নূর চৌধুরী।
১৯৭১ সালের ফেব্রæয়ারিতে যশোরে যে শিক্ষক সম্মেলন হয়েছিল, ‘ঐক্যবদ্ধ’ সমিতি হিসেবে এটা ছিল সংগঠনের শেষ সম্মেলন। এই সম্মেলনে দুটি প্যানেলের মধ্যে মূলত প্রতিদ্ব›িদ্বতা হয়। একটি প্যানেলের সভাপতি পদে পরবর্তীতে আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য বর্তমানে মরহুম কামরুজ্জামান ও মহাসচিব পদে অপর প্যানেলের মরহুম জয়নুল আবেদীন চৌধুরী নির্বাচিত হন। এই পরিস্থিতির পটভূমিতে ’৭৩-এ বাংলাদেশ শিক্ষক সমিতির নেতৃত্ব বৈষম্য দূর করে এক অভিন্ন বেতন স্কেলের দাবিতে শিক্ষকরা সোচ্চার হয়ে ওঠেন। এই ধর্মঘটের কারণে সরকারকে একবার এসএসসি পরীক্ষার তারিখ পিছিয়ে দিতে হয়। এই ধর্মঘটের ভিত্তি ছিল ৬টি জরুরি দাবি। এই দাবিগুলো আদায়ের পাশাপাশি সভা, সমাবেশ, পথসভা, বিক্ষোভ মিছিল, ঘেরাও প্রভৃতি কর্মসূচি সাফল্যের সঙ্গে পালিত হয় বৃহত্তর সিলেটে মরহুম আবদুন নূর চৌধুরীর দিকনির্দেশনায়। ওই ধর্মঘট বানচাল করার অপচেষ্টায় ছিল স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি। তখনই বৃহত্তর সিলেটে ধর্মঘট চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত হয় মরহুম আবদুন নূর চৌধুরীর সভাপতিত্বে কার্যনির্বাহী কমিটির অধিকাশ সদস্যদের মতামতের ভিত্তিতে। এক পর্যায়ে জাতীয়ভাবে বাংলাদেশ শিক্ষক সমিতি দুটি ভাগে বিভক্ত হয়েছিল। একটি ছিল কামরুজ্জামান হেনা দাশ গ্রæপ, অপরটি জয়নুল আবেদীন-মান্নান গ্রæপ। তখন ‘ঐক্যবদ্ধ’ সমিতি রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করেও তিনি বিফল হয়েছিলেন। সিলেট জেলার ৪টি প্রাক্তন মহকুমার শিক্ষকদের মতামতের ভিত্তিতে জয়নুল আবেদীন গ্রæপের সঙ্গে থেকে বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনার সিদ্ধান্ত হয়। শিক্ষকদের মধ্যে ভীতি বিভ্রান্তি অনৈক্য সত্তে¡ও বিভিন্ন সংগঠন ’৭৮, ’৭৯-তে যে আন্দোলনের বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করে, প্রত্যেকটি কর্মসূচি মরহুম আবদুন নূর চৌধুরীর নেতৃত্বে পালন করা হয়। এরশাদ সরকার ক্ষমতায় আসার পর ’৮৪ সালের ৮ নভেম্বর ঢাকায় এক বিশাল জাতীয় শিক্ষক সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। সেদিন জয়নুল গ্রæপ ও কামরুজ্জামান গ্রæপ শিক্ষকদের ন্যায্য দাবি আদায়ের লক্ষ্যে যৌথ কর্মসূচি পালনের উদ্যোগ নিলে জয়নুল গ্রæপের একজন প্রভাবশালী শিক্ষক নেতা হিসেবে যৌথ কর্মসূচি প্রণয়নে সদস্য হিসেবে আবদুন নূর চৌধুরীকে সমন্বয় পরিষদের সদস্য নির্বাচিত করা হয়। তখন থেকে তিনি একজন আপসহীন শিক্ষক হিসেবে পরিচিত লাভ করেন। ১৯৮৬ সালে যখন যৌথভাবে শিক্ষশকদের দাবি আদায়ের লক্ষ্যে উভয় গ্রæপ বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করে আসছিল তখন থেকে আবদুন নূর চৌধুরীকে জয়নুল গ্রæপের ভারপ্রাপ্ত সভাপতির দায়িত্ব পালনের ক্ষমতা জাতীয় কমিটি তার ওপর ক্ষমতা অর্পণ করে। এই সময় আমি আমার শ্রদ্ধেয় শিক্ষক নেতার একজন ঘনিষ্ঠ সহকর্মী হিসেবে কাজ করেছি এবং আন্দোলন পরিচালনার জন্য বিবিন্ন কর্মসূচি প্রণয়নের দায়িত্ব পালন করেছি। ১৯৮৬ সালের মার্চ মাসের প্রথম দিকে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে শিক্ষকদের সমাবেশ শেষে আন্দোলন পরিচালনা কর্মসূচি প্রণয়ন করে যখন তার এক নিকট আত্মীয়ের বাসায় যাওয়ার উদ্দেশে একত্রে রনু হই তখনই তাকে গ্রেফতার করা হয়। দীর্ঘ ১৫ দিন তিনি কারাবরণ করেছিলেন। শিক্ষকদের ন্যায্য দাবি আদায়ের জন্য তিনি তৎকালীন সরকারের সঙ্গে আপস করেননি। তাই তখনই তিনি একজন আপসহীন শিক্ষক নেতা হিসেবে শিক্ষক সমাজের কাছে পরিচিতি লাভ করেন।
এক সময় আন্দোলনের কর্মসূচি হিসেবে এসএসসি পরীক্ষা প্রতিহত করার কর্মসূচি পালনের সিদ্ধান্ত থাকায় মৌলভীবাজার জেলায় কর্মসূচি পালনের সময় কমলগঞ্জ উপজেলার এসএসসি পরীক্ষা কেন্দ্রে আন্দোলনকারী শিক্ষক ও পুলিশ বাহিনীর মধ্যে সংঘর্ষে শমসেরনগর এএটিএম হাইস্কুলের ছাত্র মো. সামছু পুলিশের গুলিতে নিহত হয়। এ ব্যাপারে জনাব আবদুন নূর চৌধুরী সাহেব নানা প্রকার বুদ্ধি সাহস ও মামলাগুলো পরিচালনার জন্য একজন শিক্ষক নেতা হিসেবে সাহায্য ও সহযোগিতা করে আমাকে কৃতজ্ঞতার সূত্রে আবদ্ধ করেছেণ। এই ঋণ পরিশোধ করতে পারব না। শিক্ষক-শিক্ষিকাদের বেতন বৃদ্ধির আন্দোলন, বেসরকারি শিক্ষকদের অবসর সুবিধা বোর্ড প্রবর্তনে ১৯৯৪ সালে মৌলভীবাজারে যে শিক্ষক মহাসমাবেশে হয়েছিল তা সমর্থন করে দাবি বাস্তবায়নে যথাযথ কর্তৃপক্ষকে বোঝাতে সক্ষম হয়েছিলেন এই শিক্ষক নেতা আবদুন নূর চৌধুরী।
শিক্ষককুলের আদর্শ এ মহান শিক্ষক নেতার জীবনাবসানে আমরা ব্যথিত। দেশ হারিয়েছে তার এক দেশপ্রেমিক সুসন্তানকে। আমরা হারিয়েছি আমাদের প্রিয় শিক্ষক নেতাকে।

শিক্ষক ও সহকর্মীকে ঘিরে কিছু স্মৃতি
১৯৫৭ সাল। জানুয়ারি মাসের শেষ দিক। স্যারের সঙ্গে আমার প্রথম দেখা। ৭ম শ্রেণীতে ভর্তি হওয়ার সময়। সে সময় মৌখিক ভর্তি পরীক্ষা হতো। স্যার ক্লাস সিক্সের ইংরেজির ওপর অনেক প্রশ্ন করলেন। মাত্র ৪/৫টির সঠিক উত্তর দিলাম। সহ-পরীক্ষক মালেক স্যার (ক্রীড়া শিক্ষক), বেজায় খুশি। ভর্তি ফরমে মন্তব্য দিলেন অফসরঃ ঃযব নড়ু রহ ঃযব পষধংং ঠওওঅ. ভর্তি হয়ে গেলাম। ছাত্রজীবনে ও শিক্ষক জীবনে তার অফিসের বারান্দা অতিক্রম করিনি। এখনো চোখের সামনে ভাসে তিনি যেন অফিসে বসা। শিক্ষক জীবনে কোনো প্রয়োজনে কল দিলে অফিসে বসার সুযোগ লাভ করেছি। ১৯৫৮ সাল। তখন আমি সপ্তম শ্রেণীতে। স্যার এমএড করার জন্য দীর্ঘদিনের ছুটি নিয়ে সহ-প্রধান শিক্ষক বাবু অশ্বিনসী কুমার দেবের কাঁধে দায়িত্ব দিয়ে চলে যান। ১৯৫৯ সাল। জেনারেল আইয়ুব খান তখন পাকিস্তানের সিংহাসনে। স্যার এমএড সমাপ্ত করে স্কুলের কাজে যোগদান করেন। শুরু হলো উন্নয়নের পালা। এমএড থেকে এসেই বিদ্যালয়ে স্টুডেন্টস ইউনিয়ন সংগঠন করেন। পুকুরের উত্তর পাড়ে ৯ আসন বিশিষ্ট একটি হোস্টেল নির্মাণ করেন। বিদ্যালয় গঁষঃরষধঃবৎধষ স্কিমে ঢোকানোর চেষ্টা অব্যাহত রাখেন।
১৯৬০ সাল। আমি দশম শ্রেণীর ছাত্র। ৪ এপ্রিল তিনি বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। ওই সালের জুন-জুলাই মাসে ঊধংঃ চধশরংঃধহ ঊফঁপধঃরড়হ গঁষঃরষধঃবৎধষ স্কিমে বিদ্যালয় অন্তর্ভুক্ত হয়। ঞবহ ঈষধংং শেষ হলে মার্চ মাসে ম্যাট্রিক পরীক্ষা দিয়ে আমরা চলে আসি। এদিকে বিল্ডিং উন্নয়নের কাজ সবেমাত্র শুরু। প্রত্যেকটি বিল্ডিং স্যারের নিজস্ব পরিকল্পনায় নির্মিত। কেবলমাত্র উত্তরের ধানক্ষেতের ওপর বিল্ডিংটি ইঞ্জিনিয়ারিং নকশা অনুসারে নির্মিত। চারমুখী বিভাগ নিয়ে বিদ্যালয় যাত্রা শুরু করে-আর্টস, সায়েন্স, কমার্স ও এগ্রিকালচার। হবিগঞ্জে কোনো বিদ্যালয়ে অডিটোরিয়াম ছিল না। ১০০ আসন বিশিষ্ট অত্যাধুনিক অডিটোরিয়াম নির্মাণ করেন তিনি। এটা এখনো অত্যাধুনিক। এতে আছে গ্রিন রুম, বাথরুম, গেস্ট রুম, ড্রেসিং রুম, প্রমপ্ট রুম ও আধুনিক জিমন্যাস্টিক রুম।
প্রত্যেক বিভাগের জন্য পৃথক পৃথক প্র্যাকটিক্যাল রুম। বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক নিয়োগ দেন তিনি। ছাত্রছাত্রী সংখ্যা ৮০০-তে উন্নীত হলো। ১৯৬০ সালে তিনি বৃক্ষরোপণ অভিযানকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন প্রজাতির বৃক্ষ দ্বারা স্কুলকে শোভিত করেন। তিনি একটি এগ্রিকালচারাল গার্ডেন তৈরি করেন ডেমোনেস্ট্রশনের জন্য।
১৯৬৫ সালে আমি গ্র্যাজুয়েশন নেই। সঙ্গে সঙ্গে মিরপুর হাইস্কুলে জয়েন করি। বিজ্ঞাপনে সাড়া দিয়ে ১৯৬৮ সালের আগস্ট মাসে শায়েস্তাগঞ্জ উচ্চ বিদ্যালয়ে স্যারের আহবানে যোগদান করি।
স্যার বিদ্যালয়ের সার্বিক উন্নতির জন্য প্রতিদিন ছুটির পর সব স্টাফকে নিয়ে আলোচনায় বসতেন। বিদ্যালয়ের সমস্যা, ছাত্রছাত্রীদের সমস্যা, শিক্ষক সমস্যা নিয়ে আলাপ-আলোচনা হতো। যদি একজন কোনো সমাধানে ভিন্নমত পোষণ করতেন, তিনি সমাধানটি বাদ দিয়ে ভিন্নপথে সমাধান খুজতেন। সর্বসম্মতিতে সমাধান করতেন। এজন্য তিনি একচ্ছত্র অধিপতিদ হিসেবে আজীবন কাজ করে গেছেন। তা একটা বিশেষ বৈশিষ্ট্য ছিল, কারো সঙ্গে মতবিরোধ থাকলেও যদি ওই ব্যক্তি স্কুলে হোক কিংবা বাইরে হোক বিপাকে পড়তেন, তার সমূহ বিপদ স্যার আপন মাথায় তুলে নিতেন। ফলে বিপদগ্রস্ত লোকটি আজীবনের জন্য ভক্ত হয়ে যেত। এজন্যই তিনি অপরাজেয় জীবনভর।
স্যার ছিলেন দক্ষিণ হবিগঞ্জের জন্য আদর্শ কোর্ট। দেওয়ানী ও ফৌজদারী যত মামলা-মোকদ্দমা হতো, সেগুলো আদালত স্যারের কাছে নিষ্পত্তির জন্য প্রেরণ করতেন। স্যার যথাবিহীত ট্রায়াল দিয়ে ওই সব মামলা-মোকদ্দমা নিষ্পত্তি করতেন। এ জন্য একটা আলাদা রেজিস্টার মেনটেন করতেন। করণীক জ্যোর্তিময় বাবু ছিলেন তার বিশ্বস্ত সহযোগী। তিনি গ্রামের সালিশ বিচারও করেছেন। এ জন্য গ্রাম্য মাতব্বর মুরুব্বিরাও স্যারের ভক্ত ছিলেন।
১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ। সেদিন বেতনের তারিখ ছিল। সব শিক্ষক-কর্মচারী বিদ্যালয়ে হাজির। বেলা ৩/৪টার দিকে শোনা গেল পাঞ্জাবি নামে পরিচিত পাকিস্তান আর্মি স্টেশনে এসেছে। ইতোমধ্যে বেতন নেয়ার কাজ প্রায় শেষ। যার যার সুবিধা মতো সবাই স্কুল ত্যাগ করল। স্যারকে বললাম পরিবার নিয়ে সরে পড়–ন। তিনি রাজি হলেন না। আমি বাড়ি ফিরেই শায়েস্তাগঞ্জে গুলির শব্দ শুনলাম। অন্তত ২৫/২৬টি শব্দ হবে। পরে শুনলাম শায়েস্তাগঞ্জের ব্যবসায়ীদের রেলের পুলের (ব্রিজ) ওপর গুলি করেছে পাঞ্জাবিরা। ৪/৫ দিন আর বাড়ি থেকে বের হইনি। ১ মে শুনলাম, স্যার আমাদের চরহামুয়া গ্রামে তার ছাত্র আমার প্রতিবেশী হাবিবের বাড়িতে সপরিবারে আসছেন। খবর পেয়েই এক দৌড়ে স্যারের কাছে গেলাম। দেখলাম, ম্যাডাম এবং তার ছোট জা কালো বোরকা পড়ে একটা আমগাছের ছায়ায় বসা। স্যার তখন তার দুই ছেলে শোয়েব আর শাহেদকে নিয়ে পায়চারী করছেন। আমাকে দেখেই বললেন, ‘ওরা কিছু সঙ্গে আনেনি। ৩ টাকার বালুসাঁই সঙ্গে সাথী।’
হাবিবকে বললাম, অসূর্যস্পর্শা একজন মহিলা তোমার আমতলায়। খোদার কি মহিমা। সে জবাব দিল, কোনো চিন্তা করবেন না। এরা আমার ধর্ম পিতা-মাতা। আমি জীবিত থাকতে তাদের কোনো অমর্যাদা হবে না। হাবিবের বাংলা ঝেড়ে মুছে পরিষ্কার করে প্রথমত বসার জায়গা করা হলো। পরে ভেতর বাড়ির একটি ঘর স্যারের জন্য ছেড়ে দেয়া হয়। স্যার ডিসেম্বর পর্যন্ত সেখানে অবস্থান করেন।
নিরস্ত্র গ্রামবাসীকে সামনে থেকে তিনি ব্যারিকেড সৃষ্টি করতে বারণ করেন। অন্যথায় গ্রামকে গ্রাম অগ্নিসংযোগ করে পুড়ে ছারখার করে দিতো পাকসেনারা। তিনি গ্রামের মুরুব্বিদের সঙ্গে যোগাযোগ করে গ্রাম্য বাজারগুলো দিনে দিনে শেষ করতে বলেন।
জুন মাসে পাকসেনারা বলল, ‘স্কুল চালাও, সবকো পাত্তা লাগাউ।’ বাধ্য হয়ে শিক্ষকদের গোপনে সংবাদ দিলেন। আমরা যারা ছিলাম তারা লুঙ্গি পরে স্কুল যোগদান করি। ২/৩ ঘণ্টা পরিস্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজ করে যার যার বাগিঘরে চলে আসি। আমি আর স্যার একই পথে নিজ নিজ গন্তব্যস্থলে পৌছি। মাঝে মাঝে ইউসুফ হাবিলদার এসে বলতো, ‘উস্তাদজি তালিবান কা পাত্তা লাগাউ।’ স্যার বাধ্য হয়ে হ্যান্ডনোটের মাধ্যমে ছাত্রছাত্রীদের খবর দিলেন। আগস্ট মাসের গোড়ার দিকে কিছু কিছু ছাত্রছাত্রী স্কুলে আসতে শুরু করলো। এর আগে ২৭/২৮ এপ্রিল বিদ্যালয়ে ঢুকেই অফিস, আলমিরা, সব প্র্যাকটিক্যাল রুম, ল্যাবরেটরি রুম ভেঙ্গে চুরমার করে পেলে তারা। স্যারের গাভী তারা জবাই করে ফেলে। পর পর তিনটি গরু নিধন করে পাকসেনারা মৌজ করে। নভেম্বর মাসের শেষদিকে আমার সহ-শিক্ষক আফিল ভাই কাগজের ােড়ক আমার হাতে দিয়ে বলেন, কাল বিকালে বাড়ি যাওয়ার পথে খেলার মাঠে এটা পেয়েছি। দেখতো কোনো রেকর্ড কিনা। মোড়ক খুলে দেখি আমারই ডিগ্রি সার্টিফিকেট তিন টুকরো করে মুড়িয়ে ফেলা। আমি টুকরো তিনটি সযতেœ সংরক্ষণ করেছি। আগস্ট মাসে কমিটির সিদ্ধান্তে ৩০% বেতনের অংশ কাটা হয়। অবশ্য ১৯৭২ সালের মার্চ মাসে এককালীন সব রিকভার হয়।
১৯৮০-এর বগুড়া সম্মেলন : বগুড়ায় বাংলাদেশ শিক্ষক সমিতির (বাশিস) ত্রিবার্ষিক জাতীয় সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। মোট ৩৫ জন সিলেট থেকে সিলেকশন পাই। স্যার সম্মেলনের দুদিন আগে আমাদের সহকর্মী শিক্ষক নেতা নৃপেন্দ্র বাবুকে নিয়ে ঢাকায় চেেল গেলেন কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দের সঙ্গে যোগাযোগ করার জন্য। বলে গেলেন, বিদ্যালয় থেকে সিলেকশন নিয়ে একজন আসতে পারে। স্টাফ েেক সেই সিলেকশনটি লাভ করি। সম্মেলনের একদিন আগে রাত ৮টায় পাবনা-দৌলতদিয়াগামী লঞ্চের একটি টিকেট দিতে। সে বহুক্ষণ খাতা উলট-পালট করে অবশেষে বলল, বাশিসের সব নেতাদের মাঝখানে একটি সিট খালি আছে, সেটা আপনি নেবেন? আমি বললাম, ‘আলবত নেব।’ টিকেট সংগ্রহ করে হোটেলে ছুটলাম। সেখানে দোতলায় একটি ওয়ান সিটেড রুম ভাড়া করলাম। ফ্রেশ হয়ে বিছানায় দেহ রাখতেই স্যারের কণ্ঠ শুনতে পেলাম। এক দৌড়ে স্যারের রুমে ঢুকলাম। স্যার আমাকে দেখেই হাসতে হাসতে চিৎকার করে সিলেটের আঞ্চলিক ভাষায় বললেন, ‘তুমি আইলা কিলা।’ আমি বললাম, ইচ্ছা থাকলে উপায় হয়। তুমি টিকেট করেছো? সঙ্গে সঙ্গে টিকেটটি স্যারের হাতে দিলাম। উল্লাসে তিনি বলেন, তাহের আলী কেন্দ্রীয় নেতা হয়ে গেছে। সব নেতাদের মাঝখানে তার টিকেট। ‘ও নৃপেন্দ্র, তুমি কিলা করলায়।’ নৃপেন্দ্র বাবু জবাব দিলেন, আমি তো সর্বশেষ দুটি টিকেট নিয়েছি। এরপর তো টিকেট থাকার কথা নয়। আমি বললাম, ‘ও বেটারা আমার লাগি এক সিট আগে থেকেই রিজার্ভ রাখছে। আমি হোটেল বয়কে চা দেয়ার কথা বললাম। এ সময়ের আনন্দ আমার এখনো মনে পড়ে এবং একা একা হাসি। যাই হোক, আমার টিকেট এবং বেড স্যারকে দিয়ে স্যারের বেডে শুয়ে পড়লাম। সকাল ৬টায় লঞ্চে উঠে বসলাম। লঞ্চ পাবনা-দৌলতদিয়া ঘাটে পৌছল বিকাল ৫টায়। আমরা একটি ট্যাক্সি ভাড়া করে সম্মেলন কেন্দ্র সংলগ্ন হোটেল ছালেহীনাতে অবস্থান নিলাম। তখন রাত ৮টা।
বগুড়ায় আমরা ১১ দিন থাকলাম। প্রথম মিটিংয়ে স্যারের নাম বাশিসের সভাপতি পদে প্রস্তাব আসল। প্রস্তাবটা প্রায় চূড়ান্ত। এমন সময় স্যার উঠে বক্তব্য দিলেন, সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক পদে ঢাকার কোনো লোক থাকা ভালো। মফস্বলের কোনো লোক দিয়ে বাশিস নিয়ন্ত্রণ ঠিক হবে না। অনেক তর্ক-বিতর্কের পর ঢাকার নবকুমার ইনস্টিটিউটের আবদুল মান্নান সাহেব সভাপতি ও বাড্ডা আলাতুন্নেসা স্কুলের আবদুল খালেক সাহেব সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। যাক রক্ষা পেল ধরা। অন্যথায় বাশিস খÐ-বিখÐ হয়ে যেত সে সময়েই। স্যারের এ উদ্যোগটা সর্বমহলে প্রশংসিত হলো। কারণ দু’জন দুই গ্রæপের হওয়ায় ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষা পেল।
পরের দিন সহ-সভাপতি নির্বাচনের পালা। সিলেটের সবার মুখে শুনলাম, স্যার বিনা প্রতিদ্ব›িদ্বতায় বাশিসের সহ-সভাপতি হবেন। পরদিন ভোরে ব্রেকফাস্টের জন্য নিকটবর্তী হোটেলে ঢুকলাম। এমন সময় মৌলভীবাজারের খুরশেদ সাহেব ৮/১০ জনের টিম নিয়ে নাশতা করতে ঢুকলেন। নাশতা খেতে খেতে সহ-সভাপতি পদের জন্য নিজেকে দাঁড় করালেন। ৩/৪ জন সমর্থন দিল। বাকিরা সব নীরব। আমার অবস্থা আঁচ করতে আর বাকি রইল না। সঙ্গে সঙ্গে হোটোলে ফিরলাম। দেখি নৃপন্দ্রে বাবু এখনো ঘুমায়। স্যারকে ঘটনার বিবরণ দিলাম। কিছুক্ষণ নীরবে চিন্তা করলেন। তারপর উঠে চলে গেলেন। সিলেটের জায়গীরদার সাহেবকে দিয়ে সিলেটের সব শিক্ষকের একটা মিটিং ডাকলেন। স্যার আর নৃপেন্দ্র বাবা মিটিংয়ে অনুপস্থিত থাকলেন। জায়গীরদারের মিটিংয়ে অনেক বাদানুবাদের পর এক পর্যায়ে হাতাহাতি শুরু হলো। আমি তৎক্ষণাৎ স্যারের কাছে আসি এবং ঘটনা জানাই। সঙ্গে সঙ্গে স্যার অকুস্থলে পৌছান। স্যারের উপস্থিতিতে সবাই নীরব। তিনি বিষয়টি সুরাহা করেন। জায়গীরদার ও খুরশেদ সাহেবকে বুকে জড়িয়ে ধরেন। ঘটনার মীমাংসা করেন।
বিকাল ৩টায় নির্বাচন হলো। সিলেটের কেউ স্যারের সঙ্গে প্রতিদ্ব›িদ্বতা করল না। স্যার সর্বসম্মতিতে বাশিসের কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতির পদ পেলেন। পরের দিন ভোরে সিলেটের সবাইকে রুটি-মাংসে আপ্যায়ন করলেন তিনি।
স্যারের এক্সটেনশন : চাকরির মেয়াদান্তে স্যার এক্সটেনশনের জন্য আবেদন করলেন। ৮ জন সদস্য ভিন্নমত পোষণ করলেন। কমিটির চেয়ারম্যান সৈয়দ আহমদুল হক বললেন, আমি চেয়ারম্যান, স্কুল চালাই না। আপনারা সদস্যরাও স্কুল চালান না। স্টাফ রিপ্রেজেন্টেটিভ থাকতে আমরা এ রিস্ক কেন নেব? সবার দৃষ্টি দেখি আমার দিকে। আমি বক্তব্য দিলাম, এক কিলোমিটারব্যাপী এই স্কুলে স্যারের পরিশ্রমের ফসল। শায়েস্তাগঞ্জ হাইস্কুল বহমুখী, সমস্যাও বহুমুখী। ১ হাজার ২শ ছাত্রছাত্রী, শিক্ষক সংখ্যা ২২, মুখ (বিভাগ) ৪টা, ১৩টি সেকশনÑএকটা বিশাল স্কুল, বিরাট সমস্যা। সমস্যাসঙ্কুল স্কুলে স্যারই ফিট। তাকে এক্সটেনশন না দেয়ার কোনো প্রশ্নই আসতে পারে না। এছাড়া দক্ষিণ হবিগঞ্জের মাননীয় আদালতও তিনি। তাকে অসংকোচে এক্সটেনশন দেয়া হোক। উপজেলা চেয়ারম্যান এক্সটেনশন সিদ্ধান্তে সই করলেন। স্যার দুই বছরের এক্সটেনশন পেলেন। উপজেলাপ চেয়ারম্যান আমাকে বললেনÑগাড়িতে উঠুন। গাড়ি গেট পার হলে বলেন, আপনি আমাকে বিপদ থেকে উদ্ধার করেছেন। আপনাকে একা ফেলে যাই কোথায়। মিরপুর ঘুরে বাড়ি পৌছায়ে দেন তিনি। তখন রাত ১২টা।
শিক্ষক জীবনে সর্বদাই বলতাম, ‘অং ও ধস হবরঃযবৎ ধ মড়ড়ফ ঃবধপযবৎ হড়ৎ ধ মড়ড়ফ ভধঃযবৎ’ স্যার শুনে শুধু হাসতেন।
স্যারের বেলায় এ উক্তিটি ভিন্নভাবে প্রযোজ্য। ‘ঐব রং ধ মড়ড়ফ ধফসরহরংঃৎধঃড়ৎ ধং বিষষ ধং ধ মড়ড়ফ ঃবধপযবৎ ধষংড়’.
স্যার তো পরের ছেলেমেয়েকে কোনো দিন ফাকি দেননি। এ জন্য তার প্রত্যেকটি সন্তান সুপ্রতিষ্ঠিত। ম্যাডাম সম্পর্কে কিছু বলতেই হয়। ১৯৬০ সালে আকিলা ম্যাডাম শায়েস্তাগঞ্জে আসেন। আমি ৫০ বছর যাবত স্যারের সঙ্গে জড়িত। প্রথমে ছাত্র, পরে শিক্ষকÑ অবসর জীবনে শুধু আমাকেই চিনতেন। এই দীর্ঘ সময়ে ম্যাডামকে কোনোদিন স্কুলের আঙ্গিনায়, পুকুরে, বাসায় চোখে পড়েনি। এমনকি ২২ জন শিক্ষক, ১২শ ছাত্রছাত্রী, অগণিত শিক্ষক স্যারের কাছে আসা-যাওয়া করত সমিতির কারণে। কেউ কখনো বলতে পারবে না তাকে দেখেছেন বলে। স্যারকে জিজ্ঞাসা করলাম ব্যাপারটা কি? স্যার বললেন, তোমার ম্যাডাম ফজরের নামাজের পর বিদ্যালয়ে যখন কেউ থাকে না, সে সময় বের হোন।
একবার মজার ব্যাপার হলো। ২০০০ সালের দিকের ঘটনা। স্যারের পরামর্শেই আমার মেয়ে ডা. লাভলীর বিয়ে ঠিক করলাম। দাওয়াত নিয়ে বাসায় গেলাম। দরজা বন্ধ। কেউ নেই। কোনো কাজের লোকও নেই। অথচ বাইরে ভেজা কাপড় রোদে টানানো। ইতস্তত করে স্যারকে ডাকলাম। ভিতর থেকে জবাব এলো, স্যার সিলেটে। তুমি বস, আমি দরজা খুলছি। ধাক্কা দিতেই দরজা খুলে গেল। আমি সোফায় বসলাম। তুমি কি লাভলীর আব্বা? লাভলী নাকি বরিশালে থাকে, সে বাড়ি এলে আমাকে দেখে না কেন? আমি বিয়ের দাওয়াতনামাটি পর্দার ফাকে ম্যাডামের হাতে দিলাম। মুখে সব ঘটনা খুলে বললাম। তিনি বললেন, তুমি বসো, আমি চা করছি। অনীহা প্রকাশ করায় তিনি বললেন, তুমি কিছু না খেয়ে গেলে স্যার তোমার মেয়ের বিয়েতে যাবেন না। বাধ্য হয়ে বসলাম, চা নাশতা করলাম। এ সময়ও ম্যাডাম সামনে আসেননি। যা করেছেন পর্দার আড়াল থেকেই। বাড়ি পৌছে লাভলীকে পাঠালাম ম্যাডামকে সালাম করার জন্য।
তিনি সত্যিকারের পর্দানশীল মহিলা। মহীয়সী নারী। তিনি ছিলেন বীর মাতা। আল্লাহ তার বেহেশত নসিব করুক। আর ডেডবডি যখন শায়েস্তাগঞ্জে পৌছল, দেখি লেনজাপাড়া, সুদিয়াখলা, দাউদনগর, বিরামচর, পুরান বাজার, উাহাটা, লস্করপুরের হাজারও মহিলা ম্যাডামকে শেষ শ্রদ্ধা জানাতে আসেন। এটা কি করে সম্ভব হলো? মানুষের শ্রদ্ধাবোধে যদি কোনো ফাঁকফোকর না থাকে তার বেলায় প্রযোজ্য এ বিরল ঘটনা। বাংলাদেশের আধুনিক মহিলারা যদি এই গুণের অধিকারিণী হতেন তবে সোনার বাংলা গড়তে সহজ হতো। সৎ সন্তানে সংসার ভর যেতো।
স্যার এবং শায়েস্তাগঞ্জ : স্যার সম্ভবত ১৯৪৬ সালে শায়েস্তগঞ্জ হাইস্কুলে যোগদান করেন সায়েন্স টিচার হিসেবে। তখভন তিনি বিএসসি পাস করেননি। ১৯৪৯ সালে বিএসসি পাস করেন। সম্ভবত ১৯৫১ সালে স্ক্রিন অফ হলো। বিরোধের শিকার হন স্যার এবং শৈলেশ বাবু। ১৯৫৪ সালে আদালত কর্তৃক রি-ইনস্টিটিউট হয়। তখনকার প্রধান শিক্ষক বাবু মহেশ চক্রবর্তী ইন্ডিয়ায় চলে যান। স্কুলের প্রধান শিক্ষকের অভাব দেখা দিল। এক অরাজক পরিস্থিতি সৃষ্টি হলো স্কুল অ্যাডমিনিস্ট্রেশনে। ১৯৫৬ সালে সহ-প্রধান শিক্ষক ববু অশ্বিনী কুমার দেবকে ডিঙিয়ে স্কুল কমিটি স্যারকে প্রধান শিক্ষকের পদে উন্নীত করেন। শায়েস্তাগঞ্জের সঙ্গে নিবিড় সম্পর্ক শুরু হলো তার। স্যার না থাকলে শায়েস্তাগঞ্জ হাইস্কুলের উন্নয়ন হতো, তবে বর্তমান আঙ্গিকে নয়। ১৯৬১-৬৫ পর্যন্ত এ স্কুলের প্রভূত উন্নয়ন হয়। এক কিলোমিটারব্যাপী স্কুল পরিকল্পনা, আন্তর্জাতিক মানের খেলার মাঠ, মসজিদ পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন, হেড মাস্টার কোয়ার্টার নির্মাণ, পুকুর সংস্কার; প্রতিটি ইট পাথরের সঙ্গে স্যারের শ্রম জড়িত। এক কথায় শায়েস্তাগঞ্জের জন্য তেজোদীপ্ত সূর্যের ন্যায় কাজ করে গেছেন তিনি। প্রায় ৩৫ বছর প্রধান শিক্ষক ছিলেন। এই ৩৫ বছরে কত ওলট পালট হয়েছে; স্যার কিন্তু অপরাজেয় থেকেছেন।
অবসর জীবনে বার্ধক্যজনিত কারণে বাকশক্তি ও স্মৃতিশক্তি কমে যায় স্যারের। তিনি স্কুলের মায়া ছাড়তে পারেননি। তাই স্কুলের পাশে বাড়ি করেছিলেন। ছুটির পর আমরা দলবেধে স্যারকে দেখার জন্য যেতাম। সবাই বলত, স্যার আমাকে চিনেছেন; কোনো শব্দ নেই। আমি বললে স্যার বলতেন, ‘তোমাকে চিনেছি, তুমি তাহের আলী।’ এ তো গভীর মমতারই প্রকাশ।
স্যারের ডেডবডি আসার খবর পেয়ে ২০০৮ সালের ২১ সেপ্টেম্বর রমজান মাসে অগণিত লোক দিনভর রোদে অপেক্ষা করতে থাকেন স্যারকে শেষ শ্রদ্ধা জানানোর জন্য। ৫/৬ হাজার নারী-পুরুষ, অধিকাংশপ্রাক্তন ছাত্রছাত্রী। গ্রাম্য মাতবর, দিনমজুর, প্রশাসনিক আমলা, কত মানুষ স্যারকে শেষ শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করলেন তার ইয়ত্তা নাই। স্যার ছিলেন আদর্শ হেডমাস্টার, মানুষ গড়ার কারিগর। শায়েস্তাগঞ্জ উচ্চ বিদ্যালয় তারই স্মৃতি। তার আদর্শকে যতদিন শায়েস্তাগঞ্জ ধরে রাখবে ততদিনই মঙ্গল। তার আদর্শ চিরজাগরুক থাকুকÑএ কামনা করি।
লেখক : সাবেক শিক্ষক ও ছাত্র শায়েস্তাগঞ্জ উচ্চ বিদ্যালয়।

অ এৎবধঃ ঞবধপযবৎ রিঃয ারংরড়হ ধহফ সরংংরড়হ
ওঃ’ং ঢ়ৎবারষরমব ঃড় বীঢ়ৎবংং সু ফববঢ় ৎবংঢ়বপঃ ধহফ মৎধঃরঃঁফব ঃড় সু নবষড়াবফ, ৎবংঢ়বপঃবফ ঃবধপযবৎ খধঃব গৎ. অনফঁহ ঘঁৎ ঈযড়ফিযঁৎু. ওঃ রং ধ সধঃঃবৎ ড়ভ ঢ়ৎরফব ধহফ মষড়ৎু ঃড় নব ধ ংঃঁফবহঃ ড়ভ ংঁপয ধ মৎবধঃ ঃবধপযবৎ. ঐধফ ঃযবৎব নববহ ড়হ অনফঁহ ঘঁৎ ঈযড়ফিযঁৎু, ও সরমযঃ হড়ঃ যধাব নববহ রহ ঃযরং ঢ়ড়ংরঃরড়হ যিবৎব ও ধস হড়.ি ও ধস বীঃৎবসবষু মষধফ ঃড় শহড়ি ঃযধঃ ধ ংযপড়ষধৎংযরঢ় রং মড়রহম ঃড় নব রহঃৎড়ফঁপবফ রহ যরং হধসব ধহফ ড়হ ঃযরং ড়পপধংরড়হ ধ ংাঁবহরৎ রং মড়রহম ঃড় নব ঢ়ঁনষরংযবফ. ও ধস ৎবধষষু ঢ়ৎড়ঁফ ড়ভ ঃযরং বভভড়ৎঃ.
গৎ. অনফঁহ ঘঁৎ ঈযড়ফিযঁৎু, ধ ফবফরপধঃবফ ঃবধপযবৎ লড়রহবফ ঝযধরংঃধমধহল ঐরময ঝপযড়ড়ষ ধং ধ ংপরবহপব ঃবধপযবৎ রহ ১৯৪৬ ধহফ ংঢ়বহঃ ঃযব যিড়ষব ড়ভ যরং ষরভব ঃযবৎব, ঐব নবপধসব ঐবধফ গধংঃবৎ রহ ১৯৫৬ ধহফ ৎবঃরৎবফ ভৎড়স ঃযরং রহংঃরঃঁঃরড়হ রহ ১৯৯০. ও যধফ নববহ ধ ংঃঁফবহঃ ড়ভ ঝযধরংঃধমড়হম ঐরময ঝপযড়ড়ষ ভৎড়স ১৯৬৪-১৯৬৭. ও ঢ়ধংংবফ ঝ. ঝ. ঈ রহ ১৯৬৭ ধহফ ংঃড়ড়ফ ১২ঃয রহ ঈড়সরষষধ ইড়ধৎফ রহ ঐঁসধহরঃরবং. ওঃ রং ষধঃব গৎ. অনফঁহ ঘঁৎ ঈযড়ফিযঁৎু ধষড়হম রিঃয ড়ঃযবৎ ঃবধপযবৎং যিড় রং ঃড় নব মরাবহ পৎবফরঃ ভড়ৎ সু ংঁপপবংং.
খধঃব গৎ. অনফঁহ ঘঁৎ ঈযড়ফিযঁৎু, ধ সধহ ড়ভ ংঃৎড়হম ঢ়বৎংড়হধষরঃু ধহফ রহঃবমৎরঃু ধিং ধ াবৎু মড়ড়ফ ধফসরহরংঃৎধঃড়ৎ. ঠবৎু ড়ভঃবহ যব ড়িঁষফ ধিষশ ধৎড়ঁহফ ঃযব ংপযড়ড়ষ পধসঢ়ঁং. ওঃ ংববসবফ ঃড় সব ঃযধঃ ঃযব ংঃঁফবহঃং, ঃযব ঃবধপযবৎং বাবহ ঃযব ঃৎববং ড়িঁষফ নড়ি ঃযবরৎ যবধফং রহ ৎবংঢ়বপঃ ঃড় যরস. ঊাবৎুঃযরহম ধিং রহ ড়ৎফবৎ ডব ঃযব ংঃঁফবহঃ ভবধৎবফ যরস নবপধঁংব ধঃ ঃযধঃ ঃরসব বি ফরফ হড়ঃ যধাব ঃযব ধনরষরঃু ঃড় ংরফপড়াবৎ ঃযব ংঃৎবধস ড়ভ ধভভবপঃরড়হ ভষড়রিহম রহ যরং যবধৎঃ ঁহফবৎ যরং মৎধহরঃব ষরশব পযধৎধপঃবৎ.
গৎ. অনফঁহ ঘঁৎ ঈযড়ফিযঁৎু ড়িঁষফ ধষধিুং ংঢ়বধশ রহ ঃযব ফরষবপঃ ড়ভ ঝুষযবঃ. ঙহব ফধু যিবহ ও ধিং ধ ংঃঁফবহঃ ড়ভ পষধংং ওঢ যব যরসংবষভ পধষষবফ সব রহ যরং ড়ভভরপব. ওঃ ধিং য়ঁরঃব ঁহঁংধষ. ও ধিং ধভৎধরফ ধহফ রিঃয ভবধৎ ও বিহঃ ঃড় যরং ড়ভভরপব. ও ধিং ঃৎবসনষরহম. ঐব মধাব সব ধ ভড়ৎস, লঁংঃ ঃড় ভরষষ রঃ রহ ধহফ রঃ ধিং ধহ ধঢ়ঢ়ষরপধঃরড়হ ভৎড়স ভড়ৎ ংপযড়ষধৎংযরঢ়.
অভঃবৎ ঃযব ঃবংঃ বীধস, গৎ. অনফঁহ ঘঁৎ ঈযড়ফিযঁৎু ড়িঁষফ ঃধশব ংড়বপরধষ পষধংং ড়ভ গধঃযবসধঃরপং ধহফ ঊহমষরংয ভড়ৎ ঃযব ঢ়ৎড়ংঢ়বপঃরাব ংঃঁফবহঃং যিড় বীঢ়বপঃবফ মড়ড়ফ ৎবধংঁষঃং. ডব ঢ়ধরফ হড়ঃযরহম বীঃৎধ. ঐব ফরফ রঃ ড়ভ যরং ড়হি ধপপড়ৎফ ভড়ৎ ঃযব ংধশব ড়ভ ঃযব রহঃবৎবংঃ ড়ভ ঃযব ংঃঁফবহঃং ধহফ ংপযড়ড়ষ. খধঃব গৎ. অনফঁহ ঘঁৎ ঈযড়ফিযঁৎু হড়ঁৎরংযবফ ঝযধরংঃধমড়হল ঐরময ঝপযড়ড়ষ ধং যরং ড়হি পযরষফ, ওঃ ধিং যরং ফৎবধস, ারংরড়হ ধহফ সরংংরড়হ.
ও ধস ৎবধষু ঢ়ৎড়ঁফ ড়ভ নবরহম ধ ংঃঁফবহঃ ড়ভ ংঁপয, মৎবধঃ ঃবধপযবৎ, ধ মৎবধঃ সধহ. গধু অষষধয নষবংং যরস রিঃয বঃবৎহধষ ঢ়বধপব ধহফ ংধষাধঃরড়হ.
ডৎরঃবৎ : চৎরহপরঢ়ধষ তধযঁৎ ঈযধহ ইরনর গড়যরষধ ঈড়ষষবমব
ঠরপব-ঈযধরৎসধহ, ঐধনরমধহল ংধফধৎ টঢ়ধুরষধ চধৎরংযধফ
ঋড়ৎসবৎ খবপঃঁৎবৎ ওহ ঊহমষরংয, ঘড়ঃৎব উধসব ঈড়ষষবমব, উযধশধ.

আমাদের স্যার
আমার কৈশোর জীবনের উত্তাপমাখা সময়ে তখনো নিজেকে শনাক্ত করতে পারিনি। ঠিক সে সময়ে একজন মানুষকে দেখছি একটি প্রতিষ্ঠানের মতো বিস্তৃত, স্বমহিমায় সমুজ্জ্বল। আমি আমার প্রয়াত শিক্ষক ‘হেড মাস্টার স্যার’, অর্থাৎ আবদুন নূর চৌধুরী সাহেবের কথা বলছি।
কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের তাল গাছ কবিতাখানি যখন পড়ি তখন খুব স্বতঃস্ফূর্তভাবে বলতে ইচ্ছা করে, আমার এ প্রিয় শ্রদ্ধেয় স্যারই ‘এক পায়ে দাঁড়িয়ে সব গাছ ছাড়িয়ে’ এখনো আমার মননে আমার বোধের সৃজনশীল অন্বেষণে বসবাস করছেন।
আমরা যারা জীবনের মধ্যবয়সে দাঁড়িয়ে, ‘স্যার’ শিক্ষক বলতে যা অনুভব করি, এমন একজন সমুজ্জ্বল ব্যক্তিত্ব হিসেবে আমরা আমাদের স্যার আবদুন নূর চৌধুরী সাহেবকে পেয়েছিলাম।
একজন মানুষ ক্রমশ বিকশিত হতে থাকেন তাঁর নীতিবোধ, তাঁর সততা, তার কর্মোদ্দীপনা, তার সৃষ্টিশীলতা দিয়ে, জীবনের সুস্থ সিদ্ধান্তে অটল থাকার কঠিন পরীক্ষার মধ্যদিয়ে। আমাদের হেড মাস্টার স্যার জীবনের চড়াই-উৎড়াইয়ের কঠিনতম পরীক্ষায় অবশ্যই উত্তীর্ণ হতে সক্ষম হয়েছিলেন। আজকের সমাজ বাস্তবতায় নির্লোভ জীবন যাপন করে লেখাপড়ার মাধ্যমে জীবনকে পরিপূর্ণ করে তুলতে মূল শিক্ষাট্ াতার কাছ থেকে আমি পেয়েছিলাম।
আমার সারাটা জীবন তাই তাঁর কাছে ঋণী। এ ঋণ শোধ করার শক্তি, যোগ্যতা কোনোটাই আমার নেই। সুশৃংখল স্কুল প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা, শিক্ষকমন্ডলীকে নিয়মিত শিক্ষাদানে ব্যস্ত রাখা, ছাত্রদের নিয়মানুবর্তিতার কঠোর অনুশীলন এবং হৃদয়ভরা নিঃসীম ভালোবাস দিয়ে একটি পরিবারের মতো শায়েস্তাগঞ্জ হাইস্কুলকে তিনি গড়ে তুলেছিলেন। তার মৌন প্রশান্ত ব্যক্তিত্বের অনবদ্য স্পর্শে স্কুল প্রাঙ্গণ শিক্ষার্থীদের পদভারে কেমন যেন শান্ত মুখরতায় ভরে উঠতো।
এ বিশাল ঈর্ষণীয় ব্যক্তিত্বকে নিয়ে লেখা যেমন কঠিন, তেমনি নিঃশব্দ আবেগ আমাকে প্রচÐভাবে তাড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে।
কেবলই মনে পড়ে, এই তো সেদিন দীর্ঘদেহী আদর্শ মানুষটি স্কুলের লম্বা বারান্দা ধরে সামনের দিকে ঝুঁকে গভীর পদক্ষেপে এগিয়ে যাচ্ছেন ক্লাসরুম অথবা মাঠের দিকে। কখনো কখনো পায়চারী করছেন স্কুল প্রাঙ্গণে। আবার নিজের মৌনতা নিয়ে কি যেন খুঁজে বেড়িয়েছেন তন্ময় হয়ে।
মানুষ আসে, মানুষ চলে যায়। কিন্তু তার কর্মের রূপময় অপরূপ চিহ্ন আমাদের নিয়ে যেতে থাকে অতীতের নস্টালজিয়ার বিস্তীর্ণ উপকূলে। যেখান থেকে নিজেকে উপলব্ধি করার শক্তি সঞ্চারিত হয়। এমনি একজন মানুষ আমাদের প্রিয় হেডমাস্টার স্যার। তার অমলিন কর্মযজ্ঞের স্মৃতি চিহৃ দ্বারা আমরা মুগ্ধ হই। আমরা হই উজ্জীবিত এবং খুঁজে পাই জীবনের অনাগত দিনের নির্দেশনা।
লেখক : এসএসসি ১৯৭৬ (মানবিক)

শায়েস্তাগঞ্জ বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়
আমার প্রিয় প্রাঙ্গন
শায়েস্তাগঞ্জ বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ের একজন প্রাক্তন ছাত্রী আমি। আজ থেকে ৩৪ বছর আগে ১৯৭৫ সালে এ স্কুল থেকে এসএসসি পাস করে স্কুল ছেড়ে এমনকি শায়েস্তাগঞ্জ ছেড়ে চলে এসেছি। ৩৪ বছর পরেও এ স্কুল, এর শত সহ¯্র স্মৃতি আমার মনকে নাড়া দেয়, প্রবলভাবে অস্তিত্বে জানান দেয়। স্মৃতিকাতর, শোককাতর এ আমি আজ স্মরণ করছি বিনীত শ্রদ্ধায় আমার প্রিয় শিক্ষক, এ স্কুলের দীর্ঘদিনের প্রধান শিক্ষক মরহুম আবদুন নূর চৌধুরী স্যারকে।
একদিন প্রথম আলো পত্রিকায় স্যারের মৃত্যু সংবাদটি পড়ি। আমি বেদনাহত হই। পত্রিকার রিপোর্টেই জানতে পারি স্যারের ছেলে জাহেদ চৌধুরী ‘আমার দেশ’ পত্রিকার রিপোর্টার। ঢাকায় থাকার সুবাদে তাকে খুঁজে পাই। জানতে পাই স্যারের শেষ ক’বছরের যাপিত জীবনের কথা। দুঃখ হয় ৩০ বছর ধরে ঢাকায় বসবাস করেও স্যারের সংবাদ নিতে না পারায়। তাই অপরাধবোধ আমাকে তাড়িয়ে নিয়ে বেড়ায় প্রতিনিয়ত।
শায়েস্তাগঞ্জ বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয় আমর হৃদয়ে ছবির মতো গেঁথে রয়েছে। স্কুল এর সুপরিসর ক্লাস রুম, মাঠ যেন আমায় আজও ডাকে। ভাবি সেই সোনাঝরা দিনগুলোর মতো আজও যদি মাঠের ধুলোবালি অঙ্গে জড়িয়ে নিতে পারতাম। সেই সব প্রাচীন বয়সী বৃক্ষগুলো আজও হয়তো তেমনি করে স্কুলটিকে পরম মমতায় আগলে রেখেছে। আমার দূরন্ত শৈশবের কৈশোরের মধুরতম ৬টি বছর কেটেছে এ স্কুলে। স্মৃতিভরে তাই আমি বেদনাবিহŸল, আবার আনন্দে উদ্বেলও।
মরহুম আবদুন নূর স্যারকে ১৯৭১ সাল থেকে ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত দেখেছি। তিনি ছিলেন অনুপম ব্যক্তিত্বের অধিকারী, স্বল্পভাষী কিন্তু স্পষ্টবাদী এক গম্ভীর প্রকৃতির লোক। টেস্ট পরীক্ষার পর যখন তিনি আমাদেরকে উচ্চতর গণিতের ক্লাস নিতে শুরু করেন তখন আমাদের প্রতি তার যে আন্তরিকতা ও মমত্ববোধের প্রকাশ দেখেছি তা তুলনাহীন। স্বল্পবাক, কঠিন, গম্ভীর, অপরিমেয় ব্যক্তিত্ববান এক শিক্ষকের ভেতরেও যে এক কোমল ¯েœহপরায়ণ মন বামস করে তার নিদর্শন তার মধ্যে আমরা তখন পেয়েছিলাম। কী মমতায়ই না তিনি কঠিন বিষয়টিকেও সহজবোধ্য করে দিতেন। বস্তুত আদর্শ শিক্ষকের এক অভ্যুজ্বল উদাহরণ তিনি।
ভালো লাগছে জেনে স্যারেরই সুযোগ্য উত্তরাধিকারী তার সন্তানেরা স্যারের নামে এ স্কুলের ছাত্রছাত্রীদের মেধার স্বীকৃতি দানে এগিয়ে এসেছে। এ জন্য আমি এ স্কুলের প্রাক্তন ছাত্রছাত্রীদের পক্ষ থেকে তাদের অভিনন্দন জানাই, কৃতজ্ঞতা জানাই। স্যারের বিদেহী আত্মার চিরায়ত পারলৌীকক শান্তি কামনা করি। প্রসঙ্গত আমাদের প্রত্যাশা থাকবে, তাদেরই মতো অন্যরাও এমনি উদ্যোগ নিয়ে এগিয়ে আসবেন, শায়েস্তাগঞ্জ হাইস্কুলের সুনাম বৃদ্ধি করবেন।
আজও আমার স্মরণের বীনায় ঝংকার তুলে এ স্কুলের আমার স্যারদের কথা। মনে পড়ে খালেক স্যার, ওমর আলী স্যার, সাইফুল ইসলাম স্যার, নৃপেন্দ্র স্যার, সফিউর রহমান স্যার, রঞ্জিত স্যারসহ আরও অনেক স্যারের কথা। আমার প্রিয় স্যারদের সবাইকে আজ এ সুযোগে শ্রদ্ধা জানাই। আর যারা মৃত্যুবরণ করেছেন তাদের প্রতি আমি আমার শ্রদ্ধা নিবেদন করছি, বিনয়াবনত চিত্তে স্মরণ করছি তাদের, তাদের বিদেহী আত্মার চিরায়ত শান্তি কামনা করছি।
সকালের সোনাঝরা নরম রোদে, দুপুরের দাবদাহে পড়ন্ত বিকেলের মিঠে আর ফিকে আলোয়, ঘনঘোর বরিষায়, ষড়ঋতুর বৈচিত্র্য আমি আমার এ স্কুলকে অতি কাছে থেকে দেখেছি, আর এর বিচিত্র রূপে মুগ্ধ হয়েছি। সেই মুগ্ধতার আবেশ এখনো আমার কাটেনি। তাই শ্রদ্ধা জানাই এ স্কুল আর এর শিক্ষকদের প্রতি। সেদিনের সেই আমাদেরই বয়সী আজকের কিশোর-কিশোরীদের পদচারণায় এ স্কুল প্রাঙ্গন এখন মুখরিত। মহাকারে অমোঘ বিধানে এ ধারা চলমান থাকবে আবহমান কাল। এ স্কুলের বর্তমান ও ভবিষ্যতের ছাত্রছাত্রীদের ইতিহাস গড়বে-এ প্রত্যাশা অন্য সবার মতো আমারও।
লেখিকা : ১৯৭৫ ব্যাচের ছাত্রী।

আবদুন নূর চৌধুরী : একজন আদর্শ শিক্ষকের প্রতিকৃতি
আলহাজ্ব আবদুন নূর চৌধুরী। বাংলাদেশের মাধ্যমিক পর্যায়ে শিক্ষাঙ্গনের পরিচিত নাম। ১৯৪৬ সালে শায়েস্তাগঞ্জ উচ্চ বিদ্যালয়ে যোগদানের মাধ্যমে তিনি শিক্ষকতার মহান পেশায় আত্মনিয়োগ করেন। ১৯৫৬ সালে তিনি প্রধান শিক্ষক হিসেবে পদোন্নতি লাভ করেন। সুদীর্ঘ ৩৫ বছর প্রধান শিক্ষক পদে অত্যন্ত সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেন। আলহাজ্ব আবদুন নূর চৌধুরী একাধারে ১৭ বছর বৃহত্তর সিলেট জেলার শিক্ষক সমিতির সভাপতি এবং ১৫ বছর বাংলাদেশ শিক্ষক সমিতির কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-সভাপতি ছিলেন। প্রায় ৫ বছর বাংলাদেশ শিক্ষক সমিতির কেন্দ্রীয় সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন।
একজন আদর্শ শিক্ষকের পথিকৃৎ আলহাজ্ব আবদুন নূর চৌধুরী। তিনি যখন শায়েস্তাগঞ্জ উচ্চ বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষকের দয়িত্ব পালন করেন তখন স্কুলের সার্বিক উন্নতি ও অগ্রগতি সাধিত হয়। স্কুলের পড়ালেখার সুষ্ঠু পরিবেশ সৃষ্টি করতে পেরেছিলেন তিনি। তার আমলে স্কুলের পরীক্ষার রেজাল্ট কুমিল্লা বোর্ডে ভালো অবস্থানে থাকতো। আবদুন নূর চৌধুরী আমার প্রিয় শিক্ষক। তিনি আমার শ্রদ্ধেয় মায়েরও শিক্ষক। যদিও আমি তার সরাসরি ছাত্র নই, তবে আমার পিতার সঙ্গে তার খুবই ভালো সম্পর্ক ছিল। সেই সুবাদে তার বাসায় আমার আসা-যাওয়া হতো। আবদুন নূর চৌধুরী আমাকে খুবই ¯েœহ করতেন। আমি তাকে কাছ থেকে দেখেছি। অবসর জীবনে প্রায় প্রতিদিনই বিকাল বেলা স্যারের বাসায় গিয়ে স্যারের সঙ্গে কথা হতো। আমি তাকে দেখেছি একজন আদর্শ, সত্যনিষ্ঠ, অমায়িক, ধার্মিক ব্যক্তি হিসেবে।
তিনি স্কুলের ছাত্রছাত্রীদের যেমন প্রিয় শিক্ষক ছিলেন, তেমনি শাসন করার ক্ষেত্রে ছিলেন আপসহীন। আবদুন নূর চৌধুরীর হাতে গড়া ছাত্রছাত্রী বাংলাদেশ জাতীয় সংসদ থেকে শুরু করে ইউনিয়ন পর্যন্ত প্রতিটি স্তরেই রয়েছে। বাংলাদেশ সুপ্রিমকোর্টের সাবেক প্রধান বিচারপতি সৈয়দ জে আর মোদাচ্ছির হোসেনও আবদুন নূর চৌধুরীর ছাত্র।
আলহাজ্ব আবদুন নূর চৌধুরী যখন বাংলাদেশ শিক্ষক সমিতির সভাপতি ছিলেন তখন শিক্ষক সাজের ন্যায্য অধিকার আদায়ে তিনি অনবদ্য ভূমিকা পালন করেন। তাই বাংলাদেশ শিক্ষক সমিতি আজীবন তাকে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করবে। ১৯৮৬ সালে শিক্ষকদের ন্যায্য দাবি আদায় করার জন্য কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে সমাবেশ করে ফেরার পথে সরকার ওনাকে গ্রেফতার করে। আলহাজ্ব আবদুন নূর চৌধুরী সেন্টজন্স এম্বুলেন্সের প্রাথমিক চিকিৎসা বিধানে সিভিল ডিফেন্স লোকেল ইন্সট্রাক্টর হিসেবে এবং জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। তিনি বিভিন্নভাবে প্রায় এক যুগ বাংলাদেশ স্কাউট আন্দোলনের সাথে সংশ্লিষ্ট ছিলেন। বিভাগীয় ও কেন্দ্রীয় কাউন্সিলের সদস্য ছিলেন এবং স্কাউট আন্দোলনে অবদানের জন্য ১৯৮৮ সালে তিনি বাংলাদেশ স্কাউট থেকে সম্মানসূচক প্রশংসাপত্র লাভ করেন। আবদুন নূর চৌধুরী মাধ্যমিক শিক্ষা সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে বিশেষ অবদানের জন্য ১৯৭৮ সালে শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে সম্মাননাপত্র লাভ করেন। ১৯৮৬ সালে হবিগঞ্জ সদর উপজেলার শ্রেষ্ঠ শিক্ষানুরাগী নির্বাচিত হন। এছাড়া প্রবাসী বাংলাদেশীদের সংগঠন বাংলাদেশ ন্যাশনাল স্টুডেন্টস অ্যাওয়ার্ডের পক্ষ থেকে পল্লী অঞ্চলে শিক্ষা উন্নয়নে বাস্তবমুখী পদক্ষেপ নেয়ার জন্য ১৯৯০ সালে তিনি ‘পল্লী রতœ’ উপাধি পান। ২০০৩ সালে শায়েস্তাগঞ্জ সাহিত্য ও সংস্কৃতি পরিষদ থেকে শিক্ষা ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদানের জন্য তিনি গুণীজন পদকে ভূষিত হন।
আদর্শ শিক্ষক আলহাজ্ব আবদুন নূর চৌধুরী শিক্ষকতার পাশাপাশি শায়েস্তাগঞ্জে বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তিনি শায়েস্তাগঞ্জ ডিগ্রি কলেজ প্রতিষ্ঠা কমিটির অন্যতম সদস্য এবং ৫ বছর এর প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি এক যুগ কলেজের গভর্নিং বডির সদস্য ছিলেন। তিনি শায়েস্তাগঞ্জ সিনিয়র মাদ্রাসার উন্নয়ন কমিটির সদস্য এবং গভর্নিং বোর্ডের সহ-সভাপতি হিসেবে সুদীর্ঘ ২২ বছর কাজ করেছেন। শায়েস্তাগঞ্জ পুরান াজার জামে মসজিদের কার্যকরি কমিটি এবং শায়েস্তাগঞ্জ সমাজ কল্যাণ সোসাইটির সভাপতি এবং শায়েস্তাগঞ্জ সাহ্যি ও সংস্কৃতি পরিষদের উপদেষ্টা ছিলেন।
আলহাজ্ব আবদুন নূর চৌধুরী ১৯২৬ সালে সিলেটের জকিগঞ্জের নূরনগর গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা মোদাচ্ছির আলী চৌধুরী এবং মা জোবেদা খাতুন চৌধুরী। তিনি জকিগঞ্জের নূরনগরে প্রাথমিক শিক্ষা সমাপ্ত এবং প্রথমে কানাইঘাট উচ্চ বিদ্যালয় এবং পরে সরকারি পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেন। ১৯৪৩ সালে তিনি প্রথম বিভাগে ম্যাট্রিক পাস করেন। ১৯৪৫ সালে সিলেট এমসি কলেজ থেকে প্রথম শ্রেণীতে উচ্চ মাধ্যমিক পাস এবং ১৯৪৭ সালে একই কলেজ থেকে ডিগ্রি পাস করেন। ১৯৬৩ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব এডুকেশন রিসার্চ সেন্টার থেকে কৃতিত্বের সঙ্গে এমএড পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। আলহাজ্ব আবদুন নূর চৌধুরী ব্যক্তিগত জীবনে খুবই ধার্মিক এবং একজন আলোকিত মানুষ। ২০০৮ সালের ২১ সেপ্টেম্বর তিনি পরলোক গমন করেন। তার সন্তানরা স্ব স্ব ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত। তারা কর্মজীবনে পিতার আদর্শ অনুসরণ করছেন।
লেখক : সাধারণ সম্পাদক, হবিগঞ্জ নাগরিক কমিটি

আকিলা নূর ফাউন্ডেশনের বৃত্তিপ্রাপ্ত বিভিন্ন ক্লাসের ছাত্রছাত্রীদের নাম-পরিচয়
৭ম শ্রেণী
প্রথম স্থান : মাহমুদুল হাসান রিফাত, পিতা মো. সিরাজুল ইসলাম, মাতা, কুহিনূর বেগম, গ্রাম দ. লেজাপাড়া, পো. শায়েস্তাগঞ্জ, জেলা, হবিগঞ্জ।
দ্বিতীয় স্থান : মো. মশিউর রহমান, পিতা এখলাছুর রহমান, মাতা, ডা. মমতাজ বেগম, গ্রাম. কুটিরগাঁও, পো. রামশ্রী, জেলা, হবিগঞ্জ।
তৃতীয় স্থান : সোহাগ হোসাইন, পিতা. আ: আজিজ, মাতা, রুনু আক্তার, গ্রাম উবাহাটা, পো. শায়েস্তাগঞ্জ, জেলা, হবিগঞ্জ।
৮ম শ্রেণী
প্রথম স্থান : সুলতানা আক্তার, পিতা, মো. আবদুল গনি, মাতা-রূপচাঁন বিবি, গ্রাম-উবাহাটা, পো. শায়েস্তাগঞ্জ, জেলা, হবিগঞ্জ।
দ্বিতীয় স্থান : সুনন্দা রানী দাস, পিতা, বিজয় আনন্দ দাস, মাতা, দুর্গা রানী দাস, গ্রাম, সাবাসপুর, পো. শায়েস্তাগঞ্জ, জেলা, হবিগঞ্জ।
তৃতীয় স্থান : আয়েশা সিদ্দিকা, পিতা, আবদুল গফফার, মাতা, জেসমিন নাহার,গ্রাম, লেনজাপাড়া, পো. শায়েস্তাগঞ্জ, জেলা, হবিগঞ্জ।
নবম শ্রেণী
প্রথম স্থান : রওশন আরা তৃপ্তি, পিতা-ফজলুল হক, মাতা-গোলশান আরা, গ্রাম-লেনজাপাড়া, ওয়ার্ড নং ৬, শায়েস্তাগঞ্জ পৌরসভা, পো. শায়েস্তাগঞ্জ, জেলা, হবিগঞ্জ।
দ্বিতীয় স্থান : মো, তামীম আহমেদ, পিতা আকরাম গাজী, মাতা, সীমা বেগ, গ্রাম দক্ষিণ লেনজাপাড়া, পো. শায়েস্তাগঞ্জ, জেলা, হবিগঞ্জ।
তৃতীয় স্থান : সুজন রায়, পিতা শংকর রায়, মাতা অঞ্জলী রায়, গ্রাম পূর্ব লেনজাপাড়া, পো. শায়েস্তাগঞ্জ, জেলা, হবিগঞ্জ।
দশম শ্রেণী : বিজ্ঞান বিভাগে প্রথম স্থান : জাহিদ হাসান টিপু, পিতা-মো. হোসেন ভূইয়া, মাতা-সালমা বেগম, গ্রাম-পীর কাশিমপুর, পো. পীর কাশিমপুর, জেলা-কুমিল্লা। ব্যবসায় শাখায় প্রথম স্থান : মো. আজিজুল ইসলাম নাসির, পিতা-আলাই মিয়া, মাতা-রওশন আরা বেগম, গ্রাম-দক্ষিণ লেনজাপাড়া, পো. শায়েস্তাগঞ্জ, জেলা, হবিগঞ্জ।
মানবিক বিভাগে প্রথম স্থান : মো. পারভেজ আলী, পিতা-মোহাম্মদ আলী, মাতা-রোকেয়া বেগম, গ্রাম-প্রতাবী, পো. কুলাউড়া, জেলা-মৌলভীবাজার।

কালের আহাজারি
১০ মে সকাল পৌনে দশটায় পলিনের ফোন। ফোন রিসিভ করার ইচ্ছা এবং সামর্থ্য আমার কোনোটাই ছিল না। শরীর তখনো জ্বরে কাঁপছে। সারারাতের জ্বরে নিজের নামশুদ্ধ সব ভুলে গেছি। কিন্তু পলিনের ফোন সাথে সাথে রিসিভ না করলে এর কঠিন কৈফিয়ত দিতে হবে। ওর বাজে বাজে মন্তব্য গাধার ভালো শরীরেও জ্বর এসে যায় এ অবস্থা। তাই প্রথমে ওকে আমার জ্বরের কথা বললা। তারপর জানতে পারলাম চৌধুরী আসছে। তৌহিদ চৌধুরী। যার সাথে ’৯৮-এর পর মাত্র একবার দেখা হয়েছিল। দীর্ঘদিনের বিলেতি জীবনে সে আমার ডাকে সাড়া দিয়ে সুদূর বিলেত থেকে এসেছিল। বিলেতে যাওয়ার আগে যেস বাংলাদেশ পাবলিক সার্ভিস কমিশনের পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে গিয়েছিল। আর এতে তার চাকরি হয়েীছল সহকারী পুলিশ সুপারের। বন্ধুরা সবাই কি দারুণ খুশি। আমাদের মধ্যে সবচেয়ে লিকলিকে ও ছোটখাটো গড়নের বন্ধুটাই কিনা পেল বাংলাদেশের মানুষের রাজা পুলিশের চাকরি। কিন্তু সে এই চাকরি করবে কিনা ঠিক নেই। সালেহীনের নেতৃত্বে আমরা সবাই মিলে একই চিঠিতে মতামত লিখললাম প্রায় কুড়িজনে। তখনই আমাদের ডাকে তার বাংলাদেশে আসা এবং দেখা। এরপর থেকে াঝে মধ্যে ফোনে কথাবার্তা হয় পিএইচডি শেষ করে কোনো কিছু করার জন্যও স্থায়ীভাবে দেশে চলে আসবে শুনে কখনো ভালো লাগে, আবার কখনো খুব খারাপ লাগে।
মন কিছুতেই মানছিল না, তাই জ্বর নিয়েও গেলাম প্লাটফর্মে। সেখানে আরো অপেক্ষা করছিল মামুন, মালেক, হারুন, পলিন, আহাদসহ আরো অনেকে। পলিনের কাছ থেকে চৌধুরীর দেশে ফেরা এবং শায়েস্তাগঞ্জে আসার কারণ জানলাম। একই সঙ্গে তার পিতা ও শিক্ষক শায়েস্তাগঞ্জ উচ্চ বিদ্যালরে সাবেক প্রধান শিক্ষক তথা একদঞ্চলের শিক্ষক প্রাণপুরুষ ও সমাজপিতা জনাব মরহুম আবদুন নূর চৌধুরী ও মাতা আকিলা খানম চৌধুরীর সুযোগ্য উত্তরসূরি দ্বারা গঠিত আকিলা-নূর ফাউন্ডেশনের শুভযাত্রা ঘোষণা ও বৃত্তি প্রদানের জন্য তার এই আসা। নিভে যাওয়া প্রদীপ আর কে জ্বালাবে সন্তান ছাড়া। হ্যাঁ, হাজার হাজার সন্তান যার রয়েছে তার প্রদীপ তো একবার না একবার জ্বলবেই। কেউ না কেউ সলতে, তেল, আর আলোর উৎস নিয়ে এসে সমন্বয়ের হাত বাড়াবেই। স্মৃতির কালোমেঘ মুহূর্তের মধ্যে নের পুরো আকাশ ছেয়ে গেল। বৈশাখের রোদে পোড়া চারদিক, তবও তাকালাম দূর দিগন্তে। চোখ কতদূর দেখতে পারে? দৃষ্টি কত দূর গিয়ে আবার ফিরে আসে? মনের তুলনায় খুবই কম। একজন আবদুন নূর চৌধুরী শায়েস্তাগঞ্জের এই বিশাল জনপদের বিপুল জনগোষ্ঠীর সমাজপিতার পাশাপাশি শিক্ষক ১৯৪৬ থেকে ১৯৫০ এবং ১৯৫৬ সাল থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করেন দীর্ঘ ৩৪ বছর। ক্ষণজন্মা ও কালজয়ী এ সমাজপিতা, যার হাত দিয়ে প্রতিষ্ঠা পেয়েছেন। বিচারপতি থেকে ডাক্তার প্রকৌশলীসহ শত সহ¯্র সমাজ ধারক, শিক্ষক, তিনি কেন কালের তোড়ে ভেসে যাবেন। তার সৃষ্টির প্রায় অর্ধশতাব্দী সময় কি এতোই নগন্য? কখনো না। এখানে ছিল শুধু একটা শুভ সময় ও সূচনার অভাব মাত্র। আমার জানামতে ইতোপূর্বে শায়েস্তাগঞ্জ সুশীল সমাজে আবদুন নূর চৌধুরীর নামে একটা ট্রাস্ট গঠনের কথা আলোচনা হয়েছে। আলোচনায় এসেছে শায়েস্তাগঞ্জ উচ্চ বিদ্যালয়ে প্রবেশের মূল রাস্তাটি স্যারের নামে নামকরণের। এই ঋণ যে অর্ধশতাব্দীর, শায়েস্তাগঞ্জের পুরো জনগোষ্ঠীর তাহলে এর কিঞ্চিৎ হলেও কেউ না কেউ শোধরাবেই।
ট্রেন প্রায় দেড় ঘন্টা দেরিতে এসে পৌছলো প্লাটফর্মে। এদিক-ওদিক আমরা সবাই তাকালাম চৌধুরীকে খুজতে। হঠাৎ পশ্চিম দিক তাকাতেই দেখতে পেলাম কাদে ল্যাপটপের ভারি ব্যাগসহ ল্যান্সঅলা চশমা পরা একজন পরিপুষ্ট ভদ্রলোককে। ভালোভাবে তাকিয়ে নিশ্চিত হলাম। হ্যাঁ, চৌধুরীই তো। হায় সময়! কত দ্রæত বদলায়। কত কি যে কেড়ে নিয়ে যায়, আবার অনেক কিছুই ফেলে রেখেও চলে যায়। সবাই এগুলাম তার দিকে। কাছে যেতে যেতেই আমার জ্বরে তাপিত শরীর শিউরে উঠলো। ভেতরে ভেতরে স্যারের দানদীক্ষার স্মৃতি আর বাইরে এ কোন চিত্র। তৌহিদের চোখের চশমা ঠিক যেখানে থাকার সেখানে নেই। চোখ থেকে একটু ফাঁক হয়ে চশমা নিচের দিকে ঝুলে আছে। এ দৃশ্যটা অনেক ক্ষেত্রেই বেশ রোমান্টিক হয়ে থাকে। কিন্তু আমার কাছে কেন যেন খুব পুরনে কোনো স্মৃতি আর কঠিন কোনো ভয়ের মিশ্র অনুভূতিতে মিশে গিয়ে তালগোল পাক খাচ্ছিল। তৌহিদের সাথে সবার তো আমারও করমর্দন হলো, ভাব ও কুশল বিনিময় হল। সিএনজি চেপে সবাই আমাদের গন্তব্য রওনা হলাম। কিন্তু আমার এই অনুভূতির যেন শেষ হলো না। সিএনজি এসে শায়েস্তাগঞ্জ উচ্চ বিদ্যালয়ের মূল গেটে থামল। তৌহিদের স্কুলে আসার বিষয়টা যেহেতু পূর্বপরিকল্পিত সেহেতু স্কুলের হেড স্যারসহ আরো অনেকেই রাস্তা পর্যন্ত এগিয়ে এলেন। সবাই গিয়ে বসলাম অফিসে। তৌহিদের এই অর্ধব্যবৃহত চশমা ফাঁকের ঘোর তখনও কাটছিল না। আমি পুরো স্কুলটা দেখলাম। এই সেই পুরনো কারখানা যেখানে আবদুন নূর চৌধুরী নামের একজন দক্ষ কারিগর অত্যন্ত কৌশল ও সফলতার সঙ্গে, বিশেষ করে মধ্যবিত্ত, নি¤œ মধ্যবিত্ত ও নি¤œমধ্যবিত্ত পরিবারের শতসহ¯্র উপাদান ও উপাখ্যানের জন্ম দিয়েছিলেন। বিদ্যালয়, মাঠ, ছাত্রছাত্রী, শিক্ষক সব কিছুই ঠিকই আছে কিন্তু কোথায় যেন এর প্রাণচাঞ্চল্যতার স্ফলন ঘটে গেছে। আবদুন নূর চৌধুরীর শায়েস্তাগঞ্জ উচ্চ বিদ্যালয় আর আজকের শায়েস্তাগঞ্জ উচ্চ বিদ্যালয় এই দুইয়ের মাঝে যেন বিস্তর ফারাক বিরাজ করছে। ছাত্র এবং ছাত্রীরা আলাদা ক্লাস করছে। আমি মনে মনে ভাবলাম ঘরের ভেতরে দয়াল। কই তখন তো এই দেয়ালের প্রয়োজন ছিল না। মুহূর্তের মধ্যে আমার শরীর শিউরে উঠল। তৌহিদের চশমার ফাক করে পরার দৃশ্যের সাদৃশ্য আমার কাছে স্পষ্ট হয়ে উঠতে লাগল। তখন ১৯৮৮ ইংরেজি সাল। (এখানে একটা কথা বলা দরকার, আমি শায়েস্তাগঞ্জ উচ্চ বিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলাম না। আমি সুকরিপাড়া উচ্চ বিদ্যালয়ের ছাত্র হলেও বরাবরই প্রথম হওয়ার সুবাদে, সাজেশন্স, নোট ও প্রাইভেট পড়াজনিত কারণে সেখানকার অনেক ছাত্রের সঙ্গে তখন থেকেই ভাব ও বন্ধুত্ব ছিল)। আমি মাত্র ক্লাস নাইনের ছাত্র তখন। এলাকায় তখন শায়েস্তাগঞ্জ হাইস্কুল ও স্কুলের হেড মাস্টারের সুনাম তুঙ্গে। তাই শায়েস্তাগঞ্জ স্কুল ও স্কুলের হেড মাস্টারকে দেখার কৌতুহল াামার অনেকদিনের। সময় ও সুযোগে একদিন চলে গেলাম সেখানে। ক্লাস তখনো শুরু হয়নি। কেবল এসেম্বলি শেষ হয়েছে। কি জাকজমক অবস্থা। পূর্ব পরিচিত আমার এক সহপাঠী হাত উচিয়ে সুন্দরমত চশমাঅলা লোককে দেখিয়ে বললো, ওি দেখ আবদুন নূর চৌধুরী। তিনিই হেডমাস্টার। ততক্ষণে আমার মনে হয়েছিল তিনি আমার দিকেই রওনা করে দিয়েছিলেন। হাতে একটা বেত আর চোখে ঝুলানোমতো চশমা। এক ভয়াবহ অবস্থা। ঠিক আকেই অবস্থায় ামি তাকে আরো অনেকবার দেখেছি। আমার তখনো মনে হতো তিনি যেন চশমা দিয়ে না দেখে চশমার ফাক দিয়ে পুরে স্কুলটি এবং স্কুলের প্রত্যেকটি ছাত্রছাত্রীকে দৃষ্টির নিয়ন্ত্রণে রাখছেন। এ দৃষ্টি এড়ায় সাধ্য কার। মনের ভেতরে এতোক্ষণ ধরে যে একটা বোধ আমাকে অবচেতনভাবে নিয়ে গিয়েছিল ১৯৮৮ কিংবা এরই ধারে কাছে, আমার কাছে তার জট খুলে গেল মুহূর্তের মধ্যে। আমি প্লাটফর্মে বন্ধুবর তৌহিদের চোখ ও চশমার যে অবস্থা দেখেছিলাম সেই অবস্থা আমাকে ফিরিয়ে নিয়ে গিয়েছিল অন্য এটি কালের গহŸরে। যে কালে একজন আবদুন নূর চৌধুরীর ফাঁক করে চশমা পরার ভয়াবহ দৃশ্য সর্বদা সচেষ্ট থাকতো কেবল একজনকে গড়ার জন্যই। তখন ছাত্রছাত্রীদের দীক্ষা নেয়ার একটা প্রবল ঝোক থাকতো। আজকাল যেন কেমন হয়ে গেছে ছাত্র, শিক্ষক অভিভাবক সবাই। না, আমি কেন বেত ব্যবহার করতে যাবো? বেত দিয়েকি আর শেখানো যায়? কিংবা কখনো আমার সন্তানের গায়ে বেত দেবেন না, বেত দেখলে তার মনে ভীতি প্রবেশ করে ফেলবে। তখন আর কোনোদিন আমার বাচ্চা স্কুলের নামও মুখে নেবে না।
মানুষ সৃষ্টির শুরু থেকেই শৃংখলা নিয়ন্ত্রণ প্রিয়। প্রত্যেক ধর্মেও নিয়ন্ত্রণ এবং শৃংখলা সম্পর্কে নির্দেশ দেয়া আছে। অর আজকাল সর্বত্র স্বাধীনতা, স্বাধীনতা একটা অতিরিক্ত ভাব ও ভণিতার আশ্রয়। বিশেষ করে ছাত্রছাত্রীদের বেলায় অভিভাবক, ছাত্র, শিক্ষকের এ মনোবৃত্তিই আমার মনে হজয় একজন আবদুন নূর চৌধুরীর সময় এবকং কাল থেকে আমরা বিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছি। (সরি! আমি কাউকে, কোনো প্রতিষ্ঠানকে দোষারাপ করছি না। এমনকি আমার প্রাণের বিদ্যাপীঠ এবং আমার অতীব প্রিয় হেডমাস্টার স্যারকে আমার পিতার আসনের একপাশে আজও ভক্তি করি) আমি শুধু মরহুম সমাজপতি আবদুন নূর চৌধুরীর সময়কাল এবং আমাদের এখানকার সময়কালের ঘাটতি এবং এর কারণ নিয়ে আক্ষেপ করছি। আমরা কি সামনে চলতে চলতে আমাদের অভিষ্ট লক্ষ্য থেকে আরো পেছনে সরে যাচ্ছি? তা না হলে…?
বিশেষ করে শায়েস্তাগঞ্জ উচ্চ বিদ্যালয় ও আমাদের এতদঞ্চলের সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, শিক্ষক ও অভিভাবকবৃন্দের কানে বাজছে আজ সময়ের আহাজারি, আজ খুবই প্রয়োজন আর একজন আবদুন নূর চৌধুরী। পরিশেষে আকিলা-নূর ফাউন্ডেশনের যাত্রা শুরুর শুভক্ষণে আজ নূর দম্পতির আত্মার মাগফেরাত কামনা করছি। ঘুমাও পিতা শান্তিতে, কেবল জেগে থাকুক তোমার আদর্শ ও কীর্তি।
লেখক : প্রিন্সিপাল, স্কুল হলি দেশ

মা
মাগো অনেক কিছুই তো শেখা হলো না তোমার কাছ থেকে। সময় পড়ে আছে ভেবে শুনিনি তোমার কথা কিছুই। মনে ছিল না সময়ের নিয়ন্তা তো আমি নই। নীতি নৈতিকতা আর সাহস, সে তো তোমার কাছ থেকেই পাওয়া। নিতে চাইনি কিছুই, তাও তো তুমি দিয়ে গেছ অনেক কিছুই। তাহলে তুমি কি জানতে চলে যাবে এ তো দ্রæত। ২৪ ফেব্রæয়ারি ২০০৬, সেদিনও তোমার হাতে খাবার তুলে দিয়ে বলেছিলাম নাও আব্বার জন্য। কখনো মনে হয়নি বলি ‘মা এটি তোমার জন্য’ বা একটিবার বলি মা তোমাকে অনেক ভালোবাসি। তুমি তো আছই বা তুমি তো করেই যাবে আমাদের জন্য। আাদের করা না করার তোমার কি আসে যায়। মাঝে মাঝে মনে হয় তুমি হয়তো ছিলে কোনো বিশেষ প্রকৃতির মানুষ বা অতিমানব। না হলে কীভাবে সম্ভব ছিল এতো কিছু এক হাতে সামাল দেয়া। তাহাজ্জদের নামাজ থেকে শুরু করে ইসরাক, চাশতÑকত নামাজই না তুমি পড়তে, সব কিছু সেরে ঘড়ি কাটা ১২টায় গেলে ডায়রিতে আব্বার অসুস্থতা, ওষুধ, ডাক্তার ছেলেমেয়ে, নাতি-নাতনির ফোন, সুস্থতা সব হিসাব মিলিয়েই তুমি ঘুমাতে যেতে। তাহলে তুমি কি ঘুমিয়ে সময় নষ্ট করতে না? তোমার মন কত জায়গায় চলে যায়। (সব ছেলেমেয়ের কথা মনে পড়ে)। তুমি শুনলে খুশি হবে তোমার ছেলেমেয়েরা কেউ অন্যর সম্পদে লোভ করে নাÑ অবৈধ সম্পদ অর্জন করে না। আরো জেনে খুশি হবে, আব্বার প্রতি আমরা কোনো অবহেলা করিনিÑতোমার সন্তান না আমরা। মাগো একটিবার চুপি চুপি এসে বলে যাও, তুমি কোথায় আছ?
তুমি ছেলেমেয়ের গায়ে হাত তুলতে না, তুমি বা আব্বা কখনো আমা গায়ে স্পর্শ পর্যন্ত করনি কখনো। কেন মা কেন? অথবা লিখিয়ে দিয়ে যাও তোমার সন্তান আর আত্মীয়স্বজনের সাথে সম্পর্কের এই কৌশল।
খুব মনে পড়ে ছোটবেলায় অসুস্থ হলে, জ্বর হলে রাত জেগে মাথায় পানি ঢালার কথাÑক্লান্তিহীন, নিদ্রাহীন তুমি। আত্মীয়স্বজন বেড়াতে এলে হয়ে যেত উৎসব। ২ দিনের জন্য এলেও নানা ধরনের পিঠা আর মাছ ধরা সে তো ছিল কমন। সঙ্গে ভোর বেলা উঠে রেললাইন ধরে হাটা, নদীর পাড়ে হাটতে যাওয়া, শীতের সকালে কুয়াশায় হেটে হেটে আখ মাড়াই দেখতে যাওয়াÑএগুলো ছিল সকলের জন্য করণীয়।
আরেকটা কথা মা, তোমার রান্না তো আমাকে একদম লিখে দিয়ে যাওনি-ভুল বললাম, আমি লিখিনি, ভেবেছি এতো যতœ, এতো সময় এতে শুধু কষ্টই বাড়ে-আর তুমি তো আছই। কোথাও খুজে পাই না তোমার রান্নার স্বাদ।
তুমি কাদেরকে লেখাপড়ার জন্য সাহায্য করতে, কিছুই তো আমাদের বলে যাওনি-তোমার সবই কি ছিল নীরবে? হজরত মোহাম্মদ (সা.) বাণী উদ্ধৃত করে তুমি বলতে ডান হাত দান করলে, যেন বাম হাত টের না পায়।
মা গো মনে পড়ে অবৈধ উপার্জন যারা করে তাদের বাড়ি গেলে তুমি নাস্তা খেতে না। বাসায় এসে আমরা তোমাকে নিয়ে কি হাসাহাসিই না করতাম। এখন বুঝতে পারি কত বড় মেসেজ তুমি আমাদেরকে দিয়ে গেছ মা। আব্বাকে দেখেছি সারা জীবন তোমাকে সম্মান করতে। যে আব্বাকে তুমি খাইয়ে দিতেÑ সেই আব্বাকে দেখলাম তোমার অনুপস্থিতিতে অনেক শক্ত। নিজের হাতেই খাচ্ছেন। বলেছেন তুমি কোথায় আছ।
ধৈর্য, সাহসিকতা, সততা, ন্যায়পরায়ণতা, ধর্মভীরু, উদার, দানশীলতা, অসম্ভব ¯েœহপরায়ণ, কর্মঠ, দায়িত্ববান, নিষ্ঠাবান, অন্যায়ের বিরুদ্ধে কঠোর ও আপসহীন এক অসম্ভব গুণি মায়ের সন্তান আমরা। আমরা তোমার গঠিত সন্তান।
তোমার চিরবিদায়ের ঠিক ১৩ দিন আগের কথা বলছি মা। ২৭ মে ফেব্রæয়ারি ২০০৬ সকাল বেলা ফজরের নামাজের পর তুমি প্রচÐ পেট ব্যথায় কাতরাচ্ছ। তোমাকে দেখে আমি রুমে আসতেই আমারও প্রচÐ ব্যথা। প্রথমে আমি তোমাকে বলিনি পরে খুব খারাপ লাগছে বলে তোমার কাছে যেতেই তুমি লাফ দিয়ে বিছানা থেকে আমার পেট ম্যাসাজ করে দিলে। তোমার ব্যথার কথা তুমি একদম ভুলে গেলে। আমি অবাক হয়ে দেখলাম নিমিষেই আমর ব্যথা কমে গেছে। এ কোন জাদু মা। আমাকে কি একটু শিখিয়ে দেবে না?
পত্রিকার খবরের কোনো ফলোআপ পড়া না হলেও জানতাম সমস্যা হবে না, আম্মার কাছ থেকে জেনে নেব। বাসার বাইরে গিয়ে দেরি হলেই এসে শুনতাম তুমি ফোন করেছিলে? ১২ মার্চ ২০০৬-এর পর তুমি আর কোনোদিন খোজ করনিÑকরবে না জানি। অন্তত একদিন একটিবার এসে বলে যাও।
তুমি কোথায় আছ? কেমন আছ মা?
লেখিকা : মরহুম আবদুন নূর চৌধুরী ও মরহুম আকিলা খান চৌধুরীর একমাত্র কন্যা এবং সহযোগী অধ্যাপিকা, লালমাটিয়া কলেজ, ঢাকা।

Comments

comments

সম্পাদক : মোহাম্মদ আবদুল বাছির
প্রকাশক: মোহাম্মদ জহিরুল ইসলাম
ফোন : ‎০১৭১৩৪০৯০৯০
৩৪৫/১, দিলু রোড, নিউ ইস্কাটন, ঢাকা-১০০০
X
 
নিয়মিত খবর পড়তে আমাদের ফেসবুক পেজে লাইক দিয়ে যুক্ত থাকুন
X